লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হওয়ায়-ই কি আলোচনা স্থগিত করেছে ইরান

যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ শুক্রবার ভোরে নিশ্চিত করেছে, দেশটিতে বার্গেনস্টক নামের পার্বত্য অবকাশকেন্দ্রে নির্ধারিত ওই বৈঠক হচ্ছে না। আলোচনা স্থগিত হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের চলমান অভিযানকে কেন্দ্র করে ইরান তাদের প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে। দুই দেশ গত বুধবার ভার্চ্যুয়ালি যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেছিল, তার কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য এই প্রতিনিধিদলের সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল।

খবরে আরও বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে লেবাননে ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ওই এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষের কথা জানিয়েছে।

ইরান যুদ্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ক্রমাগত সমর্থন হারাচ্ছেন ট্রাম্প। এমন অবস্থায় ইরান বুঝতে পেরেছে, যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ বাড়ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তেহরান কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং বলেছে, পরিকল্পনায় সম্মতি জানালেও তাদের কিছু আপত্তি আছে।

ইরানের আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আজ শুক্রবার বলেন, যেকোনো আলোচনা তেহরানের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। তিনি বলেন, এই চুক্তিসংক্রান্ত আলোচনায় ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করা।

গালিবাফ আরও বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করেছি, শত্রু যদি বাড়াবাড়ি করে তাহলে আমাদের আঙুল ট্রিগারে থাকে এবং শত্রুকে কঠিন জবাব দিতে আমরা কোনো দ্বিধা করি না।’

চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক আগামী রোববার মিসরের আলামিন শহরে বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছে। কায়রো ও ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সুইজারল্যান্ডের মধ্যাঞ্চলে লুসার্ন শহরের কাছে অবস্থিত বার্গেনস্টক অবকাশকেন্দ্রে একটি আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিনিধিদলগুলোর মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। এই অবকাশকেন্দ্রটি কাতারের সরকারি বিনিয়োগ তহবিলের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানি কাতারা হসপিটালিটির মালিকানাধীন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানেরও ভূমিকা আছে।

আজ বার্তা সংস্থা এএফপিকে পাঠানো এক বার্তায় সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যকার নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে।

সুইজারল্যান্ড আরও বলেছে, তারা এখনো এ আলোচনাকে এগিয়ে নিতে প্রস্তুত আছে। বার্গেনস্টকে সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতিমূলক কাজ চলমান। তবে আলোচনার জন্য নতুন কোনো তারিখ জানানো হয়নি।

লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে ইরান সুইজারল্যান্ডে তাদের প্রতিনিধিদল পাঠাতে দেরি করছে বলে সংবাদমাধ্যম আল মায়াদিনে খবর প্রকাশের পর এ ঘোষণা এসেছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রয়োজন’ থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইসরায়েলের সেনাবাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চলে’ অবস্থান করবে।

ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ এ চুক্তির সঙ্গে নেই। তবে ইরান জোর দিয়ে বলছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে দখল করে রাখা একটা বড় অংশ থেকে ইসরায়েলকে সরে যেতে হবে।

ক্রমবর্ধমান বিভাজন

১৪ দফার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার মাত্র দুই দিন পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু করার উদ্যোগটি ধাক্কা খেয়েছে।

জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডের পার্বত্য অবকাশকেন্দ্রে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে রওনা করার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। তাঁর সহকর্মী এবং কয়েকজন সাংবাদিক ওয়াশিংটনের কাছে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সে সফরের অপেক্ষায় জড়োও হয়েছিলেন।

একই সময়ে হোয়াইট হাউসের কয়েক ডজন কর্মকর্তা, অগ্রবর্তী প্রস্তুতি দল এবং সাংবাদিকেরা ভ্যান্সকে স্বাগত জানাতে আগে থেকে সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন।

তবে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই সফরটি বাতিল করা হয়।

হোয়াইট হাউস বলেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যাঁকে মনোনীত করেছেন—সেই ভ্যান্স ও তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকলেও পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটনেই থাকবেন।

লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে ইসরায়েলের অস্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, এটি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইসরায়েলের কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা বলেছেন, তাঁদের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য নয়। এমন বক্তব্যের পর ভ্যান্স গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কঠোর প্রতিক্রিয়া জানান। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত হওয়ার আগের ঘটনা এটি।

ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েলি সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তাহলে হয়তো আমি বিশ্বের মধ্যে আমার একমাত্র শক্তিশালী মিত্রকে আঘাত করতাম না।’

ইরানের তেহরান শহরের একটি সড়ক
ইরানের তেহরান শহরের একটি সড়ক। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

No comments

Powered by Blogger.