আইসিসিতে নিরপেক্ষতার সংকট by সাদ শাফকাত
যুক্তি দিয়ে বলা যায়, এই খেলাটা শুরু করেছিল ভারতই, আর পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছে পাল্টা জবাব দিতে- চোখের বদলে চোখ। ২০০৮ সালে করাচিতে এশিয়া কাপ হওয়ার পর থেকে ভারতের ক্রিকেটাররা পাকিস্তানে আর খেলেনি। অথচ এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তান ভারতের মাঠে অন্তত ১৯ বার খেলেছে। সবশেষ ২০২৩ সালের নভেম্বরে ওয়ানডে বিশ্বকাপে। শুরুতে ভারতের অস্বীকৃতিকে নিরাপত্তার যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা যেত। ২০০৯ সালের লাহোরে সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানকেও তো বছরের পর বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘ঘরের মাঠ’ বানিয়ে খেলতে হয়েছিল।
কিন্তু পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পর এবং অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডের মতো শীর্ষ দলগুলো যখন আবার পাকিস্তানে এসে খেলতে শুরু করল, তখন ভারতের ক্রিকেট বোর্ডকে নতুন অজুহাত খুঁজতে হলো। তারা সামনে আনল ‘সরকারি অনুমতির’ কথা। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের ভার তুলে দিল কট্টরপন্থী বিজেপি সরকারের হাতে। তখনই মুখোশ খুলে গেল।
এই ভারতীয় অনড় অবস্থানের ফলেই গত বছরের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আয়োজন কার্যত প্রহসনে পরিণত হয়। আট দলের টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলো যখন লাহোর, করাচি ও রাওয়ালপিন্ডিতে নির্বিঘ্নে চলছিল, তখন ভারতকে তার পাঁচটি ম্যাচই খেলতে দেয়া হয় দুবাইয়ে। এর মধ্যে ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারির পাকিস্তানের বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ গ্রুপ ম্যাচ এবং ৯ মার্চের ফাইনালও। এই চরম বৈষম্যের ব্যাখ্যা একটাই- ক্রিকেটে ভারতের অপ্রতিরোধ্য প্রভাব।
একশ কোটির বেশি দর্শকের বাজার নিয়ে ভারত রাজস্ব, স্পনসরশিপ, লবিং এবং শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)- সবকিছুর ওপরই কর্তৃত্ব কায়েম করেছে। পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে মনে হচ্ছিল, আমাদের হাতে আর কোনো তাস নেই।
তবে সাম্প্রতিক দুটি নাটকীয় রাজনৈতিক ঘটনা এই হিসাব বদলে দিয়েছে। প্রথমটি হলো বাংলাদেশে ভারতসমর্থিত শেখ হাসিনা ওয়াজেদের ক্ষমতাচ্যুতি, যা দিল্লির হস্তক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ব্যর্থ দুঃসাহসিকতা, যা পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের ভারতের প্রতি অবস্থানে নতুন আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। এই দুই ভূকম্পনের ঢেউ এসে মিলেছে ক্রিকেট দুনিয়ায়।
প্রথমে বাংলাদেশ আইসিসির কাছে অনুরোধ জানায়- তাদের আসন্ন বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো যেন ভারতের বাইরে, শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেয়া হয়। পাকিস্তান আগেই এমন ছাড় আদায় করেছিল। বাহ্যিকভাবে এই অনুরোধের কারণ ছিল আইপিএল থেকে এক বাংলাদেশি খেলোয়াড়ের রহস্যজনক বহিষ্কার। কিন্তু আসলে এর পেছনে রয়েছে ক্রমাবনত রাজনৈতিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের এই অবস্থানে সাহস পেয়ে পাকিস্তানও কঠোর অবস্থান নেয় এবং জানায়- বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ১লা ফেব্রুয়ারি সরকার নেবে। সেই সিদ্ধান্ত টুইটারে জানানো হয়: পাকিস্তান বিশ্বকাপ খেলবে, কিন্তু ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ বয়কট করবে। নকআউট পর্বে ভারতকে পেলে কী হবে- সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
খাঁটি ক্রিকেটের বিচারে গ্রুপ ম্যাচ ছেড়ে দেয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলেই মনে হতে পারে। দুটি মূল্যবান পয়েন্ট হাতছাড়া করা মানে পরের পর্বে ওঠা ঝুঁকির মুখে ফেলা। কিন্তু এখানে একটি বার্তা দেয়া জরুরি ছিল এবং পিসিবি সেটা কৌশলে দিয়েছে। আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের রেকর্ড ভয়াবহ; এই ম্যাচে হারার সম্ভাবনাই ছিল বেশি। অন্যদিকে গ্রুপের বাকি তিন প্রতিপক্ষ সহযোগী স্তরের দল- যারা অঘটন ঘটাতে পারে ঠিকই, তবে অতিক্রম অযোগ্য নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, ভারতীয় দর্শকদের তাদের প্রিয় বিনোদন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সেটা হলো পাকিস্তানকে হারানোর দৃশ্য। এই ম্যাচগুলো ভারতের টিভি বাজারে সোনার খনি। ২০২৩ বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের সম্মিলিত (টিভি ও ডিজিটাল) দর্শকসংখ্যা ছিল ৪০ কোটির বেশি। গত বছরের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেই সংখ্যা ছাড়িয়েছিল ৮০ কোটি। ১৫ই ফেব্রুয়ারির বাতিল হওয়া ম্যাচটিও নিশ্চয়ই একই রেকর্ড গড়ত। নকআউটে যদি দুই দল মুখোমুখি হয়, তাহলে সব দর্শকসংখ্যার রেকর্ড ভেঙে যাবে- এ নিয়ে সন্দেহ নেই।
এই বেছে নেয়া বয়কট পাকিস্তানে শান্ত আলোচনার জন্ম দিলেও ভারতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সেটাই প্রমাণ করে, এটা কতটা কার্যকর হয়েছে। ভারতীয় কট্টরপন্থীরা ক্ষুব্ধ, সাধারণ দর্শক হতাশ। একই সঙ্গে কিছু যুক্তিবাদী ভারতীয় কণ্ঠও শোনা যাচ্ছে। শশী থারুর আইসিসির ছাতার নিচে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে আলোচনায় বসে ‘এই অর্থহীনতা বন্ধ করার’ আহ্বান জানিয়েছেন। প্রখ্যাত ক্রিকেট সাংবাদিক শারদা উগ্রা সরাসরি দায় চাপিয়েছেন ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের ওপর- তাদের ক্ষুদ্র অহং ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কথা বলেছেন।
এই পুরো বিশৃঙ্খলায়, ক্রিকেটের বাইরেও সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো বাংলাদেশ। তাদের সঙ্গে অন্যায় হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। পাকিস্তানের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তারা শ্রীলঙ্কায় খেলতে পারত। কিন্তু আইসিসি তাদের হুমকি দেয়- না মানলে দল বদলে দেয়া হবে। শেষ পর্যন্ত সেই হুমকিই কার্যকর করা হয়।
এতে আইসিসির জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে। বৈশ্বিক ক্রিকেটের কল্যাণের দায়িত্ব যাদের, সেই সংস্থাই যদি নিরপেক্ষ না থাকে, তাহলে সমস্যা আরও গভীর। এখন আইসিসি ভারতের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে। সব ক্রিকেট জাতির উচিত একত্রিত হয়ে নীতিগত অবস্থান নেয়া এবং আইসিসিকে জবাবদিহির আওতায় আনা। কিছু না করার মূল্য অত্যন্ত চড়া।
(লেখক আগা খান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজির অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন। তার এ লেখাটি অনলাইন দ্য ডন থেকে অনুবাদ)

No comments