রাশিয়ার স্বার্থের খেলায় ইরান কি কেবলই একটি ঘুঁটি by কারাম নামা

ইরানের নেতৃত্ব ও জনগণের কাছে ভ্লাদিমির পুতিন যে নওরোজ বা নববর্ষের শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন, যুদ্ধের এই আবহে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব একটি মৌসুমি পোস্টকার্ডের চেয়ে বেশি কিছু নয়। ক্রেমলিন থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে পুতিন ইরানের নববর্ষ উপলক্ষে মোজতবা খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

কিন্তু মস্কোর কৌশলগত মানসিকতা সম্পর্কে যাঁদের ন্যূনতম ধারণা আছে, তাঁরা জানেন যে পুতিন কারোর জন্যই রাজনৈতিক অশ্রু বিসর্জন দেন না। তিনি খামেনি, বাশার আল আসাদ কিংবা নিকোলা মাদুরোর মতো নেতাদের মিত্র হিসেবে দেখেন না, বরং দেখেন এমন এক সম্পদ হিসেবে, যাকে প্রয়োজনে ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলা যায়।

তেহরান ও মস্কোর মধ্যে বহুল প্রচারিত ‘কৌশলগত অংশীদারত্বের’ মধ্যে কোনো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই। এমনকি বিপদের সময় রক্ষার কোনো গ্যারান্টিও এখানে নেই। আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে রাশিয়া কখনোই কারও বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল না। রাষ্ট্র হিসেবে তারা অন্যদের অংশীদার মনে না করে কেবল সাময়িক সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে।

এমনকি ইরানের ভেতরেও কর্মকর্তারা নিভৃতে স্বীকার করেন যে ১৯৭৯ সালে শাহর পতনের পর ইরান এখন যে ভয়াবহ সংকটে রয়েছে, সেখানে মস্কোর কাছ থেকে কার্যত কোনো অর্থবহ সহায়তা তারা পায়নি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকান ঐতিহাসিক স্টিফেন কোটকিন লিখেছেন যে পুতিন জোট গঠন করেন না। তিনি কেবল প্রভাব বিস্তারের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেন, যার মেয়াদ তখনই শেষ হয়ে যায়, যখন তা রক্ষার ব্যয় রাশিয়ার স্বার্থের চেয়ে বেড়ে যায়।

এই একটি বাক্যই রাশিয়ার সব কর্মকাণ্ড ব্যাখ্যা করে। রাশিয়া কখনো অন্য কোনো মিত্রের জন্য যুদ্ধে জড়ায় না। রাশিয়া কেবল নিজের জন্যই যুদ্ধে অংশ নেয়। যেহেতু মস্কো ইরানের এই পরিস্থিতিকে কোনো মিত্রতার বদলে বরং দর-কষাকষির ঘুঁটি হিসেবে দেখছে, তাই সম্প্রতি তারা ওয়াশিংটনের কাছে এক চাঞ্চল্যকর প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

মস্কো জানিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, তবে রাশিয়াও ইরানকে গোয়েন্দা সহযোগিতা দেওয়া বন্ধ করবে। ওয়াশিংটন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে মস্কো আবার তার পুরোনো ভূমিকায় ফিরে আসে। সেটি হলো দর্শকের ভূমিকা—যে কেবল দর-কষাকষি করতে জানে, কিন্তু রক্ষা করতে জানে না।

ইতিহাস এর প্রমাণে ভরপুর। সাদ্দাম হোসেন যখন আক্রান্ত হন তখন মস্কো সেই আক্রমণের বিরুদ্ধে সামান্যতম আপত্তিও তোলেনি। অথচ দশকের পর দশক তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এটি কোনো অনুগত মিত্রের আচরণ নয়; বরং এমন এক রাষ্ট্রের আচরণ, যারা অন্যদের কেবল আয়ের উৎস হিসেবে দেখে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা সিরিয়ার বাশার আল আসাদের ক্ষেত্রেও দেখেছি।

এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি কার্যত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট নন; বরং মস্কোর একজন রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে বাস করছেন। তাঁর নিজ দেশে আজ রাশিয়ার প্রভাব থাকলেও আসাদের নিজের কর্তৃত্ব বলতে কিছু নেই। যে মিত্রকে শেষ পর্যন্ত মস্কোয় আশ্রিত হয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে, তার করুণ পরিণতি দেখলেই বোঝা যায় ইরানের ভবিষ্যৎ আসলে কী হতে চলেছে।

রুশ রাজনৈতিক ইতিহাস এ ধরনের অনেক উদাহরণে সমৃদ্ধ। আলজেরিয়ার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হোয়ারি বুমেদিন একবার সোভিয়েত নেতাদের সরাসরি বলেছিলেন যে তাঁরা আলজেরীয়দের উটপালক হিসেবে মনে করেন, নিচু দৃষ্টিতে দেখেন এবং নিজেদের স্বার্থেই তাঁদের সাহায্য করেন। বুমেদিনের এই বক্তব্য অতিরঞ্জিত ছিল না, বরং মস্কোর সম্পর্কের আসল চরিত্রটিই সেখানে ফুটে উঠেছিল। রাশিয়ার এই সম্পর্ক কেবল একতরফা, লেনদেনভিত্তিক এবং এতে আস্থার কোনো ছিটেফোঁটা নেই।

পুতিন যখন আজ ইরানকে আবেগঘন বার্তা পাঠান, সেটি আসলে কোনো রাজনৈতিক সমর্থন কিংবা সামরিক প্রতিশ্রুতির অংশ নয়। এটি কেবল একটি প্রতীকী বাক্য, যা ইরানকে কোনো হামলা থেকে সুরক্ষা দেবে না। রাশিয়ার কাছে ইরান এমন এক ঘুঁটি, যাকে যেকোনো মুহূর্তে বিসর্জন দেওয়া যায়। মস্কোর কাছে তেহরান কেবল পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দরাদরির এক মাধ্যম। স্বার্থে আঘাত লাগলে এই ঘুঁটি যেকোনো সময় তারা বাতিল করে দিতে পারে।

পুতিনের এই নওরোজ শুভেচ্ছা তাই কোনো গভীর রাজনৈতিক বার্তার চেয়ে বেশি মৌসুমি শিষ্টাচার। এটি ইরানকে নিরাপত্তা দেয় না এবং রাশিয়ার শত্রুদেরও আতঙ্কিত করে না। যুদ্ধের সময় যে শব্দের কোনো প্রতিফলন কাজ বা অ্যাকশনে নেই, তার কোনো মূল্য নেই। ইরান আজ চারপাশ থেকে আক্রান্ত হওয়ার সময় খুব ভালোভাবেই জানে যে মস্কো কখনোই তাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে দাঁড়াবে না। ইতিহাসের শিক্ষাই হলো, রাশিয়ার কোনো বন্ধু নেই, আছে শুধু স্বার্থ। আর স্বার্থ কখনোই দুর্বলের পক্ষে থাকে না।

* কারাম নামা, ব্রিটিশ-ইরাকি লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

গত  গছর ১৫ আগস্ট রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলাস্কা বৈঠকে মিলিত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন
গত গছর ১৫ আগস্ট রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলাস্কা বৈঠকে মিলিত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স


No comments

Powered by Blogger.