Wednesday, August 28, 2024
বিস্কিটের টিন খুলে শফিক রেহমান আমাকে বললেন: লন্ডন থেকে এসেছে, তোমার ভালো লাগবে by শায়ের খান
বিস্কিটের টিন খুলে শফিক রেহমান আমাকে বললেন: লন্ডন থেকে এসেছে, তোমার ভালো লাগবে by শায়ের খান
ফোন দেই যায় যায় দিন অফিসে। সালাম দিয়ে শফিক রেহমান'কে সরাসরি বলি - ' আপনি যে লিখলেন আমার ' হাবার স্বপ্ন ' বোরিং , কোথায় ও কেন বোরিং প্লিজ বলবেন ? ' তিনি বিব্রত হলেন । সরাসরি এ প্রশ্নের উত্তর তাঁর মাথায় ছিলো না । হোল্ড অন । আমি যেই শফিক রেহমানকে এই কথাটা বলছি , তখন তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জগতের নেপোলিয়ন বোনাপার্ট আর আমি মিডিয়ায় পিচ্চি এক ওয়েস্টার্ন কাউবয় । আমার সাহসে বিব্রত হলেও খুশি হলেন শফিক রেহমান । অফিসে আসতে বললেন ।
আমি গেলাম অনেক পরে । ২০০১ সালে । হাতে একটা লেখা নিয়ে । শফিক রেহমান ছাপলেন । আমাদের সম্পর্ক হয়ে গেলো চমৎকার । বেইলি রোডের সাপ্তাহিক যায় যায় দিন পত্রিকা অফিস হয়ে গেলো আমার প্রায়ই আড্ডা মারা আর লেখার জায়গা ।
এই অফিসে শফিক ভাইয়ের অধীনস্থ তিনজন জেনারেল ছিলো । এরা একটা রুমে পাশাপাশি টেবিলে বসে কাজ করতো । সজীব ওনাসিস , সায়ন্থ সাখাওয়াত ( এনাকে অনেকেই এখন টক শো'র সুবাদে চেনে ) ও মাহমুদুজ্জামান । আমি শফিক ভাইয়ের সাথে কাজ সেরে এদের রুমে একটু আড্ডা মেরে যেতাম । আমি মনে মনে এদের ডাকতাম থ্রি স্টুজেস । এতোদিন তারা এটা জানতো না , আজ জানলো । এদের মধ্যে সজীব ওনাসিস হচ্ছে শফিক রেহমানের রক সলিড ভক্ত । সজীব ওনাসিসের বাবা হচ্ছেন বিখ্যাত গীতিকার ফজল - এ - খোদা । উনার লেখা কালজয়ী গান হচ্ছে - ' সালাম সালাম হাজার সালাম , লাখো শহীদ স্মরণে -। '
এক বিকেলের এক মজার কথা । একটা লেখা নিয়ে শফিক ভাইয়ের অফিস রুমে ঢুকলাম । তিনি আমাকে চোখ দিয়ে মাপলেন । ভূমিকা না করেই পরাজয়ের সুরে বললেন, 'তুমি তো আমাকে হারিয়ে দিলে । ' ভাবলাম আমার গত সংখ্যার লেখাটা বেশ প্রশংসিত হয়েছে । সম্ভবত উনার 'দিনের পর দিন'কে হারিয়েছি । ভুল ভাঙলো পরের লাইনে । বললেন -' শায়ের , আমি এতোদিন ভাবতাম আমিই সবচেয়ে কালারফুল । তুমি আমাকে আজ হারিয়ে দিলে । ' আমি সেদিন হ্যাজার্ড ব্র্যান্ডের এক সিঁদুরি লাল টকটকে শার্ট পরেছিলাম । হাওয়াই মিঠাই শার্টে শফিক রেহমানের চোখেমুখে স্পষ্ট পরাজয়ের ছাপ দেখেছিলাম । লাল উনার প্রিয় ।
বাংলা লেখায় শফিক রেহমানের নিজস্ব একটা স্টাইল আছে । যেমন ক্রিয়া'কে লিখেন কৃয়া , সুশীল'কে সুশিল , প্রি-কে পৃ , শ্রী-কে শৃ । এই বানান আমার মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছিলো ।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মিডিয়ায় আমার ঘনিষ্ঠ মানুষদের অনেকেই আমার উপর কড়া নজর রাখতে শুরু করে । আমি বিএনপিপন্থী বা রাজাকার টাইপ কি না এসব । পাখির ছবির লোগো-ওয়ালা টিভি চ্যানেলের কমিশনিং এডিটর 'লীগ আদর্শের' ভদ্রলোক তো আমাকে মোটামুটি ধমকের সুরেই জিজ্ঞেস করলো , আমি শফিক রেহমানের মতো বানানে লিখি কেনো ? এই চ্যানেলে আমার কোনো অনুষ্ঠান যায়নি । ইন ফ্যাক্ট ২০০৮ সালের পর কোনো টিভি চ্যানেলেই আমার নাটক প্রচার হয়নি ।
একটা নামকরা টিভি চ্যানেলে নাকি ওয়ান ইলেভেনের সময় মিটিং করে কিছু মিডিয়া দুর্বৃত্ত বলেছিলো - আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তারা আমাকে দেখে নেবে । যাদুর মতো ওদের কথায় কাজ হয়েছিলো । আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন চ্যানেলে প্রি-প্ল্যানড অপদস্ত ও হয়রানি করা হয় আমাকে । সুসংগঠিতভাবে মিডিয়ায় আমার সম্পর্কে ' নেগেটিভ ন্যারেটিভ ' তৈরি করা হয় । ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন বা চরিত্র হনন করার চেষ্টা করা হয় একাধিকবার । হানি ট্র্যাপে বিফল হয়ে মানি ট্র্যাপ করা হয়েছিলো । একটা টিভি চ্যানেল আমাকে অপহরণ করে আটকে রেখেছিলো ।
স্বৈরাচারের প্রোপ্যাগান্ডা মেশিনের প্রধান দু'টোর একটা সেই চ্যানেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে নাকি জনতা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছে । শুনেছি সেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক এখন তার ' গম মন্ত্রী ' মালিকসহ পলাতক আছে । সম্প্রতি ছাত্র জনতার সফল অভ্যুত্থানের পর উত্তেজিত জনতা জ্বালিয়ে দেয় সেই লাল রঙের লোগোর চ্যানেল ।
শফিক রেহমান যখন সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক যায় যায় দিন প্রকাশ করেন , সেটা ছিলো একটা ইতিহাস । এ নিয়ে গুঞ্জন ছিলো - কি নিয়ে যেন আসছেন শফিক রেহমান । আমাকে তিনি তা বললেন । বললেন - ' শোনো শায়ের , আমি এমন এক জিনিস বানাচ্ছি যেখানে আমার কট্টর বিরোধীরাও আসবে । আবার আমাকে ওরা রাজাকার বলে গালি দেবে । আবার আসবে । আসতে ওদের হবেই । '
এখনকার তরুণ তরুণীরা যারা ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিস্কার করে উদাহরণ তৈরি করছো , শুনে রাখো - আজ থেকে ২ দশক আগে তেজগাঁও শিল্প এলাকার এক গাঁজা - ফেনসিডিল - পকেটমারের রাস্তাকে শফিক রেহমান ঝকঝকে পরিস্কার করে নাম দিয়েছিলেন - লাভ রোড । ভালোবাসার রাস্তা । আর সেই রাস্তায়ই ছিলো দৈনিক যায় যায় দিনের অফিস । আরো শুনে রাখো - এখন তোমরা যে ভ্যালেন্টাইন'স ডে বা ভালোবাসা দিবস পালন করো , বাংলাদেশে এটা এনেছেন এই লিভিং লেজেন্ড শফিক রেহমান ।
দেখি এক এলাহী অফিস দৈনিক যায় যায় দিনের । লাইব্রেরি থেকে থিয়েটার সবই আছে । কনফারেন্স রুম আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের নামে , ক্যাফে'র নাম চে' ( গুয়েভারা ) ক্যাফে , থিয়েটার হল আলফ্রেড হিচককের নামে । গ্রাউন্ড ফ্লোর অলমোস্ট পুরোটাই কাঁচের । দুষ্টুমি করে বললাম -' হাসিনার পোংটা পোলাপান ইট মারলে ভেঙে যাবেনা ? ' বললেন -' এটা বুলেট প্রুফ । হাসিনার পোলাপান গ্রেনেড মারলেও কিছু হবেনা । '
লিখতে শুরু করলাম দৈনিক যায় যায় দিনে ।
পরের সন্ধ্যায় শফিক ভাইকে ফোন দিলাম । অনেক আবেগঘন হয়ে বললেন তাঁর ৫০ বছরের লালিত স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আনন্দের কথা ।
তথাকথিত ওয়ান ইলেভেন হওয়ার আগে আগে শফিক রেহমান তাঁর ' বিশেষ প্রতিপক্ষ ' অফিস কর্মচারীদের ট্র্যাপে পড়েছিলেন । ব্রিটিশ নাগরিক তিনি লন্ডন যাওয়ার উদ্দেশ্যে জিয়া এয়ারপোর্টে ( এখনকার হজরত শাহজালাল ) গেলে এমিরেটসের এক অফিসারের ইশারায় উনাকে আটকে দেয়া হয় । যেতে দেয়া হয়নি । ফিরে আসেন শফিক রেহমান । আর তাঁর ' বিশেষ প্রতিপক্ষ ' কর্মচারীরা মিছিল করে করে বলে , তিনি নাকি তাদের বেতন না দিয়ে পালাচ্ছিলেন । সব্বোনাশ । বলে কি ?
আমার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেলো শুনে যে কে বা কারা তাঁকে নাকি হত্যার পরিকল্পনা করেছিলো । তাই অফিসের ভার মিস তালেয়া রেহমানের ( উনার স্ত্রী ) হাতে দিয়ে নীরবে তিনি জীবনের নিরাপত্তায় দেশ ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন । সব শুনে বললাম -' আপনি চিন্তা করবেন না । আমি আপনার পাশে আছি। '
২০০৮ সালের নির্বাচনে শফিক রেহমান তাঁর ইস্কাটনের পৈতৃক বাড়িটা বিএনপি তথা বেগম খালেদা জিয়া'র অস্থায়ী অফিস হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন । এক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলো -' এটা কি আরেক হাওয়া ভবন ? ' শফিক রেহমান উচ্চস্বরে বলেছিলেন -' হাওয়া ভবনও না বাতাস ভবনও না , এটা আমার বাবার ভবন । '
২০১২ সালের দিকে হবে । হাসিনা বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে । তখন শফিক রেহমানের যায় যায় দিন ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে । ' মৌচাকে ঢিল ' নামে একটা ম্যাগাজিন বের করেন । বাসার নিচতলায়ই এর অফিস । টিভির খবরে দেখলাম শফিক রেহমানের এই বাসায় সরকারি গুন্ডারা ককটেল হামলা করেছে । সন্ধ্যায় একাই তাঁর বাসায় গেলাম । ভূতুড়ে আলো আঁধার আর থমথমে পরিবেশ । বাসার গেইটে নক করতেই খুব ভয়ে ভয়ে সিকিউরিটি গার্ড উঁকি দিলো । পরিচয় দিয়ে খুলতে বললাম । খুললো । ঘুরে ঘুরে এফবিআই তদন্তকারীদের মতো দেখে বললাম - ' ডেঞ্জারাস কিছুনা । শব্দ করে ভয় দেখাতে এসেছিলো । '
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস স্যার যখন নোবেল প্রাইজ পান , তখন শফিক রেহমান সরাসরি ইউনূস স্যারের পাশে গিয়ে দাঁড়ান । শফিক ভাইয়ের সুখী বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এমন ছিলো , যেন উনিই নোবেল জিতেছেন । হ্যালো ইউনূস স্যার , আপনার মনে আছে তো , আপনাদের জেনারেশনের জাহাঙ্গীর ভাই ছাড়া ( মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর - আপনার প্রয়াত ছোটো ভাই ) শফিক রেহমানই একমাত্র সাংবাদিক যে আপনার গর্বে গর্বিত হয়ে বিদ্যুৎ গতিতে আপনার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ? নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে । এদেশে শফিক রেহমানই একমাত্র টিভি উপস্থাপক যিনি সাধারণ ক্যামেরা ফ্রেমের এক নন-ফিকশন ইনফোটেইনমেন্ট ' লাল গোলাপ 'কে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান করে তুলেছিলেন । জিনিয়াস এই শফিক রেহমানকেই একটি টিভি চ্যানেলের পরিচয়ের ছদ্মাবরণে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। আপনি কি একজন বাংলাদেশি ? আপনি কি নিজেকে কখনো প্রশ্ন করেছেন , একজন সিনিয়র সিটিজেন ও জনপ্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শফিক রেহমানকে কেনো মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে অমানুষিক নির্যাতন করে হুইল চেয়ারে বসিয়ে দেয়া হয় এবং কেনো তিনি দেশান্তরী হন ? আপনি সেই প্রশ্ন তুলবেন না , কারণ আপনাকে পাশের দেশের স্ক্রিপ্টে তাদের এদেশীয় দালালরা ব্রেইনে ঢুকিয়েছে যে , হলিউডের গ্রেগরি পেক হচ্ছে হিরো আলম আর দুর্বৃত্ত শাসক রাজনীতিবিদের রক্ষিতাদের ভাইরাল ভিডিও হচ্ছে ক্ল্যাসিক মুভি ।
জিনিয়াস শফিক রেহমানকে নিয়ে এতো কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই , তিনি দীর্ঘ নির্বাসনের পরে লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছেন । আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম যে উনাকে অন্যায়ভাবে নির্যাতনকারীর পতন তিনি দেখে যান কিনা । হ্যাঁ , উনি দেখলেন ।
প্রিয় শফিক রেহমান , আপনাকে আপনার ভূমিতে স্বাগত । আপনি বেশ টায়ার্ড । আপনার ককটেল বম্ব খাওয়া ইস্কাটন গার্ডেনের বাসায় বসে রিল্যাক্স করে একটা ককটেল ড্রিংক্স নিন । সেটা যদি টনিক ওয়াটার দিয়ে একেবারে ট্রান্সপারেন্ট কিছু হয় , তবে এলাচ লেবুর স্লাইস আর আইস কিউব মাস্ট । চিয়ার্স ।
লেখক - নাট্যকার - ফিল্মমেকার
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1432)
- ► 2025 (3281)
-
▼
2024
(2551)
-
▼
August
(446)
-
▼
Aug 28
(10)
- মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে: গ্রহণযোগ্য বিচারের জন্য ...
- ড. ইউনূস বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার সক্ষম...
- সরকারকে যৌক্তিক সময় দিবে, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চ...
- সিলেটে মামলা বিভ্রান্তি, দলীয় কর্মীরাও আসামি by ওয়...
- সরজমিন পঙ্গু হাসপাতাল: গুলিতে হাত-পা হারিয়ে স্বপ্ন...
- ফেনীতে বন্যা: দুর্গত এলাকায় মিলছে না চিকিৎসাসেবা b...
- বিস্কিটের টিন খুলে শফিক রেহমান আমাকে বললেন: লন্ডন ...
- সরজমিন ফেনী: ত্রাণের অপেক্ষায় by মারুফ কিবরিয়া
- জীবন শঙ্কায় গুলিবিদ্ধ মামুন by মরিয়ম চম্পা
- যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনে মুসলিম ফ্যাক্টর
-
▼
Aug 28
(10)
-
▼
August
(446)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
No comments:
Post a Comment