প্রথম বিশ্বযুদ্ধকেও ছাড়িয়ে গেল রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত
গত বৃহস্পতিবার সেই অচিন্তনীয় বিষয়টিই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ আজ ১,৫৬৯তম দিনে পদার্পণ করেছে, অর্থাৎ এই সংঘাত ৪ বছর ৩ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এর মাধ্যমে স্থায়িত্বের দিক থেকে এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে পেছনে ফেলে দিল।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেনে সেনা পাঠিয়েছিলেন, তখন তার ধারণা ছিল মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দেশটির পতন ঘটবে। কিন্তু ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ সেনাদের প্রতিহত করার পর যখন এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে রূপ নেয়, তখন খোদ যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা লড়াকু সৈনিকেরাও ভাবেননি যে এই সংঘাত এতটা দীর্ঘ হবে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের ছদ্মনাম ‘ফ্রান্স’ ব্যবহার করা এক ইউক্রেনীয় সেনা বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম বড়জোর দুই বা তিন বছর চলবে, তারপর রাজনীতিবিদরা কোনো একটি সমঝোতায় পৌঁছাবেন।’
কিন্তু যুদ্ধ থামেনি। শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় অদূর ভবিষ্যতে এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণও নেই। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ইউক্রেনীয় বিশ্বাস করেন যে আগামী বছরের আগে এই যুদ্ধ শেষ হবে না। আর তেমনটা হলে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্বের (৬ বছর) কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। অনেক ইউক্রেনীয় অবশ্য মনে করেন, এই যুদ্ধ আসলে ২০১৪ সালেই শুরু হয়েছিল, যখন রুশ সেনারা ক্রিমিয়া দখল করে নেয়।
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে দুই যুদ্ধের প্রভাব
ইতিহাসবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে এই সংঘাতের হুবহু তুলনা করার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্বযুদ্ধের পরিধি ছিল বৈশ্বিক এবং সেখানে একাধিক যুদ্ধক্ষেত্র ও বিশাল সেনাবাহিনী জড়িত ছিল, যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির তুলনা করা কঠিন। তাছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
তবুও, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো ইউক্রেন যুদ্ধও আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে মনে করেন ইউক্রেনীয় ইতিহাসবিদ ইয়ারোস্লাভ রিৎসাক। দুটি যুদ্ধই সামরিক জোটের পুনর্গঠন এবং গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর মাধ্যমে ইউরোপের ভূরাজনীতিকে বদলে দিয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, উভয় যুদ্ধই প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে যুদ্ধকৌশলের ধরন বদলে দিয়েছে। এক শতাব্দী আগে যেখানে যুদ্ধবিমান এবং ট্যাঙ্কের আবির্ভাব ঘটেছিল, আজ সেখানে আকাশ, সমুদ্র এবং স্থলে ড্রোনের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। দুই ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির এই অগ্রগতি মানুষের জন্য যুদ্ধকে আরও বেশি নির্মম করে তুলেছে।
ফরাসি সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল ও সামরিক ইতিহাসবিদ মিশেল গোয়া বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই ইউক্রেনের এই যুদ্ধটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।’
শুরুর ধাক্কা থেকে ট্রেন্স যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি
উভয় যুদ্ধের শুরুর দিকের কৌশলে দারুণ মিল রয়েছে। ১৯১৪ সালে জার্মানি দ্রুত প্যারিস দখলের উদ্দেশ্যে একটি ঝটিকা অভিযান শুরু করেছিল। ২০২২ সালে কিয়েভ অভিমুখে রাশিয়ার অভিযানের উদ্দেশ্যও ছিল একই। দুই ক্ষেত্রেই আক্রমণকারীরা লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
পরবর্তীতে দুটি যুদ্ধই একটি স্থবির ও প্রায় হিমায়িত ফ্রন্টলাইনে পরিণত হয়। ২০২২ সালের শেষের দিকে যখন ইউক্রেনীয় সেনারা পরিখা এবং বাঙ্কারে অবস্থান নেয়, তখন ইতিহাসবিদরা একে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আমলের 'ট্রেঞ্চ ওয়ারফেয়ার'-এর প্রত্যাবর্তন হিসেবে আখ্যা দেন।
পূর্ব ইউক্রেনের পরিখাগুলোর দৃশ্য এক শতাব্দী আগের উত্তর ফ্রান্সের যুদ্ধক্ষেত্রের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল। ইউক্রেনীয় এবং রুশ সেনারা মাত্র কয়েকশ গজ দূরত্বে অবস্থান করত, কখনও কখনও একে অপরকে দেখাও যেত। তীব্র কামানের গোলাবর্ষণের মাধ্যমে শত্রুকে কোণঠাসা করে পদাতিক বাহিনী দিয়ে পরিখা দখল করাই ছিল প্রধান কৌশল।
মিশেল গোয়া বলেন, ‘সাধারণত ফ্রন্টলাইন যখন স্থবির হয়ে যায়, তখন আপনি আবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধেই ফিরে যান।’ তিনি আরও যোগ করেন, কামানের গোলার তীব্রতার কারণেই মূলত দুই পক্ষ পরিখা খনন করতে বাধ্য হয়। ‘নিজেকে বাঁচাতে আপনাকে মাটির নিচে লুকিয়ে যেতেই হবে।’
ড্রোন যুগের আগমন: বদলে যাওয়া রণকৌশল
ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে পরিখার সেই চেনা সমীকরণটি বদলে গেছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ড্রোনের নজরদারি এবং নিখুঁত হামলার কারণে উন্মুক্ত পরিখাগুলো এখন আর নিরাপদ নয়।
ইউক্রেনীয় সেনারা জানিয়েছেন, এখন টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো আরও ছোট এবং আরও গভীরে অবস্থান নেওয়া। বিশাল পরিখা ব্যবস্থার পরিবর্তে সেনারা এখন এমন ছোট ডাগআউট বা বাঙ্কারে আশ্রয় নিচ্ছে যেখানে মাত্র কয়েকজন সেনা থাকতে পারে। এই বাঙ্কারগুলো আকাশ থেকে সহজে চেনা যায় না এবং বোমার আঘাত সহ্য করার মতো গভীর।
ড্রোনের আধিপত্যের কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো মুখোমুখি পরিখা ব্যবস্থার পরিবর্তে এখন মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত একটি ‘কিল জোন’ তৈরি হয়েছে। এই জোনের মধ্যে যেকোনো ধরনের নড়াচড়া দেখলেই ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। ফলে এক শতাব্দী আগের মতো বিশাল সৈন্যদল নিয়ে একসঙ্গে আক্রমণ করা এখন অসম্ভব। তার বদলে মাত্র এক বা দুজন সেনা নিয়ে ছোট ছোট আক্রমণ চালানো হচ্ছে।
এমনকি ১৯১৬ সালে প্রথম ব্যবহার হওয়া ট্যাঙ্ক, যা এই যুদ্ধের প্রথম দিকেও বেশ ভীতি জাগানিয়া অস্ত্র ছিল, তা এখন ড্রোন হামলার সহজ নিশানা হয়ে উঠেছে। ফলে রণক্ষেত্রে ট্যাঙ্কের ব্যবহার অনেক কমে গেছে।
ধ্বংসযজ্ঞের তীব্রতা ও বর্তমান গতিহীনতা
রণক্ষেত্রের কৌশল বদলে গেলেও ধ্বংসের পরিমাপ কিন্তু একই রয়ে গেছে। ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইন থেকে ড্রোনের পাঠানো লাইভ ফুটেজে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেই চেনা দৃশ্যই দেখা যায়—ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া গাছপালা, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি এবং কামানের গোলায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া ফসলের মাঠ।
ন্যাটোর সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার ট্রান্সফরমেশন অ্যাডমিরাল পিয়েরে ভ্যান্ডিয়ার এই বসন্তে ইউক্রেন সফর শেষে জানান, ড্রোনের ব্যবহার ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতোই মারাত্মক ও প্রাণঘাতী করে তুলেছে।
এই যুদ্ধ কতটা ধীরগতির হয়ে পড়েছে তা রাশিয়ার অগ্রযাত্রার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সম্প্রতি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর পোক্রোভস্ক দখলে রাশিয়ার দৈনিক গড় অগ্রযাত্রা ছিল মাত্র ৭৫ গজ—যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ‘ব্যাটল অব দ্য সোম’-এর অগ্রগতির চেয়েও ধীরগতির।
অচলাবস্থা ভাঙার উপায় কী?
প্রশ্ন হলো, এই অচলাবস্থা কে ভাঙবে? প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনী জার্মানির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং একের পর এক সামরিক চাপ প্রয়োগ করে জয়লাভ করেছিল।
ইউক্রেনের বর্তমান কৌশলও কিছুটা সেই পথেরই প্রতিফলন। রাশিয়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তেল শোধনাগার ও সম্পদগুলোর ওপর ড্রোন হামলা চালিয়ে মস্কোর যুদ্ধকালীন তহবিল সংকটে ফেলার চেষ্টা করছে কিয়েভ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো বিশাল সৈন্যবাহিনী দিয়ে আক্রমণ করার মতো জনবল ইউক্রেনের নেই, তবে তারা যুদ্ধক্ষেত্রকে ছোট ছোট আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে, যাতে রুশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন করা যায়।
ইতিহাসবিদ রিৎসাক সংক্ষেপে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটি মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধই, তবে ড্রোনের সংস্করণে।’ -নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

No comments