দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ঘৃণার রাজনীতি জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল by মীনাক্ষী গাঙ্গুলি
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে যখন রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতার স্বার্থে নির্যাতন ও প্রতিশোধের চক্রকে ব্যবহার করেন। তারা অনুসারীদের তথাকথিত ‘শত্রুদের’ বিরুদ্ধে উসকে দেন- হোক তা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, শরণার্থী, অভিবাসী কিংবা প্রতিবেশী দেশ। তাদের আশা থাকে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে দিলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা থেকে মানুষের মনোযোগ সরানো যাবে।
এই ঘৃণামূলক ভাষ্য সীমান্ত ছাড়িয়েও ছড়িয়ে পড়ে। বহু ভারতীয় বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার নিন্দা করেছেন, আবার অনেক বাংলাদেশি ভারতে মুসলমানদের ওপর চলমান আক্রমণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ক্ষোভ এমনকি খেলাধুলার জগতেও ঢুকে পড়ে। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড জাতীয়তার অজুহাতে প্রিমিয়ার লিগের একটি দলকে বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দিতে বাধ্য করে। এর জবাবে বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা দেয়, ভারতে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে তাদের জাতীয় দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।
ভারত-পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্কের কারণে ক্রিকেট ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বহু আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা এপ্রিল মাসে জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গিদের হাতে পর্যটক নিহত হওয়ার পর সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। দুই দেশের মানুষই ক্ষোভ প্রকাশ করে, যার বড় অংশই তাদের নেতাদের উসকানিতে সৃষ্ট।
অনলাইনে ঘৃণার বিস্তার
এখন স্পষ্ট যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে রাজনৈতিক মতাদর্শীরা ইচ্ছাকৃতভাবে অ্যালগরিদমের অপব্যবহার করে অসন্তোষ উসকে দিতে পারে। তারা প্রচার করে যে আইন মেনে চলা, মানবাধিকারকে সম্মান করা কিংবা ভিন্ন পরিচয় ও মতকে গ্রহণ করা- সবই নাকি অপ্রয়োজনীয় ‘তুষ্টিকরণ’। যখন এই কৌশল ব্যর্থ হয়, তখন রাজনীতিকরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথে হাঁটেন এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেন, যেগুলো তাদের লাগাম টেনে ধরতে পারত।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনে অতিষ্ঠ জনগণ অজনপ্রিয় শাসকদের ক্ষমতা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত, পাকিস্তান বা মালদ্বীপের মতো দেশে ভীত শাসকগোষ্ঠী বিক্ষোভ দমিয়ে রাখার পথ বেছে নিয়েছে। ঘৃণা উসকে দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার বদলে নেতারা চাইলে অধিকারভিত্তিক উন্নয়নের কঠিন পথ বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তারা সে পথে যেতে অনিচ্ছুক।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের দমনপীড়নের পর সরকারি চাকরির কোটাবিরোধী ছোট একটি আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলেও দ্রুতই তারা পথ হারায় এবং জনতার প্রতিশোধমূলক দাবির কাছে নত হয়। সরকার ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করে। ফলে আবারও বাংলাদেশের মানুষ পছন্দের নেতৃত্ব বেছে নেয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। পরিস্থিতি কার্যত আগের তিনটি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি, যখন হাসিনা সরকারের অধীনে বিরোধী দলগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
নেপাল ও শ্রীলঙ্কা
নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে সেপ্টেম্বরে হওয়া বিক্ষোভে ৭৬ জন নিহত হন। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং ‘জেন জি’ বিক্ষোভকারীদের পছন্দে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে। কিন্তু পরিবর্তনের আশায় থাকা তরুণরা আবারও হতাশ। তাদের মতে, পুরোনো দুর্নীতিবাজ নেতারাই আবার নির্বাচনে ফিরবে।
শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে গোটাবায়া রাজাপাকসেকে উৎখাত করা গণআন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট হন অনূঢ়া কুমারা দিসানায়েকে। তিনি দুর্নীতি দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গৃহযুদ্ধের সময়কার অপরাধের জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মতে, তার সরকার এখনও কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করছে, যা মূলত তামিল ও মুসলিম সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে প্রয়োগ করা হয়। হেফাজতে নির্যাতন, নজরদারি, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীদের হয়রানিও অব্যাহত রয়েছে।
ভারতের বাস্তবতা
ভারতে দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার পরও বিজেপি ভোটের স্বার্থে বিষাক্ত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি নেতারা ঘৃণামূলক বক্তব্য দেন এবং উসকানি দেয়ার পর সমর্থকদের থামাতে অনিচ্ছুক থাকেন- যখন তারা মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করে, খ্রিস্টানদের উপহাস করে বা শিখ ও দলিতদের লাঞ্ছিত করে। প্রতিবাদ হলে কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো দমনমূলক আইনে মানুষকে কারাবন্দি করে এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দেয়।
শেষ কথা
রাজনৈতিক নেতাদের বুঝতে হবে- ঘৃণা ছড়ানো, পক্ষপাতদুষ্ট বিচারব্যবস্থা বা মানবাধিকার স্থগিত রাখা কেবল আরও নির্যাতন ডেকে আনে। এক সময় এই ক্ষোভ এমন জনরোষে রূপ নিতে পারে, যা স্বৈরাচারী নেতাদের দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করবে। এর বদলে তাদের উচিত সমতা প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনগণের অধিকার রক্ষা করা। মানুষের জীবনে প্রকৃত উন্নয়ন- রাজনৈতিক কৌশলের নামে বিভাজন নয়, এটাই সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড।
(মীনাক্ষী গাঙ্গুলি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক। তার এ লেখাটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

No comments