সৌদি যুবরাজের অনুরোধেই কি তাহলে ইরানে হামলা চালালেন ট্রাম্প
এমন এক সময়ে সৌদি আরব এই লবিং করছিল, যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী প্রায় চার দশক ক্ষমতায় থাকা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে উৎখাত করার লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করছিল।
ওই চার ব্যক্তি বলেন, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত মাসে ট্রাম্পকে বেশ কয়েকবার ব্যক্তিগতভাবে ফোন করেন। জনসমক্ষে ইরান বিষয়ে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বললেও গোপনে তিনি মার্কিন হামলার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানকে তাঁর দেশের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখেন। তিনি দীর্ঘ সময় থেকে ইরানে মার্কিন হামলার জন্য প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করে আসছিলেন।
এই দুই দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ট্রাম্পকে ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর ওপর ব্যাপক বিমান হামলার নির্দেশ দিতে প্রভাবিত করে। হামলার প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে খামেনি ও বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী অন্তত এক দশকে ইরানের বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি ছিল না। তা সত্ত্বেও এ হামলা চালানো হয়েছে। অথচ ৯ কোটির বেশি মানুষের দেশটিতে সরকারকে উৎখাতের জন্য পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান থেকে কয়েক দশক ধরে বিরত ছিল ওয়াশিংটন।
গত শনিবারের হামলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা সেই দীর্ঘকালীন মার্কিন নীতিতে ছেদ ঘটিয়েছে। তা ছাড়া এটি ট্রাম্পের আগের সামরিক অভিযানগুলো থেকে লক্ষণীয়ভাবে ভিন্ন। আগের অভিযানগুলো ছিল অনেক বেশি সীমিত ও কম বিস্তৃত।
ট্রাম্পকে এখন সেই বাজির ঝুঁকি নিতে হবে, যা তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। বাজিটি হলো শুধু আকাশপথে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মাটির রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে যখন মার্কিন বোমা হামলা হচ্ছিল, তখন ইরানের নাগরিকদের অনেকটা উসকানি দিয়ে এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আজ রাতে যা করতে যাচ্ছি, তা আগে কোনো প্রেসিডেন্ট করতে চাননি। এখন আপনারা এমন একজন প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন, যিনি আপনাদের চাওয়া পূরণ করছেন। দেখা যাক, আপনারা এখন কী করেন।’
এমন এক সময়ে সৌদি আরব এই হামলার জন্য চাপ দিচ্ছিল, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দেশটির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য জেনেভায় পৌঁছান।
সে আলোচনা চলাকালে সৌদি যুবরাজ ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি ফোনালাপ হয়। এরপর রিয়াদ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়, ইরানের ওপর কোনো হামলায় মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবেন না।
তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় সৌদি যুবরাজ বিন সালমান ভিন্ন সতর্কবার্তা দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, যুবরাজ মার্কিন কর্মকর্তাদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এখনই হামলা না চালায়, তবে ইরান ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।
২০০৩ সালে ইরাকে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি সামরিক শক্তির উপস্থিতি রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর পক্ষে মত দেন সৌদি যুবরাজ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অবস্থানকে তাঁর ভাই ও সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান সমর্থন জানান। গত জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনিও হামলা না চালানোর বিভিন্ন নেতিবাচক দিক নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, মোহাম্মদ বিন সালমানের চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা বলেন, সৌদি আরবের নেতার এ জটিল অবস্থানে সম্ভবত দুটি বিষয়ের প্রতিফলন রয়েছে। একদিকে তিনি ইরানের পাল্টা হামলা থেকে নিজ দেশের সংবেদনশীল তেল অবকাঠামোকে সুরক্ষিত রাখতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে তিনি তেহরানকে মধ্যপ্রাচ্যে রিয়াদের প্রধান শত্রু বলে মনে করেন।
শিয়াপ্রধান ইরান ও সুন্নিপ্রধান সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের এ বিরোধ পুরো অঞ্চলে ছায়া যুদ্ধ তৈরি করে রেখেছে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দফার হামলার পর ইরান সৌদি আরবের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়। এর প্রতিবাদে রিয়াদ একটি ক্ষুব্ধ বিবৃতি দেয়। সেখানে তারা ইরানের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ‘প্রয়োজনীয় ও চূড়ান্ত ব্যবস্থা’ নেওয়ার আহ্বান জানায়।
এ বিষয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করলেও সৌদি দূতাবাস কোনো সাড়া দেয়নি।
বৃহস্পতিবার জেনেভায় উইটকফ ও কুশনার ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের শেষ বৈঠকটি করেন। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে এটি ছিল তাদের তৃতীয় উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাৎ। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, তাঁরা এ বিশ্বাস নিয়ে ফিরে আসেন যে তেহরান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে তাঁদের সঙ্গে খেলা করছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, একটি বিষয় খুব স্পষ্ট ছিল, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখা তাঁদের উদ্দেশ্য, যাতে সময়–সুযোগমতো তারা পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারে।
আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় দলীয় প্রাথমিক বাছাইয়ের (প্রাইমারি) প্রচারে অংশ নিতে শুক্রবার বিকেলে ট্রাম্প যখন টেক্সাসের করপাস ক্রিস্টি শহরে পৌঁছান, তখন তাঁর হতাশা ও ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। তিনি বারবার ঘোষণা করেন, ইরানি আলোচকদের ওপর তিনি ‘সন্তুষ্ট নন’।
জ্বালানি নীতির ওপর দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তৃতার শেষ দিকে জনতার উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার সামনে এখন অনেক কিছু চলছে। আমাদের একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আপনারা তা জানেন। এটি সহজ নয়, মোটেও সহজ নয়। আমাদের খুব বড় একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
পরে ট্রাম্প সাপ্তাহিক ছুটি কাটানোর জন্য ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের সৈকত শহর পাম বিচে যান। সেখানে শুক্রবার সন্ধ্যায় নিজের মালিকানাধীন মার-এ-লাগো রিসোর্টে সমর্থকদের সঙ্গে সময় কাটান তিনি।
সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তির মতে, ট্রাম্পকে তখন ক্লান্ত দেখালেও তিনি বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। এরপর তিনি নিজের ব্যক্তিগত কক্ষে চলে যান এবং হামলার ঘোষণা দিতে একটি ভাষণ রেকর্ড করেন।
![]() |
| হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে বৈঠক হয়। ১৮ নভেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স |

No comments