Thursday, April 9, 2026
যুদ্ধে কেউ জেতেনি, হেরেছেন নেতানিয়াহু by পিটার বিউমন্ট
যুদ্ধে কেউ জেতেনি, হেরেছেন নেতানিয়াহু by পিটার বিউমন্ট
নেতানিয়াহু
বছরের পর বছর ধরে ইরানকে হুমকি দিয়ে এসেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নানা
নাটকীয় ভঙ্গি করেছেন, বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের সামনে একের পর এক সন্দেহজনক
নথিপত্র তুলে ধরেছেন। এমনকি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার জন্য একের পর
এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরি করেছেন। কিন্তু দিন শেষে
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের এই সংঘাত পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
ইরানের
শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন ও বিপ্লব নিয়ে ইসরায়েলের করা বিভিন্ন
ভবিষ্যদ্বাণীকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা। এসব
মন্তব্য শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। ইসরায়েলের ধারণা ছিল, এই যুদ্ধ
বড়জোর কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে। কিন্তু তাদের সেই হিসাব ছিল
চরম ভুল।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর তথ্যমতে, এমনকি মাত্র দুই দিন
আগেও ট্রাম্প যাতে যুদ্ধবিরতিতে রাজি না হন, সেই চেষ্টা নেতানিয়াহু
করছিলেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট তেহরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরেই
ট্রাম্প সেই পথ থেকে সরে আসেন। সূত্র বলছে, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়
ইসরায়েলকে পাত্তাই দেননি ট্রাম্প।
ইসরায়েলের প্রধান বিরোধীদলীয়
নেতা ইয়ার লাপিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের পুরো
ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক বিপর্যয় আর কখনো ঘটেনি। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার
মূল বিষয়গুলো নিয়ে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, তখন ইসরায়েল আলোচনার
ধারেকাছেও ছিল না।’
ইয়ার লাপিদ আরও বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে যা করতে
বলা হয়েছিল, তারা তার সবই করেছে এবং জনগণও অসাধারণ সহনশীলতা দেখিয়েছে।
কিন্তু নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি নিজের
নির্ধারণ করা লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জন করতে পারেননি। অহংকার, অবহেলা ও
কৌশলগত পরিকল্পনার অভাবের কারণে নেতানিয়াহু যে ক্ষতি করলেন, তা কাটিয়ে
উঠতে আমাদের বহু বছর লাগবে।’
ইসরায়েলের বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস
পার্টির প্রধান ইয়ার গোলানও যুদ্ধবিরতিকে নেতানিয়াহুর ‘কৌশলগত ব্যর্থতা’
বলেছেন। ইয়ার গোলান এক্সে লিখেছেন, ‘তিনি (নেতানিয়াহু) ঐতিহাসিক বিজয়
এবং আগামী কয়েক প্রজন্মের জন্য নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বাস্তবে
আমরা ইসরায়েলের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ কৌশলগত পরাজয় পেলাম। এটি একটি চরম
ব্যর্থতা, যা আগামী অনেক বছর ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।’
বাস্তবতা
হলো, নেতানিয়াহু এই যুদ্ধে সবকিছু বাজি ধরেছিলেন। কিন্তু তিনি ইরানের
ধর্মভিত্তিক শাসনের পতন ঘটাতে পারেননি, তেহরানের সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের
মজুত দখল করতে পারেননি এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে
কমাতে পারেননি। উল্টো গাজায় জাতিগত হত্যার (জেনোসাইড) অভিযোগে ইসরায়েলের
ভাবমূর্তি সারা বিশ্বে আগেই ক্ষুণ্ন হয়েছিল, এখন তা আরও তলানিতে গিয়ে
ঠেকেছে।
নিরাপত্তার দিক থেকে ট্রাম্পের দাবি যা-ই হোক না কেন,
ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরস (আইআরজিসি) আরও শক্তিশালী হয়েছে।
কারণ, বিশ্বের প্রধান দুই সামরিক শক্তির মাসব্যাপী আক্রমণে টিকে থাকাই ছিল
তেহরানের মূল লক্ষ্য, যা তারা অন্তত আপাতত অর্জন করতে পেরেছে।
এই
হামলার পর ইরানের শাসনব্যবস্থা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা এখনো অটুট আছে
এবং তাদের সামরিক সম্পদও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অবশিষ্ট আছে। তারা এখন
প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজবে এবং দ্রুত নিজেদের সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের
চেষ্টা করবে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেও লেবাননের
দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নেতানিয়াহু। এই
একগুঁয়েমিকে তাঁর চরম দম্ভ বলেই মনে হচ্ছে। ইসরায়েল সেখানে একটি নতুন
নিরাপত্তা অঞ্চল (বাফার জোন) তৈরি করতে চায়। এটা করতে গিয়ে তাদের
স্থলবাহিনী হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করছেন। অথচ নিজেদের
পরিচিত এই এলাকায় লড়াইয়ে হিজবুল্লাহ অত্যন্ত দক্ষ বলে ঐতিহাসিকভাবে
প্রমাণিত।
এই প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে দেখলে, লেবাননে ইসরায়েলের
ভয়াবহ ও আকস্মিক বিমান হামলাগুলোকে স্রেফ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ বলেই মনে হয়।
মনে হয়, ইরানে ব্যর্থ হওয়ার পর তারা এখন লেবাননের সাধারণ মানুষকে
বাস্তুচ্যুত করে ক্ষোভ মেটাচ্ছে।
কূটনীতি ও জনমতের দিক থেকে দেখলে এ
যুদ্ধের পরিণতি নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের জন্য আরও ভয়াবহ হতে পারে।
আমেরিকায় ১৯৬০-এর দশক থেকে চলে আসা ইসরায়েলপন্থী রাজনৈতিক ঐক্যের
ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে সত্য। এখন সেই ঐক্য দৃশ্যত ভেঙে পড়ছে। ট্রাম্পকে
ইরান যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ায় প্রগতিশীল ও কট্টর ডানপন্থী (মাগা) দুই
পক্ষই এখন নেতানিয়াহুর সমালোচনা করছে। এমনকি ইহুদি ভোটারদের মধ্যেও
ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
ইসরায়েলে
নির্বাচনের বছরে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধাক্কা হয়ে
উঠছে এই যুদ্ধ। দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি
দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। কিন্তু তা রক্ষায় তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।
নেতানিয়াহু
সাধারণত তাঁর সমসাময়িক সাফল্যগুলোকে ফলাও করে প্রচার করতে পটু। কিন্তু
এবার ইসরায়েলের জনগণের কাছে একটা বিষয় দৃশ্যমান হয়ে যাবে, তা হলো তিনি
‘অস্তিত্ব রক্ষার হুমকির’ যে কথা সব সময় বলতেন, তা আসলে দূর হয়নি। বরং
পরিস্থিতি আগের মতোই রয়ে গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী
খামেনি হয়তো নেই, কিন্তু তাঁর কট্টরপন্থী ছেলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার বদলে তেহরানের ১০ দফা, যাকে ট্রাম্প
সমঝোতা আলোচনার ভিত্তি হিসেবে মেনে নিয়ে সামনে এগোতে রাজি হয়েছেন, তার মধ্য
দিয়ে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারকে মেনে নেওয়া হয়েছে বলে মনে
হচ্ছে। অবশ্য ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের ইউরোনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারকে
যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ বলে স্বীকার করেননি।
অন্তত এই মুহূর্তে মনে
হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা আলোচনার বিষয়গুলো বারাক ওবামার সেই
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তির রূপরেখার কাছাকাছি রয়েছে। অথচ ওই চুক্তি
ভন্ডুল করতে নেতানিয়াহু জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন এবং ট্রাম্প সেই
চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন।
ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজের
সামরিক বিশ্লেষক আমোস হারেলের মতে, নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিকল্পনাতেই
ব্যর্থতা বিষয়টি ছিল। তিনি বলেন, ‘বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ও নেতানিয়াহুর
নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলের ব্যবস্থার (সরকারের) দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়ে
উঠেছে। এসব দুর্বলতার মধ্যে রয়েছে ভিত্তিহীন কল্পনার ওপর ভিত্তি করে বাজি
ধরা, অগভীর ও আধাখেঁচড়া পরিকল্পনা, বিশেষজ্ঞদের অবজ্ঞা করা এবং রাজনৈতিক
নেতৃত্বের ইচ্ছা অনুযায়ী মত পাল্টাতে বিশেষজ্ঞদের ওপর প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ
করা।’
ইসরায়েলের জনগণের কাছে আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট হয়ে যাবে, তা হলো
গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থনে এই বিশাল পরিসরে সামরিক অভিযান
চালানোর সুযোগ জীবনে একবারই আসে। সামনে হয়তো ছোটখাটো সংঘাত হবে। কিন্তু এমন
দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক যুদ্ধের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা খুবই কম।
এই
যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক উত্তেজনার মুহূর্তে ট্রাম্প পিছিয়ে এসেছেন। তার
মধ্যে ইরানে স্থল সেনা পাঠানোর বিষয়টিও রয়েছে, যেটা মার্কিন ভোটারদের কাছে
অত্যন্ত অজনপ্রিয় এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে উঠত।
ইরানের
বিষয়টি বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতির প্রধান
তুরুপের তাস ছিল। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে, এখন তাঁর (নেতানিয়াহুর) আরও টিকে
থাকার প্রয়োজনীয়তা কোথায়?
হারেৎজের বিশ্লেষক হারেল লিখেছেন, ‘গাজায়
একবার, লেবাননে একবার এবং ইরানে দুইবার—এই নিয়ে টানা চতুর্থবার তাঁর
পূর্ণাঙ্গ বিজয় এবং অস্তিত্ব রক্ষার হুমকি নির্মূলের আস্ফালন ফাঁকা বুলি
হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।’
![]() |
| ইসরায়েলের বিমান হামলার পর ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে। ৮ এপ্রিল ২০২৬। ছবি: রয়টার্স |
About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ▼ 2026 (1402)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment