Sunday, March 1, 2026
ইরানকে কি চীন উদ্ধার করতে আসবে? by নেলসন ওয়ং
ইরানকে কি চীন উদ্ধার করতে আসবে? by নেলসন ওয়ং
এর উত্তরটি প্রচলিত সামরিক জোটে ‘দুই পক্ষের একটিতে থাকা’—এই দ্বিমাত্রিক ধারণাকে ভেঙে দেয়। চীন সরাসরি সেনা পাঠাবে বা কোনো যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়াবে—এ সম্ভাবনা কম। কিন্তু এটাকে নিষ্ক্রিয়তা বলে ধরে নেওয়া হলে তা হবে একবিংশ শতাব্দীর মহাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রকৃতি ভুলভাবে বোঝা।
ইরানের প্রতি চীনের সমর্থন বাস্তব, বহুস্তরীয় এবং সামরিক হস্তক্ষেপের তুলনায় বেশ টেকসই। এটি কেবল ভিন্ন একটি কৌশলগত পরিসরে পরিচালিত হয়।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন নিয়মিতভাবে তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে। নীতির ওপর দাঁড়িয়ে চীন তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
গত মাসে জরুরি বৈঠকে জাতিসংঘে চীনের দূত সান লেই ওয়াশিংটনের উদ্দেশে কঠোরভাবে বলেন, ‘বলপ্রয়োগ কখনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। এটি সমস্যাকে আরও জটিল ও দুরূহ করে তুলবে। যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ এই অঞ্চলকে একটি অননুমেয় অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেবে।’
এটা নিছক কথার কথা নয়। চীনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্টভাবে ‘ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা সংরক্ষণে’ সমর্থন করে।
জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে নিজের অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে চীন তেহরানকে একটি অমূল্য সুবিধা দিচ্ছে। সেটি হলে বিশ্বমঞ্চে ইরানকে বৈধতা প্রদান এবং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী পাল্টা বয়ান তৈরি।
২০২১ সালে ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) পূর্ণ সদস্য হিসেবে অনুমোদন দেওয়ার পর চীনের কূটনৈতিক সমীকরণে মৌলিক পরিবর্তন আসে। এর মধ্য দিয়ে ইরান চীন, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়। এর পরপরই তেহরান ব্রিকস জোটেও অন্তর্ভুক্ত হয়।
এগুলো কোনো সামরিক জোট নয়, কিন্তু এই জোটগুলো এমন কিছু তৈরি করে, যা সামরিক জোটের চেয়েও বেশি স্থায়ী।
গত বছর চীন, রাশিয়া ও ইরানের কূটনীতিকেরা বেইজিংয়ে বৈঠক করেন এবং ব্রিকস ও এসসিওর মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনে ‘সমন্বয় জোরদার’ করার বিষয়ে একমত হন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ঘনিষ্ঠতার অর্থ হলো—ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বিষয়টি মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তিগুলোর জন্যও একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
চীন যদিও সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না, তবু দৃশ্যমান সামরিক সহযোগিতা থেকে বেইজিং পিছিয়ে থাকেনি। চলতি মাসের শুরুতে রাশিয়া, চীন ও ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে যৌথ নিরাপত্তা মহড়ার জন্য নৌযান মোতায়েন করে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের এক সহকারী এই মহড়াকে পশ্চিমা আধিপত্য মোকাবিলায় ‘সমুদ্রভিত্তিক বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ গড়ে তোলার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেন।
আরও বাস্তব বিষয় হলো, ইরানের সঙ্গে চীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার খবর এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মিডল ইস্ট আই গত বছর জানায়, ইরান তার আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য চীনে তৈরি ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা পেয়েছে। এটি ছিল তেলের বিনিময়ে অস্ত্র চুক্তির অংশ। এর মাধ্যমে তেহরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।
সংবাদমাধ্যমের খবরে এটাও এসেছে যে চীন থেকে ইরান জে–২০ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, জে–১০সি বিমান এবং এইচকিউ–৯ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পেতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এখানে প্রতীকী একটি ঘটনাও তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি মাসে ইরানের বিমানবাহিনী দিবসে একজন চীনা সামরিক অ্যাটাশে ইরানি বিমানবাহিনীর এক কমান্ডারের হাতে জে–২০ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের একটি মডেল তুলে দেন। প্রতীকী এ ঘটনাটিকে ব্যাপকভাবে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
চীনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সমর্থন মাঠযুদ্ধে দৃশ্যমান না হলেও, ইরানের জাতীয় হিসাব-নিকাশে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সত্ত্বেও চীন ইরানের প্রধান জ্বালানি অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ ইরানি তেল কিনছে চীনা ক্রেতারা।
যুক্তরাষ্ট্র এটি লক্ষ করেছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট শানদং প্রদেশের চীনা তেল পরিশোধনাগারকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দেয় ইরানের অবৈধ তেল রপ্তানি শূন্যে নামানো হবে। ওয়াশিংটনে চীন দূতাবাস এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানায়।
যদিও চীন–ইরান অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার মাঝে মাঝে মার্কিন আর্থিক ঝুঁকি এড়াতে ইরান থেকে তেল কেনা স্থগিত করে। তবে সামগ্রিক চিত্রটি হলো, বহিরাগত চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখার জন্য ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে ‘অক্সিজেন’ সরবরাহ করে যাচ্ছে চীন।
তাহলে এখানে প্রশ্নটি হলো চীন যদি ইরানকে ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক আশ্রয়, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, সামরিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক ‘অক্সিজেন’ প্রদান করে, তাহলে কেন আরও এগিয়ে যায় না? কেন যুদ্ধজাহাজ পাঠায় না বা হস্তক্ষেপের সরাসরি হুমকি দেয় না?
উত্তরটি খুঁজতে হবে চীনের কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভেতরে। বেইজিংয়ের সবচেয়ে জরুরি কৌশলগত লক্ষ্য হলো জাতীয় পুনর্মিলন অর্জন করা। এই লক্ষ্য পূরণের আগে, যেকোনো পদক্ষেপ যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যাপক সংঘাত ঘটাতে পারে, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করবে চীন।
এ ছাড়া চীন বিশ্বাস করে যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় সামরিক পদক্ষেপ ইরানে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু দেশটির শাসকদের পরিবর্তন ঘটাবে না। এই পরিস্থিতিতে বেইজিং হয়তো ইরানের ক্ষেত্রেও ইউক্রেন সংঘাতের মডেল অনুসরণ করতে পারে। এর অর্থ হলো, ইরানের সঙ্গে চীন সরাসরি সম্পৃক্ততা এড়িয়ে চলবে। আক্রমণের শিকার দেশটির সঙ্গে রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্র সম্পর্ক বজায় রাখবে। জাতিসংঘে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দেবে। এমন সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে, যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে না।
চীন ইরানকে ‘উদ্ধার’ করবে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরটি সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে। যদি উদ্ধারের অর্থ সৈন্য ও যুদ্ধজাহাজ বোঝানো হয়, উত্তরটি হবে না। যদি উদ্ধারের অর্থ হয় ইরানকে টিকে থাকতে, প্রতিরোধ করতে এবং দর–কষাকষি করার ক্ষেত্রে ইরান যাতে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে সে জন্য সহায়তা করা, তাহলে উত্তরটি নীরবে, স্থায়ীভাবে এবং কৌশলগতভাবে হবে হ্যাঁ।
* নেলসন ওয়ং, চীনের সাংহাইয়ে অবস্থিত সাংহাই সেন্টার ফর রিমপ্যাক স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ছবি : রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1407)
-
▼
March
(202)
-
▼
Mar 01
(8)
- আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি: আজকের ইরানকে গড়ে তুলেছিলেন ...
- দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান কঠিন করে তুলছে ইসরায়েল
- খামেনির মৃত্যু হলে থমকে যাবে না ইরান, রয়েছে মাস্টা...
- আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে by ট...
- ট্রাম্পের দর্শন ঘরে চলছে না, বিদেশে রপ্তানির তোড়জোড়
- ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি: সেনাবাহিনীতে খুনের ...
- ইরানকে কি চীন উদ্ধার করতে আসবে? by নেলসন ওয়ং
- হামলার মধ্যেই তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলবিরোধী ব...
-
▼
Mar 01
(8)
-
▼
March
(202)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment