Monday, July 6, 2026
মদ-ড্রাগকে বিদায়, নতুন ‘নেশায়’ ভারতের জেন-জিরা
মদ-ড্রাগকে বিদায়, নতুন ‘নেশায়’ ভারতের জেন-জিরা
ভেতরে ঢুকে প্রায় পাঁচ হাজার দর্শক জুতা খুলে মেঝেতে পা গুটিয়ে বসে পড়েন। আলো নিভে আসে। সামনের সারিতে এক তরুণী মা তার শিশুকে কাঁধে নিয়ে সংগীত শুরুর অপেক্ষায়।
তবে এটি কোনো সাধারণ পপ বা ইলেকট্রনিক মিউজিক কনসার্ট নয়। স্পিকারে বেজে ওঠে শতাব্দীপ্রাচীন হিন্দু ভক্তিমূলক সংগীত- ‘ভজন’, যা সাধারণত মন্দির বা ধর্মীয় শোভাযাত্রায় শোনা যায়।
সংগীতের তালে তালে দর্শকদের বড় একটি অংশ উঠে দাঁড়ায়। তারা একসঙ্গে হাততালি দেয়, ভজন গায় এবং নাচে। পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। কিন্তু এখানে নেই মদ, মাদক কিংবা ধূমপানের কোনো আয়োজন। বরং আয়োজকদের পক্ষ থেকেই অ্যালকোহল ও মাদক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর অংশগ্রহণকারীরাও সেটিই সমর্থন করছেন।
তরুণদের নতুন আকর্ষণ ‘ভজন ক্লাবিং’
ভারতে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘ভজন ক্লাবিং’ নামে নতুন একটি সাংস্কৃতিক ধারা। এটি মূলত ‘সোবার ক্লাবিং’ বা ‘কফি রেভ’-এর ভারতীয় সংস্করণ, যেখানে মাদক বা মদ ছাড়াই সংগীত ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করেন তরুণরা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জেন-জি প্রজন্ম ধীরে ধীরে অ্যালকোহল ও মাদক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় যেমন ‘সোবার কিউরিয়াস’ সংস্কৃতি জনপ্রিয় হচ্ছে, তেমনি ভারতে তার ধর্মীয় সংস্করণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘ভজন ক্লাবিং’।
২৫ বছর বয়সী জিল ভীরা প্রথমবারের মতো এমন একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বলেন, এমন একটি কনসার্ট, যা সত্যিই মানুষকে ঈশ্বরের কাছাকাছি নিয়ে যায়। অভিজ্ঞতাটি ছিল অসাধারণ।
তিনি বলেন, সাধারণ কনসার্টে ধূমপান, ভেপিং বা মদ্যপান খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এখানে এসে মাখন-ঘোল পান করাই যেন আমার কাছে অ্যালকোহলের বিকল্প হয়ে উঠেছিল।
প্রার্থনা ও পার্টির মিশেল
ভজন ভারতের শত শত বছরের পুরোনো ভক্তিমূলক সংগীত। সাধারণত মন্দির, ধর্মীয় শোভাযাত্রা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে পরিবেশিত হয়।
তবে নতুনত্ব এসেছে এর উপস্থাপনায়। এখন বড় ভেন্যুতে টিকিট কেটে এসব অনুষ্ঠান দেখতে আসছেন মানুষ। থাকছে স্মোক মেশিন, বিশাল এলইডি স্ক্রিন, আলোকসজ্জা ও আধুনিক কনসার্টের সব আয়োজন।
২৬ বছর বয়সী ধ্বনি পারাডিয়া বলেন, ধোঁয়া, আগুনের বিশেষ প্রভাব আর সংগীতের বিট- এসবই আমাদের প্রজন্মের সঙ্গে মানিয়ে যায়।
তার ছোট বোন ২৩ বছর বয়সী ফিওনি পারাডিয়ার ভাষায়, মঞ্চের সাজসজ্জা অনেকটা টেকনো কনসার্টের মতো। তাই এটি জেন-জি প্রজন্মকে সহজেই আকর্ষণ করছে।
ব্যাকস্টেজ সিবলিংসের হাত ধরে জনপ্রিয়তা
এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভাই-বোনের সংগীত জুটি ‘ব্যাকস্টেজ সিবলিংস’। ছোটবেলা থেকেই তারা ভজন গেয়ে আসছেন। এখন আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন শহরে তরুণদের কাছে ভজনকে নতুনভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। এই
জুটির সদস্য রাঘব আগারওয়াল বলেন, অ্যালকোহল আর ক্লাবিং এক জিনিস নয়। অ্যালকোহল মানে নেশা, আর ক্লাবিং মানে আনন্দ উপভোগ করা।
তার বোন প্রাচি আগারওয়াল বলেন, এখানে মানুষ দাদা-দাদি, বাবা-মা, বন্ধু কিংবা সঙ্গী- যাকে খুশি সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি কোটি দর্শক
ভারতের অন্যতম প্রাচীন সংগীত প্রতিষ্ঠান সারেগামাও এই উদ্যোগে সমর্থন দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব অনুষ্ঠানের ভিডিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কনসার্টের আলোয় হাজারো মানুষের একসঙ্গে ভজন গাওয়া, খালি পায়ে নাচ, আবেগে কান্না কিংবা অপরিচিত মানুষকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ দেখছেন।
সমর্থকদের মতে, এটি কঠোর ধর্মীয় নিয়মের বাইরে গিয়ে আধ্যাত্মিকতার একটি সহজ ও উন্মুক্ত প্রকাশ। তবে সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, এ ধরনের অনুষ্ঠান আধ্যাত্মিকতাকে বিনোদন ও বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করছে।
ধর্মীয় অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালে ভারতের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী এক দশকে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
একই সময়ে ভারতে হিন্দু ধর্মীয় পরিচয় ও প্রতীকও জনজীবনে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এতে দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রকাশ্যে ‘ভজন ক্লাবিং’-এর প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, জেন-জি প্রজন্ম ভজনের মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রেখে এটিকে নিজেদের জীবনযাত্রার অংশ করে নিয়েছে- এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।
কেন আকৃষ্ট হচ্ছে তরুণরা?
সনাতন জার্নি’র আয়োজক নিকুঞ্জ গুপ্তা জানান, এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সদ্য স্নাতক বা কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণ।
তার ভাষায়, মানুষের জীবনে এখন প্রচুর উদ্বেগ ও মানসিক চাপ। এখানে এসে তারা স্বস্তি অনুভব করে।
ভারতের গড় বয়স মাত্র ২৯ বছর, যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার দেশে পরিণত করেছে। দেশটির তরুণরা আগের তুলনায় আরও বেশি শিক্ষিত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তবে সীমিতসংখ্যক চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে তাদের অনেকেই হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এমন বাস্তবতায় কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও ভজনের আসর তাদের মানসিক শান্তি, আনন্দ ও একাত্মতার অনুভূতি এনে দিচ্ছে।
বর্তমানে মুম্বাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন শুরু হয়েছে।
নিকুঞ্জ গুপ্তা বলেন, মদ্যপানের পরের ক্লান্তি নয়, এখান থেকে মানুষ মানসিক প্রশান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরে। সম্ভবত এ কারণেই আরও বেশি তরুণ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া ফিওনি পারাডিয়া বলেন, প্রত্যেক মানুষই নিজের মতো করে আধ্যাত্মিকতার সন্ধান পান। এটি এমন একটি অভিজ্ঞতা, যা অন্তত একবার চেষ্টা করে দেখা উচিত।
আর তার চাচাতো বোন হেতা সোলাঙ্কির ভাষায়, একবার আসুন, তারপর দেখবেন আপনি নিজেই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। সত্যিই দারুণ আনন্দের অভিজ্ঞতা।

About: Mids
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1406)
-
▼
July
(209)
-
▼
Jul 06
(6)
- খামেনির শেষবিদায়ের অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাব...
- খামেনির জানাজায় শত্রুদের প্রতিরোধ আর ট্রাম্পকে হত্...
- ইসরাইলকে বন্ধুতালিকায় রাখছেন না ট্রাম্প!
- যে কারণে রাতে খাওয়ার পর থালাবাসন না মেজে ফেলে রাখব...
- বাল্যবিবাহ এবং আমাদের মাধ্যমিক পড়াশোনায় বাধা by ...
- মদ-ড্রাগকে বিদায়, নতুন ‘নেশায়’ ভারতের জেন-জিরা
-
▼
Jul 06
(6)
-
▼
July
(209)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment