Thursday, November 8, 2012
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত by সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত by সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
রানীরঘাট যাচ্ছি শুনে মফস্বলের বাসে এক ভদ্রলোক বলেছিলেন_রানীরঘাট যাবেন? দেখবেন মশাই, মহা ত্যাঁদোড় জায়গা। সাবধানে থাকবেন। _কেন বলুন তো?
_প্রবাদ শোনেননি 'রানীরঘাটে কে কার বাবা?' শুনিনি। তবে আমাদের গাঁয়ের পাশে এক বড় গাঁ গোকর্ণ।
_প্রবাদ শোনেননি 'রানীরঘাটে কে কার বাবা?' শুনিনি। তবে আমাদের গাঁয়ের পাশে এক বড় গাঁ গোকর্ণ।
সারা রাঢ় অঞ্চলে তার নামে প্রবাদ ছিল শুনেছি_'গোকর্ণে কে কার মেসো!' সব চালু প্রবাদের পেছনেই একটা গপ্পো থাকে। এক্ষেত্রেও ছিল। তখন নাকি ঠ্যাঙাড়েদের যুগ। আক্রান্ত পথিক অন্ধকারে ঠ্যাঙাড়েকে চিনতে পেরে মেসোমশাই বলে চেঁচিয়ে ওঠে। ঠ্যাঙাড়ে তার গলায় বাঁশ চেপে মুণ্ডু উল্টে দিয়ে বলেছিল_'গোকর্ণে কে কার মেসো!'
নিছক গপ্পো হতে পারে, নাও পারে। হয়তো সে-আমলের মাৎস্যন্যায়কে বোঝাতেও এমন গপ্পোর উদ্ভব। কিন্তু রানীরঘাটের বেলায়ও তো একটা গপ্পো থাকার কথা। কী সেটা? খোঁজখবর করতে গিয়ে দেখি, গপ্পোর নায়ক আমার রীতিমতো চেনা।
সেই গপ্পোটাই অবিকল শুনিয়ে দিচ্ছি। এতটুকু রঙ চড়াচ্ছি না। বরং যতটা রঙ ছিল, ঘষে একটু ফিকে করেই দিলুম। ঈষৎ ধূসর দেখাক না! কিন্তু দার্শনিকতা না, মরাল না, হাতের তালুর মতো স্পষ্ট ব্যাপার। আজকাল জ্ঞান দেবার চেষ্টা করলে লোকে অপমানিত বোধ করে। বিপুলা পৃথ্বী নিরবধি কালের কতটুকই বা জানি যে জ্ঞান দেব?
আরও একটা কথা। নিজেকে গপ্পোর মধ্যে ঢুকিয়ে এক নিরাসক্ত কিংবা ক্রান্তদর্শী চরিত্র করে তোলার লোভও অতিকষ্টে সংবরণ করেছি। যদিও তাই রেওয়াজ।
সে অনেক বছর আগের কথা।...
নদীর ওপারে এক শহর, এপারে এক ঘাট। তার নাম রানীরঘাট। নদীর নাম ভাগীরথী। লোকেরা বলে মাগঙ্গা। মাগঙ্গার কোলে ছোট্ট মেয়ের মতো রানীরঘাট হেসেখেলে দিন কাটায়। গাঁয়ের মেয়ের চোখে শহরের ঘোরলাগা ভাবটুকুও চোখে না পড়ে পারে না। কিন্তু শুধু ওই আলতো ঘোরটুকুই ছিল তখন, আর কিছু না।
একটা বাসস্ট্যান্ড ছিল। কয়েকটা ছোটখাটো দোকান ছিল। রিকশা খান পাঁচেক। এক সময় ঘোড়ার গাড়িও ছিল। সারাদিন বাইরের মানুষের ভিড়ে হইচই বড় বেশি। তারপর সন্ধ্যা হতে না হতে ভিড় কমে যায়। শেষ বাস ছেড়ে যায় সাড়ে সাতটাতেই। বাঁশবনে শেয়াল ডাকে। তক্ষক ডাকে। পেঁচা ডাকে শিমুল গাছে। নিঝুম রাতে ঘাটের ধারে আটচালায় একটা লণ্ঠন। কাদের চাপা গলায় গপ্পসপ্প। আর মাঝে মাঝে ঘাটের ইজারাদার চৌবেজীর চেরা গলায় হাঁক_শম্ভুয়া_আ_আ! শেষ খেয়া ফিরতে হয়তো দেরি করছে।
সেবার শীতে জেলাবোর্ডের সেন্সাসের বাবুরা এসে আধঘণ্টাতেই রানীরঘাটের গণনা শেষ করে ফেলেছিলেন। রোদে দাঁড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে চা খেতে খেতে একজন হঠাৎ তামাশা করে বললেন_আরে, ওই পাগলীটা যে রয়ে গেল! লিখে নাও।
আটচালার ধারে বসে পাগলীটা তখন যাকে দেখছে, চেঁচাচ্ছে_ও বাবারা! ওগো বাবারা! সবাইকে ওর বাবা বলা অভ্যেস। কিন্তু বাবা বলে ডাকছে কেন, কী বলতে চায়, বোঝা যায় না। ভিক্ষে দিলেও তো ছুড়ে গায়ে ফেলে দেয়।
পাশের তেলেভাজার দোকান থেকে ময়রাবুড়ী ফিক করে হেসে বলল_তা লিখে নেবেন তো নিন বাবুরা। লিখুন, সুরেশ্বরী। লোকে বলে সুরিক্ষেপী। সেও তো একটা মানুষ বটে। রানীরঘাটে সাত বছর আগে। সবার নাম লিখলেন, ওর কেন লিখবেন না?
প্রথমবাবু বললেন_আর কে আছে ওর?
_আবার কে থাকবে? যে-যা দয়া করে দেয়, খায়। আটচালাতে ঘুমোয়।
দ্বিতীয়বাবু দেখছিলেন সুরিক্ষেপীকে। ভুরু কুঁচকে চাপা গলায় বললেন_মেয়েটা মনে হচ্ছে প্রেগন্যান্ট্! স্ট্রেঞ্জ!
প্রথমবাবু হেসে ফেললেন_ভাগ্। তুমি তো ব্যাচেলার। কিসে বুঝলে?
_এসব বুঝতে বিয়ে করা লাগে না। দেখ না, জাস্ট লুক অ্যাট দ্য থিং।
সুরিক্ষেপী ছেঁড়া নোংরা শাড়িটা সামলাতে পারে না। অথচ মাথায় ঘোমটাটি থাকা চাই-ই।
প্রথমবাবু দেখলেন। অবাক হয়ে বললেন_সত্যি তো। মানুষ মাইরি এখনও জানোয়ার।
ময়রাবুড়ী ব্যাপারটা লক্ষ করে ভারি গম্ভীর হল। গোমড়ামুখে বলল_মাগঙ্গার চোখের সামনে এই পাপ। সইবে ভেবেছেন? দেখুন না কী হয় পেলয়কাণ্ড! রানীরঘাট ভেসে যাবে। ধুয়ে মুছে যাবে। বেঁচে থাকলে দেখে যাব।
দ্বিতীয়বাবু হো হো করে হেসে বললেন_ও বুড়ীমা, কী করে দেখবে? তুমিও তো ভেসে যাবে।
বুড়ী বিকৃত মুখে গরম তেলে বেগ্নি ছাড়ল। চড়চড় করে আওয়াজ হতে থাকল। কনুই গড়িয়ে জলের ফোঁটা পড়েছে বুঝি। বাবুর কথার জবাব দিল না। পাপের শাস্তি নিজের হাতে দিচ্ছে যে।
প্রথমবাবু চায়ের ভাঁড় ছুড়ে ফেলল আকন্দের ঝোপে। পা বাড়িয়ে আবার রসিকতা করল।
_তাহলে লিখতে হলে দুটো নামই লেখ। সুরেশ্বরী না কী বলল যেন, আর তার পেটে যেটা আছে।
_ছেলে হবে, না মেয়ে হবে তার ঠিক নেই। দ্বিতীয়বাবু সিগারেট ধরিয়ে পা বাড়ালেন।
_একটা কমন নাম দেওয়া যাক্।
_মাথায় আসছে না।
_অজস্র আছে, অজস্র। শোন বলছি। ঊষা, পার্বতী, রেণু, উমা... আঙুল গুনতে গুনতে প্রথমবাবু বললেন। কটা হলো? দাঁড়াও আরও বলছি। রমা।...
সুরি পাগলী চেঁচিয়ে উঠল_বাবারা! ও বাবারা! ওগো বাবারা!
ঘাটের ধারে উঁচু পাড়ে ঘাটের ইজারদার চৌবেজীর গদি। পূর্ণিয়ার লোক। এ ঘাটে আছেন চৌদা বরষ। যখন এসেছিলেন, তখন চুল ছিল কুচকুচে কালো। এখন অর্ধেক পেকে গেছে। ফি-সাল জষ্ঠি মাসের সংক্রান্তিতে গঙ্গাপুজোর মেলার দিন ন্যাড়া হন। ময়না পোষার শখ খুব। খাঁচাটা সামনে ঝুলছে। রামনাম শেখান সকাল-সন্ধ্যা। নিজে পড়েন তুলসীদাসের রামচরিতমানস। কালেকটরিতে এ বছর একইশ হাজার রূপেয়া গুনে দিয়ে ঘাট জিতেছেন। আনা-আনা পারানি। তবে বিলাঞ্চলের যুবতী মেছুনীদের বেলা আনাকড়ি নয়, রাতের জলের ফসল ঝকঝকে রাইখয়রা মাছ। চৌবেজী মাছও খান, মাংসও খান। খৈনি ডলেন, গড়গড়াও টানেন। গদিতে কোলে তাকিয়া নিয়ে বসে ভাঙা উচ্চারণে গানও গেয়ে ওঠেন_'কেম্নে এ গঙ্গাহোবো পার/হামি জানে না সাঁতার।' মাছের গন্ধ লাগা বেলুন-বেলুন বুক খিলখিল হাসিতে ফুলে ওঠে, দুলে ওঠে।_ওত্তা হাসো মাৎ রী। ফাট্ যায়গা।
_ঘাটোয়ারিবাবু না ঘাটের মড়া। কোথায় শিখলে এমন গান? আ ছি ছি।
আর ফচকেমির সময় নেই। শম্ভু মাঝি ডাক দিয়েছে_এ অষ্টসখী রাধিকে সুন্দরীরা।...
ওদিকে ডাক দিয়েছে ইসমাইল ড্রাইভারের বাসও। হর্নের ভ্যাঁক ভ্যাঁক আওয়াজ চলে যাচ্ছে নদী পেরিয়ে ওপারের ঘাটে।_পুরন্দরপুর মনসুরগঞ্জো বিনোটি মহিমাপুর। ছেড়ে গেল, ছেড়ে গেল। সবুজ। বাসের ভেতরে লোক, বাইরে লোক, ওপরে লোক। অলীক ফলন্ত বৃক্ষ হেলতে দুলতে যাবে। রাস্তা মহা ফক্কড়বাজ।
_বাবারা। ওগো বাবারা! ও বাবারা! সুরিক্ষেপী মাটিতে থাপ্পড় মেরে সেই হাত কপালে আনে। আবার মাটিতে থাপ্পড়। ধুলোয় কপাল ধূসর।
ময়রাবুড়ী চেঁচায়_চুপ। চুপ। গলায় দোব গরম তেল ঢেলে। লজ্জা করে না বড় গলা করে চ্যাঁচাতে? তখন কোথায় ছিল এ গলা? চিহরিপোকার (শ্রীহরি) কামড় খেয়ে বোবা হয়েছিলি?
মাঘের শেষে রানীরঘাটে শিমুলের ডালপালায় যেন হাজার অলীক বনমোরগ উড়ে এসে বসেছে। লাল লাল ঝুঁটি। ফাল্গুনে তাদের সাদা পালক উড়ে পড়ে মাগঙ্গার বুকে। স্বচ্ছ কালো জল বালির চরে মাথা কুটে কুটে পথ প্রার্থনা করে। যেতে পায় কী পায় না। শ্যাওলায় ঠোঁট ঘষে বেড়ায় মৌরালার ঝাঁক। প্রতিমার খড়বাঁশের টাট উল্টে গেছে যে স্রোতে, তা এখন স্মৃতি এবং পরবর্তী প্রতীক্ষা। মড়াখেকো দাঁড়কাক এসে সেই টাটে বসে সবাইকে খেতে ডাকে_খা খা। ময়রাবুড়ী তাই শুনে বলে_ওই ঘাটের মড়াটাকে খা। এ ঘাটে অনেক মড়া। কোন মড়ার কথা বলে দাঁড়কাক জানে না। সুরিক্ষেপীকে বুড়ী এনেছে চান করাতে। বুড়ীর হাতে কঞ্চি। কঞ্চিটা নাচাতে নাচাতে বলে_ভালো মানুষের বেটি হবি তো বস্। বসে পড় জলে। তাই বলে ওকে ছোঁবে না বুড়ী। নিজে-নিজেই চান করতে হবে সুরিক্ষেপীকে। তাই আবার স্নান। পা ছড়িয়ে আঘাটার জলে বসে কপাল থেকে জলের দিকে এবং জলের দিক থেকে কপালে হাত।_বাবারা! ওগো বাবারা! জল বলে ধুলোমাখা কপাল ধুয়ে যায়, এটাই এখন সুবিধে। বুড়ী বলে_হাতখানা বুকে দে লো, বুকে দে। বাবারা বলে বুকে দে দিকিনি।
শীতটা চলে গেল। গ্রীষ্ম এলো। ঘাটের ধারে আকন্দঝাড়ে ফুল ফুটল। ঘাটোয়ারিজী গঙ্গাপুজোর দিন ন্যাড়া হলেন। আটচালায় সুরিক্ষেপীকে আড়চোখে দেখে দয়া করে ভাত পাঠিয়ে দিলেন। এ বছর অচানক দশ হাজার টাকা বেড়ে গেছে ইজারার দর। তাই বলে চৌবেজী রানীরঘাট ছাড়বেন না। বুড়ো হয়ে মরবেন, তখন কেউ গদি দখল করুক। বড় মায়া বসে গেছে রানীরঘাটে।
বর্ষায় এক রাতে তুলকালাম বৃষ্টি। তার মধ্যে সুরিক্ষেপীর বাচ্চা হলো আটচালায়। কজন দূর গাঁয়ের গাড়োয়ান গরুমোষের গাড়ি নিয়ে এসে আটকে পড়েছিল। তারাই বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ছুটোছুটি করে অবশেষে ময়রাবুড়ীকেই পেল। মানুষের জন্মটা ওইসব গেঁয়ো গাড়লদের কাছে নিশ্চয়ই খুব দামী। তারা একটা হ্যারিকেন দিল পর্যন্ত। আটচালার কোণটাও কাপড় টাঙিয়ে ঘিরে দিল। মেয়েমানুষের আর্তনাদ শুনে তাদের হৃদয় গলে যাচ্ছিল। বৃষ্টি না থাকলে তারা এ সময় দূরে সরে থাকত। মানুষের জন্ম তাদের কাছে বড় পবিত্র ঘটনা। তারা একে সম্মান দিতে চাইছিল। কিন্তু বৃষ্টি! আর বুঝি সময় ছিল না বর্ষাবার। তারা বর্ষার বাপান্ত করছিল।
ময়রাবুড়ী বলল_আগুন চাই যে এখন। দেখ্ দিকি, এ অসময়ে গুখেকোর বেটি এ কী করে বসল।
গাড়োয়ানরা ঘাটোয়ারিবাবুর গদি থেকে শুকনো লাকড়ি এনে দিল। একটু পরে শোনে, ওঁয়া-ওঁয়া কান্নাকাটির মধ্যে বুড়ী হেসে-হেসে আদর করছে_এ রাঙা টুকটুক কোত্থেকে এলো রে! এ ভাঙাঘরে চাঁদের হাট কোন মুখপোড়া বসালে রে। একে আমি কোথায় রাখব রে! আহা, যেমন নাক তেমনি চোখ। যেমন মুখের গড়ন, তেমনি রঙ। ওরে ছোঁড়া, এ মুখ তুই কোথায় পেলিরে?...
সে এক দীর্ঘ পদ্য, ছড়ার সুরে গেয়। রানীরঘাটে সকাল হতে না হতে সুখবর পড়ল ছড়িয়ে। তখনও ফ্যামিলি প্লানিং-এর নামগন্ধ নেই কোথাও। রানীরঘাটের স্থায়ী জনসংখ্যা বাড়ল, এই যথেষ্ট। প্রসূতিকে কড়া চা খাইয়ে খাইয়ে ঢোল করার অবস্থা। ময়রাবুড়ী চোখ পাকিয়ে কপট ধমকায়। বাসের লোক রিকশোর লোক, আর যতসব উটকো লোকের ঝামেলা সে ছাড়া আর কে সামলাবে? সে আঁতুড় আগলে দাঁড়িয়ে বলে_কী দেখার আছে? অ্যাঁ? কারও মা-বোন বিয়োয়নি?
সেন্সাস বাবুদ্বয় অনেকগুলো নাম আওড়ে গিয়েছিল। রানীরঘাট নিল না। আদর করে নাম দিল ফালতু। আসলে এতকাল যেন কাজের মতো কাজ, কিংবা খেলার মতো একটা চমৎকার খেলা পাচ্ছিল না কেউ। এত দিনে পেল। পেল তো এমনভাবে পেল যে হুজুগের মাত্রাটা গেল বেড়ে। ছোকরা কন্ডাক্টররাই লিড নিল। চাঁদার লিস্টিতে প্রথম নাম চৌবেজীর। পাঁচ টাকা। দ্বিতীয় নাম ইসমাইল ড্রাইভার। দু টাকা। ঘাটে ফিস্টি হবে। সুরিক্ষেপীর ব্যাটার জামাপেণ্টুল কিনতে হবে। একখানা নতুন শাড়িই বা কেন কেনা হবে না? এ প্রস্তাব শম্ভু মাঝির। আর সেই দিনই দৈবাৎ এসে পড়েছে একটা নাটুকে দল। লোকে বলে আলকাপ দল। ছেলেটা মেয়ে সেজে নাচে গায়। বেঁটে লোকটা সঙ দিয়ে লোক হাসায়। ঘাটের পিছনের চত্বরে তেরপল টাঙিয়ে আসর হলো। ঘাটবাবুর হ্যাজাগ জ্বলল। রানীরঘাটে এ ছিল উৎসবের রাত। আর তখনও রানীরঘাটে ব্রিজ হয়নি। বিদ্যুৎ আসেনি। মাইক বাজত না। দূর উত্তরের ফরাক্কায় ফিডার ক্যানেলটাও খোঁড়া হয়নি। দেশ দু টুকরো হয়নি। কত কি হয়নি। সে অনেক বছর আগের কথা।...
সুরিক্ষেপীয় চেহারা আহামরি ছিল না। মুখটা ছিল গোলগাল, সরু বেঁটে নাক, নীচের ঠোঁটটা একটু পুরু। গতরটা ছিল থলথলে প্রচুর মাংসে ভরা। ময়রাবুড়ী বলত_সাতশো শ্যালশকুনেও খেয়ে শেষ করতে পারবে না। শুধু দেখবার মতো জিনিস ছিল তার চুল। কী চুল কী চুল! ছেলে হওয়ার পাঁচদিনের দিন, আঁতুড় থেকে যেদিন বেরোয়, সেই 'পাঁচোটে'র দিন কঞ্চি তাড়না করে মমতাময়ী বুড়ী তাকে নাইয়ে আনে এবং গড়গড় করে এক বাটি নারকোল তেল ঢেলে দেয় চুলে। সেই একবার তেল। ফলটা হল কী আটচালার ধুলো-ধাসড় মেখে পুরোটা গিয়েছিল জট পাকিয়ে। জটার প্রতি লোকের ভক্তি আছে। পরে যখন রানীরঘাটওলারা সুরিক্ষেপীর জন্যে বাসস্ট্যান্ডের পিছনে একটা ছফুট-চারফুট-সাতফুট মাপের খুপরি বানিয়ে দিয়েছিল, সুরি বাচ্চা কোলে নিয়ে সেখানে বসে বাবাদের ডাকাডাকি করত আর ধর্মভীরু দেহাতী মেয়েরা পয়সা ছুড়ে দিত। পয়সাগুলো সুরি পাল্টা ছুড়ে ফেলবেই। সেই পয়সা ঘাটেরই কেউ না কেউ কুড়িয়ে জোর করে ওর আঁচলে গেরো বেঁধে রাখবেই। তাতে আপত্তি ছিল না সুরির। কিছুতেই আপত্তি ছিল না। পরের গঙ্গাপুজোর আগের দিন ময়রাবুড়ী চুপি চুপি একদলা সিঁদুর ঢেলে দিয়ে এলো সিঁথেতে। চেহারাটা খুব খুলে গেল মেয়েটার। টুকটুক করে তাকিয়ে দেখে বুড়ী বলল, আহা! শাঁখানোয়াখান হলে কী মানান মানত পোড়ারমুখীকে। ব্যস, খবর গেল শম্ভু মাঝির কাছে। ওপারে ঘাটের ওপর শাঁখাপট্টি। তাও জুটে গেল। ময়রাবুড়ী খুপরির সামনে কোমরে দুহাত রেখে কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। দেখে দেখে সাধ আর মেটে না। ছেলেপুলের মায়ের যা যা দরকার, তা নইলে চলে! দেখ তো মুখপুড়ীকে এখন কেমন মানিয়েছে। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বুড়ী দৌড়ে যায় দোকানের দিকে। রানীরঘাটে পাখপাখালি যত, তত কুকুরবেড়াল। তার উপর কড়াইতে তেল ধোঁয়াচ্ছে।...
সেবার গঙ্গাপুজোর দিন সন্ধেবেলা খুব কালবোশেখি হলো। বিষ্টি হলো। বাইরের লোকেদের খোয়ারের হলো একশেষ। কিন্তু রানীরঘাটে গজিয়ে গেল এক দেবী। আবার কে? ওই সুরিক্ষেপী। সে 'ক্ষেপী মা' হয়ে গেল। লোকে তার কাছে জ্ঞাতব্য তথ্য আদায় করতে চায়। ক্ষেপী মা'র শুধু ওই এক কথা_ওগো বাবারা! ও বাবারা! আর ডান হাত কপাল থেকে মাটিতে, মাটি থেকে কপালে। রাতদুপুরে নিঝুম রানীরঘাটে হঠাৎ শোনা যায়_ওগো বাবারা! ও বাবারা!
কিন্তু এত যে যত্নআত্তি লক্ষ্য, তার তলায়-তলায় আরেক তরঙ্গ বইছিল রানীরঘাটে। কাজটা কার হতে পারে? পাপ হোক, পুণ্য হোক, ভালো বা মন্দ হোক, এ একটা ঘটনাই বটে। কে সে? জানোয়ার হোক, মানুষ হোক_দৈবাৎ মতি টলেছিল, কিন্তু কার? নানা ফিকিরে বাচ্চাটার মুখ দেখা হয়, ফিরে এসে রানীরঘাটে মুখ খুঁজে মেলাবার চেষ্টা চলে। মেলে না। চৌবেজী ঘাটোয়ারির নামটাও উঠেছিল। টেকেনি। অত সাফসুতরো মানুষ। গদির সাদা চাদরে এককণা ময়লা পড়তে দেন না। দুবেলা স্নান-আহ্নিক করেন। খালি গায়ে ধবধবে সাদা পৈতে থেকে জ্যোতি ঠিকরে পড়ে। নোংরা দুর্গন্ধ এক নারীশরীরে কোন দুঃখে সুখ খুঁজতে যাবেন? তার ওপর লাখপতি লোক। ইচ্ছে করলেই ওপারের অলিগলি খুঁজে সুন্দরী সংগ্রহ করাটা ডালরোটি খাওয়ার সামিল। কেউ বলেছিল, ইসমাইল ড্রাইভারই বা। যা মদ-তাড়ি খায় লোকটা। রাতের দিকেই ঘটেছে। হিসেবমতো আশ্বিন মাসেই বটে। সে-আশ্বিনে প্রায়ই রাতে ঝড়বৃষ্টি হতো। কিন্তু মনে পড়ল, তখন ইসমাইল অ্যাকসিডেন্ট ক'রে অনেকদিন হাসপাতালে ছিল।
এইভাবে জনাদশেক প্রজননক্ষম পুরুষ মানুষ যারা কিনা ঘাটেরই বাসিন্দা এবং বয়স পনের থেকে পঁয়ষট্টির মধ্যে, সবাইকে যাচাই করে-করে বাদ দেওয়া হলো। অতএব, দায়িত্বটা বাইরের লোকের ঘাড়েই ফেলতে হয়। আশ্বিনে তো ঝড়জল গেছে। বারো মাসই ওই আটচালায় রাতের আশ্রয় নেয় কত জায়গার পথিকজন, গাড়োয়ান, ভিখিরি, ফকির, সন্ন্যাসী_কত রকম মানুষ। কার মাথায় কটকট করে 'চিহরিপোকা' কামড়েছিল! শেষ অব্দি হাল ছেড়ে দেওয়া হলো। ও পোকা বিষম পোকা। কামড়ালে উত্তর-পুব জ্ঞানগম্যি থাকে না।
আর দিন যায়, রাত আসে। রাত যায়, দিন। মাস যায়, বছর। ঢ্যাঙা শিমুলে অলীক লালঝুঁটি মোরগের ঝাঁক আসতে ভোলে না। ঘাটোয়ারিজীর ময়না কবীরের দোহার একটি শব্দ পেরিয়ে যেতে-যেতে হিমসিম খায়। ঘাটোয়ারিজীর বাকি চুল সাদা হয়ে ওঠে। ক্ষেপীমায়ের 'থানে' পয়সা পড়ে এবং চুরিও যায়। এক শীতে ময়রাবুড়ীও গঙ্গা পায়। ক্ষেপী চেঁচায়_বাবারা! ওগো বাবারা! ও বাবারা!
ফালতু তখন গুটগুট করে হাঁটতে শিখেছে। আর রানীরঘাটের সবাই তার বাবা। আধো-আধো বুলিতে ছোঁড়াটা কাপড় ধরে টানে_বাবা! বাবা! ব্যাপারী, দালাল, ফড়ে, মামলাবাজ, গাড়োয়ান আর বাবু_সবাইকে বাবা ডাক। চৌবেজীর উঁচু গদির ধারে দাঁড়িয়ে ছোট্ট নোংরা হাত বাড়িয়ে ডেকে ওঠে_বাবা। চৌবেজী হাসতে হাসতে ধমকান_ভাগ্! ভাগ্! তাই বলে কেউ ওর গায়ে হাত তুললেই হয়েছে। সারা রানীরঘাট এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
দেখতে দেখতে ফালতু বড় হলো। আবার এক গঙ্গাপুজোর মেলার দিন খুব জলঝড় এলো। সেই রাতে সুরিক্ষেপী কাপড়-চোপড়ে আচমকা বমি করে ভোররাতে ঠাণ্ডা নীলবর্ণ হয়ে মারা পড়ল। মায়ের শুয়েমুতে ছোঁড়াটা বেহদ্দ ঘুমোচ্ছিল। বাঁশবনে বাঁশ কেটে খাটুলি বানানো হলো। ওপাশের শ্মশানে ক্ষেপীমা পুড়ল। রানীরঘাটে সেও একটা দিনের মতো দিন ছিল। আবার চাঁদা তুলে ফিস্টি। আবার এক-আসরগান। শেয়ালমারার ষষ্ঠীপদ কেত্তুনে নিখরচায় গেয়ে গেল। ফালতুকে কেউ যদি শুধোয়_তোর মা কোথায় রে? ফালতু শ্মশানের দিকটায় আঙুল তুলে ছড়া গায়_হো হো! কেপী গেচে, পুলতে/ছসেল পতোল তুলতে। অর্থাৎ কী হাসির কথা! ক্ষেপী গেছে পুড়তে, ছসের পটোল তুলতে। কে শেখাল? শম্ভু মাঝিই বা। সে বড় রসিক মানুষ। নয়তো দিনদুপুরে মাঝগঙ্গায় লগি ঠেলতে ঠেলতে কেউ গায়_'এ ভরা গাঙমে চেকন জোসনা ডুব দিয়ে পার হবি লো সই/সই লো_ও_ও_ও?'
হাফপেন্টুল পরা উদোম-গা ফালতু ভালোরকম বুলি ফুটলে বাসের মাথায় উঠে চ্যাঁচায়_চলে এস! চলে এস! আভি ছোড় দেগা। জলদি ছোড় দেগা!
আর এর ফলটা হলো এই যে সে গতি চিনল। গতিকে ভালোবাসল। ইসমাইলের বাসেই তার জীবনটা জড়িয়ে গেল দেখতে-দেখতে। পুরন্দরপুর মনসুরগঞ্জো বিনোটি মহিমাপুর। কখনও ইসমাইলের সঙ্গে গঙ্গা পেরিয়ে শহর। শহরে ইসমাইলের বাড়ি। তার বউ ফালতুর ইতিহাস জানে। দেখলেই মুখটা গম্ভীর করে। জল চাইলে ফুটো এনামেলের গেলাসে জল দেয়। ছিঘেন্নার চূড়ান্তই করে। ইসমাইল কাঁচুমাচু হাসে খালি। কী বলবে। অথচ ছোঁড়াটা খুব কাজের। পাকাচুল তোলে। ফরমাস খাটে। নিজের ছেলেরা ইস্কুলে পড়ে। তারা যেন এ হারামী ড্রাইভারী কাজের ত্রিসীমানা না ঘেঁষে! হাতে স্টিয়ারিং এলে দুনিয়াটা পয়মাল হয়ে যায়, কে বুঝবে? থিতু হয়ে বসা যায় না ঘরে। শয়তানের চাক্কা ঘোরে সারাক্ষণ এই শরীরে। থামতে দিলে তো? আর শয়তান তোমাকে শেষঅব্দি জাহান্নামের দিকেই নিয়ে চলেছে, টের পেয়েও কিছু করার নেই তোমার।...
কতকাল পরে রানীরঘাটে আরেক শীতে এসেছেন সেন্সাসের বাবুরা। এ বাবুরা সেই তাঁরা নন। এঁরা সরকারী বড় সেন্সাসের লোক। এ রানীরঘাটও সে রানীরঘাট নয়। তিনটে বাসরুট এসে মিলেছে ঘাটে। দোকানপাট বেড়েছে। বিদ্যুৎ এসেছে। শ্মশানঘাটের ওপাশে ব্রিজ গড়ে উঠেছে। চৌবেজী ঘাটোয়ারির এই শেষ ইজারা। খাঁচার ময়নাটাও গেছে মরে। আর পাখি পোষেন না। তক্তাপোশের তলায় ঘুণধরা খাঁচাটার কী অবস্থা কেউ জানে না। সেন্সারের বাবুরা ঘুরে-ঘুরে লোক গুনছিলেন। পোষা জীবজন্তুর হিসেবও নিচ্ছিলেন। আরও কত কী তথ্য। লোকসংখ্যা সতের থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে বাহান্ন। নেহাত পেটেরটা বাদ দিয়ে ধরলে। লোকেরা ব্রিজের দিকেই সরে যাবার তালে ছিল। কিন্তু গিয়ে করবেটা কী? নেহাত ঘর বেঁধে থাকাই হবে। উঁচু পুলের ওপর দিয়ে বাসবোঝাই লোকজন সোজা গিয়ে ওপারে নামবে। এখানে কোথাও আর রাস্তা আগলে দাঁড়াবার সাধ্যি নেই। রানীরঘাট হিম হয়ে ঝিম মেরে গেছে। নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে সময় গোনা! নেহাৎ ভিটের মায়ায় কেউ কেউ থেকে যাবে। সেন্সাসের বাবুরা টের পেলেন, এ বাহান্ন আবার সতেরয় নামবে, কিংবা আরও নেমে সাতে ঠেকলেও অবাক হবার কিছু নেই। যারা দোকানদারি করুতেই এখানে ঘর বেঁধেছে, তারা ওপারে নতুন বাসস্ট্যান্ডের কাছে দু-চার হাত জমির জন্যে মাথা ভাঙছে।
অথচ বাইরে-বাইরে এই মৃত্যুযন্ত্রণা বোঝার উপায় নেই। তেল ফুরোবার আগে সলতে পুড়ছে হু হু করে। রানীরঘাট ভিড় হল্লাজেল্লায় চঞ্চল। মোটর অফিসের টেবিলে শেষ সংখ্যা বসিয়ে সেন্সারের বাবুরা নেমে এলেন চায়ের দোকানে, যেখানে আগের সেন্সাসের দুই বাবু চা খেয়েছিলেন। ওপারে এক টুকরো টিনে লেখা : অন্নপূর্ণা টি স্টল। বাঁকাচোরা হরফ। তার তলায় লেখা প্রোঃ জগন্নাথ_পদবী ধুয়ে গেছে। চা বানাচ্ছে ষোল-সতের বছর বয়সের একটি মেয়ে। শ্যামলা ছিপছিপে গড়ন। দেখতে মন্দ না। ভেতরে দরমাবাতার দেয়াল ঘেঁষে একটা বেঞ্চের কোনায় বসে চা খাচ্ছে এক নবীন যুবক। মাথায় ঝাকড়মাকড় চুল। সরু চিকন গোঁফ। তামাটে রঙ। শক্তসমর্থ চেহারা। তার পরনে তোবড়ানো খাঁকি ফুলপ্যান্ট, আর খয়েরি শার্টের ওপর হাতকাটা সোয়েটার। বাঁ হাতে স্টিলের বালা। ভারি অমায়িক তার হাবভাব।
তার দিকে ঘুরে জগন্নাথের মেয়ে টুকটুকি হাসল।_ও ফালতুদা, তোমার নাম লিখিয়ে দাওনি বাবুদের?
সেন্সাসবাবুদ্বয় বেঞ্চে বসেছেন। ফালতু ভুরু কুঁচকে বলল_কিসের নাম?
হাসতে হাসতে টুকটুকি বলল_ওর নাম লিখুন। ও যে বাদ পড়ে গেল।
প্রথমবাবু বললেন_তুমি বুঝি এখানেই থাকো?
ফালতু নিস্পৃহ ভঙ্গীতে ঘাড় নেড়ে সিগারেট ধরাল। পানুটি কি এখানে? বত্রিশ কিলোমিটার রাস্তা ঠেঙিয়ে বাস নিয়ে এসেছে একটু আগে। পথে দুবার বিগড়েছিল। ঠেলতে হয়েছে। মালিককে বললে বলেন, আর ক'টা দিন চালিয়ে নে বাবা। নতুন গাড়ি আসছে। ইসমাইলকে বুড়ো করেছে এ গাড়ি। সেই গাড়ি ফালতুকেও বুড়ো করবে।
দ্বিতীয়বাবু কাগজপত্র বের করেছেন ব্যাগ থেকে।_কেউ তো বলেনি তোমার কথা! হুঁ, নামটা বলো ভাই।
ফালতু হেসে বলল_কী হবে?
প্রথমবাবু বোঝাতে শুরু করলেন। টুকটুকিও বলল_ভয় নেই বাবা। কেউ ধরে নিয়ে যাবে না। আমারও নাম লিখে নিয়েছে। নেননি বাবু? বলুন তো একবার।
একটু পরে কাচুমাচু মুখে ফালতু রাজি হল।_লিখুন তাহলে। ফালতুই লিখুন।
_ফালতু! হাসলেন উভয় বাবুই। ওটা নিশ্চয় ডাকনাম? আসল নাম বলো।
মেয়েটা হেসে খুন হল। চায়ে দুধ ঢালতে গিয়ে উনুনে পড়ে গন্ধ উঠল। ফালতু গোঁ ধরে বলল_আসল নকল জানি না স্যার, ফালতু আমার নাম। লিখতে হয় লিখুন, নয় বাদ দিয়ে দিন।
_বেশ, ফালতু। হুঁ, বয়স?
_বিশ-পঁচিশ হবে।
আবার হাসি উঠল অন্নপূর্ণা টি স্টলে।_বিশ, না পঁচিশ?
_যা মনে হয় লিখুন। ফালতু বিরক্ত হয়ে বলল।
_মাঝামাঝি লিখছি। কেমন? জাতি কী ভাই?
একটু চুপ করে থাকার পর ফালতু বলল_হিন্দুই লিখুন।
_বাবার নাম?
হঠাৎ বজ্রাঘাত। জগন্নাথ মেকদারের হাসিখুশি মেয়েটা শক্ত হয়ে গেল। আড়চোখের বাঁকানো দৃষ্টি ফালতুর গায়ে গিয়ে পড়েছে। হঠাৎ রানীরঘাট নিঃঝুম ঝড়ের আগে যখন পাতাটিও গাছে নড়ে না। খালি বাজ পড়ার শব্দ।
_বলো ভাই!
ফালতু বেঞ্চের কোনায় সিগারেট ঘষটে নেভাল। তারপর বলল_মায়ের নাম লিখুন সুরিক্ষেপী। তাহলেই হবে।
তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল জগন্নাথ মেকদারের মেয়ে।_না, সুরেশ্বরী লিখুন। বাবা বলত ক্ষেপীমার নাম সুরেশ্বরী। উইখানে থাকত_মাথায় জটা! আমি দেখিনি। বাবা দেখেছে। ঘাটের কত লোক দেখেছে। গঙ্গাপুজোর সময় নাকি ভর হত। লোকেরা মানত করত।...
সবাই গম্ভীর। তারপর আস্তে বললেন দ্বিতীয়বাবু_হুঁ অজ্ঞাত। এবার বলো, বাড়িতে কে আছে। কখানা ঘর। পোষা জীবজন্তু আছে কি না। বাড়ির গারজেন থাকলে তার নাম কী...
প্রথমবাবু বললেন_ট্রেন চালিও না। একে একে জিজ্ঞেস করো।
ফালতু উঠে দাঁড়াল। বলল_বাড়িটাড়ি নেই। থাকি মোটরআপিসে। তারপর চলে গেল।
বাবুরা চা খাচ্ছেন। তখন গঙ্গায় নেয়ে হি-হি করে কাঁপতে কাঁপতে মেয়ের বাবা জগন্নাথ এসে গেল। কোমরে বরাবর বাত। এখন শরীর দু ভাঁজ হয়ে গেছে। কোমর থেকে মাথা অব্দি মাটির সমান্তরাল। তাই হাঁটলে হাত দুটো উড়ন্ত শকুনের ডানার মতো দুপাশে ঝটপট করে। এখন একহাতে ঘটি। ঘটিতে গঙ্গাজল। মাধ্যাকর্ষণের নিয়মে সেই হাতটা ঝুলে স্বাভাবিক হয়েছিল। কিন্তু ঘটি রাখতেই আবার যে-কে-সেই। সেন্সাসের বাবুদের চা খেতে দেখে খুশি হল। টুকটুকি ঠোঁটের কোনায় হেসে বলল_ফালতুদার নাম লিখে নিয়েছে বাবা। আমিই বললুম তো লিখতে। বাদ পড়ে যেত কেমন।
জগন্নাথ হাসল।... তোর যেন দিদির স্বভাব। বুঝলেন স্যার? সেবারে আপনারা আসেননি। অন্য দু'জন এসেছিলেন। আপনাদের চেয়ে বয়স অনেক কম। দিদি থাকত ওই যে ভিটে দেখছেন, ওখানে। ওই ফালতুর মায়ের নাম লিখিয়েছিল। খুব ভালবাসত মেয়েটাকে।
কথার কথা হিসেবে প্রথমবাবু বললেন_কাকে?
_সুরিক্ষেপীকে। মানে ফালতুর মা। জগন্নাথ রোদে দাঁড়িয়ে পুঁথি খুলল। পুঁথিতে অল্পবিস্তর রঙ চড়বেই। তাই_কোন জাত না কোন জাত, জাত মানামানি নেই। দিদি ঘাটে ফেলে মেয়েটাকে রগড়াত। কী ভাল না বাসত স্যার! ঘাটের অনেকে জানে। দেখেছেও, যারা ছিল তখন। আমার দিদি মুরুক্ষু মেয়ে হলে কী হবে, প্রাণটা ছিল বড়। ফালতুর জন্মের রাতে কি বিষ্টি কী মেঘ। পেলয়ঙ্কর চলছে। তার মধ্যে দিদি কাঠ রে আগুন রে সেঁকা রে পোড়া রে, আপনার মশাই লণ্ঠন রে করে রানীরঘাটের এ-মুড়ো ও-মুড়ো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আজকাল আর অমন মানুষ হয় না স্যার! তো ফালতু এখন মানুষ হয়েছে। এ লাইনে খুব পাকা ড্রাইভার। ও জানেই না এসব কথা। কে ওর চোখে কাজল পরিয়ে গায়ে তেল মাখিয়ে রোদে বসে থাকত জিগ্যেস করুন, বলতে পারবে না।
সেন্সাসের বাবুদ্বয়ের অত সময় নেই। শহরে শিক্ষকতা করেন। স্কুলের সময় হয়ে এলো। উঠে গেলেন পয়সা দিয়ে। জগন্নাথ একটু বেজারই হল। এক সময় সুরিক্ষেপীর বাচ্চা হওয়ার ব্যাপারটা রানীরঘাটের মনমেজাজ চাঙ্গা রাখত। কার না মনে পড়ে সে-সব দিন? ফিস্টি। গানের আসর। সুরিক্ষেপীর ঘর গড়ার দিন কত হইচই স্ফূর্তি। যে আসছে, সেই হাত লাগাচ্ছে। জগন্নাথ কত কাপ চা খাইয়েছিল হিসেব নেই। আজকাল সবাই কেমন যেন হয়ে গেছে। ফালতু তখন মোটেই ফালতু ছিল না। এখন ফালতু তো বটে, মানুষই যেন ফালতু হয়ে গেছে। ঘাটোয়ারিজী একটা লাল হাফপেণ্টুল দিয়ে ফালতুকে বলেছিলেন_যেদিন বাবা বলা ছাড়বি, সেদিন থেকে রোজ একপো করে রসগোল্লা। ফালতু ছাড়তেই পারেনি। ও বাবা, তোমার পাখিটাও দাও না! ও বাবা, আমি খৈনি খাব। ও বাবা, দুটো পয়সা দাও। হুঁ, ফক্কুড়ে লোকেরা শিখিয়ে দিত ছোঁড়াটাকে। ঘাটোয়ারিজীকে নাকাল করে ছাড়ত। শুধু ঘাটোয়ারিজী কেন, জগন্নাথের ওপরও লেলিয়ে দিত না? একবার অশ্বিনী দারোগা এসেছেন ঘাটে। কে লেলিয়ে দিয়েছে ফালতুকে। ফালতু দারোগাবাবুর হাফপ্যাণ্টুল খামচে ধরে বলে_ও বাবা, সাইকেল চাপব। বাবা, সাইকেল চাপব। দারোগাবাবু বললেন_এটা সেই পাগলীর বাচ্চাটা না? আহা! রানীরঘাটে সে এক দিনকাল ছিল। দুঁদে দারোগা হো হো করে হেসে সাইকেলের রডে চাপিয়ে সত্যি একচক্কর ঘুরিয়ে দিলেন। নামিয়ে দু-আনা পয়সাও দিলেন। বললেন_কী রে ছোঁড়া? আমার সঙ্গে যাবি? আমার বাড়িতে থাকবি। লেখাপড়া শেখাব। অ্যাঁ? যাবি?
সেদিন ফালতু গেলে ভালই করত। রানীরঘাটের লোকগুলো যেন ছোঁড়াটার মায়ায় পড়ে গিয়েছিল। ও গেলে যেন ঘাট ফাঁকা হয়ে যাবে। এক ফাঁকে শম্ভু মাঝি ডাকল_আয় বে। লৌকোয় চাপবি। ফালতু চলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। দারোগাবাবু সাইকেলে চেপে গেলেন আসামী ধরতে কনকপাড়া-গোপগাঁ।...
তবে ছোঁড়াটার লোভ ছিল না কিছুতে। দিদি একখানা বেগনি হাতে দিলে তো প্রায় সারাদিন ধরে তাই কুচকুচ করে দাঁতে কেটে খাবে। দিদি ওদের মা-ব্যাটার মত যত্ন করত। এখন ভাবলে অবাক লাগে। কেন এমন করত দিদি? কেন কেন করতে করতে জগন্নাথের শীতটা গেল বেড়ে। তোবড়ানো মুখে ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকল।
_বাবা, আমি আসছি।
জগন্নাথ তাকায় মেয়ের দিকে।_নাও! মাথায় পোকা কামড়াল। খদ্দেরপাতি আসবে-টাসবে।
_তুমি দেখ না ততক্ষণ। মরতে তো যাচ্ছি না!
লম্বা পা ফেলে টুকটুকি বাসস্ট্যান্ডের ওপাশে চলে গেল। মা-মরা মেয়ে নিজের জোরে বড় হয়েছে। বাড়টা বড্ড বেশি। ঘাটসুদ্ধু লোক তার কুটুম্ব। মামা খুড়ো কাকা মামী খুড়ি কাকিমা, দাদা বউদি, আরও কত রকম সম্পর্ক মানুষের থাকে।
বাস সিন্ডিকেটের লক্ষ্মণবাবু ডাকেন_ও টুকটুকি, কোথায় যাচ্ছিস? টুকটুকি সোজা বলবে_আপনার কনে খুঁজতে দাদামশাই। লক্ষ্মণবাবু দাড়ি চুলকে বলবেন_ওরে, ওরে। তুইই তো আমার কনে। টুকটুকি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলবে_আমার বর যে ঠিক হয়ে আছে দাদামশাই।
আহা, আগে বলতে হয়।
আর ওই চৌবেজী। ওকে দেখলেই খৈনি ডলতে ডলতে_কেমনে হোবো এ গঙ্গা পার/হামি জানে না সাঁতার।
ঘাটোয়ারিজী লোটা হাতে শিমুলতলায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কানে পৈতে জড়ানো। হাতমাটি করা হয়ে গেছে। মোছা হয়নি। নির্মীয়মাণ ব্রিজ দেখছেন। দেখতে দেখতে ঘুরলেন ডাইনে বাঁশবনের দিকে। আকন্দ ও সাঁইবাবলার ঝড়ের পিছনে জগন্নাথের মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। হাতমুখ নেড়ে কথা বলছে কার সঙ্গে। একটু সরলে ঘাটোয়ারিজী অবাক। ওটা ফালতু না? চোখের নজর ইদানীং কমেছে। তাহলেও চিনতে ভুল হল না। হেঁড়ে গলায় কাঁপা-কাঁপা সুরে গেয়ে উঠলেন_'কেমনে হোবো এ গঙ্গা পার...' টুকটুকি হন হন করে চলে গেল গঙ্গার আঘাটায়। ফালতু একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর বাস অফিসের দিকে হাঁটল। চৌবেজী খুব হাসলেন। কতক্ষণ আপনমনে হাসলেন। হাসার পর গম্ভীর হয়ে গেলেন। মন খারাপ হয়ে গেল।
_টুকটুকি! ও রী টুকটুকি! শুন, শুন! ইধার আ।
_বলো ঘাটোয়ারিজী। যা বলার ঝটপট বলো, আমার শোনার সময় নেই।
_আ রী বৈঠ্বি, তব তো বোলবো।
_হুঁ, বসলুম। বলো।
_হাঁ রী, এত্তো কী ফুসুর-ফাসুর কোরে বেড়াস ফালতুর সঙ্গে?
টুকটুকি মুঠো পাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল_মারব! তারপর কান্নার ভান করে_হুঁ, মাগো। এবং আবার মুঠো তুলে_মারব!
চৌবেজী নির্লজ্জের মতো ফিসফিস করলেন_সাচ বলছি রী বেটি। বাত তো শুন।
_শুনব না। চিলচ্যাঁচানি চেঁচাল জগন্নাথের মেয়ে।
_পাগলী বেটি_বোল, বিভা করবি তো বোল হামাকে। হামি লাগিয়ে দেবে। চৌবেজী চাপা স্বরে বলতে থাকলেন। আরী! হামি তো ঘাট ছেড়ে চলেই যাবে। তোদের বিভা দেখে যাই। এত্তোকাল ঘাটে থেকে বুঢ়া হোয়ে গেল। হামার বহুত সুখ হোবে, বেটি। বহত ধুমধাড়াক্কা লাগিয়ে দেব।
টুকটুকি ভেংচি কেটে পালিয়ে গেল। তারপর থেকে তারও মন খারাপ। চৌবেজীকে দেখলে সেখান থেকে কেটে পড়ে। জগন্নাথ তাকে ওপারে শহরে পাঠালে সে আঘাটায় জল ভেঙে চলে যায়। শীত যত যায়, জল তত শুকোয়। বালির চড়ায় মাথা কোটে। ওদিকে ঘাটের সামনে বারোমাস দহ। ফালতুকে বিয়ে করলে ঘাটোয়ারিজীর কেন সুখ হবে, টুকটুকি বোঝে না।
শীত ফুরিয়ে বসন্ত এলো। রানীরঘাটের বনভূমি সাধ্যমতো সাজল। এবার নিষ্পত্র চ্যাঙা শিমুল শ্মশানে দাঁড়িয়ে রইল কিংবদন্তীর সেই রাহুচণ্ডাল। ভাগীরথীর বুকে ঘূর্ণি ঘুরে বেড়ায়। ভূতেরা নাইকুণ্ডল খোঁজে আপন-আপন। নাইতে গিয়ে টুকটুকি চেঁচায়_গরু খা, গরু খা, গরু খা! সেই সময় একদিন শম্ভু মাঝি থপথপ করে হেঁটে ফালতুর কাছে এলো।
_কেমন আছিস বাপ ফালতু?
খাতির করে সিগ্রেট দিয়ে ফালতু বলল_ভাল আছি শম্ভুকাকা। তুমি ভাল তো?
রানীরঘাটের সবচেয়ে বড় আর বুড়ো শিরীষগাছের তলায় ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল শম্ভু মাঝি।_বাপ ফালতু রে!
_বলো কাকা_
শম্ভু মাঝি হঠাৎ গামছার খুঁটে চোখ মুছে বলল_জোয়ান হয়েছ। বড় হয়েছ। ভাল রোজগারপাতি করছ।
_তা করছি কাকা_ফালতু অকৃতজ্ঞ নয়। রানীরঘাটের এসব লোকই তাকে মানুষ করেছে, সে জানে। সবাইকে শ্রদ্ধাভক্তি করে চলে।
_এবারে বিয়েটিয়ে করে ফেলো বাপ। আর কদিন আছি? ঘাটও তো উঠে যাচ্ছে। তোমার বিয়েটা দেখেই যাই।
ফালতু হাসল।_আমাকে কে মেয়ে দেবে শম্ভুকাকা?
বুড়ো ঘাটমাঝি তার গায়ে হাত বুলোতে থাকল। লগিধরা কড়াপড়া হাত। লোলচর্ম বাহু। গোঁফ ছাপিয়ে জল ঝরছে। কী স্নেহে কোন মায়ায় কাঁদে এতদিন বাদে, কে বলতে পারে সে গুহ্য কথা?
_যদি ইচ্ছে করো, জগাইকে বলি। লজ্জা করে কী হবে? ঘাটে তো সবাই জেনেছে, তোমাদের বড্ড মনামনি ভাব। বুড়ো ঘাটমাঝি ফ্যাঁচ করে নাকই ঝেড়ে ফেলল, এমন আবেগ এসেছে!
ফালতু হো হো করে হেসে উঠল।_ধ্যাৎ! আমাকে কেন মেয়ে দেবে? কাকার আবার কথা।
শম্ভু গম্ভীর হয়ে বলল_দেবে। দিয়ে বর্তে যাবে। আমরা ঘাটসুদ্ধু গিয়ে ধরব। ঘাটোয়ারিজী বলেছেন, সবাই মিলে ফালতুর বিয়ে দেব। খরচ যা লাগে তিন ভাগ ওনার। খুব ধুমধাম হবে বইকি।...
সেদিনই একটু রাত গড়ালে চৌবেজীর গতিতে সভা বসেছে। পুরনো লোকেরা সবাই এলো। জগন্নাথকেও ডাকা হল। সে-বেচারা কিছুই জানে না। দু হাত দু পাশে ছড়িয়ে শকুনের ডানার মতো ঝটপট করতে করতে কুঁজো হয়ে এলো। এসেই অবাক। তার খাতিরটা বড্ড বেশি করা হচ্ছে। ধরাধরি করে তাকে উঁচু গদিতে উঠিয়ে দিল লোকেরা। মদন কন্ডাক্টার এখন চুলপাকার দলে। ফালতুর ব্যাপারে সেই বরাবর লিড নিয়েছে। এবারও নিল। চৌবেজীর দিকে তাকিয়ে বলল_তাহলে কথাটা উঠুক ঘাটোয়ারিজী। সবাই সায় দিয়ে বলল_হ্যাঁ, হ্যাঁ। চৌবেজী বললেন_জরুর।
মদন শুরু করল। ফালতুর মা সুরিক্ষেপী থেকেই শুরু করল। ফালতুকে মানুষ করার ইতিবৃত্ত, ফালতুর চালচলন, ইসমাইল ড্রাইভারের স্নেহ (আহা, এখন সে বেঁচে থাকলে কত খুশি হত, এবং কয়েকটি জিভের চুকচুক শব্দ, মাথা নাড়িয়ে দুঃখ প্রকাশ), খুঁটিনাটি ঘটনা, অশ্বিনী দারোগার আহ্বান (খুব হাসির রোল পড়ে গেল এইতে), ফালতুর দুষ্টুমি_আধঘণ্টারও বেশি। তার সঙ্গে রানীরঘাটেরও নানা ঘটনা জুড়ে দেওয়া হল চারপাশ থেকে। ব্রিজও এলো। রানীরঘাটের অনিবার্য মৃত্যুর প্রসঙ্গও উঠল। (দীর্ঘশ্বাস ও নীরবতা) তারপর জগন্নাথের দিদি_যাকে সবাই বলত ময়রামাসি, তার কথা_এ পাপে রানীরঘাট একদিন ভেসে যাবে। তাই যাচ্ছে। আগের দিনের মানুষেরা যা বলত, ফলে যেত।
এই সময় চৌবেজী মানুষের লোভকেই দায়ী করলেন। তুলসীদাস আওড়ে বললেন_'সেবক সুখ চহ মান ভিখারী/ব্যসনী ধন সুভ গতি বিভিচারী/লোভী জনু চহ চার গুমানী/নভ দুহি দুধ দহত এ প্রাণী।' মানুষ আকাশ দুহে দুধ চায়। হায় রে লোভ!
জগন্নাথ খুব মাথা নাড়ল। মদন কন্ডাক্টার বলল_তো কথা হচ্ছে, ময়রা মাসির কাছে শোনা কথা, (স্রেফ মিথ্যে কিন্তু) সুরিক্ষেপী মাসির আগের চেনাজানা ছিল। মাসির স্বজাতিরই মেয়ে। স্বামীর অত্যাচারে...
এ পর্যন্ত শুনেই জগন্নাথ জোরে মাথা নেড়ে বলল_না! না!
শম্ভু মাঝি একটু তফাতে মাটিতে বসে ছিল। বলল_আহা, বলতেই দাও জগাইদা!
মদন একটু হেসে বলল_মাসি আমাকে বলেছিল। সত্যমিথ্যে সেই জানত। আমি যা শুনেছি বলছি। আর স্বজাতি না হলে অমন সেবাযত্ন করত? বলুন সবাই! না কি ঘাটোয়ারিজী, বলুন?
সবাই শোরগোল তুলে বলল_ঠিক ঠিক। বেজাত হলে অমন করবে কেন?
জগন্নাথ গতিক বুঝে গুম হয়ে বলল_হলেও হতে পারে তাহলে।
মদন বলল_আমরা রানীরঘাটওয়ালারা ছেলেটাকে মানুষ করেছি। এখন লায়েক হয়েছে। ভাল কামাচ্ছে। লাইনের নামকরা ড্রাইভার। না হয় লেখাপড়াটাই ভুল করে আমরা শেখাইনি। তাতে কী? যে বিদ্যে ধরেছে, তাই বা মন্দ কী! বইপড়াও বিদ্যা, গাড়ি চালানোও বিদ্যা।
সবাই সায় দিয়ে বললে_একশোবার একশোবার!
মদন বলল_এখন তাহলে ওর একটা বিয়ে দেওয়া দরকার। ওর মা-বাবা নেই তো কী হয়েছে। আমরাই ওর মা-বাবা। আমরাই ওর বিয়ে দেব। চৌবেজী, আপনাকে তিন ভাগ খরচ দিতে হবে। বাকি এক ভাগ আমরা দেব। কী বলো জগাইদা?
আগে থেকে সব সাজানো ব্যাপার। জগন্নাথ না জেনে বলল_নিশ্চয় দেব।
এবার মদন আচমকা পর্দা তুলল।_ফালতুর স্বজাতের কনে রানীরঘাটেই আছে_উপযুক্ত কনে।... মদন চাপা হেসে বলল, না কী চৌবেজী?
_জরুর।
মদন গলা ঝেড়ে বলল_আমরা সবাই জানি। সকালসন্ধ্যে দেখছি ওদের দুটিতে খুব ভাব-ভালবাসা। আমরা এখন বাকিটুকু ছেড়ে দিলুম কনের বাপের হাতে।... বলেই সে চতুর হেসে জগন্নাথের কাঁধে ডান হাতটা রেখে সহাস্যে বলে উঠল_বলো জগাইদা।
আর যায় কোথায়? কুঁজো বুড়ো নড়বড় করে প্রায় ঝাঁপ দিল নীচে। তোবড়ানো মুখখানা যতটা পারে ভয়ঙ্কর করে চেরা গলায় চেঁচিয়ে উঠল_ন্না। আবার ডানা ঝটপট করে গদির দিকে ঘুরে গর্জন করল_না! কক্ষনো না!
শোরগোল শুরু হল। সবাই ওকে বোঝাতে চায়। জগন্নাথের চারদিকে ঘিরে দাঁড়ায়। কাকুতিমিনতি কতরকম। সাধ্যসাধনা। জগন্নাথ দু হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে মাথাটা দুপাশে জোরে দোলাতে দোলাতে বলল_না না না! না না না! না না না...
বুড়ো মানুষ অমন করে কাঁদলে বড্ড খারাপ লাগে। যেন জবাই করা হচ্ছে ওকে। অদ্ভুত লোক তো! দেখব কী দিয়ে বর জোটে মেয়ের।...
তখনও ফরাক্কার ফিডার ক্যানেল খোঁড়া হয়নি। বসন্তের শুরুতেই ভাগীরথীর জল শুকিয়ে যেত। জ্যোৎস্নারাতে বালির চড়ায় বসে যুবক-যুবতীদের চমৎকার প্রেম জমত। ওপারে শহরে বিদ্যুৎ, এপারে রানীরঘাটে বিদ্যুৎ_ভাগীরথীর গর্ভে সে আলো পেঁৗছয় না। জ্যোৎস্নাটা ভালই খেলে। রানীরঘাটের নীচে অবশ্যি কিছুটা দহ। দক্ষিণে শ্মশানের ওদিকটায় প্রায় সবই শুকনো, একখানে সেই মাথা কুটতে থাকা জল ঝিলমিল করে বয়ে যায়। ফুরফুরে বাতাসে গা শিরশির করে। দুটিতে বসে অনুচ্চ স্বরে কথা বলছিল।
_ঘাটের কিসের মিটিং ডেকেছে। গেলে না যে?
_আমাকে ডাকেইনি।
_ডাকবে আবার কী? তুমি ঘাটের লোক নও?
_নাঃ। আমি ফালতু।
_শোনো, তুমি এবারে একটা নাম নাও। ভাল নাম।
_তুমিই দাও না একটা নাম।
_নেবে?
_হুঁউ।
_আগে জানলে ওই গুনতিবাবুদের কাছে...আচ্ছা, ওরা আর লোক গুনতে আসবে না?
_কে জানে! কী নাম দিচ্ছ, দাও আগে।
_দিচ্ছি। নতুন বাসমোটর কবে আসবে তোমার?
_ব্রিজ খুলুক। কেন?
_প্রথম_একেবারে প্রথম পেসেঞ্জার আমি। ভাড়া দেব না কিন্তু। চাপাবে?
_হুঁউ।
_তখন থাকবে কোথায়?
_ওপারে নতুন আপিস হচ্ছে না? সেখানে। আমার থাকার ঘরও হচ্ছে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। একটু পরে আবার_বাবা ওখানে জায়গাই পেল না। লক্ষ্মণ দাদামশাইকে বলতে বলেছিল বাবা। বলেছি তো। সে কথা নেই, শুধু দেখলেই ফক্কুড়ি করে। তুমি বলবে একবার?
_বড় মুখ করে বললে যখন, বলব।
আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর_গুনতিবাবুদের কাছে তুমি বাবার নাম বললে না। আমার খুব খারাপ লাগছিল, জানো? যা হোক একটা বললেই পারতে। কী ভাবল ওরা?
_কী ভাববে? বয়ে গেল।
_যাঃ! বাবা না থাকলে চলে? বাবা না থাকলে...
_কী?
_আমার লজ্জা করছে। তুমি হয়তো রেগে কাঁই হয়ে যাবে।
_না, না। বলোই না।
_থাক। তোমার বাবার কথা জানতে ইচ্ছে করে না?
জোরে মাথা দোলাল এবং জ্যোৎস্নামাখা বালিতে আঁচড়া কাটতে থাকল প্রেমিক যুবক। গায়ে ছায়া ফেলে উড়ে গেল একঝাঁক রাতের পাখি। শ্মশানের বাঁশবনে শেয়াল ডেকে উঠল। তার একটু পরে কী একটা শব্দ হল কোথায়। তারপর প্রেমিকা তরুণী উঠে দাঁড়াল ঝটপট। অস্ফুট স্বরে বলল_কে যেন আসছে। আমি যাচ্ছি। এদিকেই আসছে যেন। যাচ্ছি!
ডানা থাকলে উড়ে যেত এভাবে চলে গেল, যেন পা বালি ছোঁয় না। নিঃশব্দে। ফালতু উঠল একটু পরে। সিগারেট ধরাল। আলো দেখেই আওয়াজ এলো_কে ওখানে?
ফালতু লম্বা পায়ে এগিয়ে গিয়ে বলল_জগাইকাকা নাকি? আমি ফালতু।
_টুকটুকি কই? হাঁড়ির ভেতর থেকে জগন্নাথ কথা বলল যেন।
একটু দ্বিধা হল। তারপর সেটুকু ঝেড়ে ফেলে বলল_কী হয়েছে জগাইকাকা?
জগন্নাথ একটা অদ্ভুত ব্যবহার করল। সে খপ করে ফালতুর হাত দুটো ধরে ফেলল। তারপর মরণকালের ঘড়ঘড় শ্বাসকষ্টের আওয়াজ তুলে বলে উঠল_ফালতু বাবা! তোর হাত দুটো ধরে বলছি রে, এ নিশুতি কাল। মা গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে বলছি। ঘাটওয়ালারা ষড়যন্ত্র করেছে, জোর করে তোর সঙ্গে আমার টুকটুকির বিয়ে দেবে। ফালতু রে! আবার বলছি, মা গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে আছি_ওরে, তোরা ভাইবোন রে! আমি মহা পাপী রে! টুকটুকি আর তুই ভাইবোন_তোদের বিয়ে হয় না রে...
এক ঝটকায় ফালতু হাত ছাড়িয়ে নিল।
_আমি বলছি বাবা। নিচে মা গঙ্গা, আমি বলছি, আমার পাপের কথা।
ফালতু হুংকার দিতে গিয়ে সামলে নিল। সে জানে, সে দুঃখী। লোকের করুণায় বেঁচেছিল। জোর দেখাতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে যায়। অমনি চুপসে যায়। আস্তে বলল_হতে পারে তুমি লম্পট। হতে পারে বইকি। আমার মা আটচালায় থাকত আর তোমরা রানীরঘাটওয়ালারা... থাক সে কথা। এখন বয়েস হয়েছে তো। বুঝতে পারি সব। কেন আমাকে মানুষ করা, সবই বুঝি।
জগন্নাথ ফ্যাঁচ করে নাক ঝেড়ে পাছায় হাত মোছে। ক্র্যাঁও ক্র্যাঁও করে কুডাক ডাকতে ডাকতে একটা পেঁচা উড়ে যায় শ্মশানের পাশে শিমুলগাছটার দিকে। কোত্থেকে একটা সাদা কুকুর এসে একটু দূরে দাঁড়িয়ে একবার কেঁউ করে ডেকেই চুপ করে যায়। লেজ নাড়ে। জ্যোৎস্নায় নিজের ছায়া শোঁকে একবার।
ফালতু আবার বলতে থাকে_আজ পারুলিয়ার নতুন রুটে গাড়ি খারাপ হয়েছিল। মিস্ত্রি ডাকতে পাঠালুম। মাথায় টুপিপরা, সাদা দাড়ি মুখে, এক মুসলমান হাজিসায়েব এলো। চিনলেও চিনবে। ইব্রাহিম হাজি নাম বলল।
ভাঙা গলায় জগন্নাথ বলে_হ্যাঁ। ডাকাত ছিল। পরে তীর্থ করে হাজি হয়েছে। খুব চিনি বাবা, কে না চেনে। খুনের মামলায় জেল হয়েছিল যাবজ্জীবন। তাও জানি।
_কথায়-কথায় বলল, ঘাটে এক পাগলী থাকত_সে বেঁচে আছে, না মারা গেছে? বললুম, মারা গেছে। আমি তারই ছেলে। শুনেই লোকটা আমাকে জড়িয়ে ধরল। তুমি, তারই ছেলে বাবা? আমি তো অবাক। এমন কেন করছে লোকটা? তারপর কিছুতেই আসতে দেবে না। প্যাসেঞ্জার আছে গাড়িভর্তি। শোনে না। মিষ্টির দোকানে নিয়ে গেল। বলে_আমার ব্যাটাকে পেট ভরে রসগোল্লা খাইয়ে দাও। আমার কেমন যেন লাগল। আমি খেতে পারলুম না। সে আমাকে ছাড়বে না। জড়িয়ে ধরে টানাটানি। বলে, আশ্বিন মাসে ঝড়জলের রাতে...
এ পর্যন্ত শুনেই জগন্নাথ বলল_হ্যাঁ, হ্যাঁ। রাতটুকু ওপারে মোক্তারবাবুর বাড়িতে লুকিয়ে থেকে পরদিন আদালতে হাজির হত। অত রাতে তখন খেয়া বন্ধ। শম্ভু গাঁজা খেয়ে মড়া। এদিকে ঝড়জল। ইব্রাহিম আমাকে জায়গা চাইল। খুনী ফেরারকে জেনেশুনে জায়গা দিতে পারলুম না। বললুম, আটচালায় গিয়ে থাকো বরং।
ফালতু সিগারেট ছুঁড়ে ফেলল জোরে। সাদা কুকুরটা দৌড়ে গিয়ে শুঁকল এবং ছ্যাঁকা খেয়ে ফোঁৎ ফোঁৎ করে নাক ঝাড়তে থাকল।_এতকাল পরে ওর খেয়াল হল সুরিক্ষেপীর কথা। ফালতু দম-আটকানো গলায় বলে উঠল।_ওই ছাতুখোর ঘাটোয়ারি। ওই মাতাল মদন কন্ডাক্টার! আবার দেখি জগাইকাকা তুমি! তুমি আরও এককাঠি সরেস। কী না টুকটুকি আর আমি ভাইবোন। এবার ফালতু গর্জন কিংবা হাহাকার করে উঠল।_কী বাবা দেখাচ্ছো আমাকে সবাই মিলে। রানীরঘাটের মড়াখেকো শেয়ালকুকুরগুলো ফালতুকে বাবা দেখাচ্ছে। আমার বাবার দরকার নেই। হুঁ, বাবা দেখাচ্ছে শালারা! আরে, আমার হাতে যে স্টিয়ারিং ধরে দিয়েছে, সেই আমার বাবা।...
ময়রা মাসি বলেছিল_এ মহাপাপ সইবে না। রানীরঘাট ভেসে যাবে। শেষ অবধি তাই ফলে গেছে। এখন ভাগীরথীর ওপর বিশাল ব্রিজ হয়েছে। ফরাক্কার ফিডার খাল থেকে জল আসছে। বারো মাস নদী কূলে-কূলে ভরা। সেই কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ কাজল-জল আর নেই। শ্যাওলায় গা ঘষে বেড়ানো রূপসী মৌরালার ঝাঁকও আর দেখা যায় না। রোদে-জ্যোৎস্নায় বুকের তলার রুপোলি বালুকণাও আর অলীক মুক্তোর ঝিলিক দেয় না। চৌবেজীর গদি, আটচালা, জগন্নাথের অন্নপূর্ণা টি স্টল জুড়ে আকন্দ সাঁইবাবলা কালকাসুন্দে আর বনতুলসীর জঙ্গল। সুরিক্ষেপীর 'থানে', বাসস্ট্যান্ডের চত্বরে, হরেকরঙা গাঁদা ফুলের ঝাড়। এক সাধু এসে আশ্রম খুলেছেন। পিচের রাস্তায় কবে কারা ধানচাষ করেই ফেলবে। বিদ্যুতের শালকাঠের খুঁটি যে যা পেরেছে উপড়ে নিয়ে গেছে। শুধু ঘাট আর শ্মশানের মাঝামাঝি জায়গায় সেই রাহুচণ্ডাল শিমুলটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এখনও মাঘ মাসে সে মাথায় লাল পট্টি জড়াতে ভুল করে না।...
ওই একটু দূরে ষাট সত্তর ফুট উঁচু পুলের ওপর দিয়ে ঝকঝকে এক রুপোলি বাস যাচ্ছে পুরন্দরপুর মনসুরগঞ্জো বিনোটি মহিমাপুর। ড্রাইভারটি মধ্যবয়সী। সারা পথ দুধারে যত গ্রাম আছে, যত মানুষ আছে, সবার কাছে তার মোটরগাড়ি সময় জানিয়ে দেয়। ক্ষেতের মুনিশ বলে ওঠে, ফালতুর গাড়ি গেল। নাস্তা এলো কই? স্ল্যাবে ধান শুকোতে দেওয়া চাষী বউ, ঘুটেকুড়ুনী মেয়েটা, খুঁটি ও দুরমুশ হাত গাইগরু বাঁধতে আসা বুড়ী_কার সঙ্গে না কথা বলে যাবে সে। গাড়ির গতি কমিয়ে বলে যাবে_বোনটি ভাল আছে তো? ও বুড়ীমা, কাল দেখিনি কেন? ও বউঠান, মাছ রেখো তো চাট্টিখানি_ফেরার সময় নিয়ে যাবো। ওরা বলবে_ফালতুদার খবর ভাল তো? বাবা ফালতু, দুটো মাথাধরার বড়ি এনে দিস বাবা, আমার সোনার বাবা! বিনোটির মাস্টারমশাই স্কুল থেকে দৌড়ে বেরিয়ে বলবেন_ফালতু। প্রেসক্রিপশানটা নিয়ে যা বাবা! এই নে টাকা। বেশি লাগলে দিস, দোব'খন।
ফালতু এখনো ফালতু নামেই থেকে গেছে। যে তাকে নতুন নাম দিতে চেয়েছিল, রানীরঘাটের জগন্নাথের মেয়েটা, তার মতো নির্বোধ আর কেই বা ছিল। বাপ যেই না বলা, তোরা ভাইবোন_হতভাগী আপন দাদার সঙ্গে জ্যোৎস্না রাতে মা গঙ্গার বুকে শুয়েছে, এই তীব্র পাপবোধে মাথার ঠিক রাখতে পারেনি। বিষাক্ত করবী-ফল, কেউ বলে ধুতরো, শিলে বেঁটে গিলে ফেলেছিল। বাপ কোন মতলবে কী বলছে, বুঝবি তো তলিয়ে।
এই সব কথা ভাবতে ভাবতেই ফালতুর রাগ হয়। স্পিড বাড়ায়। পৃথিবীকে চাকার তলায় মাড়িয়ে শোধ নেয়।
নিছক গপ্পো হতে পারে, নাও পারে। হয়তো সে-আমলের মাৎস্যন্যায়কে বোঝাতেও এমন গপ্পোর উদ্ভব। কিন্তু রানীরঘাটের বেলায়ও তো একটা গপ্পো থাকার কথা। কী সেটা? খোঁজখবর করতে গিয়ে দেখি, গপ্পোর নায়ক আমার রীতিমতো চেনা।
সেই গপ্পোটাই অবিকল শুনিয়ে দিচ্ছি। এতটুকু রঙ চড়াচ্ছি না। বরং যতটা রঙ ছিল, ঘষে একটু ফিকে করেই দিলুম। ঈষৎ ধূসর দেখাক না! কিন্তু দার্শনিকতা না, মরাল না, হাতের তালুর মতো স্পষ্ট ব্যাপার। আজকাল জ্ঞান দেবার চেষ্টা করলে লোকে অপমানিত বোধ করে। বিপুলা পৃথ্বী নিরবধি কালের কতটুকই বা জানি যে জ্ঞান দেব?
আরও একটা কথা। নিজেকে গপ্পোর মধ্যে ঢুকিয়ে এক নিরাসক্ত কিংবা ক্রান্তদর্শী চরিত্র করে তোলার লোভও অতিকষ্টে সংবরণ করেছি। যদিও তাই রেওয়াজ।
সে অনেক বছর আগের কথা।...
নদীর ওপারে এক শহর, এপারে এক ঘাট। তার নাম রানীরঘাট। নদীর নাম ভাগীরথী। লোকেরা বলে মাগঙ্গা। মাগঙ্গার কোলে ছোট্ট মেয়ের মতো রানীরঘাট হেসেখেলে দিন কাটায়। গাঁয়ের মেয়ের চোখে শহরের ঘোরলাগা ভাবটুকুও চোখে না পড়ে পারে না। কিন্তু শুধু ওই আলতো ঘোরটুকুই ছিল তখন, আর কিছু না।
একটা বাসস্ট্যান্ড ছিল। কয়েকটা ছোটখাটো দোকান ছিল। রিকশা খান পাঁচেক। এক সময় ঘোড়ার গাড়িও ছিল। সারাদিন বাইরের মানুষের ভিড়ে হইচই বড় বেশি। তারপর সন্ধ্যা হতে না হতে ভিড় কমে যায়। শেষ বাস ছেড়ে যায় সাড়ে সাতটাতেই। বাঁশবনে শেয়াল ডাকে। তক্ষক ডাকে। পেঁচা ডাকে শিমুল গাছে। নিঝুম রাতে ঘাটের ধারে আটচালায় একটা লণ্ঠন। কাদের চাপা গলায় গপ্পসপ্প। আর মাঝে মাঝে ঘাটের ইজারাদার চৌবেজীর চেরা গলায় হাঁক_শম্ভুয়া_আ_আ! শেষ খেয়া ফিরতে হয়তো দেরি করছে।
সেবার শীতে জেলাবোর্ডের সেন্সাসের বাবুরা এসে আধঘণ্টাতেই রানীরঘাটের গণনা শেষ করে ফেলেছিলেন। রোদে দাঁড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে চা খেতে খেতে একজন হঠাৎ তামাশা করে বললেন_আরে, ওই পাগলীটা যে রয়ে গেল! লিখে নাও।
আটচালার ধারে বসে পাগলীটা তখন যাকে দেখছে, চেঁচাচ্ছে_ও বাবারা! ওগো বাবারা! সবাইকে ওর বাবা বলা অভ্যেস। কিন্তু বাবা বলে ডাকছে কেন, কী বলতে চায়, বোঝা যায় না। ভিক্ষে দিলেও তো ছুড়ে গায়ে ফেলে দেয়।
পাশের তেলেভাজার দোকান থেকে ময়রাবুড়ী ফিক করে হেসে বলল_তা লিখে নেবেন তো নিন বাবুরা। লিখুন, সুরেশ্বরী। লোকে বলে সুরিক্ষেপী। সেও তো একটা মানুষ বটে। রানীরঘাটে সাত বছর আগে। সবার নাম লিখলেন, ওর কেন লিখবেন না?
প্রথমবাবু বললেন_আর কে আছে ওর?
_আবার কে থাকবে? যে-যা দয়া করে দেয়, খায়। আটচালাতে ঘুমোয়।
দ্বিতীয়বাবু দেখছিলেন সুরিক্ষেপীকে। ভুরু কুঁচকে চাপা গলায় বললেন_মেয়েটা মনে হচ্ছে প্রেগন্যান্ট্! স্ট্রেঞ্জ!
প্রথমবাবু হেসে ফেললেন_ভাগ্। তুমি তো ব্যাচেলার। কিসে বুঝলে?
_এসব বুঝতে বিয়ে করা লাগে না। দেখ না, জাস্ট লুক অ্যাট দ্য থিং।
সুরিক্ষেপী ছেঁড়া নোংরা শাড়িটা সামলাতে পারে না। অথচ মাথায় ঘোমটাটি থাকা চাই-ই।
প্রথমবাবু দেখলেন। অবাক হয়ে বললেন_সত্যি তো। মানুষ মাইরি এখনও জানোয়ার।
ময়রাবুড়ী ব্যাপারটা লক্ষ করে ভারি গম্ভীর হল। গোমড়ামুখে বলল_মাগঙ্গার চোখের সামনে এই পাপ। সইবে ভেবেছেন? দেখুন না কী হয় পেলয়কাণ্ড! রানীরঘাট ভেসে যাবে। ধুয়ে মুছে যাবে। বেঁচে থাকলে দেখে যাব।
দ্বিতীয়বাবু হো হো করে হেসে বললেন_ও বুড়ীমা, কী করে দেখবে? তুমিও তো ভেসে যাবে।
বুড়ী বিকৃত মুখে গরম তেলে বেগ্নি ছাড়ল। চড়চড় করে আওয়াজ হতে থাকল। কনুই গড়িয়ে জলের ফোঁটা পড়েছে বুঝি। বাবুর কথার জবাব দিল না। পাপের শাস্তি নিজের হাতে দিচ্ছে যে।
প্রথমবাবু চায়ের ভাঁড় ছুড়ে ফেলল আকন্দের ঝোপে। পা বাড়িয়ে আবার রসিকতা করল।
_তাহলে লিখতে হলে দুটো নামই লেখ। সুরেশ্বরী না কী বলল যেন, আর তার পেটে যেটা আছে।
_ছেলে হবে, না মেয়ে হবে তার ঠিক নেই। দ্বিতীয়বাবু সিগারেট ধরিয়ে পা বাড়ালেন।
_একটা কমন নাম দেওয়া যাক্।
_মাথায় আসছে না।
_অজস্র আছে, অজস্র। শোন বলছি। ঊষা, পার্বতী, রেণু, উমা... আঙুল গুনতে গুনতে প্রথমবাবু বললেন। কটা হলো? দাঁড়াও আরও বলছি। রমা।...
সুরি পাগলী চেঁচিয়ে উঠল_বাবারা! ও বাবারা! ওগো বাবারা!
ঘাটের ধারে উঁচু পাড়ে ঘাটের ইজারদার চৌবেজীর গদি। পূর্ণিয়ার লোক। এ ঘাটে আছেন চৌদা বরষ। যখন এসেছিলেন, তখন চুল ছিল কুচকুচে কালো। এখন অর্ধেক পেকে গেছে। ফি-সাল জষ্ঠি মাসের সংক্রান্তিতে গঙ্গাপুজোর মেলার দিন ন্যাড়া হন। ময়না পোষার শখ খুব। খাঁচাটা সামনে ঝুলছে। রামনাম শেখান সকাল-সন্ধ্যা। নিজে পড়েন তুলসীদাসের রামচরিতমানস। কালেকটরিতে এ বছর একইশ হাজার রূপেয়া গুনে দিয়ে ঘাট জিতেছেন। আনা-আনা পারানি। তবে বিলাঞ্চলের যুবতী মেছুনীদের বেলা আনাকড়ি নয়, রাতের জলের ফসল ঝকঝকে রাইখয়রা মাছ। চৌবেজী মাছও খান, মাংসও খান। খৈনি ডলেন, গড়গড়াও টানেন। গদিতে কোলে তাকিয়া নিয়ে বসে ভাঙা উচ্চারণে গানও গেয়ে ওঠেন_'কেম্নে এ গঙ্গাহোবো পার/হামি জানে না সাঁতার।' মাছের গন্ধ লাগা বেলুন-বেলুন বুক খিলখিল হাসিতে ফুলে ওঠে, দুলে ওঠে।_ওত্তা হাসো মাৎ রী। ফাট্ যায়গা।
_ঘাটোয়ারিবাবু না ঘাটের মড়া। কোথায় শিখলে এমন গান? আ ছি ছি।
আর ফচকেমির সময় নেই। শম্ভু মাঝি ডাক দিয়েছে_এ অষ্টসখী রাধিকে সুন্দরীরা।...
ওদিকে ডাক দিয়েছে ইসমাইল ড্রাইভারের বাসও। হর্নের ভ্যাঁক ভ্যাঁক আওয়াজ চলে যাচ্ছে নদী পেরিয়ে ওপারের ঘাটে।_পুরন্দরপুর মনসুরগঞ্জো বিনোটি মহিমাপুর। ছেড়ে গেল, ছেড়ে গেল। সবুজ। বাসের ভেতরে লোক, বাইরে লোক, ওপরে লোক। অলীক ফলন্ত বৃক্ষ হেলতে দুলতে যাবে। রাস্তা মহা ফক্কড়বাজ।
_বাবারা। ওগো বাবারা! ও বাবারা! সুরিক্ষেপী মাটিতে থাপ্পড় মেরে সেই হাত কপালে আনে। আবার মাটিতে থাপ্পড়। ধুলোয় কপাল ধূসর।
ময়রাবুড়ী চেঁচায়_চুপ। চুপ। গলায় দোব গরম তেল ঢেলে। লজ্জা করে না বড় গলা করে চ্যাঁচাতে? তখন কোথায় ছিল এ গলা? চিহরিপোকার (শ্রীহরি) কামড় খেয়ে বোবা হয়েছিলি?
মাঘের শেষে রানীরঘাটে শিমুলের ডালপালায় যেন হাজার অলীক বনমোরগ উড়ে এসে বসেছে। লাল লাল ঝুঁটি। ফাল্গুনে তাদের সাদা পালক উড়ে পড়ে মাগঙ্গার বুকে। স্বচ্ছ কালো জল বালির চরে মাথা কুটে কুটে পথ প্রার্থনা করে। যেতে পায় কী পায় না। শ্যাওলায় ঠোঁট ঘষে বেড়ায় মৌরালার ঝাঁক। প্রতিমার খড়বাঁশের টাট উল্টে গেছে যে স্রোতে, তা এখন স্মৃতি এবং পরবর্তী প্রতীক্ষা। মড়াখেকো দাঁড়কাক এসে সেই টাটে বসে সবাইকে খেতে ডাকে_খা খা। ময়রাবুড়ী তাই শুনে বলে_ওই ঘাটের মড়াটাকে খা। এ ঘাটে অনেক মড়া। কোন মড়ার কথা বলে দাঁড়কাক জানে না। সুরিক্ষেপীকে বুড়ী এনেছে চান করাতে। বুড়ীর হাতে কঞ্চি। কঞ্চিটা নাচাতে নাচাতে বলে_ভালো মানুষের বেটি হবি তো বস্। বসে পড় জলে। তাই বলে ওকে ছোঁবে না বুড়ী। নিজে-নিজেই চান করতে হবে সুরিক্ষেপীকে। তাই আবার স্নান। পা ছড়িয়ে আঘাটার জলে বসে কপাল থেকে জলের দিকে এবং জলের দিক থেকে কপালে হাত।_বাবারা! ওগো বাবারা! জল বলে ধুলোমাখা কপাল ধুয়ে যায়, এটাই এখন সুবিধে। বুড়ী বলে_হাতখানা বুকে দে লো, বুকে দে। বাবারা বলে বুকে দে দিকিনি।
শীতটা চলে গেল। গ্রীষ্ম এলো। ঘাটের ধারে আকন্দঝাড়ে ফুল ফুটল। ঘাটোয়ারিজী গঙ্গাপুজোর দিন ন্যাড়া হলেন। আটচালায় সুরিক্ষেপীকে আড়চোখে দেখে দয়া করে ভাত পাঠিয়ে দিলেন। এ বছর অচানক দশ হাজার টাকা বেড়ে গেছে ইজারার দর। তাই বলে চৌবেজী রানীরঘাট ছাড়বেন না। বুড়ো হয়ে মরবেন, তখন কেউ গদি দখল করুক। বড় মায়া বসে গেছে রানীরঘাটে।
বর্ষায় এক রাতে তুলকালাম বৃষ্টি। তার মধ্যে সুরিক্ষেপীর বাচ্চা হলো আটচালায়। কজন দূর গাঁয়ের গাড়োয়ান গরুমোষের গাড়ি নিয়ে এসে আটকে পড়েছিল। তারাই বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ছুটোছুটি করে অবশেষে ময়রাবুড়ীকেই পেল। মানুষের জন্মটা ওইসব গেঁয়ো গাড়লদের কাছে নিশ্চয়ই খুব দামী। তারা একটা হ্যারিকেন দিল পর্যন্ত। আটচালার কোণটাও কাপড় টাঙিয়ে ঘিরে দিল। মেয়েমানুষের আর্তনাদ শুনে তাদের হৃদয় গলে যাচ্ছিল। বৃষ্টি না থাকলে তারা এ সময় দূরে সরে থাকত। মানুষের জন্ম তাদের কাছে বড় পবিত্র ঘটনা। তারা একে সম্মান দিতে চাইছিল। কিন্তু বৃষ্টি! আর বুঝি সময় ছিল না বর্ষাবার। তারা বর্ষার বাপান্ত করছিল।
ময়রাবুড়ী বলল_আগুন চাই যে এখন। দেখ্ দিকি, এ অসময়ে গুখেকোর বেটি এ কী করে বসল।
গাড়োয়ানরা ঘাটোয়ারিবাবুর গদি থেকে শুকনো লাকড়ি এনে দিল। একটু পরে শোনে, ওঁয়া-ওঁয়া কান্নাকাটির মধ্যে বুড়ী হেসে-হেসে আদর করছে_এ রাঙা টুকটুক কোত্থেকে এলো রে! এ ভাঙাঘরে চাঁদের হাট কোন মুখপোড়া বসালে রে। একে আমি কোথায় রাখব রে! আহা, যেমন নাক তেমনি চোখ। যেমন মুখের গড়ন, তেমনি রঙ। ওরে ছোঁড়া, এ মুখ তুই কোথায় পেলিরে?...
সে এক দীর্ঘ পদ্য, ছড়ার সুরে গেয়। রানীরঘাটে সকাল হতে না হতে সুখবর পড়ল ছড়িয়ে। তখনও ফ্যামিলি প্লানিং-এর নামগন্ধ নেই কোথাও। রানীরঘাটের স্থায়ী জনসংখ্যা বাড়ল, এই যথেষ্ট। প্রসূতিকে কড়া চা খাইয়ে খাইয়ে ঢোল করার অবস্থা। ময়রাবুড়ী চোখ পাকিয়ে কপট ধমকায়। বাসের লোক রিকশোর লোক, আর যতসব উটকো লোকের ঝামেলা সে ছাড়া আর কে সামলাবে? সে আঁতুড় আগলে দাঁড়িয়ে বলে_কী দেখার আছে? অ্যাঁ? কারও মা-বোন বিয়োয়নি?
সেন্সাস বাবুদ্বয় অনেকগুলো নাম আওড়ে গিয়েছিল। রানীরঘাট নিল না। আদর করে নাম দিল ফালতু। আসলে এতকাল যেন কাজের মতো কাজ, কিংবা খেলার মতো একটা চমৎকার খেলা পাচ্ছিল না কেউ। এত দিনে পেল। পেল তো এমনভাবে পেল যে হুজুগের মাত্রাটা গেল বেড়ে। ছোকরা কন্ডাক্টররাই লিড নিল। চাঁদার লিস্টিতে প্রথম নাম চৌবেজীর। পাঁচ টাকা। দ্বিতীয় নাম ইসমাইল ড্রাইভার। দু টাকা। ঘাটে ফিস্টি হবে। সুরিক্ষেপীর ব্যাটার জামাপেণ্টুল কিনতে হবে। একখানা নতুন শাড়িই বা কেন কেনা হবে না? এ প্রস্তাব শম্ভু মাঝির। আর সেই দিনই দৈবাৎ এসে পড়েছে একটা নাটুকে দল। লোকে বলে আলকাপ দল। ছেলেটা মেয়ে সেজে নাচে গায়। বেঁটে লোকটা সঙ দিয়ে লোক হাসায়। ঘাটের পিছনের চত্বরে তেরপল টাঙিয়ে আসর হলো। ঘাটবাবুর হ্যাজাগ জ্বলল। রানীরঘাটে এ ছিল উৎসবের রাত। আর তখনও রানীরঘাটে ব্রিজ হয়নি। বিদ্যুৎ আসেনি। মাইক বাজত না। দূর উত্তরের ফরাক্কায় ফিডার ক্যানেলটাও খোঁড়া হয়নি। দেশ দু টুকরো হয়নি। কত কি হয়নি। সে অনেক বছর আগের কথা।...
সুরিক্ষেপীয় চেহারা আহামরি ছিল না। মুখটা ছিল গোলগাল, সরু বেঁটে নাক, নীচের ঠোঁটটা একটু পুরু। গতরটা ছিল থলথলে প্রচুর মাংসে ভরা। ময়রাবুড়ী বলত_সাতশো শ্যালশকুনেও খেয়ে শেষ করতে পারবে না। শুধু দেখবার মতো জিনিস ছিল তার চুল। কী চুল কী চুল! ছেলে হওয়ার পাঁচদিনের দিন, আঁতুড় থেকে যেদিন বেরোয়, সেই 'পাঁচোটে'র দিন কঞ্চি তাড়না করে মমতাময়ী বুড়ী তাকে নাইয়ে আনে এবং গড়গড় করে এক বাটি নারকোল তেল ঢেলে দেয় চুলে। সেই একবার তেল। ফলটা হল কী আটচালার ধুলো-ধাসড় মেখে পুরোটা গিয়েছিল জট পাকিয়ে। জটার প্রতি লোকের ভক্তি আছে। পরে যখন রানীরঘাটওলারা সুরিক্ষেপীর জন্যে বাসস্ট্যান্ডের পিছনে একটা ছফুট-চারফুট-সাতফুট মাপের খুপরি বানিয়ে দিয়েছিল, সুরি বাচ্চা কোলে নিয়ে সেখানে বসে বাবাদের ডাকাডাকি করত আর ধর্মভীরু দেহাতী মেয়েরা পয়সা ছুড়ে দিত। পয়সাগুলো সুরি পাল্টা ছুড়ে ফেলবেই। সেই পয়সা ঘাটেরই কেউ না কেউ কুড়িয়ে জোর করে ওর আঁচলে গেরো বেঁধে রাখবেই। তাতে আপত্তি ছিল না সুরির। কিছুতেই আপত্তি ছিল না। পরের গঙ্গাপুজোর আগের দিন ময়রাবুড়ী চুপি চুপি একদলা সিঁদুর ঢেলে দিয়ে এলো সিঁথেতে। চেহারাটা খুব খুলে গেল মেয়েটার। টুকটুক করে তাকিয়ে দেখে বুড়ী বলল, আহা! শাঁখানোয়াখান হলে কী মানান মানত পোড়ারমুখীকে। ব্যস, খবর গেল শম্ভু মাঝির কাছে। ওপারে ঘাটের ওপর শাঁখাপট্টি। তাও জুটে গেল। ময়রাবুড়ী খুপরির সামনে কোমরে দুহাত রেখে কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। দেখে দেখে সাধ আর মেটে না। ছেলেপুলের মায়ের যা যা দরকার, তা নইলে চলে! দেখ তো মুখপুড়ীকে এখন কেমন মানিয়েছে। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বুড়ী দৌড়ে যায় দোকানের দিকে। রানীরঘাটে পাখপাখালি যত, তত কুকুরবেড়াল। তার উপর কড়াইতে তেল ধোঁয়াচ্ছে।...
সেবার গঙ্গাপুজোর দিন সন্ধেবেলা খুব কালবোশেখি হলো। বিষ্টি হলো। বাইরের লোকেদের খোয়ারের হলো একশেষ। কিন্তু রানীরঘাটে গজিয়ে গেল এক দেবী। আবার কে? ওই সুরিক্ষেপী। সে 'ক্ষেপী মা' হয়ে গেল। লোকে তার কাছে জ্ঞাতব্য তথ্য আদায় করতে চায়। ক্ষেপী মা'র শুধু ওই এক কথা_ওগো বাবারা! ও বাবারা! আর ডান হাত কপাল থেকে মাটিতে, মাটি থেকে কপালে। রাতদুপুরে নিঝুম রানীরঘাটে হঠাৎ শোনা যায়_ওগো বাবারা! ও বাবারা!
কিন্তু এত যে যত্নআত্তি লক্ষ্য, তার তলায়-তলায় আরেক তরঙ্গ বইছিল রানীরঘাটে। কাজটা কার হতে পারে? পাপ হোক, পুণ্য হোক, ভালো বা মন্দ হোক, এ একটা ঘটনাই বটে। কে সে? জানোয়ার হোক, মানুষ হোক_দৈবাৎ মতি টলেছিল, কিন্তু কার? নানা ফিকিরে বাচ্চাটার মুখ দেখা হয়, ফিরে এসে রানীরঘাটে মুখ খুঁজে মেলাবার চেষ্টা চলে। মেলে না। চৌবেজী ঘাটোয়ারির নামটাও উঠেছিল। টেকেনি। অত সাফসুতরো মানুষ। গদির সাদা চাদরে এককণা ময়লা পড়তে দেন না। দুবেলা স্নান-আহ্নিক করেন। খালি গায়ে ধবধবে সাদা পৈতে থেকে জ্যোতি ঠিকরে পড়ে। নোংরা দুর্গন্ধ এক নারীশরীরে কোন দুঃখে সুখ খুঁজতে যাবেন? তার ওপর লাখপতি লোক। ইচ্ছে করলেই ওপারের অলিগলি খুঁজে সুন্দরী সংগ্রহ করাটা ডালরোটি খাওয়ার সামিল। কেউ বলেছিল, ইসমাইল ড্রাইভারই বা। যা মদ-তাড়ি খায় লোকটা। রাতের দিকেই ঘটেছে। হিসেবমতো আশ্বিন মাসেই বটে। সে-আশ্বিনে প্রায়ই রাতে ঝড়বৃষ্টি হতো। কিন্তু মনে পড়ল, তখন ইসমাইল অ্যাকসিডেন্ট ক'রে অনেকদিন হাসপাতালে ছিল।
এইভাবে জনাদশেক প্রজননক্ষম পুরুষ মানুষ যারা কিনা ঘাটেরই বাসিন্দা এবং বয়স পনের থেকে পঁয়ষট্টির মধ্যে, সবাইকে যাচাই করে-করে বাদ দেওয়া হলো। অতএব, দায়িত্বটা বাইরের লোকের ঘাড়েই ফেলতে হয়। আশ্বিনে তো ঝড়জল গেছে। বারো মাসই ওই আটচালায় রাতের আশ্রয় নেয় কত জায়গার পথিকজন, গাড়োয়ান, ভিখিরি, ফকির, সন্ন্যাসী_কত রকম মানুষ। কার মাথায় কটকট করে 'চিহরিপোকা' কামড়েছিল! শেষ অব্দি হাল ছেড়ে দেওয়া হলো। ও পোকা বিষম পোকা। কামড়ালে উত্তর-পুব জ্ঞানগম্যি থাকে না।
আর দিন যায়, রাত আসে। রাত যায়, দিন। মাস যায়, বছর। ঢ্যাঙা শিমুলে অলীক লালঝুঁটি মোরগের ঝাঁক আসতে ভোলে না। ঘাটোয়ারিজীর ময়না কবীরের দোহার একটি শব্দ পেরিয়ে যেতে-যেতে হিমসিম খায়। ঘাটোয়ারিজীর বাকি চুল সাদা হয়ে ওঠে। ক্ষেপীমায়ের 'থানে' পয়সা পড়ে এবং চুরিও যায়। এক শীতে ময়রাবুড়ীও গঙ্গা পায়। ক্ষেপী চেঁচায়_বাবারা! ওগো বাবারা! ও বাবারা!
ফালতু তখন গুটগুট করে হাঁটতে শিখেছে। আর রানীরঘাটের সবাই তার বাবা। আধো-আধো বুলিতে ছোঁড়াটা কাপড় ধরে টানে_বাবা! বাবা! ব্যাপারী, দালাল, ফড়ে, মামলাবাজ, গাড়োয়ান আর বাবু_সবাইকে বাবা ডাক। চৌবেজীর উঁচু গদির ধারে দাঁড়িয়ে ছোট্ট নোংরা হাত বাড়িয়ে ডেকে ওঠে_বাবা। চৌবেজী হাসতে হাসতে ধমকান_ভাগ্! ভাগ্! তাই বলে কেউ ওর গায়ে হাত তুললেই হয়েছে। সারা রানীরঘাট এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
দেখতে দেখতে ফালতু বড় হলো। আবার এক গঙ্গাপুজোর মেলার দিন খুব জলঝড় এলো। সেই রাতে সুরিক্ষেপী কাপড়-চোপড়ে আচমকা বমি করে ভোররাতে ঠাণ্ডা নীলবর্ণ হয়ে মারা পড়ল। মায়ের শুয়েমুতে ছোঁড়াটা বেহদ্দ ঘুমোচ্ছিল। বাঁশবনে বাঁশ কেটে খাটুলি বানানো হলো। ওপাশের শ্মশানে ক্ষেপীমা পুড়ল। রানীরঘাটে সেও একটা দিনের মতো দিন ছিল। আবার চাঁদা তুলে ফিস্টি। আবার এক-আসরগান। শেয়ালমারার ষষ্ঠীপদ কেত্তুনে নিখরচায় গেয়ে গেল। ফালতুকে কেউ যদি শুধোয়_তোর মা কোথায় রে? ফালতু শ্মশানের দিকটায় আঙুল তুলে ছড়া গায়_হো হো! কেপী গেচে, পুলতে/ছসেল পতোল তুলতে। অর্থাৎ কী হাসির কথা! ক্ষেপী গেছে পুড়তে, ছসের পটোল তুলতে। কে শেখাল? শম্ভু মাঝিই বা। সে বড় রসিক মানুষ। নয়তো দিনদুপুরে মাঝগঙ্গায় লগি ঠেলতে ঠেলতে কেউ গায়_'এ ভরা গাঙমে চেকন জোসনা ডুব দিয়ে পার হবি লো সই/সই লো_ও_ও_ও?'
হাফপেন্টুল পরা উদোম-গা ফালতু ভালোরকম বুলি ফুটলে বাসের মাথায় উঠে চ্যাঁচায়_চলে এস! চলে এস! আভি ছোড় দেগা। জলদি ছোড় দেগা!
আর এর ফলটা হলো এই যে সে গতি চিনল। গতিকে ভালোবাসল। ইসমাইলের বাসেই তার জীবনটা জড়িয়ে গেল দেখতে-দেখতে। পুরন্দরপুর মনসুরগঞ্জো বিনোটি মহিমাপুর। কখনও ইসমাইলের সঙ্গে গঙ্গা পেরিয়ে শহর। শহরে ইসমাইলের বাড়ি। তার বউ ফালতুর ইতিহাস জানে। দেখলেই মুখটা গম্ভীর করে। জল চাইলে ফুটো এনামেলের গেলাসে জল দেয়। ছিঘেন্নার চূড়ান্তই করে। ইসমাইল কাঁচুমাচু হাসে খালি। কী বলবে। অথচ ছোঁড়াটা খুব কাজের। পাকাচুল তোলে। ফরমাস খাটে। নিজের ছেলেরা ইস্কুলে পড়ে। তারা যেন এ হারামী ড্রাইভারী কাজের ত্রিসীমানা না ঘেঁষে! হাতে স্টিয়ারিং এলে দুনিয়াটা পয়মাল হয়ে যায়, কে বুঝবে? থিতু হয়ে বসা যায় না ঘরে। শয়তানের চাক্কা ঘোরে সারাক্ষণ এই শরীরে। থামতে দিলে তো? আর শয়তান তোমাকে শেষঅব্দি জাহান্নামের দিকেই নিয়ে চলেছে, টের পেয়েও কিছু করার নেই তোমার।...
কতকাল পরে রানীরঘাটে আরেক শীতে এসেছেন সেন্সাসের বাবুরা। এ বাবুরা সেই তাঁরা নন। এঁরা সরকারী বড় সেন্সাসের লোক। এ রানীরঘাটও সে রানীরঘাট নয়। তিনটে বাসরুট এসে মিলেছে ঘাটে। দোকানপাট বেড়েছে। বিদ্যুৎ এসেছে। শ্মশানঘাটের ওপাশে ব্রিজ গড়ে উঠেছে। চৌবেজী ঘাটোয়ারির এই শেষ ইজারা। খাঁচার ময়নাটাও গেছে মরে। আর পাখি পোষেন না। তক্তাপোশের তলায় ঘুণধরা খাঁচাটার কী অবস্থা কেউ জানে না। সেন্সারের বাবুরা ঘুরে-ঘুরে লোক গুনছিলেন। পোষা জীবজন্তুর হিসেবও নিচ্ছিলেন। আরও কত কী তথ্য। লোকসংখ্যা সতের থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে বাহান্ন। নেহাত পেটেরটা বাদ দিয়ে ধরলে। লোকেরা ব্রিজের দিকেই সরে যাবার তালে ছিল। কিন্তু গিয়ে করবেটা কী? নেহাত ঘর বেঁধে থাকাই হবে। উঁচু পুলের ওপর দিয়ে বাসবোঝাই লোকজন সোজা গিয়ে ওপারে নামবে। এখানে কোথাও আর রাস্তা আগলে দাঁড়াবার সাধ্যি নেই। রানীরঘাট হিম হয়ে ঝিম মেরে গেছে। নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে সময় গোনা! নেহাৎ ভিটের মায়ায় কেউ কেউ থেকে যাবে। সেন্সাসের বাবুরা টের পেলেন, এ বাহান্ন আবার সতেরয় নামবে, কিংবা আরও নেমে সাতে ঠেকলেও অবাক হবার কিছু নেই। যারা দোকানদারি করুতেই এখানে ঘর বেঁধেছে, তারা ওপারে নতুন বাসস্ট্যান্ডের কাছে দু-চার হাত জমির জন্যে মাথা ভাঙছে।
অথচ বাইরে-বাইরে এই মৃত্যুযন্ত্রণা বোঝার উপায় নেই। তেল ফুরোবার আগে সলতে পুড়ছে হু হু করে। রানীরঘাট ভিড় হল্লাজেল্লায় চঞ্চল। মোটর অফিসের টেবিলে শেষ সংখ্যা বসিয়ে সেন্সারের বাবুরা নেমে এলেন চায়ের দোকানে, যেখানে আগের সেন্সাসের দুই বাবু চা খেয়েছিলেন। ওপারে এক টুকরো টিনে লেখা : অন্নপূর্ণা টি স্টল। বাঁকাচোরা হরফ। তার তলায় লেখা প্রোঃ জগন্নাথ_পদবী ধুয়ে গেছে। চা বানাচ্ছে ষোল-সতের বছর বয়সের একটি মেয়ে। শ্যামলা ছিপছিপে গড়ন। দেখতে মন্দ না। ভেতরে দরমাবাতার দেয়াল ঘেঁষে একটা বেঞ্চের কোনায় বসে চা খাচ্ছে এক নবীন যুবক। মাথায় ঝাকড়মাকড় চুল। সরু চিকন গোঁফ। তামাটে রঙ। শক্তসমর্থ চেহারা। তার পরনে তোবড়ানো খাঁকি ফুলপ্যান্ট, আর খয়েরি শার্টের ওপর হাতকাটা সোয়েটার। বাঁ হাতে স্টিলের বালা। ভারি অমায়িক তার হাবভাব।
তার দিকে ঘুরে জগন্নাথের মেয়ে টুকটুকি হাসল।_ও ফালতুদা, তোমার নাম লিখিয়ে দাওনি বাবুদের?
সেন্সাসবাবুদ্বয় বেঞ্চে বসেছেন। ফালতু ভুরু কুঁচকে বলল_কিসের নাম?
হাসতে হাসতে টুকটুকি বলল_ওর নাম লিখুন। ও যে বাদ পড়ে গেল।
প্রথমবাবু বললেন_তুমি বুঝি এখানেই থাকো?
ফালতু নিস্পৃহ ভঙ্গীতে ঘাড় নেড়ে সিগারেট ধরাল। পানুটি কি এখানে? বত্রিশ কিলোমিটার রাস্তা ঠেঙিয়ে বাস নিয়ে এসেছে একটু আগে। পথে দুবার বিগড়েছিল। ঠেলতে হয়েছে। মালিককে বললে বলেন, আর ক'টা দিন চালিয়ে নে বাবা। নতুন গাড়ি আসছে। ইসমাইলকে বুড়ো করেছে এ গাড়ি। সেই গাড়ি ফালতুকেও বুড়ো করবে।
দ্বিতীয়বাবু কাগজপত্র বের করেছেন ব্যাগ থেকে।_কেউ তো বলেনি তোমার কথা! হুঁ, নামটা বলো ভাই।
ফালতু হেসে বলল_কী হবে?
প্রথমবাবু বোঝাতে শুরু করলেন। টুকটুকিও বলল_ভয় নেই বাবা। কেউ ধরে নিয়ে যাবে না। আমারও নাম লিখে নিয়েছে। নেননি বাবু? বলুন তো একবার।
একটু পরে কাচুমাচু মুখে ফালতু রাজি হল।_লিখুন তাহলে। ফালতুই লিখুন।
_ফালতু! হাসলেন উভয় বাবুই। ওটা নিশ্চয় ডাকনাম? আসল নাম বলো।
মেয়েটা হেসে খুন হল। চায়ে দুধ ঢালতে গিয়ে উনুনে পড়ে গন্ধ উঠল। ফালতু গোঁ ধরে বলল_আসল নকল জানি না স্যার, ফালতু আমার নাম। লিখতে হয় লিখুন, নয় বাদ দিয়ে দিন।
_বেশ, ফালতু। হুঁ, বয়স?
_বিশ-পঁচিশ হবে।
আবার হাসি উঠল অন্নপূর্ণা টি স্টলে।_বিশ, না পঁচিশ?
_যা মনে হয় লিখুন। ফালতু বিরক্ত হয়ে বলল।
_মাঝামাঝি লিখছি। কেমন? জাতি কী ভাই?
একটু চুপ করে থাকার পর ফালতু বলল_হিন্দুই লিখুন।
_বাবার নাম?
হঠাৎ বজ্রাঘাত। জগন্নাথ মেকদারের হাসিখুশি মেয়েটা শক্ত হয়ে গেল। আড়চোখের বাঁকানো দৃষ্টি ফালতুর গায়ে গিয়ে পড়েছে। হঠাৎ রানীরঘাট নিঃঝুম ঝড়ের আগে যখন পাতাটিও গাছে নড়ে না। খালি বাজ পড়ার শব্দ।
_বলো ভাই!
ফালতু বেঞ্চের কোনায় সিগারেট ঘষটে নেভাল। তারপর বলল_মায়ের নাম লিখুন সুরিক্ষেপী। তাহলেই হবে।
তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল জগন্নাথ মেকদারের মেয়ে।_না, সুরেশ্বরী লিখুন। বাবা বলত ক্ষেপীমার নাম সুরেশ্বরী। উইখানে থাকত_মাথায় জটা! আমি দেখিনি। বাবা দেখেছে। ঘাটের কত লোক দেখেছে। গঙ্গাপুজোর সময় নাকি ভর হত। লোকেরা মানত করত।...
সবাই গম্ভীর। তারপর আস্তে বললেন দ্বিতীয়বাবু_হুঁ অজ্ঞাত। এবার বলো, বাড়িতে কে আছে। কখানা ঘর। পোষা জীবজন্তু আছে কি না। বাড়ির গারজেন থাকলে তার নাম কী...
প্রথমবাবু বললেন_ট্রেন চালিও না। একে একে জিজ্ঞেস করো।
ফালতু উঠে দাঁড়াল। বলল_বাড়িটাড়ি নেই। থাকি মোটরআপিসে। তারপর চলে গেল।
বাবুরা চা খাচ্ছেন। তখন গঙ্গায় নেয়ে হি-হি করে কাঁপতে কাঁপতে মেয়ের বাবা জগন্নাথ এসে গেল। কোমরে বরাবর বাত। এখন শরীর দু ভাঁজ হয়ে গেছে। কোমর থেকে মাথা অব্দি মাটির সমান্তরাল। তাই হাঁটলে হাত দুটো উড়ন্ত শকুনের ডানার মতো দুপাশে ঝটপট করে। এখন একহাতে ঘটি। ঘটিতে গঙ্গাজল। মাধ্যাকর্ষণের নিয়মে সেই হাতটা ঝুলে স্বাভাবিক হয়েছিল। কিন্তু ঘটি রাখতেই আবার যে-কে-সেই। সেন্সাসের বাবুদের চা খেতে দেখে খুশি হল। টুকটুকি ঠোঁটের কোনায় হেসে বলল_ফালতুদার নাম লিখে নিয়েছে বাবা। আমিই বললুম তো লিখতে। বাদ পড়ে যেত কেমন।
জগন্নাথ হাসল।... তোর যেন দিদির স্বভাব। বুঝলেন স্যার? সেবারে আপনারা আসেননি। অন্য দু'জন এসেছিলেন। আপনাদের চেয়ে বয়স অনেক কম। দিদি থাকত ওই যে ভিটে দেখছেন, ওখানে। ওই ফালতুর মায়ের নাম লিখিয়েছিল। খুব ভালবাসত মেয়েটাকে।
কথার কথা হিসেবে প্রথমবাবু বললেন_কাকে?
_সুরিক্ষেপীকে। মানে ফালতুর মা। জগন্নাথ রোদে দাঁড়িয়ে পুঁথি খুলল। পুঁথিতে অল্পবিস্তর রঙ চড়বেই। তাই_কোন জাত না কোন জাত, জাত মানামানি নেই। দিদি ঘাটে ফেলে মেয়েটাকে রগড়াত। কী ভাল না বাসত স্যার! ঘাটের অনেকে জানে। দেখেছেও, যারা ছিল তখন। আমার দিদি মুরুক্ষু মেয়ে হলে কী হবে, প্রাণটা ছিল বড়। ফালতুর জন্মের রাতে কি বিষ্টি কী মেঘ। পেলয়ঙ্কর চলছে। তার মধ্যে দিদি কাঠ রে আগুন রে সেঁকা রে পোড়া রে, আপনার মশাই লণ্ঠন রে করে রানীরঘাটের এ-মুড়ো ও-মুড়ো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আজকাল আর অমন মানুষ হয় না স্যার! তো ফালতু এখন মানুষ হয়েছে। এ লাইনে খুব পাকা ড্রাইভার। ও জানেই না এসব কথা। কে ওর চোখে কাজল পরিয়ে গায়ে তেল মাখিয়ে রোদে বসে থাকত জিগ্যেস করুন, বলতে পারবে না।
সেন্সাসের বাবুদ্বয়ের অত সময় নেই। শহরে শিক্ষকতা করেন। স্কুলের সময় হয়ে এলো। উঠে গেলেন পয়সা দিয়ে। জগন্নাথ একটু বেজারই হল। এক সময় সুরিক্ষেপীর বাচ্চা হওয়ার ব্যাপারটা রানীরঘাটের মনমেজাজ চাঙ্গা রাখত। কার না মনে পড়ে সে-সব দিন? ফিস্টি। গানের আসর। সুরিক্ষেপীর ঘর গড়ার দিন কত হইচই স্ফূর্তি। যে আসছে, সেই হাত লাগাচ্ছে। জগন্নাথ কত কাপ চা খাইয়েছিল হিসেব নেই। আজকাল সবাই কেমন যেন হয়ে গেছে। ফালতু তখন মোটেই ফালতু ছিল না। এখন ফালতু তো বটে, মানুষই যেন ফালতু হয়ে গেছে। ঘাটোয়ারিজী একটা লাল হাফপেণ্টুল দিয়ে ফালতুকে বলেছিলেন_যেদিন বাবা বলা ছাড়বি, সেদিন থেকে রোজ একপো করে রসগোল্লা। ফালতু ছাড়তেই পারেনি। ও বাবা, তোমার পাখিটাও দাও না! ও বাবা, আমি খৈনি খাব। ও বাবা, দুটো পয়সা দাও। হুঁ, ফক্কুড়ে লোকেরা শিখিয়ে দিত ছোঁড়াটাকে। ঘাটোয়ারিজীকে নাকাল করে ছাড়ত। শুধু ঘাটোয়ারিজী কেন, জগন্নাথের ওপরও লেলিয়ে দিত না? একবার অশ্বিনী দারোগা এসেছেন ঘাটে। কে লেলিয়ে দিয়েছে ফালতুকে। ফালতু দারোগাবাবুর হাফপ্যাণ্টুল খামচে ধরে বলে_ও বাবা, সাইকেল চাপব। বাবা, সাইকেল চাপব। দারোগাবাবু বললেন_এটা সেই পাগলীর বাচ্চাটা না? আহা! রানীরঘাটে সে এক দিনকাল ছিল। দুঁদে দারোগা হো হো করে হেসে সাইকেলের রডে চাপিয়ে সত্যি একচক্কর ঘুরিয়ে দিলেন। নামিয়ে দু-আনা পয়সাও দিলেন। বললেন_কী রে ছোঁড়া? আমার সঙ্গে যাবি? আমার বাড়িতে থাকবি। লেখাপড়া শেখাব। অ্যাঁ? যাবি?
সেদিন ফালতু গেলে ভালই করত। রানীরঘাটের লোকগুলো যেন ছোঁড়াটার মায়ায় পড়ে গিয়েছিল। ও গেলে যেন ঘাট ফাঁকা হয়ে যাবে। এক ফাঁকে শম্ভু মাঝি ডাকল_আয় বে। লৌকোয় চাপবি। ফালতু চলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। দারোগাবাবু সাইকেলে চেপে গেলেন আসামী ধরতে কনকপাড়া-গোপগাঁ।...
তবে ছোঁড়াটার লোভ ছিল না কিছুতে। দিদি একখানা বেগনি হাতে দিলে তো প্রায় সারাদিন ধরে তাই কুচকুচ করে দাঁতে কেটে খাবে। দিদি ওদের মা-ব্যাটার মত যত্ন করত। এখন ভাবলে অবাক লাগে। কেন এমন করত দিদি? কেন কেন করতে করতে জগন্নাথের শীতটা গেল বেড়ে। তোবড়ানো মুখে ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকল।
_বাবা, আমি আসছি।
জগন্নাথ তাকায় মেয়ের দিকে।_নাও! মাথায় পোকা কামড়াল। খদ্দেরপাতি আসবে-টাসবে।
_তুমি দেখ না ততক্ষণ। মরতে তো যাচ্ছি না!
লম্বা পা ফেলে টুকটুকি বাসস্ট্যান্ডের ওপাশে চলে গেল। মা-মরা মেয়ে নিজের জোরে বড় হয়েছে। বাড়টা বড্ড বেশি। ঘাটসুদ্ধু লোক তার কুটুম্ব। মামা খুড়ো কাকা মামী খুড়ি কাকিমা, দাদা বউদি, আরও কত রকম সম্পর্ক মানুষের থাকে।
বাস সিন্ডিকেটের লক্ষ্মণবাবু ডাকেন_ও টুকটুকি, কোথায় যাচ্ছিস? টুকটুকি সোজা বলবে_আপনার কনে খুঁজতে দাদামশাই। লক্ষ্মণবাবু দাড়ি চুলকে বলবেন_ওরে, ওরে। তুইই তো আমার কনে। টুকটুকি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলবে_আমার বর যে ঠিক হয়ে আছে দাদামশাই।
আহা, আগে বলতে হয়।
আর ওই চৌবেজী। ওকে দেখলেই খৈনি ডলতে ডলতে_কেমনে হোবো এ গঙ্গা পার/হামি জানে না সাঁতার।
ঘাটোয়ারিজী লোটা হাতে শিমুলতলায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কানে পৈতে জড়ানো। হাতমাটি করা হয়ে গেছে। মোছা হয়নি। নির্মীয়মাণ ব্রিজ দেখছেন। দেখতে দেখতে ঘুরলেন ডাইনে বাঁশবনের দিকে। আকন্দ ও সাঁইবাবলার ঝড়ের পিছনে জগন্নাথের মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। হাতমুখ নেড়ে কথা বলছে কার সঙ্গে। একটু সরলে ঘাটোয়ারিজী অবাক। ওটা ফালতু না? চোখের নজর ইদানীং কমেছে। তাহলেও চিনতে ভুল হল না। হেঁড়ে গলায় কাঁপা-কাঁপা সুরে গেয়ে উঠলেন_'কেমনে হোবো এ গঙ্গা পার...' টুকটুকি হন হন করে চলে গেল গঙ্গার আঘাটায়। ফালতু একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর বাস অফিসের দিকে হাঁটল। চৌবেজী খুব হাসলেন। কতক্ষণ আপনমনে হাসলেন। হাসার পর গম্ভীর হয়ে গেলেন। মন খারাপ হয়ে গেল।
_টুকটুকি! ও রী টুকটুকি! শুন, শুন! ইধার আ।
_বলো ঘাটোয়ারিজী। যা বলার ঝটপট বলো, আমার শোনার সময় নেই।
_আ রী বৈঠ্বি, তব তো বোলবো।
_হুঁ, বসলুম। বলো।
_হাঁ রী, এত্তো কী ফুসুর-ফাসুর কোরে বেড়াস ফালতুর সঙ্গে?
টুকটুকি মুঠো পাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল_মারব! তারপর কান্নার ভান করে_হুঁ, মাগো। এবং আবার মুঠো তুলে_মারব!
চৌবেজী নির্লজ্জের মতো ফিসফিস করলেন_সাচ বলছি রী বেটি। বাত তো শুন।
_শুনব না। চিলচ্যাঁচানি চেঁচাল জগন্নাথের মেয়ে।
_পাগলী বেটি_বোল, বিভা করবি তো বোল হামাকে। হামি লাগিয়ে দেবে। চৌবেজী চাপা স্বরে বলতে থাকলেন। আরী! হামি তো ঘাট ছেড়ে চলেই যাবে। তোদের বিভা দেখে যাই। এত্তোকাল ঘাটে থেকে বুঢ়া হোয়ে গেল। হামার বহুত সুখ হোবে, বেটি। বহত ধুমধাড়াক্কা লাগিয়ে দেব।
টুকটুকি ভেংচি কেটে পালিয়ে গেল। তারপর থেকে তারও মন খারাপ। চৌবেজীকে দেখলে সেখান থেকে কেটে পড়ে। জগন্নাথ তাকে ওপারে শহরে পাঠালে সে আঘাটায় জল ভেঙে চলে যায়। শীত যত যায়, জল তত শুকোয়। বালির চড়ায় মাথা কোটে। ওদিকে ঘাটের সামনে বারোমাস দহ। ফালতুকে বিয়ে করলে ঘাটোয়ারিজীর কেন সুখ হবে, টুকটুকি বোঝে না।
শীত ফুরিয়ে বসন্ত এলো। রানীরঘাটের বনভূমি সাধ্যমতো সাজল। এবার নিষ্পত্র চ্যাঙা শিমুল শ্মশানে দাঁড়িয়ে রইল কিংবদন্তীর সেই রাহুচণ্ডাল। ভাগীরথীর বুকে ঘূর্ণি ঘুরে বেড়ায়। ভূতেরা নাইকুণ্ডল খোঁজে আপন-আপন। নাইতে গিয়ে টুকটুকি চেঁচায়_গরু খা, গরু খা, গরু খা! সেই সময় একদিন শম্ভু মাঝি থপথপ করে হেঁটে ফালতুর কাছে এলো।
_কেমন আছিস বাপ ফালতু?
খাতির করে সিগ্রেট দিয়ে ফালতু বলল_ভাল আছি শম্ভুকাকা। তুমি ভাল তো?
রানীরঘাটের সবচেয়ে বড় আর বুড়ো শিরীষগাছের তলায় ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল শম্ভু মাঝি।_বাপ ফালতু রে!
_বলো কাকা_
শম্ভু মাঝি হঠাৎ গামছার খুঁটে চোখ মুছে বলল_জোয়ান হয়েছ। বড় হয়েছ। ভাল রোজগারপাতি করছ।
_তা করছি কাকা_ফালতু অকৃতজ্ঞ নয়। রানীরঘাটের এসব লোকই তাকে মানুষ করেছে, সে জানে। সবাইকে শ্রদ্ধাভক্তি করে চলে।
_এবারে বিয়েটিয়ে করে ফেলো বাপ। আর কদিন আছি? ঘাটও তো উঠে যাচ্ছে। তোমার বিয়েটা দেখেই যাই।
ফালতু হাসল।_আমাকে কে মেয়ে দেবে শম্ভুকাকা?
বুড়ো ঘাটমাঝি তার গায়ে হাত বুলোতে থাকল। লগিধরা কড়াপড়া হাত। লোলচর্ম বাহু। গোঁফ ছাপিয়ে জল ঝরছে। কী স্নেহে কোন মায়ায় কাঁদে এতদিন বাদে, কে বলতে পারে সে গুহ্য কথা?
_যদি ইচ্ছে করো, জগাইকে বলি। লজ্জা করে কী হবে? ঘাটে তো সবাই জেনেছে, তোমাদের বড্ড মনামনি ভাব। বুড়ো ঘাটমাঝি ফ্যাঁচ করে নাকই ঝেড়ে ফেলল, এমন আবেগ এসেছে!
ফালতু হো হো করে হেসে উঠল।_ধ্যাৎ! আমাকে কেন মেয়ে দেবে? কাকার আবার কথা।
শম্ভু গম্ভীর হয়ে বলল_দেবে। দিয়ে বর্তে যাবে। আমরা ঘাটসুদ্ধু গিয়ে ধরব। ঘাটোয়ারিজী বলেছেন, সবাই মিলে ফালতুর বিয়ে দেব। খরচ যা লাগে তিন ভাগ ওনার। খুব ধুমধাম হবে বইকি।...
সেদিনই একটু রাত গড়ালে চৌবেজীর গতিতে সভা বসেছে। পুরনো লোকেরা সবাই এলো। জগন্নাথকেও ডাকা হল। সে-বেচারা কিছুই জানে না। দু হাত দু পাশে ছড়িয়ে শকুনের ডানার মতো ঝটপট করতে করতে কুঁজো হয়ে এলো। এসেই অবাক। তার খাতিরটা বড্ড বেশি করা হচ্ছে। ধরাধরি করে তাকে উঁচু গদিতে উঠিয়ে দিল লোকেরা। মদন কন্ডাক্টার এখন চুলপাকার দলে। ফালতুর ব্যাপারে সেই বরাবর লিড নিয়েছে। এবারও নিল। চৌবেজীর দিকে তাকিয়ে বলল_তাহলে কথাটা উঠুক ঘাটোয়ারিজী। সবাই সায় দিয়ে বলল_হ্যাঁ, হ্যাঁ। চৌবেজী বললেন_জরুর।
মদন শুরু করল। ফালতুর মা সুরিক্ষেপী থেকেই শুরু করল। ফালতুকে মানুষ করার ইতিবৃত্ত, ফালতুর চালচলন, ইসমাইল ড্রাইভারের স্নেহ (আহা, এখন সে বেঁচে থাকলে কত খুশি হত, এবং কয়েকটি জিভের চুকচুক শব্দ, মাথা নাড়িয়ে দুঃখ প্রকাশ), খুঁটিনাটি ঘটনা, অশ্বিনী দারোগার আহ্বান (খুব হাসির রোল পড়ে গেল এইতে), ফালতুর দুষ্টুমি_আধঘণ্টারও বেশি। তার সঙ্গে রানীরঘাটেরও নানা ঘটনা জুড়ে দেওয়া হল চারপাশ থেকে। ব্রিজও এলো। রানীরঘাটের অনিবার্য মৃত্যুর প্রসঙ্গও উঠল। (দীর্ঘশ্বাস ও নীরবতা) তারপর জগন্নাথের দিদি_যাকে সবাই বলত ময়রামাসি, তার কথা_এ পাপে রানীরঘাট একদিন ভেসে যাবে। তাই যাচ্ছে। আগের দিনের মানুষেরা যা বলত, ফলে যেত।
এই সময় চৌবেজী মানুষের লোভকেই দায়ী করলেন। তুলসীদাস আওড়ে বললেন_'সেবক সুখ চহ মান ভিখারী/ব্যসনী ধন সুভ গতি বিভিচারী/লোভী জনু চহ চার গুমানী/নভ দুহি দুধ দহত এ প্রাণী।' মানুষ আকাশ দুহে দুধ চায়। হায় রে লোভ!
জগন্নাথ খুব মাথা নাড়ল। মদন কন্ডাক্টার বলল_তো কথা হচ্ছে, ময়রা মাসির কাছে শোনা কথা, (স্রেফ মিথ্যে কিন্তু) সুরিক্ষেপী মাসির আগের চেনাজানা ছিল। মাসির স্বজাতিরই মেয়ে। স্বামীর অত্যাচারে...
এ পর্যন্ত শুনেই জগন্নাথ জোরে মাথা নেড়ে বলল_না! না!
শম্ভু মাঝি একটু তফাতে মাটিতে বসে ছিল। বলল_আহা, বলতেই দাও জগাইদা!
মদন একটু হেসে বলল_মাসি আমাকে বলেছিল। সত্যমিথ্যে সেই জানত। আমি যা শুনেছি বলছি। আর স্বজাতি না হলে অমন সেবাযত্ন করত? বলুন সবাই! না কি ঘাটোয়ারিজী, বলুন?
সবাই শোরগোল তুলে বলল_ঠিক ঠিক। বেজাত হলে অমন করবে কেন?
জগন্নাথ গতিক বুঝে গুম হয়ে বলল_হলেও হতে পারে তাহলে।
মদন বলল_আমরা রানীরঘাটওয়ালারা ছেলেটাকে মানুষ করেছি। এখন লায়েক হয়েছে। ভাল কামাচ্ছে। লাইনের নামকরা ড্রাইভার। না হয় লেখাপড়াটাই ভুল করে আমরা শেখাইনি। তাতে কী? যে বিদ্যে ধরেছে, তাই বা মন্দ কী! বইপড়াও বিদ্যা, গাড়ি চালানোও বিদ্যা।
সবাই সায় দিয়ে বললে_একশোবার একশোবার!
মদন বলল_এখন তাহলে ওর একটা বিয়ে দেওয়া দরকার। ওর মা-বাবা নেই তো কী হয়েছে। আমরাই ওর মা-বাবা। আমরাই ওর বিয়ে দেব। চৌবেজী, আপনাকে তিন ভাগ খরচ দিতে হবে। বাকি এক ভাগ আমরা দেব। কী বলো জগাইদা?
আগে থেকে সব সাজানো ব্যাপার। জগন্নাথ না জেনে বলল_নিশ্চয় দেব।
এবার মদন আচমকা পর্দা তুলল।_ফালতুর স্বজাতের কনে রানীরঘাটেই আছে_উপযুক্ত কনে।... মদন চাপা হেসে বলল, না কী চৌবেজী?
_জরুর।
মদন গলা ঝেড়ে বলল_আমরা সবাই জানি। সকালসন্ধ্যে দেখছি ওদের দুটিতে খুব ভাব-ভালবাসা। আমরা এখন বাকিটুকু ছেড়ে দিলুম কনের বাপের হাতে।... বলেই সে চতুর হেসে জগন্নাথের কাঁধে ডান হাতটা রেখে সহাস্যে বলে উঠল_বলো জগাইদা।
আর যায় কোথায়? কুঁজো বুড়ো নড়বড় করে প্রায় ঝাঁপ দিল নীচে। তোবড়ানো মুখখানা যতটা পারে ভয়ঙ্কর করে চেরা গলায় চেঁচিয়ে উঠল_ন্না। আবার ডানা ঝটপট করে গদির দিকে ঘুরে গর্জন করল_না! কক্ষনো না!
শোরগোল শুরু হল। সবাই ওকে বোঝাতে চায়। জগন্নাথের চারদিকে ঘিরে দাঁড়ায়। কাকুতিমিনতি কতরকম। সাধ্যসাধনা। জগন্নাথ দু হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে মাথাটা দুপাশে জোরে দোলাতে দোলাতে বলল_না না না! না না না! না না না...
বুড়ো মানুষ অমন করে কাঁদলে বড্ড খারাপ লাগে। যেন জবাই করা হচ্ছে ওকে। অদ্ভুত লোক তো! দেখব কী দিয়ে বর জোটে মেয়ের।...
তখনও ফরাক্কার ফিডার ক্যানেল খোঁড়া হয়নি। বসন্তের শুরুতেই ভাগীরথীর জল শুকিয়ে যেত। জ্যোৎস্নারাতে বালির চড়ায় বসে যুবক-যুবতীদের চমৎকার প্রেম জমত। ওপারে শহরে বিদ্যুৎ, এপারে রানীরঘাটে বিদ্যুৎ_ভাগীরথীর গর্ভে সে আলো পেঁৗছয় না। জ্যোৎস্নাটা ভালই খেলে। রানীরঘাটের নীচে অবশ্যি কিছুটা দহ। দক্ষিণে শ্মশানের ওদিকটায় প্রায় সবই শুকনো, একখানে সেই মাথা কুটতে থাকা জল ঝিলমিল করে বয়ে যায়। ফুরফুরে বাতাসে গা শিরশির করে। দুটিতে বসে অনুচ্চ স্বরে কথা বলছিল।
_ঘাটের কিসের মিটিং ডেকেছে। গেলে না যে?
_আমাকে ডাকেইনি।
_ডাকবে আবার কী? তুমি ঘাটের লোক নও?
_নাঃ। আমি ফালতু।
_শোনো, তুমি এবারে একটা নাম নাও। ভাল নাম।
_তুমিই দাও না একটা নাম।
_নেবে?
_হুঁউ।
_আগে জানলে ওই গুনতিবাবুদের কাছে...আচ্ছা, ওরা আর লোক গুনতে আসবে না?
_কে জানে! কী নাম দিচ্ছ, দাও আগে।
_দিচ্ছি। নতুন বাসমোটর কবে আসবে তোমার?
_ব্রিজ খুলুক। কেন?
_প্রথম_একেবারে প্রথম পেসেঞ্জার আমি। ভাড়া দেব না কিন্তু। চাপাবে?
_হুঁউ।
_তখন থাকবে কোথায়?
_ওপারে নতুন আপিস হচ্ছে না? সেখানে। আমার থাকার ঘরও হচ্ছে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। একটু পরে আবার_বাবা ওখানে জায়গাই পেল না। লক্ষ্মণ দাদামশাইকে বলতে বলেছিল বাবা। বলেছি তো। সে কথা নেই, শুধু দেখলেই ফক্কুড়ি করে। তুমি বলবে একবার?
_বড় মুখ করে বললে যখন, বলব।
আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর_গুনতিবাবুদের কাছে তুমি বাবার নাম বললে না। আমার খুব খারাপ লাগছিল, জানো? যা হোক একটা বললেই পারতে। কী ভাবল ওরা?
_কী ভাববে? বয়ে গেল।
_যাঃ! বাবা না থাকলে চলে? বাবা না থাকলে...
_কী?
_আমার লজ্জা করছে। তুমি হয়তো রেগে কাঁই হয়ে যাবে।
_না, না। বলোই না।
_থাক। তোমার বাবার কথা জানতে ইচ্ছে করে না?
জোরে মাথা দোলাল এবং জ্যোৎস্নামাখা বালিতে আঁচড়া কাটতে থাকল প্রেমিক যুবক। গায়ে ছায়া ফেলে উড়ে গেল একঝাঁক রাতের পাখি। শ্মশানের বাঁশবনে শেয়াল ডেকে উঠল। তার একটু পরে কী একটা শব্দ হল কোথায়। তারপর প্রেমিকা তরুণী উঠে দাঁড়াল ঝটপট। অস্ফুট স্বরে বলল_কে যেন আসছে। আমি যাচ্ছি। এদিকেই আসছে যেন। যাচ্ছি!
ডানা থাকলে উড়ে যেত এভাবে চলে গেল, যেন পা বালি ছোঁয় না। নিঃশব্দে। ফালতু উঠল একটু পরে। সিগারেট ধরাল। আলো দেখেই আওয়াজ এলো_কে ওখানে?
ফালতু লম্বা পায়ে এগিয়ে গিয়ে বলল_জগাইকাকা নাকি? আমি ফালতু।
_টুকটুকি কই? হাঁড়ির ভেতর থেকে জগন্নাথ কথা বলল যেন।
একটু দ্বিধা হল। তারপর সেটুকু ঝেড়ে ফেলে বলল_কী হয়েছে জগাইকাকা?
জগন্নাথ একটা অদ্ভুত ব্যবহার করল। সে খপ করে ফালতুর হাত দুটো ধরে ফেলল। তারপর মরণকালের ঘড়ঘড় শ্বাসকষ্টের আওয়াজ তুলে বলে উঠল_ফালতু বাবা! তোর হাত দুটো ধরে বলছি রে, এ নিশুতি কাল। মা গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে বলছি। ঘাটওয়ালারা ষড়যন্ত্র করেছে, জোর করে তোর সঙ্গে আমার টুকটুকির বিয়ে দেবে। ফালতু রে! আবার বলছি, মা গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে আছি_ওরে, তোরা ভাইবোন রে! আমি মহা পাপী রে! টুকটুকি আর তুই ভাইবোন_তোদের বিয়ে হয় না রে...
এক ঝটকায় ফালতু হাত ছাড়িয়ে নিল।
_আমি বলছি বাবা। নিচে মা গঙ্গা, আমি বলছি, আমার পাপের কথা।
ফালতু হুংকার দিতে গিয়ে সামলে নিল। সে জানে, সে দুঃখী। লোকের করুণায় বেঁচেছিল। জোর দেখাতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে যায়। অমনি চুপসে যায়। আস্তে বলল_হতে পারে তুমি লম্পট। হতে পারে বইকি। আমার মা আটচালায় থাকত আর তোমরা রানীরঘাটওয়ালারা... থাক সে কথা। এখন বয়েস হয়েছে তো। বুঝতে পারি সব। কেন আমাকে মানুষ করা, সবই বুঝি।
জগন্নাথ ফ্যাঁচ করে নাক ঝেড়ে পাছায় হাত মোছে। ক্র্যাঁও ক্র্যাঁও করে কুডাক ডাকতে ডাকতে একটা পেঁচা উড়ে যায় শ্মশানের পাশে শিমুলগাছটার দিকে। কোত্থেকে একটা সাদা কুকুর এসে একটু দূরে দাঁড়িয়ে একবার কেঁউ করে ডেকেই চুপ করে যায়। লেজ নাড়ে। জ্যোৎস্নায় নিজের ছায়া শোঁকে একবার।
ফালতু আবার বলতে থাকে_আজ পারুলিয়ার নতুন রুটে গাড়ি খারাপ হয়েছিল। মিস্ত্রি ডাকতে পাঠালুম। মাথায় টুপিপরা, সাদা দাড়ি মুখে, এক মুসলমান হাজিসায়েব এলো। চিনলেও চিনবে। ইব্রাহিম হাজি নাম বলল।
ভাঙা গলায় জগন্নাথ বলে_হ্যাঁ। ডাকাত ছিল। পরে তীর্থ করে হাজি হয়েছে। খুব চিনি বাবা, কে না চেনে। খুনের মামলায় জেল হয়েছিল যাবজ্জীবন। তাও জানি।
_কথায়-কথায় বলল, ঘাটে এক পাগলী থাকত_সে বেঁচে আছে, না মারা গেছে? বললুম, মারা গেছে। আমি তারই ছেলে। শুনেই লোকটা আমাকে জড়িয়ে ধরল। তুমি, তারই ছেলে বাবা? আমি তো অবাক। এমন কেন করছে লোকটা? তারপর কিছুতেই আসতে দেবে না। প্যাসেঞ্জার আছে গাড়িভর্তি। শোনে না। মিষ্টির দোকানে নিয়ে গেল। বলে_আমার ব্যাটাকে পেট ভরে রসগোল্লা খাইয়ে দাও। আমার কেমন যেন লাগল। আমি খেতে পারলুম না। সে আমাকে ছাড়বে না। জড়িয়ে ধরে টানাটানি। বলে, আশ্বিন মাসে ঝড়জলের রাতে...
এ পর্যন্ত শুনেই জগন্নাথ বলল_হ্যাঁ, হ্যাঁ। রাতটুকু ওপারে মোক্তারবাবুর বাড়িতে লুকিয়ে থেকে পরদিন আদালতে হাজির হত। অত রাতে তখন খেয়া বন্ধ। শম্ভু গাঁজা খেয়ে মড়া। এদিকে ঝড়জল। ইব্রাহিম আমাকে জায়গা চাইল। খুনী ফেরারকে জেনেশুনে জায়গা দিতে পারলুম না। বললুম, আটচালায় গিয়ে থাকো বরং।
ফালতু সিগারেট ছুঁড়ে ফেলল জোরে। সাদা কুকুরটা দৌড়ে গিয়ে শুঁকল এবং ছ্যাঁকা খেয়ে ফোঁৎ ফোঁৎ করে নাক ঝাড়তে থাকল।_এতকাল পরে ওর খেয়াল হল সুরিক্ষেপীর কথা। ফালতু দম-আটকানো গলায় বলে উঠল।_ওই ছাতুখোর ঘাটোয়ারি। ওই মাতাল মদন কন্ডাক্টার! আবার দেখি জগাইকাকা তুমি! তুমি আরও এককাঠি সরেস। কী না টুকটুকি আর আমি ভাইবোন। এবার ফালতু গর্জন কিংবা হাহাকার করে উঠল।_কী বাবা দেখাচ্ছো আমাকে সবাই মিলে। রানীরঘাটের মড়াখেকো শেয়ালকুকুরগুলো ফালতুকে বাবা দেখাচ্ছে। আমার বাবার দরকার নেই। হুঁ, বাবা দেখাচ্ছে শালারা! আরে, আমার হাতে যে স্টিয়ারিং ধরে দিয়েছে, সেই আমার বাবা।...
ময়রা মাসি বলেছিল_এ মহাপাপ সইবে না। রানীরঘাট ভেসে যাবে। শেষ অবধি তাই ফলে গেছে। এখন ভাগীরথীর ওপর বিশাল ব্রিজ হয়েছে। ফরাক্কার ফিডার খাল থেকে জল আসছে। বারো মাস নদী কূলে-কূলে ভরা। সেই কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ কাজল-জল আর নেই। শ্যাওলায় গা ঘষে বেড়ানো রূপসী মৌরালার ঝাঁকও আর দেখা যায় না। রোদে-জ্যোৎস্নায় বুকের তলার রুপোলি বালুকণাও আর অলীক মুক্তোর ঝিলিক দেয় না। চৌবেজীর গদি, আটচালা, জগন্নাথের অন্নপূর্ণা টি স্টল জুড়ে আকন্দ সাঁইবাবলা কালকাসুন্দে আর বনতুলসীর জঙ্গল। সুরিক্ষেপীর 'থানে', বাসস্ট্যান্ডের চত্বরে, হরেকরঙা গাঁদা ফুলের ঝাড়। এক সাধু এসে আশ্রম খুলেছেন। পিচের রাস্তায় কবে কারা ধানচাষ করেই ফেলবে। বিদ্যুতের শালকাঠের খুঁটি যে যা পেরেছে উপড়ে নিয়ে গেছে। শুধু ঘাট আর শ্মশানের মাঝামাঝি জায়গায় সেই রাহুচণ্ডাল শিমুলটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এখনও মাঘ মাসে সে মাথায় লাল পট্টি জড়াতে ভুল করে না।...
ওই একটু দূরে ষাট সত্তর ফুট উঁচু পুলের ওপর দিয়ে ঝকঝকে এক রুপোলি বাস যাচ্ছে পুরন্দরপুর মনসুরগঞ্জো বিনোটি মহিমাপুর। ড্রাইভারটি মধ্যবয়সী। সারা পথ দুধারে যত গ্রাম আছে, যত মানুষ আছে, সবার কাছে তার মোটরগাড়ি সময় জানিয়ে দেয়। ক্ষেতের মুনিশ বলে ওঠে, ফালতুর গাড়ি গেল। নাস্তা এলো কই? স্ল্যাবে ধান শুকোতে দেওয়া চাষী বউ, ঘুটেকুড়ুনী মেয়েটা, খুঁটি ও দুরমুশ হাত গাইগরু বাঁধতে আসা বুড়ী_কার সঙ্গে না কথা বলে যাবে সে। গাড়ির গতি কমিয়ে বলে যাবে_বোনটি ভাল আছে তো? ও বুড়ীমা, কাল দেখিনি কেন? ও বউঠান, মাছ রেখো তো চাট্টিখানি_ফেরার সময় নিয়ে যাবো। ওরা বলবে_ফালতুদার খবর ভাল তো? বাবা ফালতু, দুটো মাথাধরার বড়ি এনে দিস বাবা, আমার সোনার বাবা! বিনোটির মাস্টারমশাই স্কুল থেকে দৌড়ে বেরিয়ে বলবেন_ফালতু। প্রেসক্রিপশানটা নিয়ে যা বাবা! এই নে টাকা। বেশি লাগলে দিস, দোব'খন।
ফালতু এখনো ফালতু নামেই থেকে গেছে। যে তাকে নতুন নাম দিতে চেয়েছিল, রানীরঘাটের জগন্নাথের মেয়েটা, তার মতো নির্বোধ আর কেই বা ছিল। বাপ যেই না বলা, তোরা ভাইবোন_হতভাগী আপন দাদার সঙ্গে জ্যোৎস্না রাতে মা গঙ্গার বুকে শুয়েছে, এই তীব্র পাপবোধে মাথার ঠিক রাখতে পারেনি। বিষাক্ত করবী-ফল, কেউ বলে ধুতরো, শিলে বেঁটে গিলে ফেলেছিল। বাপ কোন মতলবে কী বলছে, বুঝবি তো তলিয়ে।
এই সব কথা ভাবতে ভাবতেই ফালতুর রাগ হয়। স্পিড বাড়ায়। পৃথিবীকে চাকার তলায় মাড়িয়ে শোধ নেয়।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1338)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
-
▼
2012
(33842)
-
▼
November
(2002)
-
▼
Nov 08
(126)
- ব্যাংক নোটে ম্যান্ডেলা
- চীনে কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস শুরু আজ
- জারদারির মামলা চালু করতে সুইস কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ
- কেমন হবে ওবামার বৈশ্বিক নীতি?
- ‘আরও চারটি বছর’
- আওয়ামী লীগ নেতার কাণ্ড- ঠিকাদার ভেবে কিল-ঘুষি, পরে...
- রংপুর সিটি নির্বাচন: মশিউরকে এরশাদের সমর্থন- অন্য ...
- মাদক বিক্রির প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় রিকশাচালককে হ...
- মাদকবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে প্রথম আলো
- অর্থ ও আসবাব আত্মসাতের মামলা- সাবেক স্পিকার জমির উ...
- রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানাতে কাল ঢাকায় আসছেন হিনা
- সামাজিক ব্যবসা সম্মেলন শুরু হচ্ছে আজ by আসজাদুল ...
- ৭ নভেম্বরে বিএনপির আশাবাদ- ‘গণবিরোধী’ সরকারের বিরু...
- শিক্ষা বিভাগ- এসিআর ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন জরুরি b...
- মূল্যায়ন- ওবামা: আশার সংগ্রাম এখনো চলছে by বার্ন...
- সরেজমিন- ওবামার এই স্বপ্ন পূরণ হোক by মিজানুর রহ...
- কী শিক্ষা দিয়ে গেল আমাদের?- মুঠোফোনের গান ও ট্রেনে...
- বিশ্বময় শান্তি ও উন্নয়ন সাধিত হোক- অভিনন্দন, বারাক...
- চারদিক- ফিরে যাই শৈশবে by ফারুখ আহমেদ
- কৃষি- সোনালি ফসলের পাশে কৃষকের মুখ by তুহিন ওয়াদুদ
- ফিরে দেখা পঁচাত্তর- আগস্ট থেকে নভেম্বরের রক্তাক্ত ...
- জাতিসংঘ পার্কে বসাই দায় by ফারজানা আকতার
- আনোয়ারা আওয়ামী লীগের কী হবে by মোহাম্মদ মোরশেদ হ...
- শোক- সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মদ শামসুল হক
- ছাতিম ফুলের সুবাস by আহামেদ মুনির
- কালুরঘাট সেতু- ফেরির কষ্ট আরও এক মাস by মিঠুন চৌ...
- প্রথম সমকামী সিনেটর ট্যামি
- 'ফোর মোর ইয়ারস' by রাজীবুল হক
- কয়েক রাজ্যে ভোট নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ by তানজিমুল নয়ন
- ওবামার কাছে জনগণ চায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা by যিশু ম...
- ওবামার দিকে তাকিয়ে বিশ্ব by শামসুন নাহার
- 'আমি ভোট দিয়েছি' by শরীফুল ইসলাম শরীফ
- সবিশেষ-সর্বাধিক নারী সিনেটর
- অজানা
- জয়োৎসবের আগে ঝড়ের সতর্কবার্তা
- জো বাইডেন ২০১৬-তেও থাকবেন!
- সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ by রিয়াজ মিলটন
- ড্যান ডাব্লিউ মজিনা বললেন-যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ ...
- ওবামাকে ভোট দিলেন ১০৬ বছরের হিন্টন
- নাতির বিজয়ে আপ্লুত দাদি by সোহানা তুলি
- ঢাকায়ও জয়ী ওবামা
- সেই ওহাইয়োতে জিতেই ওবামা প্রেসিডেন্ট
- এবার তরুণ ভোটার বেশি by মোস্তফা রাসেল
- প্রতিক্রিয়া-গওহর রিজভীর মন্তব্য-ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্প...
- প্রতীকী ভোট দেখতে গিয়ে দুই নেতার তর্ক
- অল্প স্বল্প গল্প
- হলিউড- হলিউডে নির্বাচনী উত্তাপ
- জয়তী ও তাঁর গান by মেহেদী মাসুদ
- বলিউডআলিয়া, বরুণ, সিদ্ধার্থ- ত্রয়ীর জয়
- এটি একটি ব্যতিক্রমী উৎসব by আবুল খায়ের
- হোয়াইট হাউসের পুতুল হয়ে থাকবেন না তো?
- পরিবর্তন প্রয়োজন রিপাবলিকানদের
- গণভোটে সমলিঙ্গ বিয়ে মারিজুয়ানার অনুমোদন by ফৌজিয়া...
- তবুও আমাদের নীতি টিকে থাকবে : রমনি by হাসান ইমাম বাবু
- এত কিছুর পরও কেন হারলেন by খন্দকার মোজাম্মেল হক
- ড. ইউনূস ইস্যুতে মতদ্বৈধ কমবে by ড. দেলোয়ার হোসেন
- সাক্ষাৎকার-অর্থনীতিকে টেনে তুলেছেন ওবামা by সি এম ...
- কংগ্রেস ও গভর্নর নির্বাচন-পাল্টাল না সমীকরণ by তাম...
- সেরাটা এখনো বাকি-জয়ের পর শিকাগোয় নির্বাচনী সদর দপ্...
- যেভাবে বিজয় by আসাদুর রহমান
- আস্থায় প্রত্যাশায় ওবামা by সফেদ ফরাজী
- চোখ by হুমায়ূন আহমেদ
- আত্মজা ও একটি করবী গাছ by হাসান আজিজুল হক
- কবি by সৈয়দ শামসুল হক
- রানীরঘাটের বৃত্তান্ত by সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
- পাদটীকা by সৈয়দ মুজতবা আলী
- ডিডেলাসের ঘুড়ি by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
- সুখের পিঠে সুখ by সেলিনা হোসেন
- রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও by সুশান্ত মজুমদার
- অযান্ত্রিক by সুবোধ ঘোষ
- বীর মুক্তিযোদ্ধা- তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না
- আদালত অবমাননার অভিযোগ- সাজেদা ও মতিয়ার বিষয়ে আদেশ ...
- সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাত্রা- আবারও সাগরে ট্রলারডুবি...
- নদীতীরে by সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
- নয়ান ঢুলি by সরদার জয়েনউদ্দীন
- সরেজমিন- স্কুল চলছে, ভোটও চলছে by মিজানুর রহমান খান
- ওবামা কেন জিতলেন, কীভাবে জিতলেন by আলী রীয়াজ
- নকুলার এক বছরের কারাদণ্ড
- ৫০০ বিঘা জমির জাল দলিল by রোজিনা ইসলাম ও মাসুদ রানা
- হোয়াইট হাউসে ফিরেছেন ওবামা
- আত্মজ by সুচিত্রা ভট্টাচার্য
- বড় পাপ হে by সমরেশ মজুমদার
- কে নেবে মোরে by সমরেশ বসু
- ক্লাস ফ্রেন্ড by সত্যজিৎ রায়
- ক্লাস ফ্রেন্ড by সত্যজিৎ রায়
- গণনায়ক by সতীনাথ ভাদুড়ী
- শ্বেতপাথরের টেবিল by সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
- চন্দনেশ্বরের মাচানতলায় by শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
- মুনিয়ার চারদিক by শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
- কালান্তক লাল ফিতা by শিবরাম চক্রবর্তী
- শান্তিকামী মানুষের স্বস্তি by জাহিদুল ইসলাম সরকার
- এ নির্বাচন একটি মডেল by বেলাল হোসাইন রাহাত
- বিশ্বের মন জয় করবেন ওবামা by মাসুদ ফরহান অভি
- দ্বিতীয়বার সুযোগ পেলেন বারাক ওবামা by তানিম ইশতিয়াক
- বৃহতের সাধনা by সুভাষ সাহা
- জীবন-সার্থকতা মৃত্যুর সৌন্দর্যে by রণজিৎ বিশ্বাস
- সমকালীন চিন্তা-'কে সেই তৃতীয়, যে চলে তোমাদের সাথে?...
- বাঘহত্যা-নির্মমতার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হোক
- অভিনন্দন ওবামা-ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক নিবিড় হোক
- জিব্রাইলের ডানা by শাহেদ আলী
- কোথায় পাব তারে by শহীদুল জহির
- মহেশ by শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী by শওকত ওসমান
- কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ by শওকত আলী
- ইজ্জত by রিজিয়া রহমান
- চুড়ি by রাহাত খান
- সূর্য ওঠার আগে by রাবেয়া খাতুন
- আবারও চিনির দাম বৃদ্ধি-চিনি শিল্পের উন্নয়নে পদক্ষে...
- অভিনন্দন বারাক ওবামা-দৃঢ় হোক বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক
- পবিত্র কোরআনের আলো-ফিরআউন সময় থাকতে সত্যকে স্বীকার...
- চার দশকের পরিবর্তিত মানসিকতা by ওয়াহিদ নবি
- প্রতিক্রিয়া : হুমায়ুন কবির-ওবামার সংস্কার কর্মসূচি...
- চরাচর-সিলেটের সাতকড়া by ইয়াহইয়া ফজল
- কয়লানীতি, বিশেষজ্ঞ কমিটি ও বাস্তবতা by হাসান কামরুল
- ফতোয়া ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা by ড. নিয়াজ আহম্মেদ
- বহে কাল নিরবধি-অবরোধ কি ইরানকে কোনো 'পরিবর্তনে' বা...
- ‘বাংলাদেশ ইমম্যাচিওরড, যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচিওরড’ by ...
- মেহজাবিনের বিজ্ঞাপনী চমক by সাইফ চন্দন
- এবার সিডিতে ‘এক জীবন-২’ এর মিউজিক ভিডিও
- কারা থাকছেন আর্থিক খাত সংস্কার কমিশনে by সাইদ আরমান
- প্রেম-প্রতারণা- ‘মরে গেলাম ভাল থেকো’
- কাটরিনার ইচ্ছা
- তারা আসছেন তবে... by মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন
- মেগা নিয়ে ফিরছেন বাঁধন by কামরুজ্জামান মিলু
- ক্যামেরুন ডায়াসের সৌন্দর্যের রহস্য!
- বারাক ওবামার বিজয়ে মার্কিন তারকাদের উচ্ছ্বাস
-
▼
Nov 08
(126)
-
▼
November
(2002)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
ইরান
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
কালবেলা
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
ইউক্রেন
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
তরুণ প্রজন্ম
মানবাধিকার
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আলী যাকের
আইন ও বিচার
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
তারেক শামসুর রেহমান
মালয়েশিয়া
আসিফ নজরুল
নেপাল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
স্বাস্থ্য
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
জ্যোতির্বিজ্ঞান
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
শিল্প ও সাহিত্য
সংবিধান ও রাষ্ট্র
বগুড়া
মিয়ানমার
ঢাকা
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
গবেষণা
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
জীবনযাপন
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
মেহেদী হাসান
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
মানসুরা হোসাইন
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
মসজিদ
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
ইয়েমেন
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
Exclusive
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
উচ্চশিক্ষা
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
বিজ্ঞান
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
জনস্বাস্থ্য
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
ফরিদপুর
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লাতিন আমেরিকা
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মহাকাশচারী
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
জোহরান মামদানি
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
ইহুদি
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
স্পেন
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
বিশ্বকাপ ফুটবল
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment