ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে
প্রতিরক্ষামূলক
অবস্থানে থাকা ট্রাম্প অন্যান্য ন্যাটো দেশের বিরুদ্ধে ‘ভীরুতা’র অভিযোগ
তুলেছেন। কারণ তারা হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখতে সহায়তা করতে অস্বীকৃতি
জানিয়েছে। তিনি দাবি করেন, সামরিক অভিযান পরিকল্পনা অনুযায়ীই এগোচ্ছে।
কিন্তু যুদ্ধটি ‘সামরিকভাবে জয়ী হয়েছে’ শুক্রবার ট্রাম্পের এই ঘোষণা
বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষিক দেখা যাচ্ছে। কারণ ইরান এখনো প্রতিরোধ চালিয়ে
যাচ্ছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করছে এবং পুরো
অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
ক্ষমতায় আসার সময় ট্রাম্প
প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বোকামিপূর্ণ’ সামরিক হস্তক্ষেপ
থেকে দূরে রাখবেন। কিন্তু এখন তিনি এমন একটি সংঘাতের ফলাফল বা বার্তা-
কোনোটিই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, যে সংঘাত শুরু করতে তিনি নিজেই
ভূমিকা রেখেছেন।
একটি স্পষ্ট প্রস্থান কৌশলের অভাব তার প্রেসিডেন্ট
হিসেবে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং তার দলের ভবিষ্যৎ- উভয়ের জন্য ঝুঁকি তৈরি
করছে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। তাতে
রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে
দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার
বলেন, ট্রাম্প নিজেই নিজেকে ‘ইরান যুদ্ধ’ নামে একটি বাক্সের মধ্যে বন্দি
করেছেন। তিনি বুঝতে পারছেন না কীভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসবেন। এটাই তার
সবচেয়ে বড় হতাশার কারণ।
তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এই মূল্যায়নের
বিরোধিতা করেন। তার মতে, লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় ইরানের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত
হয়েছেন, তাদের নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
সক্ষমতাও ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়েছে। তিনি বলেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি বড়
সামরিক সাফল্য।
ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমা
গত এক সপ্তাহে
কূটনৈতিক, সামরিক এবং রাজনৈতিক- সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হোয়াইট হাউসের আরেক কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প অবাক হয়ে
দেখেন যে ন্যাটো মিত্রসহ অনেক বিদেশি অংশীদার তাদের নৌবাহিনী পাঠিয়ে হরমুজ
প্রণালি নিরাপদ করতে আগ্রহী নয়। প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন
দেখাতে না চাওয়ায় হোয়াইট হাউসের কিছু উপদেষ্টা তাকে দ্রুত একটি ‘পিছিয়ে
যাওয়ার পথ’ খুঁজে নিতে এবং সামরিক অভিযানের পরিধি সীমিত করার পরামর্শ
দিয়েছেন। তবে এসব যুক্তি ট্রাম্পকে কতটা প্রভাবিত করবে তা স্পষ্ট নয়। কিছু
বিশ্লেষকের মতে, মিত্রদের অনীহা কেবল এমন একটি যুদ্ধে জড়াতে না চাওয়ার
কারণে নয়, যেটি শুরু করার আগে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি; বরং গত ১৪
মাসে ট্রাম্পের ধারাবাহিকভাবে ঐতিহ্যগত মার্কিন জোটগুলোকে ছোট করে দেখার
প্রতিক্রিয়াও এতে কাজ করছে।
এদিকে ইসরাইলের সঙ্গেও কিছু মতবিরোধ
প্রকাশ্যে এসেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে
ইসরাইলের হামলার বিষয়ে তিনি আগাম কিছু জানতেন না। কিন্তু ইসরাইলি
কর্মকর্তারা বলেছেন, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের অভিযান নিয়ে এমন
এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছেন এবং তিনি কোন পথ বেছে নেবেন তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তিনি চাইলে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারেন। যেমন, ইরানের প্রধান
তেলকেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখল করা বা ইরানের উপকূলে সেনা মোতায়েন করে
ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংসের চেষ্টা করা। কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদি
সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা অধিকাংশ আমেরিকানই সমর্থন
করবে না।
অন্যদিকে উভয় পক্ষই আপাতত আলোচনায় রাজি না হওয়ায় ট্রাম্প চাইলে
বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। তবে এতে
উপসাগরীয় মিত্ররা ক্ষুব্ধ হতে পারে। কারণ তাদের সামনে তখন আহত কিন্তু
শত্রুভাবাপন্ন একটি ইরান থেকে যাবে। যে ইরান এখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির
চেষ্টা করতে পারে এবং উপসাগরের নৌপথ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। যদিও ইরান
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে। বার্তা সংস্থা
রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার
অতিরিক্ত মেরিন ও নাবিক পাঠাচ্ছে। তবে ইরানের ভেতরে সরাসরি সেনা পাঠানোর
সিদ্ধান্ত এখনো নেয়া হয়নি।
রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে
এই যুদ্ধ
ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা (মাগা) আন্দোলনের ওপর তার
একসময়ের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। আন্দোলনের
কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রকাশ্যে যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। এ পর্যন্ত
তার মূল সমর্থকরা তাকে সমর্থন দিলেও বিশ্লেষকদের মতে, গ্যাসের দাম বাড়তে
থাকলে এবং মার্কিন সেনা আরও মোতায়েন করা হলে আগামী সপ্তাহগুলোতে সেই সমর্থন
কমে যেতে পারে। রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডেভ উইলসন বলেন, যখন অর্থনৈতিক প্রভাব
স্পষ্ট হবে, তখন মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করবে- আমি আবার কেন এত বেশি
গ্যাসের দাম দিচ্ছি? হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি কেন ঠিক করবে আমি আগামী মাসে
ছুটিতে যেতে পারব কি না?
ভুল হিসাব
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু
হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ধীরে ধীরে উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে
এই সংঘাত এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আগেই আরও বিস্তারিত পরিকল্পনা করা
উচিত ছিল। তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, সামরিক অভিযানটি
ব্যাপকভাবে পরিকল্পিত ছিল এবং সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল- ইরান এই সংঘাতকে অস্তিত্বের
প্রশ্ন হিসেবে দেখবে।

No comments