Tuesday, November 6, 2012
টুকা কাহিনী by বুলবুল চৌধুরী
টুকা কাহিনী by বুলবুল চৌধুরী
নিড়েনের দরকার ছিল না। শিম দিয়েছে মাচানে, লকলকে ডগা মাচানের দিকে মাথা দিয়েছে মাত্র, ওপরের অংশের নাগাল পেতেও দিন কয় যাবে। তবুও টুকা ভোর ভোর থেকেই নিড়ানি হাতে বসেছে।
ঘাস বলতে ফাঁকা ফাঁকা বাদাইল্লা_একদম মূল থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তুলে ফেলতে হয়। নইলে আবার গজায়! রোদের তেজে মরে না, কেটে দিলেও গজায়। সে কাজ করছিল ধীর। এক-একটা ঘাসের মেটে রঙ ও চুলের মতো পাতলা শিকড়ও খুঁজে খুঁজে বের করছিল। আর অত ভোরে মায়মুনা মাচানের কাছে, নিমের ছায়ায় যে ভেজা ভেজা পাতকুয়া আছে, সেখানে কলসি ভরতে এসে নিচু হয়েই দাঁত কামড়ে ধরল, হায়া নাই, মানুষডার হায়া নাই। মাগো, একগা তফন পিনলে কি অয়?
বস্তুত টুকা একফালি কাপড়ের লেংটি পরেই নিড়ানি হাতে বসেছিল। খাটো মানুষ, মাথার চুল যথাসম্ভব ছোট করে ছাঁটা। গোলগাল মুখ তেল চকচক করে, ফোলাফাঁপা পেট_টুকার পেট এরকমেরই থাকে, সেরেক চালের ভাত খেলেও, দু'দিন অভুক্ত থাকলেও। যদি আলো-আঁধারিতে সে কোথাও গাঁট মেরে বসে থাকে, তাহলে মানুষ বলে ঠাউর করা যায় না। ঠাউর হয়, কেউ গোবর-পচা বা কোনো আবর্জনা কোদালে কুপিয়ে, পাতিতে বয়ে এনে দু'এক পাতি ফেলে রেখেছে।
কাকগুলো এখন উড়ে যাচ্ছে গৃহস্থ বাড়ির দিকে। পাখিও এই ডাল, সেই ডাল ওড়াউড়ি করে সারারাতের থির থাকা অবস্থাটা কাটিয়ে দূরের দিকে উড়ে যাচ্ছে। টুকা বুঝতে চায় না কোনটা কাক, কোনটা ঘুঘু, বা কখন ঝাঁক ঝাঁক পেঙ্গাপেঙ্গি নামবে খিলান জমিতে। মায়মুনা হয়তো পানি নিতে এসেছিল। রোজই তো আসে। এসব দিয়ে কী হবে তার? চরাচরে যা হবার হোক, সে দুপুর দুপুর নিড়েনটা তুলতে চায়। তারপর টুকা যাবে বেহুলডাঙ্গায়। ওদিকে ফসলের মরশুম আসছে। বেহুলডাঙ্গার দস্তিদার বলেছিল ছমাসের জন্যে পাকাপাকি কথা বলতে। খাবে-দাবে, কাজ যা আছে করবে, মাস কাবারি পয়সা। তা কত ধরবে টুকা? এ অঞ্চলে আশ্বিনে কোনো কাজ থাকে না। বর্ষা সেই যে তিরতির করে বাড়তে থাকে আষাঢ় থেকে, ভাদ্রে এসে ফণা দিয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় পানির বাড়ের সাথে আমন ফসল পেরে ওঠে না। কোনো রকমে, হাইফাই করে একটু যদি তুলতে পারে মাথা তাহলে দাবায় কে? সবুজ, পাতলা ধার ধার ধাঁচের সেই ধানপাতা নতুন ধারের কাঁচির মতো উঠতেই থাকে ওপর দিকে। যদিও আমন ফলে, ফলবে গিয়ে সেই অগ্রহায়ণে। এর আগে কাটা-থোয়া নেই ধানের। জমি বর্ষাতল বলে চাষবাসও নেই। কাজও নেই তাই। অগত্যা টুকা বেহুলডাঙ্গা যাবে।
সে কাজে আরও দ্রুত হয়ে উঠেছিল। এদিকে বৃষ্টিরও নষ্ট মাথা। কখন না জানি নামবে এমনই ঢল যে, জোয়ার সেই বৃষ্টি পেয়ে কাছিমের মতো মাথা, পা বের করে ভিটেবাড়ির দিকে এগিয়ে আসবে।
পূর্ব-পশ্চিমের পালা তুলে টুকা যেই না ঘুরে পশ্চিম-পূর্বের পালা শেষ করছিল, তখন দেখল আইনুল আসছে মাছের রাশ মাথায়। কাছাকাছি হয়ে আইনুল বাঁ হাতে টুকার দিকে আধ-খাওয়া বিড়ি এগিয়ে দিল, টুকা কা, খাও। অবেইলডায় নিড়েন দেও কেরে?
অবেইল কই, ঘাস অইছে, দেহছ না, বাদাইল্লায় কেমুন জোর চাইতাছে?
তোমার যেমুন কাম! আরে, উষী অইছে জোঙ্গলা গাছ। হেমুন নিড়েনের কি আছে?
হ, তয় মার না, হেজাডা মার না, মাস কয় ধইরাই না জ্বালাইতাছে।
আসলেও, সজারুটা মাস দুই থেকে জ্বালাচ্ছে। মাচানের কুমড়ো কাটছে, ঢেঁড়শ গাছের ডগা কাটছে, কলা, বেগুন কাটছে। ইনুচ মোল্লার বাঁশঝাড়ের কড়ুল সব শুইয়ে দিয়েছে সজারুটা। এ বছরের বাঁশ কি আর পাবে ইনুচ?
টুকারও একটা বাঁশঝাড় আছে। সজারুটা এদিকে আসতেও পারে। ভাবনা হয় তার। খোদা না করে...।
পোড়া বিড়ির টুকরো অংশ নিড়েন দেওয়া মাটির নিচে ঢুকিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করে, কোফাই থাহে হেজারা?
আইনুল রেগে যায়, আমার চেডে জানে। বাঁশ খাইবো, তরহারি খাইবো, বিনাশ অইলে তোমাগো অইবো। আমার তো একখান বাগুন জমি। হেও লাট-পাট কইরা ছাড়ছে কবে। হেজা মারনের ঠেহা অইলো তোমাগো।
আইনুল ছুটতে যাচ্ছিল এরপর। কিন্তু দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, টুকা কা, কুইচ্ছা খাইবা নিহি?
টুকার ভঙ্গিটা নির্বিকার। অথচ ভেতরে উৎসাহের শিস ঠিকই বেজে যাচ্ছে। অনেক দিন হয় কুইচ্ছা দেখে না, অনেক দিন না। আইনুলের আহ্বান পেয়ে চোখের তারায় ওই রকম লাল রক্তময় কুইচ্ছা মোচড় খায়। মোচড়ের ফলে তার চোখেও রক্ত এসে যায়। তারপর লাল হয়ে যায় সব।
খাইলে যাও, কাইল দাওন পাতছিলাম নলখাড়ির টেহের উত্তর-পশ্চিমে। গাবতলার ছিপডাত দেখবা বাইজ্জা রইছে কুইচ্ছাডা, জ্যাতা, গেলে পাইবা।
আইনুল তারপর ছুটতে থাকে। এই মাছ নিয়ে সে যাবে গঞ্জের বাজারে। বেচবে। তাই তো, সময় কোথায়!
সাথে সাথেই নিড়ানি ছেড়ে টুকা উঠে দঁাঁড়িয়েছে। নলখাগাড়ির টেকে একবার যাবে সে। কুইচ্ছা মাছটা আনতে হবে। কাজে-কামে গেলে তবেই তো গৃহস্থবাড়ির পাতে মাছ পড়ে। টুকা মাচানের বাইরে আসতেই কপালে বৃষ্টির ফোঁটা লাগল। দেখতে দেখতে যে সূর্য মুখ তুলেছিল তা-ও গেল মেঘের আড়ালে। ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল সহসাই। হতচকিত টুকা গেল ঘরের দিকে। ভেজা মাথা থেকে দু'হাতে পানি কেচে এসে আকাশের দিকে বাঁ পা তুলে দেখাতে দেখাতে সে চিৎকার করে উঠল, পোংডা দেওয়া, দেহছনে, দেহছনে...।
সে এরকম বসেও আকাশকে পা দেখায়। মায়মুনা রান্নাঘরে বসে দৃশ্যটা দেখে আর স্বামীকে বলে, দেহ, দেহ তোমার ভাইয়ের কাম, দেওয়ার লগে কেমুন কাইজ্জা লাগাইছে।
একুব তা ঠিকই শোনে হয়তো। কিন্তু পর মুহূর্তে কিছু মনে থাকে না।
বৃষ্টি থাকলই। অস্থির টুকা ভিজতে ভিজতে বেরিয়ে গেল নলখাগাড়ির টেকের দিকে। ছিপটা পাতা আছে গাবতলায়। বড়শি গিলে কুইচ্ছাটা মোচড়াচ্ছে_না ছুটলেই নয়।
দুই
ভাত চড়িয়েছে টুকা। ধোঁয়া উঠছে খুব। বৃষ্টি হচ্ছে তুমুল। হাওয়া আরও খারাপ হচ্ছে। ভারী ভারী মেঘখণ্ড জেঁকে বসেছে। এই মেঘ থেকে বৃষ্টি গড়াবেই। দুর্যোগ আক্রান্ত হবেই মানুষ। নতুন চাঁদ ছিল মেঘকুড়োলি। তার মানে ঝড়-তুফান হবে, বৃষ্টি হবে, অন্ধকার হবে এরকম ভেবে টুকা যা যা জানা আছে গালাগাল, এক প্রস্থ, দুই প্রস্থ করে সেরে ফেলেছে। তারপর চুলায় আগুন চড়াবার জন্যে কাঠ গুঁজেছে। দু'মুঠো তুষ ছিটিয়ে কাটাকুটি সারছে এখন সে। দু'পায়ের ফাঁকে ফাঁকে দু'হাঁটুর প্রান্ত দিয়ে হুঁকাটা চেপে ধরে বেদম টানতে টানতে সে ছাই মাখাচ্ছিল কুইচ্ছাটায়। মরেনি মাছটা। জোর খাটাচ্ছিল। পিচ্ছিল বলে ছাইও নিতে হচ্ছিল বেশি বেশি। বড়শি থেকে ছুটিয়ে আনবার সময় মুখ থেকে সেই যে রক্ত বেরোনো শুরু হয়েছে গলা কাটবার সময় তা এখন অধিক ধারায় বইছে। বাইন মাছের মতো লম্বা, অই রকমই গড়ায়-চড়ায়, কাঁটা নেই, নরম মাছ। রঙটা জমাট রক্তের মতোই, আসলে পুরো কুইচ্ছাটাই জমাট রক্ত, চোখ দুটো বাদে। মুখটা বেলে মাছের মতো ভোঁতা। মানুষজন সাধারণত খেতে চায় না। বলে, এই সব যে খায়, তার লাগি হাপ-ব্যাঙও ফরজ।
রক্তটা দেখবে না, দেখবে না কি নরম তেলতেলে, আর স্বাদ যে সেই মাথার তালুতে গিয়ে ঠেকে?
বঁটি দিয়ে মাথা আলগা করার সময় গলগলিয়ে রক্ত এসে হাত ভেজালো, বঁটি ভেজালো, মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল ফোঁটায় ফোঁটায়। আত্মতৃপ্তিতে টুকা গালাগাল দিল, ওই হালারা ওই, খাইতে ঘিন করে, না? তরা ঘিনে মরস? এমুন লউ দেখছসনি? দেখছস...?
ভাতের বলক আসার আগে আগেই তার ধোয়ার কাজ শেষ হয়ে গেল। বাটনা নেই। মায়মুনাকে যে ডাকবে তার উপায় কী? এই বৃষ্টি ভেঙে ও আসবে কি না টুকা জানে না। হঠাৎ শূন্যতা বোধ করল সে। আর একবার তামাক সেজে বসল। দুয়াগরির ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে ভাবল, বেহুলাডাঙ্গায় যাওয়া পিছোবে নাকি? ক'দিন থাকবে দুর্যোগ?
চুলো জ্বালাবার খড়িকুটোও ফুরিয়ে এসেছে। টুকা চুলোর ভেতর তুষ ছিটিয়ে জ্বালটা ধরে রাখছিল। পায়ের শব্দে মুখ ফেরাতেই দেখল মায়মুনা তার পেছনে। ভরা শরীরের কালো মেয়ে, জোয়ান মরদের মতো চলে, চোখটাই শুধু কেমন আলো দেয়, তা কালো না আলোময়, না কেমন বলা মুশকিল।
ভিজে কাপড় নিংড়াচ্ছিল ও। টুকা মুখ বাঁকাল, তরে ডাকছে কেডা?
মায়মুনা হেসে শরীর দুলিয়ে কাছে বসতে বসতে বলল, আইলাম। না আইলে বাডনা বাইড্ডা দিত কিডা?
তখন তখনই নরম হয়ে উঠল সে।
মায়মুনা গো, বাডনা বাইড্ডা দিবি?
মায়মুনা টুকার দিকে দু'চোখ তুলে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কার লগে তোমার কাইজ্জা হুনি? ঘরে কেউ থাকলে না? তয় কারে তহন এমুন বকাঝকাডা করলা?
টুকা আরও নরম হয়ে যায়। এরকম করে তাকে জিজ্ঞেস করত কে একজন, কে না ছিল, কে না বলত, উক্কডা ভইরা দিমু? কামলাত গিয়ে কিদ্দা খাইছো?
আকাশের দিকে দেখাতে দেখাতে টুকা বুঝিয়ে দিতে চায় ঝগড়াটা কার সাথে ছিল। কিন্তু শব্দ করতে পারে না। তার বুকের ভেতরে টুকিনির জন্যে কোথায় যেন দরদ টনটন করে ওঠে। সে অস্ফুটে ডাকে, দে, বৃষ্টি দে। দে, ডুবিয়ে দে। দে বন্যা দে। বৃষ্টি বন্যা মিলে যা, আমি আর পারি না।
তামু খাইবা?
ভাই-বৌয়ের এই প্রশ্নে টুকা অবোলভাবে মাথা নাড়ে।
কী ছান রানবা?
এবার সে একটু জড়িয়ে পেঁচিয়ে যায়। মায়মুনা কুইচ্ছা দেখলে সরে যাবে। কিন্তু লুকানো ছাপানো যাবে না ব্যাপারটা। সে তবুও, এ যেন স্বীকৃত মাছ, এ সবাই খায় এরকম একটা ভাব নিয়ে বলল, কুইচ্ছা আনছি। দোপেজি করমু। পিয়াইজ লইছি। রউন লইছি। ঝালডাও দিমু।
মায়মুনা কিন্তু কিছু বলল না। আর দিনের ঘৃণাটাও দেখা গেল না মুখে। জিজ্ঞেস করল, টুকিনি খাইতনি কুইচ্ছা?
টুকিনি? টুকা মাথা নাড়ায়। আহা! সেই বছরে বর্ষা হয়েছিল, জমি তল হলো তাতে, ভিটেবাড়িতে জল, কারো কারো ঘরেও ঢুকেছে জোয়ার। মানুষজন গাছপালার ডালায় মাচান বেঁধেছে, সরকার রিলিফ দিচ্ছে গঞ্জে।
টুকাও গিয়েছিল রিলিফের আশায়। ফেরার পথে কালীতলার বটগাছের নিচে একটা মেয়েমানুষকে বসে থাকতে দেখল জড়োসড়ো। সন্ধ্যার প্রলেপ নেমেছে চারদিকে। গাছপালাও ঘোমটা-ঢাকা হয়েছে। টুকার ডরভয় চিরদিনই কম। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি মানু না গো?
জবাব নেই।
বাড়ি কই? যাইবা কোফাই গো? কইলে আগগাইয়া দিতাম।
অন্ধকারে সে ধরতে পারে না কেমন মেয়েমানুষ, বিয়ে হয়েছে কি হয়নি, ঘরপালানো বউ না বর্ষা ভিটেছাড়া করেছে, কোনটা? কিন্তু ঘোমটা-ঢাকা মেয়েমানুষটা কোনোভাবেই নড়ে না।
ক্ষেপে গেল টুকা। ওর সামনে হাঁটু ফেলে বসতে বসতে খেঁকিয়ে জানতে চাইল, আমার লগে বিয়া বইবি?
ব্যস, নড়েচড়ে উঠল মেয়েমানুষটা। হাতে ছিল কাচের চুড়ি। হাত নাড়তেই তা বেজেও উঠল।
তরাল ঘাটে এসে টুকা ভাইকে ডেকেছিল, পার কর ও, ও-ও-ও ভাইয়ে, পার কর ও...।
ডোঙ্গা নিয়ে ভাই গিয়েছিল তাকে পার করতে। তিলিছমাতি অন্ধকার। জলে, মানুষে, গাছে, মাটিতে, সব একাকার। তা-ও বুঝল, ছোট ভাই একা নয়। সাথে কেউ আছে।
ডোঙ্গায় টুকার সামনে বসল মেয়েমানুষটা। গুটিগুটি, পোঁটলার মতো অবস্থা। মৃদুমন্দ পানির ছলক কেটে কেটে ডোঙ্গা যখন পারাপারের মাঝ-পথে এলো তখন বড় ভাই একুব জিজ্ঞেস করল, লগে কেডা রে?
বউ। লইয়া আইলাম, কালীতলা বটগাছের তলায় বইয়া আছিল।
তখন একুবও বিয়ে করেনি। বড় ভাই দৌড়ে গিয়ে মোন্তার মাকে ডেকে এনেছে। ছোট ভাই কী কাণ্ড যে করল। এখন বউ বরণ তো করতে হয়।
মোন্তার মা কুপির আলোয় বউয়ের মুখ দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করেছিল, কী নাম গো? বাপের নাম কী? কোন ভিডায় ঘর?
সেই অবস্থা, কথা নেই।
টুকাও রেগে গিয়েছিল, বোবানি?
না পেরে পেরে জিজ্ঞেস করতে করতে যখন আর পারা যাচ্ছিল না, তখন মোন্তার মা বলেছিল, থাকদে রে টুকা, তর বউয়ের নাম যহোন নাই, তহোন আয় আমরা নাম দেই টুকিনি।
টুকার বউ সেই থেকে টুকিনি হয়ে গেল। মায়মুনা ভেতরের অত অত ইতিহাস জানে না। একুব তো মাস পাঁচেক আগে প্রথম বউ তালাক দিয়ে মায়মুনাকে আনল তেলচুবানির ঘানিবাড়ি থেকে।
ভাতের পাতিল ইতিমধ্যে নামিয়ে দিয়েছে মায়মুনা। বাটনা পিষছে এবার। টুকা খানিক নড়েচড়ে বসতেই তার দিকে ফিরল। বলল, আইজ নাইলে বাডনা বাডলাম, হগল দিনডাক কেডা আইয়ে? কোন দোষে বউডারে ছাড়লা অহনও বুঝলাম না কিন্তুক?
কালো শরীর মায়মুনার। ভরা যৌবনা। এই মুহূর্তে কণ্ঠও কেমন আর্দ্র মনে হয় টুকার কাছে।
মায়মুনাকে সে কী বলবে নিজের বউয়ের কথা? টুকিনি তাকে শীতকালে ওম দিয়েছে, গরমকালে চুলের বিলির ভেতর দিয়ে ঘুম দিয়েছে, বেঁধে-বেড়ে খাইয়েছে। টুকা কুইচ্ছা খেত, সে জন্য টুকিনি নাক সিঁটকাত না। একই পাতে টুকার সাথে ভাত খেয়েছে ও। কিন্তু দোষ ছিল টুকিনির। কারো বাড়িতে গিয়ে সুযোগ পেলেই, মরিচটা, পেঁয়াজটা সরাত। মালনবাড়ির মোন্তাজ এক ধর মিষ্টি আলু কিনে এনেছিল হাট থেকে। তিন ভাই ভাগাভাগি করতে গিয়ে মাপ দেবার সময় দেখে ধর মেলে না। নিল কে?
টুকিনি গিয়েছিল মোন্তার বউয়ের কাছে পান চাইতে। কাপড় ঝাড়তেই ওর কাছে আলু পাওয়া গেল।
সেই রাতে টুকা কষে মেরেছিল বউকে। ভোররাতে উঠে বাইরে যাবার সময় দেখল টুকিনি তো নেই। ওকে পাওয়া গেল না আর কোথাও। সেই সব কথা কতকালের পুরনোই না।
বাটনা বাটতে বাটতেই মায়মুনা ফিরে ফিরে দেখছিল টুকাকে। বলল, আমি কইলাম কুইচ্ছার ছান রানতাম না। মাগো, এইত্তা মাইন্নে খায়? হঁ, তোমার লাগি টুকিনিই উচিত আছিলো। অহন তোমারে বউ দিবো কেডা? কুইচ্ছা খায় মাইন্নের লগে মাইয়া দিবো কোন বাপে?
টুকা ঘরের চারদিকে দেখে। লেপ-পোছ দেয়া ঘর। মা বেঁচে থাকতে সেই যে ঘর সাজিয়ে দিয়ে গেছে_ঘরের কোণে কোণে শিকা ঝুলছে, কলস ঝুলছে, পাতিল ঝুলছে শিকায়, এর সবই মায়ের হাতের সাজানো। মায়ের খুব লেপ-পোছ দেয়া, ঘর-আঙ্গিনা ছাফ-ছোফা রাখার অভ্যাস ছিল। টুকাও মায়ের মৃত্যুর পর কোনো শিকার বাঁধ খোলেনি, কোনো শিকার কলস বা পাতিল সরায়নি। হুবহু রেখে দিয়েছে। শুধু কলস-পাতিলের চাল, সদাইপত্র বদেলেছে। মূল নড়েনি। টুকিনিও ওগুলো নাড়ায়নি। শুধু দেয়াল মেঝেতে নিত্য নিত্য লেপ-পোছ বদলেছে। এসব দেখতে দেখতে টুকা আনমনে হাসল। চুলোর ভেতর অনর্থক একগাদা তুষ ছিটিয়ে দিয়ে বলল, মায় বাইচ্চা থাকলে বউয়ের কি কাম আছিলো, ঘরডাত এত্তো হাজের লেপ-পোছ দেহছ না, হাজগোছ দেহছ না, বেবাক মায় কইরা থুইয়া গেছে। জব্বর সাইরের আছিলো আমার মায়, জব্বর সিজিলের আর সোন্দর আছিলো...। তুই দেহছ নাই, হালার নায়েবে গাইরত করলো আমাগো। কৌশল কইরা মায়েরে ছাড়ান লওয়াইলো।
মুনা এসব গল্প অনেক শুনেছে স্বামীর মুখে। শাশুড়ি ছিল সুন্দরী। শ্বশুর ছিল অকাজের লোক, কুৎসিত-দর্শন। বউকে ধরে পেটাত রোজ রোজ। প্রতিবেশী ভিড় জমাত দৃশ্য দেখতে। অবস্থা দেখে নায়েব ছাড়ান নিয়ে দিয়েছিল মেয়েলোকটার। এটা কি নায়েবের দোষ?
বাটনা বাটা শেষ করে মায়মুনা হাত ধুয়ে বলে, অহন তাইলে যাই, তোমার ভাইয়ের রান্দন বওয়ান লাগবো। জানো না কোন তাছিরের মানুষ। দেরি দেখলে আবার কুদ পাড়বো।
মায়মুনা বেরিয়ে যেতেই টুকা পাতিল টেনে নিল। চুলা জ্বালল। কুইচ্ছার ছান রাঁধবে এবার।
চুলোয় জ্বাল দিতে দিতে তার চোখ পড়ল ঘরের উত্তর কোনায় কুনো ব্যাঙটা লাফাচ্ছে দেয়ালের দিকে মুখ করে। যেন আরও উঁচুতে উঠতে চায়। সে হঠাৎ ক্ষেপে গেল। ব্যাঙটাকে সে একদিন বাইরে ফেলে এসেছিল। আবার জায়গামতো এসে বসেছে। টুকা লাঠি খুঁজল, হালার ব্যাঙ, রাহছনে, তবে পাইছি, আতুরি-লুদরি দেইহা ছাড়মু...।
কিন্তু উঠে একটা লাঠি খুঁজবার মন হলো না তার।
তিন
আকাশ ঢল ছেড়েছে মাটির পৃথিবীর দিকে। গাছপালা, ঘরবাড়ি, জলা জমি এই বৃষ্টির তোড়ে মারাত্মক জোয়ার-ভাসাই হবে যেন। টুকা শুনছিল মেঘ-গর্জন। বিদ্যুৎ চমকায় কি এক-একবার! আকাশের খ্যাপা নাচন শুরু হতেই কাছে একটা ডাল মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ল। কার না কার ঘর-দোরের চালা উড়ে কই কই যে যাবে কে জানে। মানুষজনের বিপদই দেখি।
কী করবে সে, মায়মুনাকে ডাকবে? বলবে, সাবধানে থাক মায়মুনা। ভাইয়েরে ক'। বিপদ আছে।
হঠাৎ করেই টুকা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। নিরুপায় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায় সে। ঘরের এই কোণ, ওই কোণে যায়। বান-বাতাস কি চালা উড়িয়ে নেবে? তারপর থির করে নিজেকে। চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখে, ঘরের চালার বাঁধন শক্ত আছে কি না। দড়ির বাঁধ শেষ করে দেওয়া হয়েছিল, বাঁশের পালা বদলেছিল কবে!
কিছুক্ষণের ভেতর বোল পাল্টাল আকাশ। কালো মেঘ ছুটতে ছুটতে উত্তরে গেল। মেঘ-গর্জন থামল। বিদ্যুৎ যা চমকাচ্ছিল তা-ও বড় অলস, অসহায় এখন। গাছগাছালি মৃদু বাতাস দিতে শুরু করল। সূর্য একটু তাকাবে কি? তা তাকাল না, মুখই দেখাল না। শুধু একটা ছটা এলো সূর্যের, আকাশের নীল নীল স্তর পেরিয়ে সেই ছটায় পরিষ্কার হয়ে উঠল চারদিক।
মায়মুনা ছাগলকে পাতা দেবে বলে কাঁঠালের ডাল ভাঙতে এসেছিল। ফেরার পথে টুকার ঘরের দিকে উঁকি দিতে ভুলল না। আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, কী করতাছো?
তামু খাই।
টুকা হুঁকা দেখাল।
মায়মুনা বিদ্যুতের অলস, অসহায় অবস্থার মতো একটু হাসল, কামলা যাইবা কবে?
দিনডা ভালা গেলে কওন যায় না, কাইল বিয়ানেই রওয়ানা হইয়া যামু বেহুলডাঙ্গা। কদ্দুরা বছনে মায়মুনা। কথা কই।
অইছে, আমার কাম নাই? চুপি মাইরাও আমার ঘরডা দেহ কোনো সোময়ে? ক্যান, আওয়াজ পাও নাই? তোমার ভাইয়ে কাইল রাইতে কেমুন মুঙ্গইরা পিডা করছে আমারে। আর অহন তুমি কও বইতাম? মরদ? হের কিছু করতে পারলা না কোনোদিন? কত্ত দেখলাম পুরুষ।
কেরে মারছে?
বুঝতারো না?
টুকা মুখ হাঁ করে রেখে মাথা নাড়ে।
তোমার ভাইয়েরে তয় জিগাইও।
মায়মুনা কাঁঠালের পাতা ভরা বুকের সাথে জাপটে ধরে চলে গেল।
টুকার আজ যা হচ্ছে তা যেন কখনও হয়নি। বুক উদোম হচ্ছে। লেংটি পরা টুকার মতো হয়ে যাচ্ছে টুকা। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, পেটটা ফোলা-ফাঁপা, তেল কুচকুটে কালো টুকা। কামলা খাটে বাড়ি বাড়ি, কান্দা কয়েক জমি আছে, শিমটা, কুমড়োটা ফলায়। বাঁশ ঝাড়টায় বছরে বিক্রি ওঠায় একবার। ঘর আছে, ঘর আগলাবার মানুষ নেই তার।
মায়ের কথা টুকার মনে হয়। বাবার শরীরে ছিল পাঁঠার গন্ধ। টুকা বাবার শরীর পেয়েছে। নোলক পরা, ঘোমটা ঢাকা, লাল শাড়িতে মা, পাতলা আঙুলের মা, আর কী রক্ত ছলকের ছিল যে। টুকার আদর ছিল, টুহা রে!
মায়ের কোলে মাথা রেখে টুকা ঘুম যেত। তার মামাবাড়ি আরিন্দাপুল। টেক জঙ্গলের জায়গা, আম-কাঁঠালের জায়গা, মুলি বাঁশের জায়গা। বৈশাখে টুকা আর মা যেত মামাবাড়ি। দুধে, আমে, কাঁঠালে টুকা হাপুস-হুপুস।
বেঁচে থাকতে মা কতদিন ছেলেকে টেনে নিয়েছে কোলে। মাথার চুলে হাত বুলোতে বুলোতে প্রশ্ন করে, টুহা রে, আরিন্দার পুল যাবি? ল, পলাই, তর বাপে জব্বর হুয়র। আমারে খালি পিডায়।
এখনো অদৃশ্য হতে মায়ের সে ডাক মাঝে মাঝে আসতে শোনা যায়। বাবা ছিল গঞ্জের পাটঘরের ওজনদার। মাকে বাবা মারত কেন? মা এক-একদিন টুকাকে পিঠের কাপড় তুলে দেখাত। কুচবরণ মা, রক্তের চলাচল সবখানে_ফাঁকে ফাঁকে টানা টানা লাঠির ঘা। তা হুঁকার গজের মতো কালো কালো আর কী নির্মম।
টুকার গা শিউরে ওঠে। জ্বরগ্রস্ত রোগীর মতো সে যেন প্রলাপ বকে, মাগো, ওমা। আরিন্দাপুলে কবে না জানি তোমার লগে শেষ ঘুরনডা দিলাম? তারপরে তুমিও নাই, মামারেও কি আর দেখলাম?
টুকা নুয়ে আসে। তারপর যেন কাটা মুরগির মতো, কাটা গরুর মতো স্থির চোখের হয়ে যায় সে।
সন্ধ্যা আসে আলতো পায়ে, মা যেমন বোল্লা খড়ম পায়ে শব্দ না করে ঘর থেকে ঘরে যেত_অই রকম শব্দ না করে এগোতে এগোতে সন্ধ্যাটা তার চোখ-মন ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
মা থাকলে এই হাইনজায় বাতি দিত। ঝকঝকে তেলের কুপিটা শিষ দিয়ে আলো ছড়াত।
টুকিনিও গেল। মা তো এত পিটুনি খেয়েও যেতে চায়নি। তালাক দিতে রাজি না হওয়াতে সেবারে নায়েব বাবাকে লোক লাগিয়ে খুব মার দিল। বাবার কাছ থেকে মায়ের তালাক নেয়া হলো তার কদিন পরপরই।
কবেকার না কবেকার ঘটনা। আরিন্দাপুলের পথও মনে নেই টুকার। সেই যে কবে গিয়েছিল বাগাডুলির বৈষ্ণবপাড়া, বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর গান, তারও পরে খেয়া পারাপার_তারও পর?
বড় একা জীবন তার। মা নেই। বউটাও পালিয়ে গেল। সে বিড়বিড় প্রশ্ন তোলে, মায়মুনা গো, মায়মুনা, আরিন্দার পুলডা কোফাই, কইতে পারস? ভুইলা গেছি। ভাইয়েরে জিগা দেহি। পথ ভুল করছি মোনে লাগে। হেই কবে গেছিলাম মা'র লগে।
অস্পষ্ট অন্ধকার, ব্যাঙের ডাক, বাতাসের একটু নাড়া_সব, সব কিছুর মধ্যে টুকা অবলীলায় ঢুকে যেতে যেতে শুনল কেউ যেন তাকে ডাকছে।
কেডারে? কেডা, আমারে ডাহছ কেডা?
সে উঠতে পারে না, দাঁড়াতে পারে না। আবারও সেই ডাক, টুকা কা, ও টুকা কা, যাইবা নি?
আইনুল আইছস?
আরে দেখছনি কেমুন গুঁড়ি গুঁড়ি মেঘ। লও যাই। নলখাগাড়িত বহুতগুলান দাওন পাতছি। এমুন দিনে মাছে তো লারগোর পাইছে, ধরবোও জবর। ঘরে বইয়া বইয়া কি অইবো? উঠবানি তয় একবার?
যাইতে কস?
হ। যাইবানি? গেলে কয়ডা মাছ দিতাম পারি। কুইচ্ছাডা স্বাদ অইছিলনি? গেলে হেও পাইতে পারো। মাছ গিলতে গিয়া ছিপে কুইচ্ছা আটকায় এক-দুইডা।
আইনুল রে?
কও।
তর ছিপে জাগুর ধরে না?
হঁ? রাইতে রাইতে এক-দুইডা কি না পাই আর?
পাইলে আমারে একগা দিছ। সুরা খাইতে জব্বর স্বাদ।
টুকা বলল, ঠিক, কিন্তু সে চাইছিল একটা কুইচ্ছা যদি দাওনের বড়শিতে আটকায়। আর একটা কুইচ্ছা। তাহলে সেটাও রাঁধবে সে। বৃষ্টি থাকুক। আর এদিন দেরি করে দস্তিদারের বাড়ি গেলেই-বা কী? মাস কাবারির কাজটা ছুটবে না তাতে। সে জবাব দেয়, তুই যা। আমি ঘরের হাডর ভাইঙ্গা বেশি রাইতে মেলা দিমু।
আইনুল চলে গেল। সে এখন গিয়া ছিপ-বড়শিতে আধার দেবে। টুকা সাথে গেলে কথাও শোনা হতো, মাছও তোলা হতো। নলখাগাড়ির অত বড় টেকটার চারদিকে থৈ থৈ পানি আর মাছে টাবুস-টুবুস উয়াস সবখানে।
চুলো জ্বলে। ইতিমধ্যে টুকা হুঁকা খায় দুবার। তারপর খাওয়া-দাওয়া সারল। কুপি নিভাল। ঘরের ঝাঁপ বন্ধ করে কোঁচ হাতে বাইরে বেরিয়ে আকাশ দেখল। নক্ষত্র আছে, একফালি চাঁদ আছে, তা-ও বেজায় একদিকে। ডুবে যাবে যখন তখন, নয়তো হালকা মেঘেরই ছাউনি হবে চাঁদের গায়ে।
ঝাঁপ বন্ধ করে বাইরে বেরোতেই শুনল ভাই-বৌ-এর গলা। ঝগড়া চলছে ঘরে। আজব মেয়ে। একুব যত রাগ দেখাচ্ছে তার চাইতেও বেশি মায়মুনা হি হি হাসছে, তোমার বাপ না মায়েরে ধইরা পিডাইত? পিডাইবা, আমারেনি হেই রহম ধইরা ধইরা পিডাইবা?
একুবেরও চওড়া গলা, ঘানির ঝি গে, তর কপালডাত জবর ফের দেখতাছি। আমার ভাত বুজি তর কপালে নেই। হোনস নাই, বেদপীর লাগি আগের বউ আমি তালাক দিছি। তর কপালেও আমি হেমুন দাগ দেহি।
কেরে গো, মারবানি আবারো? মার। আবার মার। তবুও তালাক দিও না। পিঠডা জব্বর কালা। মাইরের দাগ বইলেও না কালায় কালায় মিলাইতে পারমু।
একুব রাগে চিৎকার করে, ছেনিডা কই, ওই আমার ছেনিডা কই?
কিন্তু মায়মুনা তাতেও টলে না। হাসতে হাসতে বারবার গড়াগড়ি যায়।
বাড়িতে এলে ভাই আর ভাই বউয়ের এমন ধারা ঝগড়া টুকা অনেকই শুনেছে। তার চাইতে বড় আকর্ষণ তার আইনুলের কাছে। সেখানে গেলে একটা কুইচ্ছা পেতে পারে। তখন ঘরের ঝাঁপ আটকে বাইরে বেরোয়। শিমের মাচান ডাইনে ফেলে টুকা পশ্চিমে এগোয়। নায়েববাড়ির পুকুরপাড়ে পেঁৗছে দেখে নায়েবের ঘোড়া আগলা চরে বেড়াচ্ছে। টুকারে দেখে মুখ তুলে দেখল। অন্ধকারে অত ভালো করে দেখা যায় না।
ঘোড়াটা যেন আস্তে আস্তে ঘাড়ের কেশর ফোলাচ্ছিল, পা চালাচালি করছিল, যত না উঁচু এমনিতে তার চাইতেও খাড়া হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। টুকা ভয়ে ভয়ে পাশ কাটালো।
খেয়াল আছে, এক বছর দত্তবাড়ির ধানের জমি রুয়ে দিতে গিয়ে টুকা আলে বসে জিরোচ্ছিল। সেই সময়ে নায়েব ঘোড়া চড়ে কোত্থেকে তার সামনে এসে হাঁক দিয়েছিল, টুকা, সর, দেহস না ক্ষেতে পানি? ঘোড়াডারে কি ভিজতে কস?
সে গা করেনি, বসেই রয়েছে।
নায়েব হঙ্কার দেয়, সরবি? নাইলে তর উপর দিয়ে ঘোড়া ছুডামু।
মা'কে তো নায়েবই ছাড়ান দিয়ে নিল। সেই কথা মনে হতেই খুন চড়ে গেল মাথায়। ভাবল, যাবে তো যাও, ঘুরপথে যাও। টুকা উঠবে না। টুকা তোমার চাহর না, তোমার বাড়ির কামলাও না। বাবার কালে তোমার নায়েবি আছিলো, খাজনা তুলতা তুমি। দিন বদলাইছে। জমিদারি নাই অহন। খাজনা তোলে সরকার।
হারামির ছাও পথ থেনে উডবি? না ঘোড়া দাবড়ামু তর উপর দিয়া? আরে, তর বাপে যে এত্ত খারাপ হেও মান্যিগণ্যি করছে আমারে।
আর তখন চোখের পলকেই কাজটা হল, লাগাম ধরে টানতেই ঘোড়া পিছপা হল, তারপরই ছুটে এসে ঘোড়াটা টুকাকে ডিঙাল। নায়েব চেয়েছিল হাতের চাবুক দিয়ে টুকাকে এক ঘা দেয়। কিন্তু লাগেনি। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বাতাসে তা ঘা খেয়ে স্যাৎ করে দীর্ঘ একটা শব্দ উঠেছে শুধু।
কোঁচটা বাছ মতো ধরেছে সে। সুযোগ কি ঘটবে না একবার? তাহলে শালার নায়েবের কলজে বরাবর কোঁচের চবি্বশটা শলা ঢুকিয়ে দিতে পারত টুকা। হাতের রগ টনটন করছে যেন। কোঁচটা হাতে ধরাই আছে। শক্ত মুঠিতে_যেন মাছ আছে ধান জমিনের ফাঁকে ফাঁকে, ছুটছে, ছোটাচ্ছে, গাঁথতে পারে না টুকা, নাগাল পায় না। নায়েবও কি সেই রকম তার হাতের বাইরে বাইরে থেকে যাবে? এই ব্যর্থতায় তার তখন কান্না পায়। বিড়বিড় বকে, মারে তুমি ছাড়ান নিয়া দিলা নায়েব? তুমি এইডা কেমুন কাম করলা? অনাথ বানাইলা পোলা। মাইনষে মাইনষের এই রহম গাইরত করে?
একবার দাঁড়ায় টুকা, নলখাগাড়ি তো উত্তরে নয়, দক্ষিণমুখো সড়ক ধরে ধরে যেতে হয়। সে তখন ফিরল। গাবতলায় গিয়ে আস্তে আস্তে ডাকল, আইনুলরে।
তারপর মনে হল ডাকটা টুকা নিজেই শুনতে পায়নি। আইনুল বোধহয় ঘুরে ঘুুরে ছিপ থেকে মাছ খুলছে। চারদিকে মাছের কাড়াকাড়ি টাবুস-টুবুস শব্দ_উয়াস দিচ্ছে মাছ, পানির তলা ছেড়ে একদম কিনার-কানারে চলে এসেছে, পোকামাকড়, পচা-ময়লা আর নানা বর্ণের আধারের খোঁজ করতে। আইনুল যে ঘুরে ঘুরে ছিপে আধার দিচ্ছে, খুলছে, পানিতে উঠছে-নামছে, ছপছপ শব্দেই সে বুঝতে পারল। ডাকল, আইনুল, কোফাই রে তুই?
উ-উ-উ। টুকা কা, গাবতলা ছাইড়া কানিডাত আইয়ো।
আইনুলের কাছাকাছি হতে সে বলল, আইছো, খুব ভালা করছ। কইছিলাম না, জোড়া কেমুন পরছে দেখছোনি? মেঘের ডাক হুনলেও মাছের উজানি। তুমি আইতে আইতে রাশডা ভইরা ফালাইছি।
দিছছ্রে মজা মাইরা। দে তর লগে রাশডা ধরি, তুই মাছ খোয়াইয়া থো, আধারের পোডলাডা দে আমার ফাই। ল দেহি, তুই যে কস, কেমুন মাছ ঘুইরা ঘুইরা দেহি।
প্রায় প্রত্যেকটা ছিপেরই বড়শি গিলছিল মাছ_পাবদা, টেংরা, টাকি, শিং, জাগুর, গোলাইয়া বড়শি গিলে পানির ওপর খুব তড়পাচ্ছিল। কোনো কোনো দাওনের সুতাও কাটছিল মাছ। আইনুল কথা না বলে আধার গাঁথে, মাছ খোলে। কিন্তু টুকা খুঁজছিল কুইচ্ছা। একটা কুইচ্ছা কি বড়শি গিলবে না? ঘুরে যাওয়ার সাথে সাথে মাছের রাশডা ভারি হয়ে উঠছিল আস্তে আস্তে।
আইনুল রে, আমি দুইডা জাগুর নিমু।
নিওনে।
আইনুলের সোজা হবার সময় নেই। একবার দাওনের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত, আবার ও প্রান্ত সেরে এ প্রান্ত_এরকম ঘোরাঘুরি। হঠাৎ আইনুল লাফ দিয়ে কয়েক পা সরে গেল।
কী রে?
হাপ বাজছে, দোরা হাপ, দেহনি, হালারডা কেমুন প্যাচাইতাছে!
মাছ গিলেছে বড়শি! সেই মাছ গিলেছে ঢোঁড়া সাপ। ফেঁসেছে। আইনুল ছেনি তুলে সেটা কুপিয়ে টুকরো টুকরো করল, ল আহিরি খাওন খাইয়া লইছস।
মাঝরাতের অনেক আগে মাছ চলাফেরা কমাল। ভোররাতে আবার খিদে হবে, খাওয়া-দাওয়া শেষে বেলা উঠবার সাথে সাথে কিনার-কানার ছেড়ে মাছ নামবে জলায়। সেই সময়টুকুতে একটু বিশ্রাম নেবার জন্যে আইনুল হাত-মুখ ধুয়ে নিল। বলল, টুকা কা, এডডু ঘুমাইবানি? এই রাইতে মাছ বড়ি কম গিলবো। গতরডাও তো ছাড়ন লাগে কদ্দুর। লও। গাবতলায় বিছান পাথছি গো কাহা। এক লগে হুইয়া থাকি দুইজনে।
নারে, ঘরডা খালি, যাওন লাগে।
যাইবা। তাইলে লও যাই। বিড়ি তো খাইয়া যাইবা একডা।
ফেরার মুখে আইনুল জোর করেই দুটো জাগুর দিল, গোলাইয়া, পাবদা দিল টুকাকে। বলল, খাইও, কবে না কোফাই কামলা যাওগা।
নিজের খালুইয়ে মাছ ভরে নিয়ে খালুই কোঁচের কাঠিতে আটকে বাড়িমুখো হয় টুকা। গাবতলা পেরিয়ে ছনজমি। তারপর খিলান পাটজমি কয়েকটা। এখানেও বর্ষা চোয়ানো পানি উঠেছে। কবে না হাঁটু অবধি আসে কে জানে। খিলান জমির পর হাওড়া গাছ কয়েকটা, ঘাস। টুকা চমকে উঠল, ঘোড়া না, নায়েবের ঘোড়া চরে বেড়াচ্ছে?
আইনুল আছে নলখাগাড়ির শেষ মাথায়? হয়তো এতক্ষণে গাবতলায় বিছানায় গা ছেড়ে চোখ বুজেছে ছেলেটা। এদিককার কোনো খবরই জানছে না। টুকা মাছগুলো পায়ের কাছে মাটিতে খুলে রাখল দ্রুত। একটা হাওড়া গাছের ডালায় উঠে বসে কোঁচ বাগিয়ে ধরল সে। ঘোড়াটা ঘাস খাচ্ছে। দেরি না করে সে ডাকে, আয়, লারে আয় লারে আয় দেহি চান। তুই না আমার উপর দিয়ে লাফাইয়া গেছিলি হেইদিন।
ঘোড়া ঘাস খেতে খেতে নিজের নিয়মে হাওড়া গাছের কাছে আসে। দেরি না করে সবটুকু শক্তি দিয়ে টুকা ঘোড়ার পেট বরাবর কোঁচের প্রথম ঘাইটা দিল। ঘোড়া চিঁ-হিঁ-হিঁ ডেকে উঠল একবার।
কোঁচ খুলে এনে আর একবার।
টুকা গাছ থেকে যখন নামল ঘোড়াটা তখন আর দাপাচ্ছিল না।
চার
একুবের একটা লগগ্া অসুখ আছে। নাভির কাছ থেকে কাঁচির মতো কিছু একটা হেঁচড়ে হেঁচড়ে বুক পর্যন্ত ওঠে, আবার নামে। চাঁদের পূর্ণতায় অসুখটা দেখা দেয়, ফালি চাঁদের বেলায়ও। বেহুলডাঙ্গায় যাবে বলে টুকা কাপড় বেঁধেছিল গামছাতে। আর এই সময় মায়মুনা ছেনির পোঁচের মতো ধারালো চিৎকার দিল, আল্লাগো, তোমরা মানুষডারে বাঁচাও!
আজ একুবের মুখে ফেনা উঠছিল। মায়মুনা কলসির পানি হাতে তুলে তুলে একুবের তালু ভিজিয়ে দিচ্ছিল। দৌড়ে গিয়ে টুকা দুপী কবিরাজকে ডেকে আনল। এক-একবার একুব যায় যায়। মায়মুনা কাঁদতে বসে কলসির পইড্ডায় ঠেস দিয়ে।
বিকেলবেলা লোকটা একটু ভালো হল। তবে আর দিনের মতো উঠে বসল না। কাহিল হয়ে শুয়ে থাকল। এ বেলা আর বেরোব কী? টুকা নিজের ঘরের দাওয়ায় বসে শিম মাচানটার দিকে দেখে। রোদ পেয়েছে মাটি। ভেজা মাটি শুকোচ্ছে।
মায়মুনা একবার টুকার কাছে গেল। বলল, তোমার ভাইয়ের অসুখডা যাওন থামাইল দেখতাছি।
হঁ গো, নিয়ত আছিল আইজ বেহুলডাঙ্গা মেলা দিমু। পারলাম কই?
থাক। আইজ আর তোমার যাইয়া কোনো কাম নাই। রানতে যাইও না কইলাম। আমাগো চুলায় তোমার দুগগা ভাত দিমুনে। খাও-লও। হের পরে যাও।
মায়মুনা গো!
কও।
আমার উসি টালডার ফাই নজর রাহিস, কোন্ সমে না কোন্ সোমে ছাগল-গরুয়ে মুখে দেয়। নিড়েনডাও শেষ করতাম পারলাম না। যহন তহন মেঘ। মাডি যুইত দিলে না নিড়ানি দেয় মাইনষে?
টুকা যদি শিম মাচানের নিড়েনটা উঠিয়ে যেতে পারত। মায়মুনা থাকতে গরু-ছাগলে মুখ দেবে না। সেটুকু দেখশোন ভাইবউ করে। টুকা বলল, দেখবা কাইল বিয়ানে বেইল উডনের আগে আগে বেহুলডাঙ্গা মেলা আমি।
টুকা দেখে মায়মুনা যাচ্ছে। কুয়োর কাছে কলসি রাখা ছিল। এক কলসি পানি তুলল মায়মুনা।
দিনটা উঠেছিল কি, সকালবেলার সূর্যটাই ছিল গোঁয়ারের মতো। সাঁই সাঁই করে তেজ দিতে দিতে মাঝ আকাশে যে উঠল, একটু আনত হল না। দুপুরের পর নুয়ে এলো ঠিক, তবে যেন ঘুমের দিকে যাবে বলেই। রাত শেষ হয়েই আবার উঠতে হবে তেজে, পেঁৗছতে হবে মাঝ আকাশে।
শিম মাচানের আল ধরে উত্তর-পাড়ার ধনুবাড়ির গরুগুলো খেদিয়ে দিচ্ছে নতুন মাইসকা। টুকা সাবধান করে, দেহিস রে, আমার টালডাত যেমন মুখ না দেয়।
সূর্য নামে নিচের দিকে। কোনো লোক চলাচল নেই এখন। গরু-ছাগল ঘরে ফিরছে। গামলায় গরম পানি করে তাতে খুদকুঁড়ো ছেড়ে গরু-ছাগলকে পানি দেখান হবে। গোয়ালে যাবে গরু-ছাগল।
সন্ধ্যার সাথে সাথেই মানুষজন এসব সেরে ফেলে মশার ধোঁয়া দিতে বসে। টুকার সন্ধ্যাবেলাটা দারুণ দুর্বিষহ। ঘরে টিকটিকি আছে। যতক্ষণ কুপি জ্বালান থাকে, ততক্ষণ দেখা যায় টিকটিকি পোকামাকড়ের দিকে তাক হয়ে আছে। দেখে কুনো ব্যাঙটা লাফ দেয়। কোথায় উঠতে চায় ব্যাঙ? টুকিনি থাকতে এগুলো দেখতে পেত না সে। এই যে হিম হিম করে নীরবতা আস্তে আস্তে জাঁকিয়ে বসে, তা-ও হত না। একটু একটু আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে থাকে টুকা। ঘুম না, জাগরণ না। তখনই মনে হয় কে যেন ডাকে, বলে, উঁক্কা খাইবেন?
টুকিনির গলা না?
চমকে উঠে বসল টুকা। তারপর বুঝল, ভুল শোনা। ওদিক থেকে মায়মুনা ডাকছে, খাইয়া যাও।
সে কুয়োর কাছে যায়। নিমগাছের পশ্চিমে শিম মাচানের আলে কী যেন হাঁটছে-ফিরছে। সে চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দেয় ঘন ঘন। শিয়াল না তো? না মালন-বাড়ির কুত্তা? কৌতূহল ভর এগোয় খানিক। গা শিউ শিউ করে উঠল সাথে সাথে। ঘোড়ার বাচ্চা না? নায়েবের ছাড়া আর কার? ঘোড়া যে মরল, সেই খোঁজ হয়েছে কি নায়েবের? এতক্ষণে খবর কি আর না হয়? টুকা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না।
ঘোড়ার বাচ্চা এগোয়। মায়ের মতো অত উঁচু না, অত টগবগে না। টুকা মনে মনে ডাকে, আয়, আয়...।
বড় ঘোড়াকেও টুকা এভাবেই ডেকেছিল। তারপরই কোঁচটা গিয়ে গাঁথল। ঘোড়ার কি দোষ গো? বসে বসেই, পা তুকে তুকে টুকা এগোয়, আয়, আয়_তর মায়ে কই? দুধ খাবি ক্যামনে? আয়, আয়...। আমারও মা নাই রে। নায়েবে ছাড়ান লইয়া দিছে। হেয় যে কি কাম্ডা করছে, জীব অইয়া বুঝবি কেমনে?
তারপর বাচ্চাটা আটকা পড়ল টুকার গামছায়। সেটাকে টেনে টেনে সে গেল নায়েবের বাড়ির দিকে। কুঞ্জলতার গেট। পেরিয়ে বৈঠকখানা। নায়েব বসে ছিল বারান্দায়, অন্ধকারে। ঘরে বাতি জ্বলছে।
ফুল-টুল ফুটেছে বাগানে। গন্ধটা টুকার ভালো লাগে। ভাতের গরম ভাপের মতো না, তবে ওরকমই যেন কিছুটা। বা আরও সুন্দর ও মিষ্টি গন্ধই সেটা। কতকাল কতকাল পরে সে এই বাড়িতে এলো।
নায়েব হাঁকল, কেডা?
সেই আগের গলা নেই, ভেঙে এসেছে। হাঁসফাঁস করে।
টুকা বলল, আমি অ-ই। ঘোড়ার ছাওডা...। মা তো নাই। খালি ঘুরে, খালি ঘুরে হেইতে লইয়া আইসলাম।
অ। আয়! ঘোড়াডা গাঁইয়াইয়া মারছে কে দেহি? ছাওডারে লইয়া কি করি অহোন? বাইন্দা থুইলে দড়ি ছিঁড়তে চায়। ছাইড়া দিলে কই কই যায়গা। বুঝি তো মায়ের লাগি খালি পাক পারে। মা ছাড়া ছাও, কী যে করি!
টুকা সর্বান্তকরণে একবার কাঁপে। মায়ের সন্ধান তো সে-ও কম করে না। সেই জবাব কী? বুঝতেই পারে না কখন বাচ্চাটার গলায় দেয়া গামছা তার হাত ফস্কে যায়। সে বোধহয় বলতে চাইল, যাই গো! যাই!
কিন্তু পারল না।
অন্ধকারে ভেতরে ভেতরে টুকার অত কী ঘটল নায়েব তার কিছুই দেখতে পারল না। বারান্দার কাছাকাছি হল টুকা। কোত্থেকে আসে নির্দেশ_তা-ও না, তবুও ঘটতে থাকে এসব। নায়েব নিজের মনে বলে যায়, আমার গাইরতডা করল কেডা? মাইনষে মাইনষে কাইজা লাগতে পারে। হের লাগি ক ঘোড়া মারনের কী কাম, অবলা জানোয়ারডায় কী বুঝে? হেইডা কার কইলজাত গাঁই দিল, কার জমিডাত দহল দিল হুনি? ঘাস খাইতে গেছে, হেও তো আমার জমিন।
নায়েব বসে ছিল ডেকচেয়ারে। মুখ দেখা যায় না ভালো। চেয়ারের কাপড়ের সাথে মিলেমিশে আছে। কিন্তু কণ্ঠটা খুব ভেজা ভেজা। কুয়াশাতেই এ রকম ভেজে ঘাস, মাটি। তারপর নড়তে পারে না, মাথা তুলতে পারে না ঠাণ্ডায় ঠাণ্ডায়।
টুকা বারান্দার গজারীর পালা ধরে সামলে নেয় নিজেকে। একবার বাতাস এলো। পুকুর পেরিয়ে, গাছপালার শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে বাতাস এলো। কিন্তু বাতাসটায় কী জার জার! কী শীত-শীত! টুকার কাঁপুনিটা বাড়তে থাকে। মাথায় যেন কেউ চাষ দিচ্ছে, মাটিতে যুত নেই, তবুও লাঙ্গল দাবিয়ে হালের গরুকে পেটাচ্ছে চাষি। গরুও পারে না, শক্ত মুঠিতে চাষিও ধরে রাখতে পারে না লাঙ্গল। সে না চাইলেও নিজের ধরা পড়া কণ্ঠ শুনতে পেল, ঘোড়াডারে আমি অই গাঁই দিছিলাম, আমি অই,...।
নায়েব বোধহয় শোনেনি। না শুনলেই হয় ভালো। বাতাসের জার জার ছোঁয়াটা কাটে না। পুকুরের কোনায় কোনায় ব্যাঙ ডাকে, ম্যাঘ দেও, ম্যাঘ দেও। কত দেবে বৃষ্টি? বেহুলডাঙ্গা যাবে সে। আবার বৃষ্টি! একবার ব্যাঙ ডাকা বন্ধ হল। মুহূর্ত কয়েক। একটা কু-পাখি ডাকল বুক ছেদ করে।
তখনই যেন মেঘ গর্জন হল। অপরাধীকে পেয়ে চেয়ারের ভেতর থেকে ত্বরিত বেরিয়ে আসে নায়েব। ঘোড়াটাও কোথায় চিঁহি ডেকে উঠল। টুকা উৎকর্ণ থাকে_নলখাগাড়ির টেকে কোঁচের ঘাই খাওয়া সেই চিৎকার না?
পর মুহূর্তেই নায়েবের জোর লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ল মানুষটা।
ফুলের গন্ধ আছে বাগানে। মাটিতে হাঁটু গেড়ে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে টুকা। কনুইয়ে শরীরের ভর। সেটুকুও এলোমেলো হয়ে যায় হঠাৎ।
শীত আসে কোত্থেকে? এখন তো শীতের সময় না। ঠকঠক কাঁপুনিতে সে ঘোলা দেখে সব। মায় জবর ছাপ-ছোফা থাকত। ঘরডাত্ লেপ-পোছ করত। ঘরের কোনায় কুনো ব্যাঙটা আছে। বাইরে ফেলে দিয়ে এসেছিল সে। আবার ফিরে এসেছে।
টুকা উঠতে চাইল। পারল না। শুনতে চাইল। শুনল না। ফালি চাঁদ ছিল আকাশে। তা-ও কি আছে?
বস্তুত টুকা একফালি কাপড়ের লেংটি পরেই নিড়ানি হাতে বসেছিল। খাটো মানুষ, মাথার চুল যথাসম্ভব ছোট করে ছাঁটা। গোলগাল মুখ তেল চকচক করে, ফোলাফাঁপা পেট_টুকার পেট এরকমেরই থাকে, সেরেক চালের ভাত খেলেও, দু'দিন অভুক্ত থাকলেও। যদি আলো-আঁধারিতে সে কোথাও গাঁট মেরে বসে থাকে, তাহলে মানুষ বলে ঠাউর করা যায় না। ঠাউর হয়, কেউ গোবর-পচা বা কোনো আবর্জনা কোদালে কুপিয়ে, পাতিতে বয়ে এনে দু'এক পাতি ফেলে রেখেছে।
কাকগুলো এখন উড়ে যাচ্ছে গৃহস্থ বাড়ির দিকে। পাখিও এই ডাল, সেই ডাল ওড়াউড়ি করে সারারাতের থির থাকা অবস্থাটা কাটিয়ে দূরের দিকে উড়ে যাচ্ছে। টুকা বুঝতে চায় না কোনটা কাক, কোনটা ঘুঘু, বা কখন ঝাঁক ঝাঁক পেঙ্গাপেঙ্গি নামবে খিলান জমিতে। মায়মুনা হয়তো পানি নিতে এসেছিল। রোজই তো আসে। এসব দিয়ে কী হবে তার? চরাচরে যা হবার হোক, সে দুপুর দুপুর নিড়েনটা তুলতে চায়। তারপর টুকা যাবে বেহুলডাঙ্গায়। ওদিকে ফসলের মরশুম আসছে। বেহুলডাঙ্গার দস্তিদার বলেছিল ছমাসের জন্যে পাকাপাকি কথা বলতে। খাবে-দাবে, কাজ যা আছে করবে, মাস কাবারি পয়সা। তা কত ধরবে টুকা? এ অঞ্চলে আশ্বিনে কোনো কাজ থাকে না। বর্ষা সেই যে তিরতির করে বাড়তে থাকে আষাঢ় থেকে, ভাদ্রে এসে ফণা দিয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় পানির বাড়ের সাথে আমন ফসল পেরে ওঠে না। কোনো রকমে, হাইফাই করে একটু যদি তুলতে পারে মাথা তাহলে দাবায় কে? সবুজ, পাতলা ধার ধার ধাঁচের সেই ধানপাতা নতুন ধারের কাঁচির মতো উঠতেই থাকে ওপর দিকে। যদিও আমন ফলে, ফলবে গিয়ে সেই অগ্রহায়ণে। এর আগে কাটা-থোয়া নেই ধানের। জমি বর্ষাতল বলে চাষবাসও নেই। কাজও নেই তাই। অগত্যা টুকা বেহুলডাঙ্গা যাবে।
সে কাজে আরও দ্রুত হয়ে উঠেছিল। এদিকে বৃষ্টিরও নষ্ট মাথা। কখন না জানি নামবে এমনই ঢল যে, জোয়ার সেই বৃষ্টি পেয়ে কাছিমের মতো মাথা, পা বের করে ভিটেবাড়ির দিকে এগিয়ে আসবে।
পূর্ব-পশ্চিমের পালা তুলে টুকা যেই না ঘুরে পশ্চিম-পূর্বের পালা শেষ করছিল, তখন দেখল আইনুল আসছে মাছের রাশ মাথায়। কাছাকাছি হয়ে আইনুল বাঁ হাতে টুকার দিকে আধ-খাওয়া বিড়ি এগিয়ে দিল, টুকা কা, খাও। অবেইলডায় নিড়েন দেও কেরে?
অবেইল কই, ঘাস অইছে, দেহছ না, বাদাইল্লায় কেমুন জোর চাইতাছে?
তোমার যেমুন কাম! আরে, উষী অইছে জোঙ্গলা গাছ। হেমুন নিড়েনের কি আছে?
হ, তয় মার না, হেজাডা মার না, মাস কয় ধইরাই না জ্বালাইতাছে।
আসলেও, সজারুটা মাস দুই থেকে জ্বালাচ্ছে। মাচানের কুমড়ো কাটছে, ঢেঁড়শ গাছের ডগা কাটছে, কলা, বেগুন কাটছে। ইনুচ মোল্লার বাঁশঝাড়ের কড়ুল সব শুইয়ে দিয়েছে সজারুটা। এ বছরের বাঁশ কি আর পাবে ইনুচ?
টুকারও একটা বাঁশঝাড় আছে। সজারুটা এদিকে আসতেও পারে। ভাবনা হয় তার। খোদা না করে...।
পোড়া বিড়ির টুকরো অংশ নিড়েন দেওয়া মাটির নিচে ঢুকিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করে, কোফাই থাহে হেজারা?
আইনুল রেগে যায়, আমার চেডে জানে। বাঁশ খাইবো, তরহারি খাইবো, বিনাশ অইলে তোমাগো অইবো। আমার তো একখান বাগুন জমি। হেও লাট-পাট কইরা ছাড়ছে কবে। হেজা মারনের ঠেহা অইলো তোমাগো।
আইনুল ছুটতে যাচ্ছিল এরপর। কিন্তু দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, টুকা কা, কুইচ্ছা খাইবা নিহি?
টুকার ভঙ্গিটা নির্বিকার। অথচ ভেতরে উৎসাহের শিস ঠিকই বেজে যাচ্ছে। অনেক দিন হয় কুইচ্ছা দেখে না, অনেক দিন না। আইনুলের আহ্বান পেয়ে চোখের তারায় ওই রকম লাল রক্তময় কুইচ্ছা মোচড় খায়। মোচড়ের ফলে তার চোখেও রক্ত এসে যায়। তারপর লাল হয়ে যায় সব।
খাইলে যাও, কাইল দাওন পাতছিলাম নলখাড়ির টেহের উত্তর-পশ্চিমে। গাবতলার ছিপডাত দেখবা বাইজ্জা রইছে কুইচ্ছাডা, জ্যাতা, গেলে পাইবা।
আইনুল তারপর ছুটতে থাকে। এই মাছ নিয়ে সে যাবে গঞ্জের বাজারে। বেচবে। তাই তো, সময় কোথায়!
সাথে সাথেই নিড়ানি ছেড়ে টুকা উঠে দঁাঁড়িয়েছে। নলখাগাড়ির টেকে একবার যাবে সে। কুইচ্ছা মাছটা আনতে হবে। কাজে-কামে গেলে তবেই তো গৃহস্থবাড়ির পাতে মাছ পড়ে। টুকা মাচানের বাইরে আসতেই কপালে বৃষ্টির ফোঁটা লাগল। দেখতে দেখতে যে সূর্য মুখ তুলেছিল তা-ও গেল মেঘের আড়ালে। ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল সহসাই। হতচকিত টুকা গেল ঘরের দিকে। ভেজা মাথা থেকে দু'হাতে পানি কেচে এসে আকাশের দিকে বাঁ পা তুলে দেখাতে দেখাতে সে চিৎকার করে উঠল, পোংডা দেওয়া, দেহছনে, দেহছনে...।
সে এরকম বসেও আকাশকে পা দেখায়। মায়মুনা রান্নাঘরে বসে দৃশ্যটা দেখে আর স্বামীকে বলে, দেহ, দেহ তোমার ভাইয়ের কাম, দেওয়ার লগে কেমুন কাইজ্জা লাগাইছে।
একুব তা ঠিকই শোনে হয়তো। কিন্তু পর মুহূর্তে কিছু মনে থাকে না।
বৃষ্টি থাকলই। অস্থির টুকা ভিজতে ভিজতে বেরিয়ে গেল নলখাগাড়ির টেকের দিকে। ছিপটা পাতা আছে গাবতলায়। বড়শি গিলে কুইচ্ছাটা মোচড়াচ্ছে_না ছুটলেই নয়।
দুই
ভাত চড়িয়েছে টুকা। ধোঁয়া উঠছে খুব। বৃষ্টি হচ্ছে তুমুল। হাওয়া আরও খারাপ হচ্ছে। ভারী ভারী মেঘখণ্ড জেঁকে বসেছে। এই মেঘ থেকে বৃষ্টি গড়াবেই। দুর্যোগ আক্রান্ত হবেই মানুষ। নতুন চাঁদ ছিল মেঘকুড়োলি। তার মানে ঝড়-তুফান হবে, বৃষ্টি হবে, অন্ধকার হবে এরকম ভেবে টুকা যা যা জানা আছে গালাগাল, এক প্রস্থ, দুই প্রস্থ করে সেরে ফেলেছে। তারপর চুলায় আগুন চড়াবার জন্যে কাঠ গুঁজেছে। দু'মুঠো তুষ ছিটিয়ে কাটাকুটি সারছে এখন সে। দু'পায়ের ফাঁকে ফাঁকে দু'হাঁটুর প্রান্ত দিয়ে হুঁকাটা চেপে ধরে বেদম টানতে টানতে সে ছাই মাখাচ্ছিল কুইচ্ছাটায়। মরেনি মাছটা। জোর খাটাচ্ছিল। পিচ্ছিল বলে ছাইও নিতে হচ্ছিল বেশি বেশি। বড়শি থেকে ছুটিয়ে আনবার সময় মুখ থেকে সেই যে রক্ত বেরোনো শুরু হয়েছে গলা কাটবার সময় তা এখন অধিক ধারায় বইছে। বাইন মাছের মতো লম্বা, অই রকমই গড়ায়-চড়ায়, কাঁটা নেই, নরম মাছ। রঙটা জমাট রক্তের মতোই, আসলে পুরো কুইচ্ছাটাই জমাট রক্ত, চোখ দুটো বাদে। মুখটা বেলে মাছের মতো ভোঁতা। মানুষজন সাধারণত খেতে চায় না। বলে, এই সব যে খায়, তার লাগি হাপ-ব্যাঙও ফরজ।
রক্তটা দেখবে না, দেখবে না কি নরম তেলতেলে, আর স্বাদ যে সেই মাথার তালুতে গিয়ে ঠেকে?
বঁটি দিয়ে মাথা আলগা করার সময় গলগলিয়ে রক্ত এসে হাত ভেজালো, বঁটি ভেজালো, মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল ফোঁটায় ফোঁটায়। আত্মতৃপ্তিতে টুকা গালাগাল দিল, ওই হালারা ওই, খাইতে ঘিন করে, না? তরা ঘিনে মরস? এমুন লউ দেখছসনি? দেখছস...?
ভাতের বলক আসার আগে আগেই তার ধোয়ার কাজ শেষ হয়ে গেল। বাটনা নেই। মায়মুনাকে যে ডাকবে তার উপায় কী? এই বৃষ্টি ভেঙে ও আসবে কি না টুকা জানে না। হঠাৎ শূন্যতা বোধ করল সে। আর একবার তামাক সেজে বসল। দুয়াগরির ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে ভাবল, বেহুলাডাঙ্গায় যাওয়া পিছোবে নাকি? ক'দিন থাকবে দুর্যোগ?
চুলো জ্বালাবার খড়িকুটোও ফুরিয়ে এসেছে। টুকা চুলোর ভেতর তুষ ছিটিয়ে জ্বালটা ধরে রাখছিল। পায়ের শব্দে মুখ ফেরাতেই দেখল মায়মুনা তার পেছনে। ভরা শরীরের কালো মেয়ে, জোয়ান মরদের মতো চলে, চোখটাই শুধু কেমন আলো দেয়, তা কালো না আলোময়, না কেমন বলা মুশকিল।
ভিজে কাপড় নিংড়াচ্ছিল ও। টুকা মুখ বাঁকাল, তরে ডাকছে কেডা?
মায়মুনা হেসে শরীর দুলিয়ে কাছে বসতে বসতে বলল, আইলাম। না আইলে বাডনা বাইড্ডা দিত কিডা?
তখন তখনই নরম হয়ে উঠল সে।
মায়মুনা গো, বাডনা বাইড্ডা দিবি?
মায়মুনা টুকার দিকে দু'চোখ তুলে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কার লগে তোমার কাইজ্জা হুনি? ঘরে কেউ থাকলে না? তয় কারে তহন এমুন বকাঝকাডা করলা?
টুকা আরও নরম হয়ে যায়। এরকম করে তাকে জিজ্ঞেস করত কে একজন, কে না ছিল, কে না বলত, উক্কডা ভইরা দিমু? কামলাত গিয়ে কিদ্দা খাইছো?
আকাশের দিকে দেখাতে দেখাতে টুকা বুঝিয়ে দিতে চায় ঝগড়াটা কার সাথে ছিল। কিন্তু শব্দ করতে পারে না। তার বুকের ভেতরে টুকিনির জন্যে কোথায় যেন দরদ টনটন করে ওঠে। সে অস্ফুটে ডাকে, দে, বৃষ্টি দে। দে, ডুবিয়ে দে। দে বন্যা দে। বৃষ্টি বন্যা মিলে যা, আমি আর পারি না।
তামু খাইবা?
ভাই-বৌয়ের এই প্রশ্নে টুকা অবোলভাবে মাথা নাড়ে।
কী ছান রানবা?
এবার সে একটু জড়িয়ে পেঁচিয়ে যায়। মায়মুনা কুইচ্ছা দেখলে সরে যাবে। কিন্তু লুকানো ছাপানো যাবে না ব্যাপারটা। সে তবুও, এ যেন স্বীকৃত মাছ, এ সবাই খায় এরকম একটা ভাব নিয়ে বলল, কুইচ্ছা আনছি। দোপেজি করমু। পিয়াইজ লইছি। রউন লইছি। ঝালডাও দিমু।
মায়মুনা কিন্তু কিছু বলল না। আর দিনের ঘৃণাটাও দেখা গেল না মুখে। জিজ্ঞেস করল, টুকিনি খাইতনি কুইচ্ছা?
টুকিনি? টুকা মাথা নাড়ায়। আহা! সেই বছরে বর্ষা হয়েছিল, জমি তল হলো তাতে, ভিটেবাড়িতে জল, কারো কারো ঘরেও ঢুকেছে জোয়ার। মানুষজন গাছপালার ডালায় মাচান বেঁধেছে, সরকার রিলিফ দিচ্ছে গঞ্জে।
টুকাও গিয়েছিল রিলিফের আশায়। ফেরার পথে কালীতলার বটগাছের নিচে একটা মেয়েমানুষকে বসে থাকতে দেখল জড়োসড়ো। সন্ধ্যার প্রলেপ নেমেছে চারদিকে। গাছপালাও ঘোমটা-ঢাকা হয়েছে। টুকার ডরভয় চিরদিনই কম। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি মানু না গো?
জবাব নেই।
বাড়ি কই? যাইবা কোফাই গো? কইলে আগগাইয়া দিতাম।
অন্ধকারে সে ধরতে পারে না কেমন মেয়েমানুষ, বিয়ে হয়েছে কি হয়নি, ঘরপালানো বউ না বর্ষা ভিটেছাড়া করেছে, কোনটা? কিন্তু ঘোমটা-ঢাকা মেয়েমানুষটা কোনোভাবেই নড়ে না।
ক্ষেপে গেল টুকা। ওর সামনে হাঁটু ফেলে বসতে বসতে খেঁকিয়ে জানতে চাইল, আমার লগে বিয়া বইবি?
ব্যস, নড়েচড়ে উঠল মেয়েমানুষটা। হাতে ছিল কাচের চুড়ি। হাত নাড়তেই তা বেজেও উঠল।
তরাল ঘাটে এসে টুকা ভাইকে ডেকেছিল, পার কর ও, ও-ও-ও ভাইয়ে, পার কর ও...।
ডোঙ্গা নিয়ে ভাই গিয়েছিল তাকে পার করতে। তিলিছমাতি অন্ধকার। জলে, মানুষে, গাছে, মাটিতে, সব একাকার। তা-ও বুঝল, ছোট ভাই একা নয়। সাথে কেউ আছে।
ডোঙ্গায় টুকার সামনে বসল মেয়েমানুষটা। গুটিগুটি, পোঁটলার মতো অবস্থা। মৃদুমন্দ পানির ছলক কেটে কেটে ডোঙ্গা যখন পারাপারের মাঝ-পথে এলো তখন বড় ভাই একুব জিজ্ঞেস করল, লগে কেডা রে?
বউ। লইয়া আইলাম, কালীতলা বটগাছের তলায় বইয়া আছিল।
তখন একুবও বিয়ে করেনি। বড় ভাই দৌড়ে গিয়ে মোন্তার মাকে ডেকে এনেছে। ছোট ভাই কী কাণ্ড যে করল। এখন বউ বরণ তো করতে হয়।
মোন্তার মা কুপির আলোয় বউয়ের মুখ দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করেছিল, কী নাম গো? বাপের নাম কী? কোন ভিডায় ঘর?
সেই অবস্থা, কথা নেই।
টুকাও রেগে গিয়েছিল, বোবানি?
না পেরে পেরে জিজ্ঞেস করতে করতে যখন আর পারা যাচ্ছিল না, তখন মোন্তার মা বলেছিল, থাকদে রে টুকা, তর বউয়ের নাম যহোন নাই, তহোন আয় আমরা নাম দেই টুকিনি।
টুকার বউ সেই থেকে টুকিনি হয়ে গেল। মায়মুনা ভেতরের অত অত ইতিহাস জানে না। একুব তো মাস পাঁচেক আগে প্রথম বউ তালাক দিয়ে মায়মুনাকে আনল তেলচুবানির ঘানিবাড়ি থেকে।
ভাতের পাতিল ইতিমধ্যে নামিয়ে দিয়েছে মায়মুনা। বাটনা পিষছে এবার। টুকা খানিক নড়েচড়ে বসতেই তার দিকে ফিরল। বলল, আইজ নাইলে বাডনা বাডলাম, হগল দিনডাক কেডা আইয়ে? কোন দোষে বউডারে ছাড়লা অহনও বুঝলাম না কিন্তুক?
কালো শরীর মায়মুনার। ভরা যৌবনা। এই মুহূর্তে কণ্ঠও কেমন আর্দ্র মনে হয় টুকার কাছে।
মায়মুনাকে সে কী বলবে নিজের বউয়ের কথা? টুকিনি তাকে শীতকালে ওম দিয়েছে, গরমকালে চুলের বিলির ভেতর দিয়ে ঘুম দিয়েছে, বেঁধে-বেড়ে খাইয়েছে। টুকা কুইচ্ছা খেত, সে জন্য টুকিনি নাক সিঁটকাত না। একই পাতে টুকার সাথে ভাত খেয়েছে ও। কিন্তু দোষ ছিল টুকিনির। কারো বাড়িতে গিয়ে সুযোগ পেলেই, মরিচটা, পেঁয়াজটা সরাত। মালনবাড়ির মোন্তাজ এক ধর মিষ্টি আলু কিনে এনেছিল হাট থেকে। তিন ভাই ভাগাভাগি করতে গিয়ে মাপ দেবার সময় দেখে ধর মেলে না। নিল কে?
টুকিনি গিয়েছিল মোন্তার বউয়ের কাছে পান চাইতে। কাপড় ঝাড়তেই ওর কাছে আলু পাওয়া গেল।
সেই রাতে টুকা কষে মেরেছিল বউকে। ভোররাতে উঠে বাইরে যাবার সময় দেখল টুকিনি তো নেই। ওকে পাওয়া গেল না আর কোথাও। সেই সব কথা কতকালের পুরনোই না।
বাটনা বাটতে বাটতেই মায়মুনা ফিরে ফিরে দেখছিল টুকাকে। বলল, আমি কইলাম কুইচ্ছার ছান রানতাম না। মাগো, এইত্তা মাইন্নে খায়? হঁ, তোমার লাগি টুকিনিই উচিত আছিলো। অহন তোমারে বউ দিবো কেডা? কুইচ্ছা খায় মাইন্নের লগে মাইয়া দিবো কোন বাপে?
টুকা ঘরের চারদিকে দেখে। লেপ-পোছ দেয়া ঘর। মা বেঁচে থাকতে সেই যে ঘর সাজিয়ে দিয়ে গেছে_ঘরের কোণে কোণে শিকা ঝুলছে, কলস ঝুলছে, পাতিল ঝুলছে শিকায়, এর সবই মায়ের হাতের সাজানো। মায়ের খুব লেপ-পোছ দেয়া, ঘর-আঙ্গিনা ছাফ-ছোফা রাখার অভ্যাস ছিল। টুকাও মায়ের মৃত্যুর পর কোনো শিকার বাঁধ খোলেনি, কোনো শিকার কলস বা পাতিল সরায়নি। হুবহু রেখে দিয়েছে। শুধু কলস-পাতিলের চাল, সদাইপত্র বদেলেছে। মূল নড়েনি। টুকিনিও ওগুলো নাড়ায়নি। শুধু দেয়াল মেঝেতে নিত্য নিত্য লেপ-পোছ বদলেছে। এসব দেখতে দেখতে টুকা আনমনে হাসল। চুলোর ভেতর অনর্থক একগাদা তুষ ছিটিয়ে দিয়ে বলল, মায় বাইচ্চা থাকলে বউয়ের কি কাম আছিলো, ঘরডাত এত্তো হাজের লেপ-পোছ দেহছ না, হাজগোছ দেহছ না, বেবাক মায় কইরা থুইয়া গেছে। জব্বর সাইরের আছিলো আমার মায়, জব্বর সিজিলের আর সোন্দর আছিলো...। তুই দেহছ নাই, হালার নায়েবে গাইরত করলো আমাগো। কৌশল কইরা মায়েরে ছাড়ান লওয়াইলো।
মুনা এসব গল্প অনেক শুনেছে স্বামীর মুখে। শাশুড়ি ছিল সুন্দরী। শ্বশুর ছিল অকাজের লোক, কুৎসিত-দর্শন। বউকে ধরে পেটাত রোজ রোজ। প্রতিবেশী ভিড় জমাত দৃশ্য দেখতে। অবস্থা দেখে নায়েব ছাড়ান নিয়ে দিয়েছিল মেয়েলোকটার। এটা কি নায়েবের দোষ?
বাটনা বাটা শেষ করে মায়মুনা হাত ধুয়ে বলে, অহন তাইলে যাই, তোমার ভাইয়ের রান্দন বওয়ান লাগবো। জানো না কোন তাছিরের মানুষ। দেরি দেখলে আবার কুদ পাড়বো।
মায়মুনা বেরিয়ে যেতেই টুকা পাতিল টেনে নিল। চুলা জ্বালল। কুইচ্ছার ছান রাঁধবে এবার।
চুলোয় জ্বাল দিতে দিতে তার চোখ পড়ল ঘরের উত্তর কোনায় কুনো ব্যাঙটা লাফাচ্ছে দেয়ালের দিকে মুখ করে। যেন আরও উঁচুতে উঠতে চায়। সে হঠাৎ ক্ষেপে গেল। ব্যাঙটাকে সে একদিন বাইরে ফেলে এসেছিল। আবার জায়গামতো এসে বসেছে। টুকা লাঠি খুঁজল, হালার ব্যাঙ, রাহছনে, তবে পাইছি, আতুরি-লুদরি দেইহা ছাড়মু...।
কিন্তু উঠে একটা লাঠি খুঁজবার মন হলো না তার।
তিন
আকাশ ঢল ছেড়েছে মাটির পৃথিবীর দিকে। গাছপালা, ঘরবাড়ি, জলা জমি এই বৃষ্টির তোড়ে মারাত্মক জোয়ার-ভাসাই হবে যেন। টুকা শুনছিল মেঘ-গর্জন। বিদ্যুৎ চমকায় কি এক-একবার! আকাশের খ্যাপা নাচন শুরু হতেই কাছে একটা ডাল মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ল। কার না কার ঘর-দোরের চালা উড়ে কই কই যে যাবে কে জানে। মানুষজনের বিপদই দেখি।
কী করবে সে, মায়মুনাকে ডাকবে? বলবে, সাবধানে থাক মায়মুনা। ভাইয়েরে ক'। বিপদ আছে।
হঠাৎ করেই টুকা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। নিরুপায় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায় সে। ঘরের এই কোণ, ওই কোণে যায়। বান-বাতাস কি চালা উড়িয়ে নেবে? তারপর থির করে নিজেকে। চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখে, ঘরের চালার বাঁধন শক্ত আছে কি না। দড়ির বাঁধ শেষ করে দেওয়া হয়েছিল, বাঁশের পালা বদলেছিল কবে!
কিছুক্ষণের ভেতর বোল পাল্টাল আকাশ। কালো মেঘ ছুটতে ছুটতে উত্তরে গেল। মেঘ-গর্জন থামল। বিদ্যুৎ যা চমকাচ্ছিল তা-ও বড় অলস, অসহায় এখন। গাছগাছালি মৃদু বাতাস দিতে শুরু করল। সূর্য একটু তাকাবে কি? তা তাকাল না, মুখই দেখাল না। শুধু একটা ছটা এলো সূর্যের, আকাশের নীল নীল স্তর পেরিয়ে সেই ছটায় পরিষ্কার হয়ে উঠল চারদিক।
মায়মুনা ছাগলকে পাতা দেবে বলে কাঁঠালের ডাল ভাঙতে এসেছিল। ফেরার পথে টুকার ঘরের দিকে উঁকি দিতে ভুলল না। আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, কী করতাছো?
তামু খাই।
টুকা হুঁকা দেখাল।
মায়মুনা বিদ্যুতের অলস, অসহায় অবস্থার মতো একটু হাসল, কামলা যাইবা কবে?
দিনডা ভালা গেলে কওন যায় না, কাইল বিয়ানেই রওয়ানা হইয়া যামু বেহুলডাঙ্গা। কদ্দুরা বছনে মায়মুনা। কথা কই।
অইছে, আমার কাম নাই? চুপি মাইরাও আমার ঘরডা দেহ কোনো সোময়ে? ক্যান, আওয়াজ পাও নাই? তোমার ভাইয়ে কাইল রাইতে কেমুন মুঙ্গইরা পিডা করছে আমারে। আর অহন তুমি কও বইতাম? মরদ? হের কিছু করতে পারলা না কোনোদিন? কত্ত দেখলাম পুরুষ।
কেরে মারছে?
বুঝতারো না?
টুকা মুখ হাঁ করে রেখে মাথা নাড়ে।
তোমার ভাইয়েরে তয় জিগাইও।
মায়মুনা কাঁঠালের পাতা ভরা বুকের সাথে জাপটে ধরে চলে গেল।
টুকার আজ যা হচ্ছে তা যেন কখনও হয়নি। বুক উদোম হচ্ছে। লেংটি পরা টুকার মতো হয়ে যাচ্ছে টুকা। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, পেটটা ফোলা-ফাঁপা, তেল কুচকুটে কালো টুকা। কামলা খাটে বাড়ি বাড়ি, কান্দা কয়েক জমি আছে, শিমটা, কুমড়োটা ফলায়। বাঁশ ঝাড়টায় বছরে বিক্রি ওঠায় একবার। ঘর আছে, ঘর আগলাবার মানুষ নেই তার।
মায়ের কথা টুকার মনে হয়। বাবার শরীরে ছিল পাঁঠার গন্ধ। টুকা বাবার শরীর পেয়েছে। নোলক পরা, ঘোমটা ঢাকা, লাল শাড়িতে মা, পাতলা আঙুলের মা, আর কী রক্ত ছলকের ছিল যে। টুকার আদর ছিল, টুহা রে!
মায়ের কোলে মাথা রেখে টুকা ঘুম যেত। তার মামাবাড়ি আরিন্দাপুল। টেক জঙ্গলের জায়গা, আম-কাঁঠালের জায়গা, মুলি বাঁশের জায়গা। বৈশাখে টুকা আর মা যেত মামাবাড়ি। দুধে, আমে, কাঁঠালে টুকা হাপুস-হুপুস।
বেঁচে থাকতে মা কতদিন ছেলেকে টেনে নিয়েছে কোলে। মাথার চুলে হাত বুলোতে বুলোতে প্রশ্ন করে, টুহা রে, আরিন্দার পুল যাবি? ল, পলাই, তর বাপে জব্বর হুয়র। আমারে খালি পিডায়।
এখনো অদৃশ্য হতে মায়ের সে ডাক মাঝে মাঝে আসতে শোনা যায়। বাবা ছিল গঞ্জের পাটঘরের ওজনদার। মাকে বাবা মারত কেন? মা এক-একদিন টুকাকে পিঠের কাপড় তুলে দেখাত। কুচবরণ মা, রক্তের চলাচল সবখানে_ফাঁকে ফাঁকে টানা টানা লাঠির ঘা। তা হুঁকার গজের মতো কালো কালো আর কী নির্মম।
টুকার গা শিউরে ওঠে। জ্বরগ্রস্ত রোগীর মতো সে যেন প্রলাপ বকে, মাগো, ওমা। আরিন্দাপুলে কবে না জানি তোমার লগে শেষ ঘুরনডা দিলাম? তারপরে তুমিও নাই, মামারেও কি আর দেখলাম?
টুকা নুয়ে আসে। তারপর যেন কাটা মুরগির মতো, কাটা গরুর মতো স্থির চোখের হয়ে যায় সে।
সন্ধ্যা আসে আলতো পায়ে, মা যেমন বোল্লা খড়ম পায়ে শব্দ না করে ঘর থেকে ঘরে যেত_অই রকম শব্দ না করে এগোতে এগোতে সন্ধ্যাটা তার চোখ-মন ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
মা থাকলে এই হাইনজায় বাতি দিত। ঝকঝকে তেলের কুপিটা শিষ দিয়ে আলো ছড়াত।
টুকিনিও গেল। মা তো এত পিটুনি খেয়েও যেতে চায়নি। তালাক দিতে রাজি না হওয়াতে সেবারে নায়েব বাবাকে লোক লাগিয়ে খুব মার দিল। বাবার কাছ থেকে মায়ের তালাক নেয়া হলো তার কদিন পরপরই।
কবেকার না কবেকার ঘটনা। আরিন্দাপুলের পথও মনে নেই টুকার। সেই যে কবে গিয়েছিল বাগাডুলির বৈষ্ণবপাড়া, বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর গান, তারও পরে খেয়া পারাপার_তারও পর?
বড় একা জীবন তার। মা নেই। বউটাও পালিয়ে গেল। সে বিড়বিড় প্রশ্ন তোলে, মায়মুনা গো, মায়মুনা, আরিন্দার পুলডা কোফাই, কইতে পারস? ভুইলা গেছি। ভাইয়েরে জিগা দেহি। পথ ভুল করছি মোনে লাগে। হেই কবে গেছিলাম মা'র লগে।
অস্পষ্ট অন্ধকার, ব্যাঙের ডাক, বাতাসের একটু নাড়া_সব, সব কিছুর মধ্যে টুকা অবলীলায় ঢুকে যেতে যেতে শুনল কেউ যেন তাকে ডাকছে।
কেডারে? কেডা, আমারে ডাহছ কেডা?
সে উঠতে পারে না, দাঁড়াতে পারে না। আবারও সেই ডাক, টুকা কা, ও টুকা কা, যাইবা নি?
আইনুল আইছস?
আরে দেখছনি কেমুন গুঁড়ি গুঁড়ি মেঘ। লও যাই। নলখাগাড়িত বহুতগুলান দাওন পাতছি। এমুন দিনে মাছে তো লারগোর পাইছে, ধরবোও জবর। ঘরে বইয়া বইয়া কি অইবো? উঠবানি তয় একবার?
যাইতে কস?
হ। যাইবানি? গেলে কয়ডা মাছ দিতাম পারি। কুইচ্ছাডা স্বাদ অইছিলনি? গেলে হেও পাইতে পারো। মাছ গিলতে গিয়া ছিপে কুইচ্ছা আটকায় এক-দুইডা।
আইনুল রে?
কও।
তর ছিপে জাগুর ধরে না?
হঁ? রাইতে রাইতে এক-দুইডা কি না পাই আর?
পাইলে আমারে একগা দিছ। সুরা খাইতে জব্বর স্বাদ।
টুকা বলল, ঠিক, কিন্তু সে চাইছিল একটা কুইচ্ছা যদি দাওনের বড়শিতে আটকায়। আর একটা কুইচ্ছা। তাহলে সেটাও রাঁধবে সে। বৃষ্টি থাকুক। আর এদিন দেরি করে দস্তিদারের বাড়ি গেলেই-বা কী? মাস কাবারির কাজটা ছুটবে না তাতে। সে জবাব দেয়, তুই যা। আমি ঘরের হাডর ভাইঙ্গা বেশি রাইতে মেলা দিমু।
আইনুল চলে গেল। সে এখন গিয়া ছিপ-বড়শিতে আধার দেবে। টুকা সাথে গেলে কথাও শোনা হতো, মাছও তোলা হতো। নলখাগাড়ির অত বড় টেকটার চারদিকে থৈ থৈ পানি আর মাছে টাবুস-টুবুস উয়াস সবখানে।
চুলো জ্বলে। ইতিমধ্যে টুকা হুঁকা খায় দুবার। তারপর খাওয়া-দাওয়া সারল। কুপি নিভাল। ঘরের ঝাঁপ বন্ধ করে কোঁচ হাতে বাইরে বেরিয়ে আকাশ দেখল। নক্ষত্র আছে, একফালি চাঁদ আছে, তা-ও বেজায় একদিকে। ডুবে যাবে যখন তখন, নয়তো হালকা মেঘেরই ছাউনি হবে চাঁদের গায়ে।
ঝাঁপ বন্ধ করে বাইরে বেরোতেই শুনল ভাই-বৌ-এর গলা। ঝগড়া চলছে ঘরে। আজব মেয়ে। একুব যত রাগ দেখাচ্ছে তার চাইতেও বেশি মায়মুনা হি হি হাসছে, তোমার বাপ না মায়েরে ধইরা পিডাইত? পিডাইবা, আমারেনি হেই রহম ধইরা ধইরা পিডাইবা?
একুবেরও চওড়া গলা, ঘানির ঝি গে, তর কপালডাত জবর ফের দেখতাছি। আমার ভাত বুজি তর কপালে নেই। হোনস নাই, বেদপীর লাগি আগের বউ আমি তালাক দিছি। তর কপালেও আমি হেমুন দাগ দেহি।
কেরে গো, মারবানি আবারো? মার। আবার মার। তবুও তালাক দিও না। পিঠডা জব্বর কালা। মাইরের দাগ বইলেও না কালায় কালায় মিলাইতে পারমু।
একুব রাগে চিৎকার করে, ছেনিডা কই, ওই আমার ছেনিডা কই?
কিন্তু মায়মুনা তাতেও টলে না। হাসতে হাসতে বারবার গড়াগড়ি যায়।
বাড়িতে এলে ভাই আর ভাই বউয়ের এমন ধারা ঝগড়া টুকা অনেকই শুনেছে। তার চাইতে বড় আকর্ষণ তার আইনুলের কাছে। সেখানে গেলে একটা কুইচ্ছা পেতে পারে। তখন ঘরের ঝাঁপ আটকে বাইরে বেরোয়। শিমের মাচান ডাইনে ফেলে টুকা পশ্চিমে এগোয়। নায়েববাড়ির পুকুরপাড়ে পেঁৗছে দেখে নায়েবের ঘোড়া আগলা চরে বেড়াচ্ছে। টুকারে দেখে মুখ তুলে দেখল। অন্ধকারে অত ভালো করে দেখা যায় না।
ঘোড়াটা যেন আস্তে আস্তে ঘাড়ের কেশর ফোলাচ্ছিল, পা চালাচালি করছিল, যত না উঁচু এমনিতে তার চাইতেও খাড়া হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। টুকা ভয়ে ভয়ে পাশ কাটালো।
খেয়াল আছে, এক বছর দত্তবাড়ির ধানের জমি রুয়ে দিতে গিয়ে টুকা আলে বসে জিরোচ্ছিল। সেই সময়ে নায়েব ঘোড়া চড়ে কোত্থেকে তার সামনে এসে হাঁক দিয়েছিল, টুকা, সর, দেহস না ক্ষেতে পানি? ঘোড়াডারে কি ভিজতে কস?
সে গা করেনি, বসেই রয়েছে।
নায়েব হঙ্কার দেয়, সরবি? নাইলে তর উপর দিয়ে ঘোড়া ছুডামু।
মা'কে তো নায়েবই ছাড়ান দিয়ে নিল। সেই কথা মনে হতেই খুন চড়ে গেল মাথায়। ভাবল, যাবে তো যাও, ঘুরপথে যাও। টুকা উঠবে না। টুকা তোমার চাহর না, তোমার বাড়ির কামলাও না। বাবার কালে তোমার নায়েবি আছিলো, খাজনা তুলতা তুমি। দিন বদলাইছে। জমিদারি নাই অহন। খাজনা তোলে সরকার।
হারামির ছাও পথ থেনে উডবি? না ঘোড়া দাবড়ামু তর উপর দিয়া? আরে, তর বাপে যে এত্ত খারাপ হেও মান্যিগণ্যি করছে আমারে।
আর তখন চোখের পলকেই কাজটা হল, লাগাম ধরে টানতেই ঘোড়া পিছপা হল, তারপরই ছুটে এসে ঘোড়াটা টুকাকে ডিঙাল। নায়েব চেয়েছিল হাতের চাবুক দিয়ে টুকাকে এক ঘা দেয়। কিন্তু লাগেনি। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বাতাসে তা ঘা খেয়ে স্যাৎ করে দীর্ঘ একটা শব্দ উঠেছে শুধু।
কোঁচটা বাছ মতো ধরেছে সে। সুযোগ কি ঘটবে না একবার? তাহলে শালার নায়েবের কলজে বরাবর কোঁচের চবি্বশটা শলা ঢুকিয়ে দিতে পারত টুকা। হাতের রগ টনটন করছে যেন। কোঁচটা হাতে ধরাই আছে। শক্ত মুঠিতে_যেন মাছ আছে ধান জমিনের ফাঁকে ফাঁকে, ছুটছে, ছোটাচ্ছে, গাঁথতে পারে না টুকা, নাগাল পায় না। নায়েবও কি সেই রকম তার হাতের বাইরে বাইরে থেকে যাবে? এই ব্যর্থতায় তার তখন কান্না পায়। বিড়বিড় বকে, মারে তুমি ছাড়ান নিয়া দিলা নায়েব? তুমি এইডা কেমুন কাম করলা? অনাথ বানাইলা পোলা। মাইনষে মাইনষের এই রহম গাইরত করে?
একবার দাঁড়ায় টুকা, নলখাগাড়ি তো উত্তরে নয়, দক্ষিণমুখো সড়ক ধরে ধরে যেতে হয়। সে তখন ফিরল। গাবতলায় গিয়ে আস্তে আস্তে ডাকল, আইনুলরে।
তারপর মনে হল ডাকটা টুকা নিজেই শুনতে পায়নি। আইনুল বোধহয় ঘুরে ঘুুরে ছিপ থেকে মাছ খুলছে। চারদিকে মাছের কাড়াকাড়ি টাবুস-টুবুস শব্দ_উয়াস দিচ্ছে মাছ, পানির তলা ছেড়ে একদম কিনার-কানারে চলে এসেছে, পোকামাকড়, পচা-ময়লা আর নানা বর্ণের আধারের খোঁজ করতে। আইনুল যে ঘুরে ঘুরে ছিপে আধার দিচ্ছে, খুলছে, পানিতে উঠছে-নামছে, ছপছপ শব্দেই সে বুঝতে পারল। ডাকল, আইনুল, কোফাই রে তুই?
উ-উ-উ। টুকা কা, গাবতলা ছাইড়া কানিডাত আইয়ো।
আইনুলের কাছাকাছি হতে সে বলল, আইছো, খুব ভালা করছ। কইছিলাম না, জোড়া কেমুন পরছে দেখছোনি? মেঘের ডাক হুনলেও মাছের উজানি। তুমি আইতে আইতে রাশডা ভইরা ফালাইছি।
দিছছ্রে মজা মাইরা। দে তর লগে রাশডা ধরি, তুই মাছ খোয়াইয়া থো, আধারের পোডলাডা দে আমার ফাই। ল দেহি, তুই যে কস, কেমুন মাছ ঘুইরা ঘুইরা দেহি।
প্রায় প্রত্যেকটা ছিপেরই বড়শি গিলছিল মাছ_পাবদা, টেংরা, টাকি, শিং, জাগুর, গোলাইয়া বড়শি গিলে পানির ওপর খুব তড়পাচ্ছিল। কোনো কোনো দাওনের সুতাও কাটছিল মাছ। আইনুল কথা না বলে আধার গাঁথে, মাছ খোলে। কিন্তু টুকা খুঁজছিল কুইচ্ছা। একটা কুইচ্ছা কি বড়শি গিলবে না? ঘুরে যাওয়ার সাথে সাথে মাছের রাশডা ভারি হয়ে উঠছিল আস্তে আস্তে।
আইনুল রে, আমি দুইডা জাগুর নিমু।
নিওনে।
আইনুলের সোজা হবার সময় নেই। একবার দাওনের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত, আবার ও প্রান্ত সেরে এ প্রান্ত_এরকম ঘোরাঘুরি। হঠাৎ আইনুল লাফ দিয়ে কয়েক পা সরে গেল।
কী রে?
হাপ বাজছে, দোরা হাপ, দেহনি, হালারডা কেমুন প্যাচাইতাছে!
মাছ গিলেছে বড়শি! সেই মাছ গিলেছে ঢোঁড়া সাপ। ফেঁসেছে। আইনুল ছেনি তুলে সেটা কুপিয়ে টুকরো টুকরো করল, ল আহিরি খাওন খাইয়া লইছস।
মাঝরাতের অনেক আগে মাছ চলাফেরা কমাল। ভোররাতে আবার খিদে হবে, খাওয়া-দাওয়া শেষে বেলা উঠবার সাথে সাথে কিনার-কানার ছেড়ে মাছ নামবে জলায়। সেই সময়টুকুতে একটু বিশ্রাম নেবার জন্যে আইনুল হাত-মুখ ধুয়ে নিল। বলল, টুকা কা, এডডু ঘুমাইবানি? এই রাইতে মাছ বড়ি কম গিলবো। গতরডাও তো ছাড়ন লাগে কদ্দুর। লও। গাবতলায় বিছান পাথছি গো কাহা। এক লগে হুইয়া থাকি দুইজনে।
নারে, ঘরডা খালি, যাওন লাগে।
যাইবা। তাইলে লও যাই। বিড়ি তো খাইয়া যাইবা একডা।
ফেরার মুখে আইনুল জোর করেই দুটো জাগুর দিল, গোলাইয়া, পাবদা দিল টুকাকে। বলল, খাইও, কবে না কোফাই কামলা যাওগা।
নিজের খালুইয়ে মাছ ভরে নিয়ে খালুই কোঁচের কাঠিতে আটকে বাড়িমুখো হয় টুকা। গাবতলা পেরিয়ে ছনজমি। তারপর খিলান পাটজমি কয়েকটা। এখানেও বর্ষা চোয়ানো পানি উঠেছে। কবে না হাঁটু অবধি আসে কে জানে। খিলান জমির পর হাওড়া গাছ কয়েকটা, ঘাস। টুকা চমকে উঠল, ঘোড়া না, নায়েবের ঘোড়া চরে বেড়াচ্ছে?
আইনুল আছে নলখাগাড়ির শেষ মাথায়? হয়তো এতক্ষণে গাবতলায় বিছানায় গা ছেড়ে চোখ বুজেছে ছেলেটা। এদিককার কোনো খবরই জানছে না। টুকা মাছগুলো পায়ের কাছে মাটিতে খুলে রাখল দ্রুত। একটা হাওড়া গাছের ডালায় উঠে বসে কোঁচ বাগিয়ে ধরল সে। ঘোড়াটা ঘাস খাচ্ছে। দেরি না করে সে ডাকে, আয়, লারে আয় লারে আয় দেহি চান। তুই না আমার উপর দিয়ে লাফাইয়া গেছিলি হেইদিন।
ঘোড়া ঘাস খেতে খেতে নিজের নিয়মে হাওড়া গাছের কাছে আসে। দেরি না করে সবটুকু শক্তি দিয়ে টুকা ঘোড়ার পেট বরাবর কোঁচের প্রথম ঘাইটা দিল। ঘোড়া চিঁ-হিঁ-হিঁ ডেকে উঠল একবার।
কোঁচ খুলে এনে আর একবার।
টুকা গাছ থেকে যখন নামল ঘোড়াটা তখন আর দাপাচ্ছিল না।
চার
একুবের একটা লগগ্া অসুখ আছে। নাভির কাছ থেকে কাঁচির মতো কিছু একটা হেঁচড়ে হেঁচড়ে বুক পর্যন্ত ওঠে, আবার নামে। চাঁদের পূর্ণতায় অসুখটা দেখা দেয়, ফালি চাঁদের বেলায়ও। বেহুলডাঙ্গায় যাবে বলে টুকা কাপড় বেঁধেছিল গামছাতে। আর এই সময় মায়মুনা ছেনির পোঁচের মতো ধারালো চিৎকার দিল, আল্লাগো, তোমরা মানুষডারে বাঁচাও!
আজ একুবের মুখে ফেনা উঠছিল। মায়মুনা কলসির পানি হাতে তুলে তুলে একুবের তালু ভিজিয়ে দিচ্ছিল। দৌড়ে গিয়ে টুকা দুপী কবিরাজকে ডেকে আনল। এক-একবার একুব যায় যায়। মায়মুনা কাঁদতে বসে কলসির পইড্ডায় ঠেস দিয়ে।
বিকেলবেলা লোকটা একটু ভালো হল। তবে আর দিনের মতো উঠে বসল না। কাহিল হয়ে শুয়ে থাকল। এ বেলা আর বেরোব কী? টুকা নিজের ঘরের দাওয়ায় বসে শিম মাচানটার দিকে দেখে। রোদ পেয়েছে মাটি। ভেজা মাটি শুকোচ্ছে।
মায়মুনা একবার টুকার কাছে গেল। বলল, তোমার ভাইয়ের অসুখডা যাওন থামাইল দেখতাছি।
হঁ গো, নিয়ত আছিল আইজ বেহুলডাঙ্গা মেলা দিমু। পারলাম কই?
থাক। আইজ আর তোমার যাইয়া কোনো কাম নাই। রানতে যাইও না কইলাম। আমাগো চুলায় তোমার দুগগা ভাত দিমুনে। খাও-লও। হের পরে যাও।
মায়মুনা গো!
কও।
আমার উসি টালডার ফাই নজর রাহিস, কোন্ সমে না কোন্ সোমে ছাগল-গরুয়ে মুখে দেয়। নিড়েনডাও শেষ করতাম পারলাম না। যহন তহন মেঘ। মাডি যুইত দিলে না নিড়ানি দেয় মাইনষে?
টুকা যদি শিম মাচানের নিড়েনটা উঠিয়ে যেতে পারত। মায়মুনা থাকতে গরু-ছাগলে মুখ দেবে না। সেটুকু দেখশোন ভাইবউ করে। টুকা বলল, দেখবা কাইল বিয়ানে বেইল উডনের আগে আগে বেহুলডাঙ্গা মেলা আমি।
টুকা দেখে মায়মুনা যাচ্ছে। কুয়োর কাছে কলসি রাখা ছিল। এক কলসি পানি তুলল মায়মুনা।
দিনটা উঠেছিল কি, সকালবেলার সূর্যটাই ছিল গোঁয়ারের মতো। সাঁই সাঁই করে তেজ দিতে দিতে মাঝ আকাশে যে উঠল, একটু আনত হল না। দুপুরের পর নুয়ে এলো ঠিক, তবে যেন ঘুমের দিকে যাবে বলেই। রাত শেষ হয়েই আবার উঠতে হবে তেজে, পেঁৗছতে হবে মাঝ আকাশে।
শিম মাচানের আল ধরে উত্তর-পাড়ার ধনুবাড়ির গরুগুলো খেদিয়ে দিচ্ছে নতুন মাইসকা। টুকা সাবধান করে, দেহিস রে, আমার টালডাত যেমন মুখ না দেয়।
সূর্য নামে নিচের দিকে। কোনো লোক চলাচল নেই এখন। গরু-ছাগল ঘরে ফিরছে। গামলায় গরম পানি করে তাতে খুদকুঁড়ো ছেড়ে গরু-ছাগলকে পানি দেখান হবে। গোয়ালে যাবে গরু-ছাগল।
সন্ধ্যার সাথে সাথেই মানুষজন এসব সেরে ফেলে মশার ধোঁয়া দিতে বসে। টুকার সন্ধ্যাবেলাটা দারুণ দুর্বিষহ। ঘরে টিকটিকি আছে। যতক্ষণ কুপি জ্বালান থাকে, ততক্ষণ দেখা যায় টিকটিকি পোকামাকড়ের দিকে তাক হয়ে আছে। দেখে কুনো ব্যাঙটা লাফ দেয়। কোথায় উঠতে চায় ব্যাঙ? টুকিনি থাকতে এগুলো দেখতে পেত না সে। এই যে হিম হিম করে নীরবতা আস্তে আস্তে জাঁকিয়ে বসে, তা-ও হত না। একটু একটু আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে থাকে টুকা। ঘুম না, জাগরণ না। তখনই মনে হয় কে যেন ডাকে, বলে, উঁক্কা খাইবেন?
টুকিনির গলা না?
চমকে উঠে বসল টুকা। তারপর বুঝল, ভুল শোনা। ওদিক থেকে মায়মুনা ডাকছে, খাইয়া যাও।
সে কুয়োর কাছে যায়। নিমগাছের পশ্চিমে শিম মাচানের আলে কী যেন হাঁটছে-ফিরছে। সে চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দেয় ঘন ঘন। শিয়াল না তো? না মালন-বাড়ির কুত্তা? কৌতূহল ভর এগোয় খানিক। গা শিউ শিউ করে উঠল সাথে সাথে। ঘোড়ার বাচ্চা না? নায়েবের ছাড়া আর কার? ঘোড়া যে মরল, সেই খোঁজ হয়েছে কি নায়েবের? এতক্ষণে খবর কি আর না হয়? টুকা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না।
ঘোড়ার বাচ্চা এগোয়। মায়ের মতো অত উঁচু না, অত টগবগে না। টুকা মনে মনে ডাকে, আয়, আয়...।
বড় ঘোড়াকেও টুকা এভাবেই ডেকেছিল। তারপরই কোঁচটা গিয়ে গাঁথল। ঘোড়ার কি দোষ গো? বসে বসেই, পা তুকে তুকে টুকা এগোয়, আয়, আয়_তর মায়ে কই? দুধ খাবি ক্যামনে? আয়, আয়...। আমারও মা নাই রে। নায়েবে ছাড়ান লইয়া দিছে। হেয় যে কি কাম্ডা করছে, জীব অইয়া বুঝবি কেমনে?
তারপর বাচ্চাটা আটকা পড়ল টুকার গামছায়। সেটাকে টেনে টেনে সে গেল নায়েবের বাড়ির দিকে। কুঞ্জলতার গেট। পেরিয়ে বৈঠকখানা। নায়েব বসে ছিল বারান্দায়, অন্ধকারে। ঘরে বাতি জ্বলছে।
ফুল-টুল ফুটেছে বাগানে। গন্ধটা টুকার ভালো লাগে। ভাতের গরম ভাপের মতো না, তবে ওরকমই যেন কিছুটা। বা আরও সুন্দর ও মিষ্টি গন্ধই সেটা। কতকাল কতকাল পরে সে এই বাড়িতে এলো।
নায়েব হাঁকল, কেডা?
সেই আগের গলা নেই, ভেঙে এসেছে। হাঁসফাঁস করে।
টুকা বলল, আমি অ-ই। ঘোড়ার ছাওডা...। মা তো নাই। খালি ঘুরে, খালি ঘুরে হেইতে লইয়া আইসলাম।
অ। আয়! ঘোড়াডা গাঁইয়াইয়া মারছে কে দেহি? ছাওডারে লইয়া কি করি অহোন? বাইন্দা থুইলে দড়ি ছিঁড়তে চায়। ছাইড়া দিলে কই কই যায়গা। বুঝি তো মায়ের লাগি খালি পাক পারে। মা ছাড়া ছাও, কী যে করি!
টুকা সর্বান্তকরণে একবার কাঁপে। মায়ের সন্ধান তো সে-ও কম করে না। সেই জবাব কী? বুঝতেই পারে না কখন বাচ্চাটার গলায় দেয়া গামছা তার হাত ফস্কে যায়। সে বোধহয় বলতে চাইল, যাই গো! যাই!
কিন্তু পারল না।
অন্ধকারে ভেতরে ভেতরে টুকার অত কী ঘটল নায়েব তার কিছুই দেখতে পারল না। বারান্দার কাছাকাছি হল টুকা। কোত্থেকে আসে নির্দেশ_তা-ও না, তবুও ঘটতে থাকে এসব। নায়েব নিজের মনে বলে যায়, আমার গাইরতডা করল কেডা? মাইনষে মাইনষে কাইজা লাগতে পারে। হের লাগি ক ঘোড়া মারনের কী কাম, অবলা জানোয়ারডায় কী বুঝে? হেইডা কার কইলজাত গাঁই দিল, কার জমিডাত দহল দিল হুনি? ঘাস খাইতে গেছে, হেও তো আমার জমিন।
নায়েব বসে ছিল ডেকচেয়ারে। মুখ দেখা যায় না ভালো। চেয়ারের কাপড়ের সাথে মিলেমিশে আছে। কিন্তু কণ্ঠটা খুব ভেজা ভেজা। কুয়াশাতেই এ রকম ভেজে ঘাস, মাটি। তারপর নড়তে পারে না, মাথা তুলতে পারে না ঠাণ্ডায় ঠাণ্ডায়।
টুকা বারান্দার গজারীর পালা ধরে সামলে নেয় নিজেকে। একবার বাতাস এলো। পুকুর পেরিয়ে, গাছপালার শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে বাতাস এলো। কিন্তু বাতাসটায় কী জার জার! কী শীত-শীত! টুকার কাঁপুনিটা বাড়তে থাকে। মাথায় যেন কেউ চাষ দিচ্ছে, মাটিতে যুত নেই, তবুও লাঙ্গল দাবিয়ে হালের গরুকে পেটাচ্ছে চাষি। গরুও পারে না, শক্ত মুঠিতে চাষিও ধরে রাখতে পারে না লাঙ্গল। সে না চাইলেও নিজের ধরা পড়া কণ্ঠ শুনতে পেল, ঘোড়াডারে আমি অই গাঁই দিছিলাম, আমি অই,...।
নায়েব বোধহয় শোনেনি। না শুনলেই হয় ভালো। বাতাসের জার জার ছোঁয়াটা কাটে না। পুকুরের কোনায় কোনায় ব্যাঙ ডাকে, ম্যাঘ দেও, ম্যাঘ দেও। কত দেবে বৃষ্টি? বেহুলডাঙ্গা যাবে সে। আবার বৃষ্টি! একবার ব্যাঙ ডাকা বন্ধ হল। মুহূর্ত কয়েক। একটা কু-পাখি ডাকল বুক ছেদ করে।
তখনই যেন মেঘ গর্জন হল। অপরাধীকে পেয়ে চেয়ারের ভেতর থেকে ত্বরিত বেরিয়ে আসে নায়েব। ঘোড়াটাও কোথায় চিঁহি ডেকে উঠল। টুকা উৎকর্ণ থাকে_নলখাগাড়ির টেকে কোঁচের ঘাই খাওয়া সেই চিৎকার না?
পর মুহূর্তেই নায়েবের জোর লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ল মানুষটা।
ফুলের গন্ধ আছে বাগানে। মাটিতে হাঁটু গেড়ে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে টুকা। কনুইয়ে শরীরের ভর। সেটুকুও এলোমেলো হয়ে যায় হঠাৎ।
শীত আসে কোত্থেকে? এখন তো শীতের সময় না। ঠকঠক কাঁপুনিতে সে ঘোলা দেখে সব। মায় জবর ছাপ-ছোফা থাকত। ঘরডাত্ লেপ-পোছ করত। ঘরের কোনায় কুনো ব্যাঙটা আছে। বাইরে ফেলে দিয়ে এসেছিল সে। আবার ফিরে এসেছে।
টুকা উঠতে চাইল। পারল না। শুনতে চাইল। শুনল না। ফালি চাঁদ ছিল আকাশে। তা-ও কি আছে?
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1398)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
-
▼
2012
(33842)
-
▼
November
(2002)
-
▼
Nov 06
(62)
- জামায়াতের বিক্ষোভে বাধা, দেশজুড়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
- আবেগআপ্লুত ওবামার চোখে জল
- অনলাইন ব্যাংকিংয়ে অযৌক্তিক ফি by সাইদ আরমান
- সম্মুখ সমরে সোনাক্ষী-আনুশকা
- বিপজ্জনক তারকা সানি লিওন
- পতিতা পল্লীতে প্রিয়াংকা চোপড়া
- স্তনদায়িনী by মহাশ্বেতা দেবী
- বন মর্মর by মনোজ বসু
- জাপানে দালাই লামা- চীনে পরিবর্তন দরকার
- যুক্তরাজ্যে ‘রাষ্ট্রহীন’ পথশিশুরা
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় উঠে এসেছে...
- আগাম ভোটে এগিয়ে ওবামা
- ব্যালটে গুরুত্ব পাচ্ছে যেসব বিষয়
- শবাগার by মতি নন্দী
- সাভারে ‘মাদকের হাট’ by অরূপ রায়
- কমিউনিটি ক্লিনিকে যাচ্ছেন না চিকিৎসকেরা by আবুল ...
- অ্যাসিড ছোড়ায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি
- প্রথম আলোর আলোয় আলোকিত হবে দেশ
- প্রথম আলোর আলোয় আলোকিত হবে দেশ
- খালেদার ভারত সফরে আওয়ামী লীগের স্বপ্ন ভেস্তে গেছে:...
- শিক্ষকদের পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠালেন প্রধান শিক্ষক
- ভর্তি-ইচ্ছুকদের প্রবেশপত্রে নায়ক-নায়িকাদের ছবি!
- বাংলাদেশের এএসইএম ফোরামে যোগদান
- ভুল বিকাশ by মঈনুল আহসান সাবের
- টুকা কাহিনী by বুলবুল চৌধুরী
- আমরা তিনজন by বুদ্ধদেব বসু
- ইঁদুর by বুদ্ধদেব গুহ
- আসেম শীর্ষ সম্মেলন- বাংলাদেশ কী পাবে? by সমীরণ রায়
- সরেজমিন- হিস্পানিকরাই তুরুপের তাস? by মিজানুর রহ...
- সর্বাগ্রে দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি- পুলিশের ঊর্ধ্...
- তীরে এসে নৌকা ডোবাবেন না- মসিউরের ছুটি উপাখ্যান
- চারদিক- প্রাণখোলা এক সন্ধ্যা by আকমল হোসেন
- কী দেব তোমায়?
- হালকা নাশতা বিকেলে
- ফ্রিজে গরুর মাংস তো রয়েছেই। চটপট বানিয়ে ফেলতে পা...
- ঝোল, কোরমা বা রেজালা তো অনেক হলো। গরুর মাংসের ভিন্...
- কিন্নরদল by বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
- সর্বনাশা প্রকল্প-সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে
- বীর মুক্তিযোদ্ধা- তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না
- বর্ষপূর্তি- ‘পরিবারের সবার পত্রিকা’
- ডিসিসি নির্বাচন জানুয়ারিতে! by রোজিনা ইসলাম
- আদালতে ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান- ডিজিএফআইয়ের তদন্ত...
- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-জয় হবে গণতন্ত্রের
- পবিত্র কোরআনের আলো-ফিরআউন ও তার রাজন্যবর্গ মুসার ম...
- কোন দিকে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচ...
- চরাচর-ইস্টিশনের অতিথি by বিশ্বজিৎ পাল বাবু
- কথা সামান্যই-বর্ণ ধর্ম জাতি সম্পর্কিত আইন by ফজলুল...
- কল্পকথার গল্প-কালনেমির লঙ্কাভাগ ও কুম্ভকর্ণের নিদ্...
- কালান্তরের কড়চা-দিল্লির লাড্ডু খেয়েও বেগম জিয়া পস্...
- অরণ্যে রোদন- ‘আমার ঘুম আসে না’ by আনিসুল হক
- এবারও ওহাইও যাঁর, হোয়াইট হাউস তাঁর? by মিজানুর ...
- দেশি-প্রবাসীর সেতুবন্ধ by অমিত চাকমা
- সিপিডির সংলাপ: রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ব্যাংক ব...
- ২০১২ যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আজ- ওবামা ...
- সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ-অসভ্য ও অভদ্র! by আবু এনএম ওয়াহিদ
- সমকালীন প্রসঙ্গ-বিরোধী নেত্রীর বিদেশ সফর এবং গণতন্...
- সুষমা ও সু চিকেও আমন্ত্রণ by শেখ রোকন
- শিক্ষা-মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন কেন? by ...
- রাজনীতি-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-স্বাধীনতার চেতনা by মো...
- সমকালীন প্রসঙ্গ-মিয়ানমার ও বাংলাদেশে বৌদ্ধ-মুসলমা...
- প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-বিশ্ব তাকিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে
- জেএসসি পরীক্ষা-আলোর ছবিতে কালো ছায়া
-
▼
Nov 06
(62)
-
▼
November
(2002)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
ইরান
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
কালবেলা
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
ইউক্রেন
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
নেপাল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
স্বাস্থ্য
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
জ্যোতির্বিজ্ঞান
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
শিল্প ও সাহিত্য
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
গবেষণা
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
জীবনযাপন
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
মেহেদী হাসান
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
মসজিদ
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
ইয়েমেন
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
Exclusive
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
উচ্চশিক্ষা
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
জনস্বাস্থ্য
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
লাতিন আমেরিকা
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
মহাকাশচারী
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
জোহরান মামদানি
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
ইহুদি
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
স্পেন
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment