এপস্টিন ‘মন্দ প্রকৃতির লোক’: পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোনে ট্রাম্প
ফ্লোরিডার সাবেক এক পুলিশপ্রধান জানিয়েছেন, ২০০৬ সালে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে একটি ফোনকল পেয়েছিলেন। তখন বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাঁকে বলেছিলেন, জেফরি এপস্টিনের আচরণ সম্পর্কে ‘সবাই’ জানে।
সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত এফবিআইয়ের নথিতে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
নথিটি হলো ২০১৯ সালে পাম বিচের সেই সাবেক পুলিশপ্রধানের সঙ্গে এফবিআইয়ের এক সাক্ষাৎকারের লিখিত রেকর্ড। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ বিভাগ এপস্টিনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে ফোন করে বলেছিলেন,‘যাক বাবা, ভালো হয়েছে যে আপনারা তাঁকে থামাচ্ছেন। সবাই জানত, তিনি এত দিন ধরে এসব করছেন।’
পুলিশ কর্মকর্তার নাম নথিতে মুছে দেওয়া হলেও সেখানে তাঁকে এপস্টিন তদন্তের সময়কালে পাম বিচ পুলিশপ্রধান হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি হলেন মাইকেল রাইটার, যিনি ‘মায়ামি হেরাল্ড’-কে নিশ্চিত করেছেন, তিনি ট্রাম্পের কাছ থেকে সেই ফোনকলটি পেয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বিষয়ে এপস্টিন–সংক্রান্ত যেকোনো অন্যায়ের কথা ক্রমাগত অস্বীকার করে আসছেন এবং বলছেন, তিনি এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে জানতেন না। তবে এই কথিত ফোনকলটি সম্পর্কে ট্রাম্প আসলে কী জানতেন এবং কখন থেকে জানতেন—তা নিয়ে আরও প্রশ্ন তোলার দাবিকে জোরালো করে তুলেছে।
২০১৯ সালে যখন নারী পাচারের দায়ে ফেডারেল এজেন্টরা এপস্টিনকে গ্রেপ্তার করেছিলেন, তখন সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই কলঙ্কিত অর্থদাতার ব্যাপারে তাঁর কোনো ‘সন্দেহ’ ছিল কি না। ট্রাম্প বলেছিলেন: ‘না, আমার কোনো ধারণা ছিল না। আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমি বহু বছর ধরে তাঁর সঙ্গে কথা বলিনি।’
এপস্টিন ফাইলের সর্বশেষ কিস্তিতে প্রকাশিত এফবিআইয়ের সাক্ষাৎকারের সারাংশ অনুযায়ী পুলিশ কর্মকর্তা রাইটার বলেছেন, ২০০৬ সালের জুলাইয়ে ফোন করে ট্রাম্প তাঁকে বলেছিলেন, তিনি এপস্টিনকে তাঁর ‘মার-এ-লাগো’ ক্লাব থেকে বের করে দিয়েছেন। নিউইয়র্কের মানুষ জানতেন, তিনি (এপস্টিন) একজন ঘৃণ্য লোক।
রাইটার আরও দাবি করেন, গিলেন ম্যাক্সওয়েলকে ওই এপস্টিনের ‘সহযোগী’ বলেও ট্রাম্প তাঁকে বলেছিলেন। ট্রাম্প বলেন, তিনি অত্যন্ত মন্দ প্রকৃতির মানুষ। তাই, তাঁর ওপর নজরদারি রাখা উচিত।’
গিলেন ২০২১ সালে এপস্টিনের জন্য অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের প্রলুব্ধ করার জন্য দোষী সাব্যস্ত হন।
এফবিআইকে পুলিশ কর্মকর্তা রাইটার আরও বলেন, ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তিনি একবার এপস্টিনের আশেপাশে ছিলেন যখন সেখানে কিশোরীরা ছিল এবং ট্রাম্প সেখান থেকে ‘দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন’।
নথি অনুসারে রাইটার বলেন, ফ্লোরিডা পুলিশ যখন এপস্টিনের তদন্ত করছিল, তখন যাঁরা প্রথম দিকে ফোন করেছিলেন ট্রাম্প ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন।
২০০৬ সালে পাম বিচ পুলিশ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে এই কলঙ্কিত অর্থদাতার বিরুদ্ধে তদন্ত করছিল। মামলাটি পরে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, যারা ২০০৮ সালে এপস্টিনের সঙ্গে বিতর্কিত আপস করেন। একটি বিতর্কিত চুক্তির মাধ্যমে তাঁকে আরও গুরুতর অভিযোগ থেকে রক্ষা করা হয়েছিল।
বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিচার বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘২০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, এমন কোনো সমর্থনযোগ্য প্রমাণ আমাদের জানা নেই।’
গতকাল মঙ্গলবার ব্রিফিংয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটকে এই ফোনকল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এটি ‘২০০৬ সালে ঘটে থাকতেও পারে, আবার না–ও পারে। আমি এর উত্তর জানি না।’
লেভিট আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময় যা বলেছেন তা হলো, তিনি জেফরি এপস্টিনকে তাঁর মার-এ-লাগো ক্লাব থেকে বের করে দিয়েছিলেন। কারণ, তিনি একজন অসভ্য মানুষ ছিলেন। এই ফোনকলের দাবিও সেই সত্যতাকেই সমর্থন করে। যদি এটি ঘটে থাকে, তবে এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকে যা বলে আসছেন, সেটারই প্রমাণ দেয়।’
বিবিসি এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে পুলিশ কর্মকর্তা রাইটারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে।
নব্বইয়ের দশকে ট্রাম্প ও এপস্টিনকে একসঙ্গে সামাজিক অনুষ্ঠানে এবং ছবিতে দেখা গেছে। তবে প্রেসিডেন্ট ও হোয়াইট হাউস বারবার বলেছে, ২০০৪ সালের দিকে এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করার আগে তিনি তাঁর অপরাধ সম্পর্কে অন্ধকারে ছিলেন। এপস্টিন প্রথম গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক বছর আগেই ট্রাম্প সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন বলে দাবি করা হয়।
ট্রাম্প বলেছেন, এপস্টিন মার-এ-লাগো থেকে তাঁর কর্মচারীদের ‘চুরি’ বা ভাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে যখন তিনি জানতে পারেন, তখন তাঁদের দুজনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
জুলাই মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি এটি শুনে তাঁকে বলেছিলাম, আমরা চাই না আপনি আমাদের লোকদের নিয়ে যান। তিনি তখন ওই কাজ থেকে বিরত হন। তবে কিছুদিন পর তিনি আবারও একই কাজ করেন। তখন আমি তাঁকে বলি, এখান থেকে বের হও।’
এই কথিত ফোনকলের খবরটি এমন সময় এল, যখন গিলেন গত সোমবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির সামনে ভার্চ্যুয়ালি সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার জানিয়েছেন, রুদ্ধদ্বার জবানবন্দির সময় গিলেন প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় তিনি তাঁর নীরব থাকার সাংবিধানিক অধিকারের (পঞ্চম সংশোধনী) সুযোগ নেন।
এপস্টিনের যৌন নির্যাতনের জন্য কিশোরী মেয়েদের পাচারের দায়ে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন গিলেন ম্যাক্সওয়েল।
গিলেনের আইনজীবী দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি তাঁকে ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দেন, তবে তিনি পূর্ণাঙ্গ এবং সততার সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত।
ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, গিলেনকে ক্ষমা করার ব্যাপারে এখনো কোনো চিন্তাভাবনা করেননি তিনি।
![]() |
| ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেফরি এপস্টিন। ফাইল ছবি: রয়টার্স |

No comments