ইরানকে ‘পঙ্গু’ করতে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর নতুন চাল - আসছে স্থল অবরোধ

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে দেশটির বিরুদ্ধে এবার স্থল অবরোধ আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। বৃটিশ সংবাদপত্র দ্য টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

গত কয়েক মাস ধরে বিমান হামলা ও দীর্ঘ সামরিক চাপ প্রয়োগ করেও তেহরানকে নতি স্বীকার করানো সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরদারের নতুন কৌশল বিবেচনা করছেন।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই নেতা ‘সামরিক (কাইনেটিক) ও অসামরিক (নন-কাইনেটিক) উপায়ে’ ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যাতে তারা সীমান্ত ক্রসিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। এর ফলে ইরানের আমদানি-রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হতে পারে।

ইসরাইলের সিনিয়র এক কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ভাবুন তো, যদি স্থলপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া যায়। ইরান যদি কিছুই আমদানি করতে না পারে এবং কিছুই রপ্তানি করতে না পারে, তাহলে কী হবে?

এনিয়ে অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল শন ম্যাকফারল্যান্ড বলেন, বাস্তবে এমন অবরোধ কার্যকর করা ‘প্রায় অসম্ভব’ হলেও, যদি ইরানের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বন্ধ করা যায়, তবে দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হবে।
তার ভাষায়, অর্থনৈতিক চাপই সবচেয়ে কার্যকর পথ, তবে এর সঙ্গে সামরিক উপাদানও থাকতে হবে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের স্থলসীমান্ত বহু দেশের সঙ্গে যুক্ত এবং বিশেষ করে ইরাক তেহরানের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় সব ধরনের সহায়তা বন্ধ করা অত্যন্ত কঠিন হবে।

সাত প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন

সম্ভাব্য এই পরিকল্পনায় ইঞ্চেহ বরুন ও সারাখস সীমান্ত ক্রসিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, যা ইরানকে তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ইরানের সঙ্গে ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের স্থলসীমান্ত রয়েছে। ফলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে এসব দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। তবে প্রতিবেশী কোনো দেশ এ পরিকল্পনায় সহযোগিতা করলে তাদের নিজেদের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি ইরানের পাল্টা সামরিক হামলার ঝুঁকিও তৈরি হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থল ও সমুদ্রপথে অবরোধের মাধ্যমে ইরানের নতুন অস্ত্র সংগ্রহের সক্ষমতা সীমিত করার লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে চীনের সঙ্গে নতুন সামরিক সহযোগিতা চুক্তির আওতায় বেইজিং থেকে শত শত রকেট লঞ্চার পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে তেহরান।

প্রায় ৭ কোটি ডলারের ওই চুক্তিতে কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (ম্যানপ্যাডস) ও ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চীন থেকে আসা জাহাজগুলো সাধারণত দক্ষিণ ইরানের বান্দার আব্বাস ও চাবাহার বন্দরে নোঙর করে।
দ্য টেলিগ্রাফের এক সূত্রের দাবি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বর্তমান কৌশল থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন নতুন বিকল্প খুঁজছেন। সূত্রটি জানায়, ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে উত্তেজনা আরও বাড়ানোর বিভিন্ন উপায় বিবেচনা করছেন তিনি। এই পরিকল্পনা ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’নীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার লক্ষ্য তেহরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়া।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থল অবরোধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেয়ে এটি বিভ্রান্তিমূলক কৌশল (রেড হেরিং) হিসেবেও সামনে আনা হয়ে থাকতে পারে, যাতে ইরান প্রকৃত পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়।

গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নেতৃত্বের ভেতরে মতভেদ রয়েছে। এক পক্ষ অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্য পক্ষ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে।

একজন ইসরাইলি কর্মকর্তা বলেন, ইরানে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। অনেক পেট্রোলপাম্পে ডিজেল শেষ হয়ে গেছে, দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বৈঠক ছিল ইতিবাচক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ।
ইসরাইলি এক কর্মকর্তার দাবি, বৈঠকে ইরানকে ঘিরে তিনটি সম্ভাব্য বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়- কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো, নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখা, অথবা আবার সামরিক হামলা শুরু করা।

তবে নেতানিয়াহু কোনো একটি বিকল্পের পক্ষে জোর দেননি। তিনি বলেন, আমরা শুধু নিজেদের জীবন নয়, আপনাদের জীবনও রক্ষা করছি। আমরা বর্বরতার বিরুদ্ধে সভ্যতার লড়াই করছি।

ইরানকে ‘পঙ্গু’ করতে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর নতুন চাল