এপস্টিন ফাইলস: বিশ্ব এলিটদের গোপন ও ভয়াবহ সব রহস্যের উন্মোচন

বিশ্বের ক্ষমতাধর এলিটদের নোংরা লেনদেনের যদি কোনো লিখিত দলিল থেকে থাকে, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ‘এপস্টিন ফাইলস’। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প থেকে বিল ক্লিনটন, এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজাতদের খুব কম মানুষই আছেন, যাদের নাম এই কুখ্যাত অর্থলগ্নিকারী জেফ্রি এপস্টিনের নেটওয়ার্কের ছায়া থেকে মুক্ত। এ খবর দিয়ে অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন বলছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সির শুরু থেকেই যে কেলেঙ্কারি তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল, তা এবার আরও বিস্ফোরক রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন মন্ত্রণালয় কুখ্যাত এপস্টিন ফাইলসের নতুন একটি বড় অংশ প্রকাশ করেছে। এটা রাজনৈতিক অঙ্গনে একেবারে বোমা ফাটানোর মতো। এতে প্রকাশ্যে চলে এসেছে বিশ্বনেতা, স্বঘোষিত দানবীর যেমন বিল গেটস, এবং প্রযুক্তি জগতের প্রভাবশালী ধনকুবের ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিদের নাম। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে এলিটদের বিলাসিতা, প্রভাব এবং গোপন অনৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত এই বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। নথিগুলো দেখতে গেলেই একটি অস্বাভাবিক সতর্কবার্তা চোখে পড়ে। ফাইলসে প্রবেশের আগে দর্শনার্থীকে নিশ্চিত করতে হয় যে, তিনি ১৮ বছরের বেশি বয়সী। এই সতর্কতাই ইঙ্গিত দেয়, বিষয়বস্তু কতোটা ভয়ঙ্কর ও অস্বস্তিকর। নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে রহস্যজনক মৃত্যুর সাত বছরেরও বেশি সময় পরও জেফ্রি এপস্টিনের রেখে যাওয়া অন্ধকার লিগ্যাসি কীভাবে আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনাম দখল করে আছে, তা এসব নথিতে স্পষ্ট। নতুন প্রকাশিত ফাইলগুলো ইঙ্গিত দেয়, এই কলঙ্কিত অর্থলগ্নিকারীর প্রভাব বিশ্ব ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। নথিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, হিলারি ক্লিনটন এবং জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের সঙ্গে এপস্টিনের যোগসূত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়।

সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবেক এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে একটি ইয়টে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ। যদিও এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো এপস্টিনের গোপন জগতকে ঘিরে এলিটদের অতিরিক্ত ভোগ, গোপনীয়তা ও কথিত শোষণের বিষয়টিকে আরও ঘনীভূত করে। এপস্টিনের পরিধিতে ঘোরাফেরা করেছেন প্রায় সব ক্ষেত্রের প্রভাবশালী ‘এ-লিস্টার’রা। ফুটবল তারকা ডেভিড বেকহ্যাম, প্রিন্স অ্যানড্রু, বৃটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সবাই এই কলঙ্কিত অর্থলগ্নিকারীর বিশাল কুখ্যাতির গ্যালারিতে হাজির। আইন মন্ত্রণালয়ের লাখ লাখ নথির মাধ্যমে সেগুলো এখন জনসমক্ষে হাজির।
একটি তথ্য বিশেষ নিষ্ঠুর বিদ্রুপ তৈরি করে। বিল গেটসের নাম উঠে এসেছে এমন নথিতে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এপস্টিনের ব্যবস্থাপনায় হওয়া এক সাক্ষাতের ঘটনা ঘটে। এরপর তিনি যৌনরোগে আক্রান্ত হন। এপস্টিন নিজে শুধু মানব পাচারের অভিযোগেই নয়, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী হিসেবেও কুখ্যাত। এই নথির ভেতরেই লুকিয়ে আছে ২০১৫ সালের একটি ই-মেইল বিনিময়। তাতে এপস্টিনের সহযোগীরা নিজেদের স্বার্থে মালালা ইউসুফজাই ও তার ফাউন্ডেশনকে সমর্থন দেয়ার কথা নিয়ে আলোচনা করেন। মালালা আদৌ কোনো সহায়তা পেয়েছিলেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়। তবে এই আলোচনাই দেখিয়ে দেয় যে, এপস্টিন কীভাবে বিশ্ব জুড়ে সম্মানিত ব্যক্তি ও মহৎ উদ্যোগগুলোর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিতে চাইতেন। আরেকটি ই-মেইলে তার দীর্ঘদিনের সহকারী লেসলি গ্রফ মালালা ফান্ডে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের শূন্যপদের কথা উল্লেখ করেন- যেন এপস্টিনের কোনো যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে সেখানে বেতনভুক্ত পদ পাওয়া যায় কিনা, তা যাচাই করছিলেন।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, দেশটির পোলিও নির্মূল কর্মসূচি এপস্টিনের নজরে ছিল। নরওয়ের প্রভাবশালী কূটনীতিক ও অসলো চুক্তির অন্যতম স্থপতি তেরিয়ে রড-লারসেন তাকে এ বিষয়ে নিয়মিত তথ্য দিচ্ছিলেন। এমনকি বিল গেটসের পোলিও নির্মূল সংক্রান্ত উদ্যোগ- পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠক ও যোগাযোগ, এসব সম্পর্কেও এপস্টিন অবগত ছিলেন। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে পাঠানো আই-মেসেজগুলোতে, গ্রেপ্তারের এক বছর আগে, পাকিস্তানের নতুন নেতৃত্বের প্রতি এপস্টিনের প্রকাশ্য বিদ্বেষও ফুটে ওঠে। ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় তিনি তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, শান্তির জন্য তিনি এরদোগান, খোমেনি, শি বা পুতিনের চেয়েও বড় হুমকি। এক্ষেত্রে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত নেতাদের সঙ্গে তুলনা টেনে আনেন সামনে।
শুনতে দুঃসাহসিক লাগলেও, এপস্টিনের কাছে কোনো বিষয়ই নিষিদ্ধ ছিল না। একটি আংশিক গোপন অ্যাকাউন্ট থেকে ফরওয়ার্ড করা ২০১৮ সালের আরেকটি ই-মেইলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিতর্কিত সিন্ধু পানি চুক্তি বা ‘ওয়াটার ওয়ার্স’ নিয়ে আলোচনা পাওয়া যায়, যা বহু বছর পর ভারতের চুক্তি স্থগিতের হুমকির মধ্যদিয়ে আবার আলোচনায় আসে।

এই ই-মেইলটি পাঠানো হয়েছিল অ্যাডাম লুপেলকে এবং কপি ছিল নাদিয়া আল সাইদের কাছে। দু’জনই তখন ইনস্টিটিউট অব পিসে কর্মরত। এতে বোঝা যায়, জনসমক্ষে আসার বহু আগেই এপস্টিন সংবেদনশীল ও উচ্চঝুঁকির ভূরাজনৈতিক বিরোধে আগ্রহী ছিলেন। পাকিস্তানের পাশের দেশ ভারতে এপস্টিন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদির কাছে। যার হিন্দুত্ববাদী ভাবমূর্তি তাকে দেশের ভেতরে প্রায় পূজনীয় করে তুলেছে। ই-মেইল ও টেক্সট বার্তাগুলোতে দেখা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত এই অর্থলগ্নিকারী ভারতীয় রাজনৈতিক মহলে প্রভাব বিস্তারের জন্য সক্রিয় চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এমনকি মোদির হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী দলের এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। যা দেখিয়ে দেয় যে, পশ্চিমা দুনিয়ার বাইরেও ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজেকে জড়িয়ে নেয়ার উচ্চাকাক্সক্ষা ছিল এপস্টিনের। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মোদি এপস্টিনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক অস্বীকার করলেও, প্রতিবেদনে বলা হয়- ইসরাইল সফর নিয়ে তিনি নাকি এপস্টিনের পরামর্শ চেয়েছিলেন। যেখানে তিনি গান গেয়েছিলেন ও নেচেছিলেন বলেও দাবি রয়েছে।

এপস্টিন ২০১৯ সালে গ্রেপ্তারের দুই মাসেরও কম সময় আগে মোদি ও ট্রাম্পের সাবেক কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননের মধ্যে একটি বৈঠকের ব্যবস্থাও করতে চেয়েছিলেন। এপস্টিন সংযোগ নিয়ে যারা নথিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন, তাদের মতে, এগুলো শুধু একজন বিশ্বমঞ্চে মন্তব্য করতে ভয় না পাওয়া ব্যক্তির ছবি ফুটিয়ে তোলে না। বরং এতে এমন একজন মানুষের চিত্র ফুটে ওঠে, যিনি রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যে জটিল এক প্রভাবের জাল বুনেছিলেন। যখন ও যেখানে তার প্রয়োজন হয়েছে, সেখানেই ক্ষমতার করিডোরে নিজেকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন শীতল হিসাবনিকাশে। নতুন নথিতে আরও রয়েছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আসা তথ্য ও অভিযোগের অভ্যন্তরীণ মেমো ও সারসংক্ষেপ। এর অনেকগুলোতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাম যৌন অসদাচরণের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত। নথিগুলো আরও দেখায়, অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে এপস্টিনের যোগাযোগ। ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ফ্লোরিডা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য বৈঠকের আয়োজন নিয়ে ই-মেইলে ইলন মাস্কের নাম পাওয়া যায়, যদিও তিনি বারবার কোনো সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। বিল গেটসের নামও বৈঠক ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত চিঠিপত্রে এসেছে, যা তিনিও অস্বীকার করেছেন। এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, বৃটিশ ধনকুবের রিচার্ড ব্র‍্যানসন এবং হোয়াইট হাউসের সাবেক উপদেষ্টারা- স্টিভ ব্যানন ও ক্যাথি রুমলার বারবার নথিতে উঠে এসেছেন। যা প্রমাণ করে এপস্টিনের জালের কোনো সীমানা ছিল না।

সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো এপস্টিনের নির্যাতনের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বহু আগেই জানতো। এফবিআইয়ের অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, ২০০৬-২০০৭ সালেই এপস্টিনের ফ্লোরিডার বাড়িতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের জড়িত একাধিক অভিযোগ সম্পর্কে এজেন্টরা অবগত ছিলেন। কিন্তু ফেডারেল কৌঁসুলিরা সেগুলো প্রায় উপেক্ষা করেন। শেষ পর্যন্ত এপস্টিন অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে এক সমঝোতা চুক্তি করেন। অপ্রাপ্তবয়স্কের কাছ থেকে যৌনসেবা নেয়ার দায় স্বীকার করেন এবং মাত্র ১৮ মাস কারাভোগ করেন। এপস্টিনের আন্তর্জাতিক প্রভাবের পরিধি আরও স্পষ্ট হয় বৃটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক থেকে।
https://mzamin.com/uploads/news/main/201652_1.webp

No comments

Powered by Blogger.