Tuesday, June 27, 2017
হনুজ দিল্লি দূর অস্ত by এম সাখাওয়াত হোসেন
হনুজ দিল্লি দূর অস্ত by এম সাখাওয়াত হোসেন

বিগত
বছরের অক্টোবর মাসে ভারতের রাজধানী দিল্লি গিয়েছিলাম গবেষণার কাজে। আমার
এক সুহৃদের সহযোগিতায় দেখা হয়েছিল ভারতের রাষ্ট্রপতি মি. প্রণব মুখার্জির
সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁর অফিসে। এটি ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎকার। তাঁর সঙ্গে
আমার পূর্ব পরিচিতি ছিল না। তথাপি তিনি আমাকে অনেক সময় দিয়েছেন। ইতিপূর্বে
ভারতে কোনো বাংলা ভাষাভাষী রাষ্ট্রপতি হন নাই, তাই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের
সময় সে কথা চেপে রাখতে পারিনি। তিনি আমার বক্তব্যে শুধু মুচকি হেসেছিলেন।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করায় সুযোগ হয়েছিল বিশ্বের সবচাইতে বড় এই ঐতিহাসিক সরকারি বাসভবনটির কিয়দাংশ দেখবার। রেইসিয়ানা পাহাড় কেটে এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল বৃটিশ ভারতের শাসক বৃটিশ উপনিবেশিক শক্তির ধারক বাহক ভাইসরয় হাউস হিসেবে। হার্বাট বেকারের তত্ত্বাবধানে এবং যার নকশায় এই ভবনটি তৈরি হয়েছিল তার নাম এডউইন ল্যান্ডসির লুটিয়েন্স (Edwin Landseer Lutyens)। এই ব্যক্তিই বর্তমানের নতুন দিল্লিরও নকশা করেছিলেন। তার সহযোগী ছিলেন মি. হার্বাট বেকার (Herbert Baker)। এ কারণে ভারতের রাজধানী নতুন নতুন দিল্লিকে অনেক সময় লুটিয়েন্স দিল্লি বলা হয়। এই দিল্লিই ঐতিহাসিক ভারতের অষ্টম, জনান্তরে দশম দিল্লিস্থিত রাজধানী। যাই হোক দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের বিস্তারিত বিবরণে পরে আসবো।
ইতিপূর্বেই আমি দুবার দিল্লিতে এসেছিলাম এবং সপ্তাহখানেক সময় করে কাটিয়েছিলাম। জীবনে দিল্লিতে প্রথম এসেছিলাম ২০০৯ সালে নির্বাচন কমিশনে থাকাকালে ভারতের পনেরতম সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে। তারপর আরেকবার এসেছিলাম ২০১০ সালে যখন আমি নির্বাচন সংস্কার নিয়ে গবেষণা করি। আর তৃতীয়বার ২০১৬ সালে এসেছিলাম আরেক গবেষণার কাজে। যতবারই দিল্লিতে এসেছি ততবারই মনে হয়েছে দিল্লিকে তেমনভাবে দেখা হয়নি, যেমনভাবে আমি দেখতে চেয়েছি। আমি বহু দেশের রাজধানীতে গিয়েছি। যার মধ্যে রোম নগরীও রয়েছে। তথাপি আমার মনে হয় যে দিল্লির ইতিহাসের বৈচিত্র্যের ধারেকাছেও বিশ্বের আর কোনো রাজধানী নেই। প্রথমবার এসেই মনে হয়েছিল কত পরিচিত এই শহর। কারণ উপমহাদেশের ইতিহাস যেদিন আমার পাঠ্যপুস্তকের তালিকায় এসেছিল সেদিন থেকেই আমি এই শহরের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছি। সেই ইতিহাস পড়া আজও শেষ হয়নি।
দিল্লির বর্ণনা দিতে গিয়ে বোধকরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার কয়েক পঙ্ক্তি মনে পড়ে। এর চাইতে ভালো বর্ণনা কেউ দিতে পারেনি বলে মনে হয়। অবশ্য তিনি তার কবিতায় ভারতবর্ষের কথা বললেও তা দিল্লির জন্যও প্রযোজ্য। তিনি লিখেছিলেন-
‘হেথায় আর্য, হেথায় অনার্য
হেথা দ্রাবিড় চীন
শকহুনদল পাঠান মোগল
এক দেহে হলো লীন।’
রবীন্দ্রনাথের কবিতার এই পঙক্তিতে যেন ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। দিল্লির মসনদে বসে ভারতবর্ষ শাসন করেছে আর্য, অনার্য, মোগল, পাঠান, গোত্র না জানা ক্রীতদাস, ইংরেজ। এমন বিচিত্র সাম্রাজ্যের ইতিহাস অন্য কোনো শহরে পাওয়া কল্পনাই করা যায় না।
আধুনিক ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি পক্ষান্তরে দিল্লি যতই আধুনিক হোক না কেন- নতুন বা পুরাতন দিল্লি দেখেছে সাম্রাজ্য আর শাসকদের উত্থান আর পতন। এই উত্থান আর পতনের সঙ্গে জড়িত ছিল তৎকালীন উপমহাদেশের ভাগ্য। দিল্লি শহরটি যত আধুনিকই হোক না কেন এর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সাম্রাজ্যের উত্থান পতনের ধ্বংসস্তূপ। রয়েছে বিভিন্ন ধর্মের, গোত্রের শাসকদের উত্থান আর পতনের করুণ চিহ্ন। এই শহর গড়ে উঠেছে সাতটি রাজধানী শহরকে কেন্দ্র করে। অনেকের মতে দশ হতে বারোটি শহরও হতে পারে। এ শহরের এসব পুরাতন সমাধিস্থল আর শ্মশানঘাট মনে করিয়ে দেয় উপমহাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস। এ ইতিহাস কারও পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই শহরে আসলেই জড়িয়ে পড়তে হয় ইতিহাসের সঙ্গে। নাটক, নভেল আর ভ্রমণ কাহিনীর উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে দিল্লির বৃহৎ উদ্যানগুলোতে আর রাজপথ, অলিগলি অথবা পুরাতন শহর জুড়ে। কত জাতির রক্ত ঝরেছে এই শহরে। কত সুখ-দুঃখের ইতিহাস আর অজানা গল্প রয়েছে দিল্লির প্রতিটি পাথরের নিচে। এমনই অনুভূতি হয়েছিল আমার প্রতিবারের দিল্লি সফরে।
প্রথমবার যখন দিল্লির দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাই চেষ্টা করেছিলাম কিছু অজানা ইতিহাস জানতে। কিছু পেয়েছি কিছু পাইনি। দিল্লির সাতটি রাজধানীর নাম এখনো তেমনই রয়েছে যেমন কিনা রাই পিলোথরা সবচাইতে পুরাতন শহর বলে নথিভুক্ত রয়েছে। এই শহরটি পৃত্থিরাজ চৌহান-এর তৈরি। এর ধ্বংসবিশেষ এখনো দৃশ্যমান। জায়গাটি কুতুব মিনারের কাছাকাছি। মেহেরুলী এখানেই কুতুব মিনারসহ বহু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। রয়েছে ফিরোজ শাহ তুগলকের সমাধি ও তার তৈরি ওই সময়কার সবচাইতে বৃহৎ মুসলিম পাঠস্থান মাদরাসা, সূফী বখতিয়ার উদ্দিন কাকীর সমাধি আর সামসি তালাব, ‘শিরি’, খিলজিদের রাজধানী, ফিরোজাবাদ, গিয়াসউদ্দিন তুগলকের তৈরি শহর। যমুনা নদীর তীরে ফিরোজ শাহ কোটলা, বর্তমানে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়াম এই সুলতানের নাম ধারণ করে রয়েছে।
তুগলকাবাদ গিয়াসউদ্দিন তুগলকের শহর এখন শুধুমাত্র একটি পরিত্যক্ত বিশাল আয়তনের পাথরের তৈরি দুর্গ। ওই সময়কার অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। গিয়াসউদ্দিন তুগলকের সমসাময়িক ছিলেন দিল্লির অন্যতম সূফী সাধক নিজামউদ্দিন আউলিয়া। নিজামউদ্দিন আউলিয়া ছিলেন উপমহাদেশের সবচাইতে খ্যাত সূফী সাধক খাজা মঈনউদ্দিন চিশতির শিষ্য এবং কুতুবউদ্দিন কাকীর শিক্ষানবিশ। নিজামউদ্দিন আউলিয়া ক্রমেই বিখ্যাত হয়ে উঠেন এমন কি তিনি সূফী সাধক হিসেবে কুতুবউদ্দিন কাকীর চাইতে বেশি খ্যাত হন। ওই সময়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের নিকট নিজামউদ্দিন দারুণ একজন জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তি। নিজামউদ্দিনের এ খ্যাতি গিয়াসউদ্দিন তুগলককে দারুন ঈর্ষাপরায়ণ করে তোলে। আমি কথা বলছি ১৩ শতাব্দীর আশেপাশের দিনগুলোর কথা। গিয়াসউদ্দিন তুগলক যখন তার শহর তৈরি করছিলেন ওই সময়ই নিজামউদ্দিন তার দরবারে, যা এখন এই সাধকের মাজার, খনন করছিলেন বিশাল এক তালাব (পুকুর), যা এখনো বিদ্যমান রয়েছে মাজারের পেছনে। ওই দীঘি খননের জন্য প্রয়োজন ছিল বহু কর্মীর। অপরদিকে দিল্লির সুলতানের শহর তৈরিতে কর্মীর অভাব হয়ে পড়লে নিজামউদ্দিনকে সুলতান তার কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন। নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে সুলতানের দরবারে ডেকে পাঠালে আওলিয়া সে ডাকে সাড়া দেননি।
গিয়াসউদ্দিন তুগলক তখন বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত। বাংলায় বিদ্রোহ থামাতে দিল্লি ছাড়লেন কিন্তু তার পূর্বেই তিনি মনঃস্থির করেছিলেন যে রাজদ্রোহের অপরাধে ফিরে এসে আউলিয়াকে চরম শাস্তি দেবেন। তুগলক বাংলার বিদ্রোহ দমন করে ফিরে আসবার পথে আবার তার সংকল্পের কথা প্রকাশ করলে আউলিয়ার শিষ্যরা আউলিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। নিজামউদ্দিনের তখন অনেক বয়স। তিনি তার অনুরাগীদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘তুগলককে দিল্লি পর্যন্ত আসতে দাও’- বলে যে উক্তি করেছিলেন তা উপমহাদেশে আজও উচ্চারিত হয়। ধ্যানরত আউলিয়া বলেছিলেন ‘হুনুজ দিল্লি দূর অস্ত’ ‘দিল্লি এখনো বহু দূরে’। গিয়াসউদ্দিন তুগলক দিল্লি পর্যন্ত আসতে পারেননি। পথে তার পুত্র মোহাম্মদ বিন তুগলকের তৈরি অভ্যর্থনা মঞ্চ হতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মহাক্রমশালী গিয়াসউদ্দিন তুগলকের সমাধি রয়েছে পরিত্যক্ত তুগলকাবাদের দুর্গের অদূরে জনমানবশূন্য নির্জন জায়গায় আর নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার থাকে লোকে লোকারণ্য। নিজামউদ্দিন আউলিয়া আরো ভবিষ্যদ্বাণী করে তুগলকাবাদ সম্পর্কে বলেছিলেন ‘ইয়া রাসেগা গুজর ইয়া রহেগা উজার’ (এটা হয় থাকবে পরিত্যক্ত অথবা বসবাস করবে গুজারা। [যারা মহিষ চড়ায়]) এমনই রয়েছে তুগলকাবাদ। এখান থেকে যে শিক্ষা নেয়া উচিত আমাদের সময়কার নেতাদের, ক্ষমতার দাপট চিরস্থায়ী নয়। চিরস্থায়ী নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মতো নিঃস্বদের।
গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার পুত্র মোহাম্মদ বিন তুগলক তৈরি করলেন মেহেরুলী এবং তুগলকাবাদের মাঝামাঝি নতুন শহর ‘জাহানপনা’। এখানে অনেক দিন ইবনে বতুতা অবস্থান করেছিলেন। পরে তুগলক রাজধানী দক্ষিণ ভারতে নিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিলেন জাহানপনাতে। জাহানপনা এখন ধ্বংসস্তূপ।
মোহাম্মদ বিন তুগলক ছিলেন অত্যন্ত কঠিন হৃদয়ের মানুষ এবং অনেকটা খেপাটে ধরনের। তিনি অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যার যৌক্তিকতা ওই সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন হঠাৎ দিল্লি হতে রাজধানী দক্ষিণে নিয়ে যেতে তিনি দিল্লিবাসীদের জোর করে নিয়ে যান। কথিত রয়েছে যে, একজন বিকলাঙ্গ ভিক্ষুককেও তিনি বাদ দেননি। আবার কয়েক বছর পর ফিরে আসেন দিল্লিতে। নিয়ে আসেন সব নাগরিকদের। এসবের জন্য তাকে উদাহরণ করেই ‘বাংলা ভাষায়’ যুক্ত হয়েছে প্রবাদবাক্য ‘তুগলকি কারবার’- যখন যা খুশি তাই করা। মোহাম্মদ বিন তুগলক ছিলেন ওই সময়কার প্রবল পরাক্রমশালী স্বৈরাচার। তুগলকরা এখনো একই রকম আছেন। অনেক তথাকথিত নির্বাচিত অনির্বাচিত শাসকরা ‘তুগলকি কারবারে অভ্যস্ত- আজ এক কথা কাল তার উল্টো। মোহাম্মদ বিন তুগলকের সমাধি কোথায় তা খুঁজে পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাস্ত করে শেরশাহ তৈরি করেছিলেন শেরগড়। শেরগড় লালকিল্লার কাছাকাছি জায়গায় আর পুরাতন কিল্লা ঘিরে। এখানেই এই পুরাতন কিল্লাতেই লাইব্রেরির সিঁড়ি হতে বাবরপুত্র হুমায়ুন পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
দিল্লির পুরাতন শহরের মধ্যে এখনো যা আবাদ রয়েছে- তা হলো শাহজাহানাবাদ যা বর্তমানে পুরাতন দিল্লি বলে পরিচিত। শাহজাহানাবাদ বা বর্তমানের পুরাতন দিল্লিই দিল্লির সপ্তম শহর। এই পুরাতন দিল্লিই ইতিহাসে ভরপুর। এখানেই শাহজাহানের বড় সন্তান জাহানারা তৈরি করেছিলেন ‘চাঁদনী চক’। এখানে বড় চওড়া রাস্তার মাঝে ছিল ছোট পানির তালাব আর ফোয়ারা। রাস্তার দু’ পাশে প্রবাহিত পানি যার উপরে পূর্ণিমার চাঁদের আলো ঠিকরিয়ে চকচক করতো। তাই জাহানারা নাম রেখেছিলেন চাঁদনীচক। এখন শুধুমাত্র চাঁদনী চক-এর নামটিই রয়েছে। প্রথমবার যখন পুরাতন দিল্লি তথা শাহজাহানাবাদে আসি তখন ভীষণ মর্মাহত হয়েছিলাম এখনকার
অবস্থা দেখে। পুরাতন ঢাকার চাইতে বড় এ ঐতিহাসিক শহরটি এখন হতশ্রি, ঠেলাগাড়ি, রিকশা আর মানুষের ভিড়। পাইকারি বাজার। এক সময়ের ঝলমলে এই শহরের বিখ্যাত গলিগুলো গন্ধ আর পুতময় হয়ে রয়েছে।
এক সময়ের ‘চাঁদনীচক’ যখন প্রথমবার দেখি বেশ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম ইতিহাসের গন্ধ পেয়ে। মনে হয়েছিল শাহজাহানাবাদের অলিতে-গলিতে ইতিহাস। বড় বড় হাভেলী আর কুচাগুলোর প্রতিটির অতীতই একেকটি বড় ইতিহাস। সুখ-দুঃখ, জৌলুস, প্রেম, বঞ্চনা, জীবন-মৃত্যু- সবই ধারণ করে কয়েকশত বছরের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রত্যেকটি পুরাতন জরাজীর্ণ এক সময়ের সুরম্য হাভেলী আর কুচাগুলো। এখন এটি একটি সাধারণ চৌরাস্তা- এর এক পাশে ছিল একটি অতিথিশালা যা এখন নেই সেখানেই রয়েছে টাউন হল। শাহজাহানাবাদ বা বর্তমানের পুরাতন দিল্লির স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবার ভারত বিখ্যাত। এখানে এখনো ঐতিহ্যবাহী মোগল খাবার পাওয়া যায়। এখানে পরের দিকের মোগলদের পাচকদের এক বংশধরের একটি রেস্তরাঁ রয়েছে যার নাম ‘করিমস্’, উপমহাদেশ খ্যাত এই রেস্তরাঁ। এখানে পরিবেশিত হয় সবধরনের কাবাব এবং মাংসের পরিবেশনা। মাৎস হিসেবে ব্যবহার হয় মুরগি এবং ছাগল বা বকরি। মোগলরা তাদের রাজত্বকালে তাদের হিন্দু প্রজাদের দিকে লক্ষ্য রেখেই গো-মাংস ভক্ষণকে নিরুসাহিত করেছিলেন। তাই এ অঞ্চলে কোরবানি ঈদ ‘বকরা ঈদ’ নামে পরিচিত।
শাহজাহানাবাদে অনেকগুলো বাজার ছিল। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পণ্যের বাজার। এখনো এই সব বাজার রয়েছে। তবে এগুলো এখন পাইকারি বাজার। তবে খুচরা বাজারও রয়েছে। শাহজাহানাবাদ গড়ে উঠেছিল দিল্লির মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদীর তীর ধরে। যমুনা তীর ধরেই গড়ে উঠেছিল ভারতের শত শত বছরের মুসলিম সাম্রাজ্য। লক্ষণীয় বিষয় যে, মোগল স্থাপন্যের সবচাইতে দর্শনীয় এবং বিশ্বের বিস্ময় আগ্রার তাজমহল এবং মোগলদের রাজধানী বলে কথিত আগ্রার দুর্গ গড়ে উঠে যমুনা নদীর তীরে।
যমুনা নদী তখন উন্মত্ত যৌবনা। দূর্গের পেছনে দেয়ালঘেঁষা। টলটল পরিস্কার পানির প্রবাহ। সূর্যের আলোতে চিকচিক করত। এ নদীর পানি সরবরাহ হত দূর্গ আর শাহজাহানাবাদে। এখন সেই যমুনা নদী খুঁজে পাওয়া যায় না। দূর্গ হতে কয়েক কিলোমিটার পূর্বে সরে গিয়েছে। নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে বস্তি আর পানি হয়েছে দূষিত। তবুও এই যমুনা নদী কালের সাক্ষী। অগণিত সাম্রাজ্যের উত্থান আর পতনের সাক্ষী।
অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন ওই সময়কার মুসলিম শাসকরা গঙ্গার তীরে তেমন কোনো স্থাপনা তৈরি করেননি; কারণ ওই নদীটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র নদী। তবে অনেক শাসকদের উপর মন্দির বিনষ্ট করার ঐতিহাসিক অভিযোগ রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন মধ্যযুগে ধর্মস্থানের ওপর হামলা করার অন্যতম কারণ ছিল দুর্গের ভেতর হতে শত্রুসেনাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে আসার কৌশল। হয়তো ঠিক, হয়তো ঠিক নয়- এটি নিয়ে বিতর্কের অভিপ্রায় আমার নয়।
শাহজাহানাবাদ বা পুরাতন দিল্লির আকার অনেকটা পানের মতো ছিল। এ শহরের প্রান্তে রয়েছে লালকিল্লা। লালকিল্লার লাহোর গেট হতে সোজা পশ্চিম দিকে প্রধান সড়ক যার মাঝ প্রান্তে ছিল চাঁদনী চক। প্রায় শেষ মাথায় রয়েছে একটি বৃহৎ মসজিদ; এগুলো তৈরি করেছিলেন শাহজাহানের অন্য দুই পত্নী। এর মধ্যে একজন বেগম আকবরি মহল। অপরজন বেগম ফতেহপুরী যার নামে পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে ফতেহপুরী মসজিদ। কথিত যে, তিনি এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এই দুই বেগমের সমাধি রয়েছে আগ্রার তাজমহলের প্রধান প্রবেশ পথের পাশে। আকবর মহলের তৈরি মসজিদটি ১৮৫৮ সালে কোম্পানির হুকুমে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। ওই সময় শাহজাহানাবাদের বহু মসজিদ আর মোগল স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। চাঁদনী চকের মূল সড়কে যুক্ত হয়েছে গলি, কুচা। আর শহরটি ছিল দেয়ালঘেরা যার নিয়ন্ত্রণ হতো বারটি গেটের মাধ্যমে। প্রতিটি গেটের বিভিন্ন নাম ছিল। এখনো কয়েকটি গেট দাঁড়িয়ে রয়েছে তবে দেয়াল প্রায় নেই বললেই চলে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের যুদ্ধে ধ্বংস হওয়ার পর বৃটিশ বাহিনী কয়েকটি গেট ছাড়া ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করেছিল শহরের দেয়াল। আজও পাঁচটি মূল গেট দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তার মধ্যে সবচাইতে ঘটনাবহুল এবং বহুভাবে আলোচিত ৫টি গেট বা দরওয়াজার অন্যতম বর্তমানে খুনি দরওয়াজা হিসেবে পরিচিত। এটি ছিল শাহজাহানাবাদে প্রবেশের প্রথম দরওয়াজা। এই দরওয়াজাটি তৈরি করেছিলেন শেরশাহ সুর যিনি এটা শেরগড়ে প্রবেশের অন্যতম দরওয়াজা হিসেবে ব্যবহার করতেন। পরে সম্রাট শাহজাহান তার প্রাচীর শহর শাহজাহানাবাদের প্রধান ফটকে উন্নীত করেন। এখানে হালেও বহু ঘটনার জন্ম হয়েছে। স্থানীয়রা মনে করেন ঐতিহাসিক কারণেই ‘এই দরওয়াজা, যা এখন রাস্তার ডিভাইডার-এর মাঝে, জায়গাটি অভিশপ্ত তাই বৃষ্টিতে রক্ত ঝরে। আমি প্রথমবার গাড়ি হতে নেমে এ দরওয়াজা বা গেট দেখতে। গেটটি তিনতলা উপরে সৈনিকদের বিশ্রামের জায়গা করা ছিল। এখন পরিত্যক্ত। এখানেই যুবরাজ জাহাঙ্গীর তার পিতা আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের এক সময়ে যুদ্ধে আকবরের অন্যতম রত্ন ও যোদ্ধা আবুল ফজলকে হত্যা করেছিলেন। তার শিরশ্ছেদ করে মাথা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। আরো পরে ১৮৫৭ সালে কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যখন শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর মেজর হাডসনের নিকট আত্মসমর্পণ করেন ওই সময়ে তার তিন পুত্রসহ আরো অনেককে এই দরওয়াজার প্রাঙ্গণে গুলি করে হত্যা করে শিরশ্ছেদ করে লটকিয়ে রেখেছিল।
মেজর হাডসন যিনি নিজেও আরো পরে লক্ষ্ণৌতে সিপাহীদের হাতে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার দেহকেও লটকিয়ে রাখা হয়েছিল। লক্ষ্ণৌ-এর লা মার্টিনিয়ার কলেজের এক কোনায় রয়েছে মেজর হাডসন-এর সমাধি। মেজর হাডসন প্রথমে ছিলেন একজন ভাড়াটে সৈনিক। তার ক্যাভেলারি পরে বৃটিশ ভারত বাহিনীতে ‘হাডসন হর্স’ নামে আত্মীকরণ করা হয়েছিল। আমি ২০১৬ সালে ইয়াঙ্গুনে বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধিতে গিয়েছিলাম। যাই হোক কিংবদন্তি রয়েছে যে, এই গেটের উপরে বৃষ্টির পানি পড়লে রক্তের রং ধারণ করে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন যে, এখানে যে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে তাতে লোহার উপাদান বেশি বলে মরিচার রংয়ে পানির রং বদল হয়।
আর দুটি গেট যার মধ্যে একটি ১৮৫৭ সালের ক্ষত নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে তার নাম কাশ্মিরী গেট। মূলত এই গেটের পতনের পরেই ১৮৫৭ সালের সিপাহীরা পরাজিত হন। আর দক্ষিণ প্রান্তে এখনো দাঁড়িয়ে তুর্কম্যান গেট।
বলছিলাম শাহজাহানাবাদের কথা। তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল এই শহর। লালকেল্লা হতে ‘চাঁদনীচক’ পর্যন্ত ছিল উচ্চবিত্তদের বাস আর উচ্চমার্গের বিপণী বিতান। চক কোতোয়ালি (পুলিশ থানা), হতে চাঁদনীচক স্কয়ার ছিল দ্বিতীয় ভাগ। এ জায়গাতেই ছিল উচ্চবিত্তদের বাজার। কবি-সাহিত্যিকদের বাস ও আড্ডাখানা। মীর্জা গালিবের বাসস্থানও এরই ধারেকাছে। শেষবার দিল্লি সফরকালে গিয়েছিলাম মীর্জা গালিবের বাসস্থান দেখতে। যার বেশি অংশই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল বহু আগে। তবে পরে ভারত সরকার একাংশ উদ্ধার করে গালিব ট্রাস্ট বানিয়েছেন। এখন সে অংশ গালিবের জাদুঘর।
শেষ অংশ ছিল চাঁদনীচক হতে ফতেহপুরী মসজিদ পর্যন্ত। এখানে এখন এশিয়ার সবচাইতে বড় মসলার পাইকারি আড়ত।
‘চাঁদনীচকের’ আবাসনগুলো ছিল তিন স্তরের। প্রথম স্তর হাভেলী। প্রাসাদের মতো বাড়িগুলো ছিল উঁচু দেয়ালঘেরা। মালিকরা ছিলেন আমীর, ওমরাহ বা নবাব এবং তৎকালীন সমাজের উচ্চ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। এরা ছিলেন মোগল দরবারের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। একটি হাভেলী যা এখনো বিখ্যাত এবং সবচাইতে বড় নাম চুনীমল হাভেলী। আমি দেখতে গিয়েছিলাম ওই হাভেলীটি। দ্বিতীয় স্তর ছিল কুচা। এখানে একই পেশার মানুষরা থাকতেন। তৃতীয় স্তর কাটরা। এখানে পেশাদারদের কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থান একই জায়গায় ছিল। এই দুই স্তরই ছিল মহল্লা।
চাঁদনীচকের দক্ষিণ পাশে ‘জোহরী বাজার’ এক সময় অলংকারের বড় বাজার ছিল। এখনো কিছু রয়েছে। তবে বর্তমানে এখানে শাড়ি, লেহেঙ্গা আর মহিলাদের অন্যান্য পরিধেয় জড়ির কাজ করা কাপড় ও তৈরি পোশাকের পাইকারি বাজার। সমগ্র ভারতে সরবরাহ করা হয় এখান থেকেই। এখানেই প্রথমবার আমার পরিচয় হয়েছিল একজন রিকশাচালক আহমেদ গিয়াসের সঙ্গে। যিনি ৮০ রুপির বিনিময়ে বহু গলি আর কুচা দেখিয়েছিলেন। তিনি এই জায়গারই বাসিন্দা। কথায় কথায় জেনেছিলাম যে, প্রায় দশ পুরুষ ধরে তারা মোরিগেটের বাসিন্দা। এখন তারা রিকশা আর ভ্যানগাড়ির ব্যবসা করেন। তিনি মাঝে মধ্যে মনমতো যাত্রী পেলে এলাকা ঘুরিয়ে দেখান। আমাকে দেখেই তিনি ঠাওর করেছিলেন যে, এ জায়গা দেখতে এসেছি। বাংলাদেশি শুনে বেশ খুশিই হয়েছিলেন। বলেছিলেন যে, তার দুই ছেলে স্কুলে পড়ে। ইচ্ছা ছিল উচ্চশিক্ষিত করে তুলবার। তবে তার শঙ্কা ছিল সরকারি চাকরি না পাবার। তার তথ্য মোতাবেক এখানে একসময় সব বড় ব্যবসায়ীরাই ছিলেন মুসলমান। কিন্তু প্রথমবার ১৮৫৭ সালে পটপরিবর্তন হয় আর দ্বিতীয়বার ১৯৪৭ সালের দিল্লি রায়টের পরে মাত্র দশ ভাগে নেমে আসে মুসলমান ব্যবসায়ীদের সংখ্যা। ১৯৪৭ সালের পাঞ্জাব বিভক্তির পর পশ্চিম পাঞ্জাবের ভয়াবহ দাঙ্গার ফলে উদ্বাস্তু হওয়া শিখদের এখানে এবং ধারেকাছে ক্যারলবাগে পুনর্বাসন করা হয়। এখানে যে সব মুসলমানরা রয়ে গিয়েছিল তাদেরকে একপ্রকার যুদ্ধ করেই থাকতে হয়েছে। তার পূর্ব-পুরুষরা এভাবেই রয়ে গিয়েছিলেন।
আহমেদ গিয়াস দুঃখ করে বলেছিলেন যে, এখানকার মুসলমান ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় তেমন মনোযোগী নয়। ফটকাবাজারি করা ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। বয়স্করা আড্ডা আর কবুতর বাজি করে অতীতের প্রজন্মের স্বর্ণযুগের আলোচনায় তৃপ্ত হয়ে থাকেন। আহমেদ গিয়াস বলেছিলেন, এখানকার বহু বিত্তশালী যাদের হাভেলীগুলো এখনো দাঁড়িয়ে- তা তারা বিক্রি করে অনেকেই পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। আহমেদ গিয়াস দুঃখ করে বলেছিলেন যে, তার মুরুব্বিদের কাছ থেকে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা শুনেছেন। বললেন যে, তিনি শুনেছিলেন- মুসলমানদের পতন তাদের কারণেই হয়েছে। যেদিন বাহাদুর শাহ জাফরকে হাডসনের নেতৃত্বে শিখ পল্টন এই রাস্তা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তখন এখানকার ধনাঢ্য মুসলমানরা টিকে থাকবার জন্য হাত মিলিয়েছিলেন ইংরেজদের সাথে। এমন কি মীর্জা গালিবও কোম্পানির সিপাহীদের সঙ্গে মদ খেয়ে মাতাল হয়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন বাহাদুর শাহ জাফরের মোশাহেবার রত্ন। এসব কথা বিস্তারিতভাবে তার দাদার কাছে শুনেছিলেন। তিনি আমাকে অনেক গলি কুচাতে ঘুরিয়েছিলেন। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, রাজিয়া সুলতানার সমাধিতে নিয়ে যেতে পারবে কিনা। বলেছিলেন ওই জায়গা শাহজাহানাবাদেই। তবে গলির মধ্যে এ সময় যেতে বহু সময় লাগবে। তাই আর যাওয়া হয়নি। এরপরেও আর যাওয়া হয়নি। রাজিয়া সুলতানা ইলতুতমিশ-এর কন্যা ভারতবর্ষের প্রথম নারী সুলতান। আর মুসলমানদের শত শত বছরের শাসনকালের একমাত্র নারী শাসক। এর পরে আরেক নারী দিল্লি মসনদে সদর্পে ছিলেন তার নাম ইন্দিরা গান্ধী।
আহমেদ গিয়াস শিখদের গুরুদুয়ারা শিসগঞ্জ সাহেব, যেখানে আওরঙ্গজেব নবম শিখগুরুর শিরশ্ছেদ করিয়েছিলেন। দেখিয়েছিলেন। আমি যেতে চেয়েছিলাম লালকুয়া বাজার হয়ে তুর্কম্যান গেটের দিকে। এই জায়গাটির বহু ঘটনা খুশবন্ত সিং-এর বইতে পড়েছিলাম। আহমেদ গিয়াস নিয়ে যেতে সাহস পায়নি। কারণ ওই এলাকায় দিল্লির বেশির ভাগ হিজড়াদের বাসস্থান। এদের এখানে আবাস মোগল সময় হতে। এদের মধ্য হতে মোগল হেরেমের রক্ষী নিয়োজিত হতো। অনেক ঘুরিয়ে গিয়াসউদ্দিন আমাকে দিল্লির তথা ভারতের সর্ববৃহৎ মসজিদ জামে মসজিদের সামনে নামিয়ে দিয়েছিলেন। সামনেই চোর বাজার। জামা মসজিদ এখন ওয়াক্ফ সম্পত্তি। পর্যটকদের দর্শনীয় স্থান। ১৮৫৭ সালের পর কোম্পানির সৈনিকরা ‘আস্তাবল’ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল শাহজাহানের আরেক কীর্তি, এই মসজিদ কিন্তু ওই সময়ের ইংল্যান্ডের বৃটিশ সরকারের সায় না থাকায় রয়ে গিয়েছিল। ১৮৫৭ সালে মোগলদের পতনের পর কোম্পানির শাসকরা পরবর্তী দুই বছর দিল্লিতে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার বন্ধ রেখেছিল। ভয় পেয়েছিল আরেক উত্থানের। অবশ্য সিপাহী বিদ্রোহ বা প্রথম স্বাধীনতা ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ হতে ইংরেজদের বিতারিত করতে পলাশী যুদ্ধের ১০০ বছর পর। দিল্লির জামা মসজিদ তৈরি করেছিলেন রেড সেন্ড স্টোন দিয়ে। শাহজাহান পুত্র সম্রাট আওরঙ্গজেব এর চাইতে কিছুটা বড় একই ধাঁচের লাল পাথরের মসজিদ তৈরি করেন লাহোরে। যার নাম বাদশাহী মসজিদ। মসজিদটি তৈরি করেন তার দাদার নির্মিত লাহোর দুর্গের সামনে।
প্রথম সফরে দুপুরে ইচ্ছা হয়েছিল পুরাতন দিল্লিতেই খাবার খেতে। পরাটাওয়ালি গলির অনেক নাম শুনেছি। সেখানে চল্লিশ রকমের পরাটা পাওয়া যায়- এমনটাই শোনা যায়। গিয়েছিলাম ওই গলিতে। রিকশা নিয়েছিলাম। কোন কোন গলি দিয়ে টাউন হলের সামনে অত্যধিক সরু গলির মুখে থামিয়ে রিকশাচালক দেখিয়ে দিলো ইতিহাসখ্যাত পরাটাওয়ালি গলি। গলির ভেতরে মাত্র চার পাঁচখানা দোকান এখনো অবশিষ্ট। সবগুলোই প্রায় দেড়শত বছরের পুরনো। এক দোকানে বসে পরিচয় হলো ইকবাল আলীর সঙ্গে। দুই ভাই বংশপরম্পরায় চালিয়ে আসছে এই ছোট পরিসরের দোকান। সামনে বড় কড়াইতে ঘি ফুটছে। একজন দ্রুত হস্তে পরাটা বানিয়ে ঘিয়ের মধ্যে ডুবিয়ে ভেজে নিয়ে তুলে দিচ্ছে খদ্দেরদের প্লেটে। তিন রকমের সবজি ফ্রি। চাইলে আরো পাওয়া যায়। এমন কোনো ধরনের পরাটা নেই যা চাইলে পাওয়া যায় না। অনেক পরাটার নাম শুনলেও চল্লিশ ধরনের পরাটা হতে পারে তা আমার কল্পনাতেও ছিল না। এক প্লেটে দুটো পরাটা সঙ্গে সবজি চাটনি। অপূর্ব তার স্বাদ। ইকবাল আলীও তার সুখ-দুঃখের কথা জানালেন। বলেছিলেন, এ ব্যবসা ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাত্র চারটি দোকান রয়েছে। বাকিগুলো বিভিন্ন রকমারি শাড়ি-গহনার দোকানে রূপান্তরিত হয়েছে। বললেন, হয়তো এক দু’বছর পর আসলে এটাও বন্ধ পাবেন। নিজাম-এ (নিজামউদ্দিন আউলিয়ার নামে স্থান ও রেলওয়ে স্টেশনের নাম) ছোট রেস্তরাঁ নিয়েছি সেখানেই চলে যাবো। এবার গিয়ে মাত্র তিনটি দোকান পেয়েছিলাম। ভাটিয়া নামক একজনের দোকানে নাস্তা করেছিলাম।
তিনি জানালেন, ‘এখন পরাটা লোকে তেমন খেতে চায় না। ঘিয়ে ডুবিয়ে এই পরাটা স্বাস্থ্য সচেতন লোকে তো একেবারেই খায় না। তার উপরে ডায়াবেটিস আর হৃদরোগের ঝুঁকি। তেমন আড্ডাও হয় না। পেছনে পণ্ডিত নেহেরুর ছবি দেখিয়ে ভাটিয়া বললেন, আমার দাদা এলাকায় কংগ্রেস নেতা ছিলেন। তারই আমন্ত্রণে পণ্ডিত নেহেরু স্বাধীনতার আগে রাস্তার ওপারে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। এখান থেকে পরাটা নেয়া হয়েছিল। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইকবাল আলীর কথা। বললেন, নিজাম-এ খোঁজ করলে পাবেন।
আমি প্রথমবার যখন ইকবাল আলীর দোকান থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে বের হয়েছিলাম প্রায় একদিনের অভিজ্ঞতা আর মোগলদের তৈরি জৌলুসময় এই শহরের কথা চিন্তা করতে করতে ইহিাসে ডুবে গিয়েছিলাম। একদা প্রাচ্যের গর্ব এই শাহজাহানাবাদ, বর্তমানের পুরাতন দিল্লি, যে শহরের পতন হয়েছিল চারশ’ বছর আগে সেই শহর এখন মৃতনগরী। বাকি নেই কোনো জৌলুস। মানুষ আর ঠেলাগাড়ি, হট্টগোল, গালাগালি আর দোকানের বিশ্রি চেহারার পেছনের ইতিহাস ধুলোয় ডাকা পড়ছে। একদা মোগল বংশের উচ্চবিত্তদের বাসস্থানগুলো, গজল আর উর্দু শায়েরীর গুঞ্জনে মুখরিত হতো। আজ গোডাউনে পরিণত হয়েছে। বহু হাভেলী ধ্বংসপ্রায় জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ধ্বংসপ্রায় এক সময়ের ভারতের রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেনের বংশধরদের হাভেলী আর কাশ্মীরি পণ্ডিতদের আসকার হাভেলী যেখানে শত বছর পূর্বে জওহরলাল নেহেরু আর কমলা দেবীর জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এক সময়ের জৌলুসপূর্ণ শাহজাহানাবাদ, যে শহরকে নাদির শাহ তিনদিন ধরে লুট করেছিলেন। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল কোহিনূর হীরক খণ্ড। সেই শহর আজ অতীতের স্বর্ণালী দিনগুলোও মনে করিয়ে দেয়ার অবস্থায় নেই। আমি প্রথমবার পুরাতন দিল্লি বা শাহজাহানাবাদে গিয়ে যখন চারদিকে দেখছিলাম তখন যেন চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ইতিহাস উঁকি দিয়ে গিয়েছিল। হয়তো যারা শাহজাহানাবাদের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত নন, তাদের জন্য এ জায়গা কেবলমাত্র ছোট ছোট কারখানা আর বৃহৎ সস্তা, খুচরা আর পাইকারি বাজারের ধূসর দালানকোঠাগুলো মাত্র। অনেকেই হয়তো আসতেও চাইবে না। কিন্তু যারা প্রকৃত ভ্রমণ পিপাসু, যারা ভ্রমণে ইতিহাস খোঁজ করেন, পুরাতন দিল্লি এখনও সেই ইতিহাসের জৌলশময় দিনগুলো স্মরণ করিয়ে দেবে। এখনকার মূল বাসিন্দারা কঠিন জীবনযাপন করে আসছেন।
এই শাহজাহানাবাদ এক সময় সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল। ছিল উর্দু ভাষার কবি-মহাকবিদের মিলনস্থল। ফার্সি ভাষা চর্চার কেন্দ্র যার নেতৃত্ব দিতেন মোগল দরবারের রাজকুমার বা রাজকুমারীরা। এখনো অনেক ক্ষয়িষ্ণু পরিবারের সদস্যরা কিছু ধরে রাখবার চেষ্টা করছেন। হয়তো কয়েকটি বিবর্ণ বাঁধানো ছবি আর পুরাতন গড়গড়াটা পরিষ্কার করে অতীত জীবনের স্মৃতি হাতরিয়ে বেড়াচ্ছেন। বেশির ভাগ উর্দু সংস্কৃতি আর গজল কবিতার ধারকরা পাকিস্তানে চলে গিয়েছেন। ইতিহাস হয়ে থাকা অনেক বড় বড় নামের কবিদের অস্তিত্বই নেই। জউখ এখন লক্ষ্ণৌয়ের রেললাইনের ধারের কোনো কবরে শুয়ে আর মীর্জা গালিব নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের প্রবেশমুখে উন্মুক্ত আকাশের নিচে অযত্নে অবহেলায় রয়েছেন।
এক সময় শাহজাহানাবাদে পড়ন্ত বিকেলে ছাদের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কবুতরবাজরা কবুতরবাজি করতেন। এ খেলা ছিল বড় বড় হাভেলীর নবাবদের। মোগল সম্রাট আকবরের শখ ছিল কবুতরবাজি। যার নাম রেখেছিলেন ‘ইসকবাজি’। সে সময় হতেই উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পরে এ শখের খেলা। একজনের কবুতরের ঝাঁক অন্য কবুতরের সঙ্গে খেলা দেখাতে দেখাতে নিজের ঝাঁকের সঙ্গে নিয়ে আসা। ইতিহাসে বর্ণিত যে, সম্রাট আকবরের প্রায় বিশ হাজার কবুতর ছিল। এসব কবুতরের জন্য অর্থ বরাদ্দ ছিল। ছিল পরিচর্যার জন্য বিভিন্ন পদবির কর্মকর্তাগণ। আকবরের এই শখ ছিল বাল্যকাল থেকেই। হবেই বা না কেন, মাত্র ১২ বছর বয়সকালে পিতৃবিয়োগ ঘটলে মাতা হামিদা বানুর হাত ধরে সিংহাসনে বসেছিলেন। কাজেই বাল্যকালের শখ রাজকীয় শখে পরিণত হয়েছিল। আকবরের কবুতরের ঝাঁকের মধ্যে পাঁচশত কবুতর ছিল বিশেষ ধরনের। এদের জন্য ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। তিনি নিজে তার প্রিয় কবুতরগুলোকে নাম দিয়েছিলেন। সম্রাট শাহজাহান তার দাদার এই গুণটি পেয়েছিলেন। ওই সময়ে বিকেলে শাহজাহানাবাদের আকাশে কবুতরের পাখা ঝাপটা আর তাদের নিয়ন্ত্রকদের তীক্ষ্ণ শিসের বা অন্যান্য আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠতো শাহজাহানাবাদ।
এখনো শাহজাহানাবাদে বিকেলে চলে কবুতরবাজি। তবে এখন আর এ খেলা নবাব বা রাজকুমারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এ খেলা চলে এসেছে সাধারণ মানুষের আঙ্গিনায়। এখনো উড়তে দেখা যায় সিরাজী, লাল খাল, আজাদী, গোলে, মাসাককলি এবং কাবুলী কবুতরের ঝাঁক। এখনো কবুতরের ঝাঁকে ঝাঁকে প্রতিযোগিতা হয়। এখনো অন্য ঝাঁক হতে কবুতর ছিনিয়ে আনবার কৌশল শেখানো হয়। ছাদের উপর হতে ডাক শোনা যায় ‘আও আও’। তবে যা দেখা যায় না অতীতের সেই চাকচিক্য আর কবুতরবাজিতে শাহজাহানাবাদ মাতিয়ে রাখা। এখনো হুক্কার চলন থাকলেও নাকে আসে না বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি তামাকের ঘ্রাণ। নবাব আর সম্রাটদের হুক্কা এখন ‘সিসায়’ পরিণত হয়েছে। সুগন্ধি তামাকের জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে মাদক আর তৈরি হয়েছে ‘সিসা’ বার। এর ব্যাপ্তি আরেক মোগল শহর জাহাঙ্গীরনগর- এখনকার ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
কবুতরবাজি লক্ষ্ণৌ আর দিল্লি হয়ে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী শহরগুলোতে পৌঁছেছে। মহাজিরদের কল্যাণে পাকিস্তানের শহর করাচিতেও পৌঁছেছিল। আমার কৈশোর কেটেছিল এই শহরে। আমারও শখ ছিল কবুতরবাজির। প্রায় দেড়শত কবুতর ছিল আমার সংগ্রহে। এগুলো সবই পুরাতন স্মৃতি।
শাহজাহানাবাদ আজ স্মৃতির গহ্বরে ঠিক যেমনি শাহজাহানের পিতার তৈরি ঢাকার ঐতিহ্য। পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্য এখন সেকেলে। আধুনিক হবার প্রতিযোগিতায় সমাজের অবক্ষয়, যার উদাহরণ রয়েছে ভূরি ভূরি।
শাহজাহানাবাদ আর চাঁদনীচক ক্রমশই ইতিহাসের গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। হয়তো আর কয়েক দশক পর ‘শাহজাহানাবাদ’-এর নাম ইতিহাসে খুঁজে নাও পাওয়া যেতে পারে। পুরাতন দিল্লি হয়তো থাকবে না। হয়তো পুরাতনের উপরেই গজিয়ে উঠতে পারে নতুন শহর। যে শহরের নিচে হারিয়ে যাবে মোগলদের ঐতিহ্য, জৌলুসভরা কাহিনী আর খণ্ড খণ্ড কাহিনী শোনাবার মতো আহমেদ গিয়াস আর ইকবাল আলীদের মতো ব্যক্তিরা। কতজনই বা জানেন যে ‘চাঁদনীচক’ নামটি যিনি দিয়েছিলেন সেই মোগল শাহজাদী ‘জাহানারা’, শাহজাহান কন্যা আজ নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার প্রাঙ্গণে উন্মুক্ত কবরে শায়িত। মাঝেমধ্যে দু’একজন দর্শনার্থী খুঁজে বের করেন জাহানারার সমাধি।
প্রথমবার দিল্লিতে এসেই গিয়েছিলাম দিল্লির সূফী সম্রাট হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারে। এক ঐতিহাসিক স্থান। প্রবেশপথে আমীর খসরুর মাজার যিনি উপমহাদেশে কাওয়ালীর প্রচলন করেছিলেন। তিনি নিজে কাওয়ালীর জন্য কবিতা, কাসিদা আর গজল লিখতেন। তিনি আওলিয়ার প্রধান শিষ্য ছিলেন। পরিচিত হন সূফী সাধক হিসেবে। বিখ্যাত হয়ে উঠেন সূফী সাধক হিসেবে। মাজার প্রাঙ্গণে রয়েছে মোগল বংশের বহু বিখ্যাত ব্যক্তিদের সমাধি যার মধ্যে অন্যতম জাহানারা।
নিজামউদ্দিন আওলিয়ার দরগাতে সারা বছরব্যাপী প্রচুর ভক্তের সমাগম হয়। সমাগম হয় সকল ধর্মের মানুষের। ভাবতে অবাক হতে হয় কিভাবে পরাক্রমশীল সুলতানদের সময়ে একজন সাধারণ মানুষ হয়ে উঠেন অতীব সাধারণ মানুষের ‘মসিহা’। উপমহাদেশের সূফীদের ভক্ত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের মানুষ। আওলিয়ার সঙ্গে সুলতানদের সম্পর্ক যে মধুর ছিল না তার বিবরণ আগেই দিয়েছি। হযরত নিজামউদ্দিন আওলিয়া যখন সূফী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন তখন জালালউদ্দিন খিলজি দিল্লির মসনদে। তিনি কোনোদিন জালালউদ্দিনের ধারে কাছেও ঘেঁষেননি। বেশ কিছুক্ষণ ছিলাম এই ঐতিহাসিক চত্বরে কেবলই মনে পড়ছিল তার উক্তি- ‘হনুজ দিল্লি দূর অস্ত’। ছোটবেলা হতেই শুনেছি এ বাক্য। তখন জানতাম না এর ইতিহাস।
নিজামউদ্দিন হতে কয়েক কিলোমিটার দূরেই দিল্লির অষ্টম শহর ‘লুটিয়েন্স দিল্লি’ বা নয়াদিল্লি। এ স্বাধীন ভারতের রাজধানী। প্রথমবারও দেখেছি। এবারও দেখলাম। লুটিয়েন্স একমাত্র তাজমহল ছাড়া তৎকালীন ভারতের কোনো স্থাপনাকেই শৈল্পিক মনে করেননি। তিনি বৃটিশ রাজের জন্য তৈরি করেছিলেন সর্বাধুনিক রাজধানী। তৈরি করেছিলেন বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি আবাসস্থান যা আজ ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন। যার কথা প্রারম্ভে বলেছি। ইন্ডিয়া গেটে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অন্যতম প্রশস্ত রাজপথ যার এখনকার নাম জনপথ তার অপর প্রান্তে রেইসিয়ানা পাহাড়ের অপর প্রান্তের বিশাল প্রাসাদটি দেখা যায় না। ক্রমেই সামনের দিকে এগুলে পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের উদয়ের মতো উপরে উঠতে থাকে এই প্রাসাদ। এবারই দেখবার সুযোগ হয়েছিল ভেতরের কিছু অংশ, বিশেষ করে দরবার হল আর অশোকা হল। ১৯১১ সালে কলকাতা হতে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর করলেও ১৯৩১ সালের আগে শেষ করতে পারেনি নতুন দিল্লির কাজ। যখন নতুন দিল্লি পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে ওই সময় হতেই ভারতবর্ষে বৃটিশরাজের সূর্য অস্তগামী এরপর মাত্র ১৬ বছর টিকে ছিল বৃটিশ রাজ। যখন নতুন রাজধানীর পরিকল্পনা করা হয় তখন বৃটিশ রাজ ৫০০ শ’ বছরের রাজত্বের পরিকল্পনায় বিভোর ছিল। কিন্তু বুঝতে পারেনি যে ১৮৫৭-এর ঘটনা ভারতের জাতীয়তাবাদের নতুন রূপ দিবে। ওই বিদ্রোহের পর মাত্র ৯৯ বছরই টিকেছিল সমগ্র ভারতে বৃটিশ রাজ।
যাই হোক বর্তমানের রাষ্ট্রপতি ভবন, তৎকালীন ভাইসরয় প্রাসাদ, নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ১৯৩১ সালে, ওই সময়ে খরচ হয়েছিল ৪,৭৭,০০০ ব্রিটিশ পাউন্ড। এই ভবনের মোট কক্ষ সংখ্যা ছিল ৩৫৫টি। বর্তমানে ১৯০০০ ঘন মিটার আয়তনের এই ভবনে রয়েছে ৩৪০টি কক্ষ। আমাকে যে কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির দপ্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, তার এ ভবনে ৮ বছরের কর্মকালে পঞ্চাশটি রুমের বেশি দেখতে পারেননি। রাজকীয় ভবনই বটে।
এই ভবনটি তৈরিতে কোনো স্টিল ব্যবহার হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছিল ৭০০ মিলিয়ন ইট আর ৩.৫ মিলিয়ন ঘন মিটার পাথর। ওই সময় বাগানের পরিচর্যার জন্য নিয়োজিত ছিল ৪১৮ জন মালী। এখন এ সংখ্যা অনেক কম।
এই ভবনের শেষ বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। আর স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল নিয়োজিত হয়েছিলেন সি রাজা গোপালচারি। তিনি সাধাসিধা জীবনযাপন করতেন। তিনি ভাইসরয়দের জন্য নির্দিষ্ট বিশাল শয়নকক্ষে থাকেননি। তিনি বেছে নেন ছোট একটি কক্ষ যা আজও রাষ্ট্রপতির বাসকক্ষ। ওই শয়নকক্ষটি এখন অতিথিশালা।
দিল্লি আমাকে সব সময়েই রোমাঞ্চিত করে। মনে হয় এত বিশাল ইতিহাস যার পরিমাপ সম্পূর্ণভাবে এক জীবনে করা সম্ভব নয়। বিচিত্র ইতিহাস এই নগরীর। দিল্লির ইতিহাস প্রভাবিত করে রেখেছিল সমগ্র উপমহাদেশ। লাহোর-দিল্লি-ঢাকা প্রায় একই সূত্রে গাঁথা। মাঝে মধ্যে ভাবতেও অবাক লাগে কিভাবে দিল্লি হতে ১২০০ মাইল অতিক্রম করে কুতুবউদ্দিন আইবেকের সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজি ১২০১ সাল হতে ১২০৪ সালের মধ্যে বাংলার রাজধানী গৌড় দখল করে বাংলার ভাগ্য দিল্লির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। সেই বন্ধন কি এখনো কেটেছে? মনে হয় না অন্তত ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে পিতা জাহাঙ্গীরের নামে তৈরি শহর জাহাঙ্গীরনগর আর পুত্র শাহজাহানের তৈরি শাহজাহানাবাদের সঙ্গে একটা বিশাল যোগসূত্র তো ইতিহাস স্বীকৃত। তবে পর্যায়ক্রমে সে যোগাযোগ যথেষ্ট শিথিল হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর এখন ঢাকা আর শাহজাহানাবাদ পুরাতন দিল্লি। অনেক স্মৃতি আর অনেক ইতিহাস এসব জায়গা দেখতে হলে যা প্রয়োজন তাহলো ঐতিহাসিক অনুভূতির।
(এই প্রবন্ধটি লেখকের অনবদ্য ভ্রমণ কাহিনী ‘কত জনপদ কত ইতিহাস’ হতে সংকলিত।)
সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০১৭
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করায় সুযোগ হয়েছিল বিশ্বের সবচাইতে বড় এই ঐতিহাসিক সরকারি বাসভবনটির কিয়দাংশ দেখবার। রেইসিয়ানা পাহাড় কেটে এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল বৃটিশ ভারতের শাসক বৃটিশ উপনিবেশিক শক্তির ধারক বাহক ভাইসরয় হাউস হিসেবে। হার্বাট বেকারের তত্ত্বাবধানে এবং যার নকশায় এই ভবনটি তৈরি হয়েছিল তার নাম এডউইন ল্যান্ডসির লুটিয়েন্স (Edwin Landseer Lutyens)। এই ব্যক্তিই বর্তমানের নতুন দিল্লিরও নকশা করেছিলেন। তার সহযোগী ছিলেন মি. হার্বাট বেকার (Herbert Baker)। এ কারণে ভারতের রাজধানী নতুন নতুন দিল্লিকে অনেক সময় লুটিয়েন্স দিল্লি বলা হয়। এই দিল্লিই ঐতিহাসিক ভারতের অষ্টম, জনান্তরে দশম দিল্লিস্থিত রাজধানী। যাই হোক দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের বিস্তারিত বিবরণে পরে আসবো।
ইতিপূর্বেই আমি দুবার দিল্লিতে এসেছিলাম এবং সপ্তাহখানেক সময় করে কাটিয়েছিলাম। জীবনে দিল্লিতে প্রথম এসেছিলাম ২০০৯ সালে নির্বাচন কমিশনে থাকাকালে ভারতের পনেরতম সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে। তারপর আরেকবার এসেছিলাম ২০১০ সালে যখন আমি নির্বাচন সংস্কার নিয়ে গবেষণা করি। আর তৃতীয়বার ২০১৬ সালে এসেছিলাম আরেক গবেষণার কাজে। যতবারই দিল্লিতে এসেছি ততবারই মনে হয়েছে দিল্লিকে তেমনভাবে দেখা হয়নি, যেমনভাবে আমি দেখতে চেয়েছি। আমি বহু দেশের রাজধানীতে গিয়েছি। যার মধ্যে রোম নগরীও রয়েছে। তথাপি আমার মনে হয় যে দিল্লির ইতিহাসের বৈচিত্র্যের ধারেকাছেও বিশ্বের আর কোনো রাজধানী নেই। প্রথমবার এসেই মনে হয়েছিল কত পরিচিত এই শহর। কারণ উপমহাদেশের ইতিহাস যেদিন আমার পাঠ্যপুস্তকের তালিকায় এসেছিল সেদিন থেকেই আমি এই শহরের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছি। সেই ইতিহাস পড়া আজও শেষ হয়নি।
দিল্লির বর্ণনা দিতে গিয়ে বোধকরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার কয়েক পঙ্ক্তি মনে পড়ে। এর চাইতে ভালো বর্ণনা কেউ দিতে পারেনি বলে মনে হয়। অবশ্য তিনি তার কবিতায় ভারতবর্ষের কথা বললেও তা দিল্লির জন্যও প্রযোজ্য। তিনি লিখেছিলেন-
‘হেথায় আর্য, হেথায় অনার্য
হেথা দ্রাবিড় চীন
শকহুনদল পাঠান মোগল
এক দেহে হলো লীন।’
রবীন্দ্রনাথের কবিতার এই পঙক্তিতে যেন ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। দিল্লির মসনদে বসে ভারতবর্ষ শাসন করেছে আর্য, অনার্য, মোগল, পাঠান, গোত্র না জানা ক্রীতদাস, ইংরেজ। এমন বিচিত্র সাম্রাজ্যের ইতিহাস অন্য কোনো শহরে পাওয়া কল্পনাই করা যায় না।
আধুনিক ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি পক্ষান্তরে দিল্লি যতই আধুনিক হোক না কেন- নতুন বা পুরাতন দিল্লি দেখেছে সাম্রাজ্য আর শাসকদের উত্থান আর পতন। এই উত্থান আর পতনের সঙ্গে জড়িত ছিল তৎকালীন উপমহাদেশের ভাগ্য। দিল্লি শহরটি যত আধুনিকই হোক না কেন এর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সাম্রাজ্যের উত্থান পতনের ধ্বংসস্তূপ। রয়েছে বিভিন্ন ধর্মের, গোত্রের শাসকদের উত্থান আর পতনের করুণ চিহ্ন। এই শহর গড়ে উঠেছে সাতটি রাজধানী শহরকে কেন্দ্র করে। অনেকের মতে দশ হতে বারোটি শহরও হতে পারে। এ শহরের এসব পুরাতন সমাধিস্থল আর শ্মশানঘাট মনে করিয়ে দেয় উপমহাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস। এ ইতিহাস কারও পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই শহরে আসলেই জড়িয়ে পড়তে হয় ইতিহাসের সঙ্গে। নাটক, নভেল আর ভ্রমণ কাহিনীর উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে দিল্লির বৃহৎ উদ্যানগুলোতে আর রাজপথ, অলিগলি অথবা পুরাতন শহর জুড়ে। কত জাতির রক্ত ঝরেছে এই শহরে। কত সুখ-দুঃখের ইতিহাস আর অজানা গল্প রয়েছে দিল্লির প্রতিটি পাথরের নিচে। এমনই অনুভূতি হয়েছিল আমার প্রতিবারের দিল্লি সফরে।
প্রথমবার যখন দিল্লির দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাই চেষ্টা করেছিলাম কিছু অজানা ইতিহাস জানতে। কিছু পেয়েছি কিছু পাইনি। দিল্লির সাতটি রাজধানীর নাম এখনো তেমনই রয়েছে যেমন কিনা রাই পিলোথরা সবচাইতে পুরাতন শহর বলে নথিভুক্ত রয়েছে। এই শহরটি পৃত্থিরাজ চৌহান-এর তৈরি। এর ধ্বংসবিশেষ এখনো দৃশ্যমান। জায়গাটি কুতুব মিনারের কাছাকাছি। মেহেরুলী এখানেই কুতুব মিনারসহ বহু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। রয়েছে ফিরোজ শাহ তুগলকের সমাধি ও তার তৈরি ওই সময়কার সবচাইতে বৃহৎ মুসলিম পাঠস্থান মাদরাসা, সূফী বখতিয়ার উদ্দিন কাকীর সমাধি আর সামসি তালাব, ‘শিরি’, খিলজিদের রাজধানী, ফিরোজাবাদ, গিয়াসউদ্দিন তুগলকের তৈরি শহর। যমুনা নদীর তীরে ফিরোজ শাহ কোটলা, বর্তমানে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়াম এই সুলতানের নাম ধারণ করে রয়েছে।
তুগলকাবাদ গিয়াসউদ্দিন তুগলকের শহর এখন শুধুমাত্র একটি পরিত্যক্ত বিশাল আয়তনের পাথরের তৈরি দুর্গ। ওই সময়কার অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। গিয়াসউদ্দিন তুগলকের সমসাময়িক ছিলেন দিল্লির অন্যতম সূফী সাধক নিজামউদ্দিন আউলিয়া। নিজামউদ্দিন আউলিয়া ছিলেন উপমহাদেশের সবচাইতে খ্যাত সূফী সাধক খাজা মঈনউদ্দিন চিশতির শিষ্য এবং কুতুবউদ্দিন কাকীর শিক্ষানবিশ। নিজামউদ্দিন আউলিয়া ক্রমেই বিখ্যাত হয়ে উঠেন এমন কি তিনি সূফী সাধক হিসেবে কুতুবউদ্দিন কাকীর চাইতে বেশি খ্যাত হন। ওই সময়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের নিকট নিজামউদ্দিন দারুণ একজন জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তি। নিজামউদ্দিনের এ খ্যাতি গিয়াসউদ্দিন তুগলককে দারুন ঈর্ষাপরায়ণ করে তোলে। আমি কথা বলছি ১৩ শতাব্দীর আশেপাশের দিনগুলোর কথা। গিয়াসউদ্দিন তুগলক যখন তার শহর তৈরি করছিলেন ওই সময়ই নিজামউদ্দিন তার দরবারে, যা এখন এই সাধকের মাজার, খনন করছিলেন বিশাল এক তালাব (পুকুর), যা এখনো বিদ্যমান রয়েছে মাজারের পেছনে। ওই দীঘি খননের জন্য প্রয়োজন ছিল বহু কর্মীর। অপরদিকে দিল্লির সুলতানের শহর তৈরিতে কর্মীর অভাব হয়ে পড়লে নিজামউদ্দিনকে সুলতান তার কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন। নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে সুলতানের দরবারে ডেকে পাঠালে আওলিয়া সে ডাকে সাড়া দেননি।
গিয়াসউদ্দিন তুগলক তখন বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত। বাংলায় বিদ্রোহ থামাতে দিল্লি ছাড়লেন কিন্তু তার পূর্বেই তিনি মনঃস্থির করেছিলেন যে রাজদ্রোহের অপরাধে ফিরে এসে আউলিয়াকে চরম শাস্তি দেবেন। তুগলক বাংলার বিদ্রোহ দমন করে ফিরে আসবার পথে আবার তার সংকল্পের কথা প্রকাশ করলে আউলিয়ার শিষ্যরা আউলিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। নিজামউদ্দিনের তখন অনেক বয়স। তিনি তার অনুরাগীদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘তুগলককে দিল্লি পর্যন্ত আসতে দাও’- বলে যে উক্তি করেছিলেন তা উপমহাদেশে আজও উচ্চারিত হয়। ধ্যানরত আউলিয়া বলেছিলেন ‘হুনুজ দিল্লি দূর অস্ত’ ‘দিল্লি এখনো বহু দূরে’। গিয়াসউদ্দিন তুগলক দিল্লি পর্যন্ত আসতে পারেননি। পথে তার পুত্র মোহাম্মদ বিন তুগলকের তৈরি অভ্যর্থনা মঞ্চ হতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মহাক্রমশালী গিয়াসউদ্দিন তুগলকের সমাধি রয়েছে পরিত্যক্ত তুগলকাবাদের দুর্গের অদূরে জনমানবশূন্য নির্জন জায়গায় আর নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার থাকে লোকে লোকারণ্য। নিজামউদ্দিন আউলিয়া আরো ভবিষ্যদ্বাণী করে তুগলকাবাদ সম্পর্কে বলেছিলেন ‘ইয়া রাসেগা গুজর ইয়া রহেগা উজার’ (এটা হয় থাকবে পরিত্যক্ত অথবা বসবাস করবে গুজারা। [যারা মহিষ চড়ায়]) এমনই রয়েছে তুগলকাবাদ। এখান থেকে যে শিক্ষা নেয়া উচিত আমাদের সময়কার নেতাদের, ক্ষমতার দাপট চিরস্থায়ী নয়। চিরস্থায়ী নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মতো নিঃস্বদের।
গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার পুত্র মোহাম্মদ বিন তুগলক তৈরি করলেন মেহেরুলী এবং তুগলকাবাদের মাঝামাঝি নতুন শহর ‘জাহানপনা’। এখানে অনেক দিন ইবনে বতুতা অবস্থান করেছিলেন। পরে তুগলক রাজধানী দক্ষিণ ভারতে নিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিলেন জাহানপনাতে। জাহানপনা এখন ধ্বংসস্তূপ।
মোহাম্মদ বিন তুগলক ছিলেন অত্যন্ত কঠিন হৃদয়ের মানুষ এবং অনেকটা খেপাটে ধরনের। তিনি অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যার যৌক্তিকতা ওই সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন হঠাৎ দিল্লি হতে রাজধানী দক্ষিণে নিয়ে যেতে তিনি দিল্লিবাসীদের জোর করে নিয়ে যান। কথিত রয়েছে যে, একজন বিকলাঙ্গ ভিক্ষুককেও তিনি বাদ দেননি। আবার কয়েক বছর পর ফিরে আসেন দিল্লিতে। নিয়ে আসেন সব নাগরিকদের। এসবের জন্য তাকে উদাহরণ করেই ‘বাংলা ভাষায়’ যুক্ত হয়েছে প্রবাদবাক্য ‘তুগলকি কারবার’- যখন যা খুশি তাই করা। মোহাম্মদ বিন তুগলক ছিলেন ওই সময়কার প্রবল পরাক্রমশালী স্বৈরাচার। তুগলকরা এখনো একই রকম আছেন। অনেক তথাকথিত নির্বাচিত অনির্বাচিত শাসকরা ‘তুগলকি কারবারে অভ্যস্ত- আজ এক কথা কাল তার উল্টো। মোহাম্মদ বিন তুগলকের সমাধি কোথায় তা খুঁজে পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাস্ত করে শেরশাহ তৈরি করেছিলেন শেরগড়। শেরগড় লালকিল্লার কাছাকাছি জায়গায় আর পুরাতন কিল্লা ঘিরে। এখানেই এই পুরাতন কিল্লাতেই লাইব্রেরির সিঁড়ি হতে বাবরপুত্র হুমায়ুন পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
দিল্লির পুরাতন শহরের মধ্যে এখনো যা আবাদ রয়েছে- তা হলো শাহজাহানাবাদ যা বর্তমানে পুরাতন দিল্লি বলে পরিচিত। শাহজাহানাবাদ বা বর্তমানের পুরাতন দিল্লিই দিল্লির সপ্তম শহর। এই পুরাতন দিল্লিই ইতিহাসে ভরপুর। এখানেই শাহজাহানের বড় সন্তান জাহানারা তৈরি করেছিলেন ‘চাঁদনী চক’। এখানে বড় চওড়া রাস্তার মাঝে ছিল ছোট পানির তালাব আর ফোয়ারা। রাস্তার দু’ পাশে প্রবাহিত পানি যার উপরে পূর্ণিমার চাঁদের আলো ঠিকরিয়ে চকচক করতো। তাই জাহানারা নাম রেখেছিলেন চাঁদনীচক। এখন শুধুমাত্র চাঁদনী চক-এর নামটিই রয়েছে। প্রথমবার যখন পুরাতন দিল্লি তথা শাহজাহানাবাদে আসি তখন ভীষণ মর্মাহত হয়েছিলাম এখনকার
অবস্থা দেখে। পুরাতন ঢাকার চাইতে বড় এ ঐতিহাসিক শহরটি এখন হতশ্রি, ঠেলাগাড়ি, রিকশা আর মানুষের ভিড়। পাইকারি বাজার। এক সময়ের ঝলমলে এই শহরের বিখ্যাত গলিগুলো গন্ধ আর পুতময় হয়ে রয়েছে।
এক সময়ের ‘চাঁদনীচক’ যখন প্রথমবার দেখি বেশ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম ইতিহাসের গন্ধ পেয়ে। মনে হয়েছিল শাহজাহানাবাদের অলিতে-গলিতে ইতিহাস। বড় বড় হাভেলী আর কুচাগুলোর প্রতিটির অতীতই একেকটি বড় ইতিহাস। সুখ-দুঃখ, জৌলুস, প্রেম, বঞ্চনা, জীবন-মৃত্যু- সবই ধারণ করে কয়েকশত বছরের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রত্যেকটি পুরাতন জরাজীর্ণ এক সময়ের সুরম্য হাভেলী আর কুচাগুলো। এখন এটি একটি সাধারণ চৌরাস্তা- এর এক পাশে ছিল একটি অতিথিশালা যা এখন নেই সেখানেই রয়েছে টাউন হল। শাহজাহানাবাদ বা বর্তমানের পুরাতন দিল্লির স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবার ভারত বিখ্যাত। এখানে এখনো ঐতিহ্যবাহী মোগল খাবার পাওয়া যায়। এখানে পরের দিকের মোগলদের পাচকদের এক বংশধরের একটি রেস্তরাঁ রয়েছে যার নাম ‘করিমস্’, উপমহাদেশ খ্যাত এই রেস্তরাঁ। এখানে পরিবেশিত হয় সবধরনের কাবাব এবং মাংসের পরিবেশনা। মাৎস হিসেবে ব্যবহার হয় মুরগি এবং ছাগল বা বকরি। মোগলরা তাদের রাজত্বকালে তাদের হিন্দু প্রজাদের দিকে লক্ষ্য রেখেই গো-মাংস ভক্ষণকে নিরুসাহিত করেছিলেন। তাই এ অঞ্চলে কোরবানি ঈদ ‘বকরা ঈদ’ নামে পরিচিত।
শাহজাহানাবাদে অনেকগুলো বাজার ছিল। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পণ্যের বাজার। এখনো এই সব বাজার রয়েছে। তবে এগুলো এখন পাইকারি বাজার। তবে খুচরা বাজারও রয়েছে। শাহজাহানাবাদ গড়ে উঠেছিল দিল্লির মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদীর তীর ধরে। যমুনা তীর ধরেই গড়ে উঠেছিল ভারতের শত শত বছরের মুসলিম সাম্রাজ্য। লক্ষণীয় বিষয় যে, মোগল স্থাপন্যের সবচাইতে দর্শনীয় এবং বিশ্বের বিস্ময় আগ্রার তাজমহল এবং মোগলদের রাজধানী বলে কথিত আগ্রার দুর্গ গড়ে উঠে যমুনা নদীর তীরে।
যমুনা নদী তখন উন্মত্ত যৌবনা। দূর্গের পেছনে দেয়ালঘেঁষা। টলটল পরিস্কার পানির প্রবাহ। সূর্যের আলোতে চিকচিক করত। এ নদীর পানি সরবরাহ হত দূর্গ আর শাহজাহানাবাদে। এখন সেই যমুনা নদী খুঁজে পাওয়া যায় না। দূর্গ হতে কয়েক কিলোমিটার পূর্বে সরে গিয়েছে। নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে বস্তি আর পানি হয়েছে দূষিত। তবুও এই যমুনা নদী কালের সাক্ষী। অগণিত সাম্রাজ্যের উত্থান আর পতনের সাক্ষী।
অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন ওই সময়কার মুসলিম শাসকরা গঙ্গার তীরে তেমন কোনো স্থাপনা তৈরি করেননি; কারণ ওই নদীটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র নদী। তবে অনেক শাসকদের উপর মন্দির বিনষ্ট করার ঐতিহাসিক অভিযোগ রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন মধ্যযুগে ধর্মস্থানের ওপর হামলা করার অন্যতম কারণ ছিল দুর্গের ভেতর হতে শত্রুসেনাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে আসার কৌশল। হয়তো ঠিক, হয়তো ঠিক নয়- এটি নিয়ে বিতর্কের অভিপ্রায় আমার নয়।
শাহজাহানাবাদ বা পুরাতন দিল্লির আকার অনেকটা পানের মতো ছিল। এ শহরের প্রান্তে রয়েছে লালকিল্লা। লালকিল্লার লাহোর গেট হতে সোজা পশ্চিম দিকে প্রধান সড়ক যার মাঝ প্রান্তে ছিল চাঁদনী চক। প্রায় শেষ মাথায় রয়েছে একটি বৃহৎ মসজিদ; এগুলো তৈরি করেছিলেন শাহজাহানের অন্য দুই পত্নী। এর মধ্যে একজন বেগম আকবরি মহল। অপরজন বেগম ফতেহপুরী যার নামে পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে ফতেহপুরী মসজিদ। কথিত যে, তিনি এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এই দুই বেগমের সমাধি রয়েছে আগ্রার তাজমহলের প্রধান প্রবেশ পথের পাশে। আকবর মহলের তৈরি মসজিদটি ১৮৫৮ সালে কোম্পানির হুকুমে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। ওই সময় শাহজাহানাবাদের বহু মসজিদ আর মোগল স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। চাঁদনী চকের মূল সড়কে যুক্ত হয়েছে গলি, কুচা। আর শহরটি ছিল দেয়ালঘেরা যার নিয়ন্ত্রণ হতো বারটি গেটের মাধ্যমে। প্রতিটি গেটের বিভিন্ন নাম ছিল। এখনো কয়েকটি গেট দাঁড়িয়ে রয়েছে তবে দেয়াল প্রায় নেই বললেই চলে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের যুদ্ধে ধ্বংস হওয়ার পর বৃটিশ বাহিনী কয়েকটি গেট ছাড়া ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করেছিল শহরের দেয়াল। আজও পাঁচটি মূল গেট দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তার মধ্যে সবচাইতে ঘটনাবহুল এবং বহুভাবে আলোচিত ৫টি গেট বা দরওয়াজার অন্যতম বর্তমানে খুনি দরওয়াজা হিসেবে পরিচিত। এটি ছিল শাহজাহানাবাদে প্রবেশের প্রথম দরওয়াজা। এই দরওয়াজাটি তৈরি করেছিলেন শেরশাহ সুর যিনি এটা শেরগড়ে প্রবেশের অন্যতম দরওয়াজা হিসেবে ব্যবহার করতেন। পরে সম্রাট শাহজাহান তার প্রাচীর শহর শাহজাহানাবাদের প্রধান ফটকে উন্নীত করেন। এখানে হালেও বহু ঘটনার জন্ম হয়েছে। স্থানীয়রা মনে করেন ঐতিহাসিক কারণেই ‘এই দরওয়াজা, যা এখন রাস্তার ডিভাইডার-এর মাঝে, জায়গাটি অভিশপ্ত তাই বৃষ্টিতে রক্ত ঝরে। আমি প্রথমবার গাড়ি হতে নেমে এ দরওয়াজা বা গেট দেখতে। গেটটি তিনতলা উপরে সৈনিকদের বিশ্রামের জায়গা করা ছিল। এখন পরিত্যক্ত। এখানেই যুবরাজ জাহাঙ্গীর তার পিতা আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের এক সময়ে যুদ্ধে আকবরের অন্যতম রত্ন ও যোদ্ধা আবুল ফজলকে হত্যা করেছিলেন। তার শিরশ্ছেদ করে মাথা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। আরো পরে ১৮৫৭ সালে কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যখন শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর মেজর হাডসনের নিকট আত্মসমর্পণ করেন ওই সময়ে তার তিন পুত্রসহ আরো অনেককে এই দরওয়াজার প্রাঙ্গণে গুলি করে হত্যা করে শিরশ্ছেদ করে লটকিয়ে রেখেছিল।
মেজর হাডসন যিনি নিজেও আরো পরে লক্ষ্ণৌতে সিপাহীদের হাতে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার দেহকেও লটকিয়ে রাখা হয়েছিল। লক্ষ্ণৌ-এর লা মার্টিনিয়ার কলেজের এক কোনায় রয়েছে মেজর হাডসন-এর সমাধি। মেজর হাডসন প্রথমে ছিলেন একজন ভাড়াটে সৈনিক। তার ক্যাভেলারি পরে বৃটিশ ভারত বাহিনীতে ‘হাডসন হর্স’ নামে আত্মীকরণ করা হয়েছিল। আমি ২০১৬ সালে ইয়াঙ্গুনে বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধিতে গিয়েছিলাম। যাই হোক কিংবদন্তি রয়েছে যে, এই গেটের উপরে বৃষ্টির পানি পড়লে রক্তের রং ধারণ করে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন যে, এখানে যে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে তাতে লোহার উপাদান বেশি বলে মরিচার রংয়ে পানির রং বদল হয়।
আর দুটি গেট যার মধ্যে একটি ১৮৫৭ সালের ক্ষত নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে তার নাম কাশ্মিরী গেট। মূলত এই গেটের পতনের পরেই ১৮৫৭ সালের সিপাহীরা পরাজিত হন। আর দক্ষিণ প্রান্তে এখনো দাঁড়িয়ে তুর্কম্যান গেট।
বলছিলাম শাহজাহানাবাদের কথা। তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল এই শহর। লালকেল্লা হতে ‘চাঁদনীচক’ পর্যন্ত ছিল উচ্চবিত্তদের বাস আর উচ্চমার্গের বিপণী বিতান। চক কোতোয়ালি (পুলিশ থানা), হতে চাঁদনীচক স্কয়ার ছিল দ্বিতীয় ভাগ। এ জায়গাতেই ছিল উচ্চবিত্তদের বাজার। কবি-সাহিত্যিকদের বাস ও আড্ডাখানা। মীর্জা গালিবের বাসস্থানও এরই ধারেকাছে। শেষবার দিল্লি সফরকালে গিয়েছিলাম মীর্জা গালিবের বাসস্থান দেখতে। যার বেশি অংশই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল বহু আগে। তবে পরে ভারত সরকার একাংশ উদ্ধার করে গালিব ট্রাস্ট বানিয়েছেন। এখন সে অংশ গালিবের জাদুঘর।
শেষ অংশ ছিল চাঁদনীচক হতে ফতেহপুরী মসজিদ পর্যন্ত। এখানে এখন এশিয়ার সবচাইতে বড় মসলার পাইকারি আড়ত।
‘চাঁদনীচকের’ আবাসনগুলো ছিল তিন স্তরের। প্রথম স্তর হাভেলী। প্রাসাদের মতো বাড়িগুলো ছিল উঁচু দেয়ালঘেরা। মালিকরা ছিলেন আমীর, ওমরাহ বা নবাব এবং তৎকালীন সমাজের উচ্চ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। এরা ছিলেন মোগল দরবারের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। একটি হাভেলী যা এখনো বিখ্যাত এবং সবচাইতে বড় নাম চুনীমল হাভেলী। আমি দেখতে গিয়েছিলাম ওই হাভেলীটি। দ্বিতীয় স্তর ছিল কুচা। এখানে একই পেশার মানুষরা থাকতেন। তৃতীয় স্তর কাটরা। এখানে পেশাদারদের কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থান একই জায়গায় ছিল। এই দুই স্তরই ছিল মহল্লা।
চাঁদনীচকের দক্ষিণ পাশে ‘জোহরী বাজার’ এক সময় অলংকারের বড় বাজার ছিল। এখনো কিছু রয়েছে। তবে বর্তমানে এখানে শাড়ি, লেহেঙ্গা আর মহিলাদের অন্যান্য পরিধেয় জড়ির কাজ করা কাপড় ও তৈরি পোশাকের পাইকারি বাজার। সমগ্র ভারতে সরবরাহ করা হয় এখান থেকেই। এখানেই প্রথমবার আমার পরিচয় হয়েছিল একজন রিকশাচালক আহমেদ গিয়াসের সঙ্গে। যিনি ৮০ রুপির বিনিময়ে বহু গলি আর কুচা দেখিয়েছিলেন। তিনি এই জায়গারই বাসিন্দা। কথায় কথায় জেনেছিলাম যে, প্রায় দশ পুরুষ ধরে তারা মোরিগেটের বাসিন্দা। এখন তারা রিকশা আর ভ্যানগাড়ির ব্যবসা করেন। তিনি মাঝে মধ্যে মনমতো যাত্রী পেলে এলাকা ঘুরিয়ে দেখান। আমাকে দেখেই তিনি ঠাওর করেছিলেন যে, এ জায়গা দেখতে এসেছি। বাংলাদেশি শুনে বেশ খুশিই হয়েছিলেন। বলেছিলেন যে, তার দুই ছেলে স্কুলে পড়ে। ইচ্ছা ছিল উচ্চশিক্ষিত করে তুলবার। তবে তার শঙ্কা ছিল সরকারি চাকরি না পাবার। তার তথ্য মোতাবেক এখানে একসময় সব বড় ব্যবসায়ীরাই ছিলেন মুসলমান। কিন্তু প্রথমবার ১৮৫৭ সালে পটপরিবর্তন হয় আর দ্বিতীয়বার ১৯৪৭ সালের দিল্লি রায়টের পরে মাত্র দশ ভাগে নেমে আসে মুসলমান ব্যবসায়ীদের সংখ্যা। ১৯৪৭ সালের পাঞ্জাব বিভক্তির পর পশ্চিম পাঞ্জাবের ভয়াবহ দাঙ্গার ফলে উদ্বাস্তু হওয়া শিখদের এখানে এবং ধারেকাছে ক্যারলবাগে পুনর্বাসন করা হয়। এখানে যে সব মুসলমানরা রয়ে গিয়েছিল তাদেরকে একপ্রকার যুদ্ধ করেই থাকতে হয়েছে। তার পূর্ব-পুরুষরা এভাবেই রয়ে গিয়েছিলেন।
আহমেদ গিয়াস দুঃখ করে বলেছিলেন যে, এখানকার মুসলমান ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় তেমন মনোযোগী নয়। ফটকাবাজারি করা ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। বয়স্করা আড্ডা আর কবুতর বাজি করে অতীতের প্রজন্মের স্বর্ণযুগের আলোচনায় তৃপ্ত হয়ে থাকেন। আহমেদ গিয়াস বলেছিলেন, এখানকার বহু বিত্তশালী যাদের হাভেলীগুলো এখনো দাঁড়িয়ে- তা তারা বিক্রি করে অনেকেই পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। আহমেদ গিয়াস দুঃখ করে বলেছিলেন যে, তার মুরুব্বিদের কাছ থেকে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা শুনেছেন। বললেন যে, তিনি শুনেছিলেন- মুসলমানদের পতন তাদের কারণেই হয়েছে। যেদিন বাহাদুর শাহ জাফরকে হাডসনের নেতৃত্বে শিখ পল্টন এই রাস্তা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তখন এখানকার ধনাঢ্য মুসলমানরা টিকে থাকবার জন্য হাত মিলিয়েছিলেন ইংরেজদের সাথে। এমন কি মীর্জা গালিবও কোম্পানির সিপাহীদের সঙ্গে মদ খেয়ে মাতাল হয়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন বাহাদুর শাহ জাফরের মোশাহেবার রত্ন। এসব কথা বিস্তারিতভাবে তার দাদার কাছে শুনেছিলেন। তিনি আমাকে অনেক গলি কুচাতে ঘুরিয়েছিলেন। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, রাজিয়া সুলতানার সমাধিতে নিয়ে যেতে পারবে কিনা। বলেছিলেন ওই জায়গা শাহজাহানাবাদেই। তবে গলির মধ্যে এ সময় যেতে বহু সময় লাগবে। তাই আর যাওয়া হয়নি। এরপরেও আর যাওয়া হয়নি। রাজিয়া সুলতানা ইলতুতমিশ-এর কন্যা ভারতবর্ষের প্রথম নারী সুলতান। আর মুসলমানদের শত শত বছরের শাসনকালের একমাত্র নারী শাসক। এর পরে আরেক নারী দিল্লি মসনদে সদর্পে ছিলেন তার নাম ইন্দিরা গান্ধী।
আহমেদ গিয়াস শিখদের গুরুদুয়ারা শিসগঞ্জ সাহেব, যেখানে আওরঙ্গজেব নবম শিখগুরুর শিরশ্ছেদ করিয়েছিলেন। দেখিয়েছিলেন। আমি যেতে চেয়েছিলাম লালকুয়া বাজার হয়ে তুর্কম্যান গেটের দিকে। এই জায়গাটির বহু ঘটনা খুশবন্ত সিং-এর বইতে পড়েছিলাম। আহমেদ গিয়াস নিয়ে যেতে সাহস পায়নি। কারণ ওই এলাকায় দিল্লির বেশির ভাগ হিজড়াদের বাসস্থান। এদের এখানে আবাস মোগল সময় হতে। এদের মধ্য হতে মোগল হেরেমের রক্ষী নিয়োজিত হতো। অনেক ঘুরিয়ে গিয়াসউদ্দিন আমাকে দিল্লির তথা ভারতের সর্ববৃহৎ মসজিদ জামে মসজিদের সামনে নামিয়ে দিয়েছিলেন। সামনেই চোর বাজার। জামা মসজিদ এখন ওয়াক্ফ সম্পত্তি। পর্যটকদের দর্শনীয় স্থান। ১৮৫৭ সালের পর কোম্পানির সৈনিকরা ‘আস্তাবল’ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল শাহজাহানের আরেক কীর্তি, এই মসজিদ কিন্তু ওই সময়ের ইংল্যান্ডের বৃটিশ সরকারের সায় না থাকায় রয়ে গিয়েছিল। ১৮৫৭ সালে মোগলদের পতনের পর কোম্পানির শাসকরা পরবর্তী দুই বছর দিল্লিতে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার বন্ধ রেখেছিল। ভয় পেয়েছিল আরেক উত্থানের। অবশ্য সিপাহী বিদ্রোহ বা প্রথম স্বাধীনতা ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ হতে ইংরেজদের বিতারিত করতে পলাশী যুদ্ধের ১০০ বছর পর। দিল্লির জামা মসজিদ তৈরি করেছিলেন রেড সেন্ড স্টোন দিয়ে। শাহজাহান পুত্র সম্রাট আওরঙ্গজেব এর চাইতে কিছুটা বড় একই ধাঁচের লাল পাথরের মসজিদ তৈরি করেন লাহোরে। যার নাম বাদশাহী মসজিদ। মসজিদটি তৈরি করেন তার দাদার নির্মিত লাহোর দুর্গের সামনে।
প্রথম সফরে দুপুরে ইচ্ছা হয়েছিল পুরাতন দিল্লিতেই খাবার খেতে। পরাটাওয়ালি গলির অনেক নাম শুনেছি। সেখানে চল্লিশ রকমের পরাটা পাওয়া যায়- এমনটাই শোনা যায়। গিয়েছিলাম ওই গলিতে। রিকশা নিয়েছিলাম। কোন কোন গলি দিয়ে টাউন হলের সামনে অত্যধিক সরু গলির মুখে থামিয়ে রিকশাচালক দেখিয়ে দিলো ইতিহাসখ্যাত পরাটাওয়ালি গলি। গলির ভেতরে মাত্র চার পাঁচখানা দোকান এখনো অবশিষ্ট। সবগুলোই প্রায় দেড়শত বছরের পুরনো। এক দোকানে বসে পরিচয় হলো ইকবাল আলীর সঙ্গে। দুই ভাই বংশপরম্পরায় চালিয়ে আসছে এই ছোট পরিসরের দোকান। সামনে বড় কড়াইতে ঘি ফুটছে। একজন দ্রুত হস্তে পরাটা বানিয়ে ঘিয়ের মধ্যে ডুবিয়ে ভেজে নিয়ে তুলে দিচ্ছে খদ্দেরদের প্লেটে। তিন রকমের সবজি ফ্রি। চাইলে আরো পাওয়া যায়। এমন কোনো ধরনের পরাটা নেই যা চাইলে পাওয়া যায় না। অনেক পরাটার নাম শুনলেও চল্লিশ ধরনের পরাটা হতে পারে তা আমার কল্পনাতেও ছিল না। এক প্লেটে দুটো পরাটা সঙ্গে সবজি চাটনি। অপূর্ব তার স্বাদ। ইকবাল আলীও তার সুখ-দুঃখের কথা জানালেন। বলেছিলেন, এ ব্যবসা ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাত্র চারটি দোকান রয়েছে। বাকিগুলো বিভিন্ন রকমারি শাড়ি-গহনার দোকানে রূপান্তরিত হয়েছে। বললেন, হয়তো এক দু’বছর পর আসলে এটাও বন্ধ পাবেন। নিজাম-এ (নিজামউদ্দিন আউলিয়ার নামে স্থান ও রেলওয়ে স্টেশনের নাম) ছোট রেস্তরাঁ নিয়েছি সেখানেই চলে যাবো। এবার গিয়ে মাত্র তিনটি দোকান পেয়েছিলাম। ভাটিয়া নামক একজনের দোকানে নাস্তা করেছিলাম।
তিনি জানালেন, ‘এখন পরাটা লোকে তেমন খেতে চায় না। ঘিয়ে ডুবিয়ে এই পরাটা স্বাস্থ্য সচেতন লোকে তো একেবারেই খায় না। তার উপরে ডায়াবেটিস আর হৃদরোগের ঝুঁকি। তেমন আড্ডাও হয় না। পেছনে পণ্ডিত নেহেরুর ছবি দেখিয়ে ভাটিয়া বললেন, আমার দাদা এলাকায় কংগ্রেস নেতা ছিলেন। তারই আমন্ত্রণে পণ্ডিত নেহেরু স্বাধীনতার আগে রাস্তার ওপারে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। এখান থেকে পরাটা নেয়া হয়েছিল। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইকবাল আলীর কথা। বললেন, নিজাম-এ খোঁজ করলে পাবেন।
আমি প্রথমবার যখন ইকবাল আলীর দোকান থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে বের হয়েছিলাম প্রায় একদিনের অভিজ্ঞতা আর মোগলদের তৈরি জৌলুসময় এই শহরের কথা চিন্তা করতে করতে ইহিাসে ডুবে গিয়েছিলাম। একদা প্রাচ্যের গর্ব এই শাহজাহানাবাদ, বর্তমানের পুরাতন দিল্লি, যে শহরের পতন হয়েছিল চারশ’ বছর আগে সেই শহর এখন মৃতনগরী। বাকি নেই কোনো জৌলুস। মানুষ আর ঠেলাগাড়ি, হট্টগোল, গালাগালি আর দোকানের বিশ্রি চেহারার পেছনের ইতিহাস ধুলোয় ডাকা পড়ছে। একদা মোগল বংশের উচ্চবিত্তদের বাসস্থানগুলো, গজল আর উর্দু শায়েরীর গুঞ্জনে মুখরিত হতো। আজ গোডাউনে পরিণত হয়েছে। বহু হাভেলী ধ্বংসপ্রায় জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ধ্বংসপ্রায় এক সময়ের ভারতের রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেনের বংশধরদের হাভেলী আর কাশ্মীরি পণ্ডিতদের আসকার হাভেলী যেখানে শত বছর পূর্বে জওহরলাল নেহেরু আর কমলা দেবীর জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এক সময়ের জৌলুসপূর্ণ শাহজাহানাবাদ, যে শহরকে নাদির শাহ তিনদিন ধরে লুট করেছিলেন। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল কোহিনূর হীরক খণ্ড। সেই শহর আজ অতীতের স্বর্ণালী দিনগুলোও মনে করিয়ে দেয়ার অবস্থায় নেই। আমি প্রথমবার পুরাতন দিল্লি বা শাহজাহানাবাদে গিয়ে যখন চারদিকে দেখছিলাম তখন যেন চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ইতিহাস উঁকি দিয়ে গিয়েছিল। হয়তো যারা শাহজাহানাবাদের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত নন, তাদের জন্য এ জায়গা কেবলমাত্র ছোট ছোট কারখানা আর বৃহৎ সস্তা, খুচরা আর পাইকারি বাজারের ধূসর দালানকোঠাগুলো মাত্র। অনেকেই হয়তো আসতেও চাইবে না। কিন্তু যারা প্রকৃত ভ্রমণ পিপাসু, যারা ভ্রমণে ইতিহাস খোঁজ করেন, পুরাতন দিল্লি এখনও সেই ইতিহাসের জৌলশময় দিনগুলো স্মরণ করিয়ে দেবে। এখনকার মূল বাসিন্দারা কঠিন জীবনযাপন করে আসছেন।
এই শাহজাহানাবাদ এক সময় সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল। ছিল উর্দু ভাষার কবি-মহাকবিদের মিলনস্থল। ফার্সি ভাষা চর্চার কেন্দ্র যার নেতৃত্ব দিতেন মোগল দরবারের রাজকুমার বা রাজকুমারীরা। এখনো অনেক ক্ষয়িষ্ণু পরিবারের সদস্যরা কিছু ধরে রাখবার চেষ্টা করছেন। হয়তো কয়েকটি বিবর্ণ বাঁধানো ছবি আর পুরাতন গড়গড়াটা পরিষ্কার করে অতীত জীবনের স্মৃতি হাতরিয়ে বেড়াচ্ছেন। বেশির ভাগ উর্দু সংস্কৃতি আর গজল কবিতার ধারকরা পাকিস্তানে চলে গিয়েছেন। ইতিহাস হয়ে থাকা অনেক বড় বড় নামের কবিদের অস্তিত্বই নেই। জউখ এখন লক্ষ্ণৌয়ের রেললাইনের ধারের কোনো কবরে শুয়ে আর মীর্জা গালিব নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের প্রবেশমুখে উন্মুক্ত আকাশের নিচে অযত্নে অবহেলায় রয়েছেন।
এক সময় শাহজাহানাবাদে পড়ন্ত বিকেলে ছাদের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কবুতরবাজরা কবুতরবাজি করতেন। এ খেলা ছিল বড় বড় হাভেলীর নবাবদের। মোগল সম্রাট আকবরের শখ ছিল কবুতরবাজি। যার নাম রেখেছিলেন ‘ইসকবাজি’। সে সময় হতেই উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পরে এ শখের খেলা। একজনের কবুতরের ঝাঁক অন্য কবুতরের সঙ্গে খেলা দেখাতে দেখাতে নিজের ঝাঁকের সঙ্গে নিয়ে আসা। ইতিহাসে বর্ণিত যে, সম্রাট আকবরের প্রায় বিশ হাজার কবুতর ছিল। এসব কবুতরের জন্য অর্থ বরাদ্দ ছিল। ছিল পরিচর্যার জন্য বিভিন্ন পদবির কর্মকর্তাগণ। আকবরের এই শখ ছিল বাল্যকাল থেকেই। হবেই বা না কেন, মাত্র ১২ বছর বয়সকালে পিতৃবিয়োগ ঘটলে মাতা হামিদা বানুর হাত ধরে সিংহাসনে বসেছিলেন। কাজেই বাল্যকালের শখ রাজকীয় শখে পরিণত হয়েছিল। আকবরের কবুতরের ঝাঁকের মধ্যে পাঁচশত কবুতর ছিল বিশেষ ধরনের। এদের জন্য ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। তিনি নিজে তার প্রিয় কবুতরগুলোকে নাম দিয়েছিলেন। সম্রাট শাহজাহান তার দাদার এই গুণটি পেয়েছিলেন। ওই সময়ে বিকেলে শাহজাহানাবাদের আকাশে কবুতরের পাখা ঝাপটা আর তাদের নিয়ন্ত্রকদের তীক্ষ্ণ শিসের বা অন্যান্য আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠতো শাহজাহানাবাদ।
এখনো শাহজাহানাবাদে বিকেলে চলে কবুতরবাজি। তবে এখন আর এ খেলা নবাব বা রাজকুমারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এ খেলা চলে এসেছে সাধারণ মানুষের আঙ্গিনায়। এখনো উড়তে দেখা যায় সিরাজী, লাল খাল, আজাদী, গোলে, মাসাককলি এবং কাবুলী কবুতরের ঝাঁক। এখনো কবুতরের ঝাঁকে ঝাঁকে প্রতিযোগিতা হয়। এখনো অন্য ঝাঁক হতে কবুতর ছিনিয়ে আনবার কৌশল শেখানো হয়। ছাদের উপর হতে ডাক শোনা যায় ‘আও আও’। তবে যা দেখা যায় না অতীতের সেই চাকচিক্য আর কবুতরবাজিতে শাহজাহানাবাদ মাতিয়ে রাখা। এখনো হুক্কার চলন থাকলেও নাকে আসে না বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি তামাকের ঘ্রাণ। নবাব আর সম্রাটদের হুক্কা এখন ‘সিসায়’ পরিণত হয়েছে। সুগন্ধি তামাকের জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে মাদক আর তৈরি হয়েছে ‘সিসা’ বার। এর ব্যাপ্তি আরেক মোগল শহর জাহাঙ্গীরনগর- এখনকার ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
কবুতরবাজি লক্ষ্ণৌ আর দিল্লি হয়ে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী শহরগুলোতে পৌঁছেছে। মহাজিরদের কল্যাণে পাকিস্তানের শহর করাচিতেও পৌঁছেছিল। আমার কৈশোর কেটেছিল এই শহরে। আমারও শখ ছিল কবুতরবাজির। প্রায় দেড়শত কবুতর ছিল আমার সংগ্রহে। এগুলো সবই পুরাতন স্মৃতি।
শাহজাহানাবাদ আজ স্মৃতির গহ্বরে ঠিক যেমনি শাহজাহানের পিতার তৈরি ঢাকার ঐতিহ্য। পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্য এখন সেকেলে। আধুনিক হবার প্রতিযোগিতায় সমাজের অবক্ষয়, যার উদাহরণ রয়েছে ভূরি ভূরি।
শাহজাহানাবাদ আর চাঁদনীচক ক্রমশই ইতিহাসের গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। হয়তো আর কয়েক দশক পর ‘শাহজাহানাবাদ’-এর নাম ইতিহাসে খুঁজে নাও পাওয়া যেতে পারে। পুরাতন দিল্লি হয়তো থাকবে না। হয়তো পুরাতনের উপরেই গজিয়ে উঠতে পারে নতুন শহর। যে শহরের নিচে হারিয়ে যাবে মোগলদের ঐতিহ্য, জৌলুসভরা কাহিনী আর খণ্ড খণ্ড কাহিনী শোনাবার মতো আহমেদ গিয়াস আর ইকবাল আলীদের মতো ব্যক্তিরা। কতজনই বা জানেন যে ‘চাঁদনীচক’ নামটি যিনি দিয়েছিলেন সেই মোগল শাহজাদী ‘জাহানারা’, শাহজাহান কন্যা আজ নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার প্রাঙ্গণে উন্মুক্ত কবরে শায়িত। মাঝেমধ্যে দু’একজন দর্শনার্থী খুঁজে বের করেন জাহানারার সমাধি।
প্রথমবার দিল্লিতে এসেই গিয়েছিলাম দিল্লির সূফী সম্রাট হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারে। এক ঐতিহাসিক স্থান। প্রবেশপথে আমীর খসরুর মাজার যিনি উপমহাদেশে কাওয়ালীর প্রচলন করেছিলেন। তিনি নিজে কাওয়ালীর জন্য কবিতা, কাসিদা আর গজল লিখতেন। তিনি আওলিয়ার প্রধান শিষ্য ছিলেন। পরিচিত হন সূফী সাধক হিসেবে। বিখ্যাত হয়ে উঠেন সূফী সাধক হিসেবে। মাজার প্রাঙ্গণে রয়েছে মোগল বংশের বহু বিখ্যাত ব্যক্তিদের সমাধি যার মধ্যে অন্যতম জাহানারা।
নিজামউদ্দিন আওলিয়ার দরগাতে সারা বছরব্যাপী প্রচুর ভক্তের সমাগম হয়। সমাগম হয় সকল ধর্মের মানুষের। ভাবতে অবাক হতে হয় কিভাবে পরাক্রমশীল সুলতানদের সময়ে একজন সাধারণ মানুষ হয়ে উঠেন অতীব সাধারণ মানুষের ‘মসিহা’। উপমহাদেশের সূফীদের ভক্ত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের মানুষ। আওলিয়ার সঙ্গে সুলতানদের সম্পর্ক যে মধুর ছিল না তার বিবরণ আগেই দিয়েছি। হযরত নিজামউদ্দিন আওলিয়া যখন সূফী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন তখন জালালউদ্দিন খিলজি দিল্লির মসনদে। তিনি কোনোদিন জালালউদ্দিনের ধারে কাছেও ঘেঁষেননি। বেশ কিছুক্ষণ ছিলাম এই ঐতিহাসিক চত্বরে কেবলই মনে পড়ছিল তার উক্তি- ‘হনুজ দিল্লি দূর অস্ত’। ছোটবেলা হতেই শুনেছি এ বাক্য। তখন জানতাম না এর ইতিহাস।
নিজামউদ্দিন হতে কয়েক কিলোমিটার দূরেই দিল্লির অষ্টম শহর ‘লুটিয়েন্স দিল্লি’ বা নয়াদিল্লি। এ স্বাধীন ভারতের রাজধানী। প্রথমবারও দেখেছি। এবারও দেখলাম। লুটিয়েন্স একমাত্র তাজমহল ছাড়া তৎকালীন ভারতের কোনো স্থাপনাকেই শৈল্পিক মনে করেননি। তিনি বৃটিশ রাজের জন্য তৈরি করেছিলেন সর্বাধুনিক রাজধানী। তৈরি করেছিলেন বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি আবাসস্থান যা আজ ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন। যার কথা প্রারম্ভে বলেছি। ইন্ডিয়া গেটে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অন্যতম প্রশস্ত রাজপথ যার এখনকার নাম জনপথ তার অপর প্রান্তে রেইসিয়ানা পাহাড়ের অপর প্রান্তের বিশাল প্রাসাদটি দেখা যায় না। ক্রমেই সামনের দিকে এগুলে পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের উদয়ের মতো উপরে উঠতে থাকে এই প্রাসাদ। এবারই দেখবার সুযোগ হয়েছিল ভেতরের কিছু অংশ, বিশেষ করে দরবার হল আর অশোকা হল। ১৯১১ সালে কলকাতা হতে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর করলেও ১৯৩১ সালের আগে শেষ করতে পারেনি নতুন দিল্লির কাজ। যখন নতুন দিল্লি পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে ওই সময় হতেই ভারতবর্ষে বৃটিশরাজের সূর্য অস্তগামী এরপর মাত্র ১৬ বছর টিকে ছিল বৃটিশ রাজ। যখন নতুন রাজধানীর পরিকল্পনা করা হয় তখন বৃটিশ রাজ ৫০০ শ’ বছরের রাজত্বের পরিকল্পনায় বিভোর ছিল। কিন্তু বুঝতে পারেনি যে ১৮৫৭-এর ঘটনা ভারতের জাতীয়তাবাদের নতুন রূপ দিবে। ওই বিদ্রোহের পর মাত্র ৯৯ বছরই টিকেছিল সমগ্র ভারতে বৃটিশ রাজ।
যাই হোক বর্তমানের রাষ্ট্রপতি ভবন, তৎকালীন ভাইসরয় প্রাসাদ, নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ১৯৩১ সালে, ওই সময়ে খরচ হয়েছিল ৪,৭৭,০০০ ব্রিটিশ পাউন্ড। এই ভবনের মোট কক্ষ সংখ্যা ছিল ৩৫৫টি। বর্তমানে ১৯০০০ ঘন মিটার আয়তনের এই ভবনে রয়েছে ৩৪০টি কক্ষ। আমাকে যে কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির দপ্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, তার এ ভবনে ৮ বছরের কর্মকালে পঞ্চাশটি রুমের বেশি দেখতে পারেননি। রাজকীয় ভবনই বটে।
এই ভবনটি তৈরিতে কোনো স্টিল ব্যবহার হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছিল ৭০০ মিলিয়ন ইট আর ৩.৫ মিলিয়ন ঘন মিটার পাথর। ওই সময় বাগানের পরিচর্যার জন্য নিয়োজিত ছিল ৪১৮ জন মালী। এখন এ সংখ্যা অনেক কম।
এই ভবনের শেষ বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। আর স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল নিয়োজিত হয়েছিলেন সি রাজা গোপালচারি। তিনি সাধাসিধা জীবনযাপন করতেন। তিনি ভাইসরয়দের জন্য নির্দিষ্ট বিশাল শয়নকক্ষে থাকেননি। তিনি বেছে নেন ছোট একটি কক্ষ যা আজও রাষ্ট্রপতির বাসকক্ষ। ওই শয়নকক্ষটি এখন অতিথিশালা।
দিল্লি আমাকে সব সময়েই রোমাঞ্চিত করে। মনে হয় এত বিশাল ইতিহাস যার পরিমাপ সম্পূর্ণভাবে এক জীবনে করা সম্ভব নয়। বিচিত্র ইতিহাস এই নগরীর। দিল্লির ইতিহাস প্রভাবিত করে রেখেছিল সমগ্র উপমহাদেশ। লাহোর-দিল্লি-ঢাকা প্রায় একই সূত্রে গাঁথা। মাঝে মধ্যে ভাবতেও অবাক লাগে কিভাবে দিল্লি হতে ১২০০ মাইল অতিক্রম করে কুতুবউদ্দিন আইবেকের সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজি ১২০১ সাল হতে ১২০৪ সালের মধ্যে বাংলার রাজধানী গৌড় দখল করে বাংলার ভাগ্য দিল্লির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। সেই বন্ধন কি এখনো কেটেছে? মনে হয় না অন্তত ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে পিতা জাহাঙ্গীরের নামে তৈরি শহর জাহাঙ্গীরনগর আর পুত্র শাহজাহানের তৈরি শাহজাহানাবাদের সঙ্গে একটা বিশাল যোগসূত্র তো ইতিহাস স্বীকৃত। তবে পর্যায়ক্রমে সে যোগাযোগ যথেষ্ট শিথিল হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর এখন ঢাকা আর শাহজাহানাবাদ পুরাতন দিল্লি। অনেক স্মৃতি আর অনেক ইতিহাস এসব জায়গা দেখতে হলে যা প্রয়োজন তাহলো ঐতিহাসিক অনুভূতির।
(এই প্রবন্ধটি লেখকের অনবদ্য ভ্রমণ কাহিনী ‘কত জনপদ কত ইতিহাস’ হতে সংকলিত।)
সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০১৭
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1355)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
-
▼
2017
(8870)
-
▼
June
(1181)
-
▼
Jun 27
(8)
- কেন গুগলের রেকর্ড জরিমানা?
- 'আসাদের সম্ভাব্য গ্যাস-হামলা' সংক্রান্ত নতুন মার্ক...
- স্ত্রীকে ডির্ভোস দিতে চান চঞ্চল চৌধুরী!
- হনুজ দিল্লি দূর অস্ত by এম সাখাওয়াত হোসেন
- পাকিস্তানের ভাঙন পর্ব by সোহরাব হাসান
- জেলখানায় বন্দী মায়ের শিশুদের দিন কাটে কিভাবে?
- কাতার সঙ্কট : বাড়াবাড়ি করছে সৌদি আরব?
- মানসীর মাথায় ‘মিস ইন্ডিয়া’র বিজয় মুকুট
-
▼
Jun 27
(8)
-
▼
June
(1181)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
ইরান
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
কালবেলা
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
ইউক্রেন
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
তরুণ প্রজন্ম
মানবাধিকার
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আলী যাকের
আইন ও বিচার
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
তারেক শামসুর রেহমান
মালয়েশিয়া
আসিফ নজরুল
নেপাল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
স্বাস্থ্য
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
জ্যোতির্বিজ্ঞান
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
শিল্প ও সাহিত্য
সংবিধান ও রাষ্ট্র
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
গবেষণা
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
জীবনযাপন
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
মেহেদী হাসান
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
মানসুরা হোসাইন
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
মসজিদ
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
ইয়েমেন
একরামুল হক
Exclusive
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
উচ্চশিক্ষা
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
বিজ্ঞান
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
জনস্বাস্থ্য
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
ফরিদপুর
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লাতিন আমেরিকা
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মহাকাশচারী
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
জোহরান মামদানি
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
ইহুদি
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
স্পেন
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
বিশ্বকাপ ফুটবল
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment