স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই কি ইরানে হামলা করলেন ট্রাম্প

ইরানে চলমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর প্রথমবারের মতো গতকাল রোববার মার্কিন সেনা হতাহতের খবর এসেছে। এতে করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রচণ্ড চাপে পড়েছেন। ইরান নিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, তা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যার দাবি উঠেছে।

ট্রাম্পের সমালোচকেরা হোয়াইট হাউসের কাছে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আরও স্বচ্ছতা দাবি করছেন। বিরোধী পক্ষ ও বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনার অভাব যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী এক যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করেছে। অথচ ট্রাম্প বারবার এ ধরনের যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও ইরান–বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, প্রশাসনের কোনো কর্মপরিকল্পনা থাকলেও তারা তা এখনো প্রকাশ করেনি।

ভাতানকা আরও বলেন, ট্রাম্পকে এখন একটি বড় রাজনৈতিক প্রকল্পের দিকে এগোতে হবে। শুধু সামরিক অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। বরং তাঁর প্রশাসনকে এখন বিস্তারিত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা আসলে শাসনব্যবস্থার কী ধরনের পরিবর্তন করতে চায়।

এ ইরান–বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন, যদি তা–ই হয়, তবে এই অভিযান চার দিন, চার সপ্তাহ বা চার মাসের কোনো সাধারণ অভিযান হবে না। এটি দীর্ঘ লড়াইয়ে পরিণত হতে পারে।

ট্রাম্প ২০০৩ সালের ইরাক হামলাকে বারবার বড় ভুল বলে এসেছেন। অন্যদিকে গত বছরের জুনে তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ‘তছনছ’ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন আবার কেন নতুন করে হামলার প্রয়োজন হলো, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা তিনি জনসম্মুখে দেননি। এ জন্য তিনি সমালোচিত হচ্ছেন।

গত সপ্তাহে স্টেট অব দ্য ইউনিয়নের ভাষণে ইরান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির কথা উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প। তবে সেখানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো উল্লেখ ছিল না। তিনি বলেছিলেন, ইরানের সম্ভাব্য সামরিক হুমকির বিষয়টি তিনি কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান করতে চান।

ডেমোক্র্যাটদের আশঙ্কা, ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ঘোষণা না করায় ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত অন্তহীন এক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

প্রতিনিধি পরিষদের ইন্টেলিজেন্স কমিটির জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য জিম হাইমস যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওকে (এনপিআর) বলেন, ‘এসবের শেষ কোথায়? আমরা ইসরায়েলিদের সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ইরানে বোমাবর্ষণ করতে পারি। কিন্তু কিসের আশায় আমরা তা করব?’

হাইমস আরও বলেন, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করাটাই কি উদ্দেশ্য? কিন্তু আকাশপথে বোমা হামলা চালিয়ে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উদাহরণ খুব একটা নেই। সত্যি বলতে কি, মার্কিন সামরিক বাহিনী কোনো দেশে সন্তোষজনকভাবে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পেরেছে, এমন উদাহরণও বিরল।

ভাতানকা সতর্ক করে বলেন, জনগণের তীব্র বিরোধিতা বা মার্কিন সেনাবাহিনীর সরাসরি উপস্থিতি ছাড়া ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পতনের সম্ভাবনা খুব কম। তবে সরাসরি সেনা পাঠানোর বদলে গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করাকে তিনি ভালো বিকল্প বলে মনে করেন।

দ্বিতীয় বিকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে ভাতানকা বলেন, সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত উপায় হলো, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) মাঠপর্যায়ের সূত্র বা সোর্সের মাধ্যমে অভিযান চালানো। জ্যেষ্ঠ নেতারা কোথায় এবং কখন লুকিয়ে থাকেন, তা তারা জানে।

একই গোয়েন্দা সূত্র ব্যবহার করে প্রশাসনের ভেতর নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করতে হবে উল্লেখ করে ভাতানকা বলেন, মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে যে এই শাসনব্যবস্থা শেষ হয়ে গেছে। এটি আর আগের রূপে ফিরবে না। এভাবেই দেশটিতে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটাতে হবে। তবে এতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং যুক্তরাষ্ট্র এটি সফলভাবে করতে পারবে কি না, তা মোটেও নিশ্চিত নয়।

সিআইএর সাবেক অপারেশন অফিসার ও অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘স্টেডি স্টেট’–এর প্রধান স্টিভেন ক্যাশ পরবর্তী কোনো পরিকল্পনা না থাকাকে ‘খুবই উদ্বেগজনক’ বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য সম্ভবত ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা।

স্টিভেন ক্যাশ বলেন, ‘কোরিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে স্নায়ুযুদ্ধ, ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে আমরা একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে শিখেছি। তা হলো, কেবল যুদ্ধ শুরু করা যথেষ্ট নয়, যুদ্ধ শেষ করতে একটি পরিকল্পনাও থাকা প্রয়োজন।’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং দেশটির আরও অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর ট্রাম্প বলেছেন, যাঁরা বাকি আছেন, তাঁরা এখন আলোচনায় আগ্রহী।

ট্রাম্প ‘দ্য আটলান্টিক’কে বলেন, ‘তাঁরা কথা বলতে চান এবং আমিও তাতে রাজি। আমি তাঁদের সঙ্গে কথা বলব। তাঁদের এটি আরও আগে করা উচিত ছিল। তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সহজ ছিল। তা তাঁদের আগে মেনে নেওয়া উচিত ছিল। তাঁরা অনেক দেরি করে ফেলেছেন।’

তবে ইরানে চলমান হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেহরানের পাল্টা হামলার মধ্যে এ আলোচনা খুব একটা সহজ না-ও হতে পারে। তেহরান অবশ্য আলোচনার কথা সত্য নয় বলে দাবি করেছে।

ট্রাম্প জানান, আগের আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে মারা গেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘তাঁদের বেশির ভাগ আর নেই। যাঁদের সঙ্গে আমরা আলোচনা চালাচ্ছিলাম, তাঁদের কেউ কেউ মারা গেছেন। কারণ, আঘাত বেশ ভয়াবহ ছিল। তাঁরা চাইলে একটি চুক্তি করতে পারতেন। তাঁদের আরও আগেই এটি করা উচিত ছিল।’

ট্রাম্পের এসব মন্তব্য থেকে ভাতানকার ধারণা, প্রেসিডেন্টের কাছে ইরানের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই’। বরং তিনি দেশটিতে একটি ‘দুর্বল শাসনব্যবস্থা’ চান, যা কারও ক্ষতি করতে পারবে না।

ভাতানকা বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) যদি সত্যি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে চাইতেন, তাহলে অনেক বিরোধী নেতা ছিলেন, যাঁদের হোয়াইট হাউসে ডেকে বলতে পারতেন যে এই ব্যক্তি ইরানের পরবর্তী শাসক হতে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি তা করছেন না। এতে আমাদের মনে হচ্ছে, তিনি সম্ভবত এখনো বর্তমান শাসনব্যবস্থার সঙ্গেই চুক্তির কথা ভাবছেন।’

তবে ইরানের পাল্টা হামলার কারণে এ ধারণা বদলে যেতে পারে। কারণ, নিজেকে দুর্বল হিসেবে না দেখানোর জন্য ট্রাম্পকে হয়তো আরও কঠোর অবস্থান নিতে হতে পারে।

গতকাল ইরানের পাল্টা হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

আগের দিন শনিবার হামলার ঘোষণা দিয়ে পোস্ট করা ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ জন্য সরাসরি সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে ইরানের জনগণকে জেগে ওঠার আহ্বান জানানো ছাড়া তা কীভাবে ঘটবে, সে বিষয়ে তিনি তেমন কোনো দিকনির্দেশনা দেননি।

ট্রাম্প ওই ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, ‘অনেক বছর ধরে আপনারা আমেরিকার সাহায্য চেয়েছেন। এখন আপনারা এমন একজন প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন, যিনি আপনাদের চাওয়া পূরণ করছেন। সুতরাং দেখা যাক, আপনারা এর বদলে কী করেন। এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময়। এই সুযোগ হাতছাড়া হতে দেবেন না।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-02%2Ft6tzdo9l%2FDonald-Trump-boards.JPG?rect=0%2C0%2C4489%2C2993&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বহনকারী সরকারি উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ানে উঠছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, ১ মার্চ, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

No comments

Powered by Blogger.