লোহিত সাগরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার: ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধের ঘোষণা সৌদি আরবের

রয়টার্সঃ লোহিত সাগর দিয়ে নিজেদের তেল পরিবহনের ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। হামলার শিকার হওয়ার পর তারা তেল রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ এ পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিল। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার মধ্যেই এ হামলা হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। ইরাকে তৎপর থাকা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এ হামলা চালিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বাগদাদ ও রিয়াদ। হামলার পর আজ শনিবার ইরাকের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

আরব উপদ্বীপজুড়ে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৪৫ মাইল) দীর্ঘ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনটি সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জট এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ করে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাইপলাইনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা চালানো হয়। এরপর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তারা পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিয়েছে।

হামলাটি এমন সময়ে হয়েছে, যখন ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান

ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন বাব আল–মানদেব প্রণালি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া ও ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ ঘোষণার ফলে আরব উপদ্বীপের দুপাশেই জ্বালানি সরবরাহে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

ইয়েমেনের চারটি সরকারি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছে, গতকাল শুক্রবার হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখল করেছে।

সৌদি আরবের পাইপলাইন ও পেরিম দ্বীপে হামলা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও থমকে গেছে।

কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, সৌদি আরব হুতিদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে। এমন সময়ে এ অনুরোধ জানানো হলো, যখন যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল চাপে রয়েছে।

এ বছর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ইরান যুদ্ধ শুরু করার পর নিজ দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি এরই মধ্যে রাজনৈতিকভাবে ইরান যুদ্ধের খেসারত দিচ্ছে।

ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনে কারা হামলা চালিয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। স্যাটেলাইটের ছবিতে পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন ও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তেল রপ্তানিতে এর কী প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।

এদিকে ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আজ শনিবার দেওয়া এক বিবৃতি অনুযায়ী, বরখাস্ত হওয়া ইরাকি সামরিক কমান্ডার মাইসান প্রদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকে ইরানের সীমান্তবর্তী মাইসান প্রদেশকে দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ও প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইরাক সরকার সৌদি আরবে এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবের কাছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধও করেছেন। তবে এখনই এ অনুরোধে সাড়া দিচ্ছে না সৌদি আরব।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরাকের অনুরোধের পরও সৌদি আরব এখন পর্যন্ত পাল্টা হামলা না চালানোর সিদ্ধান্তে অটল আছে। তবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ‘প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার’ অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) গতকাল জানিয়েছে, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা এর পেছনে আংশিকভাবে দায়ী।

এদিকে ইরাক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরান সীমান্তের শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধ করে দিয়েছে। দুটি নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছে। ইরান থেকে ইরাকে সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানির অন্যতম প্রধান পথ এ শালামচেহ সীমান্তপথ।

ওই দুই সূত্র বলেছে, পাইপলাইনে হামলার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করতে বড় পরিসরে অভিযান চলছে।

পাল্টা হামলার প্রস্তুতি

জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মানদেব প্রণালি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন হুতি যোদ্ধারা।

ইয়েমেনের স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি এ কথা জানিয়েছে। তাঁদের ভাষ্যমতে, গতকাল লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালির ঠিক মাঝে অবস্থিত একটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয় হুতিরা। এর মাধ্যমে পুরো প্রণালিতেই তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সরকারি কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, ময়উন নামের দ্বীপ (পেরিম নামেও পরিচিত) থেকে গত বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর সশস্ত্র হুতি যোদ্ধাদের বহনকারী নৌযান ওই দ্বীপে পৌঁছায়।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে বলেছেন, সশস্ত্র ব্যক্তিরা বাব আল-মানদেব উপকূলজুড়ে মোতায়েন রয়েছেন ও সামরিক যানবাহনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

ইরান-সমর্থিত হুতিরা গত সপ্তাহে বাব আল-মানদেব এলাকায় সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরুর পর কয়েক শ মানুষ নিহত হয়েছে। ইয়েমেনি বাহিনী বলেছে, তারা হুতিদের দখলে নেওয়া এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে।

রয়টার্স বৃহস্পতিবার বলেছিল, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে হুতিদের নাটকীয় অগ্রযাত্রায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ইরানের দুটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইরান হুতিদের সৌদি আরবে হামলা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছিল। এ কাজে সহায়তার জন্য আরও অর্থ, অস্ত্র ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল তেহরান।

ইরান হুতিদের মিত্র হিসেবে বর্ণনা করে। তবে প্রকাশ্যে তাদের সামরিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার কথা অস্বীকার করে। ইরানের ভাষ্য, হুতিরা তাদের ‘প্রক্সি বাহিনী নয়’।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, আগে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সৌদি জাহাজ ছাড়া বাকি সব জাহাজের জন্য সমুদ্রপথে চলাচল নিরাপদই রয়েছে।

সৌদি আরব সহায়তা চেয়েছে

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র গতকাল রয়টার্সকে বলেছে, হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করেন।

এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

সূত্র দুটি জানায়, ওয়াশিংটন রিয়াদকে বলেছে, আপাতত তারা হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়। তবে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করবে।

দুই নেতার মধ্যে কোনো ফোনালাপ হয়েছে কি না—রয়টার্সের এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিয়মিত যোগাযোগ চলছে।

পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। স্যাটেলাইটে এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। হিজাজ অঞ্চল, সৌদি আরব। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। স্যাটেলাইটে এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। হিজাজ অঞ্চল, সৌদি আরব। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: রয়টার্স