ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর কুকুর লেলিয়েও বর্বরতা চালিয়েছে ইসরায়েলিরা

আল–জাজিরাঃ সম্প্রতি আল-জাজিরা ‘বডিজ অব এভিডেন্স: ইসরায়েলস ডার্কেস্ট ওয়েপন’ নামে একটি অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে। তথ্যচিত্রে ইসরায়েলি কারাগারগুলোয় ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর পদ্ধতিগত ও অমানবিক নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে। বিভিন্ন মেয়াদে কারাবন্দী ছিলেন—এমন কয়েকজন ফিলিস্তিনি সেখানে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁদের প্রায় সবার নির্যাতনের বর্ণনায় বারবার কুকুরের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তথ্যচিত্রটির ভিত্তিতে আল-জাজিরা একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটির কিছুটা সংক্ষিপ্ত বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।

গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নিধন নিজের চোখে দেখেছেন মোহাম্মদ জাকি আল-বাকরি। একসময় তিনি গাজার দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর খান ইউনিসে বসবাস করতেন। তিনি প্রায় ২০ মাস ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী ছিলেন। এ সময়ে তাঁকে ইসরায়েলের পাঁচটি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-বাকরি বলেন, ‘তারা আমাদের কাপড় খুলে নগ্ন করে ফেলেছিল। আমাদের হাতকড়া পরানো ছিল...আমাদের হাত পেছনে বাঁধা ছিল, পা বাঁধা ছিল এবং আমাদের চোখও বেঁধে রাখা হয়েছিল।’

এরপর আল-বাকরি বর্বর ইসরায়েলি সেনারা তাঁর সঙ্গে করা ভয়াবহ সহিংসতার সেই অভিযোগগুলো করেন, যেগুলো ভাষায় বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। আল-জাজিরা সেসব বর্ণনার হুবহু প্রকাশ করতে পারেনি।

আল-বাকরি বলেন, ‘কাপড় খুলে নেওয়ার পর আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল একটি বড় কুকুর দিয়ে।’

সাক্ষাৎকারের অন্য এক অংশে বাকরি আরও বলেন, ‘আমরা সাতজন ওই কুকুরের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম।’

এ ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ কেবল তিনি একাই করেননি। আরও অনেকের কাছ থেকে এমন অভিযোগ এসেছে।

আল-জাজিরার ডকুমেন্টারি (তথ্যচিত্র) দল মাসের পর মাস অনুসন্ধান চালিয়ে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী ছিলেন—এমন ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে এমন সব বর্ণনা সংগ্রহ করেছে, যেখানে কুকুরকে শুধু ভয় দেখানোর উপায় হিসেবে নয়; বরং যৌন হেনস্তার মাধ্যমে অপমান করার প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে।

সেখানে বন্দীদের বিবস্ত্র করা হতো, চোখ বেঁধে দেওয়া হতো, হাতকড়া পরানো হতো, উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে বাধ্য করা হতো, মারধর করা হতো, হুমকি দেওয়া হতো, ভিডিও ধারণ করা হতো এবং তাদের ওপর হামলা চালানো হতো।

আল-জাজিরার নির্মিত অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র ‘বডিজ অব এভিডেন্স: ইসরায়েলস ডার্কেস্ট উইপেন’-এ ইসরায়েলে বন্দী গাজার ফিলিস্তিনি এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসবাস করা ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের নিপীড়নের চিত্র উঠে এসেছে।

ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী গাজার আরেক ফিলিস্তিনি তাঁর নাম প্রকাশ করেননি। তথ্যচিত্র তাঁকে ছদ্মনামে ডাকা হয়। তিনি বলেন, তাঁকে ইসরায়েলের আটটি আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছিলেন।

ওই গাজার বাসিন্দা বর্ণনা করেন, ইসরায়েলের কুখ্যাত সদে তেইমান কারাগারে আটক থাকাকালে একইভাবে পরিকল্পিত পদ্ধতিতে বন্দীদের ওপর কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হতো।

গাজার আরেক ফিলিস্তিনিও বন্দী অবস্থায় কুকুরের হামলার শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।

যৌন নিপীড়নে কুকুর ব্যবহারের বিষয়টি ছাড়াও আরেক সাবেক বন্দী ও অধিকারকর্মী শিরিন (ছদ্মনাম) বারবার বিবস্ত্র করা এবং অপমানজনকভাবে দেহতল্লাশি করার কথা বলেছেন।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিনের বাসিন্দা আদনান হাসানও কিশোর বয়সে বন্দী ছিলেন। তিনি বলেন, তাঁকে গ্রেপ্তারের পর পাঁচ মাস আটকে রাখা হয়েছিল।

জেরুজালেমের বাসিন্দা মায়স আবু ঘোশ কুখ্যাত সদে তেইমান কারাগারে বন্দী ছিলেন। তিনি কারাগারটিকে এমন একটি স্থান হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে অপমান নিত্যদিনের ঘটনা।

তাঁদের এসব সাক্ষ্যে এ ধরনের ঘটনা একটি কারাগারে, একজন কারারক্ষী দ্বারা বা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ওঠে আসেনি; বরং তাঁরা এটিকে বন্দী নিপীড়নের একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

নগ্ন করা, মারধর, ভিডিও ধারণ

ফিলিস্তিনের সরকারি সূত্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে। জাতিসংঘের দেওয়া একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৬৭ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ৮ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি কারাবন্দী হয়েছিলেন।

ফিলিস্তিনিদের জন্য কারাবন্দী থাকা কোনো বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা নয়; বরং এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ক্রমাগতভাবে চলা এক অভিজ্ঞতা। একজন ফিলিস্তিনি নিজের বাড়িতে, কোনো তল্লাশিচৌকিতে, হাসপাতালের ভেতরে, আশ্রয়কেন্দ্রে বা কোনো সামরিক অভিযানের সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন।

এরপর সেই ফিলিস্তিনিকে সেনা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সামরিক আটক কেন্দ্র, পুলিশি হেফাজত, সামরিক আদালত এবং ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস পরিচালিত কারাগারগুলোর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর করা হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে শুধু স্থাপনাগুলোর নাম বদলায়—সদে তেইমান, ওফের, নেগেভ, আশকেলন, জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র, চেকপয়েন্ট ও সামরিক শিবির।

কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতার বিবরণগুলো বারবার একই থাকে, ফিরে ফিরে আসে। একটি নাম হয়ে যায় একটি সংখ্যা—কাপড় খুলে নেওয়া হয়। চোখ বাঁধা হয়। হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না, ঘুমাতে দেওয়া হয় না। কুকুর আনা হয়। বন্দীদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়। অনেককে ধর্ষণ করা হয়।

কেউ কেউ বলেন, নির্যাতনের সময় তাঁদের ভিডিও করা হয়েছে। অনেকেই বলেন, তাঁদের এসব অভিযোগ কোথাও পৌঁছায় না।

আল-বাকরির বেলায়ও কুকুর শুধু ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল, বিষয়টা এমন নয়। তিনি বলেন, ‘এটি হামলারই অংশ ছিল। তারা আমাদের দিকে কুকুর নিয়ে আসে, তারপর লাথি মারতে শুরু করে। তারা আমাদের পেছন থেকে কুকুর দিয়ে আক্রমণ করত…তারা পাগলের মতো কুকুর দিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালাত।’

এই ফিলিস্তিনি তাঁর ওপর নির্যাতনের যে বর্ণনা দিয়েছেন, আল-জাজিরার পক্ষে তার বিস্তারিত প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

কিন্তু তাঁর সাক্ষ্যে একটি ধারা স্পষ্ট—নগ্নতা, বেঁধে রাখা, যৌন সহিংসতা এবং অপমানজনক আচরণের বর্ণনায় বারবার কুকুরের উপস্থিতির কথা উঠে আসা।

আল-বাকরি বলেন, ‘আমরা অক্ষম, আমাদের কিছুই করার ক্ষমতা নেই। তারা হাসছে। আর অবশ্যই তারা আমাদের ভিডিও করেছে।’

দ্বিতীয় আরেক ফিলিস্তিনি জব (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, সেনাদের মুখ থেকে নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুকুরগুলো আক্রমণ শুরু করে। তাঁর কাছে সেগুলোকে কুকুর নয়, মানুষ মনে হয়েছে।

জব বলেন, ‘তারা কুকুরগুলোকে ছেড়ে দেয়। এড়ানোর কোনো উপায় নেই, কুকুর আসবেই। সেগুলো হয় ধর্ষণ করবে, অথবা সেগুলোর মুখে থাকা লোহার দণ্ড দিয়ে আপনার মাথায় আঘাত করবে। সেগুলোকে যে নির্দেশ দেওয়া হবে, সেগুলো ঠিক সেটাই করবে।’

রাষ্ট্রের ভেতরের গোপন বাস্তবতা

সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর যৌন নির্যাতনের বিষয়ে নতুন প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

এসব প্রতিবেদনের পর ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এবং তাঁদের সমর্থক কিছু গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব অভিযোগগুলো অস্বীকার করে এগুলোকে ‘ব্লাড লাইবল’ বা ঐতিহাসিকভাবে মিথ্যা অপবাদ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, বিশেষ করে কুকুর ব্যবহারের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের অভিযোগকে।

কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ও বন্দী নির্যাতন নথিভুক্ত করা সংগঠনগুলোর মতে, এসব অভিযোগ হঠাৎ করে একদিনে তৈরি হয়নি।

অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ তথ্যচিত্রে দেওয়া সক্ষাৎকারে বলেন, ফিলিস্তিনিরা দীর্ঘদিন ধরে ‘কুকুর ব্যবহার করে হামলা চালানো, নির্যাতন করা এবং এমনকি যৌন নির্যাতন করার মতো পরিস্থিতির শিকার হয়ে আসছেন।

আলবানিজ আরও বলেন, ‘এগুলো এমন বাস্তবতা, যা সবাই জানে।’

আলবানিজ বন্দীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নির্যাতনের একটি বিস্তৃত ধারা বর্ণনা করেন। নির্যাতনের নমুনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘রক্তাক্ত হওয়া পর্যন্ত হাত-পা বেঁধে রাখা, মারধর, টেনেহিঁচড়ে নেওয়া, অনাহার, ঠান্ডায় রেখে দেওয়া, চিকিৎসা না দেওয়া, কুকুর দিয়ে আক্রমণ, একাকী কারাবাস, যৌন নির্যাতন, জোর করে পোশাক খুলে ফেলা এবং পরিবারের সদস্যদের ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।’

ফিলিস্তিনি নারী অধিকার সংস্থা উইমেনস সেন্টার ফর লিগ্যাল এইড অ্যান্ড কাউন্সেলিংয়ের (ডব্লিউসিএলএসি) অ্যাডভোকেসি পার্টনার খরাইম বলেন, যৌন হেনস্তা ও হুমকি দেওয়া হয় মানুষকে চুপ করিয়ে রাখতে। সামাজিক কলঙ্কের কারণে পুরুষ ও ছেলেরা অনেক সময় এ নিয়ে কথা বলেন না। নারীরা সামাজিক শাস্তির ভয়ে থাকেন, আর শিশুরা এমন লজ্জা বহন করে, যা প্রকাশ করার মতো ভাষাই তাদের নেই।

সদে তেইমান ও নির্যাতনের রূপকাঠামো

নাকাব/নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত ইসরায়েলি সামরিক আটক কেন্দ্র সদে তেইমান। কুখ্যাত এই আটক কেন্দ্রটি ৭ অক্টোবরের (২০২৩ সালে) পর ইসরায়েলের বন্দী নির্যাতনের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

সেখানে ফিলিস্তিনি বন্দীদের চোখ বেঁধে রাখা, হাত-পা বেঁধে রাখা, চিকিৎসায় অবহেলা, নির্যাতনের অভিযোগ এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ–সম্পর্কিত নানা প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে।

এর আগে সদে তেইমানে পাঁচজন ইসরায়েলি সেনার বিরুদ্ধে এক ফিলিস্তিনি বন্দীর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। ২০২৬ সালের মার্চে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সেসব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়।

ফিলিস্তিনি বন্দীদের ইসরায়েলি বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে। যেমন সামরিক আটকব্যবস্থা, গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদ, পুলিশি হেফাজত, সামরিক আদালত ও নিয়মিত কারাগার।

ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস ও পুলিশ জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন উগ্রবাদী ইহুদি ও বর্বর সব মন্তব্যের জন্য বিতর্কিত ইতামার বেন-গভির।

সদে তেইমানের মতো সামরিক আটক কেন্দ্রগুলো ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কমান্ড কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়।

শিন বেৎ ও ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। আর বিচার মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় আইননীতি, মামলা পরিচালনা এবং সরকারের আইনি প্রতিরক্ষা তদারকি করে। এভাবে দায়িত্বগুলো ছড়িয়ে–ছিটিয়ে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

একজন বন্দীকে হয়তো ইসরায়েলি সেনারা গ্রেপ্তার করেন, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন, কারারক্ষীরা তাঁকে আটক রাখেন, সামরিক আদালতে হাজির করা হয় এবং নাগরিক আইনি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিচার করা হয়।

সে ক্ষেত্রে যদি বন্দীর প্রতি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই দায় অন্য অংশের ওপর চাপাতে পারে। যদিও এ সবকিছুই ইসরায়েলি রাষ্ট্রের আটক ব্যবস্থার অংশ।

এ কারণেই ফিলিস্তিনি মানবাধিকার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রাজি সুরানি বলেছেন, সমস্যা কোনো একটি কারাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

সুরানি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে অপরাধের প্রমাণ আছে। আমাদের কাছে সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে। সদে তেইমানে যা ঘটেছে, তা প্রকৃত বাস্তবতার খুব সামান্য অংশমাত্র।’

যৌন সহিংসতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার

বন্দী থাকা অবস্থায় যৌন সহিংসতার মধ্যে ধর্ষণ, ধর্ষণের হুমকি, জোর করে নগ্ন করা, শরীর তল্লাশি এবং যৌন হেনস্তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইনে পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে এটি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ অথবা জাতিগত নিধন হিসেবে গণ্য হতে পারে।

তথ্যচিত্রে যাঁরা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তাঁদের বর্ণনায় এ ধরনের সহিংসতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ উঠে এসেছে। উত্তর গাজার জব (ছদ্মনাম) বলেন, তাঁকে ইসরায়েলি সেনারা দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছে এবং সেই ঘটনা ভিডিও করা হয়েছে।

জব বলেন, এমনকি একজন নারী সেনা একটি কৃত্রিম যন্ত্র ব্যবহার করে তাঁকে যৌন নির্যাতন করেন, অন্যরা তখন হাততালি দিচ্ছিলেন।

নিরাপত্তার কারণে পরিচয় গোপন রাখা এক নারী বলেন, তাঁকে বারবার জোর করে নগ্ন করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘তারা আমাকে একটি ঘরে নিয়ে যায়। তারা আমাকে পোশাক খুলে ফেলতে বলে।’

এরপর কীভাবে আক্রমণাত্মক ও ভয়াবহভাবে তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল, তিনি তার বর্ণনা দেন। সে সব ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।

আদনান ( ছদ্মনাম) নামের ১৭ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি স্কুলছাত্র বলেছে, সে স্কুলে যাওয়ার পথে ইসরায়েলের একটি সামরিক অভিযানের মধ্যে পড়ে যায়। সেনারা তার দিকে একটি বিস্ফোরক নিক্ষেপ করে। বিস্ফোরণে তার ডান হাত মারাত্মকভাবে জখম হয়, যার কারণে তার হাতে একটা অংশ পরে কেটে ফেলতে হয়।

প্রায় এক সপ্তাহ পরে তখনো সে অসুস্থ। সেই একই সেনাবাহিনী আবার ফিরে এসে তাকে গ্রেপ্তার করে। তাকে পাঁচ মাস আটকে রাখা হয়।

সে জানায়, সে সময় তার শরীরের সংবেদনশীল অংশে মারধর করা হয়েছে এবং বারবার জোর করে নগ্ন করে তল্লাশি করা হয়েছে। তার কেটে ফেলা হাতের ক্ষত তখনো শুকায়নি।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আবু কাবাশ প্রথমে কুকুরের আওয়াজ শুনতে পান। দিনটি ছিল শুক্রবার, রাত প্রায় ১টা, অধিকৃত পশ্চিম তীরের জর্ডান ভ্যালির খিরবেত হামসা আল-ফাওকাইন এলাকায় তাঁর পরিবার তখন ঘুমিয়ে ছিল।

কী হচ্ছে, সেটা দেখতে কাবাশ একটি টর্চলাইট নিয়ে বাইরে বের হন। তিনি বলেন, তিনি পাহাড়ের দিকে টর্চের আলো ফেলে অবাক হয়ে দেখেন, একদল লোক বিভিন্ন দিক থেকে পাহাড়ের পাশে হাঁটছে।

কাবাশ নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘ভয় আর আতঙ্ক আমাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছিল, আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি।’

কিছুক্ষণের মধ্যে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা (সেটলাররা) তাঁর ওপর হামলা চালায়। সন্ত্রাসী ইহুদি বসতি স্থাপনাকারীদের হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘চারজন সন্ত্রাসী আমার ওপর আক্রমণ করে। দুর্বৃত্ত অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী আমাকে ধরে আমার হাত বেঁধে ফেলে। আমার হাতে ছুরিকাঘাত করে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে মারধর করা হয়।’

তাঁর ভাই সোহাইব আবু কাবাশ বলেন, ‘অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা যখন ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল, তখনো সবাই ঘুমিয়ে ছিল। তারা এখানকার প্রতিটি ঘরে ঢুকে পড়ে, প্রতি ঘরে প্রায় ২০ জন সেটলার। একজন আমাদের হাতকড়া পরাচ্ছিল, আরেকজন আমাদের মারছিল।’

অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর সব ভেড়া নিয়ে নেয়, শিশুদের মারধর করে, তাঁকে হাতকড়া পরায়, জোর করে নগ্ন করে এবং তাঁর যৌনাঙ্গ বেঁধে রাখে বলেও অভিযোগ করেন সোয়াইব।

সোহাইব বলেন, ‘তারা আমাকে প্রায় ১০০ মিটার টেনে নিয়ে যায় এবং আমার ওপর পানি ও মাটি ছিটিয়ে দেয়।’

সোহাইব বলেন, তিনি দেখতে পান, কয়েকজন অবৈধ বসতি স্থাপনকারী তাঁর ভাইকে ঘিরে ফেলেছে।

সোহাইব আরও বলেন, তারা অনেকেই তাঁকে আক্রমণ করে। ‘আমি ঠিক জানি না কতজন ছিল—১০ জন, ৯ জন বা ৮ জন…অনেক মানুষ। তাঁরা তাঁকে নগ্ন করে মারধর করেছিল।’

এরপর সোহাইব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তাঁকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল তিনি কিছু একটা বলতে চান, কিন্তু কীভাবে বলবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না।

সোহাইব জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমি কি এটা বলতে পারি?..’ তারা একটি প্লাস্টিকের জিপ টাই নিয়ে এসে তাঁর লিঙ্গে বেঁধে দেয়।

পরে সোহাইব তাঁর শরীরে সেই প্লাস্টিকের জিপ টাইয়ের বাঁধনের দাগগুলো দেখান, সেগুলো এখনো স্পষ্ট।

আবু কাবাশ বলেন, ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা চলে যাওয়ার পর সোহাইব তাঁর কাছে আসেন।

আবু কাবাশ আরও বলেন, ‘তাঁর এমন অবস্থায় হয়েছিল, সে হাঁটতেও পারছিল না। আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমি কী করবে। আমি খুবই বিভ্রান্ত ছিলাম। এমন পরিস্থিতিতে আমার কী করা উচিত। এটা খুবই সংবেদনশীল জায়গা, আমি কীভাবে এটা সামলাব?’

চারদিকে অন্ধকার। তিনি কাবাশ সোহাইবের স্ত্রীকে ডেকে আনেন এবং একটি ফ্লাসলাইট ধরতে বলেন। এরপর একটি ছুরি দিয়ে মোহাম্মদ ভাইয়ের শরীরে বাঁধা প্লাস্টিকের জিপগুলো কাটতে শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘তাঁর শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল।’

দুভাই আল-জাজিরাকে বলেন, হামলা শুধু সোহাইবের ওপরই হয়নি।

অন্য সাক্ষাৎকারে সোহাইব বলেছেন, ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা নারীদের ঘর থেকে বের করে দেয়, লোকজনকে একটি তাঁবুতে জড়ো করে এবং হুমকি দেয়-যদি তারা এলাকা ছেড়ে না যায়, তাহলে নারীদের ধর্ষণ করা হবে এবং শিশুদের নিয়ে যাওয়া হবে।

আল-জাজিরার সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ আবু কাবাশ বলেন, তাঁদের ৪০০টি ভেড়া ছিল। সব তারা নিয়ে গেছে। সেগুলো ছিল তাঁদের পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস।

কাবাশ আরও বলেন, ‘এখন আমাদের শুধু আকাশটাই আছে। আমাদের পরিবারের ৫০ বছরের পরিশ্রম মাত্র ৪০ মিনিটে শেষ হয়ে গেছে।’

সোহাইব বলেন, তাঁরা সাহায্যের জন্য ফোন করেছিলেন, কিন্তু সেই সাহায্য অনেক দেরিতে এসেছিল।

সোহাইব বলেন, ‘আমরা পুলিশকে ফোন করেছিলাম.. তারপর সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি আসে। কিন্তু অনেক দেরিতে, ততক্ষণে আমরা মারধরের শিকার হয়ে গেছি।’

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশ বলেছে, তারা ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে। এখন পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না।

আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলা কোনো ভুক্তভোগীকেই এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।

বরাবরের মতো ইসরায়েলের অস্বীকার

ইসরায়েল বরাবরের মতো এই পদ্ধতিগত নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস বলেছে, এটি একটি নিরাপত্তা সংস্থা, যারা ‘আইন অনুযায়ী’ এবং ‘কঠোর নজরদারির অধীনে’ কাজ করে। বন্দীদের ‘মৌলিক অধিকার রক্ষা করেই’ তাদের কারাবন্দী রাখা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লেইতার সাম্প্রতিক যৌন নির্যাতনের অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদনের পর একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।

লেইতার বলেন, ‘ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বেআইনি আচরণের কোনো অভিযোগ থাকলে, তা তদন্তকারী সংস্থার কাছে জমা দিতে হবে এবং সেই অভিযোগগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক।’

আল-জাজিরার অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র ‘বডিজ অব এভিডেন্স: ইজরায়েলস ডার্কেস্ট ওয়েপন’–এর পোস্টার
আল-জাজিরার অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র ‘বডিজ অব এভিডেন্স: ইজরায়েলস ডার্কেস্ট ওয়েপন’–এর পোস্টার। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

No comments

Powered by Blogger.