মা-সন্তানদের করুণ মৃত্যু -ঘটনার পেছনের ছক ও দায় উদ্ঘাটিত হোক

ফারজানা ও তাঁর দুই সন্তানের করুণ মৃত্যু দেশবাসীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সাধারণ মানুষ এই ঘটনার নেপথ্যের সব কারণ উদ্ঘাটনে পুলিশের তরফে যথেষ্ট প্রগতিশীল ভূমিকা আশা করে। তদন্ত সময়সাপেক্ষ হতে পারে। জিজ্ঞাসাবাদে নতুন তথ্য বের হওয়াও স্বাভাবিক। এটা দুঃখের বিষয়, পুলিশ আশপাশে ঝোপ পেটালেও ‘আত্মহত্যা’য় সরাসরি প্ররোচনা দেওয়া কিংবা মা ও দুই শিশুর মৃত্যুর জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে।
গৃহবধূ ফারজানা এবং তাঁর দুই শিশুর মৃত্যু আত্মহত্যা বা হত্যাকাণ্ড যা-ই হোক, সেটা সুষ্ঠু তদন্তের ওপর নির্ভরশীল। সুষ্ঠু তদন্ত শেষ হলেই আমরা কেবল সুষ্ঠু বিচার আশা করতে পারি। পুলিশ চাইলেই যে ভালো কাজ পারে, তার দৃষ্টান্ত আমাদের জানা। স্বামী প্রতারণা করে আরেকটি বিয়ে করে স্ত্রী-সন্তানদের অস্বীকার করে আসছিলেন। শ্বশুরসহ ননদ ও অন্যরা অসহায় মা ও সন্তানদের বাড়িছাড়া করার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমনকি বাড়ি ছাড়ার কথা স্ট্যাম্পের ওপর লিখিয়েও নিয়েছিলেন। তাঁদের লাঞ্ছনার এ ঘটনার সাক্ষী স্বয়ং পুলিশও। উপরন্তু ঘুমের বড়ি, স্ট্যাম্প, দুই শিশুর লেখার রং পেনসিল ইত্যাদি জুগিয়ে দেওয়া গাড়িচালকের স্বীকারোক্তি থেকেও পুরো ঘটনাটি নিয়ে জটিলতা আরও বাড়ল। নিজ হাতে বড়ি এনে দিয়ে চোখের সামনে তিনটি জলজ্যান্ত মানুষকে আত্মহত্যা করতে দেখার পর গাড়ি নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার যে বিবরণ তিনি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দিয়েছেন, তার সত্যতা যাচাই করাই এখন তদন্তকারীদের কাজ। কিন্তু পুলিশ ও তদন্ত কর্মকর্তা এখনো ঘটনার ডালপালাতেই বিচরণ করছেন, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের এখনো জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হচ্ছে না। পুলিশের উচিত, মানুষের অনুভূতিতে দাগ কাটা এই মর্মান্তিক ঘটনার যথাযথ তদন্ত দ্রুতই শেষ করে অপরাধের আসল চেহারাটি উন্মোচন এবং প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা।
ফারজানা ও তাঁর দুই সন্তানের এই করুণ মৃত্যু আমাদের সমাজে নারীর নাজুক অবস্থানকেই প্রমাণ করে। প্রমাণ করে যে অনেক ক্ষেত্রে ‘আপনজনেরাই’ নারীর জীবনকে দুর্বিষহ করতে করতে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারীর হত্যা ও আত্মহত্যার মধ্যে ব্যবধান তাই খুবই কম। হত্যাকাণ্ড মানে অন্যের ইচ্ছায় অন্যের হাতে মৃত্যু। কিন্তু অন্যের চাহিদার কাছে সমর্পিত হয়ে অন্যের চাপে নিজের হাতে নিজের মৃত্যু ঘটানোর সঙ্গে ‘আত্মহত্যা’র পার্থক্যটি কেবল হাতের ভূমিকার, দায়ের নয়। উভয় ক্ষেত্রেই দায় মৃতের নয়, যারা তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, তাদের।
স্পষ্টতই, এ ঘটনার আইনি ও নৈতিক দিক রয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের, কিন্তু যে রকম পরিস্থিতিতে নারী-শিশুরা এভাবে মরে যায়, সেই পরিস্থিতি বদলের দায়িত্ব সমাজের সবার। নারীর প্রতি, পরিবারের প্রতি অধিকাংশ পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি যাতে মানবিক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ হয়, আর কোনো নারীকে-স্ত্রীকে-কন্যাকে যাতে এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে না হয়, তার দায়িত্ব আমাদের সবার।