Saturday, July 11, 2026
ওয়াশিংটনে বসে যেভাবে ভেনেজুয়েলা চালাচ্ছেন রুবিও
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানের পর দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এরপর থেকে মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃত অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে রুবিও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এমনকি তারা স্প্যানিশ ভাষায় হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা আদান-প্রদান করেন, যেখানে রাষ্ট্রীয় বিষয় ছাড়াও ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা ও অনানুষ্ঠানিক কথোপকথনও হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দাবি করা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ রপ্তানি আয়ের অর্থ প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারিতে জমা হয়। পরে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে দেশটির বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে সেই অর্থ ধাপে ধাপে ভেনেজুয়েলা সরকারকে দেওয়া হয়। অর্থ কী খাতে ব্যয় হবে এবং কারা তা ব্যবহার করতে পারবে এসব বিষয়ে রুবিও ও তার টিমের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একদিকে ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের চাপ থেকে দেশটির সরকার কিছুটা সুরক্ষা পাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে এতে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এছাড়া ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন, দেশটির তেল খাতে সংস্কার এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও রুবিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এমনকি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগের বিষয়েও অন্তর্বর্তী প্রশাসন তার সঙ্গে পরামর্শ করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত মাসে ভেনেজুয়েলায় দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর দেশটির অন্তর্বর্তী সরকারকে সহায়তা জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পর্যন্ত প্রায় ৯০০ মার্কিন সামরিক সদস্য মোতায়েন, প্রায় ৪০ কোটি মার্কিন ডলারের সহায়তা এবং নগদ অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের কারণে ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও দেশটির পুনরুদ্ধার ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে প্রতিবেদনে উপস্থাপিত এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ভেনেজুয়েলার সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও |
Friday, June 26, 2026
‘মনে হচ্ছিল কোনো ভৌতিক সিনেমার দৃশ্য’
গত বুধবার ভেনেজুয়েলায় এক মিনিটের কম সময়ের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ২৩৫–এ দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় কয়েক ডজন ভবন ধসে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, প্রথমে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প কারাকাসের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে আঘাত হানে। এর ১ মিনিটের কম সময়ে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরও শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়।
ইউএসজিএসের পূর্বাভাস বলছে, হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার হতে পারে। মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে ছুটছেন উদ্ধারকর্মীরা। অনেকে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে সাহায্য চাইছেন। কয়েকজন জীবিত ব্যক্তিকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
মারিয়া আলেহান্দ্রা বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপ টপকে আমাদের বের হতে হয়েছে। আমাদের ভবনের তত্ত্বাবধায়ক তাঁর শিশুকে নিয়ে এবং অন্য প্রতিবেশীরা আতঙ্কে নিচে নেমে এসেছিলেন। কিন্তু ধসে পড়া ওই ভবন থেকে আমি শুধু একটি পরিবারকেই বের হতে দেখেছি।’
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘অনেক ভবন ধসে পড়েছে। যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করার জন্য অত্যন্ত জোরাল অভিযান চলছে। এটি সত্যিকারের একটি ট্র্যাজেডি।’
ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতাদের উদ্যোগে চালু করা একটি ওয়েবসাইটে স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার রাত দুইটার কিছু পর পর্যন্ত ৬ হাজার ৬০০–এর বেশি মানুষ নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
জাতীয় ছুটির দিনে বিকেলে ভূমিকম্প দুটি আঘাত হানায় অনেক মানুষ তখন বাড়িঘরে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থলে ছিলেন।
পূর্ব কারাকাসের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্তিনেজ বলেন, ‘খুব জোরে একটা বিকট শব্দ হয়। ঘরের জিনিসপত্র সব পড়ে যেতে থাকে। জীবনে এমন কিছু কখনো দেখিনি।’
পশ্চিম কারাকাসের বাসিন্দা ৪১ বছর বয়সী অ্যাস্ট্রিড রামিরেজ বলেন, ‘কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই সিঁড়ি বেয়ে নিচে দৌড়াতে শুরু করে।’
দক্ষিণ কারাকাসের ৮০ বছর বয়সী মারিয়া রোমেরো বলেন, পুলিশ তাঁকে বাড়ি থেকে বের হতে সহায়তা করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘এই ভূমিকম্প ছিল ভয়াবহ; এমনকি ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও।’
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মাইকেতিয়া বিমানবন্দর থেকে ভিডিও বার্তায় সাবেক আইনপ্রণেতা উইলমের আজুয়াহে বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। শক্তিশালী ভূমিকম্পে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।’
কারাকাসের মেডিক্যাল শিক্ষার্থী হুয়ান অর্তিজ বলেন, ‘আমি হতবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারা গেছে। আরেকজন ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন। উপকূলীয় এলাকায় আমার পরিচিত আরও প্রায় ২০ জন নিখোঁজ।’
ভূমিকম্পের পর এ পর্যন্ত একের পর এক অন্তত ৩০টি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে।
দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারীরা ভেনেজুয়েলায় আসছেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ কয়েকজন বিদেশি নেতাকে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ভেনেজুয়েলায় যে দুটি বড় ভূমিকম্প হয়েছে, তা ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত, ইচ্ছুক ও সক্ষম।’
কারাকাসের হাসপাতালগুলোয় আহত মানুষের চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও কর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র নিরূপণে কর্তৃপক্ষ সপ্তাহের বাকি সময়ের জন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, এল সালভাদর, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, ব্রাজিল, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশ ভেনেজুয়েলাকে সহায়তা ও সংহতির বার্তা দিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং জরুরি সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
![]() |
| ভেনেজুয়েলার লা গুয়ারায় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনে আগুন ধরে যায়। ছবি: রয়টার্স |
Thursday, March 26, 2026
সাদ্দাম থেকে মাদুরো: ইতিহাস কেন বারবার ফিরে আসে by আব্দুলরহমান আল রাশেদ
জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে নিয়ে চাভেজের সেই বিখ্যাত মন্তব্য কেই–বা ভুলতে পারে! তিনি বলেছিলেন, গতকাল এখানে শয়তান এসেছিল এবং আজও গন্ধটা সালফারের মতো রয়ে গেছে। অন্যদের মতো তিনিও অবাস্তব লড়াইয়ে নেমেছিলেন। বাস্তবে তাঁর শাসনকাল কেটেছে অবরুদ্ধ অবস্থায় এবং শেষ পর্যন্ত পরাজয়ই ছিল তাঁর পরিণতি।
বাক্পটু চাভেজের পর এলেন মাদুরো। একজন সাধারণ মানুষ। পেশায় ছিলেন বাসচালক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। তিনি পূর্বসূরির পথেই হাঁটলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিদ্রূপ করাই তাঁর প্রিয় বিষয় হয়ে উঠল।
কিন্তু হোয়াইট হাউসে বসা নতুন শাসকের চরিত্র মাদুরো বুঝতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে ধরতে পারবেন না। আলোচনার পথে না গিয়ে তিনি নিজেকে প্রাসাদে বন্দী করলেন এবং প্রেসিডেন্ট ভবনকে ভারী অস্ত্রসজ্জিত দুর্গে পরিণত করলেন। এরপর মাদুরোর পরিণতি হয়েছে অনেকটা ২০০৩ সালের সাদ্দামের মতো।
ইরাকের নেতা সাদ্দাম বিস্ময়ে দেখেছিলেন, মার্কিন সেনাদের বহর দজলা নদীর পাড় ধরে বাগদাদের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে আসছে। তখন সাদ্দাম তড়িঘড়ি পালিয়ে যান। তবে খুব শিগগির নিজের লোকের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি ধরা পড়েন এবং মার্কিন সেনাদের হাতে বন্দী হন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকেও একইভাবে পায়জামা পরা অবস্থায় নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট বললেন, মাদুরোর পরিণতি অন্য নেতাদের জন্য শিক্ষা। কিউবা, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টদের জন্য এটি মাদক পাচারকে প্রশ্রয় না দেওয়ার সতর্কবার্তা।
লাতিন আমেরিকার সমাজ আরব সমাজের মতোই। সেখানে দেশগুলোকেও আত্মমগ্ন ও জনতুষ্টিবাদী নেতাদের বোঝা বইতে হয়। আমি ২০০৭ সালে কারাকাস গিয়েছিলাম। তখন শহরটিকে সুন্দর ও পরিষ্কার মনে হয়েছিল। শহরটিকে ঘিরে বেশ কিছু বস্তি ছিল। আমাদের গাইড আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বস্তিবাসীরা সবাই অভিবাসী। উন্নত জীবনের আশায় লাখ লাখ মানুষ এই তথাকথিত ধনী দেশে এসে জড়ো হয়েছে।
বিপ্লবী সরকারের নীতির ফলে জীবনযাত্রার মান দ্রুত খারাপ হতে থাকে। শহরে সশস্ত্র লোকজন দেখা যেত প্রায়ই। তারা পুলিশ ছিল না। ছিল নির্দিষ্ট ভবন পাহারা দেওয়ার জন্য ভাড়া করা বেসামরিক লোক। আমাদের হোটেলের পার্কিংয়ের প্রবেশপথেও তারা ছিল। তখন এক ডলার সমান ছিল দুই বলিভার। চাভেজ এবং পরে মাদুরোর শাসনে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যায়। মুদ্রার মান নেমে আসে ১ ডলারে বা প্রায় ৫০০ বলিভারে। দারিদ্র্যের চাপে ৫০ লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।
তেলসমৃদ্ধ একটি দেশ কেন মহাদেশজুড়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে! কেন একজন প্রেসিডেন্ট শীতল যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যাওয়া বিপ্লবী ভঙিমা আঁকড়ে থাকবেন! দৃশ্যটা ছিল লিবিয়ার মতোই। সম্পদে ভরপুর কিন্তু বাস্তবে দরিদ্র একটি দেশ। মাদুরো এখন আটক। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি চাভেজের ছায়ায় ছিলেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি চাভেজকে অনুকরণ করে শাসন করেছেন; কিন্তু মাদুরো যেখানে একজন সাধারণ মানুষ, সেখানে চাভেজ ছিলেন গভীর ও আদর্শ দ্বারা চালিত একজন নেতা। তিনি তেলসমৃদ্ধ দেশে বিপ্লবী বাগ্মিতাকে বৈধতা দেন। মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বের করে দেন। বড় বিনিয়োগ জাতীয়করণ করেন।
চাভেজ নিজেকে একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে তুলে ধরতেন। কবি ও লেখকদের দ্বারা নিজেকে ঘিরে রাখতেন। লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসও ছিলেন তাঁর বন্ধুদের একজন। চাভেজ নিজেকে ভেনেজুয়েলার ঐতিহাসিক নেতা সিমন বলিভারের উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করতেন। প্রেসিডেন্ট হয়েও তিনি সাপ্তাহিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান করতেন। একবার টানা আট ঘণ্টা কথা বলেছিলেন।
অবশ্য তাঁর কথার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান ছিল বিশাল। দারিদ্র্য বাড়ছিল। বেকারত্ব বাড়ছিল। গ্রেপ্তারও বাড়ছিল। চাভেজ ৫৮ বছর বয়সে কিউবার একটি ক্লিনিকে ক্যানসারে মারা যান। যদিও কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, তাঁর শরীরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। তাঁর জায়গায় আসেন মাদুরো। তিনি রাজনীতিতে চাভেজকে অনুকরণ করলেও চাভেজের বাগ্মিতা মাদুরোর ছিল না।
আমরা জানি, ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরিদের মতো নেতা নন। তাঁর আগের প্রেসিডেন্টরা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক একঘরে করার নীতিতে ভরসা করেছিলেন। ট্রাম্প ভিন্ন পথ নেন। তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ে এক আঘাতেই সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন। তিনি সরকার পরিবর্তন চাননি। বরং মাদুরোকেই লক্ষ্য করেন এবং ভেনেজুয়েলার উপপ্রধানের সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হন। যে নেতারা ট্রাম্পের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, তাঁদের জন্য কারাকাসের ঘটনা একটি স্পষ্ট বার্তা। সতর্ক থাকুন, ট্রাম্প জেতার জন্য সবই করতে পারেন।
* আব্দুলরহমান আল রাশেদ, মধ্যপ্রচ্যের সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ।
- আরব নিউজ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| নিকোলা মাদুরো। ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, March 24, 2026
নতুন বিশ্বব্যবস্থা: রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোপন প্রস্তাব’ কি সত্য হতে চলেছে by ওয়েন জোন্স
কথাটা শুনতে হয়তো উল্টো মনে হতে পারে। কারণ, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তো তার ক্ষমতাই দেখিয়েছে, দুর্বলতা দেখায়নি। তারা একটি দেশের নেতাকে অপহরণ করেছে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ভেনেজুয়েলা ‘চালাবেন’।
এই দৃশ্য কি নিজ শক্তিতে মাতাল পরাশক্তির ক্ষমতার নেশার আড়ালে থাকা অবক্ষয়কেই প্রকাশ করে না?
ট্রাম্পের বড় গুণ (যদি একে গুণ বলা যায়) তাঁর অকপটতা। আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা নগ্ন স্বার্থকে ‘গণতন্ত্র’ আর ‘মানবাধিকার’-এর মুখরোচক ভাষায় ঢেকে দিতেন। ট্রাম্প সে ভব্যতার মুখোশই পরেন না। ২০২৩ সালে তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, ‘আমি যখন ক্ষমতা ছাড়ি, ভেনেজুয়েলা তখন ভাঙনের মুখে ছিল। আমরা যদি তখন ওটা দখল করে নিতাম, তাহলে একদম পাশের বাড়িতেই দরকারি সব তেল পেতাম।’
এটি ট্রাম্পের হঠাৎ বলে ফেলা কোনো কথা নয়। তেল দখলের যুক্তি ট্রাম্পের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রেই স্পষ্টভাবে লেখা আছে। কৌশলপত্রের সেই নথি ওয়াশিংটনে দীর্ঘদিন অস্বীকার করা যে সত্যকে মেনে নেয়, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের অবসান হয়েছে।
কৌশলপত্রে বিদ্রূপের সুরে বলা হয়েছে, শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির শীর্ষ মহল নিজেদের বোঝাতে শুরু করেছিল, সারা পৃথিবীর ওপর স্থায়ী মার্কিন আধিপত্যই দেশের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে। কিন্তু এখন তারা স্বীকার করছে, গ্রিক পুরাণের দেবতা অ্যাটলাসের মতো গোটা বিশ্বকে কাঁধে তুলে রাখার দিন যুক্তরাষ্ট্রের শেষ হয়ে গেছে। বিশ্ব পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে যুগ ছিল, তার ইতি টানার ঘোষণাই কৌশলপত্রে দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যমান ব্যবস্থার জায়গায় আসছে এমন এক বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে একাধিক শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের মতো করে আলাদা আলাদা এলাকা দখলে রাখবে এবং প্রভাব খাটাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেই এলাকা হবে পুরো আমেরিকা মহাদেশ।
কৌশলপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বহুদিন অবহেলার পর যুক্তরাষ্ট্র আবার পশ্চিম গোলার্ধে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং সে জন্য তারা মনরো নীতিকে (প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ঘোষিত একটি নীতি, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ রোধ করার কথা বলা আছে) নতুন করে কার্যকর করবে।
মনরো নীতি উনিশ শতকের শুরুতে তৈরি হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, ইউরোপ যেন আমেরিকা মহাদেশে উপনিবেশ না গড়ে। কিন্তু বাস্তবে এই নীতির ফল হয়েছে ভিন্ন। এর মাধ্যমে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
ওয়াশিংটনের সহায়তায় লাতিন আমেরিকায় সহিংসতা নতুন কিছু নয়। আমার মা–বাবা চিলির ডানপন্থী স্বৈরতন্ত্র থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের পরই ডানপন্থী স্বৈরশাসক ক্ষমতায় বসেন।
তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘নিজেদের মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে কোনো দেশ কমিউনিস্ট হয়ে যাচ্ছে—এটা আমরা বসে বসে দেখব কেন?’ এই একই যুক্তি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া এবং মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয়জুড়ে হত্যাযজ্ঞ চালানো শাসনগুলোর প্রতি মার্কিন সমর্থনের ভিত্তি ছিল।
তবে গত তিন দশকে সেই আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তথাকথিত ‘পিঙ্ক টাইড’—ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভার নেতৃত্বে প্রগতিশীল সরকারগুলো আঞ্চলিক স্বাধীনতা জোরদার করতে চেয়েছিল। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন এ সময়ে মহাদেশজুড়ে তার শক্তি বাড়িয়েছে।
এ অবস্থাকে উল্টিয়ে দেওয়ার চেষ্টার প্রথম চালই ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি আসলে কথার মানুষ—বেশি চেঁচামেচি করেন, কিন্তু কাজের বেলায় তেমন কিছু করেন না। বাস্তবে তখন তিনি রিপাবলিকান দলের পুরোনো ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর সঙ্গে একধরনের অঘোষিত সমঝোতায় ছিলেন।
শর্তটা ছিল: তিনি অভিজাতদের ওপর থেকে কর কমাবেন, বড় ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবেন; আর এর বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইচ্ছেমতো উত্তেজক কথা বলবেন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর মার্কিন অভিজাতরা নিজেদের সামরিক অজেয়তা আর অর্থনৈতিক মডেলকে মানব উন্নয়নের চূড়ান্ত গন্তব্য ভেবে নিয়েছিলেন। সেই অহংকারই সরাসরি বিশ্বকে ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ার বিপর্যয়ে এবং ২০০৮ সালের আর্থিক ধসে নিয়ে যায়। তাঁরা নিজেদের মানুষকে স্বর্গীয় স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তারপর একের পর এক দুর্যোগে টেনে নিয়েছেন। সেই হতাশা থেকেই জন্ম নেয় ট্রাম্পবাদ।
যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষয় সবার সামনে আসে, তা থেকেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারণাটি আসে। আর এ ধারণার মূল সুর হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক আধিপত্য ছেড়ে গোলার্ধভিত্তিক সাম্রাজ্য কায়েম করতে হবে।
উনিশ শতকের শেষে যুক্তরাষ্ট্র যখন স্পেনকে হারিয়ে ফিলিপাইন দখল করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই অনেকে এর বিরোধিতা করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী নাগরিকেরা মিলে গড়েছিলেন ‘আমেরিকান অ্যান্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট লীগ’। তাঁদের কথা ছিল পরিষ্কার—সাম্রাজ্যবাদ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যায় এবং দেশকে ধীরে ধীরে সামরিক শাসনের দিকে ঠেলে দেয়।
কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে সেই সমঝোতা আর নেই। এবারকার ট্রাম্প আর শুধু কথায় সীমাবদ্ধ নন, তিনি পূর্ণ শক্তিতে একটি চরম ডানপন্থী শাসন কায়েম করতে চাইছেন।
এ কারণে ট্রাম্প যখন কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টদের হুমকি দেন, তখন তা বিশ্বাস করুন। যখন তিনি বলেন, ‘কিউবা ধসে পড়ার মুখে’, তখন তাঁর কথা বিশ্বাস করুন। তিনি যখন বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড অবশ্যই আমাদের দরকার’—বিশ্বাস করুন। এটাও বিশ্বাস করুন, ইউরোপের ২০ লাখের বেশি বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড দখলের ইচ্ছা তিনি সত্যিই পোষণ করেন।
যদি বা যখন গ্রিনল্যান্ড ট্রাম্পীয় সাম্রাজ্যের মুঠোয় যায়, তখন কী হবে? ভেনেজুয়েলার ওপর তাঁর প্রকাশ্য বেআইনি হামলায় ইউরোপ যে মিনমিনে দুর্বল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তিনি নিশ্চয়ই তা লক্ষ করেছেন। এখন ডেনমার্কের সার্বভৌম ভূখণ্ড দখল হলে যৌথ প্রতিরক্ষার নীতিতে গড়ে ওঠা ন্যাটোর অবসান অনিবার্য হয়ে উঠবে। আন্দাজ করা যায়, রাশিয়া যেভাবে প্রকাশ্যে ইউক্রেনের জমি কেড়ে নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও একইভাবে ডেনমার্কের জমি চুরি করবে। এর বিরুদ্ধে লন্ডন, প্যারিস বা বার্লিন থেকে মৃদু আওয়াজ হয়তো উঠবে। কিন্তু ততক্ষণে পশ্চিমা জোট শেষ।
এর কিছুদিন পর বিশ শতকের শুরুতে ডেমোক্রেটিক পার্টিও সতর্ক করে বলেছিল—কোনো দেশ একসঙ্গে অর্ধেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আর অর্ধেক সাম্রাজ্য হয়ে টিকে থাকতে পারে না। বিদেশে সাম্রাজ্য গড়তে গেলে শেষ পর্যন্ত দেশের ভেতরেও স্বৈরতন্ত্র ঢুকে পড়ে।
আজ এসব পুরোনো সতর্কবাণীকে আর অতিরঞ্জন বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ, বাইরে অন্য দেশগুলোর ওপর যা করা হয়, তার প্রভাব দেশের ভেতরেও পড়ে। মার্তিনিকের লেখক এমে সেজেয়ার একে বলেছেন সাম্রাজ্যের ‘বুমেরাং’। তাঁর মতে, উপনিবেশবাদ বাইরে গিয়ে যা সৃষ্টি করে, তা একসময় ঘুরে এসে নিজের দেশকেই আঘাত করে। ইউরোপে যেমন উপনিবেশবাদ শেষে ফ্যাসিবাদ ফিরে এসেছিল।
আমরাও দেখেছি ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর বুমেরাং। বিদেশে যুদ্ধের ভাষা ও যুক্তি এখন দেশের ভেতরে দমননীতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ট্রাম্পের উপপ্রধান স্টাফ স্টিফেন মিলার পর্যন্ত বলেছেন, ডেমোক্রেটিক পার্টি নাকি একটি ‘ঘরোয়া চরমপন্থী সংগঠন’। আফগানিস্তান বা ইরাকে একসময় যেভাবে সেনা পাঠানো হয়েছিল, ডেমোক্র্যাট–শাসিত শহরগুলোতে সেভাবেই ন্যাশনাল গার্ড নামানো হচ্ছে, যেন সেগুলো শত্রু এলাকা।
এই দৃষ্টিতে দেখলে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিষয়ে ট্রাম্পের নরম মনোভাবও আর রহস্যজনক থাকে না। ২০১৯ সালে শোনা গিয়েছিল, রাশিয়া প্রস্তাব দিয়েছিল—যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেন থেকে সরে আসে, তাহলে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন প্রভাব মেনে নেওয়া হবে। এমন কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তা অবশ্য জানা নেই।
কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে। সেখানে ক্ষমতাধর, কর্তৃত্ববাদী দেশগুলো জোর খাঁটিয়ে প্রতিবেশীদের নিয়ন্ত্রণ করবে এবং তাদের সম্পদ দখল করবে, যা একসময় কল্পনার দুঃস্বপ্ন মনে হতো, আজ তা বাস্তব হয়ে চোখের সামনে ঘটছে। এখন আসল প্রশ্ন হলো—এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো উপায়, ইচ্ছা আর শক্তি কি আমাদের আছে?
* ওয়েন জোন্স, গার্ডিয়ানের কলাম লেখক।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
[৭ জানুয়ারি ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা সংক্ষিপ্তাকারে ট্রাম্প নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ছেন, ভেনেজুয়েলা দিয়ে শুরু—এ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]
![]() |
| ডোনাল্ড ট্রাম্প, বন্দী নিকোলা মাদুরো ও ভ্লাদিমির পুতিন। কোলাজ: প্রথম আলো |
Sunday, February 22, 2026
ট্রাম্পের চাপের মধ্যে ভেনেজুয়েলা, নতুন প্রেসিডেন্টের কৌশল কি
যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঝটিকা অভিযানের পর ৩রা জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে দেশ থেকে তুলে নিয়ে যায় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ভেনেজুয়েলা তখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং এখনকার কার্যনির্বাহী লিডার ডেলসি রদ্রিগেজ নতুন করে মাদুরো ও ফ্লোরেসের প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানালেও, এমন কোনো চিহ্ন নেই যে তাদেরকে ফেরত দেয়া হবে। মাদুরো ও তার স্ত্রী এখন নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে বিচার অপেক্ষায় রয়েছেন। ড্রাগ ট্রাফিকিংসহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তারপরও মাদুরোর অনুগত রদ্রিগেজ একটি জটিল ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্য: তার সমাজতান্ত্রিক ভিত্তিকে ধরে রাখতে মাদুরোকে সমর্থন করে থাকে এবং একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মধ্যে নীতি পরিবর্তন করে, যেহেতু না মানলে তার ভাগ্যও মাদুরোর মতো হতে পারে।
চাতাম হাউস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের ল্যাটিন আমেরিকা সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ক্রিস্টোফার সাবাতিনি বলেন, ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভেনেজুয়েলা এখন মার্কিন প্রোটেক্টরেট। তাই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছায় কাজ করছেন। তার বিরুদ্ধেও তদন্ত হচ্ছে। এ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হননি, ইন্ডিক্টমেন্ট বা বাউন্টি নেই। তবে হুমকি সবসময় আছেই। হুমকি হলো, ‘আমাদের কাছে আপনার বিরুদ্ধে প্রমাণ আছে।’
রদ্রিগেজ এখন কূটনৈতিক একটি তীব্র ভারসাম্য ধরে রেখেছেন। তার প্রথম বক্তব্যে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট মাদুরো ইতিমধ্যেই এরকম আক্রমণের সতর্কতা দিয়েছিলেন। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও আগ্রহ আছে। তবে পরে ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, কারাকাস ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে এবং তিনি সেই অর্থ পরিচালনা করবেন।
১৬ জানুয়ারি জাতীয় পরিষদে তার প্রথম ভাষণে রদ্রিগেজ ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সম্প্রসারণের’ সমালোচনা করেন। একই দিনে তিনি সিআইএ ডিরেক্টর জন রাটক্লিফের সঙ্গে কারাকাসে সাক্ষাৎ করেন। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বিশ্লেষক কারমেন বিয়াট্রিজ ফার্নান্দেজ বলেন, রদ্রিগেজের বৈধতা মার্কিন সামরিক শক্তির উপর নির্ভর করছে। এটি টিকে থাকবে যদি ট্রাম্প চায়। তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন না। একটি বড় প্রশ্ন হলো, রদ্রিগেজ কতক্ষণ ভেনেজুয়েলার বামপন্থী এবং মার্কিন প্রশাসন উভয়ের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারবে? আর যদি তাকে বেছে নিতে হয়, কতটা কঠিন হবে তা, নাকি একপক্ষ সুস্পষ্টভাবে ক্ষমতাশালী?

Saturday, February 14, 2026
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনে লাভ হবে পুতিনের by লিওনিদ রাগোজিন
ভেনেজুয়েলা কোনো বড় শক্তি নয়। তবু দেশটি বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি চীন, ইরান ও রাশিয়ার রাজনৈতিক মিত্র। এই দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। এই তিন দেশের মধ্যে ভেনেজুয়েলা প্রশ্নে সবচেয়ে জটিল অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ক্রেমলিনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। তবে এর মধ্যেই কিছু সম্ভাব্য লাভও আছে। ২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরতেই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের পরিস্থিতি হঠাৎ একধরনের অংশীদারত্বে ফিরে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তারা প্রায় নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়। তবে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া চালু রাখে। জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের সর্বশেষ সংস্করণে যুক্তরাষ্ট্র ‘সরাসরি হুমকি’ তালিকা থেকে রাশিয়ার নামও বাদ দেয়। ট্রাম্পের উদ্যোগে ইউক্রেন নিয়ে শান্তি আলোচনা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পুতিনের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে যুদ্ধটি তাঁর শর্তেই শেষের দিকে যাচ্ছে।
এই সবকিছু বিবেচনায় নিলে বোঝা যায়, ভেনেজুয়েলার মতো দূরের এবং রাশিয়ার মূল স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন বিষয় নিয়ে ক্রেমলিন এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবে না । রাশিয়া কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ লাতিন আমেরিকান সরকারকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠবে না। ভেনেজুয়েলার প্রতি রাশিয়ার সমর্থন সব সময়ই ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর কতটা চাপ দিচ্ছে, তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত থাকবে।
নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সম্ভাব্য পতন ক্রেমলিনের জন্য পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রের শাসন পরিবর্তনের নেশার কারণে যেসব দেশে রাশিয়ার ঐতিহ্যগত মিত্ররা ক্ষমতা হারিয়েছে, সেখানে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রাশিয়ার আছে। এখানে একটি নির্দয় রাজনৈতিক হিসেবেও কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলা চালায়, তাহলে সেই পদক্ষেপ থেকে পাওয়া ভূরাজনৈতিক লাভ সম্ভাব্য ক্ষতির চেয়েও বেশি হতে পারে রাশিয়ার। কারণ, এতে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রশ্নে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র নৈতিকভাবে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ‘নিজস্ব উঠানে’ সামরিক শক্তি দিয়ে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে, তাহলে রাশিয়া কেন নিজের অঞ্চলে একই কাজ করতে পারবে না?
সাধারণভাবে রাশিয়ানরা নিজেদের পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে দেখে। তারা নিজেদের পররাষ্ট্রনীতিতে চূড়ান্ত রক্ষণশীল মনে করে। তাদের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব একটি সংশোধনবাদী শক্তি, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার জন্য দায়ী। ইউক্রেন যুদ্ধকে তারা সেই সংশোধনবাদ ঠেকানোর একটি উপায় হিসেবে দেখে। তবে তাদের যুক্তি হলো যদি পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই না থাকে, আর তার জন্য পশ্চিমাই দায়ী হয়, তাহলে নতুন একটি ব্যবস্থার জন্য দর–কষাকষি করা যাক।
এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তার পশ্চিম গোলার্ধে নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করবে, আর রাশিয়া সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলগুলোতে নিজের প্রভাব বজায় রাখবে। রাশিয়ার জন্য আদর্শ পরিস্থিতি হবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ভেনেজুয়েলায় জড়িয়ে পড়ে। তবে মাদুরো দ্রুত ক্ষমতা হারালেও সেটা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। সবকিছু স্থির হওয়ার পর পরিস্থিতি হয়তো একধরনের লেনদেনের মতো দেখাবে। যেমন রাশিয়ার শর্তে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী একটি ভেনেজুয়েলা।
* লিওনিদ রাগোজিন, রিগাভিত্তিক একজন সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তারে অনূদিত
![]() |
| ভেনেজুয়েলা এখন পরাশক্তিগুলোর দর-কষাকষির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, January 27, 2026
ট্রাম্প কেন ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’র কথা বলছেন by আদিত্য চক্রবর্তী
ট্রাম্প যেসব বড় বড় পরিকল্পনার কথা বলেন, সেগুলো ভালো করে দেখলে বোঝা যায়—এগুলো কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নয়, বরং পরিস্থিতি সামলানোর ছোট ছোট চাল। আজ এক কথা, কাল আরেক কথা।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনই তার উদাহরণ। তিনি একসময় ম্যানহাটানের ডেমোক্র্যাট ছিলেন, পরে ফ্লোরিডায় গিয়ে রিপাবলিকান হয়ে যান। যে মানুষ একসময় বারাক ওবামার জন্মসনদ নিয়ে ষড়যন্ত্র ছড়িয়েছিলেন, তিনিই এখন এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশে গড়িমসি করছেন। রিয়েল এস্টেট হোক বা ট্রাম্প ইউনিভার্সিটি—যে উদ্যোগগুলোর তিনি বড়াই করেছিলেন, সেগুলোর বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতা আর কেলেঙ্কারিতে ডুবে গেছে।
এখন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করে তাঁকে কোকেন চক্রের নেতা বলে দাগিয়ে দেন, তখন একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। মাত্র এক মাস আগেই ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁর প্রধান চিন্তা ফেন্টানিল। এটিকে তিনি ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ বলেছিলেন। কারণ, এই মাদকসহ কৃত্রিম আফিম যুক্তরাষ্ট্রে মোট মাদকজনিত মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী।
ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযান ছিল নিছক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশ। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে ডেলটা ফোর্সের হেলিকপ্টারসহ দেড় শতাধিক বিমান, বোমা ও বিশেষ বাহিনী। এটাকে আইনশৃঙ্খলা অভিযান না বলে একতরফা সামরিক হামলা বলাই বেশি যুক্তিসংগত।
গত সেপ্টেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বিমান হামলায় অন্তত ১১৫ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে শুধু মাদক পাচারের সন্দেহ ছিল। দ্য আটলান্টিক জানিয়েছে, এমন একটি হামলার ভিডিও দেখে ওয়াশিংটনে এক আইনপ্রণেতা প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এসব অভিযানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি একজন কট্টর ডানপন্থী ও বাস্তব রাজনীতিকে সিনেমার মতো দেখেন।
অন্য কোনো দেশ যদি এমন কাজ করত, তবে সেই দেশটিকে দুষ্কৃতি রাষ্ট্র বলা হতো। সেই দেশটির ধনীদের বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না, এটাই আসল দ্বিচারিতা।
তারপরও অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে নাকি কোনো বড় কৌশল খুঁজে পাচ্ছেন। বলা হচ্ছে, পরের ধাপে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখল করবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য আসলে উপনিবেশ গড়া নয়; তারা চায় অন্য দেশগুলো তাদের কথা মেনে চলুক।
ভেনেজুয়েলায়ও নতুন কিছু হয়নি। সেখানে পুরোনো ক্ষমতাবান গোষ্ঠীই রয়ে গেছে, শুধু নেতৃত্বে সামান্য বদল এসেছে। এটি কোনো নতুন সাম্রাজ্যবাদ নয়, বরং দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার সস্তা ব্যবস্থা।
ট্রাম্প যে এসব সামরিক অভিযান উপভোগ করেন, তা স্পষ্ট। মার-আ-লাগোতে বসে তিনি মাদুরোর বাড়িতে হামলাকে ‘দারুণ অভিযান’ বলেছেন। নির্বাচনের সময় যদি এতে লাভ হয়, তিনি এমন আরও অভিযান চাইতেই পারেন। কিন্তু পরে সেসব দেশের ধ্বংসস্তূপ সামলানোর দায়িত্ব তিনি নিতে চান না। ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা সবাইকে সে শিক্ষা দিয়েছে।
ট্রাম্প কি ভেনেজুয়েলা বা গ্রিনল্যান্ড শাসন করবেন? বরং তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রটাকেই ঠিকভাবে শাসন করতেন, সেটাই বড় কথা হতো। দ্বিতীয় মেয়াদের অনেকটা সময় পার হলেও ‘ট্রাম্পবাদ’ বাস্তবে কেমন, তা যুক্তরাষ্ট্রেই স্পষ্ট নয়।
তার শাসন মানে সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, অপছন্দের শহরে সেনা নামানো, ফেডারেল সরকার অচল করে দেওয়া। চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তও তিনি প্রথম ছয় মাসে পাঁচবার বদলেছেন। এর ফল—তাঁর জনপ্রিয়তা এখন জো বাইডেনের থেকেও কম।
এই অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতেই ট্রাম্প ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’র কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে এ ব্যবস্থায় নতুন কিছু নেই।
যুক্তরাষ্ট্র আগেও বহুবার অন্য দেশের সরকার পরিবর্তন করেছে। চিলি, ব্রাজিল, পানামা তার উদাহরণ। হার্ভার্ডের এক গবেষণা বলছে, ১৮৯৮ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪১ বার সরকার বদলাতে হস্তক্ষেপ করেছে।
নতুনত্ব কেবল এটুকু—আগে এসব কাজকে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’র নামে ঢেকে রাখা হতো। আর ট্রাম্প এখন খোলাখুলি টাকা আর চুক্তির কথা বলছেন। তিনি কোনো মতবাদে বিশ্বাসী নন, তিনি সুযোগ দেখেন আর চুক্তি করেন। আজ এক কথা, কাল আরেক কথা—এই হলো ট্রাম্পের নীতি।
কারাকাসে হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান—দুটোই ভেঙেছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই অভিযান চালানো হয়েছে। অথচ ট্রাম্প আগে কিছু ব্যবসায়ীকে খবর দিয়েছেন, পরে রাজনীতিকদের।
ভেনেজুয়েলার তেল লুটের কথাও বাস্তবসম্মত নয়। তেলের দাম এখন এত কম যে বড় কোম্পানিগুলোর সেখানে বিনিয়োগের আগ্রহ নেই। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পরিমাণও এত বেশি, যা যুক্তরাষ্ট্রের সব বড় তেল কোম্পানি মিলেও এক বছরে খরচ করে না।
সব মিলিয়ে এটি কোনো নতুন বিশ্বব্যবস্থা নয়। এটি হলো ধনী ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি বিলিয়নিয়ার, ক্রিপ্টো ব্যবসায়ী ও ছদ্ম ব্যাংকারদের এক বিশৃঙ্খল জোট, যাদের লক্ষ্য ক্ষমতা নয়, দ্রুত লাভ।
এই চিত্র ভয়ংকর ঠিকই, কিন্তু একে প্রতিরোধ করা অসম্ভব নয়, যদি ইউরোপসহ অন্য দেশগুলো সত্যিই তা চায়।
* আদিত্য চক্রবর্তী, দ্য গার্ডিয়ান–এর কলাম লেখক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশে দেশে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ছবি: রয়টার্স |
Saturday, January 24, 2026
গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেনকে এক সুতায় বাঁধল কে by সাইমন টিসডাল
ওয়াশিংটন পোস্ট–এর হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে মোট ৩০ হাজার ৫৭৩টি ‘মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি’ করেছিলেন। অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ২১টি মিথ্যা তিনি বলেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সেই অভ্যাসে কোনো ছেদ পড়েনি। প্রতিদিনই তিনি মার্কিন জনগণ এবং বিশ্ববাসীর কাছে সত্য বিকৃত করছেন। মিনিয়াপোলিসে প্রাণঘাতী গুলির ঘটনার পর তাঁর ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়া আবারও দেখিয়ে দিয়েছে—জনজীবনে সত্য ও সততার প্রতি তাঁর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এই অবজ্ঞা শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, গভীরভাবে অনৈতিক এবং বিপজ্জনক।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মতোই বিশ্বের বহু নেতা ট্রাম্পের এই দীর্ঘস্থায়ী মিথ্যাচারের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এই মিথ্যাকে মেনে নেওয়ার, চুপ করে থাকার বা এর বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়ার মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—এই তিন জটিল আন্তর্জাতিক সংকটে ট্রাম্পের মিথ্যা ও প্রতারণা একটি সাধারণ, উত্তেজনা বাড়ানো উপাদান হিসেবে কাজ করছে।
গ্রিনল্যান্ডের কথাই ধরা যাক। ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেছেন, চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ নাকি গ্রিনল্যান্ডজুড়ে ছড়িয়ে আছে আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়া দরকার। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, কোথায় সেই জাহাজ? তিনি তো নিজেই ওই স্বশাসিত দ্বীপে গেছেন। গ্রিনল্যান্ডবাসী ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে সরাসরি আজগুবি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ডেনমার্ক স্পষ্ট করে বলেছে, তারা গ্রিনল্যান্ডে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এবং সেখানে চীনা বিনিয়োগের ‘স্রোত’ যাচ্ছে বলে ট্রাম্প যেসব কথা বলছেন, তা তাঁর বানানো গল্প। জনমত জরিপ বলছে, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ ট্রাম্পের কাছে দ্বীপ বিক্রি বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরোধী। তারা চায় স্বাধীনতা। যুক্তরাষ্ট্র রাজা তৃতীয় জর্জকে তাড়িয়ে দিয়ে স্বাধীন হয়েছিল। তারা এখন স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদ্যাপন করছে। ফলে তাদের তো বিষয়টি বোঝার কথা। ট্রাম্প বলেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডকে ‘নিরাপদ’ করতে চান। বাস্তবে তিনি চান এর খনিজ সম্পদ এবং আমেরিকাকে আবার বড় করতে।
ভেনেজুয়েলায় পরিস্থিতি আরও রক্তাক্ত। গত সপ্তাহান্তের অভ্যুত্থানের আগে মিথ্যার এক ভয়াবহ স্রোত বয়ে যায়। ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই দেশটির নেতা নিকোলা মাদুরোকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন। এই অভিযোগ তুলে ট্রাম্পের প্রশাসন মাদক পাচারের সন্দেহে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে ১০০ জনের বেশি মানুষকে নৌকায় হত্যা করে কোনো যাচাই–বাছাই ছাড়াই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধে আছে’ বলে ঘোষণা দেন এবং এর মাধ্যমে তিনি কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা অবৈধভাবে দখল করেন।
আসলে, ২০১৮ সালে মাদুরো সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতা চলছে। ট্রাম্প এখন স্বীকারও করেছেন, এই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য গণতন্ত্র ফেরানো নয়; যদিও দেরিতে হলেও তিনি বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছেন। ট্রাম্পের লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার জনগণকে ‘উদ্ধার’ করা নয়, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নয়। লক্ষ্য একটাই—তেল। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই, নির্মমভাবে দেশটি লুট করছেন। সঙ্গে সঙ্গে মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়াকেও হুমকি দিচ্ছেন।
এবার ইউক্রেন। আরেকটি অচলাবস্থার মুখে পড়া ভূমি। এখানে ট্রাম্পের সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে না পারার অক্ষমতা ভয়াবহ ক্ষতি করছে। তিনি মিছেমিছি বলেছিলেন, ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করে দেবেন। ব্যর্থ হয়ে তিনি বারবার ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার হুমকি দেন। আর পুতিন (আরেকজন পেশাদার মিথ্যাবাদী) ট্রাম্পকে সামান্য তোষামোদ করে আবার বোমাবর্ষণ শুরু করেন। প্রতিবারই ট্রাম্প পিছু হটেন, আর প্রায়ই দোষ চাপান ইউক্রেনের নির্দোষ নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর।
গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—এই তিন সংকটে ট্রাম্পের মিথ্যাচার ছাড়াও আরেকটি বিষয় স্পষ্ট। সেটি হলো ইউরোপীয় নেতাদের ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুর্বলতা ও বিভক্তি। এখন অন্তত ইউরোপের বোঝা উচিত—এই প্রেসিডেন্টকে বিশ্বাস করা যায় না, তাঁর ওপর নির্ভর করা যায় না। এই প্রেক্ষাপটে ব্রেক্সিট আর শুধু ভুল সিদ্ধান্ত মনে হয় না; এটি প্রায় আত্মঘাতী বলে মনে হয়।
মার্ক টোয়েনের কথাকে একটু বদলে বললে বলা যায়, ‘মিথ্যা তিন প্রকার—মিথ্যা, মারাত্মক মিথ্যা আর ডোনাল্ড ট্রাম্প।’
● সাইমন টিসডাল, দ্য গার্ডিয়ান-এর পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। ফাইল ছবি: এএফপি |
মাচাদোকে পরিকল্পনা করেই নির্বাসনে পাঠিয়েছেন ট্রাম্প! by পিওতর এইচ কোসিকি
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার ভেতরে এবং প্রবাসী ভেনেজুয়েলানদের মধ্যে আনন্দের জায়গায় নেয় আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি। গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে মাচাদোর বৈঠকও সেই ধোঁয়াশা কাটাতে পারেনি। এখন প্রশ্ন একটাই—ভেনেজুয়েলার মানুষের বহুদিনের স্বাধীনতার স্বপ্নের কী হবে? যে গণতান্ত্রিক অধিকার ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রকৃত বিজয়ী এদমুন্দো গোনসালেসের কাছ থেকে মাদুরো কেড়ে নিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কি তা ফিরিয়ে দেবে?
মাচাদো এ মাসের শুরুতে আমেরিকানদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আমাদের একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আছেন। জনগণ যে দায়িত্ব আমাদের দিয়েছে, তা পালনে আমরা প্রস্তুত।’ কয়েক দিনের মধ্যেই ভ্যাটিকানও তার সমর্থনের বার্তা দেয়। পোপ লিও চতুর্দশের সঙ্গে মাচাদোর একটি পূর্বঘোষণাহীন ব্যক্তিগত সাক্ষাতের ছবি তখন প্রকাশ করা হয়।
কিন্তু কারাকাসে মার্কিন হস্তক্ষেপের প্রায় দুই সপ্তাহ পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রকে পাশে সরিয়ে রেখে ‘শাসন-ধারাবাহিকতা’ বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গোনসালেসকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল ভেনেজুয়েলার মানুষ। তবু ট্রাম্প সেই গণরায় উপেক্ষা করতেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমনকি মাচাদোর নোবেল শান্তি পুরস্কারও ট্রাম্পকে তাঁর বৈধতা মানতে রাজি করাতে পারেনি। বরং সেটিকে তিনি ব্যক্তিগত অপমান হিসেবেই দেখেছেন বলে মনে হয়।
ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, ‘তিনি (মাচাদো) যদি পুরস্কারটি ফিরিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে আমি এটি নিতে পারি না’, তাহলে আজ তিনিই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হতেন।’ এই মন্তব্য ঘিরে জল্পনা তৈরি হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবেই মাচাদোকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করেছে, যাতে মাদুরোকে অপসারণের পথে তিনি কোনো জটিলতা তৈরি করতে না পারেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই তিনি দেশ ছাড়তে অনিচ্ছুক ছিলেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সিআইএর মূল্যায়ন অনুযায়ী চাভেজপন্থী নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার বিরোধীরা টিকে থাকতে পারবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও–ও একই সুরে বলেছেন—মাচাদো ‘অসাধারণ’ হলেও বাস্তবতা হলো, ‘বিরোধীদের বড় অংশ এখন আর ভেনেজুয়েলার ভেতরে নেই।’ তাঁর ভাষায়, এখন প্রশাসনের দৃষ্টি ‘স্বল্পমেয়াদি জরুরি বিষয়’-এর দিকে।
রুবিওর তিন ধাপের পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলো ‘স্থিতিশীলতা’, যার মেয়াদ কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস। এই সময়ে দেশটি শাসন করবেন মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস। কিন্তু গণতান্ত্রিক উত্তরণের কোনো অঙ্গীকার তিনি করেননি। উপরন্তু মাদুরোর গোপন পুলিশপ্রধান দিয়োসদাদো কাবেয়ো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেসের ক্ষমতার ছায়ায় তাঁর নিজেরই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ট্রাম্পের ‘পুতুল’ হিসেবে তাঁর অবস্থানও স্বভাবতই ভঙ্গুর।
এই পরিস্থিতিকে কারাকাস ক্রনিকলস যথার্থই ‘স্থবির উত্তরণ’ বলে অভিহিত করেছে। মাচাদো যদিও বলেছেন, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ‘খুব ভালো’ হয়েছে, তবু বাস্তব চিত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।
ট্রাম্পকে তুষ্ট করতে গিয়ে ১৫ জানুয়ারির সেই বৈঠকে তিনি তাঁকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারও উপহার দেন। ট্রাম্প খুব আগ্রহভরে তা গ্রহণও করেন। তবে যদিও নোবেল কমিটি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়—এই পুরস্কার হস্তান্তরযোগ্য নয়। কিন্তু তোষামোদ দিয়ে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। ট্রাম্প মাচাদোকে সমর্থন করেন না, কারণ তিনি ভেনেজুয়েলার জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী; ট্রাম্পের তেলকেন্দ্রিক পরিকল্পনায় নয়।
ভেনেজুয়েলার বিরোধীদের এখন আর ট্রাম্পের অহংকারী মাথায় হাত বুলিয়ে চলার সুযোগ নেই। গত দুই বছরে দেশ-বিদেশের ভেনেজুয়েলানদের সংগঠিত করেই মাচাদো নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। রাজনৈতিক উত্তরণে নিজেদের কণ্ঠস্বর টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁকে সেই পথেই আবার ফিরতে হবে। এক বিশ্লেষকের ভাষায়, সারা দেশে প্রতিবাদ সংগঠিত করার ক্ষমতাই মাচাদোর হাতে থাকা ‘একমাত্র অস্ত্র’।
মাচাদো একজন ধর্মভীরু রোমান ক্যাথলিক। তিনি জানেন, ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক নাগরিক সমাজ গড়ে উঠেছে মূলত খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রের নৈতিকতা ও সংগঠনী শক্তির ওপর। মাচাদো ও ট্রাম্পের মূল্যবোধ (নৈতিক হোক বা রাজনৈতিক) কখনোই এক পথে আসবে না। তাই ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রীকে ফিরতে হবে সেই কৌশলে, যেটি তাঁকে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছিল। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর সামনে এখন শেষ সুযোগ—নিজেদের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠনে অর্থবহ ভূমিকা নিশ্চিত করা।
* পিওতর এইচ কোসিকি, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড-এর ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
| যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক উপহার দেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ছবি: রয়টার্স |
Sunday, January 18, 2026
মাদুরোকে তুলে নেওয়ার কয়েক মাস আগে থেকেই মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যোগাযোগ ছিল
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মার্কিন কর্মকর্তারা ৬২ বছর বয়সী কাবেলোকে সতর্ক করেছিলেন, তিনি যেন তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা নিরাপত্তা বাহিনী বা সশস্ত্র সমর্থকদের দিয়ে বিরোধীদের ওপর কোনো হামলা না করেন। ৩ জানুয়ারির অভিযানের পরও ভেনেজুয়েলার গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং সশস্ত্র বাহিনী মূলত কাবেলোর নিয়ন্ত্রণেই আছে।
মার্কিন প্রশাসন নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিতে মাদক পাচারের যে অভিযোগ ব্যবহার করেছিল, সেই একই অভিযোগে কাবেলো নিজেও অভিযুক্ত। তবে অভিযানের সময় তাঁকে ধরা বা তুলে নেওয়া হয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন, কাবেলো যদি তাঁর বাহিনী নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে স্থিতিশীলতা চাইছেন, তা নষ্ট হতে পারে। এ ছাড়া বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের ক্ষমতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
কাবেলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আইনি মামলা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলছেন।
ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার ভরকেন্দ্র কাবেলো
কাবেলো দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং মাদুরোর অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ও কাবেলো দীর্ঘদিন সরকারের কেন্দ্রে থাকলেও তাঁরা একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নন।
কাবেলো সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। ফলে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা এবং ‘কালেকতিভো’–এর (মোটরসাইকেল আরোহী সশস্ত্র বেসামরিক বাহিনী) ওপর তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। অতীতে বিক্ষোভকারীদের ওপর এসব বাহিনীর হামলা চালানোর ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র আপাতত তেলের খনিসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাবেলোর ওপর কিছুটা নির্ভর করছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মনে ভয় আছে, কাবেলো যেকোনো সময় ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিতে পারেন।
মাদক পাচারের অভিযোগ
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোকে ধরিয়ে দিলে এক কোটি ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। বর্তমানে সেই পুরস্কার বাড়িয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, কাবেলো একটি আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের (কার্টেল অব দ্য সানস) প্রধান নেতা। তবে কাবেলো সব সময়ই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর অনেক মার্কিন রাজনীতিবিদ প্রশ্ন তুলেছেন, মাদুরোকে তুলে নেওয়া হলেও কেন কাবেলোকে ধরা হলো না? রিপাবলিকান প্রতিনিধি মারিয়া এলভিরা সালাজার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘দিওসদাদো কাবেলো সম্ভবত মাদুরো বা দেলসি রদ্রিগেজের চেয়েও বেশি ভয়ংকর।’
বর্তমান পরিস্থিতি
মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার প্রথম কয়েক দিন কাবেলো মার্কিন হস্তক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। তবে গত কয়েক দিনে ভেনেজুয়েলায় তল্লাশি বা ধরপাকড়ের খবর আগের চেয়ে কমেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বর্তমান ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাবেলো এ বিষয়টি দেখাশোনা করছেন। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, মুক্তির এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির এবং এখনো শত শত মানুষ অন্যায়ভাবে বন্দী রয়েছেন।
![]() |
| ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো। ছবি: রয়টার্স |
Thursday, January 15, 2026
বিশ্বের কোথায় সবচেয়ে বেশি ভেনেজুয়েলান অভিবাসন?
আল জাজিরার এক ভিজ্যুয়াল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ভেনেজুয়েলানের সংখ্যা কমপক্ষে ৭৯ লাখ। প্রায় এক দশক ধরে চলা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই এই বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে।
কোন কোন দেশে সবচেয়ে বেশি ভেনেজুয়েলার নাগরিক?
ভেনেজুয়েলা থেকে অভিবাসনের সূচনা হয় ১৯৯৯ সালে বামপন্থী নেতা হুগো শাভেজ ক্ষমতায় আসার পর। সে সময় মূলত পেশাজীবীদের একটি ছোট অংশ দেশ ছাড়ে। শাভেজ দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তেলখাতের আয় ব্যবহার করে সরকারি ব্যয় বাড়ান এবং কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে তুলে আনেন।
২০১৩ সালে শাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় এসে উচ্চ ঋণ ও বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির ভার বহন করেন। ২০১৪ সালে তেলের দাম ধসে পড়লে অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়ে। গভীর মন্দা ও লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাপন দুর্বিষহ করে তোলে। এর ফলেই লক্ষাধিক মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, যাদের বড় অংশ দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানায়, জুন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ লাখ ভেনেজুয়েলান শরণার্থী ও অভিবাসী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৬৭ লাখ বা ৮৫ শতাংশ লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবস্থান করছে। সবচেয়ে বেশি ভেনেজুয়েলান আশ্রয় নিয়েছে কলম্বিয়ায়- যার সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ।
কী ধরনের সুরক্ষা পাচ্ছেন ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা?
মানবিক সংকটের কারণে ইউএনএইচসিআর ভেনেজুয়েলানদের একটি বিশেষ বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর ফলে তারা স্বাগতিক দেশগুলোতে আইনি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয়সহ মৌলিক সুবিধা পেতে পারেন।
কলম্বিয়ায় ‘টেম্পোরারি প্রোটেকশন স্ট্যাটিউট’-এর আওতায় ভেনেজুয়েলানদের ১০ বছরের আবাসিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালের শেষ দিকে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলানদের জন্য দেয়া টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) প্রত্যাহার করে নেয়। এতে ছয় লাখের বেশি ভেনেজুয়েলানের বসবাস ও কাজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একই সময়ে শত শত ভেনেজুয়েলানকে বহিষ্কার করা হয়, যাদের কয়েকজনকে এল সালভাদরের কুখ্যাত কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সেখানে অনেকেই নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, দেশত্যাগী ভেনেজুয়েলানদের প্রায় অর্ধেক অনানুষ্ঠানিক ও কম মজুরির কাজে নিয়োজিত। ৪২ শতাংশ পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং ২৩ শতাংশ গাদাগাদি করে বসবাস করছেন।
ভেনেজুয়েলার পাসপোর্ট কতটা শক্তিশালী?
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার পাসপোর্ট এখনও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। ২০২৬ সালের পাসপোর্ট সূচকে এটি ৪২তম অবস্থানে রয়েছে। এই পাসপোর্টধারীরা ১২৪টি দেশে ভিসামুক্ত, ভিসা-অন-অ্যারাইভাল বা ই-ভিসার সুবিধা পান।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে শেনজেন অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ভিসা অব্যাহতি চুক্তি রয়েছে। যার ফলে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে ৯০ দিন পর্যন্ত ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করা যায়। পাশাপাশি আঞ্চলিক চলাচল চুক্তির কারণে দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশে ভেনেজুয়েলানরা প্রবেশ ও কাজ করার সুযোগ পান।
(আল জাজিরা থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত)

চীনকে লাতিন আমেরিকা থেকে দূরে থাকতে বলল যুক্তরাষ্ট্র
দুই দশক ধরে লাতিন আমেরিকায় ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে চীন। অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়ায় কৌশলগত অবস্থান তৈরি করাও ছিল বেইজিংয়ের বড় লক্ষ্য। ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ, আর্জেন্টিনায় স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং স্টেশন, পেরুতে বন্দর—সব মিলিয়ে অঞ্চলটিতে চীনের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিরক্তি
লাতিন আমেরিকায় চীনের অগ্রগতি শুধু বর্তমান নয়, অতীতের একাধিক মার্কিন প্রশাসনের জন্যও বিরক্তির কারণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পেছনে চীনের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে কাজ করেছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, ঋণ ও জ্বালানি তেলের বিনিময়ে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে চীনের গড়ে ওঠা সম্পর্কের ‘ইতি টানতে’ এই বার্তা দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞায় থাকা ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণ তেল এত দিন পর্যন্ত মূলত চীনে যাচ্ছিল। এখন তা যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হবে।
‘আমরা আপনাদের এখানে চাই না’
গত শুক্রবার তেল খাতের নির্বাহীদের সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে চীন ও রাশিয়ার উপস্থিতি নিয়ে অস্বস্তির কথা প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘আমরা চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়। কিন্তু এ অঞ্চলে “প্রতিবেশী” হিসেবে তাদের চাই না।’
ট্রাম্প বলেন, ‘চীন চাইলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কিনতে পারে, কিন্তু লাতিন আমেরিকায় কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ আর থাকবে না।’
অভিযানের প্রতীকী তাৎপর্য
৩ জানুয়ারি ভোররাতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। অভিযানের শুরুর দিকে লাতিন আমেরিকার দেশটির প্রায় সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া হয়। এসবের অধিকাংশ চীন ও রাশিয়া থেকে কেনা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের মধ্য দিয়ে চীনের সামরিক প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাব—দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের বিশ্লেষক ক্রেইগ সিংলেটন বলেন, ‘চীনের বড় শক্তিতে পরিণত হওয়ার ধারণা এবং বাস্তবতার মধ্যকার ফাঁক—এই অভিযানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়ে পড়েছে।
কূটনৈতিক প্রতিবাদ, কিন্তু সীমাবদ্ধতা
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ‘একতরফা ও বেআইনি’ বলে নিন্দা জানিয়েছে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনের দূতাবাস। দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ বলেন, ‘লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, অঞ্চলটির দেশগুলো এখন বুঝতে শুরু করেছে—চীন কূটনৈতিক আশ্বাস দিতে পারে, কিন্তু প্রয়োজনে তাদের রক্ষা করতে পারে না। সেই সক্ষমতা চীনের নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ভেনেজুয়েলার ঘটনায় চীনের সীমিত প্রতিক্রিয়া অঞ্চলটির অন্য দেশগুলোকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি চাপের মুখে পড়লে বেইজিং কতটা পাশে দাঁড়াতে পারবে, সে প্রশ্ন নিয়ে এখন অঞ্চলজুড়ে আলোচনা হচ্ছে।
বৃহত্তর কৌশলের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলা অভিযান শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং এটি ‘পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের সীমানা’ নতুন করে নির্ধারণের প্রচেষ্টা। তবে একই সঙ্গে এ আশঙ্কাও রয়েছে—অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতায় জড়িয়ে যায়, তাহলে সেখানে চীন আবারও সুযোগ নিতে পারে।
কূটনীতিক ও গবেষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এ কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘প্রভাব বলয়’ভিত্তিক চিন্তাকে আরও জোরালো করতে পারে। এতে ওয়াশিংটন যেমন লাতিন আমেরিকায় কর্তৃত্ব ধরে রাখতে চাইবে, তেমনি বেইজিংও এশিয়ায় নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করার যুক্তি খুঁজতে চেষ্টা করবে।
![]() |
| আটক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের একটি ফেডারেল আদালতে প্রথমবারের তোলা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স |
Wednesday, January 14, 2026
চীন কেন ইরান, ভেনেজুয়েলার পাশে নেই by আলতাফ পারভেজ
ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলব’ (পরম সমাধানের খোঁজে অভিযান) এর পর মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ্য ইরান। এই উভয় দেশ থেকে চীন প্রচুর জ্বালানি তেল কেনে। ভেনেজুয়েলা ও ইরানে সম্ভাব্য পুতুল সরকার বসিয়ে ট্রাম্প চীনকেও জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সংকটে ফেলতে চাইছেন। বহুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য চীনকে অর্থনৈতিকভাবে কাবু করা। এবার সেটা নতুন চেহারা নিচ্ছে—তার অর্থনৈতিক সহযোগীদের কাবু করে। ‘বন্ধু’রাষ্ট্রগুলোর বিপদের মুখে গণচীন এখন কী করবে? সি চিন পিং কি পারবেন ট্রাম্পকে থামাতে? কীভাবে সেটা? আদৌ কি চীন এ রকম ভূমিকা রাখতে ইচ্ছুক?
বেছে বেছে চীনের মিত্রদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন
ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের আগ্রাসন যে মূলত দেশটির তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণের জন্য, সেটা এখন প্রায় সবাই বলছেন। ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা ও ভোক্তা চীন। ২০২৪–এর ডিসেম্বর নাগাদ চীনের দৈনিক জ্বালানি তেলের ক্ষুধা ছিল প্রায় ১৬ মিলিয়ন ব্যারেল। বিশ্ব তেলের বাজারে চাহিদার উত্থান মূলত চীনের মাধ্যমে। ২০১৩ থেকে ২০২৩–এ বিশ্ব তেল বাজারের চাহিদা বৃদ্ধির ৬০ শতাংশ কারণ ছিল চীন।
কিন্তু দেশটি জ্বালানির বিকল্প উপায় খুঁজে পেতে শুরু করায় অপরিশোধিত তেলের চাহিদা কমছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়াতেও খনিজ তেল নির্ভরতা কমাচ্ছিল চীন। পণ্য তৈরির বদলে সেবা খাতের প্রসার ঘটায়ও জ্বালানি চাহিদায় রকমফের ঘটছে তাদের।
তবে এখনো চীন খনিজ তেলের প্রধান বিশ্বভোক্তা। নিজস্ব চাহিদার ৫০-৬০ শতাংশ খনিজ তেল তারা আমদানি করে। বাকিটা উত্তোলন করে। তেল মজুতে তারা বিশ্বে ১৪তম হয়েও ভোক্তা হিসেবে দ্বিতীয়। ফলে এই খাতে এখনো তারা বড় আমদানিকারক। ভেনেজুয়েলা থেকে চাহিদার কিছু পরিমাণ খনিজ তেল কিনত চীন।
বেইজিংয়ের জন্য ভেনেজুয়েলা তেলের বড় উৎস না হলেও দরকারি উৎস। কিন্তু ভেনেজুয়েলার দিক থেকে চীন তেলের বড় ক্রেতা। চীন তাদের বড় এক আর্থিক ভরসাও ছিল। তেলের আগাম দাম হিসেবে চীন প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে চীনের জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাতের পাশাপাশি ওই ঋণও আটকে গেল।
যদিও বিশ্বে খনিজ তেলের বড় এক ভান্ডার ভেনেজুয়েলা, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধে তারা বেশি তেল উত্তোলন ও বিক্রি করতে পারত না। যে কারণে তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশা চলছিল। চীন ঋণের বিনিময়ে তাদের তেল নিয়েছে। ভেনেজুয়েলায় চীনের ১৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগও রয়েছে। সেটাও এখন ঝুঁকিতে। ভেনেজুয়েলা থেকে আনা অপরিশোধিত তেলের বিশেষ খনিজ ধরনের কারণে চীনে অনেক বিশেষায়িত রিফাইনারি গড়ে উঠেছিল। সেগুলোও এখন কারিগরি ও আর্থিক সংকটে পড়ল।
ভেনেজুয়েলার মতো রাশিয়া ও ইরান থেকেও তেল নেয় চীন। ওই দুই দেশের বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ চলছে। ভেনেজুয়েলার মতো ইরান যেসব দেশে তেল বেশি পরিমাণে রপ্তানি করে, সেই তালিকার প্রথমে আছে চীন। ভেনেজুয়েলা ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতার বড় এক কারণ চীনও। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমস্যা তৈরিও এসব দেশের বিরুদ্ধে অবরোধ ও যাবতীয় আগ্রাসনের একটা লক্ষ্য। তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি বন্ধুদেশগুলোকে দেওয়া ঋণ আটকে দেওয়া এবং বিশ্বের নানা দিকে চীনের বাণিজ্য ভিত্তিকে নতুন করে মুশকিলে ফেলতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।
দক্ষিণ আমেরিকা থেকে পিছু হটতে হবে চীনকে?
বিগত দশকগুলোতে বিশ্বজুড়ে চীনের প্রভাব বাড়ানোর দুটি হাতিয়ার ছিল পণ্যবাণিজ্য ও ঋণবাণিজ্য। গত দুই দশকে চীন দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে উঠেছিল। এখানকার অধিকাংশ দেশে তার বিপুল বিনিয়োগ আছে। গত বছরই দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সম্মেলন হলো চীনের রাজধানীতে। সেখানে সি চিন পিং নতুন করে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোর সূত্রে ব্রাজিল, কিউবা, প্যারাগুয়ে, পেরু ও ভেনেজুয়েলায় চীনা নাগরিকের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। এই অঞ্চলে ২০০৫ সালে চীন থেকে যে পরিমাণ পণ্যবোঝাই কার্গো গিয়েছিল, ২০২৪ সালে সেটা পাঁচ গুণ বেড়েছে। একই সময় আমদানি বেড়েছে ছয় গুণ।
২০২৪–এ বেইজিং চিলি, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর, নিকারাগুয়া ও পেরুর সঙ্গে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করেছে। এই অঞ্চলের অন্তত ২০টি দেশ চীনের ‘সিল্করুট উদ্যোগে’ যুক্ত। ২০০৫ থেকে এই দেশগুলোতে চীনের বিভিন্ন ব্যাংক ঋণ দিয়েছে অন্তত ১২০ বিলিয়ন ডলার। এসব দেখেই যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি আমূল বদলে ফেলেছে বলা যায়।
অতীতে নানা অজুহাতে দক্ষিণ আমেরিকাসহ সমগ্র বিশ্বে ওয়াশিংটন গোপন বা আধা গোপন প্রক্রিয়ায় স্বাধীনভাবে চলতে ইচ্ছুক সরকারগুলোকে উৎখাত করেছে। ভেনেজুয়েলা ও ইরান মডেল স্পষ্ট দেখাচ্ছে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় চীনের ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর সরকারকে খোলামেলা আগ্রাসনের মাধ্যমে সরাতে চাইছে এখন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা ইতিমধ্যে জানাচ্ছে, পশ্চিম গোলার্ধে তারা চীনের কোনো উপস্থিতি দেখতে চায় না। অর্থাৎ পুরো অঞ্চল তাদের কাছে আত্মসমর্পিত থাকতে হবে। ২০২৫ সালে ঘোষিত তাদের ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র’ও সেই আলোকে তৈরি। অন্যদিকে ইসরায়েলকে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যকেও তারা একইভাবে দেখতে চায়। এসব অঞ্চলের যেসব দেশের সরকারকে ‘আমেরিকার স্বার্থের বিরোধী’ মনে হবে, সেখানেই তারা সিআইএ ও ডেল্টা ফোর্সের মতো সংস্থাগুলোকে পাঠিয়ে দেবে মনে হচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা একে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো ‘মনরো মতবাদ’–এর একালের নবায়িত রূপ। প্রায় দুই শতাব্দী আগের প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো দক্ষিণ আমেরিকাকে উপনিবেশতুল্য গণ্য করার এ রকম লক্ষ্যের কথা বলতেন। ট্রাম্পের হাত ধরে দেশটির সেই নয়া উপনিবেশবাদী বাসনা এবার পুরোদস্তুর নতুন এক বিশ্বব্যাবস্থার চেহারা নিচ্ছে।
সে রকম লক্ষ্যের অংশ হিসেবেই ভেনেজুয়েলার পর ইরানকে টার্গেট করা হলো। রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব এবং কর্তৃত্ববাদী সরকারের কারণে ইরানের শহরাঞ্চলে অনেক দিন ধরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে এবং ইসরায়েলের গত বছরের হামলায় ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। স্থানীয় মুদ্রার মান অনেক পড়ে গেছে। এসব নিয়ে সেখানে জন–অসন্তোষ তীব্র। রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ চলছে এ সপ্তাহে।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেখানে ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত শাহ’র বংশধরদের প্রবাস থেকে এনে ক্ষমতায় বসাতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের উৎসাহে দেশটিতে এরই মধ্যে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার মতোই ইরানের তেল সম্পদের দখল নিতে ইচ্ছুক। এর মানে দাঁড়াবে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তেল মজুত আছে এমন তিনটি দেশের দুটিকে নিয়ন্ত্রণে পাওয়া। অপর দেশ সৌদি আরবে ওয়াশিংটনের বহুকালের পুরোনো মিত্ররা শাসক হিসেবে রয়েছে। এখন ইরান অধ্যায়ে সফল হলে তেলের বাজার, দাম ও বিপণনকে যুক্তরাষ্ট্র সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
চীন এখন কী করবে
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, চীন এখন কী করবে? বিশ্ব দেখছে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের গত জুনের হামলায় (অপারেশন মিডনাইট হ্যামার) চীন শক্তভাবে তেহরানের পাশে ছিল না। সিরিয়া-লিবিয়া-ভেনেজুয়েলায় মার্কিনদের গোপন ও প্রকাশ্য কোনো হস্তক্ষেপে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বেইজিং কার্যকর প্রতিরোধ গড়েনি বা গড়তে পারেনি বা চায়ওনি। রাশিয়ার ভূমিকাও তদ্রূপ। তাহলে ট্রাম্পের চলমান আগ্রাসী সামরিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলো কি চলতেই থাকবে? আগামী অনিরাপদ বিশ্বে ছোট দেশগুলোর তাহলে সুরক্ষা কী?
আপাতত যা দেখা যাচ্ছে, চীন কোনো ধরনের যুদ্ধে জড়ানো এড়িয়ে পুরো মনোযোগ দিতে চাইছে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের দিকে। তারা মনে করছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দিনের বিশ্বকে অচিন্তনীয় মাত্রায় পাল্টে দেবে। এতদিনকার গড়া সামরিক ও আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী যেভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থায় রয়েছে, চীন মুখ্যত শান্তিপূর্ণ পথে প্রযুক্তিজ্ঞানের মাধ্যমে তার অবসান ঘটাতে চায়। তারা মনে করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের সামরিকভাবে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করে তুলবে শিগগির।
গত বছর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে চীনের এই অনুমানের সমর্থনে বাস্তব কিছু প্রমাণ মেলে। এই যুদ্ধে ফ্রান্স থেকে সংগৃহীত ভারতীয় যুদ্ধবিমানের বিপরীতে চীন থেকে পাওয়া পাকিস্তানের স্যাটেলাইট জ্যামিং প্রযুক্তির সফল ব্যবহার পাশ্চাত্যকে চমকে দিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলায় জল-স্থল-আকাশ মিলিয়ে সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে মাদুরোকে অপহরণ করতে পারল, সেটা এখনো তার সামরিক ও গোয়েন্দা সামর্থ্যের বড় সাক্ষ্য। এভাবেই ডেল্টা ফোর্স ইরানের জেনারেল সোলাইমানি এবং আল-কায়েদার প্রধান লাদেনকে হত্যা করেছিল।
ওয়াশিংটনের সামরিক ও গোয়েন্দা যোগ্যতা একই সঙ্গে বিশ্বের অনেক স্থানে অনেক শক্তির বিরুদ্ধে আগ্রাসী ভূমিকায় সক্রিয় থাকতে সক্ষম। তবে এসব অভিযান যতটা একটা দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে, ততটা বৈশ্বিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করে না এবং চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান থামাতেও তা সরাসরি কোনো ভূমিকা রাখছে না। গত বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ট্রাম্পের বহুল আলোচিত শুল্কযুদ্ধও চীনকে বেশি কাবু করতে পারেনি।
ঠিক এসব কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা এখন আরও খোলামেলাভাবে চীনের কৌশলগত জায়গাগুলো ক্ষতবিক্ষত করার নীতি নিয়েছে। কিন্তু চীনের বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র বিগত বছরগুলোতে যত দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেখানকার সংঘাত থেকে তার পক্ষে সফলতার ইমেজ নিয়ে চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। প্রতিটি সংঘাতে তাকে প্রতিনিয়ত নিজস্ব ‘এজেন্ট’দের সহায়তা দিয়ে যেতে হচ্ছে। এখন হয়তো ওই সব দেশের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সে রকম ‘সহায়তা’র খরচ তুলবে তারা।
যুদ্ধ বা আগ্রাসন শুরু করা সহজ হলেও তা থেকে বেরিয়ে আসা যে দুরূহ হয়ে পড়তে পারে, তার নজির হিসেবে রাশিয়ার চার বছর পুরোনো ইউক্রেন অভিযানের কথাও বলা যায়। চীন হয়তো এসব অভিজ্ঞতার সারসংকলন হিসেবে সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে চরম রক্ষণশীল। কিন্তু চীনের নীতি স্বাধীনভাবে চলতে ইচ্ছুক ছোট দেশগুলোকে মার্কিন আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে সমর্থ কি না, বা কোনো ব্যবহারিক ভরসা তৈরি করছে কি না?
সিরিয়া, ইরান, ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতায় এই প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক। চীন বা এখনকার রাশিয়া এমন কোনো আদর্শিক অঙ্গীকারে নেই যে ‘বন্ধু’রাষ্ট্রগুলোকে আগ্রাসনের মুখে পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তা দেবে। কড়া ভাষার ‘নিন্দা’ এবং বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের প্রকাশ্য অবস্থান। চীন বিশেষভাবে তার পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রের বাজার না হারানোর বিষয়েও সদা সতর্ক। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাজার সম্প্রসারণ এবং সম্পদ সংগ্রহের দ্বন্দ্ব যতটা বড় দেখায়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আদর্শে ফারাক তত ব্যাপক নয়। মাদুরোর অপহরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে বেইজিং নিশ্চিতভাবে আগামী এপ্রিলে ট্রাম্পের চীন সফর বন্ধ করতে চাইছে না।
ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলব’ নিশ্চিতভাবে অনেক দিনের গোপন পরিকল্পনার ফসল। কিন্তু প্রতিপক্ষের এসব পরিকল্পনার বিষয়ে চীন ওয়াকিবহাল ছিল কি না বা থাকলেও ভেনেজুয়েলাকে আগ্রাসন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছিল কি না বা ভবিষ্যতে তাদের দিক থেকে ‘বন্ধু’দেশগুলো সে রকম কোনো সহযোগিতা পাবে কি না, সেসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ এমনও বলছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটাবে এই মনস্তত্ত্বও ওয়াশিংটনেরই তৈরি। এর মাধ্যমে তারা স্বদেশে নিজেদের আগ্রাসী নীতির একটা বৈধতা তৈরি করতে চায়।
এ রকম পরিস্থিতিতে, বিশ্ব যখন নব্য এক বর্বর ভবিষ্যতে প্রবেশ করছে, তখন ক্ষুদ্র দেশগুলোর মানুষদের সামনে সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে করণীয় কী? দেশে দেশে এ রকম দেশগুলোর নাগরিকদের নতুন এক গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী এবং অপর দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিভিত্তিক বৈশ্বিক জোটবদ্ধতা ছাড়া ট্রাম্পের মতো আগ্রাসী শক্তিকে রুখে দেওয়া কঠিন। কিন্তু আপাতত সে রকম সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিশ্বসংহতি নেই। এটা সেই অবস্থা, যা ধ্বনিত হয়েছিল ফ্যাসিবাদী মুসোলিনির কারাগারে গ্রামসির কথায়: ‘পুরোনোর মৃত্যু ঘটছে, কিন্তু নতুনের জন্ম হতে পারছে না, সময়টা দানবের।’
সর্বত্র আজ ‘দানব’ নিজে অভিযোগকারী, বিচারক এবং পুলিশ। এটা প্রকৃতই এক অনিশ্চিত যুগসন্ধিক্ষণ। গ্রিক ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ইন্টাররেগনাম’। ৩৫ বছর আগে বিশ্ব থেকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাড়াতে আমেরিকার প্রচার আন্দোলনে কে কোথায় কীভাবে জ্বালানি জুগিয়েছিল তার কার্যকারণ-উৎসাহদাতাদের নিয়ে তত্ত্বতালাশেরও সময় এটা।
* আলতাফ পারভেজ, ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Tuesday, January 13, 2026
ভেনেজুয়েলা থেকে আর তেল ও অর্থ পাবে না কিউবা, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
তবে ট্রাম্পের এই হুমকির মুখে নতি স্বীকার না করে কঠোর জবাব দিয়েছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল।
গতকাল রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প কিউবাকে কড়া বার্তা দেন। তিনি লেখেন, ‘কিউবায় আর কোনো তেল বা টাকা যাবে না—একদমই না। অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আমি তাদের একটি চুক্তিতে আসার পরামর্শ দিচ্ছি।’
ট্রাম্প আরও বলেন, কিউবা বহু বছর ধরে ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণ তেল ও অর্থের ওপর নির্ভর করে টিকে ছিল। এর বিনিময়ে দেশটি ভেনেজুয়েলার ‘স্বৈরশাসকদের’ নিরাপত্তা দিয়ে আসছিল। তবে চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন বাহিনীর হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো আটক হওয়ার পর থেকে দেশটিতে কিউবার তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল এক্সে (সাবেক টুইটার) বলেন, ‘কিউবা একটি মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমরা কী করব না করব, তা কেউ বলে দিতে পারে না। ৬৬ বছর ধরে কিউবা মার্কিন আক্রমণের শিকার হয়েছে। কিউবা কাউকে হুমকি দেয় না, তবে মাতৃভূমি রক্ষায় শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়তে প্রস্তুত।’
একই সুরে কথা বলেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজও। তিনি বলেন, বিশ্বের যেকোনো দেশের কাছ থেকে জ্বালানি আমদানির অধিকার কিউবার আছে এবং কোনো সামরিক চাপের কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না।
ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আসা বন্ধ হওয়ায় কিউবায় বর্তমানে ভয়াবহ জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানী হাভানাসহ পুরো দেশ দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকছে। খাবার, ওষুধ ও জ্বালানির তীব্র সংকটে অতিষ্ঠ হয়ে গত কয়েক বছরে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন।
হাভানার বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী মারিয়া এলেনা সাবিনা আক্ষেপ করে বলেন, এখানে বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, কিছুই নেই। জীবন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এখন দ্রুত একটা পরিবর্তন দরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর কিউবাকে কোণঠাসা করাই ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভেনেজুয়েলার সমর্থন হারানোয় কিউবা এখন পতনের দ্বারপ্রান্তে।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বলছে, কিউবার অর্থনীতি চরম চাপের মধ্যে থাকলেও দেশটির সরকার এখনই ভেঙে পড়বে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমানে মেক্সিকো কিউবাকে সামান্য তেল সরবরাহ করলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য। ফলে ট্রাম্পের এই নতুন অর্থনৈতিক অবরোধ কিউবাকে এক নজিরবিহীন মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
![]() |
| মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল ও অর্থপ্রবাহ বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। গত রোববার কিউবার রাজধানী হাভানার একটি দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স |
Saturday, January 10, 2026
নতুন বিশ্বব্যবস্থা: রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোপন প্রস্তাব’ কি সত্য হতে চলেছে by ওয়েন জোন্স
কথাটা শুনতে হয়তো উল্টো মনে হতে পারে। কারণ, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তো তার ক্ষমতাই দেখিয়েছে, দুর্বলতা দেখায়নি। তারা একটি দেশের নেতাকে অপহরণ করেছে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ভেনেজুয়েলা ‘চালাবেন’।
এই দৃশ্য কি নিজ শক্তিতে মাতাল পরাশক্তির ক্ষমতার নেশার আড়ালে থাকা অবক্ষয়কেই প্রকাশ করে না?
ট্রাম্পের বড় গুণ (যদি একে গুণ বলা যায়) তাঁর অকপটতা। আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা নগ্ন স্বার্থকে ‘গণতন্ত্র’ আর ‘মানবাধিকার’-এর মুখরোচক ভাষায় ঢেকে দিতেন। ট্রাম্প সে ভব্যতার মুখোশই পরেন না। ২০২৩ সালে তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, ‘আমি যখন ক্ষমতা ছাড়ি, ভেনেজুয়েলা তখন ভাঙনের মুখে ছিল। আমরা যদি তখন ওটা দখল করে নিতাম, তাহলে একদম পাশের বাড়িতেই দরকারি সব তেল পেতাম।’
এটি ট্রাম্পের হঠাৎ বলে ফেলা কোনো কথা নয়। তেল দখলের যুক্তি ট্রাম্পের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রেই স্পষ্টভাবে লেখা আছে। কৌশলপত্রের সেই নথি ওয়াশিংটনে দীর্ঘদিন অস্বীকার করা যে সত্যকে মেনে নেয়, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের অবসান হয়েছে।
কৌশলপত্রে বিদ্রূপের সুরে বলা হয়েছে, শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির শীর্ষ মহল নিজেদের বোঝাতে শুরু করেছিল, সারা পৃথিবীর ওপর স্থায়ী মার্কিন আধিপত্যই দেশের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে। কিন্তু এখন তারা স্বীকার করছে, গ্রিক পুরাণের দেবতা অ্যাটলাসের মতো গোটা বিশ্বকে কাঁধে তুলে রাখার দিন যুক্তরাষ্ট্রের শেষ হয়ে গেছে। বিশ্ব পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে যুগ ছিল, তার ইতি টানার ঘোষণাই কৌশলপত্রে দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যমান ব্যবস্থার জায়গায় আসছে এমন এক বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে একাধিক শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের মতো করে আলাদা আলাদা এলাকা দখলে রাখবে এবং প্রভাব খাটাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেই এলাকা হবে পুরো আমেরিকা মহাদেশ।
কৌশলপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বহুদিন অবহেলার পর যুক্তরাষ্ট্র আবার পশ্চিম গোলার্ধে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং সে জন্য তারা মনরো নীতিকে (প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ঘোষিত একটি নীতি, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ রোধ করার কথা বলা আছে) নতুন করে কার্যকর করবে।
মনরো নীতি উনিশ শতকের শুরুতে তৈরি হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, ইউরোপ যেন আমেরিকা মহাদেশে উপনিবেশ না গড়ে। কিন্তু বাস্তবে এই নীতির ফল হয়েছে ভিন্ন। এর মাধ্যমে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
ওয়াশিংটনের সহায়তায় লাতিন আমেরিকায় সহিংসতা নতুন কিছু নয়। আমার মা–বাবা চিলির ডানপন্থী স্বৈরতন্ত্র থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের পরই ডানপন্থী স্বৈরশাসক ক্ষমতায় বসেন।
তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘নিজেদের মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে কোনো দেশ কমিউনিস্ট হয়ে যাচ্ছে—এটা আমরা বসে বসে দেখব কেন?’ এই একই যুক্তি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া এবং মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয়জুড়ে হত্যাযজ্ঞ চালানো শাসনগুলোর প্রতি মার্কিন সমর্থনের ভিত্তি ছিল।
তবে গত তিন দশকে সেই আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তথাকথিত ‘পিঙ্ক টাইড’—ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভার নেতৃত্বে প্রগতিশীল সরকারগুলো আঞ্চলিক স্বাধীনতা জোরদার করতে চেয়েছিল। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন এ সময়ে মহাদেশজুড়ে তার শক্তি বাড়িয়েছে।
এ অবস্থাকে উল্টিয়ে দেওয়ার চেষ্টার প্রথম চালই ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি আসলে কথার মানুষ—বেশি চেঁচামেচি করেন, কিন্তু কাজের বেলায় তেমন কিছু করেন না। বাস্তবে তখন তিনি রিপাবলিকান দলের পুরোনো ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর সঙ্গে একধরনের অঘোষিত সমঝোতায় ছিলেন।
শর্তটা ছিল: তিনি অভিজাতদের ওপর থেকে কর কমাবেন, বড় ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবেন; আর এর বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইচ্ছেমতো উত্তেজক কথা বলবেন।
কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে সেই সমঝোতা আর নেই। এবারকার ট্রাম্প আর শুধু কথায় সীমাবদ্ধ নন, তিনি পূর্ণ শক্তিতে একটি চরম ডানপন্থী শাসন কায়েম করতে চাইছেন।
এ কারণে ট্রাম্প যখন কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টদের হুমকি দেন, তখন তা বিশ্বাস করুন। যখন তিনি বলেন, ‘কিউবা ধসে পড়ার মুখে’, তখন তাঁর কথা বিশ্বাস করুন। তিনি যখন বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড অবশ্যই আমাদের দরকার’—বিশ্বাস করুন। এটাও বিশ্বাস করুন, ইউরোপের ২০ লাখের বেশি বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড দখলের ইচ্ছা তিনি সত্যিই পোষণ করেন।
যদি বা যখন গ্রিনল্যান্ড ট্রাম্পীয় সাম্রাজ্যের মুঠোয় যায়, তখন কী হবে? ভেনেজুয়েলার ওপর তাঁর প্রকাশ্য বেআইনি হামলায় ইউরোপ যে মিনমিনে দুর্বল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তিনি নিশ্চয়ই তা লক্ষ করেছেন। এখন ডেনমার্কের সার্বভৌম ভূখণ্ড দখল হলে যৌথ প্রতিরক্ষার নীতিতে গড়ে ওঠা ন্যাটোর অবসান অনিবার্য হয়ে উঠবে। আন্দাজ করা যায়, রাশিয়া যেভাবে প্রকাশ্যে ইউক্রেনের জমি কেড়ে নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও একইভাবে ডেনমার্কের জমি চুরি করবে। এর বিরুদ্ধে লন্ডন, প্যারিস বা বার্লিন থেকে মৃদু আওয়াজ হয়তো উঠবে। কিন্তু ততক্ষণে পশ্চিমা জোট শেষ।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর মার্কিন অভিজাতরা নিজেদের সামরিক অজেয়তা আর অর্থনৈতিক মডেলকে মানব উন্নয়নের চূড়ান্ত গন্তব্য ভেবে নিয়েছিলেন। সেই অহংকারই সরাসরি বিশ্বকে ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ার বিপর্যয়ে এবং ২০০৮ সালের আর্থিক ধসে নিয়ে যায়। তাঁরা নিজেদের মানুষকে স্বর্গীয় স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তারপর একের পর এক দুর্যোগে টেনে নিয়েছেন। সেই হতাশা থেকেই জন্ম নেয় ট্রাম্পবাদ।
যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষয় সবার সামনে আসে, তা থেকেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারণাটি আসে। আর এ ধারণার মূল সুর হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক আধিপত্য ছেড়ে গোলার্ধভিত্তিক সাম্রাজ্য কায়েম করতে হবে।
উনিশ শতকের শেষে যুক্তরাষ্ট্র যখন স্পেনকে হারিয়ে ফিলিপাইন দখল করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই অনেকে এর বিরোধিতা করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী নাগরিকেরা মিলে গড়েছিলেন ‘আমেরিকান অ্যান্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট লীগ’। তাঁদের কথা ছিল পরিষ্কার—সাম্রাজ্যবাদ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যায় এবং দেশকে ধীরে ধীরে সামরিক শাসনের দিকে ঠেলে দেয়।
এর কিছুদিন পর বিশ শতকের শুরুতে ডেমোক্রেটিক পার্টিও সতর্ক করে বলেছিল—কোনো দেশ একসঙ্গে অর্ধেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আর অর্ধেক সাম্রাজ্য হয়ে টিকে থাকতে পারে না। বিদেশে সাম্রাজ্য গড়তে গেলে শেষ পর্যন্ত দেশের ভেতরেও স্বৈরতন্ত্র ঢুকে পড়ে।
আজ এসব পুরোনো সতর্কবাণীকে আর অতিরঞ্জন বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ, বাইরে অন্য দেশগুলোর ওপর যা করা হয়, তার প্রভাব দেশের ভেতরেও পড়ে। মার্তিনিকের লেখক এমে সেজেয়ার একে বলেছেন সাম্রাজ্যের ‘বুমেরাং’। তাঁর মতে, উপনিবেশবাদ বাইরে গিয়ে যা সৃষ্টি করে, তা একসময় ঘুরে এসে নিজের দেশকেই আঘাত করে। ইউরোপে যেমন উপনিবেশবাদ শেষে ফ্যাসিবাদ ফিরে এসেছিল।
আমরাও দেখেছি ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর বুমেরাং। বিদেশে যুদ্ধের ভাষা ও যুক্তি এখন দেশের ভেতরে দমননীতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ট্রাম্পের উপপ্রধান স্টাফ স্টিফেন মিলার পর্যন্ত বলেছেন, ডেমোক্রেটিক পার্টি নাকি একটি ‘ঘরোয়া চরমপন্থী সংগঠন’। আফগানিস্তান বা ইরাকে একসময় যেভাবে সেনা পাঠানো হয়েছিল, ডেমোক্র্যাট–শাসিত শহরগুলোতে সেভাবেই ন্যাশনাল গার্ড নামানো হচ্ছে, যেন সেগুলো শত্রু এলাকা।
এই দৃষ্টিতে দেখলে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিষয়ে ট্রাম্পের নরম মনোভাবও আর রহস্যজনক থাকে না। ২০১৯ সালে শোনা গিয়েছিল, রাশিয়া প্রস্তাব দিয়েছিল—যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেন থেকে সরে আসে, তাহলে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন প্রভাব মেনে নেওয়া হবে। এমন কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তা অবশ্য জানা নেই।
কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে। সেখানে ক্ষমতাধর, কর্তৃত্ববাদী দেশগুলো জোর খাঁটিয়ে প্রতিবেশীদের নিয়ন্ত্রণ করবে এবং তাদের সম্পদ দখল করবে, যা একসময় কল্পনার দুঃস্বপ্ন মনে হতো, আজ তা বাস্তব হয়ে চোখের সামনে ঘটছে। এখন আসল প্রশ্ন হলো—এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো উপায়, ইচ্ছা আর শক্তি কি আমাদের আছে?
* ওয়েন জোন্স, গার্ডিয়ানের কলাম লেখক।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
[৭ জানুয়ারি ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা সংক্ষিপ্তাকারে ট্রাম্প নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ছেন, ভেনেজুয়েলা দিয়ে শুরু—এ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]
| ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে কারাকাস থেকে নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হয়। ছবি: রয়টার্স |
Friday, January 9, 2026
অধিকাংশ আমেরিকান ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের পদক্ষেপ সমর্থন করে না
সোমবার প্রকাশিত দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক জরিপে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফল বলছে ট্রাম্পের বিদেশনীতি নিয়ে আমেরিকার জনগণের বিভক্তি তৈরি হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় হামলা ও মাদুরোকে আটকের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পদক্ষেপ যাচাই করতে ওয়াশিংটন পোস্ট এক হাজার আমেরিকানের ওপর জরিপ চালায়। এসব আমেরিকানদের জবাবের ভিত্তিতেই জরিপটি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী এই সংবাদমাধ্যম।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট প্রকাশিত জরিপটিকে প্রথম মানসম্মত জরিপ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। জরিপে দেখা যায়, ৪০ শতাংশ ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান সমর্থন করলেও এর বিরোধিতা করেছেন ৪২ শতাংশ আমেরিকান। অর্থাৎ জনমত প্রায় সমান ভাগে বিভক্ত। রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে সমর্থন তুলনামূলক বেশি হলেও সামগ্রিকভাবে এটিকে জনপ্রিয় বলা যাচ্ছে না।
এই ফলাফল বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো, কারণ অভিযানের আগে নেয়া জরিপগুলোতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে ছিল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির জরিপে ৬৩ শতাংশ এবং সিবিএস নিউজ-বিডিএমএফ জরিপে ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে লক্ষ্য করে সীমিত অভিযানের কারণে কিছু মানুষের সমর্থন বেড়েছে। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ নয় বরং একজন অজনপ্রিয় শাসককে আটক করার বিষয়টি জনমনে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে।
পাশাপাশি, দলীয় আনুগত্যও ভূমিকা রেখেছে। অভিযানের পর রিপাবলিকানদের মধ্যে সমর্থন বেড়ে ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে অভিযানের আগে তা ছিল ৫২-৫৮ শতাংশের মধ্যে। স্বাধীন ভোটারদের সমর্থন তুলনামূলক কম। মাত্র ৩৪ শতাংশ।
ইতিহাস বলছে- এ ধরনের সামরিক অভিযানের শুরুতে সাধারণত ব্যাপক জনসমর্থন দেখা যায়। ১৯৮৯ সালে পানামার নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে তখন ৮০ শতাংশ আমেরিকান সমর্থন জানিয়েছিলেন।
গ্রানাডা (১৯৮৩), আফগানিস্তান (২০০১) ও ইরাক (২০০৩) অভিযানের ক্ষেত্রেও শুরুতে সমর্থন ছিল প্রবল। সে তুলনায় ভেনেজুয়েলা অভিযান শুরুর দিকেই মাঝারি সমর্থন পাওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা শাসনে সরাসরি প্রভাব বিস্তার ও তেলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার ইঙ্গিত জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।
জরিপগুলো দেখাচ্ছে, বেশির ভাগ আমেরিকান এখন বিদেশনীতি নয় বরং দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক সমস্যা, মূল্যস্ফীতি ও ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ আমেরিকান চান যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে কম জড়াক। এপি-এনওআরসি জরিপে ২০২৬ সালের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে বিদেশনীতি ছিল তালিকার একেবারে নিচে।
এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও অভিযানের প্রতি ‘দৃঢ় সমর্থন’ সীমিত। ওয়াশিংটন পোস্টের জরিপে মাত্র ৪৫ শতাংশ রিপাবলিকান জোরালোভাবে এই অভিযান সমর্থন করেছেন।
রাজনৈতিকভাবে জনসমর্থন সীমিত হলেও এই অভিযানের মাধ্যমে ট্রাম্প পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের বার্তা দিতে পেরেছেন। প্রশাসনের ভাষায়, এটি শক্তি প্রদর্শনের একটি বড় পদক্ষেপ। তবে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি জড়িত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
একই সঙ্গে এই অভিযান ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট নীতি’ জোটের ভেতর বিভাজন বাড়াতে পারে। হস্তক্ষেপবিরোধী রিপাবলিকান নেতা ও প্রভাবশালীরা ইতিমধ্যে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। তাদের আশঙ্কা ভেনেজুয়েলায় গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে আটকে যেতে পারে।
ভেনেজুয়েলায় অভিযান ট্রাম্প প্রশাসনকে রিপাবলিকানদের বাহবা পাইয়ে দিলেও জরিপ বলছে- আমেরিকান জনমত এমন সাম্রাজ্যবাদী বিদেশনীতির বিপক্ষে।
সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, ভেনেজুয়েলা অভিযান কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক পদক্ষেপ নয়, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ‘ডনরো ডকট্রিন’ শব্দটি ব্যবহার করে ট্রাম্প কার্যত ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে আবারো একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সমপ্রতি প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও হুমকি, চাপ ও সামরিক শক্তির ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত প্রতীকী ছবিতে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাম্পের হাতে ‘ডনরো ডকট্রিন’ লেখা ব্যাট- এই কৌশলকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন অবাধ্য বিদেশি নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের শক্তি প্রদর্শন। এর মাধ্যমে শুধু ভেনেজুয়েলাকেই নয় বরং অন্য দেশগুলোকেও একটি কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ উপেক্ষা করলে পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।
সিএনএনের বিশ্লেষক নিক পেটন ওয়ালশের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ট্রাম্পের আলোচনার কৌশলেরই অংশ, যেখানে ভয় ও শক্তি ব্যবহার করে অন্যদের তার ইচ্ছার সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়।
এই অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে ট্রাম্পের নিজস্ব ঘাঁটিতে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পক্ষে থাকা হস্তক্ষেপবিরোধী রিপাবলিকানরা ক্রমেই অস্বস্তি প্রকাশ করছেন। কংগ্রেস সদস্য টমাস ম্যাসি ও মার্জরি টেলর গ্রিনের প্রকাশ্য সমালোচনা এবং সিনেটর র্যান্ড পল, লিসা মুরকোস্কি ও ড্যান সুলিভানের সতর্ক বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে-দলের ভেতরে ঐকমত্য আর আগের মতো শক্ত নেই।
ট্রাম্প-সমর্থক গণমাধ্যম ও অনলাইন প্রভাবকদের মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট। ক্যান্ডেস ওয়েন্স এই অভিযানকে ‘বিশ্বায়নবাদীদের শত্রুতামূলক দখলদারিত্ব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে স্টিভ ব্যানন প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প কি নব্য রক্ষণশীল বা ‘নিওকন’দের প্রভাবে এ পথে হাঁটছেন?
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ ও শাসনব্যবস্থা ঘিরে। ট্রাম্প যদি সত্যিই দেশটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে এগোন, তবে তা শুধু আন্তর্জাতিক সমালোচনাই নয়, ঘরোয়া রাজনীতিতেও বড় ধাক্কা দিতে পারে।

ভেনেজুয়েলার পর কলম্বিয়া, কিউবা, মেক্সিকোর দিকে দৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রের
মাদুরোর নাম উল্লেখ না করেই পেত্রো ওয়াশিংটনের অভিযানকে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের উপর হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, এর ফলে মানবিক সংকট তৈরি হবে। ট্রাম্প ক্যারিবিয়ানে কথিত মাদক চালানবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে সামরিক মোতায়েনের নির্দেশ দেয়ার পর থেকেই পেত্রো এসব পদক্ষেপের সমালোচক। মাদকবিরোধী কৌশলের অংশ হিসেবে ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দেন যে, কলম্বিয়ার মাদক উৎপাদন ল্যাবেও হামলা চালানো হতে পারে। একে পেত্রো ‘আক্রমণের হুমকি’ বলে নিন্দা করেন।
কারাকাস থেকে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে সরিয়ে নেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে দেশটি পরিচালনা করবে। তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও বিচক্ষণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা না যায়, ততক্ষণ আমরা দেশটি পরিচালনা করব। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ধরনের দ্বিতীয় আক্রমণ চালানোর জন্য প্রস্তুত।
লাতিন আমেরিকা নিয়ে ওয়াশিংটনের বৃহত্তর পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, পশ্চিম গোলার্ধে আবার কখনও আমেরিকার আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে না। তার ভাষায়, আমরা নিজেদের চারপাশে ভালো প্রতিবেশী চাই, স্থিতিশীলতা চাই, শক্তির উৎস চাই। ওই দেশে আমাদের বিরাট ‘এনার্জি’ রয়েছে এবং সেটাকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। আমাদের নিজেদের জন্যই তা প্রয়োজন।
ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন যে, দেশটিকে আবার মহান করতে যা দরকার তিনি তা করতে আগ্রহী। তবে বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর দেশীয় সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, তার (মাচাদো) জন্য নেতা হওয়া খুব কঠিন হবে। দেশে তার ভেতরে সেই সমর্থন বা সম্মান নেই। তিনি খুব ভদ্র একজন নারী, কিন্তু তার সে সম্মান নেই।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বড় তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলায় পাঠাবে। ভেঙেপড়া তেল অবকাঠামো মেরামতে বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে এবং দেশের জন্য আয় সৃষ্টি করবে। তার ভাষায়, আমাদের বিশাল মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সেখানে যাবে, বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে, ভেঙেচুরে যাওয়া তেল বিষয়ক অবকাঠামো ঠিক করবে এবং দেশটির জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে। ভেনেজুয়েলার সব তেলের ওপর আরোপিত অবরোধ বহাল আছে। আমেরিকান নৌবহর প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক বিকল্প খোলা রয়েছে যতক্ষণ না আমাদের সব দাবি পুরোপুরি মেনে নেয়া হয়।
মেক্সিকো ও কিউবার উদ্দেশে বার্তা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে কিউবা। তিনি বলেন, আমি যদি হাভানায় সরকারে থাকতাম, তাহলে অন্তত কিছুটা হলেও চিন্তিত হতাম।
লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘ সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যে ১৯৬১ সালের কিউবান নির্বাসিতদের নেতৃত্বাধীন ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ অভিযান, যা ফিদেল কাস্ত্রোকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছিল। মেক্সিকো প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, দেশটির সঙ্গে কিছু একটা করতেই হবে। তিনি দাবি করেন, আমরা তার (প্রেসিডেন্ট শেইনবাউমের) সঙ্গে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ। তিনি একজন ভালো নারী। কিন্তু মেক্সিকো চালাচ্ছে মাদক কার্টেলগুলো।
ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমকে বহুবার জিজ্ঞেস করেছেন ‘আপনি কি চান আমরা ওই কার্টেলগুলোকে গুঁড়িয়ে দিই?’ কিন্তু তিনি নাকি সবসময়ই ‘না’ বলেছেন।

Wednesday, January 7, 2026
নিকোলাস মাদুরো: বাসচালক থেকে লৌহমুষ্টি শাসক
কিন্তু বহু ভেনেজুয়েলাবাসীর কাছে মাদুরো কখনোই শান্তিপ্রিয় নেতা হিসেবে ধরা দেননি। তার শাসনামলে সাত মিলিয়ন মানুষ দেশ ছেড়ে অভিবাসনে গেছে। অভিযোগ রয়েছে নির্বিচার গ্রেপ্তার, সাজানো বিচার, নির্যাতন ও সেন্সরশিপের। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশের অর্থনীতি কার্যত ধসে পড়ে টানা চার বছর অতিমুদ্রাস্ফীতি এবং এক দশকে মোট দেশজ উৎপাদনে ৮০ ভাগ পতনের মধ্য দিয়ে। ক্ষমতার লাগাম ধরে রাখতে মাদুরো ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক অল্প কিছু মিত্রের ওপর। বিশেষত চীন, কিউবা ও রাশিয়া, পাশাপাশি দেশের সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা ও আধাসামরিক বাহিনীর ওপর।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে তার বিতর্কিত বিজয়ের পর যে প্রতিবাদ শুরু হয়, তা দমনে ২,৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, ২৮ জন মারা যায় এবং প্রায় ২০০ জন আহত হন। এই সহিংসতা তার আগের দমনপীড়নের ধারাবাহিকতা। ২০১৪, ২০১৭ ও ২০১৯ সালেও একই রকম অভিযান চালানো হয়।
‘প্রথম যোদ্ধা’
উঁচু দেহ, ঘন গোঁফ ও পেছনে আচড়ানো পাকা চুল এমন চেহারার মাদুরো প্রথম ক্ষমতায় আসেন ২০১৩ সালে এবং দাবি করেন যে তিনি দু’বার পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে। ওই নির্বাচন ব্যাপকভাবে কারচুপিপূর্ণ হিসেবে সমালোচিত। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তার তৃতীয় দফার শপথ সম্পন্ন হয় যা পূর্ণ হলে তিনি ১৮ বছর ক্ষমতায় থাকতেন। এটা হতো তার বিপ্লবী নায়ক হুগো শাভেজের চেয়েও বেশি। শাভেজ ১৪ বছর প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে মাদুরো ছিলেন সংসদ সদস্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর তিন মাস আগে নিজ উত্তরসূরি হিসেবে তাকেই বেছে নিয়েছিলেন শাভেজ। কিন্তু শাভেজের মতো বক্তৃতা ও ব্যক্তিত্বের জৌলুস মাদুরোর ছিল না, যা শাসক দল পিএসইউভির ভেতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। ২০১৩ সালের নির্বাচনে তিনি অল্প ব্যবধানে জিতেছিলেন। এরপর তিনি একের পর এক সঙ্কট সামাল দেন- যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, আবার তেলের দামের পতনে দেশের প্রধান আয়ের উৎস হারানো- সবকিছুর মাঝেও তিনি টিকে থাকেন।
২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক মহলের বড় অংশ সংসদীয় স্পিকার হুয়ান গুইদোকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও তার সমান্তরাল সরকার দ্রুত ভেঙে পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচন শেষে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশ ও কয়েকটি লাতিন আমেরিকান রাষ্ট্র বিরোধী নেতা এডমনদো গনজালেজ উরুতিয়াকে প্রকৃত নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। সবসময়ই তার পাশে ছিলেন স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। তাকে তিনি ডাকেন ‘প্রথম যোদ্ধা’ ও ‘সিলিতা’ নামে। পেশায় সাবেক সরকারি কৌঁসুলি ফ্লোরেস ছিলেন সংসদ সদস্য ও পরে জাতীয় পরিষদের স্পিকার । পর্দার আড়ালে মাদুরো শাসনে তিনি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভোররাতের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী মাদুরোর সঙ্গে তাকেও আটক করে নিউইয়র্কে নেয়া হয়েছে।
‘মার্কসবাদী ও খ্রিস্টান’
রাজধানী কারাকাসজুড়ে সর্বত্র টাঙানো মাদুরোর বিশাল পোস্টার ও দেয়ালচিত্র। নিজেকে তিনি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করেন- নিজেকে বলেন বেসবলপ্রেমী, সালসা নাচের ভক্ত এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রায়ই নাচতে দেখা যেত তাকে, পাশে স্ত্রীকে নিয়ে। কারাকাসে জন্ম নেয়া মাদুরো নিজেকে একইসঙ্গে ঘোষিত মার্কসবাদী ও খ্রিস্টান বলে দাবি করেন। কৈশোরে তিনি একটি রক ব্যান্ডেও গিটার বাজাতেন। ধারণা করা হয়, ইংরেজিতে ইচ্ছে করেই তিনি ভুল বলেন- যাতে উচ্চবিত্ত মনে না হয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে নানা ধরনের বাস্তব ও কল্পিত হুমকির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০১৮ সালে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা ব্যর্থ হলেও কয়েকজন সেনা আহত হন। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দায় এড়াতে তিনি শাভেজের আমলের মার্কিনবিরোধী ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে এগিয়ে নেন। বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে তাকে উৎখাতের চক্রান্তে অভিযুক্ত করেন। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার দাবি করতে করতে তিনি দেশের রাজনৈতিক বিরোধিতার পথ বন্ধ করে দেন। যথেচ্ছ গ্রেপ্তার, বিচারহীন আটক ও বিরোধীদের দমন ছিল নিয়মিত। তার সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও দক্ষ প্রমাণিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচন আয়োজনের চুক্তিতে রাজি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করাতে সক্ষম হন। তবে পরবর্তীতে তিনি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন এবং নিষেধাজ্ঞা আবার ফিরিয়ে আনা হয়। ভেনেজুয়েলার ক্লান্ত জনগণের দৈনন্দিন জীবনে মাদুরো ছিলেন প্রায় সর্বব্যাপী চরিত্র নিয়মিত টেলিভিশনে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তৃতা দিতে দেখা যেত তাকে।
এমনকি কার্টুন চরিত্র হিসেবেও তিনি জনপ্রিয় ছিলেন- ‘সুপার-বিগোতে’ বা ‘সুপার-মোচ’ নামে এক কেপ পরা সুপারহিরো, যে নাকি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।

প্রত্যাখ্যান করি আমার মাতৃভূমিকে অপমানিত করার নীতি by মিশেল এলনার
ভেনেজুয়েলাবাসীর কাছে এই কথাগুলো একটি দীর্ঘ, বেদনাদায়ক ইতিহাসের প্রতিধ্বনি।
চলুন, পরিষ্কার করে বলি প্রেসিডেন্ট যেসব দাবি করেছেন, সেগুলো কী। তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার আছে একটি বৈধভাবে ক্ষমতায় থাকা বিদেশি প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে মার্কিন ফৌজদারি আইনের আওতায় আটক করার। যুক্তরাষ্ট্র একটি সার্বভৌম দেশকে আন্তর্জাতিক কোনো ম্যান্ডেট ছাড়াই পরিচালনা করতে পারে। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ওয়াশিংটনে বসে ঠিক করা যেতে পারে। তেল সম্পদ ও ‘পুনর্গঠন’-এর নিয়ন্ত্রণ হস্তক্ষেপের স্বাভাবিক ফল। এগুলোর কোনোটি করতে কংগ্রেসের অনুমোদন বা আসন্ন কোনো হুমকি প্রমাণের প্রয়োজন নেই।
এ ধরনের ভাষা আমরা আগেও শুনেছি। ইরাকে প্রথমে ‘সীমিত হস্তক্ষেপ’ ও ‘অস্থায়ী প্রশাসন’-এর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু হয়ে উঠেছিল বছরের পর বছর দখলদারিত্ব, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ দখল, আর পেছনে রেখে যাওয়া ধ্বংস ও অস্থিতিশীলতা। স্টেওয়ার্ডশিপের নামে যা শুরু হয়েছিল, তা পরিণত হয়েছিল আধিপত্যে। এখন ভেনেজুয়েলাকে নিয়েও একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘অস্থায়ী প্রশাসন’- শেষে হয়ে দাঁড়িয়েছিল স্থায়ী বিপর্যয়।
আন্তর্জাতিক আইনে এই প্রেস কনফারেন্সে বর্ণিত কোনো কিছুই বৈধ নয়। জাতিসংঘ সনদ অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের হুমকি বা ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে এবং কোনো দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপও নিষিদ্ধ। রাজনৈতিক ফলাফল চাপিয়ে দিতে ও নাগরিক ভোগান্তি তৈরি করতে যে ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়- তা সমষ্টিগত শাস্তির শামিল। ‘একটি দেশ চালানোর’ অধিকার ঘোষণা করা মানে দখলদারিত্বের ভাষায় কথা বলা- যতই শব্দটা এড়িয়ে যাওয়া হোক।
মার্কিন আইনের ক্ষেত্রেও দাবিগুলো সমানভাবে উদ্বেগজনক। যুদ্ধের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। কোনো অনুমোদন নেই, কোনো ঘোষণা নেই, এমন কিছুই নেই যা একজন নির্বাহীর হাতে ক্ষমতা দেয় বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করতে বা কোনো দেশ পরিচালনা করতে। একে ‘আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগ’ বলা মানেই তা বৈধ হয়ে যায় না। ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করেনি, কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির সতর্কতাও দেয়নি- যা বৈধ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় পড়তে পারে। দেশটির বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের কোনো বৈধ ভিত্তি নেই- না মার্কিন আইন অনুযায়ী, না আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে।
কিন্তু আইন বা নজিরের বাইরেও রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি: এই আগ্রাসনের খেসারত দেয় সাধারণ মানুষ। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উত্তেজনার বোঝা সমানভাবে পড়ে না- তা গিয়ে আঘাত করে নারীদের, শিশুদের, বৃদ্ধদের, গরিবদের ওপর। এর মানে হলো ওষুধ ও খাবারের সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ভাঙন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহারের বৃদ্ধি, আর অবরুদ্ধ জীবনে প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াই। এর সঙ্গে যোগ হয় সেইসব মৃত্যু- যা অনিবার্য নয়, প্রাকৃতিকও নয়, বরং বিদ্যুৎ, পরিবহন, চিকিৎসা বা ওষুধের নাগাল ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে ঘটে। প্রতিটি উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে এবং বেসামরিক মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে- যেগুলোকে পরবর্তীতে ‘পার্শ্বক্ষয়’ বলা হয়, যদিও এসব ছিল আগে থেকেই অনুমেয় ও এড়ানো সম্ভব।
এটিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে সেই অন্তর্নিহিত ধারণাটি যে, ভেনেজুয়েলাবাসীরা অপমান ও বলপ্রয়োগের মুখে নিশ্চুপ ও অনুগত থাকবে। এই ধারণাটি ভুল। যখন এটি ভেঙে পড়বে- যা অবশ্যম্ভাবী, তখন মূল্য দিতে হবে অপ্রয়োজনীয় রক্তপাতের মাধ্যমে। যখন একটি দেশকে ‘উত্তরণ সমস্যা’ বা ‘প্রশাসনিক সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়- তখন মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়। জীবনগুলোকে হিসাবের খাতায় গ্রহণযোগ্য ক্ষতিতে পরিণত করা হয়। আর যে সহিংসতা পরে আসে, তাকে বলা হয় ‘দুঃখজনক পরিণতি’- অথচ সেটিই ছিল ঔদ্ধত্য ও জবরদস্তির পূর্বনির্ধারিত ফল।
একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যখন একটি দেশকে এমনভাবে বলতে শুনি- ‘পরিচালনা করা, স্থিতিশীল করা, আর শৃঙ্খলায় এলে হস্তান্তর করা’- তা আঘাত করে। অপমানিত করে এবং ক্রুদ্ধ করে।
হ্যাঁ- ভেনেজুয়েলা রাজনৈতিকভাবে একতাবদ্ধ নয়। কখনোই ছিল না। সরকার, অর্থনীতি, নেতৃত্ব, ভবিষ্যৎ- সবকিছু নিয়েই আছে গভীর বিভাজন। কেউ নিজেকে চাভিস্তা হিসেবে চিহ্নিত করে, কেউ কঠোর বিরোধী, কেউ ক্লান্ত ও বিমুখ- এবং হ্যাঁ, কেউ কেউ হয়তো উদযাপন করছে, ভেবে যে অবশেষে পরিবর্তন আসতে পারে।
কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন দখলদারিত্বকে আমন্ত্রণ জানায় না।
লাতিন আমেরিকা এই যুক্তি আগেও দেখেছে। চিলিতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে ‘অচলাবস্থা’ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার হুমকির অজুহাতে মার্কিন হস্তক্ষেপের যুক্তি বানানো হয়েছিল- যার শেষ হয়েছিল গণতন্ত্রে নয়, বরং স্বৈরশাসন, দমনপীড়ন ও দীর্ঘমেয়াদি ট্রমায়।
বাস্তবে, অনেক ভেনেজুয়েলাবাসী- যারা সরকারের বিরোধী- তারাও এই মুহূর্তটিকে প্রত্যাখ্যান করছে। তারা জানে বোমা, নিষেধাজ্ঞা ও বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া ‘উত্তরণ’ গণতন্ত্র আনে না; বরং গণতন্ত্রের সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা- নিখুঁত অবস্থান নয়। আপনি মাদুরোকে অপছন্দ করতেই পারেন, তবুও মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা করতে পারেন। আপনি পরিবর্তন চাইতে পারেন, তবুও বিদেশি আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। আপনি রাগান্বিত, ক্লান্ত বা আশাবাদী হতে পারেন, তবুও বলতে পারেন: অন্য দেশের শাসনের অধীনে থাকতে চাই না।
ভেনেজুয়েলা এমন এক দেশ, যেখানে কমিউনাল কাউন্সিল, শ্রমিক সংগঠন, পাড়াভিত্তিক কমিটি ও সামাজিক আন্দোলনগুলো তৈরি হয়েছে চাপের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক শিক্ষা এসেছে না থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক থেকে- এসেছে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে। এখন ভেনেজুয়েলাবাসীরা লুকিয়ে নেই, বরং ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। কারণ তারা ধরণটি চিনে ফেলে। তারা জানে ‘উত্তরণ’ ও ‘অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ কথাগুলোর পর সাধারণত কী আসে। এবং তারা সবসময় যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে: ভয়কে রূপ দিচ্ছে সামষ্টিক কর্মে।
এই প্রেস কনফারেন্স শুধু ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে ছিল না, বরং ছিল এই প্রশ্ন নিয়ে: সাম্রাজ্য কি আবার প্রকাশ্যে বলতে পারে- অন্য দেশগুলোকে শাসনের অধিকার তার আছে এবং আশা করতে পারে বিশ্ব চুপ থাকবে?
যদি এটি টিকে যায় তাহলে বার্তাটি নির্মম:
সার্বভৌমত্ব শর্তসাপেক্ষ, সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘গ্রহণযোগ্য’, আর গণতন্ত্র টিকে থাকে কেবল সাম্রাজ্যিক অনুমতিতে।
একজন ভেনেজুয়েলান-আমেরিকান হিসেবে আমি এই শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করি।
আমি প্রত্যাখ্যান করি- আমার করের টাকা দিয়ে আমার মাতৃভূমিকে অপমানিত করার নীতি। আমি প্রত্যাখ্যান করি- যুদ্ধ ও জবরদস্তিকে ‘ভেনেজুয়েলাবাসীর কল্যাণ’ বলে চালানোর মিথ্যা। এবং আমি নীরব থাকতে রাজি নই, যখন একটি প্রিয় দেশকে মানুষের সমাজ হিসেবে নয়, বরং মার্কিন স্বার্থের কাঁচামাল হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ কোনো মার্কিন কর্মকর্তা, কোনো করপোরেট বোর্ড, বা এমন কোনো প্রেসিডেন্টের হাতে নয়, যে মনে করে পুরো গোলার্ধ তার অধীনস্ত।
ভবিষ্যৎ কেবল ভেনেজুয়েলাবাসীর।
(মিশেল এলনার, কোডপিঙ্ক-এর লাতিন আমেরিকা ক্যাম্পেইনের সমন্বয়কারী। তিনি ভেনেজুয়েলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং প্যারিসের লা সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় (প্যারিস-৪) থেকে ভাষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকের পর তিনি কারাকাস ও প্যারিসের অফিস থেকে একটি আন্তর্জাতিক বৃত্তি কর্মসূচিতে কাজ করেন এবং আবেদনকারীদের মূল্যায়ন ও নির্বাচন করার কাজে হাইতি, কিউবা, গাম্বিয়া ও অন্যান্য দেশে পাঠানো হয় তাকে। তার এ লেখাটি অনলাইন ভেনেজুয়েলা এনালাইসিস থেকে অনুবাদ)

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...









