শিক্ষা-মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন কেন? by মো. আবুল বাশার

শিক্ষার সার্বিক ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন বিকশিত হয়। এ জন্য প্রয়োজন বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের দেশে শিক্ষা কাঠামোর তিনটি স্তরের মধ্যে মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থান দ্বিতীয়। এ স্তর খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


শিক্ষার এ স্তরের প্রধান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে, শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত মেধা ও সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন করা, কর্মজগতে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিরূপে শিক্ষার্থীকে তৈরি করা, মানসম্পন্ন শিক্ষাদান করে প্রাথমিক স্তরে প্রাপ্ত মৌলিক জ্ঞান সম্প্রসারিত ও সুসংহত করা, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার ভিত শক্ত হবে। এ জন্য মাধ্যমিক স্তরকে প্রান্তিক শিক্ষা স্তর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাধ্যমিক শিক্ষা আবার প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করে। তাই এ স্তরে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণের উপাদানগুলো হলো_ আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম, পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য শিক্ষক, প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো ও শিক্ষণসামগ্রী, যথাযথ শিক্ষণ পদ্ধতি ও কৌশল, ফলপ্রসূ ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধান, উপযুক্ত শিক্ষণ-শিখন পরিবেশ ও যথোপযুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতি ইত্যাদি। উলি্লখিত উপাদানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক। স্বাধীনতা-পরবর্তী সব শিক্ষা কমিশন রিপোর্টেই এ বাস্তবতা স্বীকার করা হয়েছে। যোগ্য শিক্ষক তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে প্রশিক্ষণ। প্রশ্ন হচ্ছে, কেবল প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেটই কি যোগ্য শিক্ষকের একমাত্র মানদণ্ড? তাহলে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের পর আবার মানসম্মত শিক্ষক শিক্ষা ও পৌনঃপুনিক প্রশিক্ষণের কথা বলা হচ্ছে কেন? একজন শিক্ষককে তখনই যোগ্য বলা যাবে শিক্ষাগত ও পেশাগত সার্টিফিকেটের সঙ্গে তিনি যখন শিক্ষণের জন্য আবশ্যকীয় দক্ষতা, জ্ঞান, মনোভাব, মূল্যবোধ, প্রেষণা ও বিশ্বাস অর্জন করবেন, যার মাধ্যমে একটি নতুন পরিবেশে টিকে থেকে শিক্ষকতা কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। অনেকেই শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শিক্ষক যোগ্যতাকে গুলিয়ে ফেলেন। বাস্তব পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের নানারকম সীমাবদ্ধতার কথাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তথাপিও যদি যোগ্যতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যেত তাহলে এ সমস্যার সমাধান পাওয়া যেত। বর্তমানে প্রচলিত বিএড শিক্ষাক্রমে ছয়টি মৌলিক যোগ্যতার আওতায় ৩২টি সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা নির্ধারণ করা আছে, যা ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যকর।
যুগের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে সক্ষম রাখার জন্য শিক্ষার লক্ষ্য দ্রুত পরিবর্তনশীল। এই চাহিদা শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্ব শিক্ষকদের এবং এ জন্য তাদের শক্তিশালী ও কার্যকর পেশাগত যোগ্যতা প্রয়োজন। তাই বিএডসহ মাধ্যমিক শিক্ষকদের সকল প্রশিক্ষণের জন্য জাতীয়ভাবে শিক্ষক যোগ্যতা নির্ধারণ সময়ের দাবি। কেননা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক নতুন ধারণার সংযোজন হয়েছে। যেমন_ একীভূত শিক্ষা, জীবন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, শিক্ষক কর্তৃক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও ব্যবহার, শিক্ষায় আইসিটি সমন্বয়, আইসিটি শিক্ষা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ব্যবহার, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহার, সৃজনশীল প্রশ্ন ও বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্য যাচাই ইত্যাদি। এসব বিষয়ের প্রশিক্ষণ তখনই কার্যকর হবে, যখন শিক্ষকরা প্রতিটি বিষয়ে নির্ধারিত পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করবেন। তাই মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের চাকরিকালীন ও চাকরিপূর্ব সব প্রশিক্ষণের জন্যই মূল যোগ্যতা ও সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা নিরূপণ জরুরি। এসব যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করতে হবে। প্রশিক্ষণের মূল্যায়ন হতে হবে যোগ্যতাভিত্তিক। যোগ্যতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ যথাযথভাবে পরিচালনা করতে পারলে একদিকে শিক্ষকদের যোগ্য করা যাবে, অন্যদিকে কোন কোন যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে তা নিরূপণ করে পরবর্তী প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করা সহজ হবে। প্রশিক্ষণে অপচয় রোধ হবে। শিক্ষকরা শিক্ষার নবতর ধারণাগুলোর ওপর আবশ্যকীয় জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ ও বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হবেন। তাই গতানুগতিক প্রশিক্ষণের পরিবর্তে মূল ও সুনির্দিষ্ট যোগ্যতাভিত্তিক মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রদানের পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এখনই।

মো. আবুল বাশার : সহকারী অধ্যাপক সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ; পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
basharnsl@hotmail.com