এপস্টেইন–ঝড়ে স্টারমারের রাজনৈতিক শক্তি নড়বড়ে
আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাজ্যে এখন এপস্টেইন নথি ঘিরে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার ভুক্তভোগীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন স্টারমার। অন্যদিকে ওয়াশিংটনে বিচারের দাবি ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্য আসলে স্টারমারের রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং ট্রাম্পের অসীম ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। এতে পরিষ্কার যে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সক্রিয়, তখন ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে থাকা মার্কিন বিচার বিভাগ এবং রিপাবলিকান–নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস তাঁকে যেকোনো কঠিন তদন্ত থেকে আগলে রাখছে।
তবে সব ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে এপস্টেইন নথির বিশ্বব্যাপী বিস্তার। এর বিষাক্ত থাবা এখন নরওয়ে থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। সাত বছর আগে কারাকক্ষে এপস্টেইনের মৃত্যু হলেও তাঁর তৈরি করা কেলেঙ্কারি এখনো একের পর এক প্রভাবশালীকে মাটিতে নামিয়ে আনছে। এ উত্তাপ কেবল স্টারমার একাই টের পাচ্ছেন না।
টালমাটাল স্টারমার
যুক্তরাষ্ট্রের মতো ‘সব ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার’ বিলাসিতা কিয়ার স্টারমারের নেই। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হয়তো মনে মনে এমনটাই চাইছেন, কিন্তু পরিস্থিতি তার পুরো বিপরীত। বৃহস্পতিবার তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব আক্ষরিক অর্থেই সুতায় ঝুলছিল। নিজের দল লেবার পার্টির এমপিদের বিদ্রোহ এবং একের পর এক সংকটে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট এখন দিশাহারা। সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টেইনের সখ্যের কথা জেনেও কেন তাঁকে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূত করা হলো—বুধবার পার্লামেন্টে এমন প্রশ্নের মুখে পড়েন স্টারমার। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ম্যান্ডেলসন যে এপস্টেইনকে চিনতেন তা আগে থেকেই জানা ছিল, কিন্তু সেই সম্পর্কের গভীরতা আর অন্ধকার দিকগুলো আমাদের কারোরই জানা ছিল না।’
২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় যৌন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পরও ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনকে সমর্থন দিয়ে গেছেন, এমন তথ্য আসার পর গত বছরই তাঁকে বরখাস্ত করেছিলেন স্টারমার। কিন্তু এবারের ধাক্কাটা আরও গুরুতর।
নতুন ফাঁস হওয়া নথি বলছে, ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার চরম মুহূর্তে ম্যান্ডেলসন রাষ্ট্রীয় গোপন এবং বাজার নিয়ন্ত্রণকারী তথ্য এপস্টেইনকে পাচার করেছিলেন। ওয়াল স্ট্রিটের চতুর বিনিয়োগকারীদের কাছে এই তথ্যের মূল্য ছিল অকল্পনীয়। এই অভিযোগ সামনে আসার পর ম্যান্ডেলসন হাউস অব লর্ডস এবং লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন। এখন তাঁর বিরুদ্ধে চলছে ফৌজদারি তদন্ত।
যুক্তরাজ্যে নাটকীয়তা
প্রশ্ন হলো, যে নথিপত্র ওয়াশিংটনে প্রকাশিত হলো, তার ধাক্কায় লন্ডন কেন বেশি টালমাটাল? এর কারণ হলো, যুক্তরাজ্যে এই ঝড় শুধু এপস্টেইনকে নিয়ে নয়; বরং এটি যুক্তরাজ্যের রাজনীতির তিনটি নাটকীয়তাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। একটি হচ্ছে, নিরঙ্কুশ জয়ের দুই বছর না যেতেই প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সময় যেন ফুরিয়ে আসছে। গত বুধবার পার্লামেন্টে তাঁর ‘অসহায়’ আত্মসমর্পণ লেবার পার্টির ভেতরেই তাঁর নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ নিয়ে গুঞ্জন বাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্টদের মেয়াদ যেমন নির্দিষ্ট, ডাউনিং স্ট্রিটে তেমন নয়। সেখানে প্রবেশের দিন থেকেই শুরু হয় ‘কত দিন টিকবেন’ সেই হিসাব। গত ১১ বছরে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী বদলানো যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার এক চরম উদাহরণ।
যাকে রাজনীতির ‘প্রিন্স অব ডার্কনেস’ বলা হয়, সেই পিটার ম্যান্ডেলসন নব্বইয়ের দশকে টনি ব্লেয়ারের সঙ্গে মিলে লেবার পার্টিকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। কিন্তু ধনী আর প্রভাবশালীদের সংস্পর্শে থাকার এক দুর্নিবার লোভ তাঁকে বারবার বিতর্কে ফেলেছে। সেই লোভই তাঁকে এপস্টেইনের ‘অভিশপ্ত’ বন্ধুত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, যা এখন তাঁর ক্যারিয়ারের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিল। এপস্টেইন–কাণ্ডে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নাম জড়ানোয় ব্রিটিশ রাজপরিবার এখন অস্তিত্বের সংকটে।
নির্বিকার ট্রাম্প
স্টারমার যখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছেন, ট্রাম্প তখন প্রায় নির্বিকার। যদিও নথিতে তাঁর নাম এসেছে, কিন্তু ওভাল অফিস থেকে তাঁকে টেনে নামানোর মতো কোনো পরিস্থিতি সেখানে নেই।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীকে যেখানে পার্লামেন্টে বিরোধীদের ‘হিংস্র’ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, ট্রাম্পের সামনে তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। উপরন্তু রিপাবলিকান–নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এখন তাঁর হাতের পুতুল। ট্রাম্প মঙ্গলবার ক্লিনটন দম্পতির সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে ‘সহমর্মিতা’ প্রকাশ করেছেন। তবে এটি কোনো সৌজন্য নয়; বরং ট্রাম্প হয়তো বুঝতে পারছেন যে ক্লিনটনদের এই সাক্ষ্যদান শেষ পর্যন্ত এই কেলেঙ্কারিকে এমন এক মোড় দেবে, যা তাঁর নিজের গদি আরও পাকাপোক্ত করবে।
![]() |
| কিয়ার স্টারমার। ফাইল ছবি: রয়টার্স |

No comments