Tuesday, November 6, 2012
কিন্নরদল by বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
কিন্নরদল by বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
পাড়ায় ছ'সাত ঘর ব্রাহ্মণের বাস মোটে। সকলের অবস্থাই খারাপ। পরস্পরকে ঠকিয়ে পরস্পরের কাছে ধার-ধোর করে এরা দিন গুজরান করে। অবিশ্যি কেউ কাউকে খুব ঠকাতে পারে না, কারণ সবাই বেশ হুঁশিয়ার।
গরিব বলেই এরা বেশি কুচুটে ও হিংসুক, কেউ কারো ভালো দেখতে পারে না বা কেউ কাউকে বিশ্বাসও করে না।
আগেই বলেছি, সকলের অবস্থা খারাপ এবং খানিকটা তার দরুন, খানিকটা অন্য কারণে সকলের চেহারা খারাপ। কিশোরী মেয়েদেরও তেমন লালিত্য নেই মুখে, ছোট ছোট ছেলেরা এমন অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন থাকে এবং এমন পাকা পাকা কথা বলে যে, তাদের আর শিশু বা বালক বলে মনে হয় না। কাব্যে বা উপন্যাসে যে শৈশবকালের কতই প্রশস্তি পাঠ করা যায়, মনে হয় সে সব এদের জন্য নয়, এরা মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে একেবারে প্রবীণত্বে পা দিয়েছে।
পাড়ায় একঘর গৃহস্থ আছে, তারা এখানে থাকে না, তাদের কোঠাবাড়িটা চাবি দেওয়া পড়ে আছে আজ দশ-বারো বছর। এদের মস্তবড় সংসার ছিল, এখন প্রায় সবাই মরে হেজে গিয়ে প্রায় পাঁচটি প্রাণীতে দাঁড়িয়েছে। বাড়ির বড় ছেলে পশ্চিমে চাকরি করে, মেজ ছেলে কলেজে পড়ে কলকাতায়, ছোট ছেলেটি জন্মাবধি কালা ও বোবা_পিসিমার কাছে থেকে মূকবধির বিদ্যালয়ে পড়ে। বড় ছেলে বিবাহ করেনি, যদিও তার বয়স ত্রিশ-বত্রিশ হয়েছে। সে নাকি বিবাহের বিরোধী, শোনা যাচ্ছে যে এমনিভাবেই জীবন কাটাবে।
পাড়ার মধ্যে এরাই শিক্ষিত ও সচ্ছল অবস্থার মানুষ। সেজন্য এদের কেউ ভালো চোখে দেখে না, মনে মনে সকলেই এদের হিংসে করে এবং বড় ছেলে যে বিয়ে করবে না বলছে, সে সংবাদে পাড়ার সবাই পরম সন্তুষ্ট। যখন সবাই ছোট ও গরিব, তখন একঘর লোক কেন এত বাড় বাড়বে? বড় ছেলে বিয়ে করলেই ছেলেমেয়ে হয়ে জাজ্বল্যমান সংসার হবে দুদিন পরে, সে কেউ সহ্য করতে পারবে না। মেজ ছেলে মোটে কলেজে পড়ছে, এখন সাপ হয় কী ব্যাঙ হয় তার কিছু ঠিক নেই, তার বিষয়ে দুশ্চিন্তার এখনো কারণ ঘটেনি, তবে বয়েসও বেশি নয়।
মজুমদার-বাড়িতে ভাঙা রোয়াকে দুপুরে পাড়ার মেয়েদের মেয়ে-গজালি হয়। তাতে রায়-গিনি্ন, মুখুজ্যে-গিনি্ন, চক্কত্তি-গিনি্ন প্রভৃতি তো থাকেনই, অল্প-বয়সী বৌয়েরা ও মেয়েরাও থাকে। সাধারণত যেসব ধরনের চর্চা এ মজলিসে হয়ে থাকে, তা শুনলে নারীজাতি সম্বন্ধে লিখিত নানা সরল প্রশংসাপূর্ণ বর্ণনার সত্যতার সম্বন্ধে ঘোর সন্দেহ যাঁর উপস্থিত না হবে, তিনি নিঃসন্দেহে একজন খুব বড় ধরনের অপটিমিস্ট।
আজ দুপুরে যে বৈঠক বসেছে, তাতে আলোচিত বিষয়গুলো থেকে মোটামুটি প্রতিদিনের আলোচনা ও বিতর্কের প্রকৃতি অনুমান করা যেতে পারে।
বোস-গিনি্ন বলছিলেন_আরে বাপু দিচ্ছি তো রোজই, আমার গাছের কাঁটাল খেয়েই তো মানুষ, আমাদের যখন কাঁটাল পাড়ানো হয়, ছেলেমেয়েগুলো হ্যাংলার মতো তলায় দাঁড়িয়ে থাকে_ঘেয়ো কী ভুয়ো এক-আধখানা যদি থাকে তো বলি, যা নিয়ে যা। তোদের নেই, যা খেগে যা। তা কি পোড়ার মুখে কোনো দিন সুবাক্যি আছে? ওমা, আজ আমার মেয়ে দুটো নেবু তুলতে গিয়েছে ডোবার ধারের গাছে, তা বলে কি না রোজ নেবু তুলতে আসে, যেন সরকারি গাছ পড়ে রয়েছে আরকি_চবি্বশ ঝুড়ি কথা শুনিয়ে দিলে মন্টুর মা। আচ্ছা বলো তো তোমরাই_
মন্টুর মা_যাঁকে উদ্দেশ করে এ কথা বলা হচ্ছিল, তিনি এঁদের মজলিসে কেবল আজই অনুপস্থিত আছেন নইলে রোজই এসে থাকেন। তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে সবাই তাঁর চালচলন, ধরন-ধারণ, রীতি-নীতির নানারূপ সমালোচনা করল।
প্রিয় মুখুজ্যের মেয়ে শান্তি_ষোল-সতেরো বছরের কুমারী_তার মায়ের বয়সী মন্টুর মায়ের সম্বন্ধে অমনি বলে বসল_ওঃ, সে কথা আর বোলো না খুড়িমা, কী ব্যাপক মেয়েমানুষ ওই মন্টুর মা। ঢের ঢের মেয়েমানুষ দেখিচি, অমন লঙ্কাপোড়া ব্যাপক যদি কোথাও দেখে থাকি, ক্ষুরে নমস্কার, বাবা বাবা!
ছোট মেয়ের ওই জ্যাঠামি কথার জন্য তাকে কেউ বকলে না বা শাসন করলে না, বরং কথাটা সকলেই উপভোগ করলে।
তারপর কথাটার স্রোত আরো কত দূর গড়াত বলা যায় না, এমন সময় রায়-বাড়ির বড়বৌ হঠাৎ মনে-পড়ার ভঙ্গিতে বললেন_হাঁ, একটা মজার কথা শোনোনি বুঝি। শ্রীপতি যে বিয়ে করেছে, বটঠাকুরের কাছে চিঠি এসেচে, শ্রীপতির মামা লিখেচে।
সকলে সমস্বরে বলে উঠল_শ্রীপতি বিয়ে করেচে!
তারপর সকলেই একসঙ্গে নানারূপ প্রশ্ন করতে লাগল :
_কোথায়, কোথায়?
_কবে চিঠি এলো?
_তবে যে শুনলাম শ্রীপতি বিয়ে করবে না বলেচে।
শ্রীপতির বিয়ের খবরে অনেকেই যেন একটু দমে গেল। খবরটা তেমন শুভ নয়। কারো উন্নতির সংবাদ এদের পক্ষে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করা অসম্ভব। তাদের যখন উন্নতি হলো না, তখন অপরের উন্নতি হবে কেন? কিন্তু এরপরেই যখন রায়-বৌ মুখ টিপে হেসে আস্তে আস্তে বললেন_বৌটি নাকি বামুনের মেয়ে নয়_তখন সকলে খাড়া হয়ে সটান উঠে বসল, তাদের মরা-মরা ভাবটা এক মুহূর্তে গেল কেটে। একটা বেশ সরস ও মুখরোচক পরনিন্দা আর ঘোঁটের আভাস ওরা পেলে, রায়-বৌয়ের চাপা ঠোঁটের হাসি থেকে।
শান্তি উৎসুক চোখে চেয়ে হাসিমুখে বললে_ভেতরে তাহলে অনেকখানি কথা আছে!
বোস-গিনি্ন বললেন_তাই বল! নইলে এমনি কোথাও কিছু নয় শ্রীপতি বিয়ে করলে, এ কি কখনো হয়। কি জাত মেয়েটার? হিঁদুু তো?
অর্থাৎ তাহলে রগড়টা আরো জমে। রায়বৌ বললেন_হিঁদুই, মেয়েটা বদ্দি বামুন।
এদেশে বৈদ্যকে বলে থাকে 'বদ্দি বামুন'_এ অঞ্চলের ত্রিসীমানায় বৈদ্যের বাস না থাকায় বৈদ্যজাতির সমাজতত্ত্ব সম্বন্ধে এদের ধারণা অত্যন্ত অস্পষ্ট। কারো বিশ্বাস ব্রাহ্মণের পরেই বৈদ্যের সামাজিক স্থান, তারা একপ্রকারের নিম্নবর্ণের ব্রাহ্মণ, তার চেয়ে নিচু নয়_আবার কারো বিশ্বাস তাদের স্থান সমাজের নিম্নতর ধাপের দিকে।
শান্তি বললে_বৌয়ের বয়েস কত?
ওঃ, তা অনেক। শুনচি চবি্বশ-পঁচিশ_
সকলে সমস্বরে আবার একটা বিস্ময়ের রোল তুললে। চবি্বশ-পঁচিশ বছর পর্যন্ত মেয়ে আইবুড়ো থাকে ঘরে! এ আবার কোথাকার ছোট জাত, রামোঃ। ছিঃ_
শান্তির মা বললেন_তাহলে মেয়ে আর নয়, মাগী বল! পাঁড় শসা_বাপ-মা বুঝি ঘরে বীজ রেখেছিল!
কে একজন মুখ টিপে হেসে বললেন_বিধবা না তো?
চক্কত্তি-গিনি্ন বললেন_আগের পক্ষের ছেলেমেয়ে কিছু আছে নাকি মাগীর!
এ কথায় শান্তিই আগে মুখে আঁচল দিয়ে খিল্খিল্ করে হেসে উঠল_তারপরে বাকি সকলে তার সঙ্গে যোগ দিলে। হ্যাঁ, এটা একটা নতুন ও ভারি মজার খবর বটে, মেয়ে-গজালির কিছুদিনের মতো খোরাক সংগ্রহ হলো। আমচুরি কাঁটালচুরির গল্প একটু একঘেঁয়ে হয়ে পড়েছিল।
ঠিক পরের দিনই এক অপ্রত্যাশিত ব্যাপার ঘটল। শ্রীপতির মেজ ভাই উমাপতি গাঁয়ে এসে বাড়ির চাবি খুলে লোক লাগিয়ে ঘরদোর পরিষ্কার করতে লাগল। তার দাদা বৌদিদিকে নিয়ে শীগ্গির আসবে এবং কিছুদিন নাকি গাঁয়েই বাস করবে। বৌদিদি পাড়াগাঁ কখনো দেখেননি,_গ্রামে আসবার তাঁর খুব আগ্রহ। তার দাদাও কলকাতায় বদলি হবার চেষ্টা করছে।
মেয়ে মজলিসে সবাই তো অবাক। শ্রীপতি কোন্ মুখে অজাতের বউ নিয়ে গাঁয়ে এসে উঠবে। মানুষের একটা লজ্জা-শরমও তো থাকে, করেই ফেলেছিস না হয় একটা অকাজ। এসব কি খিরিস্টানি কাণ্ডকারখানা, কালে কালে হলো কী! আর সে ধিঙ্গি মাগীটারই বা কী ভরসা, ব্রাহ্মণদের মধ্যে ব্রাহ্মণপাড়ায় বিয়ের বউ সেজে সে কোন সাহসে আসবে।
শ্রীপতি অবিশ্যি বৌ নিয়ে পৈতৃক বাড়িতে আসার বিষয়ে এঁদের মত জিজ্ঞাসা করেনি। একদিন একখানা নৌকো এসে গ্রামের ঘাটে দুপুরের সময় লাগল এবং নৌকো থেকে নামল শ্রীপতি, তার নববিবাহিত বধূ, একটা ছোক্রা চাকর ও দুটি ট্রাঙ্ক ও একটা বড় বিছানার মোট, একটা ঝুড়ি-বোঝাই টুকিটাকি জিনিস। ঘাটে দু-একজন যারা অত বেলায় স্নান করছিল, তারা তখুনি পাড়ার মধ্যে গিয়ে খবরটা সবাইকে বললে। তখন কিন্তু কেউ এলো না, অত বেলায় এখন শ্রীপতিদের বাড়ি গেলে তাদের খেতে বলতে হয়। অসময়ে এখন এসে তারা রান্নাবান্না চড়িয়ে খাবে, সেটা প্রতিবেশী হয়ে হতে দেওয়া কর্তব্য নয়, সুতরাং সে ঝঞ্ঝাট ঘাড়ে করবার চেয়ে এখন না যাওয়াই বুদ্ধির কাজ।
কিন্তু রাসু চক্কতি আর প্রিয় মুখুজ্যের বাড়ির মেয়েরা অত সহজেই রেহাই পেলেন না। শ্রীপতি নিজে গিয়ে একেবারে অন্তঃপুরের মধ্যে ঢুকে বললে_ও পিসিমা, ও বৌদিদি, আপনারা আপনাদের বৌকে হাতে ধরে ঘরে না তুললে কে আর তুলবে? আসুন সবাই। বাধ্য হয়ে কাছাকাছির দু-তিন বাড়ির মেয়েরা শাঁক হাতে, জলের ঘটি হাতে নতুন বৌকে ঘরে তুলতে এলেন_খানিকটা চক্ষুলজ্জায়, খানিকটা কৌতূহলে। মজা দেখবার প্রবৃত্তি সকলের মধ্যেই আছে। ছোটবড় ছেলেমেয়েও এলো অনেকে, শান্তি এলো, কমলা এলো, সারদা এলো।
শ্রীপতিদের বাড়ির উঠোনে লিচুতলায় একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, দূর থেকে মেয়েটির ধপ্ধপে ফর্সা গায়ের রং ও পরনের দামি সিল্কের শাড়ি দেখে সকলে অবাক হয়ে গেল। সামনে এসে আরো বিস্মিত হবার কারণ ওদের ঘটল_মেয়েটির অনিন্দ্যসুন্দর মুখশ্রী দেখে। কী ডাগর ডাগর চোখ! কী সুকুমার লাবণ্য সারা অঙ্গে। সর্বোপরি মুখশ্রী_অমন ধরনের সুন্দর মুখ এসব পাড়াগাঁয়ে কেউ কখনো দেখেনি।
সকলে আশা করেছিল গিয়ে দেখবে কালো কালো একটা মোটা-মতো মাগী আধ-ঘোমটা দিয়ে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্যাট্ প্যাট্ করে চেয়ে রয়েছে ওদের দিকে। কিন্তু তার পরিবর্তে দেখল, এক নম্রমুখী সুন্দরী তরুণী মূর্তি...। মুখখানি এত সুকুমার যে, মনে হয় ষোল-সতেরো বছরের বালিকা।
বিকেলে ওপাড়ার নিতাই মুখুজ্যের বৌ ঘাটের পথে চক্কত্তি-গিনি্নকে জিজ্ঞেস করলেন_কী দিদি, শ্রীপতির বৌ দেখলে নাকি? কেমন দেখতে?
চক্কত্তি-গিনি্ন বললেন_না, দেখতে বেশ ভালোই_
চক্কত্তি-গিনি্নর সঙ্গে শান্তি ছিল, সে হাজার হোক ছেলেমানুষ, ভালো লাগলে পরের প্রশংসার বেলায় সে এখনো কার্পণ্য করতে শেখেনি, সে উচ্ছ্বসিত সুরে বলে উঠলে_চমৎকার, খুড়িমা, একবার গিয়ে দেখে আসবেন, সত্যিই অদ্ভুত ধরনের ভালো।
নিতাই মুখুজ্যের বৌ পরের এতখানি প্রশংসা শুনতে অভ্যস্ত ছিলেন না_বুঝতে পারলেন না শান্তি কথাটা ব্যঙ্গের সুরে বলছে, না সত্যিই বলছে। বললেন_কী রকম ভালো?
এবার চক্কত্তি-গিনি্ন নিজেই বললেন_না, বৌ যা ভেবেছিলাম তা নয়। বৌটি সত্যিই দেখতে ভালো। আর কেনই বা হবে না বলো শহরের মেয়ে, দিনরাত সাবান ঘষছে, পাউডার ঘষছে, তোমার-আমার মতো রাঁধতে হতো, বাসন মাজতে হতো, তো দেখতাম চেহারার কত জলুস বজায় রাখে।
এই বয়সে তো দূরের কথা, তাঁর বিগত যৌবন দিনেও অজস্র পাউডার সাবান ঘষলেও যে কখনো তিনি শ্রীপতির বৌয়ের পায়ের নখের কাছে দাঁড়াতে পারতেন না_চক্কত্তি-গিনি্নর সম্বন্ধে শান্তির একথা মনে হলো। কিন্তু চুপ করে রইল সে।
বিকেলে এ-পাড়ার ও-পাড়ার মেয়েরা দলে দলে বৌ দেখতে এলো। অনেকেই বললে, এমন রূপসী মেয়ে তারা কখনো দেখেনি। কেবল হরিচরণ রায়ের স্ত্রী বললেন_আর বছর তারকেশ্বরে যাবার সময় ব্যান্ডেল স্টেশনে তিনি একটি বৌ দেখেছিলেন, সেটি এর চেয়েও রূপসী।
মেয়ে-মজলিসে পরদিন আলোচনার একমাত্র বিষয় দাঁড়াল শ্রীপতির বউ। দেখা গেল তার রূপ সম্বন্ধে দু-মত নেই সভ্যদের মধ্যে, কিন্তু তার চরিত্র সম্বন্ধে নানারকম মন্তব্য অবাধে চলেছে।
_ধরন-ধারণ যেন কেমন-কেমন_অত সাজগোজ কেন রে বাপু?
_ভালো ঘরের মেয়ে নয়। দেখলেই বোঝা যায়_
_বাসন মাজতে হলে ও-হাত আর বেশিদিন অত সাদাও থাকবে না, নরমও থাকবে না।
_ঠ্যালা বুঝবেন পাড়াগাঁয়ের। গলায় নেক্লেস ঝুলুতে আমরাও জানি_
_বেশ একটু ঠ্যাকারে। পাড়াগাঁয়ে মাটিতে যেন গুমরে পা পড়ছে না, এমনি ভাব। বামুনের ঘরে বিয়ে হয়ে ভাবছে যেন কী_
_তা তো হবেই, বদ্দি বামুনের মেয়ে, বামুনের ঘরে এসেছে, ওর সাত-পুরুষের সৌভাগ্যি না?
নববধূর স্বপক্ষে বললে কেবল শান্তি ও কমলা। শান্তি ঝাঁজের সঙ্গে বললে_তোমরা কারো ভালো দেখতে পার না বাপু! কেন ওসব বলবে একজন ভদ্দর ঘরের মেয়ের সম্বন্ধে? কাল বিকেলে আমি গিয়ে কতক্ষণ ছিলাম নতুন বৌয়ের কাছে। কোনো ঠ্যাকার নেই, অহংকার নেই, চমৎকার মেয়ে!
কমলা বললে_আমাদের উঠতে দেয় না কিছুতেই_কত গল্প করলে, খাবার খেতে দিলে, চা করলে_আর, খুব সাজগোজ কি করে? সাদাসিধে শাড়ি সেমিজ পরে তো ছিল। তবু খুব ফর্সা কাপড়চোপড়_ময়লা একেবারে দুচোখে দেখতে পারে না_
শান্তি বললে_ঘরগুলো এরই মধ্যে কী চমৎকার সাজিয়েছে! আয়না, পিক্চার, দোপাটি ফুলের তোড়া বেঁধে ফুলদানিতে রেখে দিয়েছে_শ্রীপতিদার বাপের জন্মে কখনো অমন সাজানো ঘরদোরে বাস করেনি_ভারি ফিটফাট গোছালো বৌটি_
দিন দুই পরে ডোবার ঘাটে নববধূকে একরাশ বাসন নিয়ে নামতে দেখে সকলে অবাক হয়ে গেল। চারদিকে বনে ঘেরা ঝুপসি আধ-অন্ধকার ডোবাটা যেন মেয়েটির স্নিগ্ধ রূপের প্রভায় এক মুহূর্তে আলো হয়ে উঠল, একথা যারা তখন ডোবার অন্যান্য ঘাটে ছিল, সবাই মনে মনে স্বীকার করলে। দৃশ্যটাও যেন অভিনব ঠেকলে সকলের কাছে, এমন একটা পচা এঁদো জঙ্গলে ভরা পাড়াগেঁয়ে ডোবার ঘাটে সাধারণত কালো কালো, আধ-ময়লা শাড়িপরা শ্রীহীনা ঝি-বৌ বা ত্রিকালোত্তীর্ণ প্রৌঢ়া বিধবাদের গামছা-পরিহিতা মূর্তিই দেখা যায়, বা দেখার আশা করা যায়_সেখানে এমন একটি আধুনিক ছাঁদে খোঁপা বাঁধা, ফর্সা শাড়ি ব্লাউজ-পরা, রূপকথার রাজকুমারীর মতো রূপসী, নব-যৌবনা বধূ সজনেতলার ঘাটে বসে ছাই দিয়ে নিটোল সুগৌর হাতে বাসন মাজছে, এ দৃশ্যটা খাপ খায় না। সকলের কাছেই এটা খাপছাড়া বলে মন হলো। প্রৌঢ়ারাও ভেবে দেখলে গত বিশ-ত্রিশ বছরের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটেনি এই ক্ষুদ্র ডোবার ইতিহাসে।
রায়পাড়ার একটি প্রৌঢ়া বললেন_আ-হা, বৌ তো নয়, যেন পিরতিমে_কিন্তু অত রূপ নিয়ে কি এই ডোবায় নামে বাসন মাজতে! না ও হাতে কখনোই ছাই দিয়ে বাসন মাজা অভ্যেস আছে! হাত দেখেই বুঝেছি।
তার পর থেকে দেখা গেল ঘর-সংসারের যা কিছু কাজ শ্রীপতির বৌ সব নিজের হাতে করছে।
ইতিমধ্যে শ্রীপতির কলকাতায় বদলি হবার খবর আসতে সে চলে গেল বাড়ি থেকে। পাড়ার মেয়েদের মধ্যে শান্তি ও কমলা শ্রীপতির বৌয়ের বড় ন্যাওটা হয়ে পড়ল। সকাল নেই বিকেল নেই, সব সময়েই দেখা যায় শান্তি ও কমলা বসে আছে ওখানে।
পাড়াগাঁয়ের গরিব ঘরের মেয়ে, অমন আদর করে কেউ কখনো রোজ রোজ ওদের লুচি-হালুয়া খেতে দেয়নি।
একদিন কমলা বলে_বৌদিদি, তোমার ঘরে কাপড়-মোড়া ওটা কী?
শ্রীপতির বৌ বলল, ওটা এসরাজ।
_বাজাতে জানো বৌদি?
_একটুখানি অমনি জানি ভাই, কিন্তু এ্যাদ্দিন ওকে বার পর্যন্ত করিনি। কেন জানো গাঁয়েঘরে কে কী হয়তো মনে করবে।
শান্তি বলল, নিজের বাড়ি বসে বাজাবে, কে কী মনে করবে? একটু বাজিয়ে শোনাও না, বৌদি!
একটু পরে রায়-গিনি্ন ঘাটে যাবার পথে শুনতে পেলেন বাড়ির মধ্যে কে বেহালা না কী বাজাচ্ছে, চমৎকার মিষ্টি। কোনো ভিখিরি গান গাচ্ছে বুঝি? দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ শুনে তিনি ঘাটে চলে গেলেন।
ঘাটে গিয়ে তিনি মজুমদার-বৌকে বললেন কথাটা।
ওই শ্রীপতির বাড়ি কে একজন বোষ্টম বেহালা বাজাচ্ছে শুনে এলাম। কী চমৎকার বাজাচ্ছে দিদি, দুদণ্ড দাঁড়িয়ে শুনতে ইচ্ছে করে।
দুপুরের মেয়ে-মজলিশে শান্তির মা বললেন_শ্রীপতির বৌ চমৎকার বাজাতে পারে, এসরাজ না কী বলে, এ রকম বেহালার মতো। শান্তিদের ওবেলা শুনিয়েছিল_
রায়-বৌ বললেন, ও! তাই ওবেলা নাইতে যাবার সময় শুনলাম বটে। সে যে ভারি চমৎকার বাজনা গো, আমি বলি বুঝি কোনো ফকির বোষ্টম ভিক্ষে করতে এসে বাজাচ্ছে।
এমন সময় শান্তি আসতেই তার মা বললেন, ওই জিজ্ঞেস কর না শান্তিকে।
শান্তি বলল, উঃ, সে আর তোমায় কী বলব খুড়িমা, বৌদিদি যা বাজাল, অমন কখনো শুনিনি_শুনবে তোমরা? তাহলে এখন বলি বাজাতে_বললেই বাজাবে।
শান্তি শ্রীপতিদের বাড়ি চলে যাবার অল্প পরেই শোনা গেল শ্রীপতির বৌয়ের এসরাজ বাজনা। অনেকক্ষণ কারো মুখে কথা রইল না।
চক্কত্তি-গিনি্ন বললেন, আহা, বড় চমৎকার বাজায় তো!
সকলেই স্বীকার করল শ্রীপতির বৌকে আগে যা ভাবা গিয়েছিল, সে-রকম নয়, বেশ মেয়েটি।
এসরাজ বাজনার মধ্য দিয়ে পাড়ার সকলের সঙ্গে শ্রীপতির বৌয়ের সহজভাবে আলাপ পরিচয় জমে উঠল। দুপুরে, সন্ধ্যায় প্রায়ই সবাই যায় শ্রীপতিদের বাড়ি বাজনা শুনতে।
তারপর গান শুনল সবাই একদিন। পূর্ণিমার রাত্রে জ্যোৎস্নাভরা ভেতর-বাড়ির রোয়াকে বসে বৌ এসরাজ বাজাচ্ছিল, পাড়ার সব মেয়েই এসে জুটেছে। শ্রীপতি বাড়ি নেই।
কমলা বলল, আজ বৌদি একটা গান গাইতেই হবে_তুমি গাইতেও জানো ঠিক_শোনাও আজকে।
বৌদি হেসে বলল, কে বলেছে ঠাকুরঝি আমি গাইতে জানি?
_না, ওসব রাখো_গাও একটা।
সকলেই অনুরোধ করল। বলল, গাও বৌমা, এ পাড়ায় মানুষ নেই, আস্তে আস্তে গাও, কেউ শুনবে না।
শ্রীপতির বৌ একখানা মীরার ভজন গাইল।
রাণাজি, ম্যায় গিরধর কে ঘর যাঁহু
গিরধর ম্হরা সাচো প্রিতম্ দেখত রূপ লুভাঁউ।
গায়িকার চোখে-মুখে কী ভক্তিপূর্ণ তন্ময়তার শোভা ফুটে উঠল গানখানা গাইতে গাইতে_শান্তি একটা গন্ধরাজ আর টগরের মালা গেঁথে এনেছিল বৌদিদিকে পরাবে বলে_গান গাইবার সময়ে সে আবার সেটা বৌয়ের গলায় আলগোছে পরিয়ে দিল_সেই জ্যোৎস্নায় সাদা সুগন্ধি ফুলের মালা গলায় রূপসী বৌয়ের মুখে ভজন শুনতে শুনতে মন্টুর মায়ের মনে হলো এই মেয়েটিই সেই মীরাবাই, অনেককাল পরে পৃথিবীতে আবার নেমে এসেছে, আবার সবাইকে ভক্তির গান গেয়ে শোনাচ্ছে।
মন্টুর মা একটু বাইরের খবর রাখতেন, যাত্রায় একবার মীরাবাই পালা দেখেছিলেন তার বাপের বাড়ির দেশে।
তারপর আর একখানা হিন্দিগান গাইল বৌ, এঁরা অবিশ্যি কিছু বুঝলেন না। তবে তন্ময় হয়ে শুনলেন বটে।
তারপর একখানা বেহাগ। বাংলা গান এবার। সকলে শুয়ে পড়ল। শান্তির চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। অনেকে দেখল বৌয়েরও চোখ দিয়ে জল পড়ছে গান গাইতে গাইতে_রূপসী গায়িকা একেবারে যেন বাহ্যজ্ঞান ভুলে গিয়েছে গানে তন্ময় হয়ে।
সেদিন থেকেই সকলে শ্রীপতির বৌকে অন্য চোখে দেখতে লাগল।
ওর সম্বন্ধে ক্রমে উচ্চ ধারণা করতে সকলে বাধ্য হলো আরো নানা ঘটনায়। পাড়াগাঁয়ে সকলেই বেশ হুঁশিয়ার, এ কথা আগেই বলেছি। ধার দিয়ে_সে যদি এক খুঁচি চাল কি দু পলা তেলও হয়_তার জন্যে দশবার তাগাদা করতে এদের বাধে না। কিন্তু দেখা গেল শ্রীপতির বৌ সম্পূর্ণ দিলদরিয়া মেজাজের মেয়ে। দেবার বেলায় সে কখনো না বলে কাউকে ফেরায় না, যদি জিনিসটা তার কাছে থাকে। একেবারে মুক্তহস্ত সে বিষয়ে_কিন্তু আদায় জানে না, তাগাদা করতে জানে না, মুখে তার রাগ নেই, বিরক্তি নেই, হাসিমুখ ছাড়া তার কেউ কখনো দেখেনি।
শ্রীপতির বৌয়ের আপন-পর জ্ঞান নেই, এটাও সবাই দেখল। পাশের বাড়িতে চক্কত্তি-গিনি্ন বিধবা, একাদশীর দিন দুপুরে তিনি নিজের ঘরে মাদুর পেতে শুয়ে আছেন, শ্রীপতির বৌ এক বাটি তেল নিয়ে এসে তাঁর পায়ে মালিশ করতে বসে গেল। যেন ও তাঁর নিজের ছেলের বৌ।
চক্কত্তি-গিনি্ন একটু অবাক হলেন প্রথমটা। পাড়াগাঁয়ে এ রকম কেউ করে না, নিজের ছেলের বৌয়েই করে না তো অপরের বৌ।
_এসো, এসো মা আমার এসো। থাক থাক, তেল মালিশ আবার কেন মা? তোমায় ওসব করতে হবে না, পাগলি মেয়ে_
এই পাগলি মেয়েটি কিন্তু শুনল না। সে জোর করেই বসে গেল তেল মালিশ করতে। মাথার চুল এসে অগোছালোভাবে উড়ে এসেছে মুখে, সুগৌর মুখে অতিরিক্ত গরমে ও শ্রমে কিছু কিছু ঘাম দেখা দিয়েছে_চক্কত্তি-গিনি্ন এই সুন্দরী বৌটির মুখ থেকে চোখ যেন অন্যদিকে ফেরাতে পারলেন না। বড় স্নেহ হলো এই আপন-পর জ্ঞানহারা মেয়েটার ওপর।
ইতিমধ্যে কমলার বিয়ে হয়ে গেল। শ্বশুরবাড়ি যাবার সময়ে সে শ্রীপতির বৌয়ের গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলল, বৌদিদি, তোমায় কী করে ছেড়ে থাকব, ভাই? মাকে ছেড়ে যেতে কত কষ্ট না হচ্ছে, তত হচ্ছে তোমায় ছেড়ে যেতে।...এই এক ব্যাপার থেকেই বোঝা যাবে শ্রীপতির বৌ এই অল্প কয়েক মাসের মধ্যে গ্রামের তরুণ মনের কী রকম প্রভাব বিস্তার করেছিল।
পূজার সময় এসে পড়েছে। আশ্বিনের প্রথম, শরতের নীল আকাশে অনেক দিন পরে সোনালি রোদের মেলা, বনশিমের ফুল ফুটেছে ঝোপে ঝোপে, নদীর চরে কাশফুলের শোভা। পাশের গ্রাম সত্রাজিৎপুরে বাঁড়ুজ্যে-বাড়ি পুজো হয় প্রতিবছর, এবারও শোনা যাচ্ছে মহানবমীর দিন তাদের বাড়ি আর বছরের মতো যাত্রা হবে কাঁচড়াপাড়ার দলের।
শ্রীপতির বৌ গান-পাগলা মেয়ে, এ কথাটা এত দিনে এ গাঁয়ের সবাই জেনেছে। তার দিন নেই, রাত নেই, গান লেগে আছে, দুপুরে রাত্রে রোজ এসরাজ বাজায়। গান সম্বন্ধে কথা সর্বদা তার মুখে। শান্তির এখনো বিয়ে হয়নি; যদিও সে কমলার বয়সী। সে শ্রীপতির বৌয়ের কাছে আজকাল দিনরাত লেগে থাকে গান শেখবার জন্যে।
একদিন শ্রীপতির বৌ তাকে বলল, ভাই শান্তি, এক কাজ করবি, সত্রাজিৎপুরে তো যাত্রা হবে বলে সবাই নেচেছে। আমাদের পাড়ার মেয়েরা তো আর দেখতে পাবে না? তারা কি আর অপর গাঁয়ে যাবে যাত্রা শুনতে? অথচ এরা কখনো কিছু শোনে না_আহা! এদের জন্যে যদি আমরা আমাদের পাড়াতেই থিয়েটার করি?
শান্তি তো অবাক। থিয়েটার? তাদের এই গাঁয়ে? থিয়েটার জিনিসটার নাম শুনেছে বটে সে, কিন্তু কখনো দেখেনি। বলল, কী করে করবে, বৌদি কী যে তুমি বলো। তুমি একটা পাগল।
শ্রীপতির বৌ হেসে বলল, সেসব বন্দোবস্ত আমি করব এখন। তোকে ভেবে মরতে হবে না_দ্যাখ না কী করি।
সপ্তাহখানেক পর শ্রীপতি যেমন শনিবারের দিন বাড়ি আসে তেমনি এলো। সঙ্গে তিনটি বড় মেয়ে ও দুটি ছোট মেয়ে ও চার-পাঁচটি ছেলে। বড় মেয়ে তিনটির ষোলো-সতেরো এমনি বয়স, সকলেই ভারি সুন্দরী, ছোট মেয়ে দুটির মধ্যে যেটির বয়স তেরো, সেটি তত সুবিধে নয়, কিন্তু যেটির বয়স আন্দাজ দশ_তাকে দেখে রক্তমাংসের জীব বলে মনে হয় না, মনে হয় যেন মোমের পুতুল। ছেলেদের বয়স পনেরোর বেশি নয় কারো। সকলেই সুবেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
শান্তি, শান্তির মা এবং চক্কত্তি-গিনি্ন তখন সেখানেই উপস্থিত ছিলেন। শ্রীপতির বৌ ওদের দেখে ছুটে গেল রোয়াক থেকে উঠোনে নেমে। উচ্ছ্বসিত আনন্দের সুরে বলল, এই যে রমা, পিন্টু, তারা, এই যে শিব, আয় আয় সব কেমন আছিস? ওঃ কত দিন দেখিনি তোদের_
রমা বলে ষোলো-সতেরো বছরের সুন্দরী মেয়েটি ওর গলা জড়িয়ে ধরল, সকলেই ওকে প্রণাম করে পায়ের ধুলো নিল।
_দিদি কেমন আছিস, ভাই_
_একটু রোগা হয়ে গেছিস দিদি_
_ওঃ, কত দিন যে তোকে দেখিনি_
_দাদাবাবু যখন বললেন তোর এখানে আসতে হবে, আমরা তো_
_আহিরীটোলাতে মিউজিক কম্পিটিশন ছিল_নাম দিয়েছিলাম_ছেড়ে চলে এলাম_
মেয়েগুলোর মুখ, রং, গড়ন শ্রীপতির বৌয়ের মতো। রমা তো একেবারে হুবহু ওর মতো দেখতে, কেবল যা কিছু বয়সের তফাত। জানা গেল মেয়ে দুটির মধ্যে রমা ও তার ছোট সতী, এবং ছেলেমেয়েদের মধ্যে বারো বছরের ফুটফুটে ছেলে শিবু শ্রীপতির বৌয়ের আপন ভাইবোন, বাকি সবই কেউ খুড়তুতো, কেউ জ্যাঠাতুতো ভাইবোন।
ক্রমে আরো জানা গেল শ্রীপতির বৌ এদের চিঠি লিখিয়ে আনিয়েছে থিয়েটার করানোর জন্যে।
পাড়ার সবাই এদের রূপ দেখে অবাক। এসব পাড়াগাঁয়ে অমন চেহারার ছেলেমেয়ে কেউ কল্পনাই করতে পারে না। দশ বছরের সেই ছেলেটির নাম পিন্টু, সে শান্তির বড় ন্যাওটা হয়ে গেল। সে আবার একটা সাঁতার দেবার নীল রঙের পোশাক এনেছে, সিক্ত নীল পোশাক সুগৌর দেহে যখন সে নদীর ঘাটে স্নান করে উঠে দাঁড়ায়_তখন ঘাটসুদ্ধ মেয়েরা, বোস-গিনি্ন, মন্টুর মা, শান্তির মা, মজুমদার-গিনি্ন ওর দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকেন। রূপ আছে বটে ছেলেটির! শান্তি দস্তুর মতো গর্ব অনুভব করে, যখন পিন্টু অনুযোগ করে বলে, আঃ শান্তিদি, আসুন না উঠে, ভিজে কাপড়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব? আসুন বাড়ি যাই।
পূজা এসে পড়ল। এ-গাঁয়ে কোনো উৎসব নেই পূজার, গরিবদের গাঁয়ে পূজা কে করবে? দূর থেকে সত্রাজিৎপুরের বাঁড়ুজ্যে-বাড়ির ঢাক শুনেই গাঁয়ের মেয়েরা সন্তুষ্ট হয়। ভিনগাঁয়ে গিয়ে মেয়েদের পূজা দেখবার রীতি না থাকায় অনেকে দশ-পনেরো কি বিশ বছর দুর্গাপ্রতিমা পর্যন্ত দেখেনি। মেয়েদের জীবনে কোনো উৎসব-আমোদ নেই এ গাঁয়ে।
শ্রীপতির বৌ তাই একদিন শান্তিকে বলেছিল, সত্যি কী করে যে তোরা থাকিস ঠাকুরঝি_একটু গান নেই, বাজনা নেই, বই পড়া নেই, মানুষ যে কেমন করে থাকে এমন করে।
বোধ হয় সেই জন্যেই এত উৎসাহের সঙ্গে ও লেগেছিল থিয়েটারের ব্যাপারে।
শ্রীপতিদের বাড়ির লম্বা বারান্দায় একধাপে তক্তপোশ পেতে দড়ি টাঙিয়ে হলদে শাড়ি ঝুলিয়ে স্টেজ করা হয়েছে।
শ্রীপতির বৌ ভাইবোনদের নিয়ে সকাল থেকে খাটছে।
শান্তি বলল, তুমি এত জানলে কী করে, বৌদি।
রমা বলল, তুমি জানো না দিদিকে শান্তিদিদি। দিদি অল বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশনে_
শ্রীপতির বৌ ধমক দিয়ে বোনকে থামিয়ে দিয়ে বলল, নে, নে_যা, অনেক কাজ বাকি, এখন তোর অত বক্তৃতা করতে হবে না দাঁড়িয়ে_
রমা না থেমে বলল, আর খুব ভালো পার্ট করার জন্যেও সোনার মেডেল পেয়েছে...।
যতবার পয়লা বোশেখের দিন আমাদের বাড়িতে থিয়েটার হয়, দিদিই তো তার পাণ্ডা_জানো আমাদের কি নাম দিয়েছেন জ্যাঠামশায়?
শ্রীপতির বৌ বলল, আবার?
রমা হেসে থেমে গেল।
মহাষ্টমীর দিন আজ। শুধু মেয়েদের আর ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে থিয়েটার দেখবে। শুধু মেয়েরাই_সমস্ত পাড়া কুড়িয়ে সব মেয়ে এসে জুটেছে থিয়েটার দেখতে।
ছোট্ট নাটকটি। শ্রীপতির বৌয়ের জ্যাঠামশায়ের নাকি লেখা। রাজকুমারকে ভালোবেসেছিল তাঁরই প্রাসাদের একজন পরিচারিকার মেয়ে। ছেলেবেলায় দুজনে খেলা করেছে। বড় হয়ে দিগ্বিজয়ে বেরুলেন রাজপুত্র, অন্য দেশের রাজকুমারী ভদ্রাকে বিবাহ করে ফিরলেন। পরিচারিকার মেয়ে অনুরাধা তখন নব-যৌবনা কিশোরী, বিকশিত মলি্লকা-পুষ্পের মতো শুভ্র, পবিত্র। খুব ভালো নাচতে-গাইতে শিখেছিল সে ইতিমধ্যে। রাজধানীর সবাই তাকে চেনে, জানে_নৃত্যের অমন রূপ দিতে কেউ পারে না। এদিকে ভদ্রাকে রাজ্যে এনে রাজকুমার এক উৎসব করলেন। সে সভায় অনুরাধাকে নাচতে-গাইতে হলো রাজপুত্রের সামনে ভাড়া করা নর্তকী হিসেবে। তার বুক ফেটে যাচ্ছে, অথচ সে একটা কথাও বলল না, নৃত্যের মধ্য দিয়ে সংগীতের মধ্য দিয়ে জীবনের ব্যর্থ প্রেমের বেদনা সে নিবেদন করল প্রিয়ের উদ্দেশে। এর পরে কাউকে কিছু না বলে দেশ ছেড়ে পরদিন একা একা কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।
শ্রীপতির বৌ অনুরাধা, রমা ভদ্রা। ওর অন্য সব ভাই-বোনও অভিনয় করল। শ্রীপতির বৌ বেশভূষায়, রূপে, গলে দোদুল্যমান জুঁইফুলের মালায় যেন প্রাচীন যুগের রূপকথার রাজকুমারী, রমাও তাই, গানে গানে অনুরাধা তো স্টেজ ভরিয়ে দিল, আর কী অপূর্ব নৃত্যভঙ্গি! সতী, রমা, পিন্টুও কি চমৎকার অভিনয় করল, আর কী চমৎকার মানিয়েছে ওদের!
তারপর বহুকাল পরে পথের ধারে মুমূর্ষু অনুরাধার সঙ্গে রাজপুত্রের দেখা। সে বড় মর্মস্পর্শী করুণ দৃশ্য! অনুরাধার গানের করুণ সুরপুঞ্জে ঘরের বাতাস ভরে গেল। চারদিকে শুধু শোনা যাচ্ছিল কান্নার শব্দ, শান্তি তো ফুলে ফুলে কেঁদে সারা।
অভিনয় শেষ হলো, তখন রাত প্রায় এগারোটা। গ্রামের মেয়েরা কেউ বাড়ি চলে গেল না। তারা শ্রীপতির বৌকে ও রমাকে অভিনয়ের পর আবার দেখতে চায়। শ্রীপতির বৌ ও তার ভাইবোনদের রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে চক্কত্তি-গিনি্ন, শান্তির মা ও মন্টুর মা খেতে বসিয়ে দিলেন আর ওদের চারিধার দিয়ে পাড়ার যত মেয়ে।
ও পাড়ার রাম গাঙ্গুলীর বৌ বললেন, বৌমা যে আমাদের এমন তা তো জানিনে! ওমা এমন জীবন তো কখনো দেখিনি_
মন্টুর মা বললেন, আর ভাইবোনগুলোও কি সব হিরের টুকরো! যেমন সব চেহারা তেমনি গান_
শান্তি তো তার বৌদিদির পিছু পিছু ঘুরছে, তার চোখ থেকে অভিনয়ের ঘোর এখনো কাটেনি, সেই জুঁইফুলের মালাটি বৌদির গলা থেকে সে এখনো খুলতে দেয়নি। ওর দিক থেকে অন্যদিকে সে চোখ ফেরাতে পারছে না যেন।
চক্কত্তি-গিনি্ন বললেন, আর কী গলা আমাদের বৌমার আর রমার। পিন্টু অতটুকু ছেলে, কী চমৎকার করল।...
শান্তির মা বললেন, পিন্টু খাচ্ছে না, দেখ সেজ বৌ। আর একটু দুধ দি, কটা মেখে নাও বাবা, চেঁচিয়ে তো খিদে পেয়ে গিয়েছে।...কী চমৎকার মানিয়েছিল পিন্টুকে, না সেজ বৌ?
_একে ফুটফুটে সুন্দর ছেলে...
শ্রীপতির বৌ হাজার হোক ছেলেমানুষ, সকলের প্রশংসায় সে এমন খুশি হয়ে উঠল যে খাওয়াই হলো না তার। সলজ্জ হেসে বলল, জ্যাঠামশায় আমাদের বলেন কিন্নর দল_এখন ঐ নামে আমাদের_
রমা হেসে ঘাড় দুলিয়ে বলল, নিজে যে বললে দিদি, আমি বলতে যাচ্ছিলুম, আমায় তবে ধমক দিলে কেন তখন?
তারা বলল, নামটি বেশ, কিন্নর দল, না? আমাদের শ্যামবাজারের পাড়ায় কিন্নর দল বলতে সবাই চেনে_
রমা বলল, কৃত্রিম গর্বের সঙ্গে_প্রায় এক ডাকে চেনে_হুঁ হুঁ_
তারপর এই রূপবান বালক-বালিকার দল, সকলে একযোগে হঠাৎ খিলখিল করে মিষ্টি হাসি হেসে উঠল।
সতী হাসতে হাসতে বললে_বেশ নামটি, কিন্নর দল, না?
এমন একদল সুশ্রী চেহারার ছেলেমেয়ে, তার ওপর তাদের এমন অভিনয় করার ক্ষমতা, এমন গানের গলা, এমন হাসি-খুশি মিষ্টি স্বভাব, সকলেরই মন হরণ করবে তার আশ্চর্য কী?
মন্টুর মা ভাবলেন, কিন্নর দলই বটে।...
ওদের খেতে খেতে হাসি গল্প করতে মহাষ্টমীর নিশি ভোর হয়ে এলো!
শ্রীপতির বৌ বলল, আসুন, বাকি রাতটুকু আর সব বাড়ি যাবেন কেন? গল্প করে কাটানো যাক।
শ্রীপতি বাড়ি নেই, সে সত্রাজিৎপুরের বাঁড়ুজ্যে-বাড়ির নিমন্ত্রণে গিয়েছে, আজ রাত্রের যাত্রা দেখে সকালে ফিরবে। সেই জন্যে সকলে বলল, তা ভালো, কিন্তু বৌমা তোমাকে গান গাইতে হবে!
শান্তি বলল, বৌদি, অনুরাধার সেই গানটা গেও আরেকবার, আহা, চোখে জল রাখা যায় না শুনলে।
শ্রীপতির বৌ গাইল, রমা এসরাজ বাজাল। তারপর রমা ও তারা একসঙ্গে গাইল। একটিমাত্র তেড়ো-পাখি বাঁশগাছের মগডালে কোথায় ডাক আরম্ভ করেছে। রাত ফরসা হলো।
সে মহাষ্টমীর রাত্রি থেকে গ্রামের সবাই জানল শ্রীপতির বৌ কী ধরনের মেয়ে।
কেবল তারা জানল না যে শ্রীপতির বৌ-প্রতিভাশালিনী গায়িকা, সত্যিকার আর্টিস্ট। সে ভালোবেসে শ্রীপতিকে বিয়ে করে এই পাড়াগাঁয়ের বনবাস মাথায় করে নিয়ে, নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছেড়েছে, যশের আশা, অর্থের আশা, আর্টের চর্চা পর্যন্ত ত্যাগ করেছে। তবু গানের ঝোঁক ওকে ছাড়ে না_ভূতে পাওয়ার মতো পেয়ে বসে_দিনরাত তাই ওর মুখে গান লেগেই আছে, তাই আজ মহাষ্টমীর দিন সেই নেশার টানেই এই অভিনয়ের আয়োজন করেছে।
শান্তি কিছুতেই ছাড়তে চায় না ওকে। বলে, তুমি কোথাও যেও না, বৌদিদি, আমি মরে যাব, এখানে তিষ্ঠুতে পারব না। শান্তি আজকাল শ্রীপতির বৌয়ের কাছে গান শেখে, গলা মন্দ নয় এবং এদিকে খানিকটা গুণ থাকায় সে এরই মধ্যে বেশ শিখে ফেলেছে। কিছু কিছু বাজাতেও শিখেছে। গান-বাজনায় আজকাল তার ভারি উৎসাহ। শ্রীপতির বৌ গান-বাজনা যদি পেয়েছে, আর বড় একটা কিছু চায় না, শান্তির সংগীত শিক্ষা নিয়েই সে সব সময় মহাব্যস্ত।
অগ্রহায়ণ মাসের দিকে বৌয়ের বাড়ি থেকে চিঠি এলো রমা কী অসুখ হয়ে হঠাৎ মারা গিয়েছে। শ্রীপতি কলকাতা থেকে সংবাদটা নিয়ে এলো। শ্রীপতির বৌ খুব কান্নাকাটি করল। পাড়াসুদ্ধ সবাই চোখের জল ফেলল ওকে সান্ত্বনা দিতে এসে।
শান্তি সব সময় বৌদির কাছে কাছে থাকে আজকাল। তাকে একদিন শ্রীপতির বৌ বলল, জানিস শান্তি, আমাদের কিন্নর দল ভাঙতে শুরু করেছে, রমাকে দিয়ে আরম্ভ হয়েছে, আমার মন যেন বলছে...
শান্তির বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল, ধমক দিয়ে বলল, থাক ওসব কী যে বলো বৌদি!
কিন্তু শ্রীপতির বৌয়ের কথাই খাটল।
সে ঠিকই বলেছিল, শান্তি ঠাকুরঝি, কিন্নর দলে ভাঙন ধরেছে।
রমার পরে ফাল্গুন মাসের দিকে গেল পিন্টু বসন্ত রোগে। তার আগেই শ্রীপতির বৌ মাঘ মাসে বাপের বাড়ি গিয়েছিল, শ্রাবণ মাসের প্রথমে প্রসব করতে গিয়ে সেও গেল।
এ সংবাদ গ্রামে যখন এলো, শান্তি তখন সেখানে ছিল না, সেই বোশেখ মাসে তার বিবাহ হওয়াতে সে তখন ছিল মোটরি বাণপুরে, ওর শ্বশুরবাড়িতে। গ্রামের অন্য সবাই শুনল, অনাত্মীয়ের মৃত্যুতে খাঁটি অকৃত্রিম শোক এ রকম এর আগে কখনো এ গাঁয়ে করতে দেখা যায়নি। রায়-গিনি্ন, চক্কতি-গিনি্ন, শান্তির মা, মন্টুর মা কেঁদে ভাসিয়ে দিলেন। ঐ মেয়েটি কোথা থেকে দুদিনের জন্যে এসে তার গানের সুরের প্রভাবে সকলের অকরুণ, কুটিলভাবে পরিবর্তন এনে দিয়েছিল, সে পরিবর্তন যে কতখানি, ওই সময়ে গাঁয়ের মেয়েদের দেখলে বোঝা যেত। ওদের চক্কত্তি-বাড়ির দুপুরবেলায় আড্ডায়, স্নানের ঘাটে শ্রীপতির বৌয়ের কথা ছাড়া অন্য কথা ছিল না।
চক্কত্তি-গিনি্ন পেয়েছিলেন সকলের চেয়ে বেশি। শ্রীপতির বৌয়ের কথা উঠলেই তিনি চোখের জল সামলাতে পারতেন না। বলতেন, দুদিনের জন্যে এসে মা আমায় কী মায়াই দেখিয়ে গেল! আমার পেটের মেয়ে অমন কক্ষনো করেনি...আহা! আমার পোড়া কপাল, সে কখনো এ কপালে টেকে!
মন্টুর মামা বলতেন, সে কি আর মানুষ! দেবী অংশে ওসব মেয়ে জন্মায়। নিজের মুখেই বলত হেসে হেসে, 'আমরা কিন্নর দল খুড়িমা', শাপভ্রষ্ট কিন্নরীই তো ছিল।...যেমন রূপ, তেমনি স্বভাব, তেমনি গান...ও কি আর মানুষ, মা!
কথা বলতে বলতে মন্টুর মায়ের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ত।
এসবের মধ্যে কেবল কথা বলত না শান্তি। তার বিবাহিত জীবন খুব সুখের হয়নি, ভেবেছিল বাপের বাড়ি এসে বৌদিদির সঙ্গে অনেকখানি জ্বালা জুড়োবে। পূজার পরে কার্তিক মাসের প্রথমে বাপের বাড়ি এসে সব শুনেছিল। বৌদিদি যে তার জীবন থেকে কতখানি হরণ করে নিয়ে গিয়েছে, তা এরা কেউ জানে না। মুখে সেসব পাঁচজনের সামনে ভ্যাজ ভ্যাজ করে বলে লাভ কী? কী বুঝবে লোকে?
বছর দুই পরে একদিনের কথা। গাঁয়ের মধ্যে শ্রীপতির বৌয়ের কথা অনেকটা চাপা পড়ে গিয়েছে। শ্রীপতিও অনেকদিন পরে আবার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া-আসা করছে শনিবারে কিংবা ছুটিছাঁটাতে।
শ্রীপতিদের বাড়ি থেকে শান্তিদের বাড়ি বেশি দূর নয়, দুখানা বাড়ির পরেই। শান্তি তখন এখানেই ছিল। অনেক রাত্রে সে শুনল শ্রীপতিদাদাদের বাড়িতে কে গান গাইছে। ঘুমের মধ্যে গানের সুর কানে যেতেই সে ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল_
বিরহিণী মীরা জাগে তব অনুরাগে, গিরিধর নাগর_
এ কার গলা? ওর গা শিউরে উঠল। ঘুমের ঘোর এক মুহূর্তে ছুটে গেল। কখনো সে ভুলবে জীবনে এ গান, এ গলা? সেই প্রথম পরিচয়ের দিনে ওদের রোয়াকে জ্যোৎস্না রাত্রে বসে এই গানখানা বৌদি প্রথম গেয়েছিল! সেই অপূর্ব করুণ সুর, গানের প্রতি মোচড়ে যেন একটি আকাঙ্ক্ষার প্রাণঢালা আত্মনিবেদন! এ কি আর কারো গলার_ওর কুমারী জীবনের আনন্দভরা দিনগুলোর কত অবসর প্রহর যে এ কণ্ঠের সুরে মধুময়!
ও পাগলের মতো ছুটে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল।
রাত অনেক। কৃষ্ণাতৃতীয়ার চাঁদ মাথার ওপর পেঁৗছেছে। ফুটফুটে শরতের জ্যোৎস্নায় বাঁশবনের তলা পর্যন্ত আলো হয়ে উঠেছে।
ঠিক যেন তিন বছর আগেকার সেই মহাষ্টমীর রাত্রির মতো।
শান্তির মা ইতিমধ্যে জেগে উঠে বললেন, ও কে গান করছে রে শান্তি? তারপর তিনিও তাড়াতাড়ি বাইরে এলেন। শ্রীপতিদের বাড়ি তো কেউ থাকে না, গান গাইবে কে? ওদিকে মন্টুর মা, মণি, বাদল সবাই জেগেছে দেখা গেল।
প্রথমেই এরা সবাই ভয়ে বিস্ময়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। পরে ব্যাপারটা বোঝা গেল। শ্রীপতি কখন রাতের ট্রেনে বাড়ি এসেছিল, কেউ লক্ষ করেনি। সে কলের গান বাজাচ্ছে। ওদের সাড়া পেয়ে সে বাইরে এসে বলল, আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে আজ চেয়ে আনলুম ওর গানখানা। মরবার কমাস আগে রেকর্ডে গেয়েছিল।
সবাই খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। শান্তি প্রথমে সে নীরবতা ভঙ্গ করে আস্তে আস্তে বলল, ছিরুদা, রেকর্ডখানা আর একবার দেবে?
পরক্ষণেই একটি অতি সুপরিচিত, পরম প্রিয়, সুললিত কণ্ঠের দরদ-ভরা সুরপুঞ্জে পাড়ার আকাশ-বাতাস, স্তব্ধ জ্যোৎস্না রাত্রিটা ছেয়ে গেল। মানুষের মনের কী ভুলই যে হয়! অল্পক্ষণের জন্যে শান্তির মনে হলো তার কুমারী জীবনের সুখের দিনগুলো আবার ফিরে এসেছে, যেন বৌদিদি মরেনি, কিন্নরের দল ভেঙে যায়নি, সব বজায় আছে। এই তো সামনে আসছে পূজা, আবার মহাষ্টমীতে তাদের থিয়েটার হবে, বৌদিদি গান গাইবে। গান থামিয়ে ওর দিকে চেয়ে হাসি হাসি মুখে বলবে, কেমন শান্তি ঠাকুরঝি, কেমন লাগল!
আগেই বলেছি, সকলের অবস্থা খারাপ এবং খানিকটা তার দরুন, খানিকটা অন্য কারণে সকলের চেহারা খারাপ। কিশোরী মেয়েদেরও তেমন লালিত্য নেই মুখে, ছোট ছোট ছেলেরা এমন অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন থাকে এবং এমন পাকা পাকা কথা বলে যে, তাদের আর শিশু বা বালক বলে মনে হয় না। কাব্যে বা উপন্যাসে যে শৈশবকালের কতই প্রশস্তি পাঠ করা যায়, মনে হয় সে সব এদের জন্য নয়, এরা মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে একেবারে প্রবীণত্বে পা দিয়েছে।
পাড়ায় একঘর গৃহস্থ আছে, তারা এখানে থাকে না, তাদের কোঠাবাড়িটা চাবি দেওয়া পড়ে আছে আজ দশ-বারো বছর। এদের মস্তবড় সংসার ছিল, এখন প্রায় সবাই মরে হেজে গিয়ে প্রায় পাঁচটি প্রাণীতে দাঁড়িয়েছে। বাড়ির বড় ছেলে পশ্চিমে চাকরি করে, মেজ ছেলে কলেজে পড়ে কলকাতায়, ছোট ছেলেটি জন্মাবধি কালা ও বোবা_পিসিমার কাছে থেকে মূকবধির বিদ্যালয়ে পড়ে। বড় ছেলে বিবাহ করেনি, যদিও তার বয়স ত্রিশ-বত্রিশ হয়েছে। সে নাকি বিবাহের বিরোধী, শোনা যাচ্ছে যে এমনিভাবেই জীবন কাটাবে।
পাড়ার মধ্যে এরাই শিক্ষিত ও সচ্ছল অবস্থার মানুষ। সেজন্য এদের কেউ ভালো চোখে দেখে না, মনে মনে সকলেই এদের হিংসে করে এবং বড় ছেলে যে বিয়ে করবে না বলছে, সে সংবাদে পাড়ার সবাই পরম সন্তুষ্ট। যখন সবাই ছোট ও গরিব, তখন একঘর লোক কেন এত বাড় বাড়বে? বড় ছেলে বিয়ে করলেই ছেলেমেয়ে হয়ে জাজ্বল্যমান সংসার হবে দুদিন পরে, সে কেউ সহ্য করতে পারবে না। মেজ ছেলে মোটে কলেজে পড়ছে, এখন সাপ হয় কী ব্যাঙ হয় তার কিছু ঠিক নেই, তার বিষয়ে দুশ্চিন্তার এখনো কারণ ঘটেনি, তবে বয়েসও বেশি নয়।
মজুমদার-বাড়িতে ভাঙা রোয়াকে দুপুরে পাড়ার মেয়েদের মেয়ে-গজালি হয়। তাতে রায়-গিনি্ন, মুখুজ্যে-গিনি্ন, চক্কত্তি-গিনি্ন প্রভৃতি তো থাকেনই, অল্প-বয়সী বৌয়েরা ও মেয়েরাও থাকে। সাধারণত যেসব ধরনের চর্চা এ মজলিসে হয়ে থাকে, তা শুনলে নারীজাতি সম্বন্ধে লিখিত নানা সরল প্রশংসাপূর্ণ বর্ণনার সত্যতার সম্বন্ধে ঘোর সন্দেহ যাঁর উপস্থিত না হবে, তিনি নিঃসন্দেহে একজন খুব বড় ধরনের অপটিমিস্ট।
আজ দুপুরে যে বৈঠক বসেছে, তাতে আলোচিত বিষয়গুলো থেকে মোটামুটি প্রতিদিনের আলোচনা ও বিতর্কের প্রকৃতি অনুমান করা যেতে পারে।
বোস-গিনি্ন বলছিলেন_আরে বাপু দিচ্ছি তো রোজই, আমার গাছের কাঁটাল খেয়েই তো মানুষ, আমাদের যখন কাঁটাল পাড়ানো হয়, ছেলেমেয়েগুলো হ্যাংলার মতো তলায় দাঁড়িয়ে থাকে_ঘেয়ো কী ভুয়ো এক-আধখানা যদি থাকে তো বলি, যা নিয়ে যা। তোদের নেই, যা খেগে যা। তা কি পোড়ার মুখে কোনো দিন সুবাক্যি আছে? ওমা, আজ আমার মেয়ে দুটো নেবু তুলতে গিয়েছে ডোবার ধারের গাছে, তা বলে কি না রোজ নেবু তুলতে আসে, যেন সরকারি গাছ পড়ে রয়েছে আরকি_চবি্বশ ঝুড়ি কথা শুনিয়ে দিলে মন্টুর মা। আচ্ছা বলো তো তোমরাই_
মন্টুর মা_যাঁকে উদ্দেশ করে এ কথা বলা হচ্ছিল, তিনি এঁদের মজলিসে কেবল আজই অনুপস্থিত আছেন নইলে রোজই এসে থাকেন। তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে সবাই তাঁর চালচলন, ধরন-ধারণ, রীতি-নীতির নানারূপ সমালোচনা করল।
প্রিয় মুখুজ্যের মেয়ে শান্তি_ষোল-সতেরো বছরের কুমারী_তার মায়ের বয়সী মন্টুর মায়ের সম্বন্ধে অমনি বলে বসল_ওঃ, সে কথা আর বোলো না খুড়িমা, কী ব্যাপক মেয়েমানুষ ওই মন্টুর মা। ঢের ঢের মেয়েমানুষ দেখিচি, অমন লঙ্কাপোড়া ব্যাপক যদি কোথাও দেখে থাকি, ক্ষুরে নমস্কার, বাবা বাবা!
ছোট মেয়ের ওই জ্যাঠামি কথার জন্য তাকে কেউ বকলে না বা শাসন করলে না, বরং কথাটা সকলেই উপভোগ করলে।
তারপর কথাটার স্রোত আরো কত দূর গড়াত বলা যায় না, এমন সময় রায়-বাড়ির বড়বৌ হঠাৎ মনে-পড়ার ভঙ্গিতে বললেন_হাঁ, একটা মজার কথা শোনোনি বুঝি। শ্রীপতি যে বিয়ে করেছে, বটঠাকুরের কাছে চিঠি এসেচে, শ্রীপতির মামা লিখেচে।
সকলে সমস্বরে বলে উঠল_শ্রীপতি বিয়ে করেচে!
তারপর সকলেই একসঙ্গে নানারূপ প্রশ্ন করতে লাগল :
_কোথায়, কোথায়?
_কবে চিঠি এলো?
_তবে যে শুনলাম শ্রীপতি বিয়ে করবে না বলেচে।
শ্রীপতির বিয়ের খবরে অনেকেই যেন একটু দমে গেল। খবরটা তেমন শুভ নয়। কারো উন্নতির সংবাদ এদের পক্ষে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করা অসম্ভব। তাদের যখন উন্নতি হলো না, তখন অপরের উন্নতি হবে কেন? কিন্তু এরপরেই যখন রায়-বৌ মুখ টিপে হেসে আস্তে আস্তে বললেন_বৌটি নাকি বামুনের মেয়ে নয়_তখন সকলে খাড়া হয়ে সটান উঠে বসল, তাদের মরা-মরা ভাবটা এক মুহূর্তে গেল কেটে। একটা বেশ সরস ও মুখরোচক পরনিন্দা আর ঘোঁটের আভাস ওরা পেলে, রায়-বৌয়ের চাপা ঠোঁটের হাসি থেকে।
শান্তি উৎসুক চোখে চেয়ে হাসিমুখে বললে_ভেতরে তাহলে অনেকখানি কথা আছে!
বোস-গিনি্ন বললেন_তাই বল! নইলে এমনি কোথাও কিছু নয় শ্রীপতি বিয়ে করলে, এ কি কখনো হয়। কি জাত মেয়েটার? হিঁদুু তো?
অর্থাৎ তাহলে রগড়টা আরো জমে। রায়বৌ বললেন_হিঁদুই, মেয়েটা বদ্দি বামুন।
এদেশে বৈদ্যকে বলে থাকে 'বদ্দি বামুন'_এ অঞ্চলের ত্রিসীমানায় বৈদ্যের বাস না থাকায় বৈদ্যজাতির সমাজতত্ত্ব সম্বন্ধে এদের ধারণা অত্যন্ত অস্পষ্ট। কারো বিশ্বাস ব্রাহ্মণের পরেই বৈদ্যের সামাজিক স্থান, তারা একপ্রকারের নিম্নবর্ণের ব্রাহ্মণ, তার চেয়ে নিচু নয়_আবার কারো বিশ্বাস তাদের স্থান সমাজের নিম্নতর ধাপের দিকে।
শান্তি বললে_বৌয়ের বয়েস কত?
ওঃ, তা অনেক। শুনচি চবি্বশ-পঁচিশ_
সকলে সমস্বরে আবার একটা বিস্ময়ের রোল তুললে। চবি্বশ-পঁচিশ বছর পর্যন্ত মেয়ে আইবুড়ো থাকে ঘরে! এ আবার কোথাকার ছোট জাত, রামোঃ। ছিঃ_
শান্তির মা বললেন_তাহলে মেয়ে আর নয়, মাগী বল! পাঁড় শসা_বাপ-মা বুঝি ঘরে বীজ রেখেছিল!
কে একজন মুখ টিপে হেসে বললেন_বিধবা না তো?
চক্কত্তি-গিনি্ন বললেন_আগের পক্ষের ছেলেমেয়ে কিছু আছে নাকি মাগীর!
এ কথায় শান্তিই আগে মুখে আঁচল দিয়ে খিল্খিল্ করে হেসে উঠল_তারপরে বাকি সকলে তার সঙ্গে যোগ দিলে। হ্যাঁ, এটা একটা নতুন ও ভারি মজার খবর বটে, মেয়ে-গজালির কিছুদিনের মতো খোরাক সংগ্রহ হলো। আমচুরি কাঁটালচুরির গল্প একটু একঘেঁয়ে হয়ে পড়েছিল।
ঠিক পরের দিনই এক অপ্রত্যাশিত ব্যাপার ঘটল। শ্রীপতির মেজ ভাই উমাপতি গাঁয়ে এসে বাড়ির চাবি খুলে লোক লাগিয়ে ঘরদোর পরিষ্কার করতে লাগল। তার দাদা বৌদিদিকে নিয়ে শীগ্গির আসবে এবং কিছুদিন নাকি গাঁয়েই বাস করবে। বৌদিদি পাড়াগাঁ কখনো দেখেননি,_গ্রামে আসবার তাঁর খুব আগ্রহ। তার দাদাও কলকাতায় বদলি হবার চেষ্টা করছে।
মেয়ে মজলিসে সবাই তো অবাক। শ্রীপতি কোন্ মুখে অজাতের বউ নিয়ে গাঁয়ে এসে উঠবে। মানুষের একটা লজ্জা-শরমও তো থাকে, করেই ফেলেছিস না হয় একটা অকাজ। এসব কি খিরিস্টানি কাণ্ডকারখানা, কালে কালে হলো কী! আর সে ধিঙ্গি মাগীটারই বা কী ভরসা, ব্রাহ্মণদের মধ্যে ব্রাহ্মণপাড়ায় বিয়ের বউ সেজে সে কোন সাহসে আসবে।
শ্রীপতি অবিশ্যি বৌ নিয়ে পৈতৃক বাড়িতে আসার বিষয়ে এঁদের মত জিজ্ঞাসা করেনি। একদিন একখানা নৌকো এসে গ্রামের ঘাটে দুপুরের সময় লাগল এবং নৌকো থেকে নামল শ্রীপতি, তার নববিবাহিত বধূ, একটা ছোক্রা চাকর ও দুটি ট্রাঙ্ক ও একটা বড় বিছানার মোট, একটা ঝুড়ি-বোঝাই টুকিটাকি জিনিস। ঘাটে দু-একজন যারা অত বেলায় স্নান করছিল, তারা তখুনি পাড়ার মধ্যে গিয়ে খবরটা সবাইকে বললে। তখন কিন্তু কেউ এলো না, অত বেলায় এখন শ্রীপতিদের বাড়ি গেলে তাদের খেতে বলতে হয়। অসময়ে এখন এসে তারা রান্নাবান্না চড়িয়ে খাবে, সেটা প্রতিবেশী হয়ে হতে দেওয়া কর্তব্য নয়, সুতরাং সে ঝঞ্ঝাট ঘাড়ে করবার চেয়ে এখন না যাওয়াই বুদ্ধির কাজ।
কিন্তু রাসু চক্কতি আর প্রিয় মুখুজ্যের বাড়ির মেয়েরা অত সহজেই রেহাই পেলেন না। শ্রীপতি নিজে গিয়ে একেবারে অন্তঃপুরের মধ্যে ঢুকে বললে_ও পিসিমা, ও বৌদিদি, আপনারা আপনাদের বৌকে হাতে ধরে ঘরে না তুললে কে আর তুলবে? আসুন সবাই। বাধ্য হয়ে কাছাকাছির দু-তিন বাড়ির মেয়েরা শাঁক হাতে, জলের ঘটি হাতে নতুন বৌকে ঘরে তুলতে এলেন_খানিকটা চক্ষুলজ্জায়, খানিকটা কৌতূহলে। মজা দেখবার প্রবৃত্তি সকলের মধ্যেই আছে। ছোটবড় ছেলেমেয়েও এলো অনেকে, শান্তি এলো, কমলা এলো, সারদা এলো।
শ্রীপতিদের বাড়ির উঠোনে লিচুতলায় একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, দূর থেকে মেয়েটির ধপ্ধপে ফর্সা গায়ের রং ও পরনের দামি সিল্কের শাড়ি দেখে সকলে অবাক হয়ে গেল। সামনে এসে আরো বিস্মিত হবার কারণ ওদের ঘটল_মেয়েটির অনিন্দ্যসুন্দর মুখশ্রী দেখে। কী ডাগর ডাগর চোখ! কী সুকুমার লাবণ্য সারা অঙ্গে। সর্বোপরি মুখশ্রী_অমন ধরনের সুন্দর মুখ এসব পাড়াগাঁয়ে কেউ কখনো দেখেনি।
সকলে আশা করেছিল গিয়ে দেখবে কালো কালো একটা মোটা-মতো মাগী আধ-ঘোমটা দিয়ে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্যাট্ প্যাট্ করে চেয়ে রয়েছে ওদের দিকে। কিন্তু তার পরিবর্তে দেখল, এক নম্রমুখী সুন্দরী তরুণী মূর্তি...। মুখখানি এত সুকুমার যে, মনে হয় ষোল-সতেরো বছরের বালিকা।
বিকেলে ওপাড়ার নিতাই মুখুজ্যের বৌ ঘাটের পথে চক্কত্তি-গিনি্নকে জিজ্ঞেস করলেন_কী দিদি, শ্রীপতির বৌ দেখলে নাকি? কেমন দেখতে?
চক্কত্তি-গিনি্ন বললেন_না, দেখতে বেশ ভালোই_
চক্কত্তি-গিনি্নর সঙ্গে শান্তি ছিল, সে হাজার হোক ছেলেমানুষ, ভালো লাগলে পরের প্রশংসার বেলায় সে এখনো কার্পণ্য করতে শেখেনি, সে উচ্ছ্বসিত সুরে বলে উঠলে_চমৎকার, খুড়িমা, একবার গিয়ে দেখে আসবেন, সত্যিই অদ্ভুত ধরনের ভালো।
নিতাই মুখুজ্যের বৌ পরের এতখানি প্রশংসা শুনতে অভ্যস্ত ছিলেন না_বুঝতে পারলেন না শান্তি কথাটা ব্যঙ্গের সুরে বলছে, না সত্যিই বলছে। বললেন_কী রকম ভালো?
এবার চক্কত্তি-গিনি্ন নিজেই বললেন_না, বৌ যা ভেবেছিলাম তা নয়। বৌটি সত্যিই দেখতে ভালো। আর কেনই বা হবে না বলো শহরের মেয়ে, দিনরাত সাবান ঘষছে, পাউডার ঘষছে, তোমার-আমার মতো রাঁধতে হতো, বাসন মাজতে হতো, তো দেখতাম চেহারার কত জলুস বজায় রাখে।
এই বয়সে তো দূরের কথা, তাঁর বিগত যৌবন দিনেও অজস্র পাউডার সাবান ঘষলেও যে কখনো তিনি শ্রীপতির বৌয়ের পায়ের নখের কাছে দাঁড়াতে পারতেন না_চক্কত্তি-গিনি্নর সম্বন্ধে শান্তির একথা মনে হলো। কিন্তু চুপ করে রইল সে।
বিকেলে এ-পাড়ার ও-পাড়ার মেয়েরা দলে দলে বৌ দেখতে এলো। অনেকেই বললে, এমন রূপসী মেয়ে তারা কখনো দেখেনি। কেবল হরিচরণ রায়ের স্ত্রী বললেন_আর বছর তারকেশ্বরে যাবার সময় ব্যান্ডেল স্টেশনে তিনি একটি বৌ দেখেছিলেন, সেটি এর চেয়েও রূপসী।
মেয়ে-মজলিসে পরদিন আলোচনার একমাত্র বিষয় দাঁড়াল শ্রীপতির বউ। দেখা গেল তার রূপ সম্বন্ধে দু-মত নেই সভ্যদের মধ্যে, কিন্তু তার চরিত্র সম্বন্ধে নানারকম মন্তব্য অবাধে চলেছে।
_ধরন-ধারণ যেন কেমন-কেমন_অত সাজগোজ কেন রে বাপু?
_ভালো ঘরের মেয়ে নয়। দেখলেই বোঝা যায়_
_বাসন মাজতে হলে ও-হাত আর বেশিদিন অত সাদাও থাকবে না, নরমও থাকবে না।
_ঠ্যালা বুঝবেন পাড়াগাঁয়ের। গলায় নেক্লেস ঝুলুতে আমরাও জানি_
_বেশ একটু ঠ্যাকারে। পাড়াগাঁয়ে মাটিতে যেন গুমরে পা পড়ছে না, এমনি ভাব। বামুনের ঘরে বিয়ে হয়ে ভাবছে যেন কী_
_তা তো হবেই, বদ্দি বামুনের মেয়ে, বামুনের ঘরে এসেছে, ওর সাত-পুরুষের সৌভাগ্যি না?
নববধূর স্বপক্ষে বললে কেবল শান্তি ও কমলা। শান্তি ঝাঁজের সঙ্গে বললে_তোমরা কারো ভালো দেখতে পার না বাপু! কেন ওসব বলবে একজন ভদ্দর ঘরের মেয়ের সম্বন্ধে? কাল বিকেলে আমি গিয়ে কতক্ষণ ছিলাম নতুন বৌয়ের কাছে। কোনো ঠ্যাকার নেই, অহংকার নেই, চমৎকার মেয়ে!
কমলা বললে_আমাদের উঠতে দেয় না কিছুতেই_কত গল্প করলে, খাবার খেতে দিলে, চা করলে_আর, খুব সাজগোজ কি করে? সাদাসিধে শাড়ি সেমিজ পরে তো ছিল। তবু খুব ফর্সা কাপড়চোপড়_ময়লা একেবারে দুচোখে দেখতে পারে না_
শান্তি বললে_ঘরগুলো এরই মধ্যে কী চমৎকার সাজিয়েছে! আয়না, পিক্চার, দোপাটি ফুলের তোড়া বেঁধে ফুলদানিতে রেখে দিয়েছে_শ্রীপতিদার বাপের জন্মে কখনো অমন সাজানো ঘরদোরে বাস করেনি_ভারি ফিটফাট গোছালো বৌটি_
দিন দুই পরে ডোবার ঘাটে নববধূকে একরাশ বাসন নিয়ে নামতে দেখে সকলে অবাক হয়ে গেল। চারদিকে বনে ঘেরা ঝুপসি আধ-অন্ধকার ডোবাটা যেন মেয়েটির স্নিগ্ধ রূপের প্রভায় এক মুহূর্তে আলো হয়ে উঠল, একথা যারা তখন ডোবার অন্যান্য ঘাটে ছিল, সবাই মনে মনে স্বীকার করলে। দৃশ্যটাও যেন অভিনব ঠেকলে সকলের কাছে, এমন একটা পচা এঁদো জঙ্গলে ভরা পাড়াগেঁয়ে ডোবার ঘাটে সাধারণত কালো কালো, আধ-ময়লা শাড়িপরা শ্রীহীনা ঝি-বৌ বা ত্রিকালোত্তীর্ণ প্রৌঢ়া বিধবাদের গামছা-পরিহিতা মূর্তিই দেখা যায়, বা দেখার আশা করা যায়_সেখানে এমন একটি আধুনিক ছাঁদে খোঁপা বাঁধা, ফর্সা শাড়ি ব্লাউজ-পরা, রূপকথার রাজকুমারীর মতো রূপসী, নব-যৌবনা বধূ সজনেতলার ঘাটে বসে ছাই দিয়ে নিটোল সুগৌর হাতে বাসন মাজছে, এ দৃশ্যটা খাপ খায় না। সকলের কাছেই এটা খাপছাড়া বলে মন হলো। প্রৌঢ়ারাও ভেবে দেখলে গত বিশ-ত্রিশ বছরের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটেনি এই ক্ষুদ্র ডোবার ইতিহাসে।
রায়পাড়ার একটি প্রৌঢ়া বললেন_আ-হা, বৌ তো নয়, যেন পিরতিমে_কিন্তু অত রূপ নিয়ে কি এই ডোবায় নামে বাসন মাজতে! না ও হাতে কখনোই ছাই দিয়ে বাসন মাজা অভ্যেস আছে! হাত দেখেই বুঝেছি।
তার পর থেকে দেখা গেল ঘর-সংসারের যা কিছু কাজ শ্রীপতির বৌ সব নিজের হাতে করছে।
ইতিমধ্যে শ্রীপতির কলকাতায় বদলি হবার খবর আসতে সে চলে গেল বাড়ি থেকে। পাড়ার মেয়েদের মধ্যে শান্তি ও কমলা শ্রীপতির বৌয়ের বড় ন্যাওটা হয়ে পড়ল। সকাল নেই বিকেল নেই, সব সময়েই দেখা যায় শান্তি ও কমলা বসে আছে ওখানে।
পাড়াগাঁয়ের গরিব ঘরের মেয়ে, অমন আদর করে কেউ কখনো রোজ রোজ ওদের লুচি-হালুয়া খেতে দেয়নি।
একদিন কমলা বলে_বৌদিদি, তোমার ঘরে কাপড়-মোড়া ওটা কী?
শ্রীপতির বৌ বলল, ওটা এসরাজ।
_বাজাতে জানো বৌদি?
_একটুখানি অমনি জানি ভাই, কিন্তু এ্যাদ্দিন ওকে বার পর্যন্ত করিনি। কেন জানো গাঁয়েঘরে কে কী হয়তো মনে করবে।
শান্তি বলল, নিজের বাড়ি বসে বাজাবে, কে কী মনে করবে? একটু বাজিয়ে শোনাও না, বৌদি!
একটু পরে রায়-গিনি্ন ঘাটে যাবার পথে শুনতে পেলেন বাড়ির মধ্যে কে বেহালা না কী বাজাচ্ছে, চমৎকার মিষ্টি। কোনো ভিখিরি গান গাচ্ছে বুঝি? দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ শুনে তিনি ঘাটে চলে গেলেন।
ঘাটে গিয়ে তিনি মজুমদার-বৌকে বললেন কথাটা।
ওই শ্রীপতির বাড়ি কে একজন বোষ্টম বেহালা বাজাচ্ছে শুনে এলাম। কী চমৎকার বাজাচ্ছে দিদি, দুদণ্ড দাঁড়িয়ে শুনতে ইচ্ছে করে।
দুপুরের মেয়ে-মজলিশে শান্তির মা বললেন_শ্রীপতির বৌ চমৎকার বাজাতে পারে, এসরাজ না কী বলে, এ রকম বেহালার মতো। শান্তিদের ওবেলা শুনিয়েছিল_
রায়-বৌ বললেন, ও! তাই ওবেলা নাইতে যাবার সময় শুনলাম বটে। সে যে ভারি চমৎকার বাজনা গো, আমি বলি বুঝি কোনো ফকির বোষ্টম ভিক্ষে করতে এসে বাজাচ্ছে।
এমন সময় শান্তি আসতেই তার মা বললেন, ওই জিজ্ঞেস কর না শান্তিকে।
শান্তি বলল, উঃ, সে আর তোমায় কী বলব খুড়িমা, বৌদিদি যা বাজাল, অমন কখনো শুনিনি_শুনবে তোমরা? তাহলে এখন বলি বাজাতে_বললেই বাজাবে।
শান্তি শ্রীপতিদের বাড়ি চলে যাবার অল্প পরেই শোনা গেল শ্রীপতির বৌয়ের এসরাজ বাজনা। অনেকক্ষণ কারো মুখে কথা রইল না।
চক্কত্তি-গিনি্ন বললেন, আহা, বড় চমৎকার বাজায় তো!
সকলেই স্বীকার করল শ্রীপতির বৌকে আগে যা ভাবা গিয়েছিল, সে-রকম নয়, বেশ মেয়েটি।
এসরাজ বাজনার মধ্য দিয়ে পাড়ার সকলের সঙ্গে শ্রীপতির বৌয়ের সহজভাবে আলাপ পরিচয় জমে উঠল। দুপুরে, সন্ধ্যায় প্রায়ই সবাই যায় শ্রীপতিদের বাড়ি বাজনা শুনতে।
তারপর গান শুনল সবাই একদিন। পূর্ণিমার রাত্রে জ্যোৎস্নাভরা ভেতর-বাড়ির রোয়াকে বসে বৌ এসরাজ বাজাচ্ছিল, পাড়ার সব মেয়েই এসে জুটেছে। শ্রীপতি বাড়ি নেই।
কমলা বলল, আজ বৌদি একটা গান গাইতেই হবে_তুমি গাইতেও জানো ঠিক_শোনাও আজকে।
বৌদি হেসে বলল, কে বলেছে ঠাকুরঝি আমি গাইতে জানি?
_না, ওসব রাখো_গাও একটা।
সকলেই অনুরোধ করল। বলল, গাও বৌমা, এ পাড়ায় মানুষ নেই, আস্তে আস্তে গাও, কেউ শুনবে না।
শ্রীপতির বৌ একখানা মীরার ভজন গাইল।
রাণাজি, ম্যায় গিরধর কে ঘর যাঁহু
গিরধর ম্হরা সাচো প্রিতম্ দেখত রূপ লুভাঁউ।
গায়িকার চোখে-মুখে কী ভক্তিপূর্ণ তন্ময়তার শোভা ফুটে উঠল গানখানা গাইতে গাইতে_শান্তি একটা গন্ধরাজ আর টগরের মালা গেঁথে এনেছিল বৌদিদিকে পরাবে বলে_গান গাইবার সময়ে সে আবার সেটা বৌয়ের গলায় আলগোছে পরিয়ে দিল_সেই জ্যোৎস্নায় সাদা সুগন্ধি ফুলের মালা গলায় রূপসী বৌয়ের মুখে ভজন শুনতে শুনতে মন্টুর মায়ের মনে হলো এই মেয়েটিই সেই মীরাবাই, অনেককাল পরে পৃথিবীতে আবার নেমে এসেছে, আবার সবাইকে ভক্তির গান গেয়ে শোনাচ্ছে।
মন্টুর মা একটু বাইরের খবর রাখতেন, যাত্রায় একবার মীরাবাই পালা দেখেছিলেন তার বাপের বাড়ির দেশে।
তারপর আর একখানা হিন্দিগান গাইল বৌ, এঁরা অবিশ্যি কিছু বুঝলেন না। তবে তন্ময় হয়ে শুনলেন বটে।
তারপর একখানা বেহাগ। বাংলা গান এবার। সকলে শুয়ে পড়ল। শান্তির চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। অনেকে দেখল বৌয়েরও চোখ দিয়ে জল পড়ছে গান গাইতে গাইতে_রূপসী গায়িকা একেবারে যেন বাহ্যজ্ঞান ভুলে গিয়েছে গানে তন্ময় হয়ে।
সেদিন থেকেই সকলে শ্রীপতির বৌকে অন্য চোখে দেখতে লাগল।
ওর সম্বন্ধে ক্রমে উচ্চ ধারণা করতে সকলে বাধ্য হলো আরো নানা ঘটনায়। পাড়াগাঁয়ে সকলেই বেশ হুঁশিয়ার, এ কথা আগেই বলেছি। ধার দিয়ে_সে যদি এক খুঁচি চাল কি দু পলা তেলও হয়_তার জন্যে দশবার তাগাদা করতে এদের বাধে না। কিন্তু দেখা গেল শ্রীপতির বৌ সম্পূর্ণ দিলদরিয়া মেজাজের মেয়ে। দেবার বেলায় সে কখনো না বলে কাউকে ফেরায় না, যদি জিনিসটা তার কাছে থাকে। একেবারে মুক্তহস্ত সে বিষয়ে_কিন্তু আদায় জানে না, তাগাদা করতে জানে না, মুখে তার রাগ নেই, বিরক্তি নেই, হাসিমুখ ছাড়া তার কেউ কখনো দেখেনি।
শ্রীপতির বৌয়ের আপন-পর জ্ঞান নেই, এটাও সবাই দেখল। পাশের বাড়িতে চক্কত্তি-গিনি্ন বিধবা, একাদশীর দিন দুপুরে তিনি নিজের ঘরে মাদুর পেতে শুয়ে আছেন, শ্রীপতির বৌ এক বাটি তেল নিয়ে এসে তাঁর পায়ে মালিশ করতে বসে গেল। যেন ও তাঁর নিজের ছেলের বৌ।
চক্কত্তি-গিনি্ন একটু অবাক হলেন প্রথমটা। পাড়াগাঁয়ে এ রকম কেউ করে না, নিজের ছেলের বৌয়েই করে না তো অপরের বৌ।
_এসো, এসো মা আমার এসো। থাক থাক, তেল মালিশ আবার কেন মা? তোমায় ওসব করতে হবে না, পাগলি মেয়ে_
এই পাগলি মেয়েটি কিন্তু শুনল না। সে জোর করেই বসে গেল তেল মালিশ করতে। মাথার চুল এসে অগোছালোভাবে উড়ে এসেছে মুখে, সুগৌর মুখে অতিরিক্ত গরমে ও শ্রমে কিছু কিছু ঘাম দেখা দিয়েছে_চক্কত্তি-গিনি্ন এই সুন্দরী বৌটির মুখ থেকে চোখ যেন অন্যদিকে ফেরাতে পারলেন না। বড় স্নেহ হলো এই আপন-পর জ্ঞানহারা মেয়েটার ওপর।
ইতিমধ্যে কমলার বিয়ে হয়ে গেল। শ্বশুরবাড়ি যাবার সময়ে সে শ্রীপতির বৌয়ের গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলল, বৌদিদি, তোমায় কী করে ছেড়ে থাকব, ভাই? মাকে ছেড়ে যেতে কত কষ্ট না হচ্ছে, তত হচ্ছে তোমায় ছেড়ে যেতে।...এই এক ব্যাপার থেকেই বোঝা যাবে শ্রীপতির বৌ এই অল্প কয়েক মাসের মধ্যে গ্রামের তরুণ মনের কী রকম প্রভাব বিস্তার করেছিল।
পূজার সময় এসে পড়েছে। আশ্বিনের প্রথম, শরতের নীল আকাশে অনেক দিন পরে সোনালি রোদের মেলা, বনশিমের ফুল ফুটেছে ঝোপে ঝোপে, নদীর চরে কাশফুলের শোভা। পাশের গ্রাম সত্রাজিৎপুরে বাঁড়ুজ্যে-বাড়ি পুজো হয় প্রতিবছর, এবারও শোনা যাচ্ছে মহানবমীর দিন তাদের বাড়ি আর বছরের মতো যাত্রা হবে কাঁচড়াপাড়ার দলের।
শ্রীপতির বৌ গান-পাগলা মেয়ে, এ কথাটা এত দিনে এ গাঁয়ের সবাই জেনেছে। তার দিন নেই, রাত নেই, গান লেগে আছে, দুপুরে রাত্রে রোজ এসরাজ বাজায়। গান সম্বন্ধে কথা সর্বদা তার মুখে। শান্তির এখনো বিয়ে হয়নি; যদিও সে কমলার বয়সী। সে শ্রীপতির বৌয়ের কাছে আজকাল দিনরাত লেগে থাকে গান শেখবার জন্যে।
একদিন শ্রীপতির বৌ তাকে বলল, ভাই শান্তি, এক কাজ করবি, সত্রাজিৎপুরে তো যাত্রা হবে বলে সবাই নেচেছে। আমাদের পাড়ার মেয়েরা তো আর দেখতে পাবে না? তারা কি আর অপর গাঁয়ে যাবে যাত্রা শুনতে? অথচ এরা কখনো কিছু শোনে না_আহা! এদের জন্যে যদি আমরা আমাদের পাড়াতেই থিয়েটার করি?
শান্তি তো অবাক। থিয়েটার? তাদের এই গাঁয়ে? থিয়েটার জিনিসটার নাম শুনেছে বটে সে, কিন্তু কখনো দেখেনি। বলল, কী করে করবে, বৌদি কী যে তুমি বলো। তুমি একটা পাগল।
শ্রীপতির বৌ হেসে বলল, সেসব বন্দোবস্ত আমি করব এখন। তোকে ভেবে মরতে হবে না_দ্যাখ না কী করি।
সপ্তাহখানেক পর শ্রীপতি যেমন শনিবারের দিন বাড়ি আসে তেমনি এলো। সঙ্গে তিনটি বড় মেয়ে ও দুটি ছোট মেয়ে ও চার-পাঁচটি ছেলে। বড় মেয়ে তিনটির ষোলো-সতেরো এমনি বয়স, সকলেই ভারি সুন্দরী, ছোট মেয়ে দুটির মধ্যে যেটির বয়স তেরো, সেটি তত সুবিধে নয়, কিন্তু যেটির বয়স আন্দাজ দশ_তাকে দেখে রক্তমাংসের জীব বলে মনে হয় না, মনে হয় যেন মোমের পুতুল। ছেলেদের বয়স পনেরোর বেশি নয় কারো। সকলেই সুবেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
শান্তি, শান্তির মা এবং চক্কত্তি-গিনি্ন তখন সেখানেই উপস্থিত ছিলেন। শ্রীপতির বৌ ওদের দেখে ছুটে গেল রোয়াক থেকে উঠোনে নেমে। উচ্ছ্বসিত আনন্দের সুরে বলল, এই যে রমা, পিন্টু, তারা, এই যে শিব, আয় আয় সব কেমন আছিস? ওঃ কত দিন দেখিনি তোদের_
রমা বলে ষোলো-সতেরো বছরের সুন্দরী মেয়েটি ওর গলা জড়িয়ে ধরল, সকলেই ওকে প্রণাম করে পায়ের ধুলো নিল।
_দিদি কেমন আছিস, ভাই_
_একটু রোগা হয়ে গেছিস দিদি_
_ওঃ, কত দিন যে তোকে দেখিনি_
_দাদাবাবু যখন বললেন তোর এখানে আসতে হবে, আমরা তো_
_আহিরীটোলাতে মিউজিক কম্পিটিশন ছিল_নাম দিয়েছিলাম_ছেড়ে চলে এলাম_
মেয়েগুলোর মুখ, রং, গড়ন শ্রীপতির বৌয়ের মতো। রমা তো একেবারে হুবহু ওর মতো দেখতে, কেবল যা কিছু বয়সের তফাত। জানা গেল মেয়ে দুটির মধ্যে রমা ও তার ছোট সতী, এবং ছেলেমেয়েদের মধ্যে বারো বছরের ফুটফুটে ছেলে শিবু শ্রীপতির বৌয়ের আপন ভাইবোন, বাকি সবই কেউ খুড়তুতো, কেউ জ্যাঠাতুতো ভাইবোন।
ক্রমে আরো জানা গেল শ্রীপতির বৌ এদের চিঠি লিখিয়ে আনিয়েছে থিয়েটার করানোর জন্যে।
পাড়ার সবাই এদের রূপ দেখে অবাক। এসব পাড়াগাঁয়ে অমন চেহারার ছেলেমেয়ে কেউ কল্পনাই করতে পারে না। দশ বছরের সেই ছেলেটির নাম পিন্টু, সে শান্তির বড় ন্যাওটা হয়ে গেল। সে আবার একটা সাঁতার দেবার নীল রঙের পোশাক এনেছে, সিক্ত নীল পোশাক সুগৌর দেহে যখন সে নদীর ঘাটে স্নান করে উঠে দাঁড়ায়_তখন ঘাটসুদ্ধ মেয়েরা, বোস-গিনি্ন, মন্টুর মা, শান্তির মা, মজুমদার-গিনি্ন ওর দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকেন। রূপ আছে বটে ছেলেটির! শান্তি দস্তুর মতো গর্ব অনুভব করে, যখন পিন্টু অনুযোগ করে বলে, আঃ শান্তিদি, আসুন না উঠে, ভিজে কাপড়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব? আসুন বাড়ি যাই।
পূজা এসে পড়ল। এ-গাঁয়ে কোনো উৎসব নেই পূজার, গরিবদের গাঁয়ে পূজা কে করবে? দূর থেকে সত্রাজিৎপুরের বাঁড়ুজ্যে-বাড়ির ঢাক শুনেই গাঁয়ের মেয়েরা সন্তুষ্ট হয়। ভিনগাঁয়ে গিয়ে মেয়েদের পূজা দেখবার রীতি না থাকায় অনেকে দশ-পনেরো কি বিশ বছর দুর্গাপ্রতিমা পর্যন্ত দেখেনি। মেয়েদের জীবনে কোনো উৎসব-আমোদ নেই এ গাঁয়ে।
শ্রীপতির বৌ তাই একদিন শান্তিকে বলেছিল, সত্যি কী করে যে তোরা থাকিস ঠাকুরঝি_একটু গান নেই, বাজনা নেই, বই পড়া নেই, মানুষ যে কেমন করে থাকে এমন করে।
বোধ হয় সেই জন্যেই এত উৎসাহের সঙ্গে ও লেগেছিল থিয়েটারের ব্যাপারে।
শ্রীপতিদের বাড়ির লম্বা বারান্দায় একধাপে তক্তপোশ পেতে দড়ি টাঙিয়ে হলদে শাড়ি ঝুলিয়ে স্টেজ করা হয়েছে।
শ্রীপতির বৌ ভাইবোনদের নিয়ে সকাল থেকে খাটছে।
শান্তি বলল, তুমি এত জানলে কী করে, বৌদি।
রমা বলল, তুমি জানো না দিদিকে শান্তিদিদি। দিদি অল বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশনে_
শ্রীপতির বৌ ধমক দিয়ে বোনকে থামিয়ে দিয়ে বলল, নে, নে_যা, অনেক কাজ বাকি, এখন তোর অত বক্তৃতা করতে হবে না দাঁড়িয়ে_
রমা না থেমে বলল, আর খুব ভালো পার্ট করার জন্যেও সোনার মেডেল পেয়েছে...।
যতবার পয়লা বোশেখের দিন আমাদের বাড়িতে থিয়েটার হয়, দিদিই তো তার পাণ্ডা_জানো আমাদের কি নাম দিয়েছেন জ্যাঠামশায়?
শ্রীপতির বৌ বলল, আবার?
রমা হেসে থেমে গেল।
মহাষ্টমীর দিন আজ। শুধু মেয়েদের আর ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে থিয়েটার দেখবে। শুধু মেয়েরাই_সমস্ত পাড়া কুড়িয়ে সব মেয়ে এসে জুটেছে থিয়েটার দেখতে।
ছোট্ট নাটকটি। শ্রীপতির বৌয়ের জ্যাঠামশায়ের নাকি লেখা। রাজকুমারকে ভালোবেসেছিল তাঁরই প্রাসাদের একজন পরিচারিকার মেয়ে। ছেলেবেলায় দুজনে খেলা করেছে। বড় হয়ে দিগ্বিজয়ে বেরুলেন রাজপুত্র, অন্য দেশের রাজকুমারী ভদ্রাকে বিবাহ করে ফিরলেন। পরিচারিকার মেয়ে অনুরাধা তখন নব-যৌবনা কিশোরী, বিকশিত মলি্লকা-পুষ্পের মতো শুভ্র, পবিত্র। খুব ভালো নাচতে-গাইতে শিখেছিল সে ইতিমধ্যে। রাজধানীর সবাই তাকে চেনে, জানে_নৃত্যের অমন রূপ দিতে কেউ পারে না। এদিকে ভদ্রাকে রাজ্যে এনে রাজকুমার এক উৎসব করলেন। সে সভায় অনুরাধাকে নাচতে-গাইতে হলো রাজপুত্রের সামনে ভাড়া করা নর্তকী হিসেবে। তার বুক ফেটে যাচ্ছে, অথচ সে একটা কথাও বলল না, নৃত্যের মধ্য দিয়ে সংগীতের মধ্য দিয়ে জীবনের ব্যর্থ প্রেমের বেদনা সে নিবেদন করল প্রিয়ের উদ্দেশে। এর পরে কাউকে কিছু না বলে দেশ ছেড়ে পরদিন একা একা কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।
শ্রীপতির বৌ অনুরাধা, রমা ভদ্রা। ওর অন্য সব ভাই-বোনও অভিনয় করল। শ্রীপতির বৌ বেশভূষায়, রূপে, গলে দোদুল্যমান জুঁইফুলের মালায় যেন প্রাচীন যুগের রূপকথার রাজকুমারী, রমাও তাই, গানে গানে অনুরাধা তো স্টেজ ভরিয়ে দিল, আর কী অপূর্ব নৃত্যভঙ্গি! সতী, রমা, পিন্টুও কি চমৎকার অভিনয় করল, আর কী চমৎকার মানিয়েছে ওদের!
তারপর বহুকাল পরে পথের ধারে মুমূর্ষু অনুরাধার সঙ্গে রাজপুত্রের দেখা। সে বড় মর্মস্পর্শী করুণ দৃশ্য! অনুরাধার গানের করুণ সুরপুঞ্জে ঘরের বাতাস ভরে গেল। চারদিকে শুধু শোনা যাচ্ছিল কান্নার শব্দ, শান্তি তো ফুলে ফুলে কেঁদে সারা।
অভিনয় শেষ হলো, তখন রাত প্রায় এগারোটা। গ্রামের মেয়েরা কেউ বাড়ি চলে গেল না। তারা শ্রীপতির বৌকে ও রমাকে অভিনয়ের পর আবার দেখতে চায়। শ্রীপতির বৌ ও তার ভাইবোনদের রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে চক্কত্তি-গিনি্ন, শান্তির মা ও মন্টুর মা খেতে বসিয়ে দিলেন আর ওদের চারিধার দিয়ে পাড়ার যত মেয়ে।
ও পাড়ার রাম গাঙ্গুলীর বৌ বললেন, বৌমা যে আমাদের এমন তা তো জানিনে! ওমা এমন জীবন তো কখনো দেখিনি_
মন্টুর মা বললেন, আর ভাইবোনগুলোও কি সব হিরের টুকরো! যেমন সব চেহারা তেমনি গান_
শান্তি তো তার বৌদিদির পিছু পিছু ঘুরছে, তার চোখ থেকে অভিনয়ের ঘোর এখনো কাটেনি, সেই জুঁইফুলের মালাটি বৌদির গলা থেকে সে এখনো খুলতে দেয়নি। ওর দিক থেকে অন্যদিকে সে চোখ ফেরাতে পারছে না যেন।
চক্কত্তি-গিনি্ন বললেন, আর কী গলা আমাদের বৌমার আর রমার। পিন্টু অতটুকু ছেলে, কী চমৎকার করল।...
শান্তির মা বললেন, পিন্টু খাচ্ছে না, দেখ সেজ বৌ। আর একটু দুধ দি, কটা মেখে নাও বাবা, চেঁচিয়ে তো খিদে পেয়ে গিয়েছে।...কী চমৎকার মানিয়েছিল পিন্টুকে, না সেজ বৌ?
_একে ফুটফুটে সুন্দর ছেলে...
শ্রীপতির বৌ হাজার হোক ছেলেমানুষ, সকলের প্রশংসায় সে এমন খুশি হয়ে উঠল যে খাওয়াই হলো না তার। সলজ্জ হেসে বলল, জ্যাঠামশায় আমাদের বলেন কিন্নর দল_এখন ঐ নামে আমাদের_
রমা হেসে ঘাড় দুলিয়ে বলল, নিজে যে বললে দিদি, আমি বলতে যাচ্ছিলুম, আমায় তবে ধমক দিলে কেন তখন?
তারা বলল, নামটি বেশ, কিন্নর দল, না? আমাদের শ্যামবাজারের পাড়ায় কিন্নর দল বলতে সবাই চেনে_
রমা বলল, কৃত্রিম গর্বের সঙ্গে_প্রায় এক ডাকে চেনে_হুঁ হুঁ_
তারপর এই রূপবান বালক-বালিকার দল, সকলে একযোগে হঠাৎ খিলখিল করে মিষ্টি হাসি হেসে উঠল।
সতী হাসতে হাসতে বললে_বেশ নামটি, কিন্নর দল, না?
এমন একদল সুশ্রী চেহারার ছেলেমেয়ে, তার ওপর তাদের এমন অভিনয় করার ক্ষমতা, এমন গানের গলা, এমন হাসি-খুশি মিষ্টি স্বভাব, সকলেরই মন হরণ করবে তার আশ্চর্য কী?
মন্টুর মা ভাবলেন, কিন্নর দলই বটে।...
ওদের খেতে খেতে হাসি গল্প করতে মহাষ্টমীর নিশি ভোর হয়ে এলো!
শ্রীপতির বৌ বলল, আসুন, বাকি রাতটুকু আর সব বাড়ি যাবেন কেন? গল্প করে কাটানো যাক।
শ্রীপতি বাড়ি নেই, সে সত্রাজিৎপুরের বাঁড়ুজ্যে-বাড়ির নিমন্ত্রণে গিয়েছে, আজ রাত্রের যাত্রা দেখে সকালে ফিরবে। সেই জন্যে সকলে বলল, তা ভালো, কিন্তু বৌমা তোমাকে গান গাইতে হবে!
শান্তি বলল, বৌদি, অনুরাধার সেই গানটা গেও আরেকবার, আহা, চোখে জল রাখা যায় না শুনলে।
শ্রীপতির বৌ গাইল, রমা এসরাজ বাজাল। তারপর রমা ও তারা একসঙ্গে গাইল। একটিমাত্র তেড়ো-পাখি বাঁশগাছের মগডালে কোথায় ডাক আরম্ভ করেছে। রাত ফরসা হলো।
সে মহাষ্টমীর রাত্রি থেকে গ্রামের সবাই জানল শ্রীপতির বৌ কী ধরনের মেয়ে।
কেবল তারা জানল না যে শ্রীপতির বৌ-প্রতিভাশালিনী গায়িকা, সত্যিকার আর্টিস্ট। সে ভালোবেসে শ্রীপতিকে বিয়ে করে এই পাড়াগাঁয়ের বনবাস মাথায় করে নিয়ে, নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছেড়েছে, যশের আশা, অর্থের আশা, আর্টের চর্চা পর্যন্ত ত্যাগ করেছে। তবু গানের ঝোঁক ওকে ছাড়ে না_ভূতে পাওয়ার মতো পেয়ে বসে_দিনরাত তাই ওর মুখে গান লেগেই আছে, তাই আজ মহাষ্টমীর দিন সেই নেশার টানেই এই অভিনয়ের আয়োজন করেছে।
শান্তি কিছুতেই ছাড়তে চায় না ওকে। বলে, তুমি কোথাও যেও না, বৌদিদি, আমি মরে যাব, এখানে তিষ্ঠুতে পারব না। শান্তি আজকাল শ্রীপতির বৌয়ের কাছে গান শেখে, গলা মন্দ নয় এবং এদিকে খানিকটা গুণ থাকায় সে এরই মধ্যে বেশ শিখে ফেলেছে। কিছু কিছু বাজাতেও শিখেছে। গান-বাজনায় আজকাল তার ভারি উৎসাহ। শ্রীপতির বৌ গান-বাজনা যদি পেয়েছে, আর বড় একটা কিছু চায় না, শান্তির সংগীত শিক্ষা নিয়েই সে সব সময় মহাব্যস্ত।
অগ্রহায়ণ মাসের দিকে বৌয়ের বাড়ি থেকে চিঠি এলো রমা কী অসুখ হয়ে হঠাৎ মারা গিয়েছে। শ্রীপতি কলকাতা থেকে সংবাদটা নিয়ে এলো। শ্রীপতির বৌ খুব কান্নাকাটি করল। পাড়াসুদ্ধ সবাই চোখের জল ফেলল ওকে সান্ত্বনা দিতে এসে।
শান্তি সব সময় বৌদির কাছে কাছে থাকে আজকাল। তাকে একদিন শ্রীপতির বৌ বলল, জানিস শান্তি, আমাদের কিন্নর দল ভাঙতে শুরু করেছে, রমাকে দিয়ে আরম্ভ হয়েছে, আমার মন যেন বলছে...
শান্তির বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল, ধমক দিয়ে বলল, থাক ওসব কী যে বলো বৌদি!
কিন্তু শ্রীপতির বৌয়ের কথাই খাটল।
সে ঠিকই বলেছিল, শান্তি ঠাকুরঝি, কিন্নর দলে ভাঙন ধরেছে।
রমার পরে ফাল্গুন মাসের দিকে গেল পিন্টু বসন্ত রোগে। তার আগেই শ্রীপতির বৌ মাঘ মাসে বাপের বাড়ি গিয়েছিল, শ্রাবণ মাসের প্রথমে প্রসব করতে গিয়ে সেও গেল।
এ সংবাদ গ্রামে যখন এলো, শান্তি তখন সেখানে ছিল না, সেই বোশেখ মাসে তার বিবাহ হওয়াতে সে তখন ছিল মোটরি বাণপুরে, ওর শ্বশুরবাড়িতে। গ্রামের অন্য সবাই শুনল, অনাত্মীয়ের মৃত্যুতে খাঁটি অকৃত্রিম শোক এ রকম এর আগে কখনো এ গাঁয়ে করতে দেখা যায়নি। রায়-গিনি্ন, চক্কতি-গিনি্ন, শান্তির মা, মন্টুর মা কেঁদে ভাসিয়ে দিলেন। ঐ মেয়েটি কোথা থেকে দুদিনের জন্যে এসে তার গানের সুরের প্রভাবে সকলের অকরুণ, কুটিলভাবে পরিবর্তন এনে দিয়েছিল, সে পরিবর্তন যে কতখানি, ওই সময়ে গাঁয়ের মেয়েদের দেখলে বোঝা যেত। ওদের চক্কত্তি-বাড়ির দুপুরবেলায় আড্ডায়, স্নানের ঘাটে শ্রীপতির বৌয়ের কথা ছাড়া অন্য কথা ছিল না।
চক্কত্তি-গিনি্ন পেয়েছিলেন সকলের চেয়ে বেশি। শ্রীপতির বৌয়ের কথা উঠলেই তিনি চোখের জল সামলাতে পারতেন না। বলতেন, দুদিনের জন্যে এসে মা আমায় কী মায়াই দেখিয়ে গেল! আমার পেটের মেয়ে অমন কক্ষনো করেনি...আহা! আমার পোড়া কপাল, সে কখনো এ কপালে টেকে!
মন্টুর মামা বলতেন, সে কি আর মানুষ! দেবী অংশে ওসব মেয়ে জন্মায়। নিজের মুখেই বলত হেসে হেসে, 'আমরা কিন্নর দল খুড়িমা', শাপভ্রষ্ট কিন্নরীই তো ছিল।...যেমন রূপ, তেমনি স্বভাব, তেমনি গান...ও কি আর মানুষ, মা!
কথা বলতে বলতে মন্টুর মায়ের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ত।
এসবের মধ্যে কেবল কথা বলত না শান্তি। তার বিবাহিত জীবন খুব সুখের হয়নি, ভেবেছিল বাপের বাড়ি এসে বৌদিদির সঙ্গে অনেকখানি জ্বালা জুড়োবে। পূজার পরে কার্তিক মাসের প্রথমে বাপের বাড়ি এসে সব শুনেছিল। বৌদিদি যে তার জীবন থেকে কতখানি হরণ করে নিয়ে গিয়েছে, তা এরা কেউ জানে না। মুখে সেসব পাঁচজনের সামনে ভ্যাজ ভ্যাজ করে বলে লাভ কী? কী বুঝবে লোকে?
বছর দুই পরে একদিনের কথা। গাঁয়ের মধ্যে শ্রীপতির বৌয়ের কথা অনেকটা চাপা পড়ে গিয়েছে। শ্রীপতিও অনেকদিন পরে আবার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া-আসা করছে শনিবারে কিংবা ছুটিছাঁটাতে।
শ্রীপতিদের বাড়ি থেকে শান্তিদের বাড়ি বেশি দূর নয়, দুখানা বাড়ির পরেই। শান্তি তখন এখানেই ছিল। অনেক রাত্রে সে শুনল শ্রীপতিদাদাদের বাড়িতে কে গান গাইছে। ঘুমের মধ্যে গানের সুর কানে যেতেই সে ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল_
বিরহিণী মীরা জাগে তব অনুরাগে, গিরিধর নাগর_
এ কার গলা? ওর গা শিউরে উঠল। ঘুমের ঘোর এক মুহূর্তে ছুটে গেল। কখনো সে ভুলবে জীবনে এ গান, এ গলা? সেই প্রথম পরিচয়ের দিনে ওদের রোয়াকে জ্যোৎস্না রাত্রে বসে এই গানখানা বৌদি প্রথম গেয়েছিল! সেই অপূর্ব করুণ সুর, গানের প্রতি মোচড়ে যেন একটি আকাঙ্ক্ষার প্রাণঢালা আত্মনিবেদন! এ কি আর কারো গলার_ওর কুমারী জীবনের আনন্দভরা দিনগুলোর কত অবসর প্রহর যে এ কণ্ঠের সুরে মধুময়!
ও পাগলের মতো ছুটে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল।
রাত অনেক। কৃষ্ণাতৃতীয়ার চাঁদ মাথার ওপর পেঁৗছেছে। ফুটফুটে শরতের জ্যোৎস্নায় বাঁশবনের তলা পর্যন্ত আলো হয়ে উঠেছে।
ঠিক যেন তিন বছর আগেকার সেই মহাষ্টমীর রাত্রির মতো।
শান্তির মা ইতিমধ্যে জেগে উঠে বললেন, ও কে গান করছে রে শান্তি? তারপর তিনিও তাড়াতাড়ি বাইরে এলেন। শ্রীপতিদের বাড়ি তো কেউ থাকে না, গান গাইবে কে? ওদিকে মন্টুর মা, মণি, বাদল সবাই জেগেছে দেখা গেল।
প্রথমেই এরা সবাই ভয়ে বিস্ময়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। পরে ব্যাপারটা বোঝা গেল। শ্রীপতি কখন রাতের ট্রেনে বাড়ি এসেছিল, কেউ লক্ষ করেনি। সে কলের গান বাজাচ্ছে। ওদের সাড়া পেয়ে সে বাইরে এসে বলল, আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে আজ চেয়ে আনলুম ওর গানখানা। মরবার কমাস আগে রেকর্ডে গেয়েছিল।
সবাই খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। শান্তি প্রথমে সে নীরবতা ভঙ্গ করে আস্তে আস্তে বলল, ছিরুদা, রেকর্ডখানা আর একবার দেবে?
পরক্ষণেই একটি অতি সুপরিচিত, পরম প্রিয়, সুললিত কণ্ঠের দরদ-ভরা সুরপুঞ্জে পাড়ার আকাশ-বাতাস, স্তব্ধ জ্যোৎস্না রাত্রিটা ছেয়ে গেল। মানুষের মনের কী ভুলই যে হয়! অল্পক্ষণের জন্যে শান্তির মনে হলো তার কুমারী জীবনের সুখের দিনগুলো আবার ফিরে এসেছে, যেন বৌদিদি মরেনি, কিন্নরের দল ভেঙে যায়নি, সব বজায় আছে। এই তো সামনে আসছে পূজা, আবার মহাষ্টমীতে তাদের থিয়েটার হবে, বৌদিদি গান গাইবে। গান থামিয়ে ওর দিকে চেয়ে হাসি হাসি মুখে বলবে, কেমন শান্তি ঠাকুরঝি, কেমন লাগল!
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1400)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
-
▼
2012
(33842)
-
▼
November
(2002)
-
▼
Nov 06
(62)
- জামায়াতের বিক্ষোভে বাধা, দেশজুড়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
- আবেগআপ্লুত ওবামার চোখে জল
- অনলাইন ব্যাংকিংয়ে অযৌক্তিক ফি by সাইদ আরমান
- সম্মুখ সমরে সোনাক্ষী-আনুশকা
- বিপজ্জনক তারকা সানি লিওন
- পতিতা পল্লীতে প্রিয়াংকা চোপড়া
- স্তনদায়িনী by মহাশ্বেতা দেবী
- বন মর্মর by মনোজ বসু
- জাপানে দালাই লামা- চীনে পরিবর্তন দরকার
- যুক্তরাজ্যে ‘রাষ্ট্রহীন’ পথশিশুরা
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় উঠে এসেছে...
- আগাম ভোটে এগিয়ে ওবামা
- ব্যালটে গুরুত্ব পাচ্ছে যেসব বিষয়
- শবাগার by মতি নন্দী
- সাভারে ‘মাদকের হাট’ by অরূপ রায়
- কমিউনিটি ক্লিনিকে যাচ্ছেন না চিকিৎসকেরা by আবুল ...
- অ্যাসিড ছোড়ায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি
- প্রথম আলোর আলোয় আলোকিত হবে দেশ
- প্রথম আলোর আলোয় আলোকিত হবে দেশ
- খালেদার ভারত সফরে আওয়ামী লীগের স্বপ্ন ভেস্তে গেছে:...
- শিক্ষকদের পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠালেন প্রধান শিক্ষক
- ভর্তি-ইচ্ছুকদের প্রবেশপত্রে নায়ক-নায়িকাদের ছবি!
- বাংলাদেশের এএসইএম ফোরামে যোগদান
- ভুল বিকাশ by মঈনুল আহসান সাবের
- টুকা কাহিনী by বুলবুল চৌধুরী
- আমরা তিনজন by বুদ্ধদেব বসু
- ইঁদুর by বুদ্ধদেব গুহ
- আসেম শীর্ষ সম্মেলন- বাংলাদেশ কী পাবে? by সমীরণ রায়
- সরেজমিন- হিস্পানিকরাই তুরুপের তাস? by মিজানুর রহ...
- সর্বাগ্রে দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি- পুলিশের ঊর্ধ্...
- তীরে এসে নৌকা ডোবাবেন না- মসিউরের ছুটি উপাখ্যান
- চারদিক- প্রাণখোলা এক সন্ধ্যা by আকমল হোসেন
- কী দেব তোমায়?
- হালকা নাশতা বিকেলে
- ফ্রিজে গরুর মাংস তো রয়েছেই। চটপট বানিয়ে ফেলতে পা...
- ঝোল, কোরমা বা রেজালা তো অনেক হলো। গরুর মাংসের ভিন্...
- কিন্নরদল by বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
- সর্বনাশা প্রকল্প-সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে
- বীর মুক্তিযোদ্ধা- তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না
- বর্ষপূর্তি- ‘পরিবারের সবার পত্রিকা’
- ডিসিসি নির্বাচন জানুয়ারিতে! by রোজিনা ইসলাম
- আদালতে ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান- ডিজিএফআইয়ের তদন্ত...
- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-জয় হবে গণতন্ত্রের
- পবিত্র কোরআনের আলো-ফিরআউন ও তার রাজন্যবর্গ মুসার ম...
- কোন দিকে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচ...
- চরাচর-ইস্টিশনের অতিথি by বিশ্বজিৎ পাল বাবু
- কথা সামান্যই-বর্ণ ধর্ম জাতি সম্পর্কিত আইন by ফজলুল...
- কল্পকথার গল্প-কালনেমির লঙ্কাভাগ ও কুম্ভকর্ণের নিদ্...
- কালান্তরের কড়চা-দিল্লির লাড্ডু খেয়েও বেগম জিয়া পস্...
- অরণ্যে রোদন- ‘আমার ঘুম আসে না’ by আনিসুল হক
- এবারও ওহাইও যাঁর, হোয়াইট হাউস তাঁর? by মিজানুর ...
- দেশি-প্রবাসীর সেতুবন্ধ by অমিত চাকমা
- সিপিডির সংলাপ: রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ব্যাংক ব...
- ২০১২ যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আজ- ওবামা ...
- সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ-অসভ্য ও অভদ্র! by আবু এনএম ওয়াহিদ
- সমকালীন প্রসঙ্গ-বিরোধী নেত্রীর বিদেশ সফর এবং গণতন্...
- সুষমা ও সু চিকেও আমন্ত্রণ by শেখ রোকন
- শিক্ষা-মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন কেন? by ...
- রাজনীতি-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-স্বাধীনতার চেতনা by মো...
- সমকালীন প্রসঙ্গ-মিয়ানমার ও বাংলাদেশে বৌদ্ধ-মুসলমা...
- প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-বিশ্ব তাকিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে
- জেএসসি পরীক্ষা-আলোর ছবিতে কালো ছায়া
-
▼
Nov 06
(62)
-
▼
November
(2002)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ইরান
ক্রিকেট
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
কালবেলা
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
ইউক্রেন
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
নেপাল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
স্বাস্থ্য
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
জ্যোতির্বিজ্ঞান
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
শিল্প ও সাহিত্য
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
গবেষণা
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
জীবনযাপন
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
মেহেদী হাসান
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
মসজিদ
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
ইয়েমেন
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
Exclusive
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
উচ্চশিক্ষা
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
জনস্বাস্থ্য
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
লাতিন আমেরিকা
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
মহাকাশচারী
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
জোহরান মামদানি
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
ইহুদি
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
স্পেন
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment