Thursday, May 29, 2025
চীনকে বাগে আনতে ট্রাম্পকে যে পথে হাঁটতে হবে by ই ফুসিয়ান
চীনকে বাগে আনতে ট্রাম্পকে যে পথে হাঁটতে হবে by ই ফুসিয়ান
সমস্যা হলো ট্রাম্পের ‘চিকিৎসা পদ্ধতি’। তিনি যেন অস্ত্রোপচার করতে চাচ্ছেন করাত দিয়ে, যা কিনা রোগীকেই মেরে ফেলতে পারে। অথচ দরকার ছিল আরও সূক্ষ্ম স্ক্যালপেল (অপারেশনের জন্য ব্যবহার্য ধারালো ছুরি)। সরলভাবে বললে, ট্রাম্প সমস্যার ধরন বুঝলেও তাঁর সমাধানের পথটা খুব রুক্ষ আর বিপজ্জনকভাবে বেছে নিয়েছেন।
বর্তমানে যেটা আমরা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের নিয়মকানুন দেখি (যেমন বিভিন্ন দেশের মধ্যে পণ্যের লেনদেন ও ডলারের গুরুত্ব), তার সবকিছু তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেটন উডস নামের একটি জায়গায় অনুষ্ঠিত এক বড় সম্মেলনে। তখন ইউরোপ ছিল যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ আর যুক্তরাষ্ট্র ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি। ১৯৪৮ সালে ওই সম্মেলনের চার বছর পর দুনিয়ার অর্ধেকের বেশি পণ্য একা যুক্তরাষ্ট্রই তৈরি করত।
তবে সেই সময় যে ‘নির্ধারিত বিনিময় হার’ (ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট) চালু করা হয়েছিল, মানে একেক দেশের মুদ্রার মান একভাবে বেঁধে দেওয়া হতো, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হয়নি। এর ফলে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্প দুর্বল হতে শুরু করে। ১৯৫৩ সালে বিশ্বে উৎপাদিত সব পণ্যের ৫৫ শতাংশ যেটি একা যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করত, সেটি ১৯৭০ সালে ২৪ শতাংশে নেমে আসে।
এই অবস্থায় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ১৯৭১ সালে বড় একটি সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মার্কিন ডলারকে সোনার মানের সঙ্গে যুক্ত থাকার নিয়ম থেকে আলাদা করে দেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতের অবস্থা কিছুটা স্থির হয়। পরবর্তী ৩০ বছর ধরে অবস্থা মোটামুটি একই রকম থাকে।
সরল করে বললে, যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় কারখানা ছিল দুনিয়ার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু ভুল নিয়মে তাদের উৎপাদন দুর্বল হয়। পরে কিছু বড় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তারা আবার নিজেদের অবস্থান কিছুটা ঠিক করে নেয়।
ডলারকে সোনার মান থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক বড় প্রভাব হলো যুক্তরাষ্ট্র আগে যে আয় করত (অর্থাৎ রপ্তানি করে যা পেত), তার চেয়ে বেশি খরচ করা শুরু করে (অর্থাৎ আমদানি বেশি করে)। ফলে ধীরে ধীরে তারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ঘাটতির দেশ হয়ে ওঠে। আর এই সুযোগে জাপান তাদের উৎপাদন খাত অনেক বড় করে তোলে।
এরপর ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর (জাপান, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য) সঙ্গে এক চুক্তি করে, যার মাধ্যমে ডলারের মূল্য কমিয়ে দেয়। এতে কিছুদিনের জন্য আমদানি কমে যায় এবং বাণিজ্যঘাটতি কিছুটা কমে। কিন্তু ১৯৯৪ সালে নাফটা নামে একটা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি চালু হয়, আর ২০০১ সালে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেয়। তখন ব্যাপক হারে সস্তা চীনা পণ্য মার্কিন বাজারে ঢুকতে থাকে।
২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দুটি বিষয় ঘটে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ও আমদানির অনুপাত ৬৫ শতাংশ থেকে কমে ৪৫ শতাংশে চলে আসে। মানে আমদানি বাড়ে, রপ্তানি কমে। দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো, তাদের উৎপাদনের পরিমাণ, যা একসময় দুনিয়ার ২৫ শতাংশ ছিল, তা নেমে ১৬ শতাংশে নেমে যায়।
এই তথ্যগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাত ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে আর এর পেছনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি অনেকটা দায়ী। ট্রাম্প এই দুর্বলতার দিকটা ঠিকই ধরেছেন। তবে তিনি যে কৌশল নিচ্ছেন, যেমন সবার ওপর একসঙ্গে শুল্ক বসিয়ে দেওয়া, সেটি সমস্যা কমানোর বদলে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো চীন নিজেও তাদের অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন বা ওভারক্যাপাসিটি সমস্যার কারণে বেশ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। মানে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, চীনও সমস্যায় আছে।
শিশুরা অনেক কিছু ব্যবহার করে, যেমন খেলনা, জামা–কাপড়, খাবার, শিক্ষা, ইত্যাদি। তাই কোনো পরিবারে যত বেশি শিশু থাকে, তত বেশি খরচ হয়। কিন্তু চীনে অনেক দিন ধরে এক সন্তান নীতি চলায় এখন তাদের শিশুদের সংখ্যা অনেক কম। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবার ছোট হয়েছে, অন্যদিকে তাদের খরচও কমে গেছে। এই কারণেই চীনে মানুষের আয় কম এবং তারা বাজারে খুব বেশি জিনিসপত্র কেনে না।
চীনের পরিবারগুলো যত কম খরচ করে, ততই চীনের ভেতরে (দেশের মধ্যে) জিনিসপত্র বিক্রি কম হয়। তাই তারা বাধ্য হয়ে অনেক পরিমাণে পণ্য তৈরি করে অন্য দেশে রপ্তানি করে। ২০২৩ সালে চীন প্রায় ১ দশমিক ৮৬ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা তাদের পুরো জিডিপির ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্র একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ, মার্কিনরা অনেক জিনিস কেনেন ও ব্যবহার করেন। আবার ডলার হলো বিশ্বের প্রধান মুদ্রা, তাই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারে অনেক পণ্য কিনতে পারে এবং সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি করতে চায়। চীনের অতিরিক্ত পণ্যের জন্য তাই যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এই দুই দেশের এমন সম্পর্ককে ইতিহাসবিদেরা বলছেন ‘চিমেরিকা’ (চীন আর আমেরিকা মিলিয়ে এই নাম)।
এই সম্পর্ক শুরুতে দুই দেশের জন্যই উপকারী মনে হলেও পরে সমস্যা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের শিল্প ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়, কারণ, সস্তা চীনা পণ্য মার্কিন বাজারে ঢুকতে থাকে। আর চীনের ভেতরে নিজের মানুষের চাহিদা এত কম যে তারা সব সময় বাইরে পণ্য বিক্রি না করলে চলতে পারে না।
চীন এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। সেখানে এখন এক সন্তান নীতির পরিবর্তে এখন দুই সন্তান বা তিন সন্তান নিতে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ পরিবার এত কম আয় করে যে তারা আর বেশি সন্তান নিতে চায় না।
চীন সরকার এখন ভাবছে, তাদের কাছে তো অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা তরুণ আছেন, তাই তাঁদের দিয়ে অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই তরুণেরা চাকরি খোঁজেন যেসব জায়গায়, সেখানে খুব কম চাকরি আছে। তাই দেশে বেকারত্ব বাড়ছে, নতুন বিয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যার মানে হচ্ছে জন্মহারও কমছে।
এসব সমস্যা সমাধানে যদি যুক্তরাষ্ট্র (বিশেষ করে ট্রাম্প) সব দেশের ওপর বড় বড় শুল্ক বসিয়ে দেয়, তাহলে শুধু চীন নয়, পুরো বিশ্ববাণিজ্যই বড় বিপদে পড়বে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের যে বিশাল বাণিজ্যঘাটতি, তার সঙ্গে চীনের অতিরিক্ত রপ্তানি ভারসাম্য তৈরি করে।
ট্রাম্প যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চান, তাহলে সেটা চীন থেকেই করতে হবে। অর্থাৎ চীনের জন্মহার বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর ভেতরেই মূল সমস্যা নিহিত। কিন্তু এই কাজ শুল্ক বসিয়ে (ট্যারিফ দিয়ে) করা সম্ভব নয়। এটা করতে হলে চীনকে তার ভেতরের সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে বড় পরিকল্পনা করতে হবে।
* ই ফুসিয়ান উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী। তিনি চীনের এক সন্তান নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| এক সন্তান নীতি থেকে সরে এসেছে চীন রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1372)
-
▼
2025
(3281)
-
▼
May
(344)
-
▼
May 29
(16)
- পুতিন যে দুই জায়গায় ট্রাম্পকে পাত্তা দেন না by রজন...
- ১০ দেশে শান্তির পতাকা হাতে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা
- ‘এখনই গাজায় আগ্রাসন থামাও’- সরব হাজারো ইসরায়েলি সেনা
- ফিলিস্তিনে অবৈধ ইহুদি বসতির ‘গডমাদার’, গাজায় বসতি ...
- একজোট ইউরোপ কি নেতানিয়াহুকে থামাতে পারবে by ইউসুফ...
- চীনকে বাগে আনতে ট্রাম্পকে যে পথে হাঁটতে হবে by ই ফ...
- স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গড়ে ওঠা পিএলও...
- ভারত–পাকিস্তানের হাতে পারমাণবিক বোমার চেয়েও ভয়ংকর ...
- সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট: ইসরাইলে যুদ্ধাপর...
- ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেবে ইন্দোনেশিয়া, তবে...
- ইসরাইলি হামলায় বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ যে দম্...
- ‘আবর্জনা থেকে হবে সোনা', জনতাকে বোকা বানালেন মন্ত্রী
- রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ: ট্রাম্পের বক্তব্যে ‘তৃতীয় বি...
- বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারে পেরুর মমি রহস্যে নয়া মোড়
- শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক ফরাসি চিকিৎসক...
- সমাবেশটি আগের মতো ছুটির দিনেও হতে পারতো by রাফসান ...
-
▼
May 29
(16)
-
▼
May
(344)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment