অভিবাসীদের ঢল যেভাবে স্পেন-ইসরায়েল সম্পর্ককে আরও তিক্ত করল

আলজাজিরার বিশ্লেষণঃ উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সিউতায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসীর ঢলের পর পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছে স্পেন সরকার। কর্তৃপক্ষের দাবি, সীমান্ত অতিক্রম করা বেশির ভাগ মানুষই স্বেচ্ছায় আবার মরক্কো ফিরে গেছেন।

গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এই অভূতপূর্ব ঢলে হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রপথে সাঁতরে বা ছোট নৌকায় করে সিউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। অনেকে সীমান্ত ফটকে এত বেশি সংখ্যায় জড়ো হন যে, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের সামাল দিতে হিমশিম খায়। কেউ কেউ সীমান্তের বাঁধ ও কাঁটাতারের বেড়া টপকে ঢোকারও চেষ্টা করেন। এ সময় সিউতায় পৌঁছাতে গিয়ে অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন একই সময়ে সিউতায় ঢোকার চেষ্টা করলেন, এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। ঘটনাটি যে নিছক কাকতালীয় নয়, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রায় ঐকমত্য রয়েছে। তাহলে কি এটি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল? যদি হয়ে থাকে, তবে কারা এর পেছনে এবং উদ্দেশ্যই বা কী? এ নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

সিউতা কোথায়, কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সিউতা উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর, যার এক পাশে মরক্কো। মেলিলার সঙ্গে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আফ্রিকার মধ্যে থাকা মাত্র দুটি স্থলসীমান্তের একটি।

১৪১৫ সালে প্রথম পর্তুগালের দখলে যায় সিউতা। পরে ১৫৮০ সালে এটি স্পেনের অংশে পরিণত হয়। ১৬৪০ সালে পর্তুগাল স্বাধীন হলেও সিউতা স্পেনের অধীনেই থেকে যায়। আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পরও সিউতা ও মেলিলা ইউরোপীয় শক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকা শেষ দুটি ভূখণ্ড।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বহু বছর ধরেই এটি ইউরোপে প্রবেশ করতে চাওয়া অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ। শহরটি উঁচু সীমান্তবেষ্টনী, নজরদারি ব্যবস্থা এবং স্পেনের সিভিল গার্ড ও জাতীয় পুলিশের স্থায়ী উপস্থিতির মাধ্যমে সুরক্ষিত রাখা হয়।

হঠাৎ অভিবাসীদের এত বড় ঢলের কারণ কী?

স্পেনের কর্মকর্তারা বলছেন, গত জুলাইয়ে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পরই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়, সমুদ্রপথে স্পেনে পৌঁছানো অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রমকারীদের ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়।

কিন্তু অনেক বিশ্লেষক এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাদের মতে, আদালতের ওই রায়ের খবর এত বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর জানার কথা নয়।

উত্তর আফ্রিকায় অভিবাসন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ স্প্যানিশ সাংবাদিক ইগনাসিও সেমব্রেরো এএফপিকে বলেন, সন্দেহ নেই, ৮ জুলাইয়ের রায়টি কিছুটা ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এত বড় মাত্রার মানুষের সমাবেশ ব্যাখ্যা করার জন্য এটি যথেষ্ট নয়।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের অভিযোগ, মানব পাচারকারী চক্রগুলো আদালতের রায়কে অতিরঞ্জিত করে হাজার হাজার মানুষকে সিউতায় ঢোকার জন্য উৎসাহিত করেছে।

তবে আরেকটি আলোচিত ব্যাখ্যা হলো মরক্কো নিজেই হয়তো এই সীমান্ত ভাঙার ঘটনাকে নীরবে উৎসাহ দিয়েছে। মরক্কো কখনো সিউতা ও মেলিলার ওপর স্পেনের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেনি। তাদের দাবি, এগুলো মরক্কোর ভূখণ্ড এবং এখনো স্পেনের দখলে রয়েছে।

এ ছাড়া পশ্চিম সাহারা নিয়েও স্পেন ও মরক্কোর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জটিল। ১৯৭৫ সালে মরক্কো পশ্চিম সাহারা দখল করে নেয়। কিন্তু পলিসারিও ফ্রন্ট ওই অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

২০২১ সালের এপ্রিলে স্পেন মানবিক কারণে পলিসারিও ফ্রন্টের নেতা ব্রাহিম ঘালিকে কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অনুমতি দেয়। এতে মরক্কো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। কারণ, ঘালিকে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা ও অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে।

এর জেরে মরক্কো মাদ্রিদ থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর ২০২১ সালের মে মাসে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। সে সময় প্রায় ১০ হাজার অভিবাসী সিউতায় ঢুকে পড়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল স্পেনের ওপর মরক্কোর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল।

পরে ২০২২ সালে দুই দেশের সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়। পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে প্রায় চার দশকের অবস্থান পরিবর্তন করে স্পেন মরক্কোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানায়। অনেকের ধারণা, সিউতা ও মেলিলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকিকেই কূটনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করেছিল মরক্কো।

তবে সম্প্রতি সম্পর্ক আবারও টানাপোড়েনে পড়ে। কারণ, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আলজেরিয়া সফর করেন। আলজেরিয়া পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে পলিসারিও ফ্রন্টের অন্যতম প্রধান সমর্থক এবং মরক্কোর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী।

এ কারণে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, সিউতায় সাম্প্রতিক ঘটনাও হয়তো স্পেনকে নতুন করে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।

এর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কোথায়?

কিছু বিশ্লেষকের মতে, যদি মরক্কো সত্যিই এই পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখে থাকে, তাহলে তারা হয়তো একা নয়। কারণ স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজের সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে এমন আরও কয়েকজন নেতার নামও আলোচনায় এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

ইউরোপের মধ্যে পেদ্রো সানচেজকে সবচেয়ে প্রকাশ্য ফিলিস্তিনপন্থী নেতাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি একাধিকবার বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান গণহত্যার শামিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান নিয়েও তিনি কড়া সমালোচনা করেছেন।

শুধু তাই নয়, স্পেনের যৌথভাবে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্র-স্পেন সামরিক স্থাপনাগুলো ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহার করারও অনুমতি দেননি তিনি।

অন্যদিকে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে স্পেনের অবস্থানের সমালোচনা করে আসছেন।

মরক্কো-ইসরায়েল সম্পর্ক

স্পেনের তুলনায় মরক্কোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক অনেক উষ্ণ। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটি জাহাজ, যাতে ইসরায়েলের জন্য অস্ত্র বহন করা হচ্ছিল, সেটিকে স্পেনের আলহেসিরাস বন্দরে ভিড়তে দেয়নি মাদ্রিদ। পরে জাহাজটি মরক্কোর বন্দরে যায়।

একই বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরায়েলের উদ্দেশে যাত্রার পথে একটি ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজ স্পেনে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে মরক্কোর তানজিয়ার বন্দরে জ্বালানি ও রসদ সংগ্রহ করে।

ইসরায়েলের অনেক রাজনীতিকই মনে করেন, স্পেন একদিকে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেয়, অন্যদিকে নিজেই আরব ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে।

২০১৯ সালে নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহু সামাজিকমাধ্যমে সিউতা ও মেলিলার মানচিত্র প্রকাশ করে লিখেছিলেন, প্রিয় আরব ও মুসলিমরা, দখলকৃত আরব-ইসলামী ভূমি মুক্ত করতে চাইলে এখান থেকেই শুরু করুন।

চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক মিডল ইস্ট ফোরামে প্রকাশিত এক নিবন্ধে গবেষক মাইকেল রুবিন লিখেছিলেন, মরক্কোর উচিত সীমান্তে বুলডোজার নিয়ে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সিউতা ও মেলিলা পুনর্দখলের উদ্যোগ নেওয়া।

এপ্রিল মাসে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট নিউজে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মরক্কোর বিশ্লেষক আমিন আইয়ুবও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র-স্পেন সম্পর্কে টানাপোড়েন মরক্কোর জন্য সিউতা ও মেলিলা প্রশ্নে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং এ ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের মাধ্যমে ইসরায়েল কূটনৈতিকভাবে রাবাতকে সমর্থন দিতে পারে।

শুক্রবার, যখন হাজার হাজার অভিবাসীর ঢলে সিউতা কার্যত অচল, তখন জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি মন্তব্য করেন, যা নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।

তিনি লেখেন, স্পেন কখনো ইসরায়েলকে উপদেশ দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করে না। অথচ এখন সিউতায় নিজেদের অভিবাসন নীতির কারণে তাদের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছে। অন্যদের শিক্ষা দেওয়ার আগে স্পেনের উচিত বিশ্বের কাছে ব্যাখ্যা করা তারা এখনো কেন আফ্রিকায় উপনিবেশ ধরে রেখেছে।

ড্যাননের এই মন্তব্যের জবাবে স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে বলেন, আচ্ছা, এখন অনেক কিছুই যেন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।

তার এই মন্তব্যকে অনেকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন তিনি হয়তো মনে করছেন, সিউতার সাম্প্রতিক ঘটনার পেছনে ইসরায়েলেরও কোনো না কোনো ভূমিকা থাকতে পারে।

মরক্কোয় ইসরায়েলপন্থি অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মরক্কোয় ইসরায়েলপন্থি মনোভাব দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্কও আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

সম্প্রতি মরক্কো পশ্চিম সাহারার একটি ১ হাজার ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কের নাম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে রাখার ঘোষণা দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর একটি ছিল মরক্কো। ওই চুক্তির মাধ্যমে দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।

এর বিনিময়ে পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে জাতিসংঘ এবং দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে মরক্কোকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে অঞ্চলটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছে রাবাত।

প্রমাণ নেই, তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে

সিউতায় অভিবাসীদের ঢল সংগঠিত করতে মরক্কো ইসরায়েলের হয়ে কাজ করেছে এমন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। তবে একের পর এক কাকতালীয় ঘটনা, আঞ্চলিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

আলজাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ না থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট সিউতার সাম্প্রতিক সংকট স্পেনের বামপন্থি প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং ইসরায়েলের ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের মধ্যকার আগেই তিক্ত হয়ে ওঠা সম্পর্ককে আরও শীতল করে তুলেছে।

সূত্র : আল জাজিরা 

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।। ছবি : সংগৃহীত
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।। ছবি : সংগৃহীত