Monday, February 10, 2025
ইলন মাস্ক যেভাবে বিশ্বের ১ নম্বর সমস্যা হয়ে উঠলেন by সোমদীপ সেন
ইলন মাস্ক যেভাবে বিশ্বের ১ নম্বর সমস্যা হয়ে উঠলেন by সোমদীপ সেন
তিনি মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডিকে ‘অপরাধী সংগঠন’ আখ্যা দিয়ে এটির ‘মৃত্যু’ হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন। এ ছাড়া তিনি নতুন সরকারি বিভাগ ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সির (ডজ) প্রধান হিসেবে কঠোর ব্যয় সংকোচনের নীতি অনুসরণ করছেন, যা অনেকের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে মাস্কের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নেই। তিনি কট্টর ডানপন্থী ট্রাম্প ও তাঁর মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) আন্দোলনকে ক্ষমতায় আনতে সহায়তা করেছেন। তিনি এখন বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া মাস্ক তাঁর ‘বিশ্বভ্রমণ’ শুরু করেছেন। তিনি চরম ডানপন্থী মতাদর্শ উসকে দিচ্ছেন এবং যুক্তরাজ্যে তাঁর অনুগত উগ্রপন্থী নেতাদের ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা করছেন।
গত এক বছরে মাস্ক যুক্তরাজ্যের কট্টর ডানপন্থী ব্যক্তিদের (যেমন টমি রবিনসন ও নাইজেল ফারাজ) বারবার সমর্থন দিয়েছেন। জানুয়ারির শুরুতে তিনি আবারও ‘ফ্রি টমি রবিনসন!’ লিখে টুইট করেন এবং রবিনসনের বিতর্কিত তথ্যচিত্র ‘সাইলেন্সড্’-এর লিংক শেয়ার করেন। ওই তথ্যচিত্রে রবিনসন ভুলভাবে দাবি করেন, সিরীয় শরণার্থী কিশোর জামাল হিজাজি ইংরেজ স্কুলছাত্রীদের আক্রমণ করেছিল এবং এক সহপাঠীকে ছুরিকাঘাতের হুমকি দিয়েছিল।
২০১৮ সালে ইয়র্কশায়ারের এক স্কুলে জামাল হিজাজিকে মারধরের একটি ভিডিও ভাইরাল হলে টমি রবিনসন একই ধরনের দাবি করেছিলেন। তিনি ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন, যা ১০ লাখের বেশি মানুষ দেখেছিল। ফলে হিজাজির পরিবার মৃত্যুর হুমকির মুখে পড়ে।
পরবর্তী সময় মার্কিন ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত টমি রবিনসনের বিরুদ্ধে জামাল হিজাজি মানহানির মামলা করেন। সে মামলায় রবিনসন পরাজিত হন। আদালত হিজাজিকে ১ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড (প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ডলার) ক্ষতিপূরণ দিতে এবং ৫ লাখ পাউন্ড (প্রায় ৬ লাখ ২৬ হাজার ডলার) আইনগত খরচ বহন করতে নির্দেশ দেন রবিনসনকে। পাশাপাশি তাঁকে হিজাজির বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে পুনরাবৃত্তি করতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
টমি রবিনসন ‘সাইল্যান্সড্’ নামের একটি তথ্যচিত্র তৈরি করে আবারও জামাল হিজাজির বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলেন। তিনি এটি লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে দেখান এবং অনলাইনে ছড়িয়ে দেন, যা আদালতের নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে। এ জন্য তাঁকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কিন্তু ইলন মাস্ক এসব উপেক্ষা করে রবিনসনকে সমর্থন করেন। তিনি এ ঘটনাকে ব্যবহার করে প্রচার করতে চান, পশ্চিমা দেশে ব্যাপক অভিবাসন নারীদের জন্য হুমকি। এ ধারণা ব্রিটেনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আর মাস্ক সেটাকেই কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে চাইছেন।
গত গ্রীষ্মে এক রুয়ান্ডান বংশোদ্ভূত ব্যক্তি তিনজন ব্রিটিশ কিশোরীকে হত্যার পর যুক্তরাজ্যে সহিংস অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। তবে আসল উত্তেজনা তৈরি হয় মিথ্যা প্রচারের কারণে, যেখানে কট্টর ডানপন্থীরা, বিশেষ করে টমি রবিনসন, ভুল তথ্য ছড়িয়ে দাবি করেন, হত্যাকারী আল সাকাতি নামের ১৭ বছর বয়সী একজন আশ্রয়প্রার্থী।
এ ছাড়া ব্রিটেনে এক দশক ধরে আলোচিত ‘গ্রুমিং গ্যাং স্ক্যান্ডাল’কেও (এমন একটি প্রচারণা যেখানে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পুরুষেরা শ্বেতাঙ্গ কিশোরীদের নিপীড়ন করেছে) মাস্ক ও কট্টর ডানপন্থীরা বর্ণবাদী ও অভিবাসনবিরোধী প্রচারণার জন্য ব্যবহার করছেন।
২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওল্ডহ্যামে তথাকথিত ‘গোপন তথ্য লুকানোর’ ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু মাস্ক সত্যকে উপেক্ষা করে ‘গোপন তথ্য লুকানোর’ ধারণা ছড়িয়ে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের চেষ্টা করেন।
সম্প্রতি মাস্ক দাবি করেন, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার (যিনি ২০০৮-২০১৩ সালে ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস, সংক্ষেপে ‘সিপিএস’ পরিচালনা করেছেন) ‘দলবদ্ধ ধর্ষণের’ বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেননি। টুইটে তিনি লেখেন, ‘স্টারমার ব্রিটেনের ধর্ষণের ঘটনায় সহযোগী ছিলেন এবং তাঁর বিচার হওয়া উচিত।’
মাস্ক যুক্তরাজ্যের উপমন্ত্রী জেস ফিলিপসকে ‘ধর্ষণের সমর্থক’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং রাজা চার্লসকে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মাস্কের টুইট ও টমি রবিনসনের মতো ব্যক্তিদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন হয়তো যুক্তরাজ্যে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন আনবে না, তবে তিনি স্পষ্টভাবেই দেশটিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কট্টর ডানপন্থার উত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করছেন।
মাস্ক তাঁর বিশ্বব্যাপী কট্টর ডানপন্থা উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে জার্মানিতেও হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি দেশটির কট্টর ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) প্রকাশ্য সমর্থক হয়েছেন। ডিসেম্বরের শেষ দিকে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি এএফডিকে জার্মানির ‘শেষ আশার আলো’ বলে উল্লেখ করেন। সে লেখায় তিনি বলেন, অভিবাসন সীমিত করার মাধ্যমে দলটি দেশকে নিরাপদ রাখতে ও জার্মান সংস্কৃতি রক্ষা করতে পারবে।
জানুয়ারির শুরুতে মাস্ক এক্সে এক সরাসরি আলোচনায় এএফডির নেতা অ্যালিস ভিডেলের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, শুধু এএফডি–ই দেশকে অভিবাসনজনিত অপরাধ বৃদ্ধির হাত থেকে বাঁচাতে পারে। ভিডেলও বিতর্কিত মন্তব্য করে বলেন, হিটলার আসলে কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক ছিলেন।
জানুয়ারির শেষ দিকে মাস্ক ভিডিও লিংকের মাধ্যমে জার্মানির হাল্লেতে এএফডির এক সমাবেশে বক্তৃতা দেন। সেখানেও তিনি এএফডিকে জার্মানির ভবিষ্যতের ‘সর্বশেষ আশা’ বলে অভিহিত করেন।
এই প্রকাশ্য সমর্থন এবং ভিডেলকে প্ল্যাটফর্ম দেওয়ার মাধ্যমে মাস্ক সম্ভবত এএফডিকে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ট্রাম্পের মতো জয়ী করতে সাহায্য করতে চাইছেন।
ট্রাম্প কট্টর ডানপন্থীদের উত্থানে ভূমিকা রাখছেন। তিনি ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যেখানে মাস্কও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন।
এ ছাড়া মাস্ক প্রকাশ্যে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেয়ির প্রশংসা করেছেন। মিলেয়ির কঠোর অর্থনৈতিক নীতিগুলো তার ‘ডজ’ নীতির অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। মিলেয়ি ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন।
গত সেপ্টেম্বরে মাস্ক এল সালভাদরের বিতর্কিত নেতা নায়িব বুকেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নায়িব বুকেল কঠোর অপরাধ দমন নীতি ও গণহারে লোকজনকে জেলে পাঠানোর জন্য বিশাল কারাগার বানানোর জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছেন। এখন খবর পাওয়া যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের দণ্ডিত অপরাধীদের বুকেলের কারাগারে পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে। বুকেলে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফি নিয়ে তাদের কয়েদিদের রাখার মাধ্যমে তিনি নিজের কারাগারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চান।
মাস্কের ডানপন্থী প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে তিনি কোনো মন্তব্য না করলেও কিছু দেশে তা প্রভাব ফেলছে। পোল্যান্ডে এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোটার মাস্ক–সমর্থিত প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন।
এটি ঠিক, মাস্কের বৈশ্বিক ডানপন্থী বিপ্লবের প্রচেষ্টা এখনো প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। তাঁর কিছু পদক্ষেপ সফল হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তিনি হয়তো যে রকম প্রভাব চাচ্ছেন, তা না–ও হতে পারে। তবে এটি চিন্তার বিষয় যে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার ক্ষেত্রে মাস্ক অনেক দূর এগিয়ে গেছেন।
সোমদীপ সেন রস্কিল্ড ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| ইলন মাস্ক |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1406)
- ▼ 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment