Monday, July 6, 2026
বাল্যবিবাহ এবং আমাদের মাধ্যমিক পড়াশোনায় বাধা by জান্নাতি আক্তার
বাল্যবিবাহ এবং আমাদের মাধ্যমিক পড়াশোনায় বাধা by জান্নাতি আক্তার
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, একটি মেয়েকে স্কুলে যাওয়ার বয়সে যদি ঘরে আটকে রাখা হয়, তার জীবন কতটা কঠিন হয়ে যায়? সে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলার আনন্দ উপভোগ করতে চায়, নতুন কিছু শিখতে চায়, কিন্তু সে বাধাপ্রাপ্ত হয়। স্কুলে নিয়মিত যাওয়া কঠিন হয়ে যায়, পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি অসম্ভব হয়ে যায়, হোমওয়ার্ক করা মুশকিল হয়ে ওঠে। তার স্বপ্ন থেমে যায়।
মাধ্যমিক শিক্ষা হলো এমন এক সময়, যখন একটি শিশু তার ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করে। কিন্তু বাল্যবিবাহ সেই সময়কেই ভেঙে দেয়। ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত থাকা, পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া, নতুন কিছু শেখা—সবই বাধাপ্রাপ্ত হয়। ঘরের দায়িত্ব, সংসার পরিচালনা, সন্তান দেখাশোনার মতো দায়িত্ব এসে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সে তার স্বপ্ন পূরণের পথ হারিয়ে ফেলে।
শুধু পড়াশোনা নয়, বাল্যবিবাহ মেয়েদের মানসিক ও সামাজিক জীবনকেও প্রভাবিত করে। বন্ধুর সঙ্গে খেলার সময় কমে যায়। নতুন কিছু শেখার সুযোগ সীমিত হয়। সমাজের নানা রকম সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। কেউ বলে, ‘ছোট বয়সে বিয়ে করলে কী হবে?’ বা ‘এটা ঠিক হয়নি।’ এই কথাগুলো শিশুর মনকে আরও দমিয়ে দেয়, তার স্বপ্নের জগৎকে ছোট করে দেয়।
বাল্যবিবাহের ফলে স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেয়েরা প্রাকৃতিকভাবে বয়সের জন্য প্রস্তুত নয়। যখন তারা সন্তান ধারণ করে, তখন তাদের শরীর ও মন উভয়ই প্রভাবিত হয়। ক্লাসে যাওয়া বা হোমওয়ার্ক করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে বাল্যবিবাহের প্রভাব আরও বেশি। অনেক পরিবার মেয়েকে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেয়ে বিয়ে করাতে আগ্রহী। কেউ ভাবেন, ‘মেয়ের নিরাপত্তা সবচেয়ে বড়।’ কিন্তু বাস্তবে নিরাপত্তার নামে মেয়েদের পড়াশোনা ও স্বপ্ন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। স্কুল হলো প্রতিটি শিশুর জন্য জ্ঞান ও স্বাধীনতার জায়গা। বাল্যবিবাহ তা বন্ধ করে দেয়।
আপনি যদি একনজরে দেখেন, দেশের বহু গ্রামের মেয়েরা মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছাতে পারে না। তারা ছোট বয়সেই সংসারের দায়িত্বে আবদ্ধ হয়। বন্ধুর সঙ্গে খেলাধুলা, স্কুলে যাওয়ার আনন্দ, নতুন বই পড়ার সুযোগ—সবই সীমিত হয়ে যায়। অনেক সময় তারা হতাশ হয়। স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। তারা মনে করে, ‘আমার জীবন শেষ।’
তবে শুধু স্কুলে যাওয়া বন্ধ হওয়া নয়; বাল্যবিবাহ মেয়েদের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তিকেও নষ্ট করে। তারা নিজের ক্ষমতা ও সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করে। মনে হয়, ‘আমি কীভাবে বড় হয়ে নিজের জীবন গড়ব?’ বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। নতুন কিছু শেখার আগ্রহও কমে যায়। মানসিক চাপ বাড়ে।
আমরা যদি সত্যিই চাই আমাদের মেয়েরা স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়, তাহলে বাল্যবিবাহ রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ, সরকার—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মা–বাবা যদি সচেতন থাকেন, তাঁরা মেয়েকে ছোট বয়সে বিয়ে না দিয়ে পড়াশোনায় সহায়তা করতে পারেন। তাঁরা মেয়েকে বলবেন, ‘তুমি পড়াশোনা করো, বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াও।’ এই ছোট্ট কথাগুলোই মেয়ের জন্য বড় শক্তি। শিক্ষকেরা মেয়েদের উৎসাহিত করবেন। বন্ধুরা সহমর্মিতা দেখাবে। সমাজও সমর্থন করলে বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব।
আইনও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আইন আছে। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হয় না। অনেক পরিবার আইনের উপেক্ষা করে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেয়। স্কুলের পরিবেশ, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আর আইনের কঠোর প্রয়োগ—সব মিলিয়ে আমাদের সমাজে মেয়েদের শিক্ষার পথ খোলা রাখতে হবে।
মাধ্যমিক পড়াশোনা মেয়ের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি তার স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। বাল্যবিবাহ সেই সম্ভাবনা কেড়ে নেয়। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে। প্রতিটি মেয়েকে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে, তার পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হবে।
আজও অনেক মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে পড়েছে। কেউ চাকরি করছে না, কেউ ব্যবসা করছে না, কেউ একাই সংসার সামলাচ্ছে। তারা প্রমাণ করছে—বাল্যবিবাহ শুধু তাদের শিক্ষা ও স্বপ্নকে থামায়, কিন্তু সাহস ও সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নষ্ট করতে পারে না। তারা বড় হয়ে জীবন গড়ার চেষ্টা করছে।
আমরা সবাই যদি সচেতন হই, তাহলে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব। পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু, সমাজ—সবাইকে মেয়েদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের শিক্ষা চালিয়ে নিতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা শেষ করার সুযোগ দিতে হবে। এভাবে তারা স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।
শিক্ষিত মেয়ে শুধু নিজের জীবন গড়বে না, সমাজ ও দেশের জন্যও উপকার করবে। সে ভালো চাকরি করতে পারবে। নিজের পরিবারকে সাহায্য করতে পারবে। সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করতে পারবে। সমাজে উদাহরণ স্থাপন করতে পারবে। বাল্যবিবাহ সবকিছু ধ্বংস করে। তাই এটি রোধ করা জরুরি।
আমাদের সমাজের প্রত্যেককে বোঝানো দরকার, বাল্যবিবাহ মানে কোনো সুবিধা নয়; এটি শিশুর জীবন, স্বপ্ন ও শিক্ষা নষ্ট করে। আমাদের কাজ হলো মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া, তাদের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করা। ছোট্ট শিক্ষার্থীরাও বুঝতে পারবে—পড়াশোনা করা জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
* জান্নাতি আক্তার, শিক্ষার্থী
- ঝুমুরবাড়ি দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1406)
-
▼
July
(209)
-
▼
Jul 06
(6)
- খামেনির শেষবিদায়ের অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাব...
- খামেনির জানাজায় শত্রুদের প্রতিরোধ আর ট্রাম্পকে হত্...
- ইসরাইলকে বন্ধুতালিকায় রাখছেন না ট্রাম্প!
- যে কারণে রাতে খাওয়ার পর থালাবাসন না মেজে ফেলে রাখব...
- বাল্যবিবাহ এবং আমাদের মাধ্যমিক পড়াশোনায় বাধা by ...
- মদ-ড্রাগকে বিদায়, নতুন ‘নেশায়’ ভারতের জেন-জিরা
-
▼
Jul 06
(6)
-
▼
July
(209)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment