Tuesday, March 24, 2026
যৌনতার দ্বীপে অভিজাতদের ক্ষমতা–চরিত্রের নগ্ন চেহারা by প্রতাপ ভানু মেহতা
যৌনতার দ্বীপে অভিজাতদের ক্ষমতা–চরিত্রের নগ্ন চেহারা by প্রতাপ ভানু মেহতা
ইতিহাসে নানা সময়ে দ্বীপকে কল্পনা করা হয়েছে এমন এক জায়গা হিসেবে, যেখানে আধুনিক সমাজ নিজের সবচেয়ে বিপজ্জনক কল্পনাগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারে।
আলোকপ্রাপ্ত যুগে ধারণা ছিল—দ্বীপ মানে মূল সমাজের বাইরে থাকা একটি নিরাপদ এলাকা। সেখানে নৈতিক নিয়ম, সামাজিক শালীনতা বা যৌন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে রাখা যায়। মানুষ ইচ্ছেমতো ভোগে মেতে উঠতে পারে, কিন্তু তাতে মূল সমাজের নৈতিক কাঠামো নষ্ট হবে না। কারণ, সবকিছুই ঘটছে ‘ব্যতিক্রমী’ এক জায়গায়, ‘অফশোরে’, মানে সমুদ্রের ওপারে।
এই একই যুক্তি পরে শুধু যৌনতার ক্ষেত্রে নয়, আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো হয়েছে। ‘অফশোরিং’ মানে হলো অপরাধ বা অনৈতিক কাজকে এমন জায়গায় সরিয়ে নেওয়া, যেখানে মনে হয় তা মূল ব্যবস্থাকে স্পর্শ করছে না। যেন কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং বা আর্থিক প্রতারণা কোথাও দূরে ঘটছে, তাই পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষতি হচ্ছে না।
এভাবে অপরাধ, যৌন সহিংসতা, লাগামছাড়া ভোগ আর আর্থিক বিশ্বাসঘাতকতাকে ‘সমুদ্রের ওপারে’ পাঠানো একদিকে ভয়ংকর, আবার অন্যদিকে ক্ষমতাবানদের মনে একধরনের স্বস্তিও দেয়। তাঁদের মনে হয়, সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে না। কারণ, তা নাকি কেন্দ্রের ভেতরে নয়। কিন্তু এই স্বস্তিই আসলে এক মারাত্মক ভ্রান্তি।
আর্থিক অপরাধকে ‘অফশোরে’ সরিয়ে দিলে তা ছোট বা প্রান্তিক হয়ে যায়, এটা সত্য নয়। বরং এসব অফশোর ব্যবস্থা মূল আর্থিক কেন্দ্রের অপরাধকে আরও বড়, আরও শক্তিশালী করে তোলে। অর্থাৎ অপরাধ দূরে সরে যায় না, উল্টো কেন্দ্রের ভেতরেই তার প্রভাব বাড়ে।
একই ভুল ধারণা ছিল অভিজাতদের মনেও। তাঁরা ভেবেছিলেন, মূল সমাজকে নষ্ট না করেই তাঁরা গোপনে তাঁদের সবচেয়ে বিকৃত ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারবেন। কিন্তু জেফ্রি এপস্টেইনের আশপাশে যাঁরা ঘুরেছেন, তাঁরা কোনো স্বাধীনচেতা বিদ্রোহী ছিলেন না। তাঁরা সামাজিক নিয়ম ভাঙার সাহসী আন্দোলনও করছিলেন না।
আসলে তাঁরা আধুনিকতার এক অন্ধকার দিক বাস্তবে প্রয়োগ করছিলেন। এখানে কল্পনাই হয়ে উঠেছে অশ্লীল পণ্যে ভরা। মানুষকে, বিশেষ করে দেহকে, ব্যবহার করা হয়েছে কেনাবেচার জিনিস হিসেবে। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মানুষ নিজেকে পর্যন্ত অপমান করতে প্রস্তুত হয়েছে।
এই অভিজাত শ্রেণির ভেতরে একই সঙ্গে আছে ভয়ংকর দায়মুক্তির অনুভূতি বা আইনের ঊর্ধ্বে থাকার আত্মবিশ্বাস এবং মানসিকভাবে অপরিণত আচরণ। এখানে ক্ষমতা আছে, কিন্তু সংযম নেই; প্রভাব আছে, কিন্তু নৈতিকতা নেই।
এপস্টেইন ফাইল নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। সব নথি কি সত্যিই প্রকাশিত হয়েছে? ভুক্তভোগীদের অধিকার কি সুরক্ষিত হবে? ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টি—উভয় দলই যখন জড়িত, তখন কার লাভ হবে? এই নথিগুলো আমেরিকার কিছু অভিজাত মানুষের এক নির্মম ‘এক্স-রে’ তুলে ধরে।
যে মানুষগুলো মানসিকভাবে অপরিণত, ভেতরে ভঙ্গুর, কিন্তু বাইরে অসম্ভব ক্ষমতাবান—তাঁরা আসলে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?
আসল রহস্য হলো, জেফ্রি এপস্টেইন কীভাবে নিজেকে এমন জায়গায় বসাতে পারলেন, যেখানে বিশ্বরাজনীতির বড় বড় শক্তির পথও যেন তাঁর মধ্য দিয়েই যেত। কেন রাষ্ট্র, ধনকুবের আর ক্ষমতাশালীরা ভাবলেন—এই লোককে ছাড়া কাজ চলবে না?
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঝগড়া হলেও একটা ব্যাপারে তারা প্রায় একমত—এই কেলেঙ্কারিকে ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে দেখাতে হবে। অর্থাৎ বলা হচ্ছে, এটা কিছু ব্যক্তির বিচ্যুতি, পুরো শাসকশ্রেণির স্বাভাবিক চেহারা নয়। ঠিক যেমন আগে দ্বীপ বা উপনিবেশকে এমন জায়গা ভাবা হতো, যেখানে অভিজাতরা ইচ্ছেমতো নিয়ম ভাঙতে পারে, কিন্তু মূল সমাজ নাকি অক্ষত থাকে। এখানে একই কৌশল চলছে—অভিজাতদের অনৈতিক আচরণকে আলাদা করে দেখানো, যেন কেন্দ্রের নৈতিক ব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে না পড়ে।
এখানে আধুনিক রাজনীতির এক গভীর অসুখ ধরা পড়ে। আজ ক্ষমতা আর নৈতিকতা বা ব্যক্তিগত গুণের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। ক্ষমতা টিকে থাকে অস্বচ্ছতা, নির্লজ্জ আচরণ, আইনের জটিল ভাষা, প্রচারণা আর নানা প্রক্রিয়াগত চালাকির ওপর। ভয়াবহ অপরাধ চোখের সামনে থাকলেও সেগুলো নিয়ে কথা না বলে শক্তি খরচ হয় আইনি ফাঁকফোকর আর শব্দের খেলায়।
আধুনিকতাকে এক পুরোনো ভয় এখনো তাড়া করে। এ মুহূর্ত সবচেয়ে ভালো বুঝিয়েছিলেন প্রাচীন রোমান ইতিহাসবিদেরা—ট্যাসিটাস, স্যালাস্ট ও লিভি। তাঁরা বলেছিলেন, ক্ষমতার কেন্দ্রে যখন যৌন অবক্ষয় আর সহিংসতা ঢুকে পড়ে, তখন তা রাজনৈতিক পতনের লক্ষণ হয়ে ওঠে। আমরা ‘আধুনিক’রা অবশ্য নিজেদের আলাদা মনে করি।
আমরা বলি, ব্যক্তিগত জীবন আর রাষ্ট্রীয় কাজ আলাদা। আমাদের কাছে দুর্নীতি মানে নৈতিক পতন নয়, বরং প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করছে কি না, সেই প্রশ্ন।
কিন্তু জে জি এ পোকক মনে করিয়ে দেন একটি বড় দ্বন্দ্বের কথা। আমরা প্রকাশ্যে বলি, যৌন অবক্ষয় সমাজ ভাঙার কারণ নয়; আসল কারণ অর্থনীতি বা রাজনীতি। তবু আমরা ‘গুণ’ বা নৈতিকতার ভাষা পুরোপুরি ছাড়তে পারি না। কারণ, মনে মনে একটা সন্দেহ থেকেই যায়—যদি এসব অবক্ষয় সরাসরি কারণ না–ও হয়, তবু এগুলো ক্ষমতার ভেতরের সত্যটা প্রকাশ করে দেয়।
নিশ্চয়ই এপস্টেইন ফাইলের ভেতরে নানা স্তর আছে, যেগুলো আলাদা করে বুঝতে হবে। কেউ আইনগতভাবে অপরাধ করেছে। কেউ নৈতিকভাবে জঘন্য কাজে জড়িয়েছে। আবার কেউ ব্যক্তিগতভাবে দোষী না হলেও এমন এক ক্ষমতা ও জ্ঞানের কাঠামোকে সমর্থন করেছে, যা লজ্জাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে।
এপস্টেইন ফাইল ব্যক্তিগত অপরাধ বা নির্দোষিতার প্রশ্ন নয়। এটি সমষ্টিগত ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে। আর যখন সেই সমষ্টিগত ক্ষমতা যৌন, আর্থিক, আইনি, রাজনৈতিক, এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকেও লজ্জা ও দায়মুক্তির সঙ্গে সারিবদ্ধ করে, তখন প্রশ্ন জাগে—রোমান ইতিহাসবিদেরা কি ঠিকই কিছু দেখেছিলেন? তাঁরা ভেবেছিলেন, সাম্রাজ্য ভাঙে তখনই, যখন অভিজাতেরা কোনো ক্ষেত্রেই আর আত্মসংযম রাখতে পারেন না।
রোমানরা যে সংকটের কথা জানত, সেটাই আজকের সংকট। এ ধরনের অভিজাতদের আর কোনো নৈতিক কর্তৃত্ব অবশিষ্ট থাকে না। ক্ষমতায় থেকেও তাঁরা ভীত। নিজেদের কুকর্ম ঢাকতে তাঁরা আরও কী ধরনের সহিংসতায় যেতে পারেন, তা কে জানে।
* প্রতাপ ভানু মেহতা, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| (ওপরে বাঁ থেকে ডানে) ডোনাল্ড ট্রাম্প, জেফরি এপস্টেইন, (নিচে বাঁ থেকে ডানে) ইলন মাস্ক, বিল গেটস। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1427)
-
▼
March
(202)
-
▼
Mar 24
(10)
- গ্যাঁড়াকলে মধ্যপ্রাচ্য: কী করবে সৌদি ও আরব আমিরাত...
- নতুন বিশ্বব্যবস্থা: রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোপন...
- ইরানে হামলা চালিয়ে যেতে ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন সৌদি...
- যৌনতার দ্বীপে অভিজাতদের ক্ষমতা–চরিত্রের নগ্ন চেহার...
- ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হতে চেয়ে কেন যুদ্ধের পথে হাঁ...
- ইরান যুদ্ধ : পানি কি হয়ে উঠেছে যুদ্ধের অস্ত্র? by ...
- ভারতে অসুস্থ যুবকের ‘পরোক্ষ মৃত্যুর’ পক্ষে রায় দিল...
- সুন্দরবন ও বাঘ রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই by এম...
- ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে
- সস্তা ড্রোন আকাশযুদ্ধের ধরনকেই বদলে দিচ্ছে
-
▼
Mar 24
(10)
-
▼
March
(202)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment