গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ৩৮ দিনেও থানায় যায়নি! by শরিফুজ্জামান

একের পর এক রাজনৈতিক কৌশল সফল হলেও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সরকার প্রথম ধাক্কা খেল। আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ৩৮ দিনেও পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করার চেষ্টা করেনি। এ ক্ষেত্রে সরকারের মধ্যে দ্বিধা ও কিছুটা শঙ্কা কাজ করেছে বলে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৮ দিনে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় না যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে একধরনের বিভ্রান্তি ও ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। আদালতের কর্মচারীরা বলছেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় পাঠানো হয়েছে। জানতে চাইলে পুলিশের উপকমিশনার (গুলশান) খন্দকার লুৎফুল কবীর গতকাল বৃহস্পতিবারও প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় পৌঁছায়নি।
এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার আবারও আদালতে হাজিরার তারিখ সামনে চলে এসেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তাঁর উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পেলে ৫ এপ্রিল খালেদা জিয়া আদালতে যাবেন। সরকারের দায়িত্ব হবে তাঁকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া।
পরোয়ানা জারির এক মাসের বেশি সময় পরও গ্রেপ্তার না হওয়া প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী রফিক-উল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইশারা ছাড়া এ রকম হওয়ার কথা নয়। তবে এ নিয়ে বেশি কথা না বলাই ভালো। আমার বা আরেকজনের মতো সাধারণ মানুষের পরোয়ানা হলে দেখতেন, কত দ্রুত তা আদালত থেকে থানায় যায়।’
সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের মনোভাব হচ্ছে, বিষয়টি আদালতের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হোক। সরকার নিজে তাঁকে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিতে চায় না। এমনকি দলীয় কার্যালয় থেকে তাঁকে ধরে আনা হবে বলে যতটা চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, বাস্তবতা সে রকম নয়।
তবে ইতিমধ্যে বিএনপির নেতাদের মধ্যেও কিছুটা নরম সুর লক্ষ করা যাচ্ছে। আন্দোলন থেকে মনোযোগ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে চলে যাওয়ায় জনজীবন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে সাময়িকের জন্য হলেও কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
আওয়ামী লীগের একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, খালেদা জিয়াকে অবশ্যই জেলে যেতে হবে। তবে তা দুর্নীতি মামলার রায় হওয়ার আগে, না পরে তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
ওই মন্ত্রী জানান, খালেদা জিয়াকে এখন পর্যন্ত দলীয় কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার না করার পক্ষে সরকার। তবে আদালতে হাজির হলে জামিন বা জেল, যা-ই হোক তা নিয়ে সরকারের কোনো ভাবনা নেই।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তায়। খালেদা জিয়া আদালতে হাজির হলে এই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু এভাবে হাজির না হতে থাকলে একপর্যায়ে আদালতই পুলিশের কাছে পরোয়ানা তামিল না করার কারণ জানতে চাইবে।
প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রীরা বারবার খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করার কথা বললেও তা না করায় রাজনৈতিক অঙ্গন ও বিচারালয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা হচ্ছে। দলটির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই মনে করছেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলে ওলট-পালট হওয়ার মতো বড় কিছু ঘটনার সম্ভাবনা নেই। তবে এর ফলে দেশে-বিদেশে তিনি রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন। বিদেশিরাও এখনকার তুলনায় সরব হয়ে উঠতে পারে।
এ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার আদালতে হাজিরার আগে ১৬ কূটনীতিকের তৎপরতাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা হচ্ছে। ওই দিন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল না করার জন্য অনেকেই কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপকে কারণ বলে মনে করছেন। অবশ্য সরকারের অজুহাত হচ্ছে, আদালত থেকে পরোয়ানাটি থানায় পৌঁছায়নি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এটা সরকারের দুর্বলতা নয়। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব এবং তা করতে সরকার বাধ্য। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওনাকে কিছুটা স্পেস দেওয়া হয়েছে, যাতে উনি বোঝার ও ভাবার সুযোগ পান।’
আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখা ও পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, পরোয়ানা জারির পর বিষয়টি আর আদালতের কাছে নেই। এখন পরোয়ানা আদালতে পৌঁছা নিয়ে যা কিছু হচ্ছে, তা রাজনৈতিক।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, আদালতে গরহাজির থাকায় বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার যৌক্তিক কারণে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন বিচারক। সরকারের ধারণা ছিল, জেলের ভয়ে অথবা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তিনি নিজেই আদালতে যাবেন।
এ প্রসঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ওসমান ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, আইন ও আদালতের প্রতি ওনার শ্রদ্ধার কমতি নেই। কিন্তু এখনকার বিষয়টি রাজনৈতিক। এর সঙ্গে আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের সম্পর্ক নেই। তাঁর মতে, রাজনৈতিক সমাধান হলে, সংলাপ ও তার ভিত্তিতে নির্বাচন হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি আদালত খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন।
আদালত সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের ৩ জুলাই ওই মামলা দায়ের হওয়ার পর অসংখ্যবার তারিখ পিছিয়ে ইতিমধ্যে ছয় বছর পার হয়েছে। গত ১৯ মার্চ অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্য গ্রহণও পিছিয়েছে কয়েক দফা। কয়েক মাস ধরে আদালতে হাজির না হওয়ায় বিচারক খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর। এ নিয়ে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা চলছে বা চলবে। কিন্তু তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, গ্রেপ্তার করলে কবে, কখন এবং কোন পরিস্থিতিতে, তা সরকারের উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হবে।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব গতকাল তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগেও বলেছি, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, আদালতে যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে আদালতে যেতে পারছেন না। এর আগে গত ২৪ ডিসেম্বর যখন তিনি আদালতে গিয়েছিলেন, তখন পথে তাঁর গাড়িবহরে হামলা হয়েছিল।’
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রায় তিন মাস ধরে গুলশানের নিজ কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি ওই কার্যালয় থেকে বের হননি, মামলার শুনানি হলেও তিনি হাজিরা দেননি।