Monday, August 4, 2025
কাঠগড়ায় প্রধান বিচারপতি: হাসিনার বিচার বিভাগ ধ্বংসের পরিণতি by কামাল আহমেদ
কাঠগড়ায় প্রধান বিচারপতি: হাসিনার বিচার বিভাগ ধ্বংসের পরিণতি by কামাল আহমেদ
উদ্বেগের কথা হলো, গত আট বছরে এর সব ঘটনাই বাংলাদেশে ঘটেছে। এটি এমন এক করুণ ঘটনাক্রম, যেখানে দেখা যায়, একচ্ছত্র ক্ষমতাধর শাসক হয়ে ওঠা শেখ হাসিনা কীভাবে ঠান্ডা মাথায় ধাপে ধাপে দেশের বিচার বিভাগকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।
এই ধ্বংসের অন্যতম মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা ছিল সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করা। এই সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর ফলে শেখ হাসিনা টানা তিনটি একতরফা নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছেন এবং ক্ষমতায় নিজের অবস্থান শক্ত সংহত করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের এই সংশোধনী নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার ছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তিনি উন্মুক্ত আদালতে ঘোষিত সংক্ষিপ্ত আদেশ পরে পাল্টে দেন এবং অবসর নেওয়ার ১৬ মাস পরে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। অনেকেই মনে করেন, এটি শুধু বিচারিক অসদাচরণ নয় বরং এটি ছিল প্রতারণা বা জালিয়াতির মতো কিছু।
এ ধরনের আচরণ বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও সততার যেই মান থাকা উচিত, তার বড় বিচ্যুতি। এতে বিচার বিভাগের প্রতি জনসাধারণের আস্থা অনেকটাই নষ্ট হয়েছে। অনেকে সন্দেহ করেন, পূর্ণাঙ্গ রায় দিতে ইচ্ছা করে দেরি করা হয়েছিল, যাতে শেখ হাসিনা ওই সংক্ষিপ্ত আদেশ এড়িয়ে আইন পাস করতে পারেন। কারণ, সংক্ষিপ্ত আদেশে আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করতে হতো। এ সুযোগটাই হাসিনা কাজে লাগান। সংসদের একটি কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে দুই মেয়াদে বহাল রাখার সুপারিশ করলেও তিনি তা উপেক্ষা করে সেটি পুরোপুরি বাতিল করে দেন।
তার চেয়েও চিন্তার বিষয় হলো তৎকালীন বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছিল যে যখন তাঁর বেঞ্চে সরকারের বিরুদ্ধে কিছু মামলা চলছিল, সে সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্রাণ তহবিল থেকে তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলেন। এমন কাজ বিচারিক নৈতিকতার দিক থেকে একটি বড় আপস বা দুর্বলতাকেই সামনে আনে।
সমালোচকেরা আরও বলেন, খায়রুল হক অবসরের পরও অনেক বছর আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে চুক্তিভিত্তিক কাজ করে গেছেন। এই পদে তাঁর নিয়োগ বারবার বাড়ানো হয়। শেখ হাসিনার সরকারের পতন পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় তিনি নিজে রায় দিয়েছিলেন—বিচারপতিরা অবসর নেওয়ার পর লাভজনক কোনো রাষ্ট্রীয় পদ গ্রহণ করতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে তিনি নিজেই ঠিক সেই কাজ করেছেন। তিনি এমন একটি সরকারের অধীনে চাকরি করেছেন, যে সরকার তাঁর বিচারিক রায়েই সবচেয়ে বড় সুবিধা পেয়েছিল।
তবে খায়রুল হক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) বিচারক হওয়ার চেষ্টা করেও সফল হননি। শেখ হাসিনার সরকার ২০১৫ ও ২০২০ সালে তাঁকে দুবার প্রার্থী করেছিল। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রবল আপত্তি এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সমর্থনের অভাবে শেষ পর্যন্ত উভয়বারই তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
সম্প্রতি খায়রুল হকের গ্রেপ্তার নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই অস্বস্তি বোধ করছেন, কারণ যেসব অভিযোগ বা বিচারিক অসদাচরণের কথা আগেই বলা হচ্ছিল, সেসবের কোনোটিতেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বরং তাঁকে আটক করা হয়েছে হত্যার অভিযোগে করা মামলায়, যা অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।
দুঃখের বিষয় হলো, যাদের সরকার জেলে পাঠাতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে এখনো মিথ্যা হত্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে। আমরা ভেবেছিলাম, একনায়কতন্ত্র শেষ হলে এসবও শেষ হবে। কিন্তু তা হয়নি। দেখা যাচ্ছে, এখনো এটি একটি জনপ্রিয় কৌশল হিসেবে টিকে আছে।
অনেকেই অনেক দিন ধরে বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তাঁর কারণেই শেখ হাসিনা বিচার বিভাগকে রাজনীতির হাতিয়ার বানাতে পেরেছিলেন। তাঁরা এখন তাঁর গ্রেপ্তারে একধরনের স্বস্তি বা প্রতিশোধের অনুভূতি পাচ্ছেন। তাঁদের মতে, খায়রুল হক এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন, যা বিরোধী দলের বহু মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করেছে, এমনকি অনেক সময় তাদের ওপর সরকারি নির্যাতনেও ভূমিকা রেখেছে। তাই তাঁরা মনে করেন, খায়রুল হকের বিচারও সেই অনুযায়ী হওয়া উচিত।
তবে এখানেই যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে, সেটি হলো: তাহলে কেন খায়রুল হককে তাঁর ত্রয়োদশ সংশোধনী রায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হলো না?
মামলা দুটির একটিতে অভিযোগ ছিল, তিনি সংক্ষিপ্ত আদেশ থেকে রায় পাল্টে দিয়ে জালিয়াতি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা নারায়ণগঞ্জে দায়ের হয়েছিল রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে। (হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের দুদিন পর তাঁকে রায় জালিয়াতির মামলাতেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।)
কিছু আইনবিশেষজ্ঞ মনে করেন, জুডিশিয়াল ইমিউনিটি বা বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় করা কাজের জন্য তাঁদের যে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়, সেটি ওই দুই মামলায় খায়রুল হককে গ্রেপ্তার না দেখানোর কারণ হতে পারে। কিন্তু অন্য আইনজ্ঞরা বলছেন, ১৮৫০ সালের জুডিশিয়াল অফিসার্স প্রোটেকশন অ্যাক্ট অনুযায়ী বিচারকদের যে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা আছে, তা বিচারক অবসরে যাওয়ার পর, বিশেষ করে সাধারণ নাগরিক অবস্থায় কোনো ভুল বা অপরাধ করলে তা আর তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না।
অন্যদিকে বিচারপতি এস কে সিনহা, যিনি ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন (যে সংশোধনীটি বহাল থাকলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে হতো), তিনি নিজেই লিখে জানিয়েছেন, কীভাবে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের (ডিজিএফআই) কর্মকর্তারা তাঁকে আদালতের ভেতরে হেনস্তা করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল।
এস কে সিনহার এই অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে বাংলাদেশে বিচার বিভাগকে দমন করার ঘটনা একেবারেই নতুন নয়। বলা যায়, এস কে সিনহাই ছিলেন প্রথম এবং একমাত্র প্রধান বিচারপতি, যিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সরকারের দ্বারা প্রকাশ্যে নিগৃহীত হন।
এখন বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। এখন বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি এমন বিচারব্যবস্থা, যা নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে স্বাধীন থাকবে এবং যেখানে কাজ চলবে স্বচ্ছতা, সততা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। সে ধরনের ব্যবস্থাই এমন অবস্থা নিশ্চিত করতে পারে, যেখানে কোনো বিচারপতিকে আর অপমানজনক মামলায় ফাঁসানো হবে না কিংবা দেশ ছেড়ে পালাতে হবে না।
[ইংরেজি থেকে অনূদিত। লেখাটি গত ৩০ জুলাই ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছিল]
● কামাল আহমেদ, সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে আদালত থেকে হাজতখানায় নেওয়া হচ্ছে। ছবি : প্রথম আলো |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1406)
-
▼
2025
(3281)
-
▼
August
(188)
-
▼
Aug 04
(6)
- গাজায় অর্ধমৃত জিম্মির ভিডিও নিয়ে বিশ্বজুড়ে নিন্দা,...
- কাঠগড়ায় প্রধান বিচারপতি: হাসিনার বিচার বিভাগ ধ্বংস...
- মিমাংসা ছাড়াই সেনাদের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত বন্ধ করছে...
- ক্রমাগত হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনে আইসিসিতে নেতানিয়া...
- নিজের কবর নিজেই খুঁড়ছেন ইসরাইলি এক জিম্মি
- সিডনির হারবার ব্রিজে ফিলিস্তিনের পক্ষে ইতিহাসের বৃ...
-
▼
Aug 04
(6)
-
▼
August
(188)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment