ইরানে চীনের এইচকিউ-৯বি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
এর আগে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময়, পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার জবাবে চালানো অভিযানে পাকিস্তানে এইচকিউ-৯বি কাক্সিক্ষতভাবে লক্ষ্যবস্তু রক্ষা করতে পারেনি বলে অভিযোগ ওঠে। ইরানেও এর দুর্বল পারফরম্যান্স সামরিক বিশ্লেষকদের এইচকিউ-৯বি’র সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে। তবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এই ব্যর্থতা ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দিতে পারে। আবার এটাও সম্ভব যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত বিমান শক্তি এইচকিউ-৯বি-নির্ভর অবকাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে চাপে ফেলে দিয়েছে। বিশেষত উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা শুরুর পর তড়িঘড়ি করে এটি গড়ে তোলা হয়েছিল।
এইচকিউ-৯বি কেমন ব্যবস্থা?
চায়না অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন (সিএএসআইসি) নির্মিত এইচকিউ-৯বি মূলত রাশিয়ার এস-৩০০ পিএমইউএবং যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট পিএসি-২ সিস্টেম দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও পরবর্তীতে এটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়। ২০০৬ সালে প্রথম পরীক্ষা করা হয় এবং গত এক দশক ধরে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর পাল্লা প্রায় ২৬০ কিলোমিটার এবং এটি প্রায় ৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় উঠে উচ্চ-উচ্চতায় থাকা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম। সক্রিয় রাডার হোমিং এবং প্যাসিভ ইনফ্রারেড সিকার প্রযুক্তির কারণে এটি স্টেলথ বিমানের বিরুদ্ধেও কার্যকর বলে দাবি করা হয়। খবরে বলা হয়, এইচকিউ-৯বি একসঙ্গে ৬-৮টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এবং প্রায় ১০০টি লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে সক্ষম। চীনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বেইজিং, তিব্বত ও দক্ষিণ চীন সাগরে এই সিস্টেম মোতায়েন রয়েছে। ফলে এটি চীনের আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের একটি প্রধান অংশ।
ইরানের অস্ত্রভাণ্ডারে এইচকিউ-৯বি’র ভূমিকা
উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় ইরান তার সামরিক ভাণ্ডার শক্তিশালী করতে শুরু করে। চীনের সঙ্গে ‘তেলের বিনিময়ে অস্ত্র’ চুক্তির আওতায় ইরান এইচকিউ-৯বি সংগ্রহ করে। ২০২৫ সালের সংঘাতে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে রাশিয়ার এস-৩০০পিএমইউ-২ দুর্বল পারফরম্যান্স দেখানোর পর এইচকিউ-৯বি ছিল ইরানের বড় আপগ্রেড। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এইচকিউ-৯বি দীর্ঘপাল্লার প্রতিরক্ষা স্তর গঠন করেছিল। এটিকে সহায়তা করছিল এস-৩০০পিএমইউ-২ ও বাভার-৩৭৩ (দীর্ঘপাল্লা), খোরদাদ-১৫ ও রাদ (মাঝারি পাল্লা), এবং স্বল্পপাল্লার তোর-এম২, প্যান্টসার-এস১, জোলফাকার ও কৌশলগত এমএএনপিএডিএস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। সম্ভবত নাতাঞ্জ পারমাণবিক কমপ্লেক্স, ফোরদো সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি এবং তেহরান ও ইসফাহানের নিকটবর্তী বিমানঘাঁটির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর চারপাশে এইচকিউ-৯বি মোতায়েন ছিল।
দ্রুত উত্তেজনা বৃদ্ধি
সপ্তাহ ও মাসব্যাপী উত্তেজনাপূর্ণ বাক্যবিনিময়ের পর শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিভিন্ন শহরে সমন্বিত হামলা চালায়। যার জবাবে তেহরান তীব্র প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেছে। ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২০টির বেশি, রাজধানী তেহরানসহ এই হামলার প্রভাব পড়েছে। হামলা ও পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রভাবিত হয়েছে। বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর একটি দুবাই বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইরান সংঘাতের পরিধি বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মাধ্যমে তারা বার্তা দিয়েছে যে, শত্রুপক্ষের সঙ্গে অবস্থান নিলে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হামলায় নিহত হয়েছেন এবং তেহরান ঘোষণা দিয়েছে তাকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণাত্মক অভিযান’ চালানো হবে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প খামেনিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে দুষ্ট ব্যক্তিদের একজন’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান যতদিন প্রয়োজন, ততদিন চলবে।

No comments