ইয়েমেনে ফের যুদ্ধ, সানা ও লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণে নতুন লড়াই

ইয়েমেনে আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে যুদ্ধ। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর দেশটিতে এখন সবচেয়ে বড় ধরনের সংঘাতের মুখোমুখি হচ্ছে হুতিরা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার।

চলতি সপ্তাহে হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। তায়েজ, আল-বায়দা ও আল-জাওফ প্রদেশে লড়াই তীব্র হয়েছে। আল-জাওফকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজধানী সানার অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে দেখা হয়।

অন্যদিকে হুতিরা দাবি করেছে, তারা সরকারি বাহিনীর কয়েকটি অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবেও হামলা চালিয়েছে তারা। সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করছে।

সংঘাতের নতুন এই পর্যায়ে ইয়েমেন সরকার হুতিদের কাছ থেকে রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য নিয়েছে। একই সময়ে দুপক্ষই বাব আল-মানদাব প্রণালির আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মানদাব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার পর এই নৌপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ২০২৩ সাল থেকে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছে হুতিরা।

বিশ্লেষকদের মতে, আগের তুলনায় এবার ইয়েমেন সরকারের সমর্থক বাহিনী বেশি সংগঠিত ও শক্তিশালী। তবে দ্রুত জয় পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ইয়েমেনি-আমেরিকান বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা মনে করেন, এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।

চলতি বছরের শুরুতে দক্ষিণ ইয়েমেনের কিছু এলাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের কাছ থেকে পুনর্দখল করে সরকারি বাহিনী। এরপর সরকারবিরোধী বিভিন্ন বাহিনীকে একটি সামরিক কাঠামোর অধীনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য হুতিদের মোকাবিলা করা।

তবে হুতিরা এখনও শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে টিকে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারা পিছু হটলে উত্তরাঞ্চলের সাদা, হাজ্জাহ, সানা ও আশপাশের এলাকায় ঘাঁটি গেড়ে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালাতে পারে।

ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতও ইয়েমেনের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক সংঘাতের সুযোগ নিয়ে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার হুতিদের বিরুদ্ধে বড় অভিযান চালানোর সুযোগ পেয়েছে।

সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালেদ বাতারফির মতে, হুতিরা এখন শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই। তারা লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

সম্প্রতি সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে হুতিদের হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছে। হামলায় দেশটির কয়েকটি তেল ও জ্বালানি স্থাপনাতেও আগুন লাগে। এতে ইয়েমেনের সংঘাত আবারও সরাসরি সৌদি-হুতি নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইয়েমেনের সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বাব আল-মানদাব প্রণালি। সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্যও এই নৌপথের গুরুত্ব বেড়েছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধের কারণে।

হরমুজ ও বাব আল-মানদাব—দুটি নৌপথ একই সময়ে গুরুতরভাবে বিঘ্নিত হলে এর প্রভাব ইয়েমেন বা সৌদি আরবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, সামনে ইয়েমেনে আরও বড় পরিসরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সরকারি বাহিনী আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও হুতিদের দ্রুত পরাজিত করার সম্ভাবনা কম। বরং ইয়েমেন আবারও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

সূত্র: আলজাজিরা

হুতি যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে সৌদি-সমর্থিত ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের হামলা। ছবি: এএফপি
হুতি যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে সৌদি-সমর্থিত ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের হামলা। ছবি: এএফপি