তেহরান থেকে রিয়াদ: যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমারেখা টেনে দেয় ইসরাইল

ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে দিয়েছে, আর নিজে দর্শকের আসনে বসে মার্কিন করদাতাদের সেই যুদ্ধের খরচ বহন করতে দেখছে। ধারের টাকায় কেনা বোমাগুলো পুড়ছে ছাই হয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, বেনিয়ামিনের নেতানিয়াহু উসকানিতে যুদ্ধে পা দেওয়ার আগে যে প্রণালীটি পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল, তা পুনরায় চালুর অজুহাতে পেট্রোল পাম্পে পেট্রোলের দাম এবং মূল্যস্ফীতির চাপে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চলে যাচ্ছে। এখন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিরাপদ দূরত্বে বসে মার্কিন বাহিনী ও ইরানের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের খেলা দেখে মুচকি হাসছেন—যে যুদ্ধের জন্য তিনি বছরের পর বছর ধরে ওয়াশিংটনকে ঠেলে দিয়েছেন।

এদিকে দেশে মার্কিন সৈনিকদের কফিন এসে পৌঁছাচ্ছে—একটি যুদ্ধের বলি হয়ে, যার সূচনা করেছিল ইসরাইল আর তা বাস্তবায়ন করল মার্কিন সৈন্যরা। অন্যদিকে কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিষয়ক সচিব (প্রতিরক্ষামন্ত্রী) পিট হেগসেথ সিনেটের কাছে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আরো অর্থ বরাদ্দের আবেদন করছেন।

আইনপ্রণেতাদের এমন একটি যুদ্ধের চেক সই করতে বলা হচ্ছে, যা শুরু করার অনুমোদন তারা কখনো দেননি; যে যুদ্ধের লক্ষ্য ওয়াশিংটন নির্ধারণ করেনি এবং যার সমাপ্তি কখন বা কীভাবে হবে—তার কোনো হিসাবও কারো জানা নেই।

অন্যদিকে দখলকৃত ফিলিস্তিনে ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ এক আবাসন সম্মেলনে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘ইসরাইলের এই অভিযানে যোগ দেওয়ার কোনো আগ্রহ নেই... ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই সীমাবদ্ধ সংঘাতটিই [পরিস্থিতি] আমাদের [ইসরাইলের] জন্য সবচেয়ে সঠিক ও লাভজনক।” সহজ ভাষায় বললে, আসুন আমরা বসে বসে দেখি আমেরিকানরা মরছে এবং আমাদের যুদ্ধের জন্য মূল্য দিচ্ছে।

সংগত প্রমাণ, যুক্তরাষ্ট্র যখন এই অঞ্চলজুড়ে নিজের সামরিক ঘাঁটিগুলো রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ শেষ করে ফেলছে, তখন ইসরাইল তাদের নিজস্ব ইন্টারসেপ্টরগুলো জমিয়ে রাখছে। ইসরাইল তাদের মজুদ খরচ করছে না। তারা সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছে যখন আমেরিকানদের ভাঁড়ার শূন্য হয়ে যাবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। আর ঠিক তখনই, ইসরাইলি ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হবে এক বহুমূল্য অস্ত্র—যা তারা বিশাল মূল্যের বিনিময়ে ইউএই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) এবং বাকি উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বিক্রি করবে।

গত রোববার ‘ফক্স নিউজ’-এ সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় নেতানিয়াহু আমেরিকার সামনে ইরান যুদ্ধের লক্ষ্যসমূহ তুলে ধরেন। একজন বিদেশি প্রধানমন্ত্রী আমেরিকান প্রচারমাধ্যমে এসে কার্যত একটি মার্কিন যুদ্ধের শর্ত ও শেষ মুহূর্তের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন—যে যুদ্ধ মার্কিন পাইলটরা লড়ছেন, মার্কিন করদাতারা অর্থায়ন করছেন এবং এখন দৃশ্যত তা ইসরাইলের ইচ্ছাতেই সমাপ্ত হবে। ট্রাম্প যাই চুক্তি করেন বা ওয়াশিংটন যাই সিদ্ধান্ত নিক না কেন, নেতানিয়াহু আগেই আমেরিকাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে সেগুলোর কোনো মূল্য নেই। তিনি ইসরাইলের শর্তে যুদ্ধ শেষ করার জন্য স্রেফ অপেক্ষা করছেন না, বরং তিনি সিদ্ধান্তটি চাপিয়ে দিচ্ছেন।

তবে কেবল আমেরিকার যুদ্ধ নীতিই নয়, কূটনীতি এবং বাণিজ্যও তেল আবিবের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। ওয়াশিংটন যখন সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করল এবং উভয় সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর চুক্তির কালি শুকানোর আগেই—একদিনের মাথায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে এলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন, চুক্তিটি বাস্তবায়নের আগে সৌদি আরবকে অবশ্যই ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে।

ওয়াশিংটনের নীতি তারা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, তা নিয়ে ইসরাইলি কর্মকর্তারা কোনো কূটনৈতিক রাখঢাকও করেন না। ট্রাম্প নতুন শর্ত যোগ করার আগেই ইসরাইলের সংস্কৃতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী মিকি জোহর ‘আর্মি রেডিও’-কে বলেছিলেন, ‘ইসরাইল তার রেড লাইনগুলো সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্পষ্ট। এ এমন এক সরকারের কথা, যারা বোঝে যে তাদের হাতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা আছে, তারা রেড লাইন নির্ধারণ করে এবং আমেরিকা তাদের কথা শোনে।

‘ইসরাইল আমেরিকার কাছে তাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমার বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। এগুলো এমন এক সরকারের বক্তব্য, যারা ভালো করেই জানে যে নীতি ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা তাদের হাতেই রয়েছে এবং তারা নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে দিলে আমেরিকা তা মেনে চলে।

একটু ভেবে দেখুন, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ, অর্থাৎ উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি দেশের সঙ্গে আমেরিকার একটি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত চুক্তি নিয়ে একজন ইসরায়েলি মন্ত্রী প্রকাশ্যে রেড লাইনের কথা বলছেন। এই কাঠামোটি ওয়াশিংটন কয়েক দশক ধরে গড়ে তুলেছে। সৌদি চুক্তিটি যে আমেরিকার জ্বালানি ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করে, তাতে কিছু যায় আসেনি। গুরুত্বপূর্ণ ছিল শুধু এই যে, তেল আবিব তখনও এতে স্বাক্ষর করেনি।

মূল প্রশ্ন এটি নয় যে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ কৌশল নির্ধারণের চেষ্টা করছে কি না, কিংবা তাদের নেতারা ওয়াশিংটনের জন্য কোনো সীমা বা শর্ত নির্ধারণ করছে কি না। আসল প্রশ্ন হলো—আমেরিকার সমস্ত রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা কেন বিশ্ব ক্ষমতার একমাত্র পরাশক্তি হয়েও একটি কৌশলগতভাবে নগণ্য দেশকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির ওপর এমন অসামান্য প্রভাব খাটাতে দিচ্ছেন?

ইসরাইলি ‘রেড লাইন’-এর কারণেই আমেরিকার ‘ইসরাইল-ফার্স্টপন্থী আনুগত্যকারীরা হঠাৎ করে আবিষ্কার করলেন যে এই চুক্তিটি নাকি পারমাণবিক অস্ত্র প্রসারের ঝুঁকি তৈরি করবে! বহু দশক ধরে তারা ইসরাইলের অঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রাগারকে সমর্থন জুগিয়ে এসেছে, ক্ষমা করেছে বা উপেক্ষা করেছে।

অথচ একটি বেসামরিক সৌদি পারমাণবিক কর্মসূচির সম্ভাবনাই তাদের মনে নৈতিক ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। কারণ আসল বিষয়টি কখনোই পারমাণবিক সংঘাত রোধ ছিল না, ছিল কৌশলী ধারাবাহিকতা বা 'সিকোয়েন্সিং'। সৌদি আরব ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরদিনই তারা সেই বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচকে বৈধ' বা 'হালাল' বলে মেনে নিতে রাজি হতো, কিন্তু তার আগে নয়। অথচ সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির সম্ভাবনা হঠাৎ করেই নৈতিক ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। বিষয়টি কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা ছিল না। এটি ছিল পর্যায়ক্রমের বিষয়। সৌদি আরব ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরের দিনই তারা একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিকে বৈধতা দিতে রাজি হবে, তার আগে নয়।

আরব বিশ্বের রাজধানীগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন একটি সম্পর্ক চায় যা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে, তবে তাদের সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতাকে ‘ক্ষমতা’ বা ‘প্রভাব’ বলে ভুল করা বন্ধ করতে হবে। বহু বছর ধরে তাদের কৌশল ছিল অর্থ দিয়ে ক্ষমতা কেনা—জারার্ড কুশনারের মতো শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারীদের পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢেলে তাকে ওভাল অফিসের গোপন দরজা হিসেবে ব্যবহার করা।

কিন্তু কুশনার কোনো নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী নন। তিনি ইসরাইল-প্রথম নীতির একজন প্রবক্তা, যিনি হোয়াইট হাউস-পরবর্তী সময়ে আরব পুঁজির ওপর ভিত্তি করে নিজের সম্পদ গড়ে তুলেছেন এবং ইসরায়েলের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্য নীতি নির্ধারণ করেছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এই নির্মম বাস্তবতার শিকার। কুশনার আবুধাবিকে ‘আব্রাহিম আকর্ডস’ -এ রাজি করিয়েছিলেন একটি প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে—ইসরাইলকে সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলে, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত আমেরিকান যুদ্ধবিমান—২৩ বিলিয়ন ডলারে পঞ্চাশটি এফ-৩৫—পাওয়া যাবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সঙ্গে সঙ্গেই তাদের অংশটুকু দিয়ে দেয়—স্বীকৃতি, দূতাবাস, উন্মুক্ত আকাশসীমা। ওয়াশিংটন ইসরাইলকে সেই চুক্তির প্রতিটি সুবিধাই দিয়েছে। কিন্তু সেই যুদ্ধবিমানগুলো কখনোই আসেনি। বছরের পর বছর ধরে ‘প্রযুক্তিগত প্রয়োজনীয়তা’, আটকে থাকা পর্যালোচনা এবং নীরবে চুক্তি পরিবর্তনের পর অবশেষে তা এসেছে।

ট্রাম্প সৌদি আরবকে একটি বাণিজ্যিক চুক্তির প্রতিশ্রুতি বিক্রি করতে চান, কিন্তু ইসরাইলকে দিতে চান তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি। আরব গাভীটিকে পুঁজি, বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক সদিচ্ছার জন্য দোহন করা হয়, এবং যখন প্রতিদান দেওয়ার মুহূর্ত আসে, তখন তার বদলে ইসরায়েলের বেদীতে তা নিবেদন করা হয়। কুশনারকে তোষামোদ করতে ব্যয় করা প্রতিটি ডলার, সরল বিশ্বাসে দেওয়া প্রতিটি ছাড়, প্রবেশাধিকার নয় বরং তার একটি বিভ্রম কিনেছে, যা আদায় করার জন্য কখনোই যথেষ্ট নয়।

আরব শাসকগোষ্ঠীগুলোকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, কুশনারের মতো ইসরাইল-ফার্স্টপন্থী অনুগতদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রবেশাধিকার কেনা, কিংবা তেল আবিবে পরিকল্পিত যুদ্ধ পরিচালনার জন্য আমেরিকান ঘাঁটিগুলোকে আশ্রয় দেওয়া—কোনোটিই মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন আনবে না। কারণ ইসরাইল যতদিন পর্যন্ত তাদের ওপর এমন লবিং ক্ষমতা বজায় রাখবে, মার্কিন নেতারা তাদের টেনে দেওয়া ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করার সাহস কোনোদিনই পাবে না।

সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

তেহরান থেকে রিয়াদ: যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমারেখা টেনে দেয় ইসরাইল
ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠক। ছবি: সংগৃহীত।