স্মরণ: জাদুকর হুমায়ূন by অলোক আচার্য

হুমায়ূন আহমেদ
সাহিত্যকর্ম কেন সৃষ্টি হয় এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো পাঠকের জন্য। পাঠক পাঠ করে আনন্দ পায়। আত্মার ক্ষুধা মেটায়। সাহিত্য সৃষ্টির বিচারে কে জনপ্রিয় লেখক এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। জনপ্রিয়তার ধরনেও রয়েছে পার্থক্য। তবে একটা কথা মেনে নিতে হয়, লেখকের লেখা পাঠকের অন্তরে স্থান করে নেয় তিনিই লেখক হিসেবে স্বার্থকতা পান। পাঠক মজে থাকে লেখকের লেখার জাদুতে। মঞ্চের জাদুকর কিছুক্ষণ জাদু দেখিয়ে দর্শকদের বাহবা পান।

একজন লেখক তার লেখার জাদুতে মুগ্ধ রাখেন বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। এই যেমন দেবদাস বা শেষের কবিতার অমিত বা এরকম কোনো চরিত্র নিয়ে আজও মানুষ আবেগপ্রবণ হয়, সত্যি মনে করে, অনেকটা সেরকম। তাই লেখকের চেয়ে বড় কোনো জাদুকর নেই। যেমন জাদুকর ছিলেন আমাদের প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বেঁচে থাকতে পাঠককে নিজের লেখার জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন, আবার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েও পাঠককে তার সৃষ্টির জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন। তাই এদেশের সবচেয়ে বড় জাদুকর মনে হয় তিনিই। বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রবাদ পুরুষ হুমায়ূন আহমেদ। বেঁচে থাকতে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গস্পর্শী এবং তার মৃত্যুর পরেও তার জনপ্রিয়তা কমেনি।

সহজ, সরল আর সাবলীল গতিতে সৃষ্টি হওয়া এক একটি সাহিত্যকর্ম যেন পাঠকের প্রাণ। লেখকের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো তার লেখায় পাঠককে ধরে রাখার ক্ষমতা। কোনো একটি বই পড়তে গিয়ে অর্ধেক পড়ার পর যদি বিরক্তির জন্ম হয় তখন বুঝতে হবে লেখায় পাঠককে টানার ক্ষমতা কম ছিল। একটি বইয়ের যত গভীরে যাওয়া যাবে তত বইটি শেষ করার ইচ্ছা জাগতে হবে। উপন্যাস বা ছোটগল্পের চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে কল্পনা করেও অনেক পাঠক তৃপ্তি বোধ করেন। যেমন কেউ হুমায়ূন আহমেদের হিমু সেজে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়।
  • লেখকের চেয়ে বড় কোনো জাদুকর নেই। যেমন জাদুকর ছিলেন কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বেঁচে থাকতে পাঠককে নিজের লেখার জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন, আবার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েও পাঠককে তার সৃষ্টির জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন। তাই এদেশের সবচেয়ে বড় জাদুকর মনে হয় তিনিই।
আজকের যুগে লেখালেখি করার ক্ষেত্র বা সুযোগ অনেক বেশি। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা ছাড়াও প্রতি বছর মেলায় গাদা গাদা বই প্রকাশিত হয়। প্রচুর নতুন লেখক, কবিদের আগমন ঘটে। আবার বইমেলা শেষ হলে সেসব লেখকের বেশিরভাগেরই আর দেখা পাওয়া যায় না। একজন লেখক তার লেখা চালিয়ে যান সারা বছর। পাঠকই লেখকের লেখা খুঁজে বের করে। হুমায়ূন আহমেদের চলে যাবার পর আজও সেই পাঠক তৈরি করার মতো লেখকের দেখা পাইনি। যারা লিখে এসেছে তারাই লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। হুমায়ূন আহমেদ চলে যাবার পরও প্রতিটি বইমেলায় তার বই কিনতে পাঠকদের আগ্রহ দেখেছি। তার সৃষ্টি মিসির আলী, হিমু বা রুপা চরিত্রগুলো আজও বইয়ের পাতা থেকে রাস্তায় দেখা যায়। বাংলা সাহিত্যে এত তুমুল জনপ্রিয় লেখকের দেখা খুব কমই পেয়েছে সাহিত্যনুরাগীরা।

কোনো লেখকের শূন্যতাই পূরণ হবার নয়। তিনি ছিলেন পাঠক নন্দিত লেখক। পাঠকের অন্তরে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন বলেই এমন বলা হয়। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হয়, তখনই বোঝা গিয়েছিল কথাসাহিত্যের বিশাল জগতে তিনি অল্প সময়ের জন্য আসেননি, এসেছেন রাজত্ব করতে। সাহিত্যের ভুবনে ছিলেন সম্রাট। তার পাঠক শ্রেণি ছিল আলাদা। যারা গোগ্রাসে তার লেখা পড়তো। মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রা অসাধারণ দক্ষতায় তুলে এনেছেন। অবশ্য তার সমালোচক শ্রেণিরও অভাব ছিল না। সমালোচনা তার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। তিনি তার লেখার ধরন নিজের মতো ঠিখ রেখেছেন। সে সমালোচনা তাকে আরো উঁচুতে পৌঁছে দিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের লজিক ও অ্যান্টিলজিক চরিত্র হিমু ও মিসির আলী চরিত্র দুটি আমাদের দেশে খুবই জনপ্রিয়। এ চরিত্র নিয়েই দেশে বহু আলোচনা হয়েছে। বাস্তবতার সঙ্গে মেলানোর প্রচেষ্টাও করা হয়েছে। অনেক সময় চরিত্র দুটির স্রষ্টাকেই এই চরিত্রের সত্যিকারের মানুষ বলে মনে হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশে যে তুমুল জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক ছিলেন সে কথা দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়। তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন তা জানতে হলে তার কর্ম এবং সৃষ্টির দিকে তাকাতে হবে। হুমায়ূন আহমেদের স্পর্শ যেন সফলতার অন্য নাম। সহজ, সরল সাবলীল ভাষায় পাঠককে গল্পের ভেতর টেনে নেওয়ার যে ক্ষমতা তা তার ছিল। তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সফল হয়েছেন।

প্রকৃতির প্রতি বিশেষ টান তার চরিত্রের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। ছোটবেলায় হুমায়ূন আহমেদ ভালোবাসতেন সবুজ অরণ্য, বৃষ্টি আর টিনের চালে সেই ছন্দ, বৃষ্টির পানিতে ভেজা। তার তৈরি নুহাশপল্লীতে তিনি সেভাইে সাজিয়েছিলেন প্রকৃতিকে। তার লেখার বহু বর্ণনায় সেসব পাওয়া যায়।

বিংশ শতাব্দির জনপ্রিয় বাঙালি ঔপন্যাসিকদের তিনি অন্যতম। তার এই লেখার জাদুতে আরো বহু যুগ পাঠক মুগ্ধ থাকবে। বহু যুগ পার হয়ে গেলেও পাঠক হুমায়ূন আহমেদে মশগুল থাকবে—এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

>>>লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক
sopnil.roy@gmail.com