কার কল্যাণে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট by মোস্তফা হোসেইন

শেরপুর জেলার জগৎপুর গ্রামের গণহত্যা ও গণকবর বিষয়ে লেখার ইচ্ছা ছিল। মৌলভীবাজার জেলার শমশেরনগরের নির্যাতনকেন্দ্র কিংবা কুমিল্লা জেলার লাকসামের নির্যাতনকেন্দ্র ও বধ্যভূমির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে, এমনই ভাবনায় ছিল।


শেরপুর জেলার জগৎপুরের সুনীল দে ও সজল দের বর্ণনা অনুযায়ী তাঁদের গ্রামের ৪৭ জনের হত্যাকাণ্ড, মৌলভীবাজার জেলার শমশেরনগরের আবদুল মুছাবি্বরের বর্ণনা অনুযায়ী নির্যাতনচিত্র এবং তাঁর ১৩ সঙ্গীর জীবনদানের বিষয়ও বিশ্লেষিত হবে। আর সেসবের সমাপ্তি ঘটবে সেখানে সরকার স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করছে কি না কিংবা সিদ্ধান্ত হলেও কোনো কারণে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে না ইত্যাদি। অবশ্যই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি এবং অবহেলার বিষয়টিও বর্ণনায় আসার কথা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আরো কিছু বিষয়ে লেখার প্রয়োজন বোধ করায় প্রসঙ্গান্তর ঘটছে। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান কিভাবে মৃত্যুপুরীর উদাহরণ হয়, কিভাবে সেখানে লুটপাট ও দুর্নীতি মাথা গেড়ে বসে তাই বর্ণিত হচ্ছে এবার। তার নাম মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট।
বড় আশা নিয়ে বঙ্গবন্ধু এ ট্রাস্ট গঠন করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, এর আয় দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের কল্যাণ সাধিত হবে। কমও ছিল না সেই ট্রাস্টের সম্পদ। ৫৫ একর জমিসহ মোট ৩৫টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে শুরু হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের সব কটিই পাকিস্তান আমলে মুনাফা করত। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন মৃত শামুকের খোলসের সঙ্গে তুল্য। নামে আছে, কিন্তু কাজে নেই। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, প্রতিষ্ঠালগ্নে বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখেছিলেন অর্থাৎ এর আয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সচ্ছলভাবে চলতে পারবেন_সেই স্বপ্ন এখন ধুলোয় মিশে গেছে। এ প্রতিষ্ঠানের চার শতাধিক কর্মী এখন সরকারের বোঝা। মাসে মাসে লাখ লাখ টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে সরকারকে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করবে কিভাবে? তারা নিজেরাই তো এখন সরকারের করুণার পাত্র। বার্ষিক ৬৩ কোটি টাকা তারা সরকারের তহবিল থেকে নিচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রদানের জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রদানের জন্য এই চার শতাধিক মানুষ পোষার যুক্তি কী? বলা হতে পারে তাবানি বেভারেজ বিষয়ে। এটি বন্ধ আছে বিধায় দুই শতাধিক মানুষ বেকার জীবনযাপন করছে। কথা আসতেই পারে_কোকা কোলার মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান কল্যাণ ট্রাস্টের সঙ্গে ব্যবসা করতে চাইছে না কেন? কেন সেই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ঘোষিত হয়েছে? তাবানি বেভারেজ ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে যেখানে ১৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে সেই প্রতিষ্ঠানটিই ২০০০-২০০১ অর্থবছরে এসে ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা লোকসান দেয় কোন কারণে। তারপর থেকে লোকসান কেবল বেড়েই চলেছে এবং অবশেষে সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। তাবানি বেভারেজকে আবার লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো চিন্তাভাবনা কি কর্তৃপক্ষের আছে?
অত্যন্ত সোজা কথা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মাঝে পাক খেয়ে প্রতিষ্ঠানটি লোটা-কম্বল নিয়ে পালিয়ে বেঁচেছে। না, এমন ভাবনার কারণ নেই যে এ প্রতিষ্ঠানই শুধু জটিলতার মুখে পড়েছে। মনে আছে নিশ্চয়ই মিমি চকোলেট কারখানার কথা। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, মিমি চকোলেটের মতো লাভজনক প্রতিষ্ঠানটিও সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে রাখতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরি কোন স্বার্থে হাতছাড়া হয়েছে? পারুমা ইস্টার্ন লি., ইস্টার্ন কেমিক্যালস লি., বাঙ্লি পেইন্ট, সিরকো সোপ, মেটাল প্যাকেজ, আলমাস সিনেমা হল, ইসিআই গ্লুর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর খবর কী?
তেজগাঁও, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ কিংবা চট্টগ্রামের মতো জায়গায় অতি মূল্যবান থাকার পরও এ প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের চলার মতো আয়-রোজগারও করতে পারছে না কেন? প্রশ্ন একের পর এক বাড়তেই থাকবে বিশ্লেষণ করতে গেলে। চার শতাধিক মানুষ প্রায় অলস বসে যেখানে সরকারের কোষাগার থেকে বেতন নিচ্ছে সেখানে একটার পর একটা প্রতিষ্ঠানের মেশিনপত্র মাটিতে মিশে যায় কিভাবে? এমনও শোনা যায়, তাদের কিছু প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি নাকি এখন আর কেজি হিসেবেও বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। তালা খোলা হয় না ১০-১২ বছর ধরে এমন প্রতিষ্ঠানও আছে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের। নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্যে কতটা অবহেলা থাকলে একটি প্রতিষ্ঠানের জমিও জরিপের সময় অন্য নামে রেকর্ড হয়ে যেতে পারে? তার উদাহরণ জানতে হলে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কাছে যেতে পারেন যে কেউ। ৫৫ একর জমির মালিক এ প্রতিষ্ঠানের জমির খাজনা পর্যন্ত দেওয়ার কথা মনে রাখেননি। জমির পরচা ঠিক নেই, নকশাও না। ১৯৭২ সাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত দেশে দুইবার ভূমি জরিপ হয়েছে। কিন্তু একবারও সেখানে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিল না। ফলে তালগোল লেগে গেছে জরিপ পরবর্তীকালে। জরিপের পরও ত্রুটি সারানোর কোনো চেষ্টা করা হয়নি। তাদের কর্তব্যে অবহেলা দেখার মতো কেউ ছিল কি না তাও আজকে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আসলে নিজেরা চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানের জন্য দুই পয়সা রোজগার করার মানসিকতাই নেই তাদের। এ ক্ষেত্রে ঢাকার গুলিস্তান কমপ্লেঙ্রে কথা ধরা যেতে পারে। সেখানে ২০ তলা বাণিজ্যিক ভবন তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় তারা। একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয় সেখানে ভবন তৈরি করার। ওই প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ সালের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে তাদের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার চুক্তি করলেও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ২০০৯ সাল পর্যন্ত টুঁ-শব্দটি করার সময় পায়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর খবর হয়, গুলিস্তান কমপ্লেঙ্ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ছিল তাদের। আর সেখান থেকে নিয়মিত ভাড়া আসার কথা তাদের তহবিলে। কিন্তু তত দিনে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটি অনিয়মের শতভাগই সম্পন্ন করেছে বলে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকেই বলা হচ্ছে। আজ অবধি এই কমপ্লেঙ্রে বিষয়টি সুরাহা হয়নি। জানা গেছে, আদালতে মামলা চলছে কমপ্লেঙ্ বিষয়ে। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের যে সম্পদ ছিল তা যদি সঠিকভাবে পরিচালনা করা হতো তাহলে এ প্রতিষ্ঠান থেকে বার্ষিক পাঁচ শতাধিক কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করা কোনো ব্যাপারই ছিল না। আজকে সেই প্রতিষ্ঠানটি ১২৩ কোটি টাকা ঋণ করে বসে আছে। এই ঋণ পরিশোধ করার ক্ষমতা আছে কি প্রতিষ্ঠানটির?
এ প্রতিষ্ঠানটি যে কত অবহেলার শিকার তার একটি প্রমাণ হচ্ছে_ট্রাস্টি বোর্ডের কোনো সভা না হওয়া। এ সরকার ক্ষমতায় এলে ট্রাস্টি বোর্ডের সভা ডাকা হয়। তার আগে বৈঠক হয়েছিল দীর্ঘ ১১ বছর আগে। এতেই বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি কতটা এতিম ।
সারা দেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধা বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন। অথচ তাঁদের চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হয়েছিল পাঁচ তলাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল। সেই হাসপাতালটি এখন নিজেই মৃত্যুর দুয়ারে। এ হাসপাতাল পরিচালনা করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেওয়া হয়েছিল, যাকে অনেকেই স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের বলে অভিযোগ করে থাকেন। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ কিভাবে করবে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট? তার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই যেখানে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, সেখানে তাদের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ করা অসম্ভব। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার। তারা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে_এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
tsrahmanbd@yahoo.com