Wednesday, February 4, 2026
আবার হামলা হলে মরণকামড় দেবে ইরান by সাইয়েদ হোসেইন মুসাভিয়ান
আবার হামলা হলে মরণকামড় দেবে ইরান by সাইয়েদ হোসেইন মুসাভিয়ান
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চারপাশে বড় ধরনের সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। অতিরিক্ত নৌবহর, যুদ্ধবিমান ও সহায়ক সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে ইরানের কাছাকাছি সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক উপস্থিতিগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তুতি সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ইঙ্গিত বহন করছে। তেহরান এ নিয়ে তীব্র সতর্কবার্তাও দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই ইরানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যভাবে ‘শাসন পরিবর্তন’-কেন্দ্রিক কৌশল গ্রহণ করেছেন।
গত বছরের জুনে ইসরায়েল একটি নাটকীয় সামরিক অভিযান চালায়। এ কৌশলের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ওপরে আঘাত, নিচে গণবিদ্রোহ’। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাকারীরা ধরে নিয়েছিলেন, ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক, সামরিক, নিরাপত্তা ও পারমাণবিক কর্মকর্তাদের হত্যা করা হলে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামবে। একই সঙ্গে তারা মনে করেছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র–সক্ষমতা ধ্বংস করা গেলে পাল্টা আক্রমণও ঠেকানো যাবে।
ওই অভিযানে ইরানের ডজনের বেশি শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। কিন্তু প্রত্যাশার বিপরীতে সাধারণ মানুষ সরকারের পাশেই দাঁড়ায়। শুধু তা-ই নয়, ইরান ইসরায়েলের ওপর শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই বাস্তবতাই ২০২৫ সালের ওই অভিযানের ব্যর্থতার প্রধান কারণ। এরপর ট্রাম্প ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দেন। এতে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়। এর পরপরই একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলকে আরও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করা।
কিন্তু ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইরানের ভেতরে অর্থনৈতিক ক্ষোভ নতুন করে বিস্ফোরিত হয়। তেহরানের ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমে আসেন মুদ্রার দরপতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে। দ্রুতই এই আন্দোলন অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলন ‘হাইজ্যাক’-এর চেষ্টা
এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘প্ল্যান বি’ বাস্তবায়নের সুযোগ খুঁজে পায়। এই কৌশলের সারকথা—‘নিচ থেকে বিদ্রোহ, ওপর থেকে সামরিক আঘাত’।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কগুলো আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে নাশকতা, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা ও সহিংসতা চালিয়েছে, যাতে সংঘর্ষ বাড়ে এবং প্রাণহানি ঘটে। ট্রাম্পও ইঙ্গিত দেন, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপের যুক্তি পাবে। এ দফায় নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের হতাহতের সংখ্যা আগের আন্দোলনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত এই কৌশলও ব্যর্থ হয়। সহিংস অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে কয়েক লাখ মানুষ সরকার-সমর্থিত সমাবেশে অংশ নেয়, যেখানে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হয়। নিরাপত্তা বাহিনী অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং হাজারো মানুষকে আটক করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে আসে।
পরবর্তী ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে সরানোর চেষ্টা করতে পারে, যার সঙ্গে সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলার ঘটনার তুলনা টানা হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সরানোর সময় এসেছে। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম একে নাৎসি শাসনের পতনের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের দেশের মহান নেতার ওপর আঘাত মানে পুরো ইরানি জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ।’
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থী কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী প্রস্তাব দিয়েছে, সরাসরি আগ্রাসনের বদলে ইরানের খার্গ দ্বীপের তেল টার্মিনাল দখল করা যেতে পারে। এই টার্মিনাল দিয়েই ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। উদ্দেশ্য—অর্থনৈতিকভাবে দেশটিকে পঙ্গু করা।
অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি
আগামী দিনগুলোতে ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ শাসন ও সামাজিক সংহতি। বেকারত্ব, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক বৈষম্যই মূল ক্ষোভের কারণ। সরকার আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও অসন্তোষ পুরোপুরি দূর হয়নি। চারটি প্রধান রাজনৈতিক ধারার মধ্যে বিভাজন জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করছে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শাসন পরিবর্তনের চাপ। দীর্ঘদিনের শত্রুতার মধ্যে ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুমকি পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এটি শুধু ইরানের নিরাপত্তার জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যও বিপজ্জনক। তৃতীয়ত, অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর ভূমিকা।
সৌদি আরব, মিসর, ওমান ও কাতার ইরানে সামরিক হামলার বিরোধিতা করছে। তারা বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা করছে। চতুর্থত, ইরানের পূর্বমুখী কৌশল। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে ইরান সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিকসে যোগ দিয়েছে। এটি পশ্চিমা চাপ মোকাবিলায় এক নতুন জোট গঠনের চেষ্টা।
সবশেষে, ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থান। হিজবুল্লাহ, হুথি ও ইরাকের কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইরানে হামলা হলে তারা চুপ থাকবে না। অর্থাৎ নতুন সংঘাত মানেই হতে পারে পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধ। কয়েকজন মার্কিন ও ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, ট্রাম্প নতুন হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন।
এ মুহূর্ত যেন এক ‘রক্তাক্ত বিরতি’। সামনে রয়েছে ‘আঞ্চলিক বিস্ফোরণের’ আশঙ্কা। ইরানের জন্য আরেকটি হামলা হবে অস্তিত্বের প্রশ্ন। তখন আর সংযমের কোনো জায়গা থাকবে না।
এ বিপর্যয় এড়াতে হলে ট্রাম্পকে ‘আত্মসমর্পণ না হলে যুদ্ধ’ কৌশল থেকে সরে এসে একটি সম্মানজনক, পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমঝোতার পথে যেতে হবে। নইলে ৪৭ বছরের সংঘাত শেষ না হয়ে গোটা অঞ্চলকে ঠেলে দেবে এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধে।
* সাইয়েদ হোসেইন মুসাভিয়ান, ইরানি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিবাদে ইরানে বিক্ষোভ। তেহরান, ইরান, ২২ জুন ২০২৫ ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1406)
-
▼
February
(244)
-
▼
Feb 04
(8)
- ভারতে বসে বাংলাদেশে রাজনীতিতে ফেরার ছক কষছেন নির্ব...
- শেখ হাসিনাকে ছাড়িয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এগোনো উচ...
- ফিলিস্তিনে যুদ্ধবিরতি? কোন যুদ্ধবিরতি? by শকাত আদম
- ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌন সম...
- ‘খাসোগি হত্যায় সৌদি যুবরাজকে ফাঁসাতে পারেন আমিরাতে...
- মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম নিহত
- ৯ বছর প্রেমের পর বিয়ে, দুই মাসের মধ্যেই মা-বাবার স...
- আবার হামলা হলে মরণকামড় দেবে ইরান by সাইয়েদ হোসেইন ...
-
▼
Feb 04
(8)
-
▼
February
(244)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment