Thursday, February 12, 2026
ভোটের লাইন, সেদিনের–এদিনের by সারফুদ্দিন আহমেদ
ভোটের লাইন, সেদিনের–এদিনের by সারফুদ্দিন আহমেদ
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখলে মনে হয় না তাঁরা কোনো নাটকের চরিত্র। তাঁরা খুব সাধারণ—কারও হাতে মোবাইল, কারও কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, কারও চোখে সকালের অন্যমনস্কতা। কেউ তরুণ, কেউ যুবক, কেউ মাঝবয়সী।
কারও মুখে উত্তেজনার রং নেই। বরং আছে এক ধরনের প্রশান্তি—যেন তাঁরা জানেন, আজকের কাজটি খুব বড় নয়, অথচ খুব গভীর।
কেন্দ্রের সামনে দিয়ে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি ধীর গতিতে চলে গেল। গাড়ির শব্দও যেন চাপা। চারপাশে কোনো হাউকাউ নেই। ভোটের সকাল যেন এক ধরনের ধ্যানমগ্নতা ধারণ করেছে।
এই লাইনটির দিকে আমার দৃষ্টি আটকে ছিল অন্য কারণে। কারণ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি, প্রায় একই সময়ে, একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি আরেকটি লাইন দেখেছিলাম। দৈর্ঘ্যে প্রায় একই। বাহ্যিকভাবে একই রকম সুশৃঙ্খল। কিন্তু ভেতরে-ভেতরে সম্পূর্ণ আলাদা।
সেদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলো ছিল বেশির ভাগই তরুণ। চেহারায় ছিল এক ধরনের প্রস্তুতি, কিন্তু তা ভোটারের নয়—ডিউটির। যেন তাঁরা এসেছেন উপস্থিত থাকার দায়িত্ব নিয়ে। লাইন থাকবে, লাইন শেষ হবে না—এই দায়বদ্ধতা নিয়ে।
সেদিন লাইনের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক পরিচিতজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ভোট দিবেন?’
তিনি বলেছিলেন, ‘হ, দিমু।’
বলেছিলাম, ‘ভোটার তো বেশি দেখছি না।’
তিনি একটু হেসে বলেছিলেন, ‘অহনও আসে নাই, তয় আইসা পড়ব।’
আমি সরে যাচ্ছিলাম। তিনি কানে কানে বলেছিলেন, ‘ভোটার তো আসবে না, বোঝেন না! আমরা আছি কয়জন, কারণ আমাগো থাকতে অইবো। লাইন থাকব। লাইন শেষ হইবো না।’
সেদিন লাইন ছিল, কিন্তু ভোটার ছিল না। উপস্থিতি ছিল, কিন্তু অংশগ্রহণ ছিল না। এক ধরনের অনুকরণ ছিল, অথচ তার ভেতরে প্রাণ ছিল না।
আজকের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলোতে প্রাণ আছে। এখানে কেউ ‘লাইন রক্ষা’ করতে আসেননি; প্রত্যেকে নিজের একটি চিহ্ন রাখতে এসেছেন।
মানুষ যখন ভোটকেন্দ্রে দাঁড়ায়, তখন সে কেবল একটি প্রতীকে সিল দেয় না; সে নিজের অস্তিত্বে সিল দেয়।
কদমতলা পূর্ব বাসাবো স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র, খিলগাঁওয়ের তালতলা প্রাইম স্কুল অ্যান্ড কলেজ—একই ছবি। ছোট ছোট লাইন, স্বল্প সময়ের অপেক্ষা, কোনো উত্তেজনা নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এজেন্টরা পাশাপাশি বসে আছেন। চোখে সন্দেহের আগুন নয়, বরং সতর্কতার সংযম।
পাশের ঢাকা-৮ আসনকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হচ্ছিল। মির্জা আব্বাস ও নাসির উদ্দিন পাটোয়ারির তীব্র ভাষণের রেশ তখনো তাজা। কিন্তু শাহজাহানপুরের কয়েকটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখি, ধানের শিষ ও অন্য প্রতীকের অফিস পাশাপাশি। যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, শত্রুতা নেই।
একজন মাঝবয়সী রিকশাওয়ালা আমাকে কেন্দ্রগুলো ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার ভোট কোথায়?’
বললেন, ‘ঢাকায়। বেলা বারোটার পর দিমু।’
বললাম, ‘পরিবেশ কেমন লাগছে?’
তিনি হেসে বললেন, ‘খুব আনন্দ হচ্ছে মামা। বহুতদিন পর ভোট দিবার পারতাছি। মারাত্মক আনন্দ হচ্ছে।’
এই ‘আনন্দ’ শব্দটির ভেতরেই রাজনীতির গভীরতম দর্শন লুকিয়ে আছে। মানুষ যখন বলে, ‘আমি ভোট দিতে পারছি’—তখন সে কেবল নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করছে না; সে নিজের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
মানুষ মাত্রই রাজনীতিবিদ—এই কথাটি আমরা প্রায়শই তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলি। কিন্তু এর ভেতরে এক গভীর সত্য আছে। মানুষ যখন বাজারে দাম নিয়ে দর-কষাকষি করে, যখন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে, যখন রাস্তার নিরাপত্তা নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়—তখন সে রাজনীতির ভেতরেই থাকে। আসলে রাজনীতি কেবল সংসদ ভবনের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার ভাষা।
ভোটার মাত্রই রাজনীতিবিদ—কারণ ভোট দেওয়ার মুহূর্তে সে রাষ্ট্রের সহ-নির্মাতা হয়ে ওঠে। সে সিদ্ধান্ত নেয়, কোন পথে তার সমাজ হাঁটবে। সে তার নীরবতার মধ্যেও একটি উচ্চারণ রেখে যেতে চায়।
সবুজ কানন এলাকার বিখ্যাত খলিল মিয়ার চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। খলিল ভাইকে বললাম, ‘কোনো ক্যান্ডিডেটের লোক নাই যে ভোটাররে ফাউ চা খাওয়াবে?’
খলিল ভাই হেসে বললেন, ‘না, সে চান্স নাই। আসেন, আমি আপনারে মাগনা চা খাওয়াই।’
চায়ের কাপে ভাসছিল ভোটের সকালের স্বপ্ন। স্থানীয় ভোটার ইলিয়াস হোসেন বললেন, ‘এখন পর্যন্ত যেভাবে ভোট হচ্ছে, তাকে সুষ্ঠু ভোট বলা যায়। আমি কোনো হইচই ছাড়াই ভোট দিতে পেরেছি—এটা আমাকে আনন্দ দিয়েছে।’
‘আনন্দ’—আবারও সেই শব্দ।
রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মানুষের চাওয়ার তালিকা দীর্ঘ হতে পারে। কিন্তু অন্তত একটি জিনিস সে চায়—তার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হোক। তার উপস্থিতি যেন কৃত্রিম না হয়।
সেদিনের লাইন ছিল একটি প্রহসনের প্রতীক। আজকের লাইনটি, ছোট হলেও, এক ধরনের প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত।
গণতন্ত্র কখনো হঠাৎ করে জন্ম নেয় না; এটি ধীরে ধীরে মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়। আর সেই অভ্যাসের সূচনা হয় এমনই এক সকালে—যখন মানুষ নিঃশব্দে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, উত্তেজনা ছাড়া, ভয় ছাড়া, অভিনয় ছাড়া।
সকালের সেই ছোট্ট লাইনটি তাই কেবল ভোটের লাইন নয়। এটি মানুষের নিজের কাছে ফিরে আসার লাইন।
* সারফুদ্দিন আহমেদ, প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক।
- ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com
![]() |
| আজকের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলোতে সেই প্রাণ আছে। এখানে কেউ ‘লাইন রক্ষা’ করতে আসেননি; প্রত্যেকে নিজের একটি চিহ্ন রাখতে এসেছেন। ছবি: সারফুদ্দিন আহমেদ |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1427)
-
▼
February
(244)
-
▼
Feb 12
(13)
- এপস্টিন নথিতে গোপন করা ছয় ব্যক্তির নাম প্রকাশ
- মিয়ানমারে নির্বাচন শেষে যে রাজনৈতিক মোড়বদল ঘটছে by...
- মানুষের কাছে ভোট কেন এত বড় উৎসব by মনোজ দে
- ভোটগ্রহণের সময় শেষ, অপেক্ষা গণনার
- ভোটের লাইন, সেদিনের–এদিনের by সারফুদ্দিন আহমেদ
- দিনভর বজায় থাকুক ভোট নিয়ে উদ্দীপনা, ইইউ নির্বাচন প...
- গাজীপুরের শ্রীপুরঃ কেন্দ্রে গিয়ে দেখলেন, ভোট দেওয়া...
- এএফপিকে তারেক রহমান: দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরা...
- নিজের তিন কর্মীকে বিনা দোষে আটকের অভিযোগ রুমিন ফার...
- সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুর দুই মেয়ের সঙ্গেও তাহলে ক...
- যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী হয়...
- যুদ্ধে মারা গেছেন ভেবে মৃতদেহ সৎকার করল পরিবার, দু...
- সবাই সরকারে চলে এলে দেশ চলবে কীভাবে : -ডয়চে ভেলেকে...
-
▼
Feb 12
(13)
-
▼
February
(244)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment