Sunday, March 29, 2026
বাজারে নকল ও মানহীন কনডম, জনস্বাস্থ্য হুমকিতে by পার্থ শঙ্কর সাহা
বাজারে নকল ও মানহীন কনডম, জনস্বাস্থ্য হুমকিতে by পার্থ শঙ্কর সাহা
দোকানি যে কনডমটি বেচলেন, এর গায়ের নাম ‘ম্যান লাভ’। কিন্তু প্যাকেটের ভেতরে যে কনডম পাওয়া গেল, তার মোড়কে নাম লেখা ‘এক্সপ্রেশন’। দোকানিকে বিষয়টি দেখানোর পর তিনি বললেন, ‘এসব দেহি না ভাই। কুন নামে আছে হেইটা কে দেহে। জিনিস তো আছেই।’
দোকানি জানান, স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী কিছুদিন পরপর নানা ব্র্যান্ডের কনডম দিয়ে যায়। বাজারে প্রচলিত ভালো কোম্পানির চেয়ে এগুলোর দাম অনেক কম। তাই এগুলোর বিক্রিও ভালো। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে এসবের চাহিদা প্রবল।দেশের বাজার এখন এ রকম মানহীন ও নকল কনডমে ভরে গেছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ ও যৌনরোগ থেকে নিরাপদ থাকতেই মূলত কনডমের ব্যবহার হয়। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমোদনহীন এসব কনডমে ‘মাইক্রোলিকেজ’ বা অতিক্ষুদ্র ছিদ্র থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। আর তা যদি থাকে তবে কনডম ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। এ ধরনের কনডম ব্যবহারের ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ যেমন হতে পারে, তেমনি যৌনবাহিত রোগ হওয়ারও আশঙ্কা আছে।
যৌনসংক্রামিত রোগ, যেমন সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া, জেনিটাল হার্পিস, জেনিটাল ওয়ার্টস (এইচপিভি), হেপাটাইটিস বি ও সি ইত্যাদি রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের কারণ আছে। আর সে ক্ষেত্রে এ ধরনের কনডমের ব্যবহারও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কনডমের মান
কনডম একধরনের মেডিক্যাল ডিভাইস হিসেবে চিহ্নিত। তাই অন্য যেকোনো ওষুধের অনুমোদনের মতোই এরও অনুমোদন দেয় সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ)। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. আকতার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অনুমোদিত কনডমের সংখ্যা কমে-বাড়ে। তবে এখন ২৬ কোম্পানির ৫৭টি ব্র্যান্ডের কনডম এখন চালু আছে। এর বাইরের অন্য কোনো কনডমের অনুমোদন নেই।
আকতার হোসেন জানান, অনুমোদিত কনডমগুলোর মধ্যে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির (এসএমসি) যে আট ধরনের ব্র্যান্ড আছে, সেগুলোই বেশি চলে।
অনুমোদনহীন ব্র্যান্ডে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। সরকারি তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে দেশের বাজারে পাওয়া যায় প্রায় ১৯০টি ব্র্যান্ডের কনডম। সরকারের তথ্য মেনে নিলে, অন্তত ১৪০টিই অনুমোদনহীন। অর্থাৎ এসব কনডমের কোনোটির পরীক্ষাও হয়নি, ডিজিডিএর অনুমোদন পায়নি।
আকতার হোসেন বলেন , কোনো কনডম দেশের বাজারে অনুমোদনের আগে সেগুলো তাঁদের অধিদপ্তরের পরীক্ষার জন্য জমা দিতে হয়। যে দেশ থেকে আনা হচ্ছে, সেসব দেশের ‘ফ্রি সেল সার্টিফিকেট’ দিতে হয়। অধিদপ্তরের ল্যাবে এসব পরীক্ষা করা হয়। তারপর অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদনহীন কনডমের বিস্তার পর্যটন ও প্রত্যন্ত এলাকায়
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব নকল ও মানহীন কনডমের বিস্তার বেশি প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সীমান্ত এলাকায়। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজারের সীমান্তঘেঁষা এলাকা এসব পণ্য সহজলভ্য।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় সৈকতের কাছাকাছি এক মার্কেটের দোকানি বলছিলেন, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ভরা পর্যটনের মৌসুমে তাঁর দোকানসহ বিভিন্ন দোকানে কনডমের বিক্রি বেশি হয়। ওই দোকানির কথা, পরিচিত ব্র্যান্ডের বাইরে নানা ব্র্যান্ডের বিক্রি হয় তাঁর দোকানে। কম দামি ব্র্যান্ডের চাহিদাও আছে। অনেকেই মানের চেয়ে দামের দিকে বেশি দৃষ্টি দেয়। কম দামের কনডমগুলোতে লাভ বেশি থাকায় তাঁরা এসব বিক্রি করতে উৎসাহিত বোধ করেন। আবার সেগুলোর চাহিদাও আছে বলে জানান এই দোকানি।
কক্সবাজার শহরের এক ওষুধ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছিলেন, অল্প দামের কনডম শুধু দেশের মধ্যেই নয়, সীমান্ত পার হয়ে মিয়ানমারেও যায়। ওই সব দেশে বাংলাদেশের কনডমের চাহিদা আছে। ব্যবসায়ীর কথা, পর্যটনে এলে মানুষ মানের বাছবিচার কম করে।
যে দুই ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয়, তাঁরা কেউ নিশ্চিত নন—অনুমোদনহীন কনডমের কোনো ঝুঁকি থাকতে পারে। দেশের বাজারে যেহেতু বিক্রি হচ্ছে, তাই সেগুলোর মান ভালো বলেই মনে করেন তাঁরা।
তবে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরও গত বছর রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ অনুমোদনহীন কনডম উদ্ধার করে বলে জানান পরিচালক আকতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাজারে এগুলো আছে। কিন্তু সব সময় আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি না। এসব নিয়ে গণমাধ্যমও সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে।’
অনুমোদনহীন, নিম্নমানের কনডম কীভাবে বাজারে ছড়ায়
একাধিক ব্যবসায়ী জানান, অনেক ব্যবসায়ী চীনসহ কিছু দেশ থেকে পুরোনো বা মেয়াদোত্তীর্ণ ল্যাটেক্স বা রাবার দিয়ে তৈরি এসব মানহীন কনডম স্বল্প দামে কিনে নিয়ে এসে দেশেই মোড়কজাত করে দেশের বাজারে ছেড়ে দিচ্ছেন।
সেগুলোতে মাইক্রোলিকেজ থাকতে পারে, এখানে প্রয়োজনীয় লুব্রিকেন্ট কম থাকতে পারে, আবার রাবারের মানও নিম্ন হয় সাধারণত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোলিকেজ হলো কনডমের খুব সূক্ষ্ম ছিদ্র বা দুর্বল অংশ, যেখান দিয়ে ভাইরাস ও শুক্রাণু সহজেই প্রবেশ করতে পারে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সমরেশ চন্দ্র হাজরা প্রথম আলোকে বলেন, মানহীন ও ত্রুটিপূর্ণ কনডমে মাইক্রোলিকেজ থাকতেই পারে। তিনি আরও বলেন, এর ফলে এইচআইভি ও অন্যান্য যৌন সংক্রমিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ব্যবহারকারীর মধ্যে কনডমের প্রতি আস্থা কমে যায়, যা দীর্ঘ মেয়াদে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে।
বাড়ছে যৌন সংক্রমিত রোগের সংখ্যা
দেশে এইচআইভির সংক্রমণ বেড়েছে গত ২০২৫ সালে। সে বছর ১ হাজার ৮১৯ জন নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হন। আগের বছর ২০২৪ সালে এইচআইভি শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৮। শুধু এইচআইভি নয়, এসটিডির (যৌনসংক্রমিত রোগ) প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে।
এশিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল প্রিন্সিপ্যালস অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেশে যৌনবাহিত রোগ বৃদ্ধির চিত্র উঠে আসে। ‘প্রিভিলেন্স, ট্রেন্ডস অ্যান্ড সোশিওডেমোগ্রাফিত ডিটারমিন্যান্টস অব সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেডে ডিজিসেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণা হয় খুলনা বিভাগের দুই হাজারের বেশি মানুষের ওপর। গবেষণাপত্রে বলা হয়, ‘গনোরিয়া ও ক্ল্যামাইডিয়ার সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এসব সংক্রমণ মোকাবিলায় লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।’
হাসপাতালে রোগী ভর্তি এবং প্রাইভেট প্র্যাকটিসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ঢাকা মেডিক্যালের সহযোগী অধ্যাপক সমরেশ চন্দ্র হাজরা বলেন, যৌন সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বিশেষ করে সিফিলিসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এর দুটো দিক হতে পারে, হয়তো আগের চেয়ে মানুষ এখন বেশি করে আসছে। আবার সামাজিক নানা পরিবর্তন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন ও সুরক্ষাসামগ্রীর সমস্যার কারণেও হতে পারে।
![]() |
| প্রতীকী ছবি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1428)
-
▼
March
(202)
-
▼
Mar 29
(6)
- জাতিসংঘের পাল্টা ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদ’ কি নতুন ...
- নামের আগে ‘ডক্টর’ লাগাতে মরিয়া কেন তাঁরা by ইমদাদু...
- প্রতিদিন কয়টি ফল খাওয়া ভালো? by ফাহমিদা মাহমুদ
- বাজারে নকল ও মানহীন কনডম, জনস্বাস্থ্য হুমকিতে by প...
- দ্রুত গতিতে সাবমেরিন নির্মাণ করছে চীন, দুশ্চিন্তায়...
- মঙ্গল গ্রহে যেখানে মানুষ অবতরণ করতে পারে
-
▼
Mar 29
(6)
-
▼
March
(202)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment