অভিবাসন খাতে অর্জিত সাফল্য ধরে রাখতে হবে by হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ

বাংলাদেশের জনগণের উপার্জনের একটি অন্যতম খাত অভিবাসন। এই খাতের সরাসরি উপকারভোগী দেশের প্রায় চার কোটি মানুষ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৮০ লাখ অভিবাসী শ্রমিক পৃথিবীর নানা দেশে কর্মরত রয়েছে। যারা প্রতিবছর তাদের কষ্টার্জিত হাজার হাজার মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে প্রেরণ করছে। সেই অর্থ আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


অভিবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতিতে বরাবরই আশীর্বাদস্বরূপ। প্রবাসীদের রক্ত ঝরানো এই আয়-অর্জন দেশের অর্থনীতির চাকাকেই শুধু সচল রাখেনি, খোদ বিশ্বমন্দার চরম সময়েও এই খাতটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহুবিধ বিপদ থেকে রক্ষা করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রতিযোগিতায় বিশ্বব্যাপী আমাদের অবস্থান যথেষ্ট ভালো এবং সুসংহত। দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের অবস্থান আরো সুদৃঢ় এবং ঊর্ধ্বগতিসম্পন্ন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের দ্য মাইগ্রেশন অ্যান্ড রেমিট্যান্সেস ফ্যাক্টবুক ২০১১-এর প্রদত্ত তথ্যমতে, এই খাতে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই আমাদের অবস্থান। তবে জনসংখ্যানুপাতে ভারত থেকে এই খাতে আমাদের আয় মোটেও কম নয়।
দ্য মাইগ্রেশন অ্যান্ড রেমিট্যান্সেস ফ্যাক্টবুক ২০১১ অনুযায়ী আমরা দেখতে পাই, প্রতিবছরই আমাদের রেমিট্যান্সপ্রাপ্তির হার বেড়েই চলেছে। বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও গত এক দশকে এই ধারাবাহিকতায় কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। আমরা যদি উলি্লখিত তথ্যানুযায়ী গত পাঁচ বছরের অর্জনের দিকে চোখ রাখি বা একটু বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখি, তাহলে দেখতে পাব আমরা ক্রমশই উচ্চধাপে এগিয়ে চলেছি। ২০০৬ সালের কথাই ধরা যাক। ওই বছর আমাদের মোট রেমিট্যান্সপ্রাপ্তি ছিল পাঁচ হাজার ৪২৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৭ সালে এই অর্জন আরো বেড়ে দাঁড়ায় ছয় হাজার ৫৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। পরের বছর ২০০৮ সালে আরো উত্থান ঘটে। রেমিট্যান্স আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় আট হাজার ৯৯৫ মার্কিন ডলারে। ২০০৯ সালে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৫২৩ মার্কিন ডলারে। আর গত বছর আগের ধারাবাহিকতায় না বাড়লেও বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। ২০১০ সালে মোট রেমিট্যান্সপ্রাপ্তি ছিল ১১ হাজার ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। ২০১০ সালের তুলনামূলক চিত্র থেকেও আমরা দেখতে পাই, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতই কেবল আমাদের সামনে, আর কেউ নয়। দেখা যায়, ২০১০ সালে ভারত ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশ ১১ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, পাকিস্তান ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, শ্রীলঙ্কা ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং নেপাল ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স থেকে আয় করেছে। এই চিত্র স্পষ্টত বলে দিচ্ছে, আমাদের প্রাপ্তিহার অনেক বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বরাবরই প্রথম অবস্থানে ভারত। এর পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এরপর রয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা। অন্যদিকে ইস্ট এশিয়ার মধ্যে রেমিট্যান্স আয়ে যেসব দেশ এগিয়ে রয়েছে সেগুলো হলো- চীন, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া।
সরকারও বলছে, জনশক্তি খাত গতিশীল ছিল বলেই দেশের অর্থনীতিতে মন্দার আঘাতটা তেমন বোঝা যায়নি। গত ২৫ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদের নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান যে উদ্বোধনী ভাষণ দেন, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে অভিবাসী শ্রমিকদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, 'বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের তিন বছরে ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ডিসেম্বর ২০১১ পর্যন্ত মোট জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪২ জন। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৮০ লাখ কর্মী বিশ্বের ১৪৩টি দেশে কর্মরত আছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স যে কেবল জিডিপিকে সমৃদ্ধ করছে তা নয়, এটি দেশের ৭৬ লাখ পরিবারের জীবনমান উন্নয়ন, তথা দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। ২০১১ সালে প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো মুদ্রার পরিমাণ ১২ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এ সময়ে পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার ৬২ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি আরো সৃদৃঢ় হয়েছে।'
রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, "ইতোপূর্বে অভিবাসন ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক কর্মীকে ভিটেমাটি বিক্রি অথবা উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হতো। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বর্তমান সরকার 'প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক' স্থাপন করেছে, যার কার্যক্রম ২০ এপ্রিল ২০১১ থেকে শুরু হয়েছে। এখন বিদেশগামী কর্মীরা এ ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে বিদেশে যেতে পারছেন। এ ছাড়া বিদেশ থেকে সহজে ও স্বল্পসময়ে রেমিট্যান্স প্রেরণ এবং বিদেশফেরত কর্মীদের ঋণ প্রদানের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানে উদ্যোগী করাও এ ব্যাংকের অন্যতম উদ্দেশ্য। এ ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের এবং বিদেশ থেকে প্রত্যাগতদের স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা ও অন্যান্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এপ্রিল ২০১১ থেকে অক্টোবর ২০১১ পর্যন্ত এ ব্যাংক থেকে ১৩৮ জনকে ঋণ প্রদান করা হয়েছে। প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় এক কোটি তিন লাখ ৩৬ হাজার টাকা। প্রদত্ত ঋণের অনুকূলে আদায়ের হার ৯৭ শতাংশ। ২০১১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তিনটি বিভাগীয় শহরে (চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা) ব্যাংকের আঞ্চলিক শাখা স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রবাসীদের সরাসরি সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ব্যাংকের বুথ স্থাপন করা হচ্ছে।"
জনশক্তি খাতে বর্তমানে আমাদের যে অর্জন, সেই অর্জনের প্রধান কৃতিত্ব বর্তমান সরকারের প্রবাসী এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপির। যিনি এই মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকেই সৎ, নিষ্ঠা, একাগ্রতা এবং নিরন্তর পরিশ্রমের এক অনন্যদৃষ্টান্ত স্থাপন করে অভিবাসন-প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে সচেষ্ট রয়েছেন। ক্লিন ইমেজের এই মন্ত্রী জনশক্তি রপ্তানি খাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চতকরণ এবং নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে অবিরাম প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে চলেছেন। নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করতে সহকর্মীদের নিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। কথা বলেছেন বিভিন্ন দেশের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। একই সঙ্গে অভিবাসন ধারাকে স্বচ্ছ, জবাবদিহি করতে শুরুতেই যিনি একধরনের জিহাদ শুরু করেন। ইতিমধ্যেই এ উদ্যোগের সুফল পেতে শুরু করেছে অভিবাসী হতে ইচ্ছুক কর্মীরা। গৃহযুদ্ধ চলাকালীন লিবিয়া থেকে যেসব শ্রমিক সব কিছু ফেলে শুধু জীবন নিয়ে দেশে ফেরার সুযোগ পায়, তাদের প্রত্যেকের ক্ষতিপূরণ প্রদান নিশ্চিত করা হয়।
সবশেষে বলব, জনশক্তি খাতে চলমান যে সাফল্য, তা অবশ্যই ধরে রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে আমাদের যে দূতাবাসগুলো রয়েছে, সেগুলোকে আরো প্রো-পিপল করতে হবে। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সঙ্গে সঠিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সমন্বয় সাধন করতে হবে। জনশক্তি রপ্তানি-প্রক্রিয়ার আইন আরো সহজ ও অভিবাসী এবং স্টেকহোল্ডারবান্ধব করারও প্রয়োজন রয়েছে।
জনশক্তি খাতে আমাদের এখন যে সাফল্য এবং আগামী দিনে এই খাতে আরো যে প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে দক্ষ শ্রমিক তৈরি ও পাঠানোর কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা যত বেশি দক্ষ শ্রমিক ও প্রফেশনাল প্রেরণ করতে পারব, বিশ্ব-শ্রমবাজারে আমাদের ডিমান্ড ও ইমেজ তত বেশি বৃদ্ধি পাবে। আমাদের সবার মনোযোগ এখানেই নিবদ্ধ হওয়া সময়ের দাবি।
লেখক : জনশক্তি রপ্তানি বিশ্লেষক এবং চেয়ারম্যান,
ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
kirondebate@gmail.com