Tuesday, November 6, 2012
ইঁদুর by বুদ্ধদেব গুহ
ইঁদুর by বুদ্ধদেব গুহ
একটা ইঁদুর খাটের তলা থেকে দৌড়ে বেরিয়ে সোজা এসে সুধীনবাবুর ইজিচেয়ারের তলায় ঢুকে গেল।
তালতলার চটি থেকে পা দুটো তাড়াতাড়ি চেয়ারের ওপরে তুললেন তিনি। তুলেই হাঁক দিলেন, দেবেন।
তালতলার চটি থেকে পা দুটো তাড়াতাড়ি চেয়ারের ওপরে তুললেন তিনি। তুলেই হাঁক দিলেন, দেবেন।
দেবেন ছিল না। থাকে না। কখনোই ও আজকাল সময়মতো থাকে না হাতের কাছে। চেঁচামেচি শুনে শ্যামা দৌড়ে এলো, বলল, কী হলো বাবু?
সুধীনবাবু ওকে দেখে পা দুটো নামিয়ে ফেললেন।
মুখে গাম্ভীর্য এনে বললেন, ইঁদুর।
শ্যামা অনেক দিনের লোক। মা, মানে সুধীনবাবুর স্ত্রী থাকতেই সে দশ বছর এ বাড়িতে কাজ করেছে। সুধীনবাবুর বড় ছেলে এবং মেজ ছেলের বাচ্চারা সবাই শ্যামার হাতেই মানুষ। ওর শরীরে মায়াদয়া আছে। বয়সও হয়েছে। কপালের দুপাশের চুলগুলো সব রুপোলি হয়ে গেছে। নিজেরও গেঁটে বাত ও ডায়াবেটিসের কারণে বাবুর দুঃখ ও একটু একটু বোঝে।
শ্যামা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ইঁদুরই তো! ঘর থেকে যে বাঘ বেরোয়নি এই যথেষ্ট! কী অবস্থা করেছে দেবেন ঘরটার। আর বৌদিদেরও বলিহারি যাই। বুড়ো শ্বশুরের দিকেও তো মানুষ একটু দেখে। নিজেদের ঘরও তেমনই, কী নোংরা; কী নোংরা।
সুধীনবাবু কখনো পরনিন্দা পরচর্চা প্রশ্রয় দেননি। এখনো দেন না। চাপা ধমক দিলেন তিনি শ্যামাকে। বললেন, আঃ শ্যামা। যাও, নিজের কাজ করো। দেবেন এলে পাঠিয়ে দিও আমার কাছে।
শ্যামা গজগজ করতে করতে চলে গেল।
সিঁড়ির কাছে গিয়েই শ্যামা চুপ করে গেল। বৌদিরা কেউ তার বক্তৃতা শুনতে পেলে আর রক্ষা নেই।
সুধীনবাবুর চোখ দুটো ভারী হয়ে এলো। তাঁর আপন বলতে যে একমাত্র মানুষটি ছিল সেই নীহারিকাই চলে গেছেন দু বছর হলো; যদিও নীহারিকা থাকাকালীন তিনি যে তাঁর এতখানি আপন সে-কথা পঁয়তালি্লশ বছরের পার্টনারশিপেও কখনো বুঝতে পারেননি সুধীনবাবু। দাবি করার, জোর খাটানোর, ঝগড়া করার মানুষ ঐ একজনই ছিল।
নীহারিকার ছবির দিকে তাকালেন একবার সুধীনবাবু। বড় ছেলে একটা অয়েল পেইন্টিং করে এনেছে কাকে দিয়ে যেন অনেক পয়সা খরচ করে। বেঁচে থাকাকালীন সপ্তাহে এক দিনও ছেলে মা বলে ডাকেনি, কি মা-বাবার ঘরে আসেনি পর্যন্ত। আর মায়ের মৃত্যুর পর ছবি বাঁধিয়ে এনে ভালোবাসার পরাকাষ্ঠা দেখাচ্ছে!
মেজ ছেলে গত মৃত্যুদিনে কাগজের ফুলের একটা সাদা মালা এনে নীহারিকার ছবির গলায় পরিয়ে দিয়েছিল। এখন সে সাদা কাগজের ফুলের চেহারা হয়ে গেছে প্রায় রুদ্রাক্ষের মতো। এত ধুলো পড়েছে যে ছবি তো দূরের কথা, মালাটাতেও হাত ছোঁয়ানো যায় না। মানুষটা চলে গেছে বলে কী কাগজের মালা পরিয়ে তাকে অবহেলা করতে হয় এমন করে? ছেলে-বৌরা কি রোজ একটা করে সাদা ফুলের মালাও নীহারিকার গলায় পরাতে পারে না? যে তাদের স্তন্যদায়িনী, যে কোলে-কাঁখে করে মানুষ করল, যে সারা জীবনে এক দিনও স্বামীর সঙ্গে সিনেমা দেখতে গেল না পাছে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ক্ষতি হয়; সেই মানুষটাকে? জন্মদাত্রী, পরম শুভার্থী মাকেও ওরা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেল? ভেবে বড়ই কষ্ট পান সুধীনবাবু।
দেবেন এলো। বলল, ডাকছিলেন?
সুধীনবাবুর কথা বলতে ইচ্ছে করল না। মুখে শুধু বললেন, ইঁদুর।
দেবেন ঘরে আসার আগেই শ্যামার মুখে শুনেছিল। বলল, আজ ইঁদুরের বিষ আনব। মজা টের পাবেন বাছাধনরা।
সুধীনবাবু আস্তে আস্তে বললেন, ঘরে ইঁদুরের চাষ করে তারপর বিষ দিয়ে মারা কেন? চাষটা বন্ধ করো না ঘরে।
তারপর বললেন, প্রিভেনশান ইজ বেটার দ্যান কিওর।
সুধীনবাবু অভ্যেস বশেই বলে ফেললেন ইংরেজি। দেবেন ইংরেজিটা বুঝতে পারল না। বলল, ঝাড়ব ঘর। একা লোক চারদিকের কাজ সামলাতে পারি না। এই বড়দা ডাকল সিগারেট আনতে, মেজদা ডাকল পান আনতে, তাও তো ছোড়দারা এ বাড়িতে থাকে না। বাঁচোয়া। বৌদিরাও কি কম ডাকাডাকি করে? শুধু আপনার একার কাজ করলে না হয় এসব ঠিক ঠিক করে রাখতাম।
এসব কথাতে সুধীনবাবু আজকাল সত্যিই বিরক্ত হন। এসব কথা শুনতে বা আলোচনা করতেও চান না তিনি। তাঁর একার কাজের জন্যে তো দেবেনকে অথবা বাড়ির কাউকেই রাখা হয়নি। তাই এসব কথা কোনো ছেলে বৌয়ের কানে গেলে মিছিমিছি অশান্তিই বাড়বে। যত দিন নীহারিকা ছিল, তখন অন্য কথা। আজ তার এই অবসরপ্রাপ্ত, কর্মহীন, অপ্রয়োজনীয় জীবনে এই রকম তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অশান্তি ভালো লাগে না। একা ঘরে ইজিচেয়ারে বসে যতই অনাদর-অবহেলা পান, ততই যেন অসহায়তায় চোখের কোল দুটো জ্বালা করে। নীহারিকার কথা মনে পড়ে।
এই বয়সে সকলেই একটু দেব-দেবী গুরুটুরুর দিকে ঝোঁকে। সুধীনবাবুর ঐসব দুর্বলতা কখনো ছিল না। সুধীনবাবুর ধারণা যে যারা জীবনে অনেকানেক অন্যায় করে তারাই শেষ জীবনে হঠাৎ ঠাকুর দেবতার শ্রীচরণে হুমড়ি খেয়ে পড়ে পাপক্ষালন করতে চায়। না, সুধীনবাবু যৌবনেও ওসব করেননি; বার্ধক্যেও করবেন না।
সবচেয়ে মুশকিল হয় সময় নিয়ে। সময়ের ভার বড় ভার। যাঁরা বেশি বয়সে স্বামী হারান, তাঁরা এতটা একা হয়ে পড়েন না। কারণ বিধবাদের পক্ষে সংসারের মধ্যে অনেকখানি সময় আদরেই হোক কি অনাদরেই হোক, কেটে যায়ই। কিন্তু বিপত্নীক পুরুষ মানুষ সত্যিই বড় নির্জন। সময় তাঁদের বুকে পাথরের মতো চেপে বসে। কিছুতেই নড়তে চায় না। বই পড়ে সময় কাটাতেন আগে, কিন্তু এখন চোখও বিদ্রোহ করছে। দুটি চোখেই ছানি পড়েছে অথচ ম্যাচিওর করেনি যে কাটাবেন। সন্ধের পর টিভি দেখে সময় কাটে। তবু শনি-রবিবার বাংলা-হিন্দি সিনেমা যখন হয়, তখন আজকাল আর দেখেন না। ছেলে বৌরা বন্ধুবান্ধব নিয়ে জমিয়ে বসে সিনেমা দেখে। তাই হংসমধ্যে বকযথা হয়ে থাকতে খারাপ লাগে তার। একদিন আড়াল থেকে শুনেছিলেন, বড় বৌ বলছিলেন কাউকে। 'বুড়োর রস কম নয়।'
এসব শুনেও গায়ে মাখেন না বিশেষ সুধীনবাবু। মাখেন না, এই কারণে যে এ বাড়িটা তাঁর, তাঁর বাড়িতেই ছেলে-বৌ-নাতি-পুতিরা রয়েছে। এই বাজারে আলাদা আলাদা বাড়ি নিয়ে থাকতে হলে প্রত্যেকেই বুঝত। বড় সরকারি চাকরি করতেন বলে এখনো মাসে হাজার টাকা করে পেনশন পান উনি। তা ছাড়া ফিঙ্ড ডিপোজিটের সুদও আছে। নিজের কোনো ব্যাপারে তিনি পরের মুখাপেক্ষী ননই, উপরন্তু তিনি ছেলেদের সংসারে প্রতি মাসে নিজের সামর্থ্যের প্রায় সবটাই ঢেলে দেন। এ কারণেই আর্থিক বিষয়ে কোনো রকম মানসিক দৈন্য কখনো বোধ করেননি। যতটুকু অবহেলা পান সুধীনবাবু, তা নিছক জেনারেশন গ্যাপ এবং নীহারিকার স্বার্থপরের মতো আগে চলে যাওয়ার দোষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েই নিশ্চিন্ত থাকেন।
টেলিফোনটা বাজছিল। টেলিফোনটা নিচের বসার ঘরে আছে। ওঁর ঘরে একটা এঙ্টেনশন আছে। টেলিফোনটা বেজেই চলল অথচ কেউই ধরছে না। দেবেনটাই বা কোথায় গেল?
যখন কেউ ধরল না, তখন অগত্যা নিজেই উঠলেন। কোমরটা কনকন করে উঠল। ধীরে ধীরে গিয়ে রিসিভারটা তুললেন। ওপাশ থেকে মিষ্টির গলা ভেসে এলো।
কে_এ_এ? দাদু?
সুধীনবাবুর মুখ-চোখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, হ্যাঁ দাদু। তোমার কী খবর?
_ভালো। ওপাশ থেকে পাঁচ বছরের মিষ্টি বলল।
_তুমি কবে আসবে আমাদের বাড়ি?
_আসব না। আড়ি তোমার সঙ্গে।
সুধীনবাবু উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, কেন? কেন? আড়ি কেন? কী করেছি আমি?
_তুমি আমাকে রথ কিনে দিলে না কেন? আজ না রথ! আমাদের বাড়ির দোতলার মিঠুকে ওর দিদা কিনে দিয়েছে। পাশের বাড়ির বুজুকে ওর বাবা কিনে দিয়েছে। আমাকে কেউ কিনে দিল না।
সুধীনবাবু বললেন, ঠিকই তো। বড্ড ভুল হয়ে গেছে তো! ভেরি সরি। তোমাকে কালই কিনে দেব।
মিষ্টি বলল, কাল কিনলে কি হবে? রথ তো আজ হয়েই গেল।
তাতে কী? উল্টোরথের দিন টানবে।
_আচ্ছা। আশ্বস্ত হয়ে বলল মিষ্টি।
তোমার মা-বাবা কোথায়?
_পার্টিতে গেছে।
_তুমি একা আছ?
_না, বেলাদি আছে।
_তুমি খেয়েছ?
_না, খাব।
_কী খাবে?
_এই ভাত, পেঁপের তরকারি, আমার তো শরীর ভালো না। ও জানো দাদু, দাদু; আজ না কাঁচকলার ঝুরি করবে রঘুদাদা। ঝুরি খেতে কি ভালো, না?
_হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব ভালো।
আজ থেকে দশ বছর আগে হলে এই কথার উত্তরে সুধীনবাবু হয়তো বলতেন, খুব ভালো। ঝুরি, ঝুড়ি ঝুড়ি খেতে ভালো।
তখন কত সহজে রসিকতা করতে পারতেন। কত আনন্দ ছিল মনে। আজকাল নিজের সবচেয়ে প্রিয় ছোট্ট একমাত্র নাতনির সঙ্গেও রসিকতা করেন না তিনি।
তারপর বললেন, শোনো, আমি এক্ষুনি মেলায় যাচ্ছি তোমার জন্যে রথ কিনতে। তুমি কি আসবে এখানে? মেলায় যাবে আমার সঙ্গে?
_এখন? এখন কি করে যাব? এখন তো খাব। মা বকবে এখন গেলে। কার সঙ্গে যাব?
_ঠিক আছে।
তারপর বললেন, আজ রথ, তুমি পাঁপর ভাজা খেয়েছিলে?
_পাঁপর ভাজা? না তো। রথের দিনে বুঝি পাঁপর ভাজা খেতে হয়?
_হয় তো। আমরা তো তাই-ই খেতাম ছোটবেলায়। তোমার দিদা থাকতেও। এবারে খাইনি।
_মা পাঁপর ভাজা খেলে রাগ করে। বলে, পেট আপসেট করবে।
_ও_ও। না, না। তাহলে খেও না।
রেখেদি? মিষ্টি গলায় বলল।
আচ্ছা।
নাতনি রিসিভার নামিয়ে রাখল।
সুধীনবাবু ডাকলেন, দেবেন।
সাড়া নেই। আবারও ডাকলেন, দেবেন, অ্যাই দেবেন।
সাড়া নেই।
ঠাকুর সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল ওপরে। বলল, দেবেনের সঙ্গে তো আমার রাস্তায় দেখা হলো, বাবু। দেবেন তো ঋষির দোকানে গেল_বৌদিদের জন্যে ভেলপুরি কিনতে। আর দই-বড়া।
ড্রাইভারকে ডাকো তো ঠাকুর। সে কি আছে? না চলে গেছে।
ড্রাইভার তো বড়দাকে নিয়ে বেরোল, বলছিল নাখুদা মসজিদের কাছে যাবে। রয়্যাল না কী হোটেল আছে, সেখান থেকে বিরিয়ানি পোলাউ আনবে। বড়দার সম্বন্ধীরা খেতে আসছেন।
_ঠিক আছে। বললেন সুধীনবাবু।
তারপর আস্তে আস্তে ধুতিটা পরলেন। আলমারি খুলে হ্যাঙার থেকে এন্ডির পাঞ্জাবিটা বের করলেন। ছাতাটা নিলেন। তারপর সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেন। আজকাল তিনি বাড়ি থেকে বেরোলে কোথায় যাচ্ছেন, কখন ফিরবেন এবং আদৌ ফিরবেন কি না তা জিজ্ঞেস করার লোক কেউ নেই। উনি ভাবেন, ভালোই হয়েছে। একেবারে মুক্তপুরুষ।
মেজ বৌ বসবার ঘরে বসেছিল। বলল, গাড়ি তো দাদা নিয়ে গেছেন, গাড়ি ছাড়াই বেরোচ্ছেন, বাবা?
_হ্যাঁ।
মেজ বৌও আর কিছু বলল না, সুধীনবাবুও না।
সুধীনবাবু বুঝলেন যে মেজ বৌয়ের তাঁর সম্বন্ধে যত না মাথাব্যথা, দাদাই যে গাড়িটা বেশি ব্যবহার করে এ কথাটা তাঁকে জানানোর উৎসাহই তার চেয়ে অনেক বেশি।
টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল সকাল থেকে। তখনো পড়ছিল। ছাতাটা খুললেন তিনি। রথের দিনে প্রতিবছরই বৃষ্টি হয়। সারা পথ কাদা প্যাচ প্যাচ করছে। হাঁটুতে এতই ব্যথা যে পদ্মপুকুর হেঁটে যাওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব। মোড়ে এসে রিকশা নিলেন। তারপর মেলায় পেঁৗছে একটা রথ কিনলেন সাড়ে চার টাকা দিয়ে। জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার কাঠের মূর্তিও কিনলেন।
ফেরার সময় একটা মিনিবাস আস্তে করে ধাক্কা দিল রিকশাটাকে। একটু হলে তিনি ও রিকশাওয়ালা দুজনেই পড়ে যেতেন। কিন্তু পড়লেন না। রিকশায় চড়া মানেই লোকের কাঁধে চড়া। যৌবনে কখনো সে জন্যে রিকশায় চড়েননি তিনি। কিন্তু এখন নিজের পায়ের ওপর আর কোনো জোর নেই বলে পরস্কন্ধারূঢ় হন নিরুপায়েই।
গাড়িটাও তাঁর নিজেরই। যেবার প্রথম ওভারহেড ভাল্বের অ্যাম্বাসাডর বেরোল, সেবার কিনেছিলেন। আজ অনেক বছর হলো। কন্ডিশন এখনো ভালোই আছে। এক হাতের গাড়ি ছিল। এখন ছেলেরাই চড়ে। ওরাই চাঁদা করে ড্রাইভার রেখেছে। ছেলেরা অবশ্য বলে, বাবা, যখনই আপনার দরকার একটু আগে বলে দেবেন, গাড়ি নিয়েই বেরোবেন। কিন্তু নিজের গাড়ি নিয়ে বেরোতে হলে পাঁচ দিন আগে থেকে অন্যদের বলাবলি তাঁর পছন্দ হয় না।
তা ছাড়া, যাবেনই বা কোথায়? সত্তর বছরে পেঁৗছে সংসারে বন্ধু, হিতাকাঙ্ক্ষী আত্মীয়-পরিজনের স্বরূপ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন তিনি। যত দিন বড় সরকারি চাকরিতে ছিলেন, প্রভাব-প্রতিপত্তি, বেকারদের চাকরি করে দেওয়ার ক্ষমতা এ সমস্ত বিদ্যমান ছিল, তত দিন তাঁর কাছে লোকের ভিড়ের অভাব হয়নি। বন্ধুরা এসেছে দলে দলে। আজকে সারা দিনে দুটো কথা বলার লোকও পান না একজনও। তাই গাড়ির প্রয়োজন তার মিটেই গেছে। যখন দরকার হয় তখন এমন হঠাৎ হঠাৎই দরকার হয়। আগে বলবার সময় কোথায় পান?
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই প্রতিবেশী জগবন্ধুবাবুর সঙ্গে দেখা। ময়দার কল আছে ভদ্রলোকের। হাসিখুশি মোটাসোটা আমুদে মানুষ। বয়সে সুধীনবাবুর চেয়ে বছর চার-পাঁচের ছোট। তিনি গাড়ি থামিয়ে দুটো কথা বলে নিলেন। বললেন, কী খবর বড় সাহেবের? গেছিলেন কোথায়? রিকশা কেন? গাড়ি কী হলো?
সুধীনবাবু হাসলেন। গাড়ির কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বললেন, এই রথের মেলায়। কাছাকাছিই। ওহো তাই তো! রথ দেখছি যে! তা পেঁয়াজি-ফুলুরি খেলেন?
সুধীনবাবু হাসলেন। বললেন, অম্বল।
কিসের অম্বল? ইয়াং ম্যান। জগবন্ধুবাবু বললেন।
তারপর বললেন, চলুন চলুন আমার বাড়ি। আপনাকে দেখে যদি আমার গৃহিণী গালাগালি থেকে ক্ষান্ত হয়। আজ বড় দেরি হয়ে গেল ফিরতে। ওকে নিয়ে এক জায়গায় যাওয়ার ছিল। চলুন। আপনার সুন্দর মুখ দেখলেই রাগ পড়ে যাবে।
সুধীনবাবু হাসলেন। আজকাল যেমন নিজে রসিকতা করতে পারেন না। অন্য কেউ করলেও ভালো লাগে না।
বললেন, আজ ছেড়ে দিন।
তার পরই বলতে গেলেন; শুনুন! স্ত্রীকে অমন হেলাফেলা করবেন না। স্ত্রী যে কী জিনিস, চলে গেলে বুঝবেন। কিন্তু কথাটা আর বলবেন না। ভাবলেন, তিনি নিজেও বুঝতেন না কী জিনিস স্ত্রী, নীহারিকা থাকতে। ভাবলেন, স্ত্রীর কথা ওঠালে জগবন্ধুবাবু ভাবতে পারেন যে দাঁত চলে যাওয়ায় দাঁতের কদর বুঝেছে বুড়ো। হাঃ হাঃ।
রিকশাওয়ালাকে বিদায় দিয়ে রথটা নিয়ে বাড়ি ঢুকতে গিয়ে দেখলেন, বড় দুটো রথ সুন্দর করে সাজিয়ে-টাজিয়ে তার বড় ছেলের ও মেজ ছেলের পুত্ররা টানাটানি করছে।
সুধীনবাবু বললেন, রথ? এ কী, রথ কোথায় পেলি?
বারে! বাবা কিনে দিয়েছে। বাবা কিনে দিয়েছে।
শান্টু বলল, দাদু ঐ রথটা আমাকে দাও।
সুধীন গম্ভীর মুখে বললেন, না। এটা মিষ্টির।
বলেই ওপরে চলে গেলেন আস্তে আস্তে। দেবেন এসে ভিজে ছাতাটা নিল।
জামাকাপড় ছাড়তে ছাড়তে সুধীনবাবু খুব দুঃখিত হলেন। যা ভেবেছিলেন, তার কিছুই হলো না। ভেবেছিলেন, ছেলেরা সব এক বাড়িতেই থাকবে। জমজমাট সংসার। নীহারিকার ফরসা, লক্ষ্মীশ্রীসম্পন্ন চেহারাটা মনে পড়ল। চওড়া লাল পেড়ে শাড়ি। চাবির গোছা আঁচলে। বৌরা ঘিরে রয়েছে। ছেলেদের ভাব গলায় গলায়। মা-বাবা, ছেলে-বৌ।
কিছুই হলো না।
ছোট ছেলে দীপু পড়াশোনায় সবচেয়ে খারাপ ছিল। ইউনিভার্সিটির পরীক্ষায় কখনোই তেমন ভালো করেনি। কিন্তু জীবনের পরীক্ষাতে ঐ সবচেয়ে সফল হলো। সাহেবি কম্পানিতে সামান্য সেলসম্যানের চাকরিতে ঢুকে দেখতে দেখতে মার্কেটিং ম্যানেজার হলো। কম্পানির ফ্ল্যাট, কম্পানির গাড়ি। দীপুর বৌ শিখা বোম্বের মেয়ে। ওর বাবা ছিলেন এক মার্কেন্টাইল ফার্মের বড় কর্তা। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। সাহেবি ধরনের মানুষ। তার পক্ষে এই বাড়িতে পাঁচমিশালি রুচির মধ্যে থাকা সম্ভব হলো না। মিষ্টিটাকে বড়ই মিস করেন সুধীনবাবু। আর কী যে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ও। নীহারিকার বড়ই প্রিয় ছিল এই নাতনি।
আসলের চেয়ে সুদ যে বড়, এ কথা যাদের সুদ নেই তারা জানে না।
আজকাল দীপু ও শিখার সঙ্গেও দেখা হয় না বেশি। সপ্তাহে এক দিন করে আসে। অবশ্য ফোন করে খোঁজখবর নেয় মাঝেমধ্যে। রান্না করে এটা-ওটা পাঠায়। কিন্তু মিষ্টির জন্যেই মনটা হু হু করে সুধীনবাবুর। নীহারিকা চলে যাওয়ার পর মিষ্টি ওদের নতুন ফ্ল্যাটে উঠে যাওয়ায় দ্বিতীয়বার ধাক্কা খেয়েছিলেন তিনি। পুরোপুরি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন।
যখন দীপু চলে গেছিল, খুব রাগ হয়েছিল সুধীনবাবুর। কিন্তু এখন মনে হয় যে তাঁর প্রজন্মের মানুষদের পক্ষে, সমস্ত পৃথিবীজুড়ে যে যৌথ পরিবারের ভাঙন আরম্ভ হয়েছে, তা রোধ করা সম্ভব নয়। আলাদা থাকা একেক সময় ভালো বলেও মনে হয়। তাতে সম্পর্ক বোধ হয় ভালো থাকে। যদি প্রত্যেকের রুচি, রোজগার, শিক্ষা এসব একরকম না হয়, তাহলে জোর করে একসঙ্গে থেকে বাইরের লোককে সুখের বন্যা দেখানো হয় বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পায়ের তলায় মাটি সরতে থাকে। কেউ অত্যাচার করে, কেউ অত্যাচারিত হয়। যার রোজগার বেশি এবং যার কম তাদের দুজনেরই দুরকম কমপ্লেঙ্ জন্মায়। সেটা প্রত্যেকেরই জীবন উপভোগের পথে বাধাস্বরূপ। সুধীনবাবু আর নীহারিকা সবাইকে নিয়ে থাকতে চেয়েছিলেন জড়িয়ে। কিন্তু তিনি নিজের জীবনেও দেখেছেন। যৌথ পরিবারে কেউ ঠকে; কেউ ঠকায়। কেউ অন্যায় করে; কেউ তা সয়ে যায়। যে ভালো, তাকে বোকা ভাবা হয়। জীবন যেহেতু একটাই, তখন যার যার যোগ্যতা, যার যার রুচি, যার যার মতামত নিয়ে আলাদা থাকাই বোধ হয় ভালো। যারা, তা থাকতে পারে। বড় বৌ, মেজ বৌ তাঁর সামনে কখনো ঝগড়া করে না বটে, কিন্তু সুধীনবাবু বোঝেন, ভালো করেই বোঝেন যে ওদের মধ্যে সব সময় একটা রেষারেষি, একটা কোল্ড-ওয়ার চলে। সেটা আরো অসহ্য ঠেকে।
রথ নিয়ে উনি ওপরে উঠে যেতেই মেজ বৌ ঘরে গিয়ে উষ্মার সঙ্গে মেজ ছেলেকে বলল, বাড়াবাড়ি।
_কেন? কার? খাটে শুয়ে বই পড়তে পড়তে মেজ বলল।
_কার আবার? তোমার বাবার। মিষ্টির জন্যে নিজে হাতে রথ কিনতে গেলেন, বৃষ্টিতে ভিজে। কেন আমার ছেলেদের জন্যে তো কখনো একটা চকোলেটও কিনে দেন না?
মেজ বলল, তাই নাকি? বাবা নিজে গেছিলেন? স্ট্রেঞ্জ!
মেজ বৌ বলল, তোমার ছেলেরা কি ভেসে এসেছিল?
বড় বৌ জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিল যখন সুধীনবাবুর সঙ্গে জগবন্ধুবাবু কথা বলছিলেন।
বড় বৌ মেজকে ডাকলেন। মেজ বাইরে এলে বলল, দ্যাখ কী লজ্জার।
_কী? মেজ বলল।
বাবা জগবন্ধুবাবুকে, গাড়ি পান না, রিকশায় যাতায়াত করেন_এসব কথা বলছিলেন নিশ্চয়ই; এটা অপমানের নয়? বুড়ো হলে মানুষগুলো কুটিল হয়ে যায়? কাজকর্ম নেই তো!
সুধীনবাবুও ইজিচেয়ারে বসে ভাবছিলেন, স্ট্রেঞ্জ! বড় ছেলে, মেজ ছেলে নিজেদের ধাড়ী ধাড়ী ছেলেদের রথ কিনে দিল আর ছোট ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে মিষ্টির জন্যে চার টাকা দিয়ে একটা রথ কেনার কথা মনে হলো না ওদের। এরা একেবারে চামার হয়েছে। তাঁর নিজের ছেলে বলে ভাবতেও কষ্ট হয়।
সুধীনবাবু বোঝেন সব। মুখে কিছু বলেন না। বড়লোক বাবার কাছে গরিব সেজে থাকার লাভ অনেক। অন্তত তাই ভাবে ওরা। তিনি চিরদিন ন্যায়ের পক্ষে, অন্যায়ের বিপক্ষে। দীপু চলে গেছে বলেই তিনি তাকে দূর করে দিতে পারেন না। উইল করে ফেলেছেন তিনি। যা-কিছুই আছে স্থাবর-অস্থাবর, ছেলেমেয়ে সকলকে সমান ভাগ। বৌমারা এ কথা জানে না বলেই বোধ হয় রেষারেষি হয়। কে শ্বশুরের বেশি কাছের, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে।
ড্রাইভার ফিরে এসে ওপরে এলো দেখা করতে। সুধীনবাবু বললেন যে এক্ষুনি রথটা ছোটবাবুর নিউ আলিপুরের ফ্ল্যাটে পেঁৗছে দিয়ে আসতে।
ড্রাইভার চলে গেল। বড় ছেলে শালা ও শালা-বৌয়ের জন্যে গরম গরম বিরিয়ানি ও চিকেন চাঁব নামিয়ে রেখে রাগতস্বরে শালাদের সামনেই বলল, বাবা যত বুড়ো হচ্ছেন, ততই ইনকনসিডারেট হচ্ছেন। এত রাতে বৃষ্টির মধ্যে ড্রাইভারকে কি না পাঠালেই চলত না। গরিব লোকটা সারা দিন খাটছে। বুড়ো হলে মানুষগুলো সেনাইল হয়ে যায়। ভীমরতি ধরে।
বড়বাবুর বড় শালা কথা ঘুরিয়ে বলল, যাই বলো আর তাই বলো, শিখা ও দীপু চলে গিয়ে তোমাদের বাড়িটা কেমন খাঁ খাঁ করে যেন।
বড় বৌ বলল, তা তো লাগবেই দাদা তোমার। আমরা তো শিখার মতো সুন্দরীও নই আর অমন শরীর বের করে সাজতেও পারি না।
বড় শালা হেসে ফেললেন। বললেন, নমু তুই কোন লজ্জায় এ-কথা বলছিস? তুই যা শরীর করেছিস তা কি কাউকে দেখাবার? তুই তো একেবারে আমাদের কম্পানির সাফ্লায়ার ঢালাইওয়ালা মি. আগরওয়ালার স্ত্রীর মতো দেখতে হয়ে গেছিস। ওজন কত কুইন্টাল হলো?
বোন রেগে গেল। বলল, তোমাদের সব দেমাকি মেয়েছেলে ছাড়া ভালোই লাগে না। শিখার দেমাক একদিন ভাঙব। ভগবান কি নেই? ভগবানই একদিন ওকে মুড়িয়ে খাবেন।
দাদা বললেন, ছিঃ ছিঃ, তুই না পড়াশোনা করেছিস। তুইও এ রকম? টিপিক্যাল! তারপর বলল, ভগবানের আরো অনেক ইমপরট্যান্ট কাজ আছে। যা-ই বলিস, তোদের বাড়িতে কিন্তু দীপু-শিখাকে আমার সবচেয়ে পছন্দ। ভেরি ট্রেইট-ফরোয়ার্ড।
বড় বৌদি বলল, খুব লক্ষ্মী মেয়ে কিন্তু শিখা। ওরা যখন এখানে থাকত, একটা ঘরে থাকলে কী হয়; ঘরের মেঝেতে মুখ দেখা যেত। এখন তোমাদের বাড়িতে ঢুকলেই মনই খারাপ হয়ে যায়। মাসিমা আর শিখা চলে গিয়ে তাদের বাড়ি একেবারে শ্রীহীন হয়ে গেছে।
বড় বৌ চটে গেল। বলল, তা এই বাড়িতে আসা কেন, বাবা? না এলেই তো পারো। কেউ বাড়ি বয়ে এসে এমন অপমান করে, শুনিনি কোথাও।
ঘর ফাঁকা হতেই বড় শালা নিজের স্ত্রীকে বলল, তোমার এমন স্পষ্ট কথা বলার দরকার কী?
আমি স্পষ্ট কথাই বলি। তোমার বোন বলে কি ছেড়ে দেব? ওরা কেউ শিখার ধারেকাছে নয়। তাই-ই তো দলাদলি আর পলিটিকস করে ওকে তাড়াল। শিখা চাপা মেয়ে, কিন্তু একদিন আমার কাছে সব বলেছিল। শিখার কী? ও নিজে বড়লোকের একমাত্র মেয়ে, স্বামীরও যথেষ্ট যোগ্যতা আছে; ও কেন এই নোংরামির মধ্যে থাকবে? আমার সামর্থ্য থাকলে আমিও তোমাদের বাড়ি থাকতাম না। কত সুখেই রেখেছ তুমি আমাকে জগাখিচুড়ির সংসারে।
তারপর বলল, লোকে ঈর্ষা আর হিংসা করে তো আর কারো কপাল পোড়াতে পারে না। কপাল কে নেবে? যে যেমন কপাল করে আসে। তোমার বোনের এই পরশ্রীকাতর স্বভাব আমার মোটেই ভালো লাগে না।
আঃ কী করছ! বাড়াবাড়ি কোরো না, শুনতে পাবে।
শুনুক। তোমার মতো আদেখলাও দেখিনি আমি। বিরিয়ানি খাওয়ার এত লোভ, তো হোটেলে গিয়ে খেলেই পারো!
আহা! সমীর এত করে নেমতন্ন করল। সমীরের কী দোষ। বলল, হুইস্কি খাওয়াবে। বৃষ্টির দিন। সমীর তো ভালোই।
বড় শালার স্ত্রী বলল, ভালো। তেমনি ভালো। যেমন দেবা, তেমনি দেবী। এ রকম ছোট মনের পুরুষও আমি দেখিনি। স্ত্রীর কথায় ওঠে-বসে।
থামো তো! ধমক লাগাল বড় শালা।
বড় এসে বলল, এসো, ঘরে এসো, চুপচাপ হুইস্কি খেতে হবে ঘরে বসে। হাশ্-হাশ্ করে। বাবা জানতে পারলে তো কোনো সম্পত্তিই দিয়ে যাবেন না। ত্যাজ্যপুত্তুর করবেন।
বড় শালা অবাক হয়ে বলল, কেন? দীপু তো খেত বাড়িতে মাঝেমধ্যে।
বড় ছেলে সমীর বলল, দীপুর কথা ছাড়ো। ওর কি কোনো রেসপেক্ট আছে নাকি বড়দের প্রতি? ও সাহেব লোক।
২.
এ কী? দেখেছ? সর্বনাশ করেছে। ঘুম থেকে সেদিন উঠেই চেঁচিয়ে উঠলেন সুধীনবাবু। তার পরেই ডাকলেন, দেবেন, দেবেন।
দেবেন নেই। যথারীতি! মেজ বৌ তক্ষুনি ওপরে এলো। ছেলের খাবারের তাগাদা দিতে। চিৎকার শুনে ঘরে ঢুকে বলল, কী হলো বাবা?
ইঁদুর।
কোথায়?
এই দ্যাখো না, তোমার মায়ের লেপটা কেটে কী করেছে।
লেপটা কোথায় ছিল?
সুধীনবাবুর রাগ হলো। ভাবলেন, বলেন যে, লেপ কোথায় থাকে তা তো তোমাদেরই জানার কথা মা। এ ঘরটা তো আবর্জনার স্তূপ হয়ে আছে। কখনো তো চোখ মেলেও দ্যাখো না। কিন্তু পরক্ষণেই সামলে নিলেন।
পরের বাড়ির মেয়ে। ছেলের বৌ। রাগ করেন তাদের ওপরে, সে অধিকার কোথায়? রাগ করার লোক, ঝগড়া করার লোক তো চলে গেছে।
সুধীনবাবু বললেন, তোমার মায়ের খাটের মাথার কাছেই ভাঁজ করা ছিল। দেখেছ, কেটে তুলোগুলোকে কী করেছে। তোমার মায়ের বড় প্রিয় লেপ ছিল ওটা। সে বলত, বড় ওম ধরে। সেই যেবার আমরা শীতকালে উটীতে গেছিলাম সেইবার এই লেপটা সঙ্গে নিয়ে গেছিল তোমার মা। সঙ্গে সেবার ছোটনও গেছিল। মনে আছে। ওঃ সেবারে কী শীত। তখন কতই বা বয়স আমাদের। তোমার মার সে কী আনন্দ উটী দেখে।
মেজ বৌ মনে মনে বলল, কী কুক্ষণে এই ঘরে ঢুকলাম। এখন বৃদ্ধের মধুচন্দ্রিমার গল্প শুনতে হবে।
এমন সময় দেবেন এলো।
সুধীনবাবু বললেন, দেবেন, তুই আমার কাছে মার খেয়ে মরে যাবি।
ফেলুন, মেরেই ফেলুন। দেবেন বলল। এই চাকরি আমার আর সহ্য হচ্ছে না। আমি মরে গিয়েই বাঁচি।
সুধীনবাবু বললেন, তুই ইঁদুর মারবি কি মারবি না? দেখেছিস, হতভাগা ইডিয়ট, দেখেছিস কী করেছে।
মেজ বৌ বলল, বাবা ইঁদুরের কী দোষ। এ তো ইঁদুরের ধর্ম।
ধর্ম মানে? প্রায় চটেই উঠেছিলেন সুধীনবাবু।
মেজ বৌ বলল, ধর্ম মানে; না কাটলে যে ইঁদুর মারা যায়।
মানে, ইঁদুরের দাঁত থাকে এমন যে সব সময় সেটা জিনিসপত্র কেটে কেটে ঘষে ঘষে ছোট না করলে সেই দাঁত ইঁদুরের মগজ ফুটো করে দেয়। দেখেন না, ইঁদুর কাগজ কাটে, লেপ কাটে, তোশক কাটে, যা পায় তাই-ই কাটে, কিন্তু সেগুলো কিছুই খায় না। না কাটলে যে ইঁদুর বাঁচতেই পারে না।
তা তো জানতাম না। সুধীনবাবু বললেন।
মেজ বৌ মনে মনে বলে, অনেক কিছুই জানেন না আপনি।
দেবেন বলল, দেখেছেন, মায়ের লেপটাকে কী করেছে ব্যাটারা। এমন বিষ দেব যে মানুষ পর্যন্ত মরে যাবে। দেখাচ্ছি মজা।
সুধীনবাবু বললেন, দয়া করে দেখাও।
বড় বৌমা ঘরে ঢুকল। মেজ বৌ বাবাকে কী জ্ঞান দিচ্ছে দেখার জন্যে। চান্স পেলেই একা একা বাবার কাছে ঘুসুর ঘুসুর করে। মায়ের যত গয়না ছিল সবই তো হাত করেছে মেজই! বড় কিছুই পায়নি! তবে আনন্দ এইটুকুই যে ছোট কিছু চায়ওনি এবং তাকে কিছু দেওয়াও হয়নি। তার স্বামী বড়লোক তাকে দেবেনই বা কেন?
বড় বৌমা বলল, বাবা।
বলো। সুধীনবাবু বললেন।
আজ রাজার জন্মদিন।
তাই নাকি? তা এত দেরি করে বললে, রাজাকেও তো দেখলাম না সকাল থেকে।
ও দেরি করে উঠেছিল। তাই সকালে আসতে পারেনি আপনার কাছে। স্কুল থেকে ফিরেই আসবে।
মেজ বৌ বলল, সে কী দিদি, আমারও তো মনেই ছিল না।
বড় বৌ মনে মনে বলল, কত যেন মনে করে রাখো তুমি।
তারপর বলল, রাজার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবকে খেতে বলব আর রাজার পিসি আর পিসেকে। ওর মামা-মাসিদের।
সুধীনবাবু বললেন, দীপু আর শিখাকে বলছ না?
মানে, ও বলছিল, জায়গা কম; লোক বেশি হলে...।
সুধীনবাবু বললেন, জায়গা যত কমই হোক, দীপু-শিখার জায়গার অকুলান হবে না এ-বাড়িতে। অন্তত হওয়া উচিত নয় বলেই মনে হয়।
বড় বৌ বুঝল যে সুধীনবাবু ভীষণ চটেছেন।
বললেন, ওরা তো ভালো খায়, ভালো থাকে। ওরা কি সাধারণ ব্যাপারে আসবে? তারপর পার্টি-ফার্টি তো লেগেই আছে! ককটেল। তাই ভাবছিলাম...।
সুধীনবাবু অনেক বছর পরে বড় বৌয়ের চোখে লাল চোখে তাকালেন। বললেন, কী ভাবছিলে?
এমন সময় নিচ থেকে দীপুর কম্পানির উর্দিপরা ড্রাইভার সুন্দর র্যাপিং পেপারে মোড়া একটা এয়ার রাইফেল, এক বাঙ্ চকোলেট আর লাল গোলাপ ফুল নিয়ে এলো। সঙ্গে শিখার ছোট্ট চিঠি।
রাজাবাবু,
আজ তোমার জন্মদিন। তোমাকে অনেক অনেক আদর পাঠাচ্ছি তোমার ছোট কাকু, মিষ্টি ও ছোট কাকিমা। আমি যখন ও-বাড়িতে ছিলাম তখন তুমি পাশের বাড়ির রুনুর এয়ার রাইফেলটা একদিন চেয়ে পাওনি বলে খুব দুঃখ করেছিলে। আমার মনে আছে। তোমার ছোট কাকু তাই তোমার জন্যে একটা এয়ার রাইফেল পাঠালেন! মিষ্টি ফুল পাঠাল। আর আমি অনেক আদর। তোমার জন্যে পায়েস রেঁধেছি। বিকেলে আমরা সক্কলে তোমার কাছে যাব, পায়েস নিয়ে।
_ইতি ছোট কাকিমা
চিঠিটা পড়ে বড় বৌমার মুখ কালো হয়ে গেল।
সুধীনবাবু বললেন, কে লিখেছে?
শিখা।
কী লিখেছে? দেখি?
বড় বৌ চিঠিটা এগিয়ে দিল।
চিঠিটা পড়ে সুধীনবাবু বড় বৌমাকে ফিরিয়ে দিলেন।
বড় বৌ বলল, আমি যাই শিখাকে ফোন করি গিয়ে।
সুধীনবাবু কিছু বললেন না।
দেবেন ইঁদুরে-কাটা তুলো-টুলোগুলো পরিষ্কার করছিল। বাইরের রাস্তার বকুলগাছে কাক ডাকতে লাগল। হঠাৎ বকুলের গন্ধ এলো নাকে এক ঝলক। নীহারিকা এই গন্ধ ভারি ভালোবাসত।
পাশের বাড়িতে রাজেশ্বরী দত্তর গাওয়া 'এ পরবাসে রবে কে' গানের রেকর্ড বাজছিল।
সুধীনবাবুর মনটা উদাস হয়ে গেল। নীহারিকার বড় প্রিয় গান ছিল এটি। সত্যিই পরবাস! শুধুই স্বার্থকোলাহল; শুধুই বিবাদ।
৩.
বারান্দার বাইরেটা বেলুন আর কাগজে সাজানো হয়েছে। বাচ্চারা হৈচৈ করছে। আজকাল হৈচৈ মোটে সহ্য হয় না সুধীনবাবুর। নিজের ঘরেই আছেন। নিচে গাড়ির শব্দ হলো, বোধ হয় বড় বৌমার দাদা-বৌদিরা এলো। সুধীনবাবুর একমাত্র মেয়ে ফুচি। ওরা এখন দিলি্লতেই সেটেল্ড। এক মাসের ছুটিতে এসেছে এখানে। নীহারিকা থাকলে এখানে এসেই উঠত। নীহারিকা যাওয়ার পর আর ওঠে না। কেন ওঠে না তা বলেনি ফুচি সুধীনবাবুকে। কিন্তু সুধীনবাবু বোঝেন যে হয়তো বড় বৌমা বা মেজ বৌমা অথবা দুই বৌমারই কোনো ব্যবহারে ও বা প্রদীপ দুঃখিত হয়েছে। বোঝেন সব কিছুই। মুখে চুপ করেই থাকেন। একটাই মেয়ে। কিছুই করতে পারেন না ওদের জন্যে। উল্টো মেয়েজামাই-ই সুধীনবাবুকে নিয়ে এখানে-ওখানে যায়। থিয়েটার দেখতে, যাত্রা দেখতে। বড় ও ভালো রেস্তোরাঁতে খাওয়া যায়। পাজামা-পাঞ্জাবি বানিয়ে দেয়। এবারের আসার সময় একটা শাল কিনে নিয়ে এসেছে। কত দামি শাল। কবে এবং কোথায় পরবেন সুধীনবাবু? দিন তো ফুরিয়ে এলো।
শিখা আর দীপুর সঙ্গে কিন্তু খুব ভাব ফুচি আর প্রদীপের। প্রত্যেকটা উইক-এন্ডে ওরা ওদের ওখানে গিয়ে থাকে। এটাও একটা প্রচণ্ড অশান্তির কারণ। মেজ বৌ ও বড় বৌয়ের ধারণা, কভেনান্টেভ অফিসারে অফিসারে মিলে গেছে। দুজনেই সাহেব, তা আমাদের কি আর পছন্দ হবে তাদের?
আরেকটা গাড়ির শব্দ হলো। ফুচি, প্রদীপ, শিখা ও দীপু একসঙ্গে নামল গাড়ি থেকে। ওদের গলার শব্দ পেলেন সুধীনবাবু। তার পরই মিষ্টির পরিচিত জুতোর শব্দ পেলেন সিঁড়িতে। হালকা পায়ের নরম থপ থপ শব্দ। মুখস্থ হয়ে গেছে সুধীনবাবুর। নাতিরা এত দুরন্ত নয়। মিষ্টি, মেয়ে হয়েও ভারি দুরন্ত। এনার্জিতে ভরপুর। ওর হাঁটাচলা, কথা বলা সমস্তই এতই প্রাণবন্ত যে, পরপারের পথে চোখ চাওয়া সুধীনবাবুর ওকে দেখে আবার জীবনকে ব্যাক গিয়ারে ফেলে অনেক দূরে পিছিয়ে মিষ্টির বয়সে পেঁৗছতে ইচ্ছে করে।
মিষ্টি, গাড়ি থেকে নেমেই সোজা দৌড়ে ওপরে আসে দাদু, দাদু, দাদু ডাকতে ডাকতে। মিষ্টি যখন সিঁড়ি থেকে ডাকে দাদু, দাদু, দাদু, তখন সুধীনবাবুও ঘর থেকে উত্তর দেন কি দাদু, কি দাদু, কি দাদু?
মিষ্টি এসেই সুধীনবাবুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আজও পড়ল। সুধীনবাবু ওকে জড়িয়ে ধরলেন জোরে। যখনই মিষ্টিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন সুধীনবাবু, সুধীনবাবুর মনে হয়, যেন বিয়ের সময়ের ছোট্ট বালিকা-বধূ নীহারিকাকেই আদর করেন। তার একটা কারণও ছিল। মিষ্টি যে পাউডার মাখে, নীহারিকাও সেই পাউডার মাখত। একটি পাউডারের গন্ধে মিষ্টির মাধ্যমে তাঁর নীহারিকা তাঁর কাছে ফিরে আসত।
সুধীনবাবু প্রত্যেকবার মিষ্টিকে কোলে নিয়ে ভাবতেন পাউডারের কম্পানি থেকে যায়, শুধু মানুষই চলে যায়।
ফুচি আর প্রদীপও ঘরে এলো দীপুর সঙ্গে। শিখা এলো না। হয়তো পরে আসবে। শিখার মধ্যে, মন-রাখা লোক-দেখানো কোনো ব্যাপারই নেই। সেটা ভালো যেমন, খারাপও। একটু পরে শিখাও এলো। পিছনে পিছনে বড় বৌ মেজ বৌ।
ফুচি হাসতে হাসতেই সত্যি কথাটা বলল, এই বৌদিরা, তোমরা আমার বাবাকে কী করে রেখেছ? ঘরটার কী অবস্থা দ্যাখো তো? এর মধ্যে মানুষ থাকতে পারে? আলমারির মাথায় টিন, নিচে জুতো, ছেঁড়া মশারি, খাটের তলায় পুরো গুদোম! বলেই, চেঁচিয়ে উঠল, ওমা, ওটা কী?
মিষ্টি উত্তেজিত হয়ে হাততালি দিয়ে উঠল, দাদুর কোলে বসে বলল, ইঁদুর। ওমা। পিসি ইঁদুরকে ভয় পায়।
শিখা হাসতে হাসতে বলল, এসব বলিস না ফুচি, বললেই দিদিরা বলবে আমি তোকে শিখিয়ে দিয়েছি।
শিখা কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বড় বৌ বলে উঠল, তুমি তো কয়েক দিন এখানে থেকে বাবার ঘরটা পরিষ্কার করে দিয়ে গেলেই পারো।
শিখা হাসল। বলল, নিশ্চয়ই পারি। কিন্তু তা করলে তোমাদের অপমান করা হয় বলে কখনো তা করিনি। তোমরা যদি অনুমতি দাও তো নিশ্চয়ই করব এবং করে দেখিয়ে দেব যে এই ঘরই কিভাবে রাখা যায়।
বড় বৌ চেঁচিয়ে উঠল, ম্যাগো! বলে।
একট বড় ইঁদুর কামড়ে দিয়েছে পায়ে।
মেজ বৌমা বলল, দিদি শিগগির ওষুধ লাগা, প্লেগ হবে; প্লেগ।
প্রদীপ অবাক হয়ে তাকাল মেজ বৌয়ের দিকে। মেজ বৌদি যে এত অশিক্ষিত জানত না প্রদীপ।
ফুচি বলল, বড়দি চল, চল নিচে। শিগগির ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছি।
তারপর শিখার দিকে চেয়ে বলল, শিখা, আয় দুজনে মিলে কাল এসে বাবার ঘরটা পরিষ্কার করে দিয়ে যাই। বৌদিরা নানা ঝামেলায় সময় পায় না।
শিখা বলল, বেশ তো! খুব ভালো।
ঘর ছেড়ে যাওয়ার আগে দীপু বলল, কেমন আছ বাবা?
এই আছি!
তোমার ব্লাড সুগার? প্রেসার? সব ঠিক?
ঠিকই আছে!
আসলে সুধীনবাবুর এই বয়সে মেপে-খেয়ে, মেপে হেঁটে, প্রেসার মেপে, বেঁচে থাকার আর ইচ্ছা নেই। জীবনের সব প্রয়োজনীয়তা, সার্থকতা তো শেষ। হাইওয়েতে একটা গাড়ির ইঞ্জিন কাট-অফ করে দেওয়া হয়েছে। গিয়ারও নিউট্রাল। এখন যত দূর যায় গড়িয়ে গড়িয়ে। এ গাড়িতে তেল-মবিল দিয়ে আর লাভ কী? গন্তব্যই যখন নেই কোনো, একমাত্র থেমে যাওয়া ছাড়া।
দীপু বলল, আমাদের অফিসের ডাক্তারের সঙ্গে ঠিক করেছি, তোমাকে সপ্তাহে একবার করে দেখে যাবেন।
কেন? আমাদের গজেন ডাক্তার কী দোষ করল?
না। উনিও দেখুন। তবে উনি তো মাঝে মাঝে ডুব দিয়ে দেন।
ঘর থেকে উঠে চলে যাওয়ার সময় দীপু বলল, বাবা, মিষ্টিকে আজেবাজে কিছু খাইও না যেন। ওর সকাল থেকে পেটের গণ্ডগোল। শিখা টিফিন ক্যারিয়ারে করে ওর জন্যে শুকতো নিয়ে এসেছে। ঐ খাবে। ভাতে মাখে।
সুধীনবাবু মুখে বললেন, ঠিক আছে। মনে মনে বললেন, এদের কায়দার শেষ নেই। ছেলেমানুষ, নেমন্তন্ন খেতে এসেছে; তা না টিফিন ক্যারিয়ারের শুকতো খাবে। যত্ত সব।
রাজা ঘরে এলো। মিষ্টির দুই গুণ বয়স রাজার। রাজা বলল, মিষ্টি নিচে চল আমরা কেক কাটব। তুই গান গাইবি না হ্যাপি বার্থডে?
হ্যাঁ! হ্যাঁ করে নেচে উঠল মিষ্টি।
সুধীনবাবু বললেন, আমিও যাব। তারপর মিষ্টির হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামলেন নিচে। ততক্ষণে বাচ্চারা সকলে ভীষণ মেতে গেছে।
কেক কাটা হলো! গান হলো। কেক খাওয়া কিন্তু হলো না মিষ্টির। শিখা খুব নির্দয় মা। বলল, মিষ্টি তোমার ভাগ আমি বাড়ি নিয়ে যাব। কাল ভালো হয়ে গেলে খাবে।
মিষ্টি মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলল না।
সুধীনবাবু বললেন, চলো, কেক কাটা হলো, আমরা ওপরে যাই। তারপর মিষ্টির কানে কানে বললেন, তুমি কি দই খাবে? যদুবাবুর বাজার থেকে দই আনাব?
নাঃ। বলল মিষ্টি।
ওপরে উঠে দেখেন, দেবেন কাবাব রেখে গেছে দুটো। একটা প্লেটে। আর প্লেটটা রেখেছে খাটের নিচে মাটিতে। একটা চামচ পর্যন্ত দেয়নি। দেবেনটা দিনকে দিন...
সুধীনবাবুর শরীরটাও কাল থেকে ভালো নেই। ঠিকই করেছিলেন যে রাতে শুধু দুধ-খৈ খাবেন।
মিষ্টি মুখে কিছু না বলে এমনভাবে তাকাল সুধীনবাবুর চোখে যে সুধীনবাবুর বুকের মধ্যেটা কেমন যেন করে উঠল। ভদ্রলোক অপত্যস্নেহ কাকে বলে জীবনে জেনেছিলেন। কিন্তু আসলের প্রতি যে স্নেহ, যে দরদ; তার মধ্যে কিছুটা তবু ভারসাম্য থাকে। সুদের প্রতি স্নেহ ও দরদে তা থাকে না। যিনি দাদু বা দিদা হননি, তিনি জানেন না সুদের কী টান। কী কষ্ট? যে নাতি বা নাতনির প্রতি স্নেহ আছে অসীম, কিন্তু যার মালিক তার মা ও বাবা; তাকে আদর করতে, তাকে হাত ধরে বেড়াতে নিয়ে যেতে যখন তাঁর নিজের অনিচ্ছুক ছেলে-মেয়ের অনুমতি চাইতে হয়, তখন বুকের মধ্যে বড় কষ্ট হয়। আসলের চেয়ে সুদ অনেকই দামি। সুদকে ভালোবাসায় ভীষণ জ্বালা!
হঠাৎ সুধীনবাবুর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তাঁর নিজেরও কি কোনো দাবি নেই নাতনির ওপর?
উনি মিষ্টিকে বললেন, তোমার কি এখন পেট ব্যথা করছে?
না তো দাদু।
তবে কী অসুবিধা?
জানি না। সকালে তিনবার পাই করেছিলাম।
তারপর আর যাওনি?
ওষুধ খেয়েছ?
হ্যাঁ। মেকসাফর্ম।
দাঁড়াও। বলে সুধীনবাবু উঠে দাঁড়ালেন। তারপর দরজাটা বন্ধ করলেন ঘরের। বন্ধ করেই তাড়াতাড়ি কাবাবের প্লেটটা হাতে করে এনে মিষ্টিকে বললেন, খাও দাদু।
দুটোই? মিষ্টি বলল। তারপর বলল, তুমি একটা খাও দাদু।
দুটোই তুমি খাও। আমি খাব না।
মিষ্টির চোখ-মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কাবাব মুখে দিল মিষ্টি।
কেমন লাগছে? সুধীনবাবু বললেন।
ভালো। মিষ্টি বলল। তারপর বলল, ঝাল। তার পরই বলল, গন্ধ লাগছে।
সুধীনবাবু ভাবলেন, শিখা মেয়েটাকে বেশি যত্নে যত্নে একেবারে স্পয়েল করে ফেলেছে। এদের ইমিউনিটি বলে কিছুই ডেভেলপ করেনি। যা কিছু খায়, তাতেই অসুখ।
সুধীনবাবু বললেন, আরেকটা খাও।
মিষ্টির চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। বলল, না থাক। খুব ঝাল।
সুধীনবাবু বললেন, দাঁড়াও তোমাকে জল দিই। দেবেনকে এখন ডাকলেই তো জানাজানি হয়ে যাবে। শিখা বা দীপু এক্ষুনি চলে এলে প্রচণ্ড ঝামেলা বাধাবে। ফুচিও আসতে পারে। তাই নিজেই বারান্দায় গিয়ে কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে এনে মিষ্টিকে দিলেন।
মিষ্টি জল খেয়েই বলল, দাদু, আমি মার কাছে যাব।
কেন দাদু? কী হলো?
ভালো লাগছে না।
কেন ভালো লাগছে না? হলোটা কী তোমার?
না। এমনিই।
আমি পেঁৗছে দিয়ে আসব? না তুমিই যাবে?
আমি যেতে পারব নিচে।
আচ্ছা। তবে যাও। বাড়ি যাওয়ার আগে আমাকে বলে যেও। একটা আব্বা দিয়ে যেও আমাকে।
আচ্ছা!
মিষ্টি দরজার কাছে পেঁৗছতেই সুধীনবাবু বললেন, কাউকে বোলো না যেন কথাটা!
মিষ্টি হাসল।
ভারি স্মার্ট মেয়েটা। চোখ পিটপিট করে বলল, কাউকে বলব না। প্রমিস।
দেবেন মশারি গুঁজে দিতে এসেছিল। সুধীনবাবু বাঁধানো দাঁতের পাটিটা খুলে একটা জলভরা বাটির মধ্যে রাখলেন। রাতে দুধ খই-ই খেয়েছিলেন। এখন শরীরটা ভালোই লাগছে। নিচে এখনো ওদের গলা পাচ্ছেন। এগারোটা বাজে। খাওয়া-দাওয়া হতে বারোটা-সাড়ে বারোটা হবে। শিখা মিষ্টিকে নিয়ে আগেই চলে গেছে। মিষ্টির শরীরটা নাকি ভালো নেই। দীপুকে ফুচি আর প্রদীপ নামিয়ে দিয়ে যাবে ট্যাঙ্ িকরে। মিষ্টির শরীরটা ভালো নেই শুনে ভয়ে সুধীনবাবুর মুখ শুকিয়ে গেছে। শিখার রাগী মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে।
মশারিটা গুঁজে দিয়ে দেবেন বলল, কাল ঘরে গন্ধ পেলে বলবেন বাবু।
কিসের গন্ধ?
ইঁদুর পচার।
কেন? ইঁদুর পচবে কেন? সুধীনবাবু শুধোলেন।
পচবে না? দুটো কাবাবে ভালো করে ইঁদুর মারা ওষুধ মাখিয়ে রেখেছিলেন খাটের নিচে। একটা এরই মধ্যে খেয়ে ফেলেছে ব্যাটারা। একটা ইঁদুরে নিশ্চয়ই খায়নি। ধেড়ে ইঁদুরের বংশ নির্বংশ হবে এক কামড় খেলে।
সুধীনবাবুর হৃৎপিণ্ডটা খাঁচা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইল এক লাফে।
সোজা খাটে উঠে বসলেন। বললেন, দাঁড়া দাঁড়া দেবেন।
তারপর মশারি ছেড়ে বাইরে এলেন। বললেন, কোথায় দেখি, তোর কাবাব।
এই তো! বলেই দেবেন মিষ্টি যে-প্লেটে থেকে খেয়েছিল সেটা টেনে বের করল।
হতভম্ব হয়ে অনেকক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলেন সুধীনবাবু।
এমন সময় নিচ থেকে দেবেনকে মেজ বৌমা ডাকল। দেবেন নিচে গেলেই ফিসফিসে গলায় বলল, বাবা শুয়ে পড়েছেন? খেলেন না?
না। শরীর ভালো নেই।
মেজ বৌমা বলল শোনো, মিষ্টির খুব শরীর খারাপ হয়েছে। ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। এক্ষুনি ফোন এসেছিল ছোট বৌদির। বাবাকে এ কথা এখন বোলো না। সকালে ঘুম থেকে উঠলেই আমরা অসুখের খবর দেব। সকালে দেখতেও নিয়ে যাব।
দেবেন ওপরে ফিরে গেল।
সুধীনবাবু ইজিচেয়ারে গিয়ে বসেছিলেন। টেবিলের ওপর মিষ্টির একটা ছবি ছিল। সেদিকে তাকিয়েছিলেন। নীহারিকার ছবির দিকেও। দেবেন আসতেই বললেন, বৌদি ডাকল কেন?
না, এমনি...
বেশি চালাক হয়েছিস না? কী হয়েছে বল?
কিছু তো হয়নি। আপনার কাজ শেষ করে নিচে মেজবাবুর বিছানা ঠিক করে দিতে বললেন।
ও। তুই মিথ্যে বলছিস না?
না বাবু।
আমাকে টেলিফোনের বইটা দে। গজেন ডাক্তারের ফোন নম্বর জানিস?
না। বলে, দেবেন বইটা এনে দিল। চশমাটা নাকে লাগিয়ে গজেন ডাক্তারের ফোন নম্বরটা বের করে পাশের ঘরে গিয়ে ডায়াল করলেন। দেবেনকে বললেন, তুই নিচের যা কাজ আছে, সেরে, তারপর আমার কাছে আয়।
দেবেন চলে গেল নিচে।
গজেন?
বলছি। কে? বড় কর্তা নাকি? কেমন আছেন? রোজ শোওয়ার সময় ক্যাম্পোজ খাচ্ছেন তো একটা করে?
তা খাচ্ছি। শোনো, ইঁদুর মারার ওষুধ।
মানে? বলেন কী আপনি? মাথা খারাপ হলো নাকি?
না, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করছি। কোনো খাবারে, ইঁদুর মারার ওষুধ বেশি করে দিয়ে যদি কোনো বাচ্চাকে খাওয়ানো যায়, তবে তার এফেক্ট কী হবে?
গজেন ডাক্তার হেসে বলল, আপনি কি গোয়েন্দা গল্প লিখছেন নাকি?
আঃ, গজেন, যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দাও।
এফেক্ট আর কী হবে? মরে যাবে।
সুধীনবাবুর হাতটা রিসিভার থেকে আলগা হয়ে এলো।
বললেন, আর উ্য শিওর?
অ্যাব্সলুটলি।
খাওয়ার কতক্ষণ পরে মারা যাবে?
স্টম্যাক পাম্প না করলে অল্পক্ষণের মধ্যেই।
আচ্ছা? ঠিক আছে।
গজেন ডাক্তার বললেন, ব্যাপারটা...
গজেন ডাক্তারের কথা শেষ হবার আগেই সুধীনবাবু ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।
দেবেন ফিরে এলো একটু পরে। বলল, কী হলো বাবু, ঘুমোবেন না। লাইট নিভিয়ে দেব?
সুধীনবাবু বললেন, ঘুমবো রে ঘুমবো। আমাকে ঘুম পাড়ানোর জন্যে তোদের এত তাড়া কিসের?
তার পরই বললেন, মিষ্টিকে কখন হাসপাতালে নিয়ে গেছে রে?
দেবেন অবাক হলো। তার পরেই ভাবল, গজেন ডাক্তারের কাছে শুনেছেন বোধ হয়।
বলল, এক্ষুনি।
সুধীনবাবু মনে মনে হিসেব করলেন, মিষ্টি সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় তাঁর কাছে এসেছিল। এখন বাজে সাড়ে এগারোটা। অনেক ঘণ্টা।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ দেবেনের ওপর রেগে উঠলেন তিনি। বললেন, তুই ভেবেছিস কী? রয়ে রয়ে মুরলি বাজাবি? এক্ষুনি আরো আন, বিষ আন, সারা ঘরে খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে রাখ, যাতে ঘরের যত ইঁদুর আছে এক দিনেই মরে যায়। তুই রোজ রোজ এই রকম বিষ দিবি নাকি? রোজই ইঁদুর পচাবে? এটা কি ধাপার মাঠ পেয়েছিস?
কাবাব তো নেই। অবাক হয়ে বলল, দেবেন। বিষ মেশাব কিসে?
নবাব হয়েছেন। ইঁদুরকে কাবাব খাওয়াতে হবে না। পাউরুটি আন। তাতে বিষ মাখিয়ে রাখ। যা শিগগির যা।
দেবেন চলে যেতেই, স্লিপিং পিলের শিশিটা নিয়ে এলেন তাড়াতাড়ি দেরাজ খুলে।
তারপরে প্যাড বের করে, বলপেন বের করে, চশমা নাকে দিয়ে দ্রুত চিঠি লিখলেন একটা। খামে ভরে, মুখ বন্ধ করলেন সেটার।
দেবেন ফিরে এলেই বললেন, রাখ ওখানে। আমি নিজে দেব আনাচে-কানাচে।
আপনি কেন? আমিই দিচ্ছি। বলে, দেবেন ভালো করে বিষ মাখিয়ে রুটির টুকরাগুলো এদিকে-ওদিকে সব দিকে দিয়ে দিল। আলমারির নিচে, খাটের নিচে_সব জায়গায়।
সুধীনবাবু বললেন, আমি এখন পড়ব। তুই মশারিটা গুঁজে দিয়ে যা। জল দিয়েছিস?
হ্যাঁ। সব দিয়েছি।
দেবেন চলে যাওয়ার আগে খামে বন্ধ চিঠিটা দেবেনের হাতে দিয়ে বললেন, কাল সকালে এই চিঠিটা ছোট বৌদিকে পাঠিয়ে দিবি ড্রাইভারকে দিয়ে। কেউ না থাকলে, তুই নিজে যাবি। জরুরি চিঠি। কাল সকালে বুঝলি?
আচ্ছা। দেবেন বলল।
এবার যা। ভালো করে খাওয়া-দাওয়া কর। হাত ধুয়ে নিস ভালো করে। অনেক খাটনি গেছে আজ তোর।
দেবেন বলল, খাটনির কথা বলবেন না বাবু! অন্যরা তো সব গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়াচ্ছে। খাটনি যা, সব দেবেনেরই। তাও তো আপনি বেশি ভালোবাসেন বলে অন্য সব লোকের কী আক্রোশ আমার ওপর।
দেবেন চলে যাচ্ছিল। সুধীনবাবু ডাকলেন। বললেন, তুই একটা হাতঘড়ি চেয়েছিলি না আমার কাছে? বলেই, নিজের রোলেকস ঘড়িটি বালিশের তলা থেকে তুলে দেবেনকে দিলেন।
বললেন, এটা তুই রাখিস।
এ কী! এ কী! বলল দেবেন। এটা যে আপনার নিজের ঘড়ি। এত দামি!
তা হোক। তুইও দামি। তুই-ই নে। সময়ের দাম ফুরিয়ে গেছে আমার কাছে। ঘড়িতে আমার আর কী দরকার?
তাহলেও। বলল, দেবেন।
এবার যা ভাগ। আমি পড়ব। সুধীনবাবু ওকে তাড়ালেন।
দেবেন চলে যেতে ভাবল, আজ ঘড়িটা কাউকে দেখাবে না। কাল দেখাবে। ঠাকুর, নটবর সকলকে চমকে দেবে ঘড়িটা দেখিয়ে। তার পরই ভাবল, ওরা আবার ভাববে না তো যে চুরি করেছি? ভাবলে কী? বাবুর কাছে ডেকে আনব। বাবুর নিজের মুখেই শুনুক ওরা দেবেনের কী পজিশন এ বাড়িতে।
দেবেন চলে যেতেই দরজাটা বন্ধ করে দিলেন সুধীনবাবু। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে সারা ঘরময় ঘুরে ঘুরে পাউরুটির টুকরাগুলো তুলে খেতে লাগলেন। যেন শিশু হয়ে গেলেন সুধীনবাবু। মিষ্টির চেয়েও ছোট। হামাগুড়ি দিয়ে গাবা মেরে মেরে যমকে মুখে পুরতে লাগলেন, তারপর দাঁতে কাটতে লাগলেন। ছিঁড়ে ছিঁড়ে মৃত্যুকে খেতে লাগলেন তিনি।
বড় জ্বালা করতে লাগল বুক, পেট। আঃ মিষ্টি! দাদু আমার। প্রমিস। তুমি তোমার প্রমিস রেখেছ দাদু। অত যন্ত্রণাতেও প্রমিস ভাঙোনি। এ আমি কী করলাম? মিষ্টি সোনা আমার, কী করলাম আমি! শেষে...শিখা তুমিই ঠিক। বুড়োগুলোর কোনো দিশা নেই।
রুটির টুকরোগুলো চিবোতে চিবোতে, গিলতে গিলতে মনে মনে বললেন; তোমার কী হবে শিখা? দীপুরও কী হবে? মিষ্টিকে ছাড়া তোমরা বাঁচবে কী করে? মনে মনে বলতে লাগলেন সুধীনবাবু।
তারপর স্লিপিং ট্যাবলেটের শিশি খালি করে মুঠো করলেন, দু গ্লাস জলের সঙ্গে সব গিলে ফেললেন।
ফেলেই, কোনোক্রমে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়লেন।
*৪.
বাইরে ভোর হয়ে আসছিল। নার্সিং হোমের ওয়েটিং রুমে বসেছিল ওরা। শিখা, ফুচি, প্রদীপ, অন্যরা। দীপু ভেতরে ছিল ডাক্তারদের সঙ্গে। মেজ বৌ ছিল বাড়িতে, বাচ্চাদের আগলাতে।
ডাক্তার ব্যানার্জি এসে শিখাকে ডাকলেন।
ডাক্তার ব্যানার্জি ভণিতা না করেই বললেন, উই আর সরি। ইট ওয়াজ আ কেস অব পয়জনিং। পুরো চিকিৎসাই তো প্রথমে অন্য রকম হয়েছিল। দেরিও হয়ে গেছিল...
এখন আর কোনো কষ্টই নেই মিষ্টির।
সুধীনবাবু গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
সুধীনবাবুর খুব কষ্ট হতে লাগল। কষ্টের মধ্যেই যেন হঠাৎ মনে হলো, ঘরময়, বাড়িময় তাঁর মস্তিষ্কময়ই ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি করছে।
উনি দেখলেন, তাঁর ছেলেমেয়ে বৌমারা সকলেই ইঁদুর। তেমনই দৌড়াদৌড়ি করছে। তাঁর বাড়িতে, কলকাতা শহরের সব বাড়িতে যেন লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি ইঁদুরের বাস। ওরা নিরন্তর কুটি কুটি করে কাটছে। সম্পত্তি কাটছে, সম্পর্ক কাটছে, সুখ-শান্তি-ভালোবাসা, মায়া-মমতা-সততা সব কিছুই কাটছে। খাওয়ার লোভে নয়। শুধু কাটারই লোভে।
মেজ বৌমা বলেছিল, ইঁদুররা কিছু না কেটে বেঁচে থাকতে পারে না। ঈর্ষায় কাটছে, পরশ্রীকাতরতায় কাটছে, লোভে, ঘেন্নায় কাটছে, একে অন্যকে ইঁদুরগুলো; সর্বক্ষণ কুটুর্ কুটুর্ কুটুর্...
হঠাৎই তাঁর মনে হলো, এতগুলো ইঁদুরের মধ্যে উনি এত দিন ছিলেন কী করে?
একটা বিরাট চওড়া মসৃণ রাস্তা। কিন্তু সুন্দর গন্ধভরা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। কত ফুল, পাখি, প্রজাপতি। তাঁর হাতে স্টিয়ারিং। পাশে মিষ্টি বসেছিল। একটা সুন্দর হলুদ-সাদা ফুল-ফুল ফ্রক পরে।
সবে ভোর হয়েছে। ফুরফুর করে হাওয়া লাগছে গায়ে।
মিষ্টি বলল, ও দাদু। দিদার কাছে কখন পেঁৗছব?
এই তো! পেঁৗছে গেলাম বলে।
সুধীনবাবু বললেন, দিদা তোমাকে দেখে কী বলবে?
কী বলবে আবার? আদর করবে?
তুমি দিদাকে কী বলবে?
কিছু বলব না। আব্বা দেব।
দাদু একটা গল্প বলো না, যেতে যেতে। মিষ্টি বলল।
সুধীনবাবু বললেন, জানো দাদু; একজন বাঁশিওয়ালা ছিল। তার নাম হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা। সে না একদিন সব ইঁদুরকে বাঁশি বাজিয়ে বাজিয়ে; বাজিয়ে...
সুধীনবাবু ওকে দেখে পা দুটো নামিয়ে ফেললেন।
মুখে গাম্ভীর্য এনে বললেন, ইঁদুর।
শ্যামা অনেক দিনের লোক। মা, মানে সুধীনবাবুর স্ত্রী থাকতেই সে দশ বছর এ বাড়িতে কাজ করেছে। সুধীনবাবুর বড় ছেলে এবং মেজ ছেলের বাচ্চারা সবাই শ্যামার হাতেই মানুষ। ওর শরীরে মায়াদয়া আছে। বয়সও হয়েছে। কপালের দুপাশের চুলগুলো সব রুপোলি হয়ে গেছে। নিজেরও গেঁটে বাত ও ডায়াবেটিসের কারণে বাবুর দুঃখ ও একটু একটু বোঝে।
শ্যামা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ইঁদুরই তো! ঘর থেকে যে বাঘ বেরোয়নি এই যথেষ্ট! কী অবস্থা করেছে দেবেন ঘরটার। আর বৌদিদেরও বলিহারি যাই। বুড়ো শ্বশুরের দিকেও তো মানুষ একটু দেখে। নিজেদের ঘরও তেমনই, কী নোংরা; কী নোংরা।
সুধীনবাবু কখনো পরনিন্দা পরচর্চা প্রশ্রয় দেননি। এখনো দেন না। চাপা ধমক দিলেন তিনি শ্যামাকে। বললেন, আঃ শ্যামা। যাও, নিজের কাজ করো। দেবেন এলে পাঠিয়ে দিও আমার কাছে।
শ্যামা গজগজ করতে করতে চলে গেল।
সিঁড়ির কাছে গিয়েই শ্যামা চুপ করে গেল। বৌদিরা কেউ তার বক্তৃতা শুনতে পেলে আর রক্ষা নেই।
সুধীনবাবুর চোখ দুটো ভারী হয়ে এলো। তাঁর আপন বলতে যে একমাত্র মানুষটি ছিল সেই নীহারিকাই চলে গেছেন দু বছর হলো; যদিও নীহারিকা থাকাকালীন তিনি যে তাঁর এতখানি আপন সে-কথা পঁয়তালি্লশ বছরের পার্টনারশিপেও কখনো বুঝতে পারেননি সুধীনবাবু। দাবি করার, জোর খাটানোর, ঝগড়া করার মানুষ ঐ একজনই ছিল।
নীহারিকার ছবির দিকে তাকালেন একবার সুধীনবাবু। বড় ছেলে একটা অয়েল পেইন্টিং করে এনেছে কাকে দিয়ে যেন অনেক পয়সা খরচ করে। বেঁচে থাকাকালীন সপ্তাহে এক দিনও ছেলে মা বলে ডাকেনি, কি মা-বাবার ঘরে আসেনি পর্যন্ত। আর মায়ের মৃত্যুর পর ছবি বাঁধিয়ে এনে ভালোবাসার পরাকাষ্ঠা দেখাচ্ছে!
মেজ ছেলে গত মৃত্যুদিনে কাগজের ফুলের একটা সাদা মালা এনে নীহারিকার ছবির গলায় পরিয়ে দিয়েছিল। এখন সে সাদা কাগজের ফুলের চেহারা হয়ে গেছে প্রায় রুদ্রাক্ষের মতো। এত ধুলো পড়েছে যে ছবি তো দূরের কথা, মালাটাতেও হাত ছোঁয়ানো যায় না। মানুষটা চলে গেছে বলে কী কাগজের মালা পরিয়ে তাকে অবহেলা করতে হয় এমন করে? ছেলে-বৌরা কি রোজ একটা করে সাদা ফুলের মালাও নীহারিকার গলায় পরাতে পারে না? যে তাদের স্তন্যদায়িনী, যে কোলে-কাঁখে করে মানুষ করল, যে সারা জীবনে এক দিনও স্বামীর সঙ্গে সিনেমা দেখতে গেল না পাছে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ক্ষতি হয়; সেই মানুষটাকে? জন্মদাত্রী, পরম শুভার্থী মাকেও ওরা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেল? ভেবে বড়ই কষ্ট পান সুধীনবাবু।
দেবেন এলো। বলল, ডাকছিলেন?
সুধীনবাবুর কথা বলতে ইচ্ছে করল না। মুখে শুধু বললেন, ইঁদুর।
দেবেন ঘরে আসার আগেই শ্যামার মুখে শুনেছিল। বলল, আজ ইঁদুরের বিষ আনব। মজা টের পাবেন বাছাধনরা।
সুধীনবাবু আস্তে আস্তে বললেন, ঘরে ইঁদুরের চাষ করে তারপর বিষ দিয়ে মারা কেন? চাষটা বন্ধ করো না ঘরে।
তারপর বললেন, প্রিভেনশান ইজ বেটার দ্যান কিওর।
সুধীনবাবু অভ্যেস বশেই বলে ফেললেন ইংরেজি। দেবেন ইংরেজিটা বুঝতে পারল না। বলল, ঝাড়ব ঘর। একা লোক চারদিকের কাজ সামলাতে পারি না। এই বড়দা ডাকল সিগারেট আনতে, মেজদা ডাকল পান আনতে, তাও তো ছোড়দারা এ বাড়িতে থাকে না। বাঁচোয়া। বৌদিরাও কি কম ডাকাডাকি করে? শুধু আপনার একার কাজ করলে না হয় এসব ঠিক ঠিক করে রাখতাম।
এসব কথাতে সুধীনবাবু আজকাল সত্যিই বিরক্ত হন। এসব কথা শুনতে বা আলোচনা করতেও চান না তিনি। তাঁর একার কাজের জন্যে তো দেবেনকে অথবা বাড়ির কাউকেই রাখা হয়নি। তাই এসব কথা কোনো ছেলে বৌয়ের কানে গেলে মিছিমিছি অশান্তিই বাড়বে। যত দিন নীহারিকা ছিল, তখন অন্য কথা। আজ তার এই অবসরপ্রাপ্ত, কর্মহীন, অপ্রয়োজনীয় জীবনে এই রকম তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অশান্তি ভালো লাগে না। একা ঘরে ইজিচেয়ারে বসে যতই অনাদর-অবহেলা পান, ততই যেন অসহায়তায় চোখের কোল দুটো জ্বালা করে। নীহারিকার কথা মনে পড়ে।
এই বয়সে সকলেই একটু দেব-দেবী গুরুটুরুর দিকে ঝোঁকে। সুধীনবাবুর ঐসব দুর্বলতা কখনো ছিল না। সুধীনবাবুর ধারণা যে যারা জীবনে অনেকানেক অন্যায় করে তারাই শেষ জীবনে হঠাৎ ঠাকুর দেবতার শ্রীচরণে হুমড়ি খেয়ে পড়ে পাপক্ষালন করতে চায়। না, সুধীনবাবু যৌবনেও ওসব করেননি; বার্ধক্যেও করবেন না।
সবচেয়ে মুশকিল হয় সময় নিয়ে। সময়ের ভার বড় ভার। যাঁরা বেশি বয়সে স্বামী হারান, তাঁরা এতটা একা হয়ে পড়েন না। কারণ বিধবাদের পক্ষে সংসারের মধ্যে অনেকখানি সময় আদরেই হোক কি অনাদরেই হোক, কেটে যায়ই। কিন্তু বিপত্নীক পুরুষ মানুষ সত্যিই বড় নির্জন। সময় তাঁদের বুকে পাথরের মতো চেপে বসে। কিছুতেই নড়তে চায় না। বই পড়ে সময় কাটাতেন আগে, কিন্তু এখন চোখও বিদ্রোহ করছে। দুটি চোখেই ছানি পড়েছে অথচ ম্যাচিওর করেনি যে কাটাবেন। সন্ধের পর টিভি দেখে সময় কাটে। তবু শনি-রবিবার বাংলা-হিন্দি সিনেমা যখন হয়, তখন আজকাল আর দেখেন না। ছেলে বৌরা বন্ধুবান্ধব নিয়ে জমিয়ে বসে সিনেমা দেখে। তাই হংসমধ্যে বকযথা হয়ে থাকতে খারাপ লাগে তার। একদিন আড়াল থেকে শুনেছিলেন, বড় বৌ বলছিলেন কাউকে। 'বুড়োর রস কম নয়।'
এসব শুনেও গায়ে মাখেন না বিশেষ সুধীনবাবু। মাখেন না, এই কারণে যে এ বাড়িটা তাঁর, তাঁর বাড়িতেই ছেলে-বৌ-নাতি-পুতিরা রয়েছে। এই বাজারে আলাদা আলাদা বাড়ি নিয়ে থাকতে হলে প্রত্যেকেই বুঝত। বড় সরকারি চাকরি করতেন বলে এখনো মাসে হাজার টাকা করে পেনশন পান উনি। তা ছাড়া ফিঙ্ড ডিপোজিটের সুদও আছে। নিজের কোনো ব্যাপারে তিনি পরের মুখাপেক্ষী ননই, উপরন্তু তিনি ছেলেদের সংসারে প্রতি মাসে নিজের সামর্থ্যের প্রায় সবটাই ঢেলে দেন। এ কারণেই আর্থিক বিষয়ে কোনো রকম মানসিক দৈন্য কখনো বোধ করেননি। যতটুকু অবহেলা পান সুধীনবাবু, তা নিছক জেনারেশন গ্যাপ এবং নীহারিকার স্বার্থপরের মতো আগে চলে যাওয়ার দোষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েই নিশ্চিন্ত থাকেন।
টেলিফোনটা বাজছিল। টেলিফোনটা নিচের বসার ঘরে আছে। ওঁর ঘরে একটা এঙ্টেনশন আছে। টেলিফোনটা বেজেই চলল অথচ কেউই ধরছে না। দেবেনটাই বা কোথায় গেল?
যখন কেউ ধরল না, তখন অগত্যা নিজেই উঠলেন। কোমরটা কনকন করে উঠল। ধীরে ধীরে গিয়ে রিসিভারটা তুললেন। ওপাশ থেকে মিষ্টির গলা ভেসে এলো।
কে_এ_এ? দাদু?
সুধীনবাবুর মুখ-চোখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, হ্যাঁ দাদু। তোমার কী খবর?
_ভালো। ওপাশ থেকে পাঁচ বছরের মিষ্টি বলল।
_তুমি কবে আসবে আমাদের বাড়ি?
_আসব না। আড়ি তোমার সঙ্গে।
সুধীনবাবু উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, কেন? কেন? আড়ি কেন? কী করেছি আমি?
_তুমি আমাকে রথ কিনে দিলে না কেন? আজ না রথ! আমাদের বাড়ির দোতলার মিঠুকে ওর দিদা কিনে দিয়েছে। পাশের বাড়ির বুজুকে ওর বাবা কিনে দিয়েছে। আমাকে কেউ কিনে দিল না।
সুধীনবাবু বললেন, ঠিকই তো। বড্ড ভুল হয়ে গেছে তো! ভেরি সরি। তোমাকে কালই কিনে দেব।
মিষ্টি বলল, কাল কিনলে কি হবে? রথ তো আজ হয়েই গেল।
তাতে কী? উল্টোরথের দিন টানবে।
_আচ্ছা। আশ্বস্ত হয়ে বলল মিষ্টি।
তোমার মা-বাবা কোথায়?
_পার্টিতে গেছে।
_তুমি একা আছ?
_না, বেলাদি আছে।
_তুমি খেয়েছ?
_না, খাব।
_কী খাবে?
_এই ভাত, পেঁপের তরকারি, আমার তো শরীর ভালো না। ও জানো দাদু, দাদু; আজ না কাঁচকলার ঝুরি করবে রঘুদাদা। ঝুরি খেতে কি ভালো, না?
_হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব ভালো।
আজ থেকে দশ বছর আগে হলে এই কথার উত্তরে সুধীনবাবু হয়তো বলতেন, খুব ভালো। ঝুরি, ঝুড়ি ঝুড়ি খেতে ভালো।
তখন কত সহজে রসিকতা করতে পারতেন। কত আনন্দ ছিল মনে। আজকাল নিজের সবচেয়ে প্রিয় ছোট্ট একমাত্র নাতনির সঙ্গেও রসিকতা করেন না তিনি।
তারপর বললেন, শোনো, আমি এক্ষুনি মেলায় যাচ্ছি তোমার জন্যে রথ কিনতে। তুমি কি আসবে এখানে? মেলায় যাবে আমার সঙ্গে?
_এখন? এখন কি করে যাব? এখন তো খাব। মা বকবে এখন গেলে। কার সঙ্গে যাব?
_ঠিক আছে।
তারপর বললেন, আজ রথ, তুমি পাঁপর ভাজা খেয়েছিলে?
_পাঁপর ভাজা? না তো। রথের দিনে বুঝি পাঁপর ভাজা খেতে হয়?
_হয় তো। আমরা তো তাই-ই খেতাম ছোটবেলায়। তোমার দিদা থাকতেও। এবারে খাইনি।
_মা পাঁপর ভাজা খেলে রাগ করে। বলে, পেট আপসেট করবে।
_ও_ও। না, না। তাহলে খেও না।
রেখেদি? মিষ্টি গলায় বলল।
আচ্ছা।
নাতনি রিসিভার নামিয়ে রাখল।
সুধীনবাবু ডাকলেন, দেবেন।
সাড়া নেই। আবারও ডাকলেন, দেবেন, অ্যাই দেবেন।
সাড়া নেই।
ঠাকুর সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল ওপরে। বলল, দেবেনের সঙ্গে তো আমার রাস্তায় দেখা হলো, বাবু। দেবেন তো ঋষির দোকানে গেল_বৌদিদের জন্যে ভেলপুরি কিনতে। আর দই-বড়া।
ড্রাইভারকে ডাকো তো ঠাকুর। সে কি আছে? না চলে গেছে।
ড্রাইভার তো বড়দাকে নিয়ে বেরোল, বলছিল নাখুদা মসজিদের কাছে যাবে। রয়্যাল না কী হোটেল আছে, সেখান থেকে বিরিয়ানি পোলাউ আনবে। বড়দার সম্বন্ধীরা খেতে আসছেন।
_ঠিক আছে। বললেন সুধীনবাবু।
তারপর আস্তে আস্তে ধুতিটা পরলেন। আলমারি খুলে হ্যাঙার থেকে এন্ডির পাঞ্জাবিটা বের করলেন। ছাতাটা নিলেন। তারপর সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেন। আজকাল তিনি বাড়ি থেকে বেরোলে কোথায় যাচ্ছেন, কখন ফিরবেন এবং আদৌ ফিরবেন কি না তা জিজ্ঞেস করার লোক কেউ নেই। উনি ভাবেন, ভালোই হয়েছে। একেবারে মুক্তপুরুষ।
মেজ বৌ বসবার ঘরে বসেছিল। বলল, গাড়ি তো দাদা নিয়ে গেছেন, গাড়ি ছাড়াই বেরোচ্ছেন, বাবা?
_হ্যাঁ।
মেজ বৌও আর কিছু বলল না, সুধীনবাবুও না।
সুধীনবাবু বুঝলেন যে মেজ বৌয়ের তাঁর সম্বন্ধে যত না মাথাব্যথা, দাদাই যে গাড়িটা বেশি ব্যবহার করে এ কথাটা তাঁকে জানানোর উৎসাহই তার চেয়ে অনেক বেশি।
টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল সকাল থেকে। তখনো পড়ছিল। ছাতাটা খুললেন তিনি। রথের দিনে প্রতিবছরই বৃষ্টি হয়। সারা পথ কাদা প্যাচ প্যাচ করছে। হাঁটুতে এতই ব্যথা যে পদ্মপুকুর হেঁটে যাওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব। মোড়ে এসে রিকশা নিলেন। তারপর মেলায় পেঁৗছে একটা রথ কিনলেন সাড়ে চার টাকা দিয়ে। জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার কাঠের মূর্তিও কিনলেন।
ফেরার সময় একটা মিনিবাস আস্তে করে ধাক্কা দিল রিকশাটাকে। একটু হলে তিনি ও রিকশাওয়ালা দুজনেই পড়ে যেতেন। কিন্তু পড়লেন না। রিকশায় চড়া মানেই লোকের কাঁধে চড়া। যৌবনে কখনো সে জন্যে রিকশায় চড়েননি তিনি। কিন্তু এখন নিজের পায়ের ওপর আর কোনো জোর নেই বলে পরস্কন্ধারূঢ় হন নিরুপায়েই।
গাড়িটাও তাঁর নিজেরই। যেবার প্রথম ওভারহেড ভাল্বের অ্যাম্বাসাডর বেরোল, সেবার কিনেছিলেন। আজ অনেক বছর হলো। কন্ডিশন এখনো ভালোই আছে। এক হাতের গাড়ি ছিল। এখন ছেলেরাই চড়ে। ওরাই চাঁদা করে ড্রাইভার রেখেছে। ছেলেরা অবশ্য বলে, বাবা, যখনই আপনার দরকার একটু আগে বলে দেবেন, গাড়ি নিয়েই বেরোবেন। কিন্তু নিজের গাড়ি নিয়ে বেরোতে হলে পাঁচ দিন আগে থেকে অন্যদের বলাবলি তাঁর পছন্দ হয় না।
তা ছাড়া, যাবেনই বা কোথায়? সত্তর বছরে পেঁৗছে সংসারে বন্ধু, হিতাকাঙ্ক্ষী আত্মীয়-পরিজনের স্বরূপ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন তিনি। যত দিন বড় সরকারি চাকরিতে ছিলেন, প্রভাব-প্রতিপত্তি, বেকারদের চাকরি করে দেওয়ার ক্ষমতা এ সমস্ত বিদ্যমান ছিল, তত দিন তাঁর কাছে লোকের ভিড়ের অভাব হয়নি। বন্ধুরা এসেছে দলে দলে। আজকে সারা দিনে দুটো কথা বলার লোকও পান না একজনও। তাই গাড়ির প্রয়োজন তার মিটেই গেছে। যখন দরকার হয় তখন এমন হঠাৎ হঠাৎই দরকার হয়। আগে বলবার সময় কোথায় পান?
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই প্রতিবেশী জগবন্ধুবাবুর সঙ্গে দেখা। ময়দার কল আছে ভদ্রলোকের। হাসিখুশি মোটাসোটা আমুদে মানুষ। বয়সে সুধীনবাবুর চেয়ে বছর চার-পাঁচের ছোট। তিনি গাড়ি থামিয়ে দুটো কথা বলে নিলেন। বললেন, কী খবর বড় সাহেবের? গেছিলেন কোথায়? রিকশা কেন? গাড়ি কী হলো?
সুধীনবাবু হাসলেন। গাড়ির কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বললেন, এই রথের মেলায়। কাছাকাছিই। ওহো তাই তো! রথ দেখছি যে! তা পেঁয়াজি-ফুলুরি খেলেন?
সুধীনবাবু হাসলেন। বললেন, অম্বল।
কিসের অম্বল? ইয়াং ম্যান। জগবন্ধুবাবু বললেন।
তারপর বললেন, চলুন চলুন আমার বাড়ি। আপনাকে দেখে যদি আমার গৃহিণী গালাগালি থেকে ক্ষান্ত হয়। আজ বড় দেরি হয়ে গেল ফিরতে। ওকে নিয়ে এক জায়গায় যাওয়ার ছিল। চলুন। আপনার সুন্দর মুখ দেখলেই রাগ পড়ে যাবে।
সুধীনবাবু হাসলেন। আজকাল যেমন নিজে রসিকতা করতে পারেন না। অন্য কেউ করলেও ভালো লাগে না।
বললেন, আজ ছেড়ে দিন।
তার পরই বলতে গেলেন; শুনুন! স্ত্রীকে অমন হেলাফেলা করবেন না। স্ত্রী যে কী জিনিস, চলে গেলে বুঝবেন। কিন্তু কথাটা আর বলবেন না। ভাবলেন, তিনি নিজেও বুঝতেন না কী জিনিস স্ত্রী, নীহারিকা থাকতে। ভাবলেন, স্ত্রীর কথা ওঠালে জগবন্ধুবাবু ভাবতে পারেন যে দাঁত চলে যাওয়ায় দাঁতের কদর বুঝেছে বুড়ো। হাঃ হাঃ।
রিকশাওয়ালাকে বিদায় দিয়ে রথটা নিয়ে বাড়ি ঢুকতে গিয়ে দেখলেন, বড় দুটো রথ সুন্দর করে সাজিয়ে-টাজিয়ে তার বড় ছেলের ও মেজ ছেলের পুত্ররা টানাটানি করছে।
সুধীনবাবু বললেন, রথ? এ কী, রথ কোথায় পেলি?
বারে! বাবা কিনে দিয়েছে। বাবা কিনে দিয়েছে।
শান্টু বলল, দাদু ঐ রথটা আমাকে দাও।
সুধীন গম্ভীর মুখে বললেন, না। এটা মিষ্টির।
বলেই ওপরে চলে গেলেন আস্তে আস্তে। দেবেন এসে ভিজে ছাতাটা নিল।
জামাকাপড় ছাড়তে ছাড়তে সুধীনবাবু খুব দুঃখিত হলেন। যা ভেবেছিলেন, তার কিছুই হলো না। ভেবেছিলেন, ছেলেরা সব এক বাড়িতেই থাকবে। জমজমাট সংসার। নীহারিকার ফরসা, লক্ষ্মীশ্রীসম্পন্ন চেহারাটা মনে পড়ল। চওড়া লাল পেড়ে শাড়ি। চাবির গোছা আঁচলে। বৌরা ঘিরে রয়েছে। ছেলেদের ভাব গলায় গলায়। মা-বাবা, ছেলে-বৌ।
কিছুই হলো না।
ছোট ছেলে দীপু পড়াশোনায় সবচেয়ে খারাপ ছিল। ইউনিভার্সিটির পরীক্ষায় কখনোই তেমন ভালো করেনি। কিন্তু জীবনের পরীক্ষাতে ঐ সবচেয়ে সফল হলো। সাহেবি কম্পানিতে সামান্য সেলসম্যানের চাকরিতে ঢুকে দেখতে দেখতে মার্কেটিং ম্যানেজার হলো। কম্পানির ফ্ল্যাট, কম্পানির গাড়ি। দীপুর বৌ শিখা বোম্বের মেয়ে। ওর বাবা ছিলেন এক মার্কেন্টাইল ফার্মের বড় কর্তা। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। সাহেবি ধরনের মানুষ। তার পক্ষে এই বাড়িতে পাঁচমিশালি রুচির মধ্যে থাকা সম্ভব হলো না। মিষ্টিটাকে বড়ই মিস করেন সুধীনবাবু। আর কী যে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ও। নীহারিকার বড়ই প্রিয় ছিল এই নাতনি।
আসলের চেয়ে সুদ যে বড়, এ কথা যাদের সুদ নেই তারা জানে না।
আজকাল দীপু ও শিখার সঙ্গেও দেখা হয় না বেশি। সপ্তাহে এক দিন করে আসে। অবশ্য ফোন করে খোঁজখবর নেয় মাঝেমধ্যে। রান্না করে এটা-ওটা পাঠায়। কিন্তু মিষ্টির জন্যেই মনটা হু হু করে সুধীনবাবুর। নীহারিকা চলে যাওয়ার পর মিষ্টি ওদের নতুন ফ্ল্যাটে উঠে যাওয়ায় দ্বিতীয়বার ধাক্কা খেয়েছিলেন তিনি। পুরোপুরি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন।
যখন দীপু চলে গেছিল, খুব রাগ হয়েছিল সুধীনবাবুর। কিন্তু এখন মনে হয় যে তাঁর প্রজন্মের মানুষদের পক্ষে, সমস্ত পৃথিবীজুড়ে যে যৌথ পরিবারের ভাঙন আরম্ভ হয়েছে, তা রোধ করা সম্ভব নয়। আলাদা থাকা একেক সময় ভালো বলেও মনে হয়। তাতে সম্পর্ক বোধ হয় ভালো থাকে। যদি প্রত্যেকের রুচি, রোজগার, শিক্ষা এসব একরকম না হয়, তাহলে জোর করে একসঙ্গে থেকে বাইরের লোককে সুখের বন্যা দেখানো হয় বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পায়ের তলায় মাটি সরতে থাকে। কেউ অত্যাচার করে, কেউ অত্যাচারিত হয়। যার রোজগার বেশি এবং যার কম তাদের দুজনেরই দুরকম কমপ্লেঙ্ জন্মায়। সেটা প্রত্যেকেরই জীবন উপভোগের পথে বাধাস্বরূপ। সুধীনবাবু আর নীহারিকা সবাইকে নিয়ে থাকতে চেয়েছিলেন জড়িয়ে। কিন্তু তিনি নিজের জীবনেও দেখেছেন। যৌথ পরিবারে কেউ ঠকে; কেউ ঠকায়। কেউ অন্যায় করে; কেউ তা সয়ে যায়। যে ভালো, তাকে বোকা ভাবা হয়। জীবন যেহেতু একটাই, তখন যার যার যোগ্যতা, যার যার রুচি, যার যার মতামত নিয়ে আলাদা থাকাই বোধ হয় ভালো। যারা, তা থাকতে পারে। বড় বৌ, মেজ বৌ তাঁর সামনে কখনো ঝগড়া করে না বটে, কিন্তু সুধীনবাবু বোঝেন, ভালো করেই বোঝেন যে ওদের মধ্যে সব সময় একটা রেষারেষি, একটা কোল্ড-ওয়ার চলে। সেটা আরো অসহ্য ঠেকে।
রথ নিয়ে উনি ওপরে উঠে যেতেই মেজ বৌ ঘরে গিয়ে উষ্মার সঙ্গে মেজ ছেলেকে বলল, বাড়াবাড়ি।
_কেন? কার? খাটে শুয়ে বই পড়তে পড়তে মেজ বলল।
_কার আবার? তোমার বাবার। মিষ্টির জন্যে নিজে হাতে রথ কিনতে গেলেন, বৃষ্টিতে ভিজে। কেন আমার ছেলেদের জন্যে তো কখনো একটা চকোলেটও কিনে দেন না?
মেজ বলল, তাই নাকি? বাবা নিজে গেছিলেন? স্ট্রেঞ্জ!
মেজ বৌ বলল, তোমার ছেলেরা কি ভেসে এসেছিল?
বড় বৌ জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিল যখন সুধীনবাবুর সঙ্গে জগবন্ধুবাবু কথা বলছিলেন।
বড় বৌ মেজকে ডাকলেন। মেজ বাইরে এলে বলল, দ্যাখ কী লজ্জার।
_কী? মেজ বলল।
বাবা জগবন্ধুবাবুকে, গাড়ি পান না, রিকশায় যাতায়াত করেন_এসব কথা বলছিলেন নিশ্চয়ই; এটা অপমানের নয়? বুড়ো হলে মানুষগুলো কুটিল হয়ে যায়? কাজকর্ম নেই তো!
সুধীনবাবুও ইজিচেয়ারে বসে ভাবছিলেন, স্ট্রেঞ্জ! বড় ছেলে, মেজ ছেলে নিজেদের ধাড়ী ধাড়ী ছেলেদের রথ কিনে দিল আর ছোট ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে মিষ্টির জন্যে চার টাকা দিয়ে একটা রথ কেনার কথা মনে হলো না ওদের। এরা একেবারে চামার হয়েছে। তাঁর নিজের ছেলে বলে ভাবতেও কষ্ট হয়।
সুধীনবাবু বোঝেন সব। মুখে কিছু বলেন না। বড়লোক বাবার কাছে গরিব সেজে থাকার লাভ অনেক। অন্তত তাই ভাবে ওরা। তিনি চিরদিন ন্যায়ের পক্ষে, অন্যায়ের বিপক্ষে। দীপু চলে গেছে বলেই তিনি তাকে দূর করে দিতে পারেন না। উইল করে ফেলেছেন তিনি। যা-কিছুই আছে স্থাবর-অস্থাবর, ছেলেমেয়ে সকলকে সমান ভাগ। বৌমারা এ কথা জানে না বলেই বোধ হয় রেষারেষি হয়। কে শ্বশুরের বেশি কাছের, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে।
ড্রাইভার ফিরে এসে ওপরে এলো দেখা করতে। সুধীনবাবু বললেন যে এক্ষুনি রথটা ছোটবাবুর নিউ আলিপুরের ফ্ল্যাটে পেঁৗছে দিয়ে আসতে।
ড্রাইভার চলে গেল। বড় ছেলে শালা ও শালা-বৌয়ের জন্যে গরম গরম বিরিয়ানি ও চিকেন চাঁব নামিয়ে রেখে রাগতস্বরে শালাদের সামনেই বলল, বাবা যত বুড়ো হচ্ছেন, ততই ইনকনসিডারেট হচ্ছেন। এত রাতে বৃষ্টির মধ্যে ড্রাইভারকে কি না পাঠালেই চলত না। গরিব লোকটা সারা দিন খাটছে। বুড়ো হলে মানুষগুলো সেনাইল হয়ে যায়। ভীমরতি ধরে।
বড়বাবুর বড় শালা কথা ঘুরিয়ে বলল, যাই বলো আর তাই বলো, শিখা ও দীপু চলে গিয়ে তোমাদের বাড়িটা কেমন খাঁ খাঁ করে যেন।
বড় বৌ বলল, তা তো লাগবেই দাদা তোমার। আমরা তো শিখার মতো সুন্দরীও নই আর অমন শরীর বের করে সাজতেও পারি না।
বড় শালা হেসে ফেললেন। বললেন, নমু তুই কোন লজ্জায় এ-কথা বলছিস? তুই যা শরীর করেছিস তা কি কাউকে দেখাবার? তুই তো একেবারে আমাদের কম্পানির সাফ্লায়ার ঢালাইওয়ালা মি. আগরওয়ালার স্ত্রীর মতো দেখতে হয়ে গেছিস। ওজন কত কুইন্টাল হলো?
বোন রেগে গেল। বলল, তোমাদের সব দেমাকি মেয়েছেলে ছাড়া ভালোই লাগে না। শিখার দেমাক একদিন ভাঙব। ভগবান কি নেই? ভগবানই একদিন ওকে মুড়িয়ে খাবেন।
দাদা বললেন, ছিঃ ছিঃ, তুই না পড়াশোনা করেছিস। তুইও এ রকম? টিপিক্যাল! তারপর বলল, ভগবানের আরো অনেক ইমপরট্যান্ট কাজ আছে। যা-ই বলিস, তোদের বাড়িতে কিন্তু দীপু-শিখাকে আমার সবচেয়ে পছন্দ। ভেরি ট্রেইট-ফরোয়ার্ড।
বড় বৌদি বলল, খুব লক্ষ্মী মেয়ে কিন্তু শিখা। ওরা যখন এখানে থাকত, একটা ঘরে থাকলে কী হয়; ঘরের মেঝেতে মুখ দেখা যেত। এখন তোমাদের বাড়িতে ঢুকলেই মনই খারাপ হয়ে যায়। মাসিমা আর শিখা চলে গিয়ে তাদের বাড়ি একেবারে শ্রীহীন হয়ে গেছে।
বড় বৌ চটে গেল। বলল, তা এই বাড়িতে আসা কেন, বাবা? না এলেই তো পারো। কেউ বাড়ি বয়ে এসে এমন অপমান করে, শুনিনি কোথাও।
ঘর ফাঁকা হতেই বড় শালা নিজের স্ত্রীকে বলল, তোমার এমন স্পষ্ট কথা বলার দরকার কী?
আমি স্পষ্ট কথাই বলি। তোমার বোন বলে কি ছেড়ে দেব? ওরা কেউ শিখার ধারেকাছে নয়। তাই-ই তো দলাদলি আর পলিটিকস করে ওকে তাড়াল। শিখা চাপা মেয়ে, কিন্তু একদিন আমার কাছে সব বলেছিল। শিখার কী? ও নিজে বড়লোকের একমাত্র মেয়ে, স্বামীরও যথেষ্ট যোগ্যতা আছে; ও কেন এই নোংরামির মধ্যে থাকবে? আমার সামর্থ্য থাকলে আমিও তোমাদের বাড়ি থাকতাম না। কত সুখেই রেখেছ তুমি আমাকে জগাখিচুড়ির সংসারে।
তারপর বলল, লোকে ঈর্ষা আর হিংসা করে তো আর কারো কপাল পোড়াতে পারে না। কপাল কে নেবে? যে যেমন কপাল করে আসে। তোমার বোনের এই পরশ্রীকাতর স্বভাব আমার মোটেই ভালো লাগে না।
আঃ কী করছ! বাড়াবাড়ি কোরো না, শুনতে পাবে।
শুনুক। তোমার মতো আদেখলাও দেখিনি আমি। বিরিয়ানি খাওয়ার এত লোভ, তো হোটেলে গিয়ে খেলেই পারো!
আহা! সমীর এত করে নেমতন্ন করল। সমীরের কী দোষ। বলল, হুইস্কি খাওয়াবে। বৃষ্টির দিন। সমীর তো ভালোই।
বড় শালার স্ত্রী বলল, ভালো। তেমনি ভালো। যেমন দেবা, তেমনি দেবী। এ রকম ছোট মনের পুরুষও আমি দেখিনি। স্ত্রীর কথায় ওঠে-বসে।
থামো তো! ধমক লাগাল বড় শালা।
বড় এসে বলল, এসো, ঘরে এসো, চুপচাপ হুইস্কি খেতে হবে ঘরে বসে। হাশ্-হাশ্ করে। বাবা জানতে পারলে তো কোনো সম্পত্তিই দিয়ে যাবেন না। ত্যাজ্যপুত্তুর করবেন।
বড় শালা অবাক হয়ে বলল, কেন? দীপু তো খেত বাড়িতে মাঝেমধ্যে।
বড় ছেলে সমীর বলল, দীপুর কথা ছাড়ো। ওর কি কোনো রেসপেক্ট আছে নাকি বড়দের প্রতি? ও সাহেব লোক।
২.
এ কী? দেখেছ? সর্বনাশ করেছে। ঘুম থেকে সেদিন উঠেই চেঁচিয়ে উঠলেন সুধীনবাবু। তার পরেই ডাকলেন, দেবেন, দেবেন।
দেবেন নেই। যথারীতি! মেজ বৌ তক্ষুনি ওপরে এলো। ছেলের খাবারের তাগাদা দিতে। চিৎকার শুনে ঘরে ঢুকে বলল, কী হলো বাবা?
ইঁদুর।
কোথায়?
এই দ্যাখো না, তোমার মায়ের লেপটা কেটে কী করেছে।
লেপটা কোথায় ছিল?
সুধীনবাবুর রাগ হলো। ভাবলেন, বলেন যে, লেপ কোথায় থাকে তা তো তোমাদেরই জানার কথা মা। এ ঘরটা তো আবর্জনার স্তূপ হয়ে আছে। কখনো তো চোখ মেলেও দ্যাখো না। কিন্তু পরক্ষণেই সামলে নিলেন।
পরের বাড়ির মেয়ে। ছেলের বৌ। রাগ করেন তাদের ওপরে, সে অধিকার কোথায়? রাগ করার লোক, ঝগড়া করার লোক তো চলে গেছে।
সুধীনবাবু বললেন, তোমার মায়ের খাটের মাথার কাছেই ভাঁজ করা ছিল। দেখেছ, কেটে তুলোগুলোকে কী করেছে। তোমার মায়ের বড় প্রিয় লেপ ছিল ওটা। সে বলত, বড় ওম ধরে। সেই যেবার আমরা শীতকালে উটীতে গেছিলাম সেইবার এই লেপটা সঙ্গে নিয়ে গেছিল তোমার মা। সঙ্গে সেবার ছোটনও গেছিল। মনে আছে। ওঃ সেবারে কী শীত। তখন কতই বা বয়স আমাদের। তোমার মার সে কী আনন্দ উটী দেখে।
মেজ বৌ মনে মনে বলল, কী কুক্ষণে এই ঘরে ঢুকলাম। এখন বৃদ্ধের মধুচন্দ্রিমার গল্প শুনতে হবে।
এমন সময় দেবেন এলো।
সুধীনবাবু বললেন, দেবেন, তুই আমার কাছে মার খেয়ে মরে যাবি।
ফেলুন, মেরেই ফেলুন। দেবেন বলল। এই চাকরি আমার আর সহ্য হচ্ছে না। আমি মরে গিয়েই বাঁচি।
সুধীনবাবু বললেন, তুই ইঁদুর মারবি কি মারবি না? দেখেছিস, হতভাগা ইডিয়ট, দেখেছিস কী করেছে।
মেজ বৌ বলল, বাবা ইঁদুরের কী দোষ। এ তো ইঁদুরের ধর্ম।
ধর্ম মানে? প্রায় চটেই উঠেছিলেন সুধীনবাবু।
মেজ বৌ বলল, ধর্ম মানে; না কাটলে যে ইঁদুর মারা যায়।
মানে, ইঁদুরের দাঁত থাকে এমন যে সব সময় সেটা জিনিসপত্র কেটে কেটে ঘষে ঘষে ছোট না করলে সেই দাঁত ইঁদুরের মগজ ফুটো করে দেয়। দেখেন না, ইঁদুর কাগজ কাটে, লেপ কাটে, তোশক কাটে, যা পায় তাই-ই কাটে, কিন্তু সেগুলো কিছুই খায় না। না কাটলে যে ইঁদুর বাঁচতেই পারে না।
তা তো জানতাম না। সুধীনবাবু বললেন।
মেজ বৌ মনে মনে বলে, অনেক কিছুই জানেন না আপনি।
দেবেন বলল, দেখেছেন, মায়ের লেপটাকে কী করেছে ব্যাটারা। এমন বিষ দেব যে মানুষ পর্যন্ত মরে যাবে। দেখাচ্ছি মজা।
সুধীনবাবু বললেন, দয়া করে দেখাও।
বড় বৌমা ঘরে ঢুকল। মেজ বৌ বাবাকে কী জ্ঞান দিচ্ছে দেখার জন্যে। চান্স পেলেই একা একা বাবার কাছে ঘুসুর ঘুসুর করে। মায়ের যত গয়না ছিল সবই তো হাত করেছে মেজই! বড় কিছুই পায়নি! তবে আনন্দ এইটুকুই যে ছোট কিছু চায়ওনি এবং তাকে কিছু দেওয়াও হয়নি। তার স্বামী বড়লোক তাকে দেবেনই বা কেন?
বড় বৌমা বলল, বাবা।
বলো। সুধীনবাবু বললেন।
আজ রাজার জন্মদিন।
তাই নাকি? তা এত দেরি করে বললে, রাজাকেও তো দেখলাম না সকাল থেকে।
ও দেরি করে উঠেছিল। তাই সকালে আসতে পারেনি আপনার কাছে। স্কুল থেকে ফিরেই আসবে।
মেজ বৌ বলল, সে কী দিদি, আমারও তো মনেই ছিল না।
বড় বৌ মনে মনে বলল, কত যেন মনে করে রাখো তুমি।
তারপর বলল, রাজার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবকে খেতে বলব আর রাজার পিসি আর পিসেকে। ওর মামা-মাসিদের।
সুধীনবাবু বললেন, দীপু আর শিখাকে বলছ না?
মানে, ও বলছিল, জায়গা কম; লোক বেশি হলে...।
সুধীনবাবু বললেন, জায়গা যত কমই হোক, দীপু-শিখার জায়গার অকুলান হবে না এ-বাড়িতে। অন্তত হওয়া উচিত নয় বলেই মনে হয়।
বড় বৌ বুঝল যে সুধীনবাবু ভীষণ চটেছেন।
বললেন, ওরা তো ভালো খায়, ভালো থাকে। ওরা কি সাধারণ ব্যাপারে আসবে? তারপর পার্টি-ফার্টি তো লেগেই আছে! ককটেল। তাই ভাবছিলাম...।
সুধীনবাবু অনেক বছর পরে বড় বৌয়ের চোখে লাল চোখে তাকালেন। বললেন, কী ভাবছিলে?
এমন সময় নিচ থেকে দীপুর কম্পানির উর্দিপরা ড্রাইভার সুন্দর র্যাপিং পেপারে মোড়া একটা এয়ার রাইফেল, এক বাঙ্ চকোলেট আর লাল গোলাপ ফুল নিয়ে এলো। সঙ্গে শিখার ছোট্ট চিঠি।
রাজাবাবু,
আজ তোমার জন্মদিন। তোমাকে অনেক অনেক আদর পাঠাচ্ছি তোমার ছোট কাকু, মিষ্টি ও ছোট কাকিমা। আমি যখন ও-বাড়িতে ছিলাম তখন তুমি পাশের বাড়ির রুনুর এয়ার রাইফেলটা একদিন চেয়ে পাওনি বলে খুব দুঃখ করেছিলে। আমার মনে আছে। তোমার ছোট কাকু তাই তোমার জন্যে একটা এয়ার রাইফেল পাঠালেন! মিষ্টি ফুল পাঠাল। আর আমি অনেক আদর। তোমার জন্যে পায়েস রেঁধেছি। বিকেলে আমরা সক্কলে তোমার কাছে যাব, পায়েস নিয়ে।
_ইতি ছোট কাকিমা
চিঠিটা পড়ে বড় বৌমার মুখ কালো হয়ে গেল।
সুধীনবাবু বললেন, কে লিখেছে?
শিখা।
কী লিখেছে? দেখি?
বড় বৌ চিঠিটা এগিয়ে দিল।
চিঠিটা পড়ে সুধীনবাবু বড় বৌমাকে ফিরিয়ে দিলেন।
বড় বৌ বলল, আমি যাই শিখাকে ফোন করি গিয়ে।
সুধীনবাবু কিছু বললেন না।
দেবেন ইঁদুরে-কাটা তুলো-টুলোগুলো পরিষ্কার করছিল। বাইরের রাস্তার বকুলগাছে কাক ডাকতে লাগল। হঠাৎ বকুলের গন্ধ এলো নাকে এক ঝলক। নীহারিকা এই গন্ধ ভারি ভালোবাসত।
পাশের বাড়িতে রাজেশ্বরী দত্তর গাওয়া 'এ পরবাসে রবে কে' গানের রেকর্ড বাজছিল।
সুধীনবাবুর মনটা উদাস হয়ে গেল। নীহারিকার বড় প্রিয় গান ছিল এটি। সত্যিই পরবাস! শুধুই স্বার্থকোলাহল; শুধুই বিবাদ।
৩.
বারান্দার বাইরেটা বেলুন আর কাগজে সাজানো হয়েছে। বাচ্চারা হৈচৈ করছে। আজকাল হৈচৈ মোটে সহ্য হয় না সুধীনবাবুর। নিজের ঘরেই আছেন। নিচে গাড়ির শব্দ হলো, বোধ হয় বড় বৌমার দাদা-বৌদিরা এলো। সুধীনবাবুর একমাত্র মেয়ে ফুচি। ওরা এখন দিলি্লতেই সেটেল্ড। এক মাসের ছুটিতে এসেছে এখানে। নীহারিকা থাকলে এখানে এসেই উঠত। নীহারিকা যাওয়ার পর আর ওঠে না। কেন ওঠে না তা বলেনি ফুচি সুধীনবাবুকে। কিন্তু সুধীনবাবু বোঝেন যে হয়তো বড় বৌমা বা মেজ বৌমা অথবা দুই বৌমারই কোনো ব্যবহারে ও বা প্রদীপ দুঃখিত হয়েছে। বোঝেন সব কিছুই। মুখে চুপ করেই থাকেন। একটাই মেয়ে। কিছুই করতে পারেন না ওদের জন্যে। উল্টো মেয়েজামাই-ই সুধীনবাবুকে নিয়ে এখানে-ওখানে যায়। থিয়েটার দেখতে, যাত্রা দেখতে। বড় ও ভালো রেস্তোরাঁতে খাওয়া যায়। পাজামা-পাঞ্জাবি বানিয়ে দেয়। এবারের আসার সময় একটা শাল কিনে নিয়ে এসেছে। কত দামি শাল। কবে এবং কোথায় পরবেন সুধীনবাবু? দিন তো ফুরিয়ে এলো।
শিখা আর দীপুর সঙ্গে কিন্তু খুব ভাব ফুচি আর প্রদীপের। প্রত্যেকটা উইক-এন্ডে ওরা ওদের ওখানে গিয়ে থাকে। এটাও একটা প্রচণ্ড অশান্তির কারণ। মেজ বৌ ও বড় বৌয়ের ধারণা, কভেনান্টেভ অফিসারে অফিসারে মিলে গেছে। দুজনেই সাহেব, তা আমাদের কি আর পছন্দ হবে তাদের?
আরেকটা গাড়ির শব্দ হলো। ফুচি, প্রদীপ, শিখা ও দীপু একসঙ্গে নামল গাড়ি থেকে। ওদের গলার শব্দ পেলেন সুধীনবাবু। তার পরই মিষ্টির পরিচিত জুতোর শব্দ পেলেন সিঁড়িতে। হালকা পায়ের নরম থপ থপ শব্দ। মুখস্থ হয়ে গেছে সুধীনবাবুর। নাতিরা এত দুরন্ত নয়। মিষ্টি, মেয়ে হয়েও ভারি দুরন্ত। এনার্জিতে ভরপুর। ওর হাঁটাচলা, কথা বলা সমস্তই এতই প্রাণবন্ত যে, পরপারের পথে চোখ চাওয়া সুধীনবাবুর ওকে দেখে আবার জীবনকে ব্যাক গিয়ারে ফেলে অনেক দূরে পিছিয়ে মিষ্টির বয়সে পেঁৗছতে ইচ্ছে করে।
মিষ্টি, গাড়ি থেকে নেমেই সোজা দৌড়ে ওপরে আসে দাদু, দাদু, দাদু ডাকতে ডাকতে। মিষ্টি যখন সিঁড়ি থেকে ডাকে দাদু, দাদু, দাদু, তখন সুধীনবাবুও ঘর থেকে উত্তর দেন কি দাদু, কি দাদু, কি দাদু?
মিষ্টি এসেই সুধীনবাবুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আজও পড়ল। সুধীনবাবু ওকে জড়িয়ে ধরলেন জোরে। যখনই মিষ্টিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন সুধীনবাবু, সুধীনবাবুর মনে হয়, যেন বিয়ের সময়ের ছোট্ট বালিকা-বধূ নীহারিকাকেই আদর করেন। তার একটা কারণও ছিল। মিষ্টি যে পাউডার মাখে, নীহারিকাও সেই পাউডার মাখত। একটি পাউডারের গন্ধে মিষ্টির মাধ্যমে তাঁর নীহারিকা তাঁর কাছে ফিরে আসত।
সুধীনবাবু প্রত্যেকবার মিষ্টিকে কোলে নিয়ে ভাবতেন পাউডারের কম্পানি থেকে যায়, শুধু মানুষই চলে যায়।
ফুচি আর প্রদীপও ঘরে এলো দীপুর সঙ্গে। শিখা এলো না। হয়তো পরে আসবে। শিখার মধ্যে, মন-রাখা লোক-দেখানো কোনো ব্যাপারই নেই। সেটা ভালো যেমন, খারাপও। একটু পরে শিখাও এলো। পিছনে পিছনে বড় বৌ মেজ বৌ।
ফুচি হাসতে হাসতেই সত্যি কথাটা বলল, এই বৌদিরা, তোমরা আমার বাবাকে কী করে রেখেছ? ঘরটার কী অবস্থা দ্যাখো তো? এর মধ্যে মানুষ থাকতে পারে? আলমারির মাথায় টিন, নিচে জুতো, ছেঁড়া মশারি, খাটের তলায় পুরো গুদোম! বলেই, চেঁচিয়ে উঠল, ওমা, ওটা কী?
মিষ্টি উত্তেজিত হয়ে হাততালি দিয়ে উঠল, দাদুর কোলে বসে বলল, ইঁদুর। ওমা। পিসি ইঁদুরকে ভয় পায়।
শিখা হাসতে হাসতে বলল, এসব বলিস না ফুচি, বললেই দিদিরা বলবে আমি তোকে শিখিয়ে দিয়েছি।
শিখা কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বড় বৌ বলে উঠল, তুমি তো কয়েক দিন এখানে থেকে বাবার ঘরটা পরিষ্কার করে দিয়ে গেলেই পারো।
শিখা হাসল। বলল, নিশ্চয়ই পারি। কিন্তু তা করলে তোমাদের অপমান করা হয় বলে কখনো তা করিনি। তোমরা যদি অনুমতি দাও তো নিশ্চয়ই করব এবং করে দেখিয়ে দেব যে এই ঘরই কিভাবে রাখা যায়।
বড় বৌ চেঁচিয়ে উঠল, ম্যাগো! বলে।
একট বড় ইঁদুর কামড়ে দিয়েছে পায়ে।
মেজ বৌমা বলল, দিদি শিগগির ওষুধ লাগা, প্লেগ হবে; প্লেগ।
প্রদীপ অবাক হয়ে তাকাল মেজ বৌয়ের দিকে। মেজ বৌদি যে এত অশিক্ষিত জানত না প্রদীপ।
ফুচি বলল, বড়দি চল, চল নিচে। শিগগির ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছি।
তারপর শিখার দিকে চেয়ে বলল, শিখা, আয় দুজনে মিলে কাল এসে বাবার ঘরটা পরিষ্কার করে দিয়ে যাই। বৌদিরা নানা ঝামেলায় সময় পায় না।
শিখা বলল, বেশ তো! খুব ভালো।
ঘর ছেড়ে যাওয়ার আগে দীপু বলল, কেমন আছ বাবা?
এই আছি!
তোমার ব্লাড সুগার? প্রেসার? সব ঠিক?
ঠিকই আছে!
আসলে সুধীনবাবুর এই বয়সে মেপে-খেয়ে, মেপে হেঁটে, প্রেসার মেপে, বেঁচে থাকার আর ইচ্ছা নেই। জীবনের সব প্রয়োজনীয়তা, সার্থকতা তো শেষ। হাইওয়েতে একটা গাড়ির ইঞ্জিন কাট-অফ করে দেওয়া হয়েছে। গিয়ারও নিউট্রাল। এখন যত দূর যায় গড়িয়ে গড়িয়ে। এ গাড়িতে তেল-মবিল দিয়ে আর লাভ কী? গন্তব্যই যখন নেই কোনো, একমাত্র থেমে যাওয়া ছাড়া।
দীপু বলল, আমাদের অফিসের ডাক্তারের সঙ্গে ঠিক করেছি, তোমাকে সপ্তাহে একবার করে দেখে যাবেন।
কেন? আমাদের গজেন ডাক্তার কী দোষ করল?
না। উনিও দেখুন। তবে উনি তো মাঝে মাঝে ডুব দিয়ে দেন।
ঘর থেকে উঠে চলে যাওয়ার সময় দীপু বলল, বাবা, মিষ্টিকে আজেবাজে কিছু খাইও না যেন। ওর সকাল থেকে পেটের গণ্ডগোল। শিখা টিফিন ক্যারিয়ারে করে ওর জন্যে শুকতো নিয়ে এসেছে। ঐ খাবে। ভাতে মাখে।
সুধীনবাবু মুখে বললেন, ঠিক আছে। মনে মনে বললেন, এদের কায়দার শেষ নেই। ছেলেমানুষ, নেমন্তন্ন খেতে এসেছে; তা না টিফিন ক্যারিয়ারের শুকতো খাবে। যত্ত সব।
রাজা ঘরে এলো। মিষ্টির দুই গুণ বয়স রাজার। রাজা বলল, মিষ্টি নিচে চল আমরা কেক কাটব। তুই গান গাইবি না হ্যাপি বার্থডে?
হ্যাঁ! হ্যাঁ করে নেচে উঠল মিষ্টি।
সুধীনবাবু বললেন, আমিও যাব। তারপর মিষ্টির হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামলেন নিচে। ততক্ষণে বাচ্চারা সকলে ভীষণ মেতে গেছে।
কেক কাটা হলো! গান হলো। কেক খাওয়া কিন্তু হলো না মিষ্টির। শিখা খুব নির্দয় মা। বলল, মিষ্টি তোমার ভাগ আমি বাড়ি নিয়ে যাব। কাল ভালো হয়ে গেলে খাবে।
মিষ্টি মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলল না।
সুধীনবাবু বললেন, চলো, কেক কাটা হলো, আমরা ওপরে যাই। তারপর মিষ্টির কানে কানে বললেন, তুমি কি দই খাবে? যদুবাবুর বাজার থেকে দই আনাব?
নাঃ। বলল মিষ্টি।
ওপরে উঠে দেখেন, দেবেন কাবাব রেখে গেছে দুটো। একটা প্লেটে। আর প্লেটটা রেখেছে খাটের নিচে মাটিতে। একটা চামচ পর্যন্ত দেয়নি। দেবেনটা দিনকে দিন...
সুধীনবাবুর শরীরটাও কাল থেকে ভালো নেই। ঠিকই করেছিলেন যে রাতে শুধু দুধ-খৈ খাবেন।
মিষ্টি মুখে কিছু না বলে এমনভাবে তাকাল সুধীনবাবুর চোখে যে সুধীনবাবুর বুকের মধ্যেটা কেমন যেন করে উঠল। ভদ্রলোক অপত্যস্নেহ কাকে বলে জীবনে জেনেছিলেন। কিন্তু আসলের প্রতি যে স্নেহ, যে দরদ; তার মধ্যে কিছুটা তবু ভারসাম্য থাকে। সুদের প্রতি স্নেহ ও দরদে তা থাকে না। যিনি দাদু বা দিদা হননি, তিনি জানেন না সুদের কী টান। কী কষ্ট? যে নাতি বা নাতনির প্রতি স্নেহ আছে অসীম, কিন্তু যার মালিক তার মা ও বাবা; তাকে আদর করতে, তাকে হাত ধরে বেড়াতে নিয়ে যেতে যখন তাঁর নিজের অনিচ্ছুক ছেলে-মেয়ের অনুমতি চাইতে হয়, তখন বুকের মধ্যে বড় কষ্ট হয়। আসলের চেয়ে সুদ অনেকই দামি। সুদকে ভালোবাসায় ভীষণ জ্বালা!
হঠাৎ সুধীনবাবুর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তাঁর নিজেরও কি কোনো দাবি নেই নাতনির ওপর?
উনি মিষ্টিকে বললেন, তোমার কি এখন পেট ব্যথা করছে?
না তো দাদু।
তবে কী অসুবিধা?
জানি না। সকালে তিনবার পাই করেছিলাম।
তারপর আর যাওনি?
ওষুধ খেয়েছ?
হ্যাঁ। মেকসাফর্ম।
দাঁড়াও। বলে সুধীনবাবু উঠে দাঁড়ালেন। তারপর দরজাটা বন্ধ করলেন ঘরের। বন্ধ করেই তাড়াতাড়ি কাবাবের প্লেটটা হাতে করে এনে মিষ্টিকে বললেন, খাও দাদু।
দুটোই? মিষ্টি বলল। তারপর বলল, তুমি একটা খাও দাদু।
দুটোই তুমি খাও। আমি খাব না।
মিষ্টির চোখ-মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কাবাব মুখে দিল মিষ্টি।
কেমন লাগছে? সুধীনবাবু বললেন।
ভালো। মিষ্টি বলল। তারপর বলল, ঝাল। তার পরই বলল, গন্ধ লাগছে।
সুধীনবাবু ভাবলেন, শিখা মেয়েটাকে বেশি যত্নে যত্নে একেবারে স্পয়েল করে ফেলেছে। এদের ইমিউনিটি বলে কিছুই ডেভেলপ করেনি। যা কিছু খায়, তাতেই অসুখ।
সুধীনবাবু বললেন, আরেকটা খাও।
মিষ্টির চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। বলল, না থাক। খুব ঝাল।
সুধীনবাবু বললেন, দাঁড়াও তোমাকে জল দিই। দেবেনকে এখন ডাকলেই তো জানাজানি হয়ে যাবে। শিখা বা দীপু এক্ষুনি চলে এলে প্রচণ্ড ঝামেলা বাধাবে। ফুচিও আসতে পারে। তাই নিজেই বারান্দায় গিয়ে কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে এনে মিষ্টিকে দিলেন।
মিষ্টি জল খেয়েই বলল, দাদু, আমি মার কাছে যাব।
কেন দাদু? কী হলো?
ভালো লাগছে না।
কেন ভালো লাগছে না? হলোটা কী তোমার?
না। এমনিই।
আমি পেঁৗছে দিয়ে আসব? না তুমিই যাবে?
আমি যেতে পারব নিচে।
আচ্ছা। তবে যাও। বাড়ি যাওয়ার আগে আমাকে বলে যেও। একটা আব্বা দিয়ে যেও আমাকে।
আচ্ছা!
মিষ্টি দরজার কাছে পেঁৗছতেই সুধীনবাবু বললেন, কাউকে বোলো না যেন কথাটা!
মিষ্টি হাসল।
ভারি স্মার্ট মেয়েটা। চোখ পিটপিট করে বলল, কাউকে বলব না। প্রমিস।
দেবেন মশারি গুঁজে দিতে এসেছিল। সুধীনবাবু বাঁধানো দাঁতের পাটিটা খুলে একটা জলভরা বাটির মধ্যে রাখলেন। রাতে দুধ খই-ই খেয়েছিলেন। এখন শরীরটা ভালোই লাগছে। নিচে এখনো ওদের গলা পাচ্ছেন। এগারোটা বাজে। খাওয়া-দাওয়া হতে বারোটা-সাড়ে বারোটা হবে। শিখা মিষ্টিকে নিয়ে আগেই চলে গেছে। মিষ্টির শরীরটা নাকি ভালো নেই। দীপুকে ফুচি আর প্রদীপ নামিয়ে দিয়ে যাবে ট্যাঙ্ িকরে। মিষ্টির শরীরটা ভালো নেই শুনে ভয়ে সুধীনবাবুর মুখ শুকিয়ে গেছে। শিখার রাগী মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে।
মশারিটা গুঁজে দিয়ে দেবেন বলল, কাল ঘরে গন্ধ পেলে বলবেন বাবু।
কিসের গন্ধ?
ইঁদুর পচার।
কেন? ইঁদুর পচবে কেন? সুধীনবাবু শুধোলেন।
পচবে না? দুটো কাবাবে ভালো করে ইঁদুর মারা ওষুধ মাখিয়ে রেখেছিলেন খাটের নিচে। একটা এরই মধ্যে খেয়ে ফেলেছে ব্যাটারা। একটা ইঁদুরে নিশ্চয়ই খায়নি। ধেড়ে ইঁদুরের বংশ নির্বংশ হবে এক কামড় খেলে।
সুধীনবাবুর হৃৎপিণ্ডটা খাঁচা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইল এক লাফে।
সোজা খাটে উঠে বসলেন। বললেন, দাঁড়া দাঁড়া দেবেন।
তারপর মশারি ছেড়ে বাইরে এলেন। বললেন, কোথায় দেখি, তোর কাবাব।
এই তো! বলেই দেবেন মিষ্টি যে-প্লেটে থেকে খেয়েছিল সেটা টেনে বের করল।
হতভম্ব হয়ে অনেকক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলেন সুধীনবাবু।
এমন সময় নিচ থেকে দেবেনকে মেজ বৌমা ডাকল। দেবেন নিচে গেলেই ফিসফিসে গলায় বলল, বাবা শুয়ে পড়েছেন? খেলেন না?
না। শরীর ভালো নেই।
মেজ বৌমা বলল শোনো, মিষ্টির খুব শরীর খারাপ হয়েছে। ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। এক্ষুনি ফোন এসেছিল ছোট বৌদির। বাবাকে এ কথা এখন বোলো না। সকালে ঘুম থেকে উঠলেই আমরা অসুখের খবর দেব। সকালে দেখতেও নিয়ে যাব।
দেবেন ওপরে ফিরে গেল।
সুধীনবাবু ইজিচেয়ারে গিয়ে বসেছিলেন। টেবিলের ওপর মিষ্টির একটা ছবি ছিল। সেদিকে তাকিয়েছিলেন। নীহারিকার ছবির দিকেও। দেবেন আসতেই বললেন, বৌদি ডাকল কেন?
না, এমনি...
বেশি চালাক হয়েছিস না? কী হয়েছে বল?
কিছু তো হয়নি। আপনার কাজ শেষ করে নিচে মেজবাবুর বিছানা ঠিক করে দিতে বললেন।
ও। তুই মিথ্যে বলছিস না?
না বাবু।
আমাকে টেলিফোনের বইটা দে। গজেন ডাক্তারের ফোন নম্বর জানিস?
না। বলে, দেবেন বইটা এনে দিল। চশমাটা নাকে লাগিয়ে গজেন ডাক্তারের ফোন নম্বরটা বের করে পাশের ঘরে গিয়ে ডায়াল করলেন। দেবেনকে বললেন, তুই নিচের যা কাজ আছে, সেরে, তারপর আমার কাছে আয়।
দেবেন চলে গেল নিচে।
গজেন?
বলছি। কে? বড় কর্তা নাকি? কেমন আছেন? রোজ শোওয়ার সময় ক্যাম্পোজ খাচ্ছেন তো একটা করে?
তা খাচ্ছি। শোনো, ইঁদুর মারার ওষুধ।
মানে? বলেন কী আপনি? মাথা খারাপ হলো নাকি?
না, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করছি। কোনো খাবারে, ইঁদুর মারার ওষুধ বেশি করে দিয়ে যদি কোনো বাচ্চাকে খাওয়ানো যায়, তবে তার এফেক্ট কী হবে?
গজেন ডাক্তার হেসে বলল, আপনি কি গোয়েন্দা গল্প লিখছেন নাকি?
আঃ, গজেন, যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দাও।
এফেক্ট আর কী হবে? মরে যাবে।
সুধীনবাবুর হাতটা রিসিভার থেকে আলগা হয়ে এলো।
বললেন, আর উ্য শিওর?
অ্যাব্সলুটলি।
খাওয়ার কতক্ষণ পরে মারা যাবে?
স্টম্যাক পাম্প না করলে অল্পক্ষণের মধ্যেই।
আচ্ছা? ঠিক আছে।
গজেন ডাক্তার বললেন, ব্যাপারটা...
গজেন ডাক্তারের কথা শেষ হবার আগেই সুধীনবাবু ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।
দেবেন ফিরে এলো একটু পরে। বলল, কী হলো বাবু, ঘুমোবেন না। লাইট নিভিয়ে দেব?
সুধীনবাবু বললেন, ঘুমবো রে ঘুমবো। আমাকে ঘুম পাড়ানোর জন্যে তোদের এত তাড়া কিসের?
তার পরই বললেন, মিষ্টিকে কখন হাসপাতালে নিয়ে গেছে রে?
দেবেন অবাক হলো। তার পরেই ভাবল, গজেন ডাক্তারের কাছে শুনেছেন বোধ হয়।
বলল, এক্ষুনি।
সুধীনবাবু মনে মনে হিসেব করলেন, মিষ্টি সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় তাঁর কাছে এসেছিল। এখন বাজে সাড়ে এগারোটা। অনেক ঘণ্টা।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ দেবেনের ওপর রেগে উঠলেন তিনি। বললেন, তুই ভেবেছিস কী? রয়ে রয়ে মুরলি বাজাবি? এক্ষুনি আরো আন, বিষ আন, সারা ঘরে খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে রাখ, যাতে ঘরের যত ইঁদুর আছে এক দিনেই মরে যায়। তুই রোজ রোজ এই রকম বিষ দিবি নাকি? রোজই ইঁদুর পচাবে? এটা কি ধাপার মাঠ পেয়েছিস?
কাবাব তো নেই। অবাক হয়ে বলল, দেবেন। বিষ মেশাব কিসে?
নবাব হয়েছেন। ইঁদুরকে কাবাব খাওয়াতে হবে না। পাউরুটি আন। তাতে বিষ মাখিয়ে রাখ। যা শিগগির যা।
দেবেন চলে যেতেই, স্লিপিং পিলের শিশিটা নিয়ে এলেন তাড়াতাড়ি দেরাজ খুলে।
তারপরে প্যাড বের করে, বলপেন বের করে, চশমা নাকে দিয়ে দ্রুত চিঠি লিখলেন একটা। খামে ভরে, মুখ বন্ধ করলেন সেটার।
দেবেন ফিরে এলেই বললেন, রাখ ওখানে। আমি নিজে দেব আনাচে-কানাচে।
আপনি কেন? আমিই দিচ্ছি। বলে, দেবেন ভালো করে বিষ মাখিয়ে রুটির টুকরাগুলো এদিকে-ওদিকে সব দিকে দিয়ে দিল। আলমারির নিচে, খাটের নিচে_সব জায়গায়।
সুধীনবাবু বললেন, আমি এখন পড়ব। তুই মশারিটা গুঁজে দিয়ে যা। জল দিয়েছিস?
হ্যাঁ। সব দিয়েছি।
দেবেন চলে যাওয়ার আগে খামে বন্ধ চিঠিটা দেবেনের হাতে দিয়ে বললেন, কাল সকালে এই চিঠিটা ছোট বৌদিকে পাঠিয়ে দিবি ড্রাইভারকে দিয়ে। কেউ না থাকলে, তুই নিজে যাবি। জরুরি চিঠি। কাল সকালে বুঝলি?
আচ্ছা। দেবেন বলল।
এবার যা। ভালো করে খাওয়া-দাওয়া কর। হাত ধুয়ে নিস ভালো করে। অনেক খাটনি গেছে আজ তোর।
দেবেন বলল, খাটনির কথা বলবেন না বাবু! অন্যরা তো সব গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়াচ্ছে। খাটনি যা, সব দেবেনেরই। তাও তো আপনি বেশি ভালোবাসেন বলে অন্য সব লোকের কী আক্রোশ আমার ওপর।
দেবেন চলে যাচ্ছিল। সুধীনবাবু ডাকলেন। বললেন, তুই একটা হাতঘড়ি চেয়েছিলি না আমার কাছে? বলেই, নিজের রোলেকস ঘড়িটি বালিশের তলা থেকে তুলে দেবেনকে দিলেন।
বললেন, এটা তুই রাখিস।
এ কী! এ কী! বলল দেবেন। এটা যে আপনার নিজের ঘড়ি। এত দামি!
তা হোক। তুইও দামি। তুই-ই নে। সময়ের দাম ফুরিয়ে গেছে আমার কাছে। ঘড়িতে আমার আর কী দরকার?
তাহলেও। বলল, দেবেন।
এবার যা ভাগ। আমি পড়ব। সুধীনবাবু ওকে তাড়ালেন।
দেবেন চলে যেতে ভাবল, আজ ঘড়িটা কাউকে দেখাবে না। কাল দেখাবে। ঠাকুর, নটবর সকলকে চমকে দেবে ঘড়িটা দেখিয়ে। তার পরই ভাবল, ওরা আবার ভাববে না তো যে চুরি করেছি? ভাবলে কী? বাবুর কাছে ডেকে আনব। বাবুর নিজের মুখেই শুনুক ওরা দেবেনের কী পজিশন এ বাড়িতে।
দেবেন চলে যেতেই দরজাটা বন্ধ করে দিলেন সুধীনবাবু। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে সারা ঘরময় ঘুরে ঘুরে পাউরুটির টুকরাগুলো তুলে খেতে লাগলেন। যেন শিশু হয়ে গেলেন সুধীনবাবু। মিষ্টির চেয়েও ছোট। হামাগুড়ি দিয়ে গাবা মেরে মেরে যমকে মুখে পুরতে লাগলেন, তারপর দাঁতে কাটতে লাগলেন। ছিঁড়ে ছিঁড়ে মৃত্যুকে খেতে লাগলেন তিনি।
বড় জ্বালা করতে লাগল বুক, পেট। আঃ মিষ্টি! দাদু আমার। প্রমিস। তুমি তোমার প্রমিস রেখেছ দাদু। অত যন্ত্রণাতেও প্রমিস ভাঙোনি। এ আমি কী করলাম? মিষ্টি সোনা আমার, কী করলাম আমি! শেষে...শিখা তুমিই ঠিক। বুড়োগুলোর কোনো দিশা নেই।
রুটির টুকরোগুলো চিবোতে চিবোতে, গিলতে গিলতে মনে মনে বললেন; তোমার কী হবে শিখা? দীপুরও কী হবে? মিষ্টিকে ছাড়া তোমরা বাঁচবে কী করে? মনে মনে বলতে লাগলেন সুধীনবাবু।
তারপর স্লিপিং ট্যাবলেটের শিশি খালি করে মুঠো করলেন, দু গ্লাস জলের সঙ্গে সব গিলে ফেললেন।
ফেলেই, কোনোক্রমে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়লেন।
*৪.
বাইরে ভোর হয়ে আসছিল। নার্সিং হোমের ওয়েটিং রুমে বসেছিল ওরা। শিখা, ফুচি, প্রদীপ, অন্যরা। দীপু ভেতরে ছিল ডাক্তারদের সঙ্গে। মেজ বৌ ছিল বাড়িতে, বাচ্চাদের আগলাতে।
ডাক্তার ব্যানার্জি এসে শিখাকে ডাকলেন।
ডাক্তার ব্যানার্জি ভণিতা না করেই বললেন, উই আর সরি। ইট ওয়াজ আ কেস অব পয়জনিং। পুরো চিকিৎসাই তো প্রথমে অন্য রকম হয়েছিল। দেরিও হয়ে গেছিল...
এখন আর কোনো কষ্টই নেই মিষ্টির।
সুধীনবাবু গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
সুধীনবাবুর খুব কষ্ট হতে লাগল। কষ্টের মধ্যেই যেন হঠাৎ মনে হলো, ঘরময়, বাড়িময় তাঁর মস্তিষ্কময়ই ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি করছে।
উনি দেখলেন, তাঁর ছেলেমেয়ে বৌমারা সকলেই ইঁদুর। তেমনই দৌড়াদৌড়ি করছে। তাঁর বাড়িতে, কলকাতা শহরের সব বাড়িতে যেন লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি ইঁদুরের বাস। ওরা নিরন্তর কুটি কুটি করে কাটছে। সম্পত্তি কাটছে, সম্পর্ক কাটছে, সুখ-শান্তি-ভালোবাসা, মায়া-মমতা-সততা সব কিছুই কাটছে। খাওয়ার লোভে নয়। শুধু কাটারই লোভে।
মেজ বৌমা বলেছিল, ইঁদুররা কিছু না কেটে বেঁচে থাকতে পারে না। ঈর্ষায় কাটছে, পরশ্রীকাতরতায় কাটছে, লোভে, ঘেন্নায় কাটছে, একে অন্যকে ইঁদুরগুলো; সর্বক্ষণ কুটুর্ কুটুর্ কুটুর্...
হঠাৎই তাঁর মনে হলো, এতগুলো ইঁদুরের মধ্যে উনি এত দিন ছিলেন কী করে?
একটা বিরাট চওড়া মসৃণ রাস্তা। কিন্তু সুন্দর গন্ধভরা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। কত ফুল, পাখি, প্রজাপতি। তাঁর হাতে স্টিয়ারিং। পাশে মিষ্টি বসেছিল। একটা সুন্দর হলুদ-সাদা ফুল-ফুল ফ্রক পরে।
সবে ভোর হয়েছে। ফুরফুর করে হাওয়া লাগছে গায়ে।
মিষ্টি বলল, ও দাদু। দিদার কাছে কখন পেঁৗছব?
এই তো! পেঁৗছে গেলাম বলে।
সুধীনবাবু বললেন, দিদা তোমাকে দেখে কী বলবে?
কী বলবে আবার? আদর করবে?
তুমি দিদাকে কী বলবে?
কিছু বলব না। আব্বা দেব।
দাদু একটা গল্প বলো না, যেতে যেতে। মিষ্টি বলল।
সুধীনবাবু বললেন, জানো দাদু; একজন বাঁশিওয়ালা ছিল। তার নাম হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা। সে না একদিন সব ইঁদুরকে বাঁশি বাজিয়ে বাজিয়ে; বাজিয়ে...
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1398)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
-
▼
2012
(33842)
-
▼
November
(2002)
-
▼
Nov 06
(62)
- জামায়াতের বিক্ষোভে বাধা, দেশজুড়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
- আবেগআপ্লুত ওবামার চোখে জল
- অনলাইন ব্যাংকিংয়ে অযৌক্তিক ফি by সাইদ আরমান
- সম্মুখ সমরে সোনাক্ষী-আনুশকা
- বিপজ্জনক তারকা সানি লিওন
- পতিতা পল্লীতে প্রিয়াংকা চোপড়া
- স্তনদায়িনী by মহাশ্বেতা দেবী
- বন মর্মর by মনোজ বসু
- জাপানে দালাই লামা- চীনে পরিবর্তন দরকার
- যুক্তরাজ্যে ‘রাষ্ট্রহীন’ পথশিশুরা
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় উঠে এসেছে...
- আগাম ভোটে এগিয়ে ওবামা
- ব্যালটে গুরুত্ব পাচ্ছে যেসব বিষয়
- শবাগার by মতি নন্দী
- সাভারে ‘মাদকের হাট’ by অরূপ রায়
- কমিউনিটি ক্লিনিকে যাচ্ছেন না চিকিৎসকেরা by আবুল ...
- অ্যাসিড ছোড়ায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি
- প্রথম আলোর আলোয় আলোকিত হবে দেশ
- প্রথম আলোর আলোয় আলোকিত হবে দেশ
- খালেদার ভারত সফরে আওয়ামী লীগের স্বপ্ন ভেস্তে গেছে:...
- শিক্ষকদের পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠালেন প্রধান শিক্ষক
- ভর্তি-ইচ্ছুকদের প্রবেশপত্রে নায়ক-নায়িকাদের ছবি!
- বাংলাদেশের এএসইএম ফোরামে যোগদান
- ভুল বিকাশ by মঈনুল আহসান সাবের
- টুকা কাহিনী by বুলবুল চৌধুরী
- আমরা তিনজন by বুদ্ধদেব বসু
- ইঁদুর by বুদ্ধদেব গুহ
- আসেম শীর্ষ সম্মেলন- বাংলাদেশ কী পাবে? by সমীরণ রায়
- সরেজমিন- হিস্পানিকরাই তুরুপের তাস? by মিজানুর রহ...
- সর্বাগ্রে দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি- পুলিশের ঊর্ধ্...
- তীরে এসে নৌকা ডোবাবেন না- মসিউরের ছুটি উপাখ্যান
- চারদিক- প্রাণখোলা এক সন্ধ্যা by আকমল হোসেন
- কী দেব তোমায়?
- হালকা নাশতা বিকেলে
- ফ্রিজে গরুর মাংস তো রয়েছেই। চটপট বানিয়ে ফেলতে পা...
- ঝোল, কোরমা বা রেজালা তো অনেক হলো। গরুর মাংসের ভিন্...
- কিন্নরদল by বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
- সর্বনাশা প্রকল্প-সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে
- বীর মুক্তিযোদ্ধা- তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না
- বর্ষপূর্তি- ‘পরিবারের সবার পত্রিকা’
- ডিসিসি নির্বাচন জানুয়ারিতে! by রোজিনা ইসলাম
- আদালতে ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান- ডিজিএফআইয়ের তদন্ত...
- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-জয় হবে গণতন্ত্রের
- পবিত্র কোরআনের আলো-ফিরআউন ও তার রাজন্যবর্গ মুসার ম...
- কোন দিকে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচ...
- চরাচর-ইস্টিশনের অতিথি by বিশ্বজিৎ পাল বাবু
- কথা সামান্যই-বর্ণ ধর্ম জাতি সম্পর্কিত আইন by ফজলুল...
- কল্পকথার গল্প-কালনেমির লঙ্কাভাগ ও কুম্ভকর্ণের নিদ্...
- কালান্তরের কড়চা-দিল্লির লাড্ডু খেয়েও বেগম জিয়া পস্...
- অরণ্যে রোদন- ‘আমার ঘুম আসে না’ by আনিসুল হক
- এবারও ওহাইও যাঁর, হোয়াইট হাউস তাঁর? by মিজানুর ...
- দেশি-প্রবাসীর সেতুবন্ধ by অমিত চাকমা
- সিপিডির সংলাপ: রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ব্যাংক ব...
- ২০১২ যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আজ- ওবামা ...
- সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ-অসভ্য ও অভদ্র! by আবু এনএম ওয়াহিদ
- সমকালীন প্রসঙ্গ-বিরোধী নেত্রীর বিদেশ সফর এবং গণতন্...
- সুষমা ও সু চিকেও আমন্ত্রণ by শেখ রোকন
- শিক্ষা-মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন কেন? by ...
- রাজনীতি-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-স্বাধীনতার চেতনা by মো...
- সমকালীন প্রসঙ্গ-মিয়ানমার ও বাংলাদেশে বৌদ্ধ-মুসলমা...
- প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-বিশ্ব তাকিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে
- জেএসসি পরীক্ষা-আলোর ছবিতে কালো ছায়া
-
▼
Nov 06
(62)
-
▼
November
(2002)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
ইরান
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
কালবেলা
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
ইউক্রেন
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
নেপাল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
স্বাস্থ্য
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
জ্যোতির্বিজ্ঞান
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
শিল্প ও সাহিত্য
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
গবেষণা
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
জীবনযাপন
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
মেহেদী হাসান
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
মসজিদ
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
ইয়েমেন
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
Exclusive
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
উচ্চশিক্ষা
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
জনস্বাস্থ্য
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
লাতিন আমেরিকা
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
মহাকাশচারী
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
জোহরান মামদানি
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
ইহুদি
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
স্পেন
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment