Friday, May 23, 2025
ঘড়ির চাপে কি আমাদের ইবাদতের ক্ষতি হচ্ছে by মনযূরুল হক
ঘড়ির চাপে কি আমাদের ইবাদতের ক্ষতি হচ্ছে by মনযূরুল হক
সময়ের প্রাকৃতিক ছন্দে যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ
কল্পনা করুন, আপনি উপনিবেশকালের আগে মুসলিম বিশ্বের কোনো গ্রামে জন্মেছেন। তখন সময় মাপা হতো মসজিদের প্রাঙ্গণে সূর্যঘড়ির মাধ্যমে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের তাল রাখত সময়। সময় ছন্দ মিলাত প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত সূর্য, চাঁদ আর নামাজের আজানের সুরে। ড. বারবারা ফ্রেয়ার স্টোয়াসার তাঁর বই টাইম স্টিকস: হাউ ইসলাম অ্যান্ড আদার কালচারস হ্যাভ মেজার্ড টাইম-এ বর্ণনা করেছেন, তখন মানুষ নামাজের সময় বা সামাজিক অনুষ্ঠানের আলোকে সময় নির্ধারণ করত। কোনো যান্ত্রিক যন্ত্র তাদের তাড়া করত না।
কিন্তু ১৩ শতকে ইউরোপের মঠগুলোতে যান্ত্রিক ঘড়ির আবির্ভাব ঘটে। ঐতিহাসিক ডেভিড ল্যান্ডেস তাঁর রেভোল্যুশন ইন টাইম বইতে বলেছেন, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা যখন আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি নিয়ে এসেছিল, তখন তারা ঘড়িটাওয়ার ও হাতঘড়ি প্রবর্তন করে। এটি কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ছিল না, মনন দর্শনেও পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এর ফলে সময়ের ধারণা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান্ত্রিক নির্ভুলতার দাসে পরিণত হয়।
আধ্যাত্মিকতার ওপর ঘড়ির প্রভাব
আপনি কি কখনো নামাজে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে আনন্দ অনুভব করেছেন? এটা তখনই সম্ভব, যখন আপনার ওপর সময়ের চাপ নেই। আজ মসজিদে ঢুকলেই দেয়ালে ঘড়ি আর নামাজের কাউন্টডাউন। এটি আমাদের নামাজকে তাড়াহুড়া করিয়ে দেয়। ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর আল-ওয়াবিল আস-সায়্যিব-এ লিখেছেন, প্রাচীন মুসলিমরা ইবাদতে এত মগ্ন থাকতেন যে সময়ের অস্তিত্বই ভুলে যেতেন।
জুমার খুতবা, যা একসময় সম্প্রদায়ের জন্য প্রাণবন্ত আলোচনার মঞ্চ ছিল, এখন ১৫-২০ মিনিটের একটি সময় বাঁধা অনুষ্ঠান। রমজানের তারাবিহ নামাজও এক পারা থেকে কয়েক পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে সময়ের চাপে। এই যান্ত্রিক সময় আমাদের আধ্যাত্মিকতাকে সংকুচিত করছে।
সম্পর্কের ওপর সময়ের চাপ
‘চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে!’—এই কথাগুলো আমাদের পরিবারে অহরহ শোনা যায়। সমাজবিজ্ঞানী জুডি ওয়াজম্যান তাঁর প্রেসড ফর টাইম-এ বলেন, সময়ের এই চাপ পরিবারে উদ্বেগ ছড়ায়। ড. উইলিয়াম ডোহার্টির গবেষণা দেখায়, সময়ের তাড়ায় পিতা–মাতা-সন্তানের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা তাড়াহুড়ায় সন্তানের সঙ্গে মূল্যবান মুহূর্ত হারাই।
নৃতত্ত্ববিদ থমাস হিল্যান্ড এরিকসেন তাঁর টাইর্যানি অব দ্য মোমেন্ট-এ বলেন, পারিবারিক সমাবেশ এখন কঠোর সময়সূচির অধীন। আমাদের স্মৃতিগুলো তখনই গভীর হয়, যখন আমরা সময়ের তাড়না ছাড়াই একে অপরের সঙ্গে থাকি।
স্বাস্থ্য ও কাজের ওপর প্রভাব
যান্ত্রিক ঘড়ির চাপ আমাদের কাজের প্রবাহ নষ্ট করে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণা বলছে, সময়ের চাপ শারীরিক বিপদের মতো স্ট্রেস সৃষ্টি করে। ড. রবার্ট লেভিন তাঁর আ জিওগ্রাফি অব টাইম-এ ‘ক্লক-টাইম সিকনেস’ নামে একটি আধুনিক সমস্যার কথা বলেন, যা দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
মিহালি সিকসেন্টমিহালির গবেষণা দেখায়, সময়ের তাড়না আমাদের কাজের প্রবাহ ভেঙে ফেলে, যা আমাদের কর্মক্ষমতা ও আনন্দ নষ্ট করে। জাপানে ‘কারোশি’ বা অতিরিক্ত কাজে মৃত্যুর ঘটনা এই যান্ত্রিক সময়ের চাপেরই ফল।
সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন
যান্ত্রিক ঘড়ি একটি সরঞ্জাম, আমাদের প্রভু নয়। দার্শনিক মার্শাল ম্যাকলুহান বলেন, ‘আমরা আমাদের সরঞ্জাম গঠন করি, তারপর সেগুলো আমাদের গঠন করে।’ ঘড়ি আমাদের সময়ের অভিজ্ঞতাকে বদলে দিয়েছে। সাইয়্যেদ হোসেন নাসর তাঁর ট্র্যাডিশনাল ইসলাম ইন দ্য মডার্ন ওয়ার্ল্ড-এ বলেন, যান্ত্রিক সময় গ্রহণ আমাদের ঐশ্বরিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
ব্যবহারিক পদক্ষেপ
১. সময়ের চাপ সম্পর্কে সচেতনতা: সময়ের চাপ কখন অনুভব করেন, তা লক্ষ করুন। এটি কি প্রয়োজনীয়? নাকি অভ্যাসগত? অপ্রয়োজনীয় চাপের সময় জিকির বা কোরআন পড়ুন। ২. ঘড়িমুক্ত সময়: সপ্তাহান্তে ঘড়ি না পরে কোরআন পড়ুন বা প্রকৃতিতে হাঁটুন। দেখুন, আপনার স্ট্রেস কমে কি না। ৩. সম্পর্কের নিরাময়: দেরির জন্য বিরক্ত হলে থামুন। এটি কি সত্যিই চাপ, ভাবুন তো? পরিবারের সঙ্গে সময়ের চাপ নিয়ে আলোচনা করুন। ৪. আল্লাহর সময়ের সঙ্গে সংযোগ: সূর্যের অবস্থান দেখে নামাজের সময় নির্ধারণ করুন। হিজরি ক্যালেন্ডার অনুসরণ করুন। ৫. সীমানা নির্ধারণ: প্রয়োজনীয় কাজে ঘড়ি ব্যবহার করুন, তবে অপ্রয়োজনীয় চাপ এড়ান।
শেষ কথা
কল্পনা করুন, একটি মসজিদে কোনো ঘড়ি নেই। প্রথমে হয়তো অস্বস্তি হবে, কিন্তু ধীরে ধীরে আপনি নামাজে মগ্ন হবেন। ঘড়ির চাপ ছাড়া নামাজ হবে শান্ত, মনোযোগী। বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো হবে অতুলনীয়। সময়ের চাপ এলেও ই-মেইল ঠিকানা দিয়ে তা মোকাবিলা করুন। আমাদের লক্ষ্য ঘড়িকে প্রভু নয়, সেবক হিসেবে ব্যবহার করা। এভাবে আমরা সময়ের সঙ্গে সুস্থ ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারব, ইনশাআল্লাহ।
* প্রোডাক্টিভ মুসলিম ডটকম অবলম্বনে
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1413)
- ▼ 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment