Friday, October 24, 2025
কিংমেকার ‘পি কে’ চাইছেন বিহারের রাজা হতে by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
কিংমেকার ‘পি কে’ চাইছেন বিহারের রাজা হতে by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
উঁকিঝুঁকি মারা এতগুলো সম্ভাবনার অভিমুখ একাধিক হলেও এবার যাঁর উপস্থিতি সবার মনে নানাবিধ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তাঁর নাম প্রশান্ত কিশোর পান্ডে ওরফে ‘পি কে’। ১০ বছর ধরে নামটি পরিচিতি পেয়েছে ভোট পরিচালনার দক্ষতার কারণে। ৪৮ বছরের এই বিহারি ব্রাহ্মণ, রাজনীতিসচেতন ভারতীয়রা যাঁকে ‘মাস্টার স্ট্র্যাটেজিক’ বা ভোটকুশলী হিসেবে জানে, পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এই প্রথম তিনি ভোটযুদ্ধে নেমেছেন অন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরির বাসনায়।
ভোটের বাকি মাত্র তিন সপ্তাহ। ৬ ও ১১ নভেম্বর দুই দফার ভোট। ফল ঘোষণা ১৪ তারিখ। অথচ এখনো সবচেয়ে বড় হেঁয়ালি হয়ে শীতের কুয়াশার মতো ঝুলে রয়েছেন পি কে। তাঁর উপস্থিতি নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন। যাবতীয় রাজনৈতিক রহস্যও তাঁকে ঘিরেই।
কোনো ভোটে কোনো ব্যক্তিবিশেষকে নিয়ে এমন আগ্রহ বিরল। পি কে সেই আগ্রহ সঞ্চার করেছেন তাঁর কৃতিত্বের কারণে। ভোটকুশলী হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর আবির্ভাব নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোট তাঁর হাতেখড়ি। এর পর থেকে পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিক হিসেবে তাঁর গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। মোদির দিল্লি জয়ের পর তিনি দায়িত্ব নেন পাঞ্জাবে কংগ্রেসের অমরিন্দর সিংয়ের নির্বাচনী প্রচারের। ২০১৫ সালে মুখ্যমন্ত্রী হন অমরিন্দর। ২০১৯ সালে অন্ধ্র প্রদেশে জগনমোহন রেড্ডি, ২০২০ সালে দিল্লিতে অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তামিলনাড়ুতে এম কে স্ট্যালিনকে জেতাতে তাঁর কৌশল স্বীকৃত। ব্যর্থ হয়েছেন একবারই। ২০১৭ সালে। উত্তর প্রদেশ বিধানসভার ভোটে কংগ্রেসকে তিনি তরাতে পারেননি। সেই পি কে অন্তরাল থেকে বেরিয়ে কিংমেকারের ভূমিকা ছেড়ে নিজেই রাজা হতে চাইছেন। বিহারের ভাগ্যবিধাতা হতে তিন বছর আগে গড়েছেন ‘জন সুরাজ পার্টি’। তিন বছর ধরে রাজ্য চষেছেন। ২৪৩ আসনেই প্রার্থী দেবেন। যদিও জানিয়েছেন, নিজে প্রার্থী হবেন না; দলীয় প্রার্থীদের প্রচারের স্বার্থে।
এমন ঝুঁকি অনেকেই নেন। তাহলে পি কে-কে ঘিরে এত আগ্রহের কারণ কী? কারণটা তাঁর রাজনৈতিক প্রচার। তিন বছর ধরে নিরলস জনসম্পর্কের সময় একটা কথাই তিনি বলছেন—বিহারকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজনীতিকে জাতপাতের বেড়া ভেঙে এগোতে হবে। বিহারবাসীকে জাতের গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে বুঝতে হবে, কারা কীভাবে তাদের ব্যবহার করছে। শোষণ করছে। জাতভিত্তিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা ভেঙে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম না দিলে বিহারিদের কষ্ট ঘুচবে না। তারা অন্যের হাতের পুতুল হয়েই নাচবে।
তিন বছর ধরে এসব বলে চলা পি কে এত বছরের ভোট পরিচালনার অভিজ্ঞতার আলোয় যা করতে চলেছেন, তাতে সফল হবেন কি না অজানা। তবে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, তাঁর প্রচারে উপচে পড়া জনতার ৮০ শতাংশ তরুণ। জাতপাতের আগল ভেঙে নতুন বিহার তারা গড়তে চায় কি না পরের কথা, পি কে যদিও তাদের চোখে স্বপ্ন দেখছেন।
দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি বা নেতা হিসেবে পি কেই হয়ে উঠেছেন মিডিয়ার সেরা আকর্ষণ। তাঁর মতো এত সাক্ষাৎকার আর কেউ দিচ্ছেন না।
তৃতীয়ত, তিনি নিজেকে তৃতীয় শক্তি হিসেবে জাহির করেছেন। বলছেন, কাউকে হারিয়ে কাউকে জেতানো তাঁর লক্ষ্য নয়। তিনি চান বিহারকে জেতাতে। তাই ভোটের পর কোনো জোটের দিকে তিনি ঢলবেন না।
চতুর্থত, শুধু এসব বলা নয়, সদিচ্ছার প্রমাণও রাখছেন। মোদির বিজেপিকে যেমন রেয়াত করছেন না, তেমনই তুলাধোনা করছেন নীতীশ-লালু-তেজস্বী-রাহুলদের রাজনীতি। সমালোচনার ধার এতটাই যে সাধারণ মানুষ যেমন তা শুনতে পছন্দ করছে, তেমনই তা আকর্ষণ করছে মিডিয়াকেও। ফলে ভোটের প্রাক্কালে পি কে হয়ে উঠেছেন মূল আকর্ষণ।
রাজনৈতিক আক্রমণের নমুনা দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। মোদি সম্পর্কে বলছেন, উনি চান না বিহারে শিল্প হোক। কারণ, তা হলে গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু সস্তার শ্রমিক পাবে না। প্রধানমন্ত্রী গুজরাটে গিয়ে বুলেট ট্রেন চালানোর কথা বলেন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরির কথা বলেন, অথচ বিহারে বলেন সস্তায় আরও বেশি খাদ্য দেবেন। আরও বন্দে ভারত ট্রেন চালাবেন। আরও ট্রেন মানে আরও বেশি সস্তার বিহারি শ্রমিকের ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া। একের পর এক জনসভা ও সাক্ষাৎকারে মোদিকে আক্রমণ করে পি কে বলছেন, ১১ বছরে বিহারকে তিনি কিচ্ছুটি দেননি।
পি কে একটা সময় জেডিইউ নেতা নীতীশ কুমারের ঘর করেছিলেন। সহসভাপতি হয়েছিলেন। বেরিয়ে এসেছেন সাড়ে তিন বছর আগে। নীতীশ প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, তাঁর রাজনীতি শেষ। আর মুখ্যমন্ত্রী হবেন না। এবার ২০টি আসনও জেডিইউ জিততে পারবে না। বলছেন, পরিতাপ এটাই, সৎ হয়েও যে সরকার নীতীশ চালাচ্ছেন, বিহারের ইতিহাসে তত দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার কখনো আসেনি। কংগ্রেস সম্পর্কে বলছেন, বিহারে দলটার নিজস্ব বলতে কিছুই নেই। তারা লালু প্রসাদের উচ্ছিষ্টভোগী। লালুপুত্র তেজস্বী সম্পর্কে বলছেন, বাবার জঙ্গলরাজেই তিনি আবদ্ধ। পি কের দৃষ্টিতে তেজস্বী ও রাহুল দুজনেই টবে পরিচর্যা করা বাহারি গাছ।
ভোটের আবহে এসব কথা শুনতে ভালো লাগলেও পি কের ক্ষমতা ঘিরে দুটি প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে। প্রথমত, জনসমর্থনকে ভোটে পরিণত করার মতো সাংগঠনিক শক্তি তিনি আয়ত্ত করতে পেরেছেন কি না। দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর দানখয়রাত নীতির মোকাবিলা কীভাবে করবেন। শাসক এনডিএ রাজ্যের ১ কোটি ২১ লাখ নারীকে স্বনির্ভর হতে এককালীন ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দিচ্ছে। শিক্ষিত বেকার যুবাদের দিচ্ছে মাসিক ২ হাজার টাকা করে ভাতা। তেজস্বী প্রতি পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দেবেন বলেছেন। পি কের প্রতিশ্রুতি সেখানে স্রেফ ‘পলায়ন’ রোধ।
বিহারের জনসংখ্যার ৭ শতাংশ পরিযায়ী শ্রমিক। ভিনরাজ্যে কাজের সন্ধানে যাওয়া তাঁর কাছে ‘পলায়ন’। শুধু এতে চিড়ে ভিজবে? এই পুঁজি নিয়ে রাজ্য দখলের স্বপ্ন দেখা কি আকাশকুসুম কল্পনা নয়? জবাবে পি কে বলেছেন, ‘হয় দেড় শ আসন পাব, নয়তো দশেরও কম। ফল যা–ই হোক, থেমে যাব না।’
কিছু পরিসংখ্যান জরুরি। গতবার এনডিএ ও ইন্ডিয়ার প্রাপ্ত ভোটের পার্থক্য ছিল মাত্র ১২ হাজার। ২০ কেন্দ্রে জয়–পরাজয়ের ব্যবধান ছিল ১ হাজারের কম ভোটে। ৩২ কেন্দ্রে ব্যবধান ৫ হাজার। কেন্দ্রপিছু ২ থেকে ১০ হাজার ভোট টানলে কার কপাল পুড়িয়ে কার হাসি চওড়া করবেন পি কে? তাঁর জবাব, প্রতিষ্ঠিতদের সর্বনাশ না হলে বিহারে পৌষ মাস আসবে না।
১৯৮৩ সালে অন্ধ্র প্রদেশের এন টি রাম রাও, ১৯৮৫ সালে আসামের প্রফুল্ল মহন্ত, ২০১৩ সালে দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো ভোট-ভাগ্য নিয়ে পি কে কি হবেন বিহারের নতুন রংধনু? নাকি ‘ভোট–কাটুয়া’ সেজে এনডিএ বা ইন্ডিয়ার কাউকে ভাসাবেন, কাউকে ডোবাবেন?
* সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি
![]() |
| প্রশান্ত কিশোর পান্ডে। ছবি: এএনআই |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1399)
-
▼
2025
(3281)
-
▼
October
(199)
-
▼
Oct 24
(9)
- ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় সংলাপে বসবে হামাস
- যুদ্ধবিরতির পরও গাজার মানুষের ক্ষুধার যন্ত্রণা দূর...
- গাজায় গণহত্যা: ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জা...
- নেপালের গণ–অভ্যুত্থান ভারতের মাথাব্যথা বাড়াল by আন...
- রোগ ও দুর্ভিক্ষের মারাত্মক আঘাতে প্রজন্মগত সংকটে গ...
- কিংমেকার ‘পি কে’ চাইছেন বিহারের রাজা হতে by সৌম্য ...
- স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বী...
- পশ্চিম তীর সংযুক্ত করলে যুক্তরাষ্ট্রের সব সমর্থন হ...
- গুলি করে হত্যা ও গণভবনে কবর: শেখ হাসিনার মনস্তত্ত্...
-
▼
Oct 24
(9)
-
▼
October
(199)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment