ট্রাম্পের নিশানা আবারও ইরানের প্রধান তেলকেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপ’, কী আছে সেখানে
ইরানের উপকূলবর্তী প্রবাল দ্বীপটি তেহরানের অর্থনৈতিক লাইফলাইন বা মূল চালিকা শক্তি। দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই সাধারণত এ দ্বীপের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘খুব দূরের নয়—এমন এক সময়ে আমরা খারগ দ্বীপসহ অন্যান্য তেল অবকাঠামো দখল করব। ভেনেজুয়েলার মতো তাদের তেল ও গ্যাস বাজারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আমরা নিয়ে নেব।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগেও ইরানের প্রধান তেলকেন্দ্রটি দখলের ধারণা নিয়ে কথা বলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র এ দ্বীপে একাধিকবার হামলাও চালিয়েছে। তবে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা যখন নতুন করে লড়াই এড়াতে সংলাপের জন্য চাপ দিচ্ছেন, ঠিক তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সর্বশেষ এ মন্তব্য পরিস্থিতিকে নাটকীয়ভাবে উত্তপ্ত করে তুলল।
খারগ দ্বীপ কী
ইরান উপকূলের অদূরে অবস্থিত খারগ দ্বীপটি মাত্র পাঁচ মাইল দীর্ঘ একটি ভূখণ্ড। আয়তনে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটান শহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। মার্কিন কর্মকর্তারা এ দ্বীপকে ‘ইরানের সামগ্রিক তেল সরবরাহের মূল কেন্দ্র’ হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন।
দ্বীপটির দীর্ঘ জেটিগুলো সমুদ্রের এমন গভীর অংশে বিস্তৃত, যেখানে বড় বড় তেলবাহী সুপার ট্যাংকারগুলো অনায়াসে ভিড়তে পারে। আর এ বৈশিষ্ট্যের কারণেই দ্বীপটি তেল বিতরণের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরেই দ্বীপটি ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে। ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি গোপন নথি প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, এই তেল অবকাঠামোগুলো ‘ইরানের তেলব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এর সচল থাকা অপরিহার্য।’
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প তেল রপ্তানি পথ থাকলেও সেগুলো বেশ সীমিত। বড় পরিসরে এগুলোর কার্যকারিতাও এখন পর্যন্ত জোরালোভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।
আইইএ আরও জানায়, উদাহরণ হিসেবে ২০২১ সালে ইরান ‘জাস্ক তেল টার্মিনাল’ উদ্বোধন করেছিল। এর মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালির ঠিক পূর্বে ওমান উপসাগরের জাস্ক বন্দরে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তবে ইরানি তেল রপ্তানির জন্য এ টার্মিনালকে এখনো পুরোপুরি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর বরাত দিয়ে গত মার্চে রয়টার্স জানায়, খারগ দ্বীপে ইরানের প্রায় ৩ কোটি ব্যারেল তেল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছিলেন, তেল টার্মিনালটি ধ্বংস করতে পারলে তা ‘ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে এবং দেশটির শাসনের পতন ঘটাবে।’
ইরান কি সম্ভাব্য মার্কিন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত মার্চ মাসে বলেছিলেন, ‘ইরানের শত্রুরা এ অঞ্চলের একটি দেশের সহায়তায়’ তাদের একটি দ্বীপ দখল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে তিনি সরাসরি কোনো দ্বীপের নাম উল্লেখ করেননি। সে সময়ে অবশ্য তেমন কিছু ঘটেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে পরিচিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, খারগ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে ইরান সেখানে ফাঁদ পেতেছে। পাশাপাশি চলতি বছরের শুরুর দিকে তারা সেখানে অতিরিক্ত সামরিক কর্মী ও বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।
সূত্রগুলো জানায়, দ্বীপটিতে আগে থেকেই স্তরে স্তরে সাজানো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছিল। এর সঙ্গে ইরানিরা কাঁধে রেখে উৎক্ষেপণযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ‘গাইডেড মিসাইল সিস্টেম’ (ম্যানপ্যাডস) মোতায়েন করেছে সেখানে।
যুক্তরাষ্ট্র কি এর আগে এ দ্বীপে হামলা করেছে
হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার করেছে। ইরান যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা অব্যাহত রাখে, তবে দ্বীপের তেল অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর মাঝে গত মার্চে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপের ‘প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে’ বোমাবর্ষণ করেছে।
‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পোস্ট করা এবং সিএনএনের ভৌগোলিক অবস্থান নিশ্চিত করা এক ভিডিওতে দেখা গেছে, দ্বীপের বিমানবন্দর স্থাপনায় মার্কিন হামলায় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটছে এবং কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে।
ট্রাম্প অবশ্য একই দিন বলেছিলেন, খারগ দ্বীপটি ‘(যুক্তরাষ্ট্রের হামলার) তালিকায় খুব ওপরের দিকে নেই। এটি অনেকগুলো বিষয়ের একটি মাত্র। আমি যেকোনো মুহূর্তে আমার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে পারি।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার বহু বছর আগে, সেই ১৯৮৮ সালেও এই দ্বীপটি দখলের বিষয়ে কথা বলেছিলেন। সে সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমাদের কোনো সেনা বা জাহাজে একটি গুলি লাগলে আমি খারগ দ্বীপের বারোটা বাজিয়ে দেব। আমি সেখানে ঢুকে এটি দখল করে নেব।’
যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তার মতে, গত এপ্রিলের শুরুর দিকে মার্কিন বাহিনী এ দ্বীপের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানার কথা জানায়। তবে সেবারের হামলায় তেল স্থাপনাগুলো নিশানা করা হয়নি।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছিল, ওই হামলায় দ্বীপের সামুদ্রিক অবকাঠামোর সামান্য ক্ষতি হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানান, সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিশ্বাস করেন, খারগ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে তা ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) ‘পুরোপুরি দেউলিয়া’ করে দেবে। এর ফলে যুদ্ধ হয়তো দ্রুত শেষ হতে পারে।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে অনেকেই এমন পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক। কারণ, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিপুলসংখ্যক পদাতিক বা স্থল সেনা মোতায়েন করার প্রয়োজন হবে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের দুজন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা মাসের পর মাস ধরে তৈরি করা থাকলেও তা বারবার স্থগিত রাখা হয়েছে। কারণ, এ অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
![]() |
| কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে ইরানের খারগ দ্বীপের একটি তেল টার্মিনাল দেখা যাচ্ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স |

No comments