ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রায় নতুন সংকটে যুক্তরাষ্ট্র

রয়টার্সের বিশ্লেষণঃ ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের সপ্তম মাসে নতুন এক সংকটে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইয়েমেনের উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর চাপ তৈরির সক্ষমতা বাড়িয়েছে হুতিরা। শুক্রবার তারা ইয়েমেন ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী ওই প্রণালির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র।

বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে গেলে ইরান আরব উপদ্বীপের দুই পাশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব নিয়ে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে নতুন করে বড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দরগুলো দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি করছে। বাব আল-মান্দেবও হুমকির মুখে পড়ায় সৌদির বিকল্প এই রপ্তানি পথও অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। তার জনপ্রিয়তা রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে নেমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাও ঝুঁকিতে পড়েছে।

কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো স্টিফেন ওয়ার্থেইম রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছিলেন, যাতে সামরিক সংঘাত সীমিত রেখে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করা যায়। কিন্তু হুতিদের অগ্রযাত্রা সেই পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি বেশ কঠিন। হুতিরা বাব আল-মান্দেব বন্ধ করে দিলে জ্বালানির দাম ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন চাপ তৈরি হবে। আবার তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালালে ইরানে ইতোমধ্যে ব্যস্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর আরও চাপ তৈরি হবে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছে তিনটি সূত্র। তবে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না বলে তাকে জানানো হয়েছে। এর পরিবর্তে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করা হবে।

শনিবার ট্রাম্পও নিশ্চিত করেছেন, সৌদি যুবরাজের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। একই সঙ্গে হুতিরাও তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর অনুরোধ করেছে বলে জানান তিনি।

ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাসহ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় অংশীদারদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

ইরানের সঙ্গে যুক্ত হুতিরা বাব আল-মান্দেব বন্ধ করতে সক্ষম হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হতো। বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে আরও প্রায় ৭ শতাংশ বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম সরবরাহ এবং প্রায় ১২ শতাংশ বৈশ্বিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে প্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডেভিড শেনকার রয়টার্সকে বলেন, ইরান যদি হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে বিশ্বের দুটি প্রধান জ্বালানি চোকপয়েন্ট তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এর মাধ্যমে তেহরান বিপুল প্রভাব খাটানোর সুযোগ পাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখন ট্রাম্পের সামনে মূলত দুটি পথ; হুতিদের ঠেকাতে মার্কিন সেনা ও সীমিত আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র ব্যবহার করা, অথবা সৌদি আরব, তার মিত্র এবং দক্ষিণ ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে একাই হুতিদের মোকাবিলা করতে দেওয়া।

হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান শুরু হলে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর বড় ধরনের সম্পদ মোতায়েন করতে হতে পারে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা সক্ষমতাও ব্যবহার করতে হবে, কারণ গত বছরের তুলনায় হুতিদের অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে।

হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানকে সক্রিয় হতে হলে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুতও আরও কমে যেতে পারে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মজুত রয়েছে এবং কৌশলগত সব লক্ষ্য পূরণে সম্পদের ঘাটতি হবে না।

ইয়েমেনে সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত টিম লেন্ডারকিং বলেন, ট্রাম্প সরাসরি সামরিকভাবে হুতিদের বিরুদ্ধে যেতে অনিচ্ছুক হলে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা সহায়তা আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা জোরদার করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন একসময় জানতে চেয়েছিল, ‘ইয়েমেন আমাদের জন্য কী করতে পারে?’ এখন বাস্তবতা হলো, ‘ইয়েমেন আমাদের দিনটাই নষ্ট করে দিতে পারে।’

সূত্র : রয়টার্স

রাইফেল ও আরপিজি লঞ্চার হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি যোদ্ধরা। ছবি: এএফপি
রাইফেল ও আরপিজি লঞ্চার হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি যোদ্ধরা। ছবি: এএফপি