Sunday, January 19, 2025
জিয়াউর রহমানের যে নীতির কারণে বিএনপি টিকে গেল by মারুফ মল্লিক
জিয়াউর রহমানের যে নীতির কারণে বিএনপি টিকে গেল by মারুফ মল্লিক
ঠিক এই সময় দেশের ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ সালে তিনি ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের অংশ ছিলেন না বা উল্লেখযোগ্য কোনো চরিত্রও নন। কিন্তু ৭ নভেম্বর তিনিই আসল নায়ক। সিপাহী জনতার বিপুল সমর্থন ও সময় তাঁকে নায়কের আসনে বসিয়ে দিয়েছে। এর আগে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধেরও অন্যতম নায়ক ছিলেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বাকশালের একদলীয় শাসনের পতনের পরপরই জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। অর্থনীতির অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিল। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এমনই একসময়ে জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাজনীতির মঞ্চে চলে আসেন। ওই পরিবর্তনের বিপক্ষ শক্তিও ছিল। এর প্রভাব জিয়াউর রহমানের শাসনামলে পরিলক্ষিত হয়। সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না হলেও কমবেশি ২৪ থেকে ২৫টি ছোট–বড় সামরিক অভ্যুত্থান জিয়াউর রহমানকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। সর্বশেষ এক ঘটনায় তিনি সামরিক বাহিনীর কিছু সদস্যদের হাতে নিহত হন।
মুক্তিযুদ্ধের জেড ফোর্সের অধিনায়ক ও সেক্টর কমান্ডার সামরিক কর্মকর্তা থেকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় শাসকে পরিণত হওয়া জিয়াউর রহমানের আজ ৮৯তম জন্মবার্ষিকী। খুব দ্রুতই তিনি দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। এর মূল কারণ হচ্ছে, তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজজীবন—সবর্ত্রই তিনি উদারনীতির প্রচলন করেছিলেন।
সেই সময়ের অনেক শাসকই কর্তৃত্ববাদের রাজনীতির ভাবনা থেকে বের হতে পারেননি। শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশালই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জিয়াউর রহমানের সামনে দুটি বিকল্প ছিল। এক, বাকশালের ধারাবাহিতা রক্ষা করে ওই সময়ের তৃতীয় বিশ্বের অনেক শাসকের মতো কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠ করা; দুই, জনগণের কাছে যাওয়া। জিয়া দ্বিতীয় পথ অনুসরণ করে উদারপন্থী রাজনীতি নিয়ে জনগণের কাছে গেলেন। তিনি সব মত ও পথের দল নিয়ে রাষ্ট্র পুনর্নির্মাণে অগ্রসর হন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকেও তিনি মধ্যপন্থী উদার দল হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেন। বিএনপির নীতি–আদর্শ বিবেচনা করলে দেখা যাবে, জিয়াউর রহমান ইউরোপের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের রাজনীতির দর্শন এখানে প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি বাকশালের একদলীয় শাসনের পরিবর্তে ফিরিয়ে আনেন বহুদলীয় গণতন্ত্র। এমনকি বাকশালে বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনেন। পাশাপাশি অন্যান্য দলকেও রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, তিনি জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন; কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, তিনি একই সঙ্গে বিলুপ্ত আওয়ামী লীগকেও বাকশালের গহ্বর থেকে তুলে এনেছিলেন।
কে রাজনীতি করতে পারবে বা কে করতে পারবে না, সেই সিদ্ধান্ত জিয়াউর রহমান জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি বরং প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে মোকাবিলা করার পথ বেছে নিয়েছিলেন। বহুপক্ষীয়, উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজগঠনের জন্য ১৯ দফা ঘোষণা করে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে জনসাধারণকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন। এই প্রচেষ্টায় তিনি সফল হয়েছিলেন।
প্রথমত, জিয়াউর রহমান সব জাতি–ধর্ম–বর্ণের সমান পরিচয় ও অধিকারের ভিত্তিতে একটি সমাজগঠনে উদ্যোগী হন। তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রচার করেন রাষ্ট্রের নাগরিকদের একক রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের জন্য। সংকীর্ণ জাতিবাদী বাঙালি বা ধর্মীয় জাতিয়তাবাদের ধারণা থেকে বের হয়ে এসেছিলেন তিনি। মূলত পশ্চিম বা উত্তর ইউরোপের দেশগুলোর আদলে রাষ্ট্রের ভিত্তিতে তিনি নাগরিকদের পরিচয় নির্মাণের প্রয়াসী হন।
উল্লেখ্য যে জিয়াউর রহমান ওই সময় এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকায় প্রবল জাতিবাদী জাতীয়তাবাদের ঢেউ থেকে নিজের রাজনৈতিক দর্শনকে আলাদা করতে পেরেছিলেন। উত্তর ঔপনিবেশিক সময়ে দেশগুলো তখন জাতিবাদীতায় আচ্ছন্ন ছিল। তারা মনে করত, জাতিবাদী জাতীয়তাবাদই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সম্ভাব্য দর্শন। কিন্তু জাতিবাদী ধারণা সমাজে, রাষ্ট্রে বিভাজন সৃষ্টি করে। ইউরোপ তখন এই ধারণা থেকে বের হয়ে এলেও এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিনের দেশগুলোর তখনো এ ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। এমন অবস্থায় যুদ্ধবিধ্বস্ত, অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির একটা দেশের শাসক হিসেবে জিয়াউর রহমানের পক্ষে খুব একটা সহজ বিষয় ছিল না জাতিবাদী কর্তৃত্বের ধারণা থেকে বের হয়ে পশ্চিম ইউরোপের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের আদলে একটি দল গঠন করা এবং রাজনীতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
রাজনৈতিক দর্শনকে জিয়াউর রহমান অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যম প্রয়োগ করেন। তিনি গ্রহণ করেছিলেন রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পুঁজির বিকাশের ধারণাকে। সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিকাশে নীতি ও কৌশল প্রয়োগ করেন। তাঁর সময়ই বেসরকারি খাতে শিল্পকলকারখানার পাশাপাশি এনজিওগুলোর বিস্তার ঘটতে থাকে। সামাজিক উন্নয়নে এনজিওগুলো ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এই এনজিওগুলোই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
সারা দেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড জিয়াউর রহমান ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুদানপ্রথা তাঁর আমলেই শুরু হয়। কিন্তু এরপরও বিএনপি কি মধ্যডান না ডানপন্থী দল, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ পারলে বিএনপিকে ইসলামপন্থী দল হিসেবেই পরিচয় দেয়। কিন্তু আমরা যদি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন বিশ্লেষণ করি, বিশেষ করে তাঁর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আমলে নিই, তাহলে বিএনপিকে একটি উদার মধ্যবাম ধারার দল হিসেবেই উল্লেখ করতে হয়। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে ইউরোপীয় মধ্যবাম ধারার সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট বা লেবার পার্টির সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। তবে ভোটের রাজনীতিতে ধর্মপন্থী দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন করায় বিএনপির উদার পরিচয় অনেকটা আড়ালে চলে গিয়েছিল।
মধ্যবাম ধারার সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট রাজনীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে রাজনৈতিক উদারতা, মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, কেইনজিয়ান অর্থনৈতিক নীতি, সম্পদের সুষম বণ্টনের নিশ্চয়তা ও কল্যাণমূলক ব্যবস্থা। জিয়াউর রহমান দেশে একটি বহুদলীয় উদার রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তিনি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সুযোগ রেখেছিলেন। অর্থনীতিকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেননি। পাশাপাশি তিনি শহর ও গ্রামের ব্যবধান কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কৃষির উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি সমন্বিত যৌথ খামার পদ্ধতিরও পরিকল্পনা করেছিলেন।
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে জিয়াউর রহমান একটি উদার, বহুপক্ষীয়, সামাজিক উন্নয়ন রাজনীতির সূচনা করেছিলেন। কর্তৃত্ববাদের স্রোতে গা না ভাসিয়ে সময়ের চেয়ে জিয়াউর রহমানের ভিন্নতর এই অবস্থান দেশের রাজনীতিতে তাঁকে বিশেষ স্থান দিয়েছে।
কোনো শাসকের মতো জিয়াউর রহমানেরও সমালোচনা আছে। তবে রাজনৈতিক দর্শনের জায়গা থেকে বিবেচনা করলে তিনি সমসাময়িক আশপাশের অন্যান্য শাসকের তুলনায় ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁকে নিয়ে অপপ্রচার, নিন্দামন্দ আওয়ামী লীগ কমে করেনি। তাঁর নাম–নিশানা মুছে দিতে চেয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের খেতাব কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু দেশের পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এখন পলাতক। আর চরম দমন, নির্যাতনের মুখেও জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দল টিকে গেল হিমালয়সমান বাধাকে মোকিবেলা করে। এর কারণ, জিয়াউর রহমানের নীতি ও উদারপন্থী রাজনৈতিক দর্শন।
ড. মারুফ মল্লিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1402)
-
▼
2025
(3281)
-
▼
January
(191)
-
▼
Jan 19
(11)
- জিয়াউর রহমানের যে নীতির কারণে বিএনপি টিকে গেল by ম...
- অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনামুলক রিপোর্ট প্রত্যাহা...
- ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ প্রচারের পর সাংবাদি...
- কোন ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হতে পারে
- ইসরাইলের গড়িমসির পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি আজ
- ডোম ঘরের কান্না by মোহাম্মদ রায়হান
- ট্রাম্প শুল্ক আরোপ করলে পাল্টা জবাব দেবে কানাডা
- ট্রাম্প কি সব প্রতিশ্রুতি রাখতে পারবেন!
- টিউলিপ দুই ভুবনের রাজনীতিতেই স্বস্তিতে নেই by সলিল...
- মিয়ানমারে আটক ১৮ বাংলাদেশির ফেরার আকুতি by মিজানুর...
- খালেদা জিয়ার কাছে খবর ছিল বিএনপিকে ৩০-৪০টি আসন দেয়...
-
▼
Jan 19
(11)
-
▼
January
(191)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment