খারগ দ্বীপ দখলের জুয়া আমেরিকার জন্য বুমেরাং হবে by জানুস টি এইচ সিয়ান
হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানি বাহিনীর হাতে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়। এর পরপরই উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। জবাবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের রাডার, যোগাযোগ ও বিমান প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। তেহরানও বসে থাকেনি। তারা জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা পাঁচটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানে। এর মধ্যে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরও রয়েছে।
সহিংসতার এই চক্রের মধ্যেই বড় বাজি ধরেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী চরম শক্তি প্রয়োগ করে ইরানে হামলা চালিয়ে তারা ইরানের তেল ও গ্যাসশিল্পের নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং খারগ দ্বীপ দখল করবে।
ট্রাম্প স্পষ্ট করেই এই পরিকল্পনার তুলনা করেছেন চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় চালানো অপারেশনের সঙ্গে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর ভেনেজুয়েলার তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল ওয়াশিংটন।
খারগ দ্বীপ দখলের এই হুমকি ওয়াশিংটনের গভীর হতাশার বহিঃপ্রকাশ। তাদের সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতা উদ্যোগ থমকে গেছে। কোনো পক্ষই নিজেদের দাবি থেকে সরতে রাজি নয়।
প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের নীতি হচ্ছে ‘বোমা নিয়ে আলোচনা’। হোয়াইট হাউস এখন এই নীতিতেই চলছে। তারা তেহরানকে সমঝোতায় বাধ্য করতে সর্বোচ্চ চাপ তৈরি করছে। অবশ্য পরে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কিছুটা ভিন্ন সুর ধরেন। তিনি জানান, ইরান হরমুজ প্রণালি খোলা রাখলে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা করবে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে খারগ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা এখনো পেন্টাগনের টেবিলে রয়েছে।
ভূ-কৌশলগত দিক থেকে খারগ দ্বীপ পারস্য উপসাগরের সাধারণ কোনো দ্বীপ নয়। পারস্য উপসাগরের উত্তরে মাত্র ২২ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপটি ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। এই সংকটের আগে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশই হতো এই দ্বীপ দিয়ে। প্রতিদিন এখান থেকে প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল জাহাজে তোলা হতো।
ইরানের মূল ভূখণ্ডের উপকূলভাগ বেশ অগভীর। ফলে সেখানে বড় বড় তেলবাহী জাহাজ (ভিএলসিসি) ভিড়তে পারে না। খারগ দ্বীপের গভীর সমুদ্রবন্দরই বিশ্ববাজারে তেল পাঠানোর একমাত্র পথ। বিশেষ করে চীনের বাজারে তেল পাঠানোর জন্য এটি অপরিহার্য। এই দ্বীপটি না থাকলে তেহরান তাৎক্ষণিকভাবে বড় অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে। কারণ, সরকারের মোট খরচের প্রায় অর্ধেকই আসে এই তেলের রাজস্ব থেকে।
সামরিক হিসাব-নিকাশ
পেন্টাগন অবশ্য খারগ দ্বীপ দখলের জন্য মূল ভূখণ্ডে বড় কোনো অভিযানের কথা ভাবছে না। সেন্টকম সীমিত আকারে উভচর হামলা ও নিখুঁত বিমান হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে। এই অভিযান কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে। পারস্য উপসাগরে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে খারগ দ্বীপ দখল করা যত সহজ, ধরে রাখা ততটাই কঠিন। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দ্বীপে অবস্থান নেওয়া মার্কিন সেনারা সরাসরি ইরানের হামলার আওতায় থাকবে।
খারগ দ্বীপটি ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ২১ মাইল (৩৩ কিলোমিটার) দূরে। এত কম দূরত্বের কারণে দ্বীপে থাকা প্রতিটি মার্কিন সেনা, রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চরম ঝুঁকিতে থাকবে। ইরান সহজেই তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে কামান, রকেট, ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সেখানে হামলা চালাতে পারবে।
ভূপ্রকৃতিও মার্কিন বাহিনীর জন্য একটি বড় বাধা। বুশেহরের পাহাড়ি উপকূলের কারণে ইরানি বাহিনী প্রাকৃতিক সুবিধা পাবে। ফলে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো সময়মতো আগাম ক্ষেপণাস্ত্রের খোঁজ পাবে না।
রসদ সরবরাহ করাও হবে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো খারগ দ্বীপ থেকে ১০০ নটিক্যাল মাইলেরও বেশি দূরে। প্রতিটি রসদবাহী জাহাজকে সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক জলপথ পাড়ি দিতে হবে। ফলে সরবরাহ জাহাজের পাহারায় মার্কিন নৌবাহিনীকে বাড়তি যুদ্ধজাহাজ খাটাতে হবে। অর্থাৎ খারগ দ্বীপ কোনো কৌশলগত সম্পদ না হয়ে আমেরিকার জন্য এক বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল
এমন হুমকির মুখে ইরান হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। খারগ দ্বীপের সুরক্ষায় ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একাধিক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। সাগরে আইআরজিসির ১১২তম জুলফিকার সারফেস কমব্যাট ব্রিগেড রয়েছে। তারা দ্রুতগামী ও ক্ষেপণাস্ত্রবাহী বোটের মাধ্যমে ঝাঁকে ঝাঁকে হামলা চালাতে পারদর্শী।
আকাশ প্রতিরক্ষায় তাদের রয়েছে রাশিয়ার তৈরি এস-৩০০ পিএমইউ-২ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এর পাশাপাশি ড্রোন ও নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে টর-এম১ এবং প্যান্টসির-এস১ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা। তেহরানের কাছে প্রায় ২ থেকে ৬ হাজার উন্নত নৌ-মাইনের মজুত রয়েছে। যুদ্ধের মধ্যে এই মাইনগুলো পরিষ্কার করা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। বিশেষ করে যদি উপকূল থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে অনবরত হামলা চালানো হয়।
ইরানি কর্মকর্তারা খারগ দ্বীপের বাইরেও যুদ্ধের পরিধি বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। প্রবীণ রাজনীতিক ও সংসদ সদস্য মানুচেহর মোত্তাকি সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, মার্কিন বাহিনী দ্বীপের কোনো অংশ দখল করলে ইরানি বিশেষ বাহিনী কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে কমান্ডো হামলা চালাবে। তাদের উদ্দেশ্য হবে মার্কিন সেনাদের জিম্মি করা। অর্থাৎ তেহরান এই আঞ্চলিক লড়াইকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা
খারগ দ্বীপে সামরিক সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়াবে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ১১ জুনের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এটি করোনা মহামারির পর সর্বনিম্ন। জ্বালানি বাজারে ইতিমধ্যে এর প্রভাব পড়েছে। ২০২৬ সালে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি গড়ে ৯৪ ডলার হতে পারে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি।
খারগ দ্বীপের লড়াইয়ে তেল সরবরাহ আরও বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে যেতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। আরেকটি বড় ধাক্কা আসবে সারের বাজারে। পারস্য উপসাগর থেকে সালফার ও অ্যামোনিয়া সরবরাহ বন্ধ হলে সারের দাম ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৩ শতাংশে নামবে।
তবে ওয়াশিংটনের হিসাবের মধ্যে একটি বড় গলদ রয়েছে। ট্রাম্প ভাবছেন খারগ দ্বীপ দখল করলে ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে এবং তারা আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত ১৩ এপ্রিল থেকে চলা মার্কিন কঠোর নৌ-অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি এমনিতেই প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। খারগ দ্বীপের কাছে ২০টিরও বেশি তেলবাহী জাহাজ আটকে আছে। তারা এশিয়ায় তেল পাঠাতে পারছে না। অর্থনৈতিকভাবে ইরান এখন তেল রাজস্ব ছাড়াই জরুরি অবস্থার মধ্যে চলছে।
তাই খারগ দ্বীপ দখল করলেও ইরানের ওপর নতুন করে কোনো অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে না। উল্টো এটি ইরানি জাতীয়তাবাদকে উসকে দেবে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যপন্থী সরকার এবং আইআরজিসির কট্টরপন্থী নেতৃত্ব—উভয় পক্ষই স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা আত্মসমর্পণের চেয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই বেশি পছন্দ করে।
ভেনেজুয়েলার মতো দ্রুত কোনো রাজনৈতিক সমাধান ওয়াশিংটন এখানে পাবে না। উল্টো আমেরিকা এক দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যার কোনো শেষ নেই। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করবে, জ্বালানি বাজার ধ্বংস করবে এবং বিশ্বকে মন্দার দিকে ঠেলে দেবে। সংক্ষেপে বলা যায়, খারগ দ্বীপ কোনো ভেনেজুয়েলা নয়।
* জানুস টি এইচ সিয়ান, ইন্দোনেশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত।
![]() |
| ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ খারগ দ্বীপ। ছবি : রয়টার্স |

No comments