Monday, October 13, 2025
এ–ই যদি হয় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা... by মিশেল এলনার
এ–ই যদি হয় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা... by মিশেল এলনার
মাচাদো আসলে কিসের প্রতীক, তা যাঁরা বোঝেন, তাঁরা জানেন, তাঁর রাজনীতির সঙ্গে ‘শান্তি’ শব্দটির কোনো সম্পর্কই নেই। যদি ২০২৫ সালের ‘শান্তি’ বলতে এটাই বোঝানো হয়, তাহলে বলা যেতে পারে, নোবেল পুরস্কার তার সব বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে।
আমি ভেনেজুয়েলায় জন্মগ্রহণকারী একজন আমেরিকান। আমি খুব ভালো জানি মাচাদো কিসের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি হলেন ওয়াশিংটনের রেজিম চেঞ্জ যন্ত্রের (কোনো দেশের এক সরকারকে ফেলে দিয়ে অন্য সরকারকে বসানোর ব্যবস্থা) হাস্যোজ্জ্বল মুখ। তিনি হলেন নিষেধাজ্ঞা, বেসরকারীকরণ ও বিদেশি হস্তক্ষেপকে ‘গণতন্ত্র’ নামে সাজিয়ে তোলার এক সুশীল কণ্ঠস্বর। মাচাদোর রাজনীতি সহিংসতায় ভরপুর। তিনি প্রকাশ্যে বিদেশি হস্তক্ষেপকে আহ্বান জানিয়েছেন।
এমনকি গাজা ধ্বংসের খলনায়ক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেও তিনি বলেছেন, তিনি যেন বোমা মেরে ভেনেজুয়েলাকে ‘মুক্ত’ করেন। তিনি নিজের দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়েছেন; অথচ তিনি জানেন, অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা নীরব যুদ্ধেরই একটি রূপ।
মাচাদোর জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বিভাজন সৃষ্টি করে, ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ক্ষয় করে এবং জনগণের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার কেড়ে নিয়ে তিনি তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবন কাটিয়েছেন।
মারিয়া কোরিনা মাচাদো ২০০২ সালের সেই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন প্রেসিডেন্টকে অল্প সময়ের জন্য উৎখাত করেছিল। তিনি ‘কারমোনা ডিক্রি’-তে স্বাক্ষর করেছিলেন, যা কিনা রাতারাতি সংবিধান বিলুপ্ত ও সব সরকারি প্রতিষ্ঠান বাতিল করে দিয়েছিল। তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ‘রেজিম চেঞ্জ’কে ন্যায্যতা দিতে কাজ করেছেন। তিনি বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ‘বলপ্রয়োগের মাধ্যমে’ ভেনেজুয়েলাকে ‘মুক্ত’ করা যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী বক্তব্য ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর যে সিদ্ধান্ত ‘মাদকবিরোধী অভিযানের’ নামে এক সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধের ইন্ধন জুগিয়েছে, মাচাদো সেই বক্তব্য ও সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন।
ট্রাম্প যখন ভেনেজুয়েলার সম্পদ জব্দ করছিলেন, মাচাদো তখন ট্রাম্পের স্থানীয় প্রতিনিধি হতে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ট্রাম্পের হাতে তুলে দিতে তৈরি ছিলেন।
মাচাদো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কাজ করেছেন। অথচ তিনি ভালো করেই জানতেন, গরিব, অসুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষদের এর মূল্য দিতে হবে। তিনি সেই তথাকথিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ গঠনে মুখ্য ভূমিকা রাখেন, যা আসলে ওয়াশিংটনের অর্থায়নে পরিচালিত এক পুতুল প্রশাসনের স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট দ্বারা পরিচালিত। দেশে শিশুরা অনাহারে যখন মারা যাচ্ছিল, তখন সেই প্রেসিডেন্ট দেশের সম্পদ লুট করে বাইরে পাচার করছিলেন।
মাচাদো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি জেরুজালেমে ভেনেজুয়েলার দূতাবাস পুনরায় চালু করবেন। অর্থাৎ তিনি সেই একই বর্ণবাদী রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াবেন, যারা ‘আত্মরক্ষা’র কথা বলে হাসপাতালে বোমা মারে। এখন তিনি দেশের তেল, পানি ও অবকাঠামো বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে চান।
যে নব্য–উদার ফর্মুলা নব্বইয়ের দশকে লাতিন আমেরিকাকে দুর্ভোগের পরীক্ষাগারে পরিণত করেছিল, তিনি ঠিক সেই ফর্মুলা অনুসরণ করেন।
২০১৪ সালের ‘লা সালিদা’ নামে যে সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছিল, মাচাদো তার অন্যতম স্থপতি ছিলেন। ওই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারের পতন ঘটানো। বিদেশি সংবাদমাধ্যম এগুলোকে ‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ’ বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে তখন রাস্তা অবরোধ করে, বিভিন্ন স্থাপনা জ্বালিয়ে, শ্রমিকবাহী বাস পুড়িয়ে সহিংস বিক্ষোভ করা হচ্ছিল।
সে সময় কাউকে হুগো চাভেজের অনুসারী মনে হলে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা পর্যন্ত হয়েছে। চিকিৎসক, অ্যাম্বুলেন্স, এমনকি কিউবার চিকিৎসা ব্রিগেডকেও সে সময় আক্রমণ করা হয়েছিল। কেউ কেউ তখন আগুনে পুড়ে মরতে বসেছিল। ধ্বংস করা হয়েছিল সরকারি ভবন, খাদ্যবাহী ট্রাক, স্কুল। পুরো এলাকার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটিয়েছে। আর সেই সময় মাচাদো টেলিভিশনে তাকে ‘প্রতিরোধ’ বলে প্রশংসা করেছেন।
ট্রাম্প যে পদক্ষেপের মাধ্যমে অভিবাসী শিশুদের খাঁচায় আটকে রেখেছিলেন, অনেক পরিবারকে আলাদা করে দিয়েছিলেন এবং ট্রাম্পের যে নীতির কারণে আজ হাজারো ভেনেজুয়েলান মা তাঁদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের খুঁজে ফিরছেন, সেই কুৎসিত উদ্যোগ ও নীতিকে মাচাদো ‘দৃঢ় পদক্ষেপ’ বলে প্রশংসা করেছেন।
এ–ই যদি হয় শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের যোগ্যতা, তবে শান্তি শব্দটা অপমানিত হবে। আসলে মাচাদো শান্তির প্রতীক নন। তিনি আসলে বৈশ্বিক এক জোটের অংশ, যেখানে ফ্যাসিবাদ, জায়নবাদ ও নব্য–উদারনীতি (নিওলিবারালিজম) জড়িত।
এই জোট মুখে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘শান্তি’র কথা বলে, কিন্তু তাদের আসল লক্ষ্য হলো দমন ও আধিপত্য। ভেনেজুয়েলায় এই মতবাদ মানে ছিল অভ্যুত্থান, নিষেধাজ্ঞা ও বেসরকারীকরণ। গাজায় এর মানে হলো গণহত্যা ও জাতিগতভাবে ফিলিস্তিনিদের সত্তাকে মুছে ফেলা। দুই জায়গায় নীতিটা এক। এই নীতির কাছে কিছু জীবন তুচ্ছ; সার্বভৌমত্ব বিক্রিযোগ্য আর সহিংসতাকে ‘শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা’ বলে বিক্রিও করা যায়।
তবে হেনরি কিসিঞ্জার যদি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন, তবে মারিয়া কোরিনা মাচাদো কেন পাবেন না? ‘অধিকার দখলের মধ্যেও সহানুভূতি’ দেখানোর জন্য হয়তো আগামী বছর ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ও এই পুরস্কার পেয়ে যেতে পারে। প্রতিবার যখন এই পুরস্কার কোনো সহিংসতার স্থপতিকে ‘কূটনীতিক’ সাজিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা প্রকৃত শান্তিকর্মীদের মুখে থুতু ছিটানোর মতো মনে হয়।
অথচ প্রকৃত শান্তিকর্মীরা হলেন গাজার ধ্বংসস্তূপে লাশ তোলা চিকিৎসকেরা, জীবন বাজি রেখে সত্য তুলে ধরা সাংবাদিকেরা আর সেই মানবিক ত্রাণকর্মীরা, যাঁরা ফ্লোটিলায় করে শিশুদের জন্য খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দিতে গিয়ে ইসরায়েলি অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু আসল শান্তি কোনো পুরস্কার বা বড় সম্মেলনে তৈরি হয় না। সেই পুরস্কার গড়ে ওঠে অবরোধের সময় মানুষকে খাওয়াতে এগিয়ে আসা নারীদের হাতে, নদী রক্ষায় লড়াই করা আদিবাসীদের ঐক্যে, শ্রমিকদের অবিচল সংগ্রামে আর সেই ভেনেজুয়েলান মায়েদের প্রতিবাদে, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির কারণে হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের ফেরত চান।
এই শান্তি পুরস্কার প্রাপ্য ভেনেজুয়েলা, কিউবা, ফিলিস্তিন ও পুরো বৈশ্বিক দক্ষিণের—যে শান্তি আত্মসমর্পণের নয়, বরং স্বাধীনতা ও মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ায়।
* মিশেল এলনার, কোডপিংক নামের নারী আন্দোলনমূলক একটি শান্তি ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বয়ক
- যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত বামপন্থী ধারার ওয়েবসাইট কমন ড্রিমস থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
| ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1402)
-
▼
2025
(3281)
-
▼
October
(199)
-
▼
Oct 13
(8)
- গাজা যুদ্ধ থামিয়েও ট্রাম্প নোবেল পেলেন না কেন by জ...
- এ–ই যদি হয় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা....
- কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক চিকিৎসক সাফিয়াকে কেন মুক্তি...
- ঘরে ফিরে গাজাবাসী দেখছেন চারদিকে শুধুই ধ্বংসস্তূপ
- ‘ভারত আমাদের হাত বেঁধে, মুখ ঢেকে বন্দীদের মতো করে ...
- জিম্মিরা মুক্ত হওয়ামাত্রই গাজার সুড়ঙ্গগুলো গুঁড়িয়ে...
- ট্রাম্পের সঙ্গে শির বৈঠকের আগে কেন দুর্লভ খনিজ রপ্...
- ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক কেন ছাড়লেন ‘বিস্ম...
-
▼
Oct 13
(8)
-
▼
October
(199)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment