Friday, June 19, 2026
ইসরায়েল বেপরোয়া হলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি অসম্ভব by হুসেইন চোকর
ইসরায়েল বেপরোয়া হলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি অসম্ভব by হুসেইন চোকর
এই চুক্তিগুলোর পেছনে ছিল কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এগুলো ছিল—১৯৫৬ সালের ত্রিপক্ষীয় আগ্রাসন, ১৯৬৭ নাকসা, ১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধ, ১৯৭৮ সালে লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন এবং ১৯৮২ সালে বৈরুত আক্রমণ।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সেই শান্তির পথে এগোনোর প্রচেষ্টা থেকে সরে এসেছে। বরং উল্টো পথে গিয়ে তারা ইসরায়েলকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে, যেখানে সামরিক শক্তির জোরে গোটা অঞ্চলে আধিপত্য কায়েম করাই হয়ে উঠেছে মূল লক্ষ্য। ফলে এখন যখন ওয়াশিংটনের প্রয়োজন একটি কার্যকর শান্তিচুক্তি করা এবং তা ধরে রাখা, তখন তারা তা করতে পারছে না। কারণ, তারা নিজেরাই বহুদিন ধরে ইসরায়েলের আগ্রাসনকে উৎসাহ দিয়ে এসেছে।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রচিন্তার ভেতরে শুরু থেকেই একধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করেছে। আরব অধ্যুষিত এবং ইসলামপ্রধান একটি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন করে রাষ্ট্র গড়ার প্রকল্পে তারা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কিত ছিল। এই শঙ্কা মোকাবিলায় তারা দুটি ভিন্ন পথ তৈরি করে।
প্রথম পথটি ছিল শক্তি ও সামরিক নিষ্ঠুরতার ওপর নির্ভরশীল। এই ধারণা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন জিয়েভ জাবোটিনস্কি, যিনি ফিলিস্তিনে ইরগুন নামে একটি সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। ১৯২৩ সালে লেখা তাঁর ‘লোহার দেয়াল’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, জায়নবাদী উপনিবেশ স্থাপন হয় থেমে যাবে, না হলে স্থানীয় জনগণকে উপেক্ষা করেই চলবে। আর তা সম্ভব কেবল এমন এক শক্তিশালী সুরক্ষার আড়ালে, যা স্থানীয়দের পক্ষে ভাঙা অসম্ভব; আর সেটিই হলো লোহার দেয়াল।
ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নও একইভাবে বিশ্বাস করতেন, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতাকেই শক্তির মাধ্যমে বদলে ফেলতে হবে।
বহু বছর পর লিকুদ পার্টির নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ১৯৯৩ সালে লেখা তাঁর বইয়ে লিখেছিলেন, ইসরায়েলকে টিকে থাকতে হলে তাকে অবশ্যই সামরিকভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকতে হবে এবং সেই অনুযায়ী অঞ্চলকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও তিনি এই নীতিতেই অটল থেকেছেন। এর ফল হয়েছে মৃত্যু, ধ্বংস এবং অস্থিতিশীলতা।
দ্বিতীয় পথটি তৈরি হয় ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর। তখন ইসরায়েল নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়ে। তখন ‘শান্তির মাধ্যমে অস্তিত্ব’ ধারণাটি সামনে আসে। এই ধারণা অনুযায়ী, ইসরায়েল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে টিকে থাকতে পারে। এর ভিত্তি ছিল ‘ভূমির বিনিময়ে শান্তি’—অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে দখল করা ভূখণ্ড ফিরিয়ে দিয়ে স্বীকৃতি ও শান্তি অর্জন।
এই পথ দ্রুত কিছু ফলও এনে দেয়। ১৯৭৮ সালে মিসরের সঙ্গে চুক্তি করে সিনাই উপদ্বীপ ফিরিয়ে দেয় ইসরায়েল। ১৯৯৪ সালে জর্ডানের সঙ্গে চুক্তি হয়। সেখানেও কিছু দখল করা জমি ফেরত দেওয়া হয়।
ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার সঙ্গে অসলো চুক্তিও এই ধারার অংশ ছিল। এমনকি প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন সিরিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তির বিনিময়ে পুরো গোলান মালভূমি ফেরত দিতেও প্রস্তুত ছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু ১৯৯৫ সালের শেষে তিনি জায়নবাদী উগ্রপন্থীদের হাতে নিহত হন।
এর পর থেকে ধীরে ধীরে ইসরায়েল আবার আগের ‘লোহার দেয়াল’ নীতিতে ফিরে যায় এবং বর্তমানে তা সবচেয়ে চরম আকার ধারণ করেছে।
ইসরায়েলের এই আগ্রাসী পথে ফিরে আসা শুধু তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফল নয়, এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের সরকার ও সেনাবাহিনীর আচরণের ওপর কোনো সীমা আরোপ না করে ওয়াশিংটন এমন আচরণ করেছে, যেন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রের স্বার্থই বৈধ নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই মেয়াদে এই সমর্থন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর্থিক সহায়তা, কূটনৈতিক সুরক্ষা, দখল করা ভূখণ্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সামরিক সহযোগিতা—সবকিছুর বাইরে গিয়ে তিনি ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নেন। দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির বিপরীতে গিয়ে তিনি আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনি প্রশ্নকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই চুক্তিগুলো মূলত ‘ভূমির বিনিময়ে শান্তি’ ধারণাকে সরিয়ে দিয়ে ‘হত্যা-ধ্বংস-যুদ্ধ না হলেই শান্তি’—এমন একটি নতুন সূত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ট্রাম্প ইসরায়েলকে এমন সুযোগও দেন, যাতে তারা পুরো অঞ্চলে নির্বিচার সামরিক অভিযান চালাতে পারে। গত বছর মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ছয়টি আরব দেশে ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়। এমনকি কাতারের মতো দেশও রেহাই পায়নি, যেখানে মার্কিন সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের অগ্রবর্তী ঘাঁটি রয়েছে।
এর চেয়েও বড় উদাহরণ হলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এই যুদ্ধ মূলত ইসরায়েলের স্বার্থেই পরিচালিত হয়েছে। এমনকি এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ কিংবা তাদের আরব মিত্রদের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।
এই নীতির কারণে আরব দেশগুলো ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়েছে। আগে তারা নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ভাবত, কিন্তু এখন তাদের মতামত তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। বরং এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা আসলে ইসরায়েলের স্বার্থে তৈরি—আরব দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা বা স্বাধীনতার জন্য নয়।
এই পরিস্থিতিকে বাইরে থেকে ‘শান্তি’ বা ‘স্থিতিশীলতা’ বলা হলেও বাস্তবে এটি আরও অস্থিরতা তৈরি করছে। যেমন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেছিল, ইসরায়েল সেটি মানতে চায়নি। এতে বোঝা যায়, যখন কোনো দেশ নিঃশর্ত সমর্থন পায়, তখন সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। সোজা কথা, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি চায়, তাহলে তাকে তার নীতি বদলাতে হবে। শুধু চুক্তির নাম ‘শান্তি’ রাখলেই আসল শান্তি আসে না।
● হুসেইন চোকর, বৈরুতভিত্তিক নীতিনির্ধারণ বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স |
About: Kutubdia News
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1276)
-
▼
June
(267)
-
▼
Jun 19
(18)
- লেবাননে হামলা নিয়ে ইসরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি ভ্যান্সের
- লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হওয়ায়-ই কি আলোচনা...
- বাংলাদেশের পাটপণ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বহাল রাখ...
- ইসরায়েল বেপরোয়া হলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি অসম্ভব by ...
- ইরান চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিতে গৃহদাহ
- যেভাবে কূটনৈতিক চালে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি করাল...
- ভারত থেকে পালালেন ইসরাইলি সেনা, নেপথ্যে কী
- পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত: ইসরাইলি মন্ত্রী
- স্ত্রীর মাথা ন্যাড়া করে প্রস্রাব পান করানোর অভিযোগ...
- গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ: ট্রাম্পের অযৌক্তিক যুদ্ধ আর ...
- এক আঘাতেই দুটি শান্তিচুক্তি নস্যাৎ করতে চান নেতানি...
- ট্রাম্প যেভাবে নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নষ্ট ক...
- চিকিৎসা আছে, তবু রোগটি গোপন রেখে যন্ত্রণায় ভোগেন ম...
- ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি করার পর প্রশ্ন উঠ...
- রিগ্যান থেকে ট্রাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের পতন ও চীনের উ...
- এবার বাংলাদেশে চলে যান, মমতাকে দিলীপ ঘোষ
- শান্তিচুক্তির জন্য মরিয়া ছিলেন ট্রাম্প: মোজতবা খামেনি
- জলবায়ু সম্মেলনে নেই যুক্তরাষ্ট্র, নেতৃত্বের জায়গা ...
-
▼
Jun 19
(18)
-
▼
June
(267)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment